স্বাস্থ্য প্রশাসনে একের পর এক বিতর্কিত পদায়ন: অনিশ্চয়তায় বরিশালের চিকিৎসাসেবা
, বিশেষ প্রতিবেদক
দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় দুই কোটি মানুষের চিকিৎসাসেবার অন্যতম কেন্দ্র বরিশাল। কিন্তু বিভাগীয় স্বাস্থ্য প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে একের পর এক বদলি, নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক, দায়িত্ব গ্রহণে বিলম্ব এবং শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ (শেবাচিম) হাসপাতালের পরিচালকের দীর্ঘ অনুপস্থিতিকে ঘিরে স্বাস্থ্য খাতে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এ পরিস্থিতি দীর্ঘ হলে জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন শেবাচিম হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. মশিউল মুনীর। হাসপাতালের জনবল সংকট, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ঘাটতি ও অতিরিক্ত রোগীর চাপ নিয়ে একাধিকবার প্রকাশ্যে কথা বলার পর তিনি দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত। এদিকে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী হাসপাতাল পরিচালনা কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম সভাতেও পরিচালক উপস্থিত ছিলেন না। বিষয়টি স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্ট মহলে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
শেবাচিম হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. আবদুল মুনায়েম সাদ বলেন, পরিচালকের ওপর কিছুটা চাপ রয়েছে। তবে তার চলে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি হয়নি। ছেলের এইচএসসি পরীক্ষা চলায় তিনি বর্তমানে ঢাকায় অবস্থান করছেন। পরিচালকের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
সম্প্রতি বরিশাল বিভাগের স্বাস্থ্য পরিচালক নিয়োগ নিয়ে আন্দোলনের পর সরকারের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের ঘটনা আলোচনায় আসে। এরই মধ্যে ২১ জুলাই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বরিশালের সিভিল সার্জন ডা. এস এম মনজুর এলাহীকে স্ট্যান্ড রিলিজ দিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে সংযুক্ত করে এবং তার স্থলে ওএসডি কর্মকর্তা ডা. মো. মনিরুজ্জামানকে পদায়ন করে। তবে কয়েকদিন পেরিয়ে গেলেও নতুন সিভিল সার্জন আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারেননি।
বিদায়ী সিভিল সার্জন ডা. মনজুর এলাহী বলেন, ব্যক্তিগত কারণে তিনি বর্তমানে ঢাকায় অবস্থান করছেন। বরিশালে ফিরে এসে সরকারি বিধি অনুযায়ী দায়িত্ব বুঝিয়ে দেবেন। তিনি দাবি করেন, বরিশাল প্রেসক্লাবের কয়েকজন নেতা তার কাছে নতুন সিভিল সার্জনকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেওয়ার সুপারিশ নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি বিষয়টিকে গুরুত্ব না দিয়ে জরুরি প্রয়োজনে ঢাকায় চলে আসেন। ডা. মনজুর এলাহীর এ বক্তব্যের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
নবনিযুক্ত সিভিল সার্জন ডা. মো. মনিরুজ্জামানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। স্বাস্থ্য বিভাগের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, তিনিও বর্তমানে ঢাকায় অবস্থান করছেন।
ডা. মনিরুজ্জামান এর আগে গৌরনদী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা থাকাকালে কর্মস্থলে অনুপস্থিতি, টেস্ট বাণিজ্য, প্রশাসনিক অনিয়ম ও দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে স্থানীয়দের আন্দোলনের মুখে পড়েন। ২০২২ সালে স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) একটি অনুষ্ঠানে চিকিৎসকদের অংশগ্রহণের নির্দেশনা দিয়েও তিনি সমালোচনার জন্ম দেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি।
এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বাসদের কেন্দ্রীয় নেতা ও চিকিৎসক ডা. মনীষা চক্রবর্তী। তিনি বলেন, গত প্রায় ২৫ বছর ধরে বরিশালের চিকিৎসাসেবা সংকটে রয়েছে। মানুষের আন্দোলনের পর সেনাবাহিনী থেকে পরিচালক নিয়োগ হলেও প্রত্যাশিত পরিবর্তন আসেনি। বরং হাসপাতালের পঞ্চম তলার একটি গুরুত্বপূর্ণ ওয়ার্ডের (এইচইউডি) HDU (High Dependency Unit) – উচ্চ নির্ভরশীলতা কেন্দ্র কার্যক্রম বন্ধ রেখে সেটি পরীক্ষার হল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। স্বাস্থ্য পরিচালক ও সিভিল সার্জন নিয়োগ নিয়ে যা হচ্ছে, তা মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবার জন্য ইতিবাচক নয়। বিভাগীয় শহরের গুরুত্বপূর্ণ পদে অভিজ্ঞ, দক্ষ ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত কর্মকর্তার পদায়ন প্রয়োজন। এছাড়াও জরুরী চিকিৎসা সেবার প্রয়োজনীয় উপকরণের চাহিদাও এখন পর্যন্ত পূরণ হয়নি বরিশালের হাসপাতালে।
প্রায় একই কথা বলেন বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. লোকমান হাকিম। তিনি বলেন, দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় দুই কোটি মানুষের চিকিৎসাসেবার কেন্দ্র বরিশাল। তাই এখানে অভিজ্ঞ, দক্ষ ও বিতর্কমুক্ত কর্মকর্তাদের নিয়োগ হওয়াই সবার প্রত্যাশা। সরকারি সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে জনমত যাচাই এজন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে জানান তিনি।
স্বাস্থ্য প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ঘন ঘন বদলি, বিতর্কিত পদায়ন এবং প্রশাসনিক অনিশ্চয়তায় মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবার সমন্বয় ব্যাহত হচ্ছে।
প্রতিবেদনের বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুলের বক্তব্য জানতে তার ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) মাহমুদুল হাসানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, বিষয়টি তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রীকে অবহিত করবেন।
এ ছাড়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে পুরো বিষয়টি উল্লেখ করে হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হয়েছে। তবে প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তার কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
স্বাস্থ্যসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, জেলার সিভিল সার্জন ও শেবাচিম হাসপাতালের পরিচালক – দুটি পদই জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব পদে দীর্ঘ অনিশ্চয়তা, বিতর্ক এবং প্রশাসনিক অস্থিরতা শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে ফেলতে পারে সাধারণ রোগীদেরই। তাই নিয়োগ ও পদায়নে স্বচ্ছতা, অভিজ্ঞতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার পাশাপাশি দ্রুত প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।







