চার দশক পেরিয়েও থামেনি বীক্ষণ: নতুন আহ্বায়ক কমিটিতে তরুণদের নেতৃত্ব

আরিফ আহমেদ

Sharing is caring!

চার দশক পেরিয়েও থামেনি বীক্ষণ: নতুন আহ্বায়ক কমিটিতে তরুণদের নেতৃত্ব

বিশেষ প্রতিবেদক

ব্রহ্মপুর নদের কোল ঘেঁষে স্রোতের সাথে পাল্লা দিয়ে চলছে ময়মনসিংহ সাহিত্য সংসদের বীক্ষণ পাঠচক্র। কেউ কেউ বলেন বাঁশের কঞ্চির বাঁশ হয়ে ওঠার গল্প এই বীক্ষণ। কেননা ময়মনসিংহ সাহিত্য সংসদের যতটা অন্তর্দন্দ ও কলহের দূর্নাম, ঠিক ততটাই বা তারচেয়ে অনেক অনেক গুন বেশি সুনাম বা সুখ্যাতি ছড়িয়ে যাচ্ছে এই পাঠচক্রটি। ব্রহ্মপুত্রের তীরে
চার দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রতি সপ্তাহে সাহিত্যপ্রেমীদের মিলন ঘটিয়ে চলেছে এই ‘বীক্ষণ’। পাঠ, বিষয়ভিত্তিক আলোচনা, কবিতা, আবৃত্তি, সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চার এই সাপ্তাহিক আয়োজন এখন শুধু ময়মনসিংহের নয়, দেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসেরও এক অনন্য ধারাবাহিকতার নাম। ১৯৮৩ সালে যাত্রা শুরু করা ময়মনসিংহ সাহিত্য সংসদের নিয়মিত সাপ্তাহিক পাঠচক্র ‘বীক্ষণ’ আজ দুই হাজার দুই শতাধিক (২২০০) আসর পেরিয়ে বাংলাদেশের দীর্ঘতম ধারাবাহিক সাপ্তাহিক সাহিত্য পাঠচক্র হিসেবে টিকে আছে।
নতুন প্রজন্মের কবি, লেখক, পাঠক, আবৃত্তিশিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের সম্পৃক্ত করে সেই দীর্ঘ ঐতিহ্যকে এগিয়ে নিতে অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর ২০২৬ এই তিন মাসের জন্য গঠন করা হয়েছে বীক্ষণের নতুন আহ্বায়ক কমিটি। এতে আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন নবী হোসেন লাদেন এবং যুগ্ম আহ্বায়ক হয়েছেন সুষ্মিতা সরকার।

ময়মনসিংহ সাহিত্য সংসদের সাধারণ সম্পাদক জুবায়েদ ইবনে সাঈদ নতুন কমিটির দায়িত্বপ্রাপ্তদের শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন। একই সঙ্গে বীক্ষণের নিয়মিত কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন তিনি।
নতুন কমিটিতে সদস্য হিসেবে রয়েছেন শাহিদ আমিনি রুমি, প্রণয় কুমার বিশ্বাস, টিপু চৌধুরী, হাসান রাকিব, বিউটি দাস, জিসি দেবনাথ ও স্নিগ্ধা ধর শিথিল।
নবনিযুক্ত আহ্বায়ক নবী হোসেন লাদেন দীর্ঘদিন ধরেই বীক্ষণের সঙ্গে যুক্ত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বীক্ষণের কার্যক্রম সরাসরি সম্প্রচারের শুরুর সময় থেকেই তিনি এর সঙ্গে সম্পৃক্ত। পড়াশোনার পাশাপাশি সাংবাদিকতা, লেখালেখি ও আবৃত্তিচর্চায়ও যুক্ত রয়েছেন তিনি। যুগ্ম আহ্বায়ক সুষ্মিতা সরকারও দীর্ঘদিন ধরে বীক্ষণের নিয়মিত কার্যক্রমে অংশ নিয়ে আসছেন। সংগঠনের পক্ষ থেকে তাকে দায়িত্বশীল ও সম্ভাবনাময় কর্মী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
নতুন কমিটির সদস্যদের মধ্যেও রয়েছে সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চার বৈচিত্র্য। শাহিদ আমিনি রুমি গান, সাহিত্য ও কবিতার সঙ্গে যুক্ত। প্রণয় কুমার বিশ্বাস পাঠক, লেখক ও প্রাবন্ধিক হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে ময়মনসিংহ সাহিত্য সংসদের কার্যক্রমে সম্পৃক্ত। আবৃত্তিশিল্পী টিপু চৌধুরী নিয়মিত বীক্ষণের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। কবি ও সংবাদকর্মী হাসান রাকিব নিয়মিত লেখালেখি করেন। বিউটি দাস প্রতি শুক্রবারের পাঠচক্রে কবিতা আবৃত্তির মাধ্যমে অংশ নেন।
সদ্য সাবেক আহ্বায়ক জিসি দেবনাথ দীর্ঘদিন ধরে বীক্ষণের কার্যক্রমে সক্রিয় থাকার পাশাপাশি কবিতা লেখেন। আর স্নিগ্ধা ধর শিথিল কবিতা লেখা, ছবি তোলা ও বাঁশি বাজানোর সঙ্গে যুক্ত। ফলে নতুন কমিটিতে অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের পাশাপাশি সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিভিন্ন মাধ্যমেরও সমন্বয় ঘটেছে।
তবে বীক্ষণের নতুন কমিটি গঠনের এই ঘটনা বুঝতে হলে ফিরে তাকাতে হয় এর দীর্ঘ ইতিহাসের দিকে।
ময়মনসিংহ সাহিত্য সংসদ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৮০ সালে। এর কয়েক বছর পর ১৯৮৩ সালের ৮ সেপ্টেম্বর যাত্রা শুরু করে নিয়মিত সাপ্তাহিক পাঠচক্র ‘বীক্ষণ’। শহরের সি. কে. রোডের প্রেসক্লাব চত্বরে বসেছিল বীক্ষণের প্রথম আসর। সেই প্রথম আয়োজনে সাহিত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত একাধিক বিশিষ্ট ব্যক্তি অংশ নেন। কথাশিল্পী সালিম হাসান ছিলেন বীক্ষণের প্রথম আহ্বায়ক।
শুরু থেকেই বীক্ষণের উদ্দেশ্য ছিল শুধু কবিতা পাঠ নয়; বরং পাঠ, আলোচনা, সমকাল, সাহিত্য, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সমাজকে নিয়ে মুক্ত চিন্তার একটি পরিসর তৈরি করা। প্রতি শুক্রবারের এই আয়োজন ধীরে ধীরে ময়মনসিংহের সাহিত্যপ্রেমীদের কাছে হয়ে ওঠে নিয়মিত মিলনমেলা।
সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে বীক্ষণের আসর বিভিন্ন স্থানে হয়েছে। একপর্যায়ে ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে জয়নুল আবেদিন উদ্যানে এর নিয়মিত আয়োজন শুরু হয়। খোলা আকাশের নিচে নদীর পাড়ে কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ পাঠ এবং সমকালীন বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনার কারণে বীক্ষণ ময়মনসিংহের সাংস্কৃতিক জীবনে আলাদা পরিচিতি পায়।
বীক্ষণের সবচেয়ে বড় শক্তি তার ধারাবাহিকতা। প্রতিকূল আবহাওয়া, নানা সামাজিক ও সাংগঠনিক বাস্তবতা কিংবা অংশগ্রহণকারীর স্বল্পতা, কোনোটিই এই সাপ্তাহিক আয়োজনকে দীর্ঘ সময় থামিয়ে রাখতে পারেনি। এমনও হয়েছে, প্রবল প্রতিকূলতার মধ্যেও অল্পসংখ্যক মানুষ নিয়ে আসর বসেছে। কারণ বীক্ষণের কাছে মূল বিষয় ছিল উপস্থিতির সংখ্যা নয়, ধারাবাহিকভাবে সাহিত্যচর্চার প্রদীপটি জ্বালিয়ে রাখা।
এই ধারাবাহিকতার পথ ধরে একের পর এক মাইলফলক পেরিয়েছে বীক্ষণ। ১৯৯৩ সালে অনুষ্ঠিত হয় ৫০০তম আসর। ২০০৩ সালে এক হাজারতম আসর। ২০১৪ সালে ১ হাজার ৬০০তম আসর। এরপরও থামেনি এই সাহিত্যযাত্রা। ২০১৮ সালে বীক্ষণের ১ হাজার ৭৮৫তম আসর অনুষ্ঠিত হয়। পরবর্তী সময়ে দুই হাজারের মাইলফলকও পেরিয়ে যায় এটি।
বীক্ষণের আসরে বিভিন্ন সময়ে দেশের খ্যাতিমান কবি, সাহিত্যিক, গবেষক ও চিন্তাবিদরা অংশ নিয়েছেন। শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, শহীদ কাদরী, নির্মলেন্দু গুণ, হেলাল হাফিজ, আসাদ চৌধুরী, আবদুল মান্নান সৈয়দ, বদরুদ্দীন উমর, হাবীবুল্লাহ সিরাজী, নাসরীন জাহান, মুহম্মদ নূরুল হুদাসহ অনেক বিশিষ্টজনের উপস্থিতি এই পাঠচক্রের ইতিহাসকে সমৃদ্ধ করেছে।
শুধু অতিথি নির্ভর আয়োজন নয়, বীক্ষণের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো স্থানীয় ও তরুণ লেখকদের জন্য নিয়মিত একটি মঞ্চ তৈরি করা। নতুন কবি তাদের কবিতা পড়েছেন, তরুণ লেখক তাদের লেখা পাঠ করেছেন, পাঠকেরা প্রশ্ন করেছেন, মত দিয়েছেন। ফলে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সাহিত্যচর্চার একটি সরাসরি সেতু তৈরি হয়েছে।
এ কারণেই বীক্ষণকে কেবল একটি সাপ্তাহিক সাহিত্যসভা হিসেবে দেখলে এর ব্যাপ্তি বোঝা যায় না। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রতি সপ্তাহে সাহিত্য ও মুক্তচিন্তার একটি উন্মুক্ত পরিসর ধরে রাখার যে নজির এটি তৈরি করেছে, বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিসরে তা বিরল। দুই হাজার দুই শতাধিক আসর পেরিয়ে যাওয়ায় বীক্ষণ এখন দেশের দীর্ঘতম ধারাবাহিক সাপ্তাহিক সাহিত্য পাঠচক্র হিসেবে একটি স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছে।
তবে এই দীর্ঘ যাত্রাপথ সবসময় মসৃণ ছিল না। বীক্ষণের সঙ্গে যুক্ত স্থান ও মঞ্চ নিয়েও সময়ের সঙ্গে নানা সংকট তৈরি হয়েছে। ব্রহ্মপুত্রের তীরের দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক পরিসর ও মুক্তমঞ্চ ভেঙে দেওয়া নিয়েও সংস্কৃতিকর্মীদের মধ্যে উদ্বেগ ও প্রতিবাদ দেখা গেছে। সাংগঠনিক মতপার্থক্যও কখনো কখনো সামনে এসেছে। তবু এসবের মধ্যেও বীক্ষণের সাপ্তাহিক আয়োজন অব্যাহত থাকার বিষয়টি এর সাংস্কৃতিক শক্তিরই প্রমাণ বহন করে।
২০২৬ সালেও বীক্ষণের নিয়মিত আসর অব্যাহত রয়েছে। দুই হাজার দুই শতাধিক আসরের এই দীর্ঘ ধারাবাহিকতায় নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণও বাড়ছে। সেই ধারারই অংশ হিসেবে এবার নতুন আহ্বায়ক কমিটিতে তরুণদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
নতুন কমিটির সামনে তাই তিন মাসের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি রয়েছে দীর্ঘ একটি ঐতিহ্যকে ধারণ করার দায়িত্ব। প্রযুক্তির বদলে যাওয়া সময়ে পাঠাভ্যাসে পরিবর্তন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তার এবং তরুণ প্রজন্মের দ্রুত পরিবর্তিত সাংস্কৃতিক আগ্রহের মধ্যেও বীক্ষণের মূল চেতনা- পাঠ, চিন্তা, মতবিনিময় ও সৃজনশীলতার ধারাটি কতটা শক্তিশালী করা যায়, সেটিই হবে নতুন নেতৃত্বের বড় কাজ।

 

Print Friendly, PDF & Email

Sharing is caring!

About the author

ডিসেম্বর ৭১! কৃত্তনখোলার জলে সাঁতার কেটে বেড়ে ওঠা জীবন। ইছামতির তীরঘেষা ভালবাসা ছুঁয়ে যায় গঙ্গার আহ্বানে। সেই টানে কলকাতার বিরাটিতে তিনটি বছর। এদিকে পিতা প্রয়াত আলাউদ্দিন আহমেদ-এর উৎকণ্ঠা আর মা জিন্নাত আরা বেগম-এর চোখের জল, গঙ্গার সম্মোহনী কাটিয়ে তাই ফিরে আসা ঘরে। কিন্তু কৈশরী প্রেম আবার তাড়া করে, তের বছর বয়সে তের বার হারিয়ে যাওয়ার রেকর্ডে যেন বিদ্রোহী কবি নজরুলের অনুসরণ। জীবনানন্দ আর সুকান্তে প্রভাবিত যৌবন আটকে যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙ্গিনায় পদার্পন মাত্রই। এখানে আধুনিক হবার চেষ্টায় বড় তারাতারি বদলে যায় জীবন। প্রতিবাদে দেবী আর নিগার নামের দুটি কাব্য সংকলন প্রশ্ন তোলে বিবেকবানের মনে। তার কবিতায়, উচ্চারণ শুদ্ধতা আর কবিত্বের আধুনিকায়নের দাবী তুলে তুলে নেন দীক্ষার ভার প্রয়াত নরেণ বিশ্বাস স্যার। স্যারের পরামর্শে প্রথম আলাপ কবি আসাদ চৌধুরী, মুহাম্মদ নুরুল হুদা এবং তৎকালিন ভাষাতত্ব বিভাগের চেয়ারম্যান ড. রাজীব হুমায়ুন ডেকে পাঠান তাকে। অভিনেতা রাজনীতিবিদ আসাদুজ্জামান নূর, সাংকৃতজন আলী যাকের আর সারা যাকের-এর উৎসাহ উদ্দিপনায় শুরু হয় নতুন পথ চলা। ঢাকা সুবচন, থিয়েটার ইউনিট হয়ে মাযহারুল হক পিন্টুর সাথে নাট্যাভিনয় ইউনিভার্সেল থিয়েটারে। শংকর শাওজাল হাত ধরে শিখান মঞ্চনাটবের রিপোটিংটা। তারই সূত্র ধরে তৈরি হয় দৈনিক ভোরের কাগজের প্রথম মঞ্চপাতা। একইসমেয় দর্শন চাষা সরদার ফজলুল করিম- হাত ধরে নিযে চলেন জীবনদত্তের পাঠশালায়। বলেন- মানুষ হও দাদু ভাই, প্রকৃত মানুষ। সরদার ফজলুল করিমের এ উক্তি ছুঁয়ে যায় হৃদয়। সত্যিকারের মানুষ হবার চেষ্টায় তাই জাতীয় দৈনিক রুপালী, বাংলার বাণী, জনকণ্ঠ, ইত্তেফাক, মুক্তকণ্ঠের প্রদায়ক হয়ে এবং অবশেষে ভোরেরকাগজের প্রতিনিধি নিযুক্ত হয়ে ঘুরে বেড়ান ৬৫টি জেলায়। ছুটে বেড়ান গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। ২০০২ সালে প্রথম চ্যানেল আই-্র সংবাদ বিভাগে স্থির হন বটে, তবে অস্থির চিত্ত এরপর ঘনবদল বেঙ্গল ফাউন্ডেশন, আমাদের সময়, মানবজমিন ও দৈনিক যায়যায়দিন হয়ে এখন আবার বেকার। প্রথম আলো ও চ্যানেল আই আর অভিনেত্রী, নির্দেশক সারা যাকের এর প্রশ্রয়ে ও স্নেহ ছায়ায় আজও বিচরণ তার। একইসাথে চলছে সাহিত্য বাজার নামের পত্রিকা সম্পাদনার কাজ।