বরিশালে বছরে দুই শতাধিক প্রাণহানি: প্রতিরোধে নেই সমন্বিত গবেষণা ও কার্যকর উদ্যোগ

আরিফ আহমেদ

Sharing is caring!

বরিশালে বছরে দুই শতাধিক প্রাণহানি, প্রতিরোধে নেই সমন্বিত গবেষণা ও কার্যকর উদ্যোগ

(করোনার পর ববিতে সাত শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা, বিশ্ববিদ্যালয়ে মনোবিজ্ঞান শিক্ষক নিয়োগের দাবী)

 বিশেষ প্রতিবেদক

ববির সাতজন ছবি জুয়েল সরকার থেকে সংগৃহীত

একটির পর একটি তরুণ প্রাণ ঝরে যাচ্ছে। পরিবার, বন্ধু, শিক্ষক কিংবা সহপাঠী – কারও চোখেই যেন ধরা পড়ছে না তাদের ভেতরের নিঃশব্দ যন্ত্রণা। করোনা মহামারির সময় ২০২০ সাল থেকে এ পর্যন্ত বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (ববি) সাতজন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। একই সময়ে বরিশাল জেলায় প্রতিবছর গড়ে প্রায় দুই শতাধিক মানুষ আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছেন। অথচ আত্মহত্যার প্রকৃত কারণ, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী এবং প্রতিরোধের কার্যকর কৌশল নিয়ে বরিশালকে কেন্দ্র করে কোনো সমন্বিত গবেষণা বা দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা নেই। ফলে আত্মহত্যার এই নীরব মহামারি ক্রমেই ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে।
সর্বশেষ গত ২১ জুলাই বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন খালপাড় এলাকার একটি মেস থেকে ভূ-তত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থী উচ্ছ্বাস কর্মকারের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে বন্দর থানা-পুলিশ। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে ২০২০ সালের পর বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে আত্মহত্যার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে সাতজনে। প্রতিটি ঘটনাই নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে – শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সমাজ ও রাষ্ট্র কতটা প্রস্তুত?
স্থানীয় সংবাদমাধ্যম, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, পুলিশি তথ্য এবং সামাজিক সংগঠন আঁচল ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, বরিশাল অঞ্চলে আত্মহত্যার প্রবণতা দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগজনক। বিশেষ করে শিক্ষার্থী ও তরুণদের মধ্যে মানসিক চাপ, সম্পর্কের টানাপোড়েন, ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, সামাজিক অপমান, একাকীত্ব এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা বড় ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠছে।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালের ২ আগস্ট গণিত বিভাগের শিক্ষার্থী সুপ্রিয়া দাস নিজ বাড়িতে আত্মহত্যা করেন। এরপর ২০২৩ সালের ১৯ জুলাই উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী শাহরিন নিভানার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার হয়। ২০২৪ সালে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে। ওই বছর চারজন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেন। সর্বশেষ চলতি বছর উচ্ছ্বাস কর্মকারের মৃত্যুর ঘটনায় মোট সংখ্যা দাঁড়ায় সাতজনে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শুধু মৃত্যুই নয়, ২০২৪ সালে আরও অন্তত ১১ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন। সহপাঠী ও স্বজনদের দ্রুত হস্তক্ষেপে তাঁরা প্রাণে বেঁচে যান। বিষয়টি শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য সংকটের গভীরতাকেই সামনে নিয়ে এসেছে।
আঁচল ফাউন্ডেশনের সর্বশেষ বার্ষিক সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সারা দেশে ৪০৩ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে বরিশাল বিভাগেই আত্মহত্যা করেছেন ৫৭ জন শিক্ষার্থী, যা জাতীয় মোট সংখ্যার প্রায় ১৪ দশমিক ৪ শতাংশ। সংখ্যার দিক থেকে ঢাকা ও চট্টগ্রামের পরই বরিশাল বিভাগের অবস্থান। আত্মহত্যাকারীদের মধ্যে ৬১ দশমিক ৮ শতাংশ নারী এবং ৩৮ দশমিক ২ শতাংশ পুরুষ। সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বয়স ১৩ থেকে ১৯ বছর। মোট আত্মহত্যাকারীদের প্রায় অর্ধেকই স্কুলশিক্ষার্থী, এরপর কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রয়েছেন।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ও বিভিন্ন ঘটনার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত এক বছরে বরিশালে আত্মহত্যার পেছনে কয়েকটি কারণ বারবার সামনে এসেছে। এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর হিজলা, বাকেরগঞ্জ ও বাবুগঞ্জে কয়েকজন শিক্ষার্থী আত্মহত্যার চেষ্টা করেন, যাদের মধ্যে দুই শিক্ষার্থী মারা যায়। সম্প্রতি নগরীর সাগরদী এলাকায় প্রেমিকার সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলার সময় এক কলেজছাত্র আত্মহত্যা করেন। আগৈলঝাড়ায় স্বামীর নির্যাতনের অভিযোগে এক নারী ইউপি সদস্য আত্মহত্যা করেন। দীর্ঘদিনের শারীরিক অসুস্থতায় নগরীর এক বৃদ্ধার আত্মহত্যা এবং বিসিক শিল্প এলাকায় এক শ্রমিকের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধারের ঘটনাও আলোচনায় আসে। এসব ঘটনায় পরীক্ষার চাপ, সম্পর্কের সংকট, পারিবারিক সহিংসতা, কর্মক্ষেত্রের হতাশা এবং দীর্ঘমেয়াদি মানসিক অবসাদের বিষয় সামনে এসেছে।
তবে প্রশ্ন উঠেছে, বারবার এমন মর্মান্তিক ঘটনা ঘটলেও কেন এখনো বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থায়ী মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা পূর্ণাঙ্গ মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা কেন্দ্র গড়ে ওঠেনি। শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, প্রয়োজনের সময় অনেকেই কাউকে খুঁজে পান না, নিজের সংকট প্রকাশ করার মতো নিরাপদ পরিবেশও সবসময় থাকে না।
বরিশাল জেলা পুলিশের সুত্রে জানা গেছে গত একবছরে জেলায় দেড় শতাধিক অপমৃত্যু রেকর্ড হয়েছে। জেলা পুলিশের ক্রাইম জোন জানিয়েছে, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ১২ মাসে জেলায় মোট ২০৮টি অপমৃত্যুর মামলা রুজু হয়েছে। এর মধ্যে ফাঁসিতে মৃত্যু ৯৬টি (প্রায় ৪৬.২%), বিষপানে ১৭টি (প্রায় ৮.২%) এবং অন্যান্য কারণে ৮৭টি (প্রায় ৪১.৮%)। এছাড়া নিহতদের মধ্যে পুরুষ ১৩৭ জন (প্রায় ৬৫.৯%) এবং নারী ৭১ জন (প্রায় ৩৪.১%)।
আত্মহত্যা প্রতিরোধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. কামাল উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী সবার আগে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মনোবিজ্ঞান বিভাগ চালু করা এবং শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মধ্যের সম্পর্ক উন্নয়নসহ বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ দিয়েছেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে তরুণদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। পাস-ফেল নির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা, পারিবারিক ও সামাজিক চাপ, ক্যারিয়ারের অনিশ্চয়তা এবং একাকিত্ব তরুণদের চরম মানসিক অবসাদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এছাড়া বিনোদনের সুযোগ না থাকায় একধরনের মারাত্মক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক শূন্যতা তৈরি হচ্ছে।এই সংকট থেকে উত্তরণে প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্থায়ী কাউন্সেলিং ব্যবস্থা জোরদার করা এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি অভিভাবকদের সন্তানের আচরণের পরিবর্তন বা ডিপ্রেশনের দিকে গভীর নজর রাখতে হবে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, মানসিক রোগ নিয়ে আমাদের সামাজিক লোকলজ্জা ও সংস্কারের ভয় দূর করতে হবে। যেকোনো মানসিক অস্থিরতায় দ্বিধাহীনভাবে পেশাদার সাইকোলজিস্টদের পরামর্শ নেওয়া এবং সরকারি- বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি।”
এ বিষয়ে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড মামুনুর রশীদ বলেন, আমি ইতিমধ্যেই শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মাঝে সম্পর্কের উন্নয়নে কাজ শুরু করেছি। ফাস্টইয়ার থেকেই শিক্ষার্থীদের কাউন্সিলিং যাতে হয় সেটায় গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তাছাড়া মনোবিজ্ঞান বিভাগ বা শিক্ষক নিয়োগ প্রকিয়া যাচাই-বাছাই করে সে বিষয়েও উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানান তিনি।
ববি উপাচার্য আরো বলেন, মোবাইল আসক্তি আমাদের এখন বড় সমস্যা। সারাদেশে ছোট বড় সকলের মধ্যে এখন এই আসক্তি এতোটাই ভয়াবহ হয়েছে যে এটিই এখন একাকীত্বের জন্য প্রধান দায়ী বলা যায়। এ নিয়ে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা প্রয়োজন বলে জানান অধ্যাপক ড মামুনুর রশীদ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আত্মহত্যাকে কেবল আইনশৃঙ্খলা বা ব্যক্তিগত ব্যর্থতার বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি এখন জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ একটি ইস্যু। বরিশালের মতো ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে জেলা প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ, পুলিশ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক সংগঠনগুলোর সমন্বয়ে আত্মহত্যা প্রতিরোধে পৃথক কর্মপরিকল্পনা, গবেষণা ও কাউন্সেলিং নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা সময়ের দাবি। তা না হলে প্রতিবছরই আরও অনেক সম্ভাবনাময় জীবন নীরবে হারিয়ে যাবে, আর প্রতিটি মৃত্যুর পর একই প্রশ্ন ফিরে আসবে- আর কত?

Print Friendly, PDF & Email

Sharing is caring!

About the author

ডিসেম্বর ৭১! কৃত্তনখোলার জলে সাঁতার কেটে বেড়ে ওঠা জীবন। ইছামতির তীরঘেষা ভালবাসা ছুঁয়ে যায় গঙ্গার আহ্বানে। সেই টানে কলকাতার বিরাটিতে তিনটি বছর। এদিকে পিতা প্রয়াত আলাউদ্দিন আহমেদ-এর উৎকণ্ঠা আর মা জিন্নাত আরা বেগম-এর চোখের জল, গঙ্গার সম্মোহনী কাটিয়ে তাই ফিরে আসা ঘরে। কিন্তু কৈশরী প্রেম আবার তাড়া করে, তের বছর বয়সে তের বার হারিয়ে যাওয়ার রেকর্ডে যেন বিদ্রোহী কবি নজরুলের অনুসরণ। জীবনানন্দ আর সুকান্তে প্রভাবিত যৌবন আটকে যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙ্গিনায় পদার্পন মাত্রই। এখানে আধুনিক হবার চেষ্টায় বড় তারাতারি বদলে যায় জীবন। প্রতিবাদে দেবী আর নিগার নামের দুটি কাব্য সংকলন প্রশ্ন তোলে বিবেকবানের মনে। তার কবিতায়, উচ্চারণ শুদ্ধতা আর কবিত্বের আধুনিকায়নের দাবী তুলে তুলে নেন দীক্ষার ভার প্রয়াত নরেণ বিশ্বাস স্যার। স্যারের পরামর্শে প্রথম আলাপ কবি আসাদ চৌধুরী, মুহাম্মদ নুরুল হুদা এবং তৎকালিন ভাষাতত্ব বিভাগের চেয়ারম্যান ড. রাজীব হুমায়ুন ডেকে পাঠান তাকে। অভিনেতা রাজনীতিবিদ আসাদুজ্জামান নূর, সাংকৃতজন আলী যাকের আর সারা যাকের-এর উৎসাহ উদ্দিপনায় শুরু হয় নতুন পথ চলা। ঢাকা সুবচন, থিয়েটার ইউনিট হয়ে মাযহারুল হক পিন্টুর সাথে নাট্যাভিনয় ইউনিভার্সেল থিয়েটারে। শংকর শাওজাল হাত ধরে শিখান মঞ্চনাটবের রিপোটিংটা। তারই সূত্র ধরে তৈরি হয় দৈনিক ভোরের কাগজের প্রথম মঞ্চপাতা। একইসমেয় দর্শন চাষা সরদার ফজলুল করিম- হাত ধরে নিযে চলেন জীবনদত্তের পাঠশালায়। বলেন- মানুষ হও দাদু ভাই, প্রকৃত মানুষ। সরদার ফজলুল করিমের এ উক্তি ছুঁয়ে যায় হৃদয়। সত্যিকারের মানুষ হবার চেষ্টায় তাই জাতীয় দৈনিক রুপালী, বাংলার বাণী, জনকণ্ঠ, ইত্তেফাক, মুক্তকণ্ঠের প্রদায়ক হয়ে এবং অবশেষে ভোরেরকাগজের প্রতিনিধি নিযুক্ত হয়ে ঘুরে বেড়ান ৬৫টি জেলায়। ছুটে বেড়ান গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। ২০০২ সালে প্রথম চ্যানেল আই-্র সংবাদ বিভাগে স্থির হন বটে, তবে অস্থির চিত্ত এরপর ঘনবদল বেঙ্গল ফাউন্ডেশন, আমাদের সময়, মানবজমিন ও দৈনিক যায়যায়দিন হয়ে এখন আবার বেকার। প্রথম আলো ও চ্যানেল আই আর অভিনেত্রী, নির্দেশক সারা যাকের এর প্রশ্রয়ে ও স্নেহ ছায়ায় আজও বিচরণ তার। একইসাথে চলছে সাহিত্য বাজার নামের পত্রিকা সম্পাদনার কাজ।