সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ উপেক্ষা করে সিটি মার্কেট নির্মাণ : বসিক প্রশাসকের স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ
(একজন বৃদ্ধের কান্না- গরিবের ঘর উচ্ছেদ হলেও ছাড় পায় অট্টালিকা…)
, বিশেষ প্রতিবেদক
বরিশাল নগরীতে ফাঁকা জায়গা পেলেই মার্কেট নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়ার প্রবণতা থেকে বরিশাল সিটি করপোরেশনের (বসিক) প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরিনকে বেরিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন নাগরিকরা। একই সঙ্গে সড়ক ও ফুটপাতের জায়গা সংকুচিত করে নতুন স্থাপনা নির্মাণের পরিবর্তে প্রকৃত হকারদের পুনর্বাসন এবং জনদুর্ভোগমুক্ত নগরী গড়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
গত ৩ অক্টোবর শনিবার সকাল ১১টায় নগরীর ১৭ নম্বর ওয়ার্ডের বগুড়া রোডে প্রস্তাবিত সিটি মার্কেট নির্মাণের প্রতিবাদে মানববন্ধন করেন বিএনপির একটি অংশসহ স্থানীয়রা। এতে নেতৃত্ব দেন বরিশাল মহানগর বিএনপির ১ নম্বর যুগ্ম আহ্বায়ক আফরোজা খানম নাসরিন।
মানববন্ধনকারীদের অভিযোগ, গত ৩০ সেপ্টেম্বর সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের সামনের সড়কের পাশে বসিকের নিজস্ব জায়গায় বহুতল সিটি মার্কেট নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন ও কাজের উদ্বোধন করেন প্রশাসক শিরিন। তিনি সরাসরি উপস্থিত না হয়ে অনলাইনে যুক্ত হন। এরপরই শুরু হয় মাটি খননের কাজ।
তবে মানববন্ধনের পরও কাজ থামেনি। ৫ অক্টোবর, সোমবার সরেজমিনে দেখা যায়, ওই এলাকায় ভেকু দিয়ে মাটি খনন চলছে। সরু সড়কের পাশে বসিকের মালিকানাধীন লম্বাটে জায়গাটির কোথাও প্রস্থ চার ফুট, কোথাও ছয় ফুট, আবার কোথাও প্রায় ১০ ফুট। স্থানীয়দের ভাষ্য, জায়গাটি এতদিন চলাচলের পথ, ফুটপাত ও পানি নিষ্কাশনের কাজে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রকল্পের সীমানা চিহ্নিত লাল দাগের আওতায় কয়েকটি বিদ্যমান বহুতল ভবনের অংশও রয়েছে বলে স্থানীয়রা দাবি করছেন। তাদের প্রশ্ন, সীমানার মধ্যে ভবনের অংশ থাকলে সেটি অক্ষত রেখে কীভাবে নির্মাণকাজ এগোচ্ছে? আর ভবনটি সীমানার বাইরে হলে প্রকল্পের সঠিক সীমানা ও নকশা কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে, তারও ব্যাখ্যা দাবি করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, মার্কেট নির্মাণ হলে আশপাশের ৪০ থেকে ৫০টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। অনেক বাড়ির প্রবেশপথ সংকুচিত বা বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি মূল সড়ক আরও সরু হয়ে যানজট বাড়তে পারে। বর্ষায় এলাকায় পানি জমে থাকায় নতুন স্থাপনা হলে পানি নিষ্কাশন সমস্যাও বাড়বে বলে তাদের আশঙ্কা।
মানববন্ধনে স্থানীয় বাসিন্দা হুমায়ুন কবির, রফিকুল, জাহিদুল ইসলাম, বশীরুল ইসলাম খান, রেজাউল ইসলাম খান ও অহিদুন নবীসহ অন্যরা বলেন, জায়গাটি মার্কেট নির্মাণের পরিবর্তে সড়ক সম্প্রসারণ, ফুটপাত ও পানি নিষ্কাশনের কাজে ব্যবহার করা উচিত। গার্লস স্কুল ও বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান এখানে, তাই এই সড়কের সৌন্দর্যবর্ধনে এই জায়গা ব্যবহার হলে আমরা বেশি উপকৃত হবো।
মানববন্ধনে আসা একজন প্রবীণ ব্যক্তি নিজের চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় সিটি করপোরেশনে অভিযোগ করতে গিয়ে তাকে অন্যত্র প্রবেশপথ করে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে বলে কান্নায় ভেঙে পড়েন। এতে উপস্থিত মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়। তাদের প্রশ্ন- গরিব মানুষের চলাচলের পথ সংকুচিত হলেও অট্টালিকা কীভাবে অক্ষত থাকে?
মানববন্ধনে হকার পুনর্বাসনের দাবিও ওঠে। বক্তারা বলেন, ফুটপাত দখলমুক্ত করতে নগরীর কয়েকটি স্থানে হকার উচ্ছেদ করা হয়েছে। তাদের পুনর্বাসন অঙ্গীকার করে ১৫০টির মতো স্টল নির্মাণ করা হয়েছে। অতচ তিনমাসও কোনো হকার পুনর্বাসন হয়নি।
তারা বলেন, প্রকৃত হকারদের উচ্ছেদ করে নয়; তাদের তালিকা করে পরিকল্পিতভাবে পুনর্বাসন করতে হবে। শুধু মার্কেট নির্মাণ করলেই হকার পুনর্বাসন হয় না, প্রকৃত হকাররা সেখানে বরাদ্দ পাবেন কি না, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
মানববন্ধনে বিএনপি নেত্রী আফরোজা খানম নাসরিন বলেন, জনগণকে দুর্ভোগে ফেলে কোনো উন্নয়ন হতে পারে না। প্রশাসকের উচিত সরেজমিনে জায়গাটি পরিদর্শন করে সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা। অন্যথায় এলাকাবাসী আন্দোলনে যেতে বাধ্য হবে।
অন্যদিকে মানববন্ধনের অভিযোগকে ‘ষড়যন্ত্র’ দাবি করে বসিক প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন বলেন, নগরবাসীর সমস্যা সমাধানে তিনি সচেতন। কারও অভিযোগ থাকলে সিটি করপোরেশনে এসে সরাসরি জানানো উচিত ছিল। মানববন্ধনে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা স্থানীয় বাসিন্দা নন বলেও দাবি করেন তিনি।
এদিকে প্রকল্পটি নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক বরিশাল শাখাও আপত্তি জানিয়েছে বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, মার্কেট নির্মাণকে ঝুঁকিপূর্ণ উল্লেখ করে বাংলাদেশ ব্যাংক বরিশাল শাখার পক্ষ থেকে বসিক প্রশাসক বরাবর একটি চিঠি দেওয়া হয়েছে। তবে চিঠিতে কী কী কারণ উল্লেখ করা হয়েছে, তা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সিটি কর্পোরেশনের একজন কর্মকর্তা বাংলাদেশ ব্যাংকের চিঠি প্রার্থীর কথা স্বীকার করেন।
নগরবাসীর প্রশ্ন এখন শুধু একটি মার্কেট নির্মাণ নিয়ে নয়, নগরীর অবশিষ্ট খোলা জায়গাগুলো কি একের পর এক বাণিজ্যিক স্থাপনায় পরিণত হবে, নাকি সড়ক, ফুটপাত, পানি নিষ্কাশন, সবুজায়ন ও নাগরিক চলাচলের জন্যও জায়গা রাখা হবে?
বরিশাল বাসি চান, বসিক প্রশাসক ফাঁকা জায়গা পেলেই মার্কেট নির্মাণের প্রবণতা থেকে বেরিয়ে এসে আগে নগরীর দীর্ঘমেয়াদি প্রয়োজন বিবেচনা করবেন এবং প্রকৃত হকারদের পরিকল্পিত পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেবেন। উন্নয়ন এমন হওয়া উচিত, যা নগরবাসীর জীবন সহজ করে, এক সমস্যার জায়গায় নতুন সমস্যা তৈরি করে না।








