বহুবছর পর শেরেবাংলার পুনর্জাগরণ বরিশালে: স্মরণসভা ও সাহিত্য সম্মেলনে তাঁকে স্মরণ
বিশেষ প্রতিবেদক
দল-মত, ধর্ম-বর্ণ ও রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠে মানুষের পরিচয়, অধিকার ও মর্যাদাকে সম্মান করার যে অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দর্শন শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক ধারণ করতেন, বরিশালে তার ১৫৩তম জন্মবার্ষিকী ঘিরে আয়োজিত স্মরণসভা ও সাহিত্য সম্মেলনে সেই আদর্শই নতুন করে আলোচনায় এসেছে। দীর্ঘ বিরতির পর বরিশালে শেরেবাংলাকে কেন্দ্র করে স্মরণ, আলোচনা, কবিতা, গল্প, গান ও গুণীজন সংবর্ধনার মধ্য দিয়ে সাহিত্য-সংস্কৃতির অঙ্গনে নতুন প্রাণের সঞ্চার হয়েছে। তবে এই আয়োজন শুধু একজন জাতীয় নেতাকে স্মরণ করার আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং গত দেড় দশকের বেশি সময়ে তাকে ঘিরে সাংস্কৃতিক আয়োজনের সীমাবদ্ধতা, রাজনৈতিক ও মতাদর্শিক দূরত্ব এবং সাহিত্যাঙ্গনের বিভাজন নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন সামনে এসেছে।
যে মানুষটি সারাজীবন অসাম্প্রদায়িকতা, উদারতা, মানবিক মর্যাদা ও মানুষের মধ্যে ঐক্যের কথা বলেছেন, তার স্মরণেও কেন এতদিন বৃহত্তর পরিসরে সর্বজনীন আয়োজন গড়ে ওঠেনি? কেন সাহিত্য ও সংস্কৃতির মতো মুক্তচিন্তার পরিসরেও রাজনৈতিক পরিচয়, ধর্মীয় ভাবধারা কিংবা প্রগতিশীলতার সংজ্ঞা নিয়ে দূরত্ব তৈরি হবে? শেরেবাংলার জন্মভূমি বরিশালে এবারের দুটি আয়োজন এসব প্রশ্নকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। এ সম্পর্কে লেখক, সাংবাদিক ও সম্পাদক আজাদ আলাউদ্দিনের বলেন, গত ১৭ বছরে শেরেবাংলাকে নিয়ে অনুষ্ঠান আয়োজন একেবারেই হয়নি, বিষয়টি এমন নয়। বরিশাল সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় এ সময়ে গোপনে ও অনাড়ম্বর পরিবেশে বহুবার তার জন্ম ও মৃত্যুদিবসের অনুষ্ঠানমালা সাজিয়েছে। তবে আনুষ্ঠানিক ও জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন এবারই প্রথম। তার এই বক্তব্যে স্পষ্ট হয়, শেরেবাংলাকে স্মরণ করার আগ্রহ থাকলেও বৃহত্তর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিসরে সেই আয়োজনের বিস্তার সবসময় সহজ ছিল না।
আজাদ আলাউদ্দিন আরও বলেন, বরিশালের পরিচিত ও গুণীজনদের অনেকেই তাদের আমন্ত্রণ গ্রহণ করেন না, গ্রহণ করলেও অনুষ্ঠানে আসেননি। তার মতে, তাদের সঙ্গে একটি দূরত্ব তৈরি হয়েছে, যা আয়োজকদের একতরফা উদ্যোগে নয়, বরং দুই পক্ষের পারস্পরিক যোগাযোগের অভাবেও তৈরি হয়েছে। নিজেকে আধুনিক ও প্রগতিশীল ভাবার প্রবণতা থেকেও এ দূরত্ব তৈরি হয়ে থাকতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
এদিকে বরিশাল সাহিত্য সংসদ এর সাধারণ সম্পাদক ও জনপ্রিয় সাহিত্য পত্রিকা সাহিত্য বাজার এর সম্পাদক আরিফ আহমেদ বলেন, একশ্রেণীর লেখক ও কবিরা নিজেদের প্রগতিশীল দাবী করে যারা ধর্মীয় ভাবধারায় সাহিত্য সংস্কৃতির চর্চা করেন তাদেরকে হেয় প্রতিপন্ন করতে ব্যস্ত থাকেন। আধুনিকতা ও প্রগতিশীলতার দ্বন্দ্বটা আসলে তাদেরই সৃষ্টি। তারাই কবি আল মাহমুদ বা ফররুখ আহমদকে সম্মান করতে চাননা। আমরাতো কখনোই জীবনানন্দ দাশ বা সুকান্ত ভট্টাচার্য, কামিনী রায় তাদের অসম্মান করিনি। তার প্রশ্ন, ধর্মীয় ভাবধারার লেখা মানেই কি অনাধুনিক কিংবা অপ্রগতিশীল? তাহলে রবীন্দ্রনাথ ও নজরুলের অসংখ্য কবিতা ও গানও ধর্মীয় ভাবধারায় রচিত। ভিন্ন চিন্তা ও বিশ্বাসের মানুষ একে অন্যের কাছে এসে নিজেদের ভাবনা তুলে ধরলে পারস্পরিক ভুল বোঝাবুঝি কমতে পারে বলেও মনে করেন তিনি।
আবার একই প্রসঙ্গে কবি ও ছড়াকার তপংকর চক্রবর্তী বলেছেন, আমি কোনো বিভাজনে বিশ্বাস করিনা। বরিশালকে দক্ষীণ অঞ্চলের সাহিত্যকর্মীদের একটা মিলনমেলা তৈরি করতে চেয়েছি, আমরা তা পেরেছি, আমরা সার্থকও। আমাদের সময়ে কে রাজাকার ছিল, কে মুক্তিযোদ্ধা ছিল তা বাছাই করতে যাইনি। সাহিত্যতো সর্ব সুন্দরের বিচরণ ভূমি। এখানে উদারমনাদেরই অগ্রাধিকার। যে সাহিত্যে উদারতার স্থান নেই সেটা তো সৃজনশীল সাহিত্য হতে পারেনা। প্রগতিশীলতার দাবীতো আরও পরের কথা বলে জানান তিনি।
আবার একই প্রসঙ্গে আধুনিক কবি হেনরী স্বপন এর বক্তব্য বেশ স্পষ্ট। তিনি বলেছেন, সাহিত্যে বিভাজন থাকবেই। প্রগতিশীলদের সাথে প্রতিক্রিয়াশীলদের সাহিত্য নিয়ে বিভাজন, এটা থাকবে। একজন যে মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে অবস্থান নেবে তার সাথে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে যে থাকবে, তার দ্বন্ধ থাকবেই। এটা দূর হবার নয়। সৃজনশীল সাহিত্য সব সময়ই প্রগতিশীল। সব যুগেই এ দ্বন্ধ ছিল। আজো আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে।
কবি হেনরী স্বপন এর এই চিন্তাধারাই হচ্ছে প্রগতিশীলতা?
বরিশালের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এই দূরত্বের পেছনে রাজনৈতিক সংস্কৃতির প্রভাবও আলোচনায় এসেছে। দীর্ঘ সময় ধরে দেশের রাজনীতিতে প্রতিপক্ষকে সহনশীলতার সঙ্গে গ্রহণ না করা, ভিন্ন মতকে অবমূল্যায়ন করা এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়কে রাজনৈতিক আনুগত্যের মাপকাঠিতে বিচার করার প্রবণতা নিয়ে নানা সময়ে সমালোচনা হয়েছে। বরিশালেও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন ও মতাদর্শভিত্তিক পরিসরের মধ্যে যোগাযোগ ও অংশগ্রহণের সীমাবদ্ধতা নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে প্রগতিশীলতা ও আধুনিকতার একক সংজ্ঞা নির্ধারণের প্রবণতা এবং ধর্মীয় মূল্যবোধসম্পন্ন সাহিত্যচর্চাকে কখনো কখনো কম গুরুত্ব দেওয়ার অভিযোগ সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বিতর্ক তৈরি করেছে।
তবে শেরেবাংলার জীবন ও রাজনৈতিক দর্শন কোনো একক রাজনৈতিক দল, ধর্মীয় পরিচয় কিংবা সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর সম্পত্তি নয়। তিনি ছিলেন কৃষক-প্রজার অধিকার প্রতিষ্ঠার নেতা, শিক্ষাবিস্তারের পৃষ্ঠপোষক এবং বহুমাত্রিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় মানুষের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠার প্রবক্তা। তার জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষাগুলোর একটি ছিল ভিন্ন পরিচয় ও মতের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে চলা। ফলে তার স্মরণে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ভিন্ন মতের কবি, লেখক, গবেষক ও সংস্কৃতিকর্মীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা শুধু সৌজন্য নয়, তার আদর্শের প্রতিফলনও।

বাংলার বাঘ ফাউন্ডেশনের সভাপতি সাইফুল আহসান বুলবুল এর হাতে সম্মাননা ক্রেস্ট তুলে দিচ্ছেন ববি শিক্ষার্থীরা।
“নিজের পরিচয়কে ভালোবাসি, অন্যের পরিচয়কেও শ্রদ্ধা করি- এটাই শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের আদর্শ।” এই দর্শন ধারণ করে সমাজে সম্প্রীতি, সহনশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছেন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মামুন অর রশিদ।
৩১ অক্টোবর শনিবার বরিশাল বিভাগীয় জাদুঘর মিলনায়তনে বাংলার বাঘ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে আয়োজিত স্মরণসভা ও গুণীজন সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, আমরা শেরেবাংলা সম্পর্কে জানি, তার অসংখ্য অবদান সম্পর্কেও জানি। কিন্তু তার গুণাবলি থেকে কতটুকু শিক্ষা নিচ্ছি, কতটুকু অনুসরণ করছি, সেটি ভাবার বিষয়। অন্তত তার জীবনের ছোট ছোট শিক্ষাগুলো ধারণ ও অনুসরণ করতে পারি। দেশে শেরেবাংলা, মাওলানা ভাসানী ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মতো নেতৃত্ব আর কেন তৈরি হচ্ছে না, সেটিও নতুন প্রজন্মকে ভাবতে হবে।
বাংলার বাঘ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে এবং বরিশাল বিভাগীয় জাদুঘরের সহযোগিতায় আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন কবি, লেখক ও গবেষক সাইফুল আহসান বুলবুল। অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের চেয়ারম্যান আবদুল বাতেন, চাখার ফজলুল হক কলেজের অধ্যক্ষ দেলোয়ার হোসেন, বরিশাল বিভাগীয় জাদুঘরের সহকারী পরিচালক হাবিবুর রহমান, শেরেবাংলা স্মৃতি একাডেমির আহ্বায়ক এইচ এম রেজাউল করিম, শেরেবাংলা গবেষক মোসলেম উদ্দিন এবং জাদুঘরের ট্রাস্টি আরিফুর রহমান আরিফ।
আলোচনায় শেরেবাংলার শিক্ষা বিস্তারে অবদানও বিশেষ গুরুত্ব পায়। কলকাতায় মুসলিম শিক্ষার্থীদের জন্য ফজলুল হক মুসলিম ছাত্রাবাস প্রতিষ্ঠা এবং মুসলিম নারীদের উচ্চশিক্ষার সুযোগ সৃষ্টিতে লেডি ব্রাবোর্ন কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ ও পৃষ্ঠপোষকতায় তার ভূমিকা ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম হলও তার নামেই প্রতিষ্ঠিত। ১৯৪০ সালে চালু হওয়া হলটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাচীন আবাসিক হলগুলোর একটি।
বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলার চাখার ছিল শেরেবাংলার পৈতৃক নিবাস। নিজের জন্মভূমিকে শিক্ষা ও সংস্কৃতির কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে তিনি পৈতৃক সম্পত্তির বড় অংশ শিক্ষার কাজে দান করেন। ১৯৪০ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ফজলুল হক কলেজ, বর্তমানে সরকারি ফজলুল হক কলেজ। ছেলেদের জন্য চাখার ফজলুল হক ইনস্টিটিউশন এবং মেয়েদের জন্য ওয়াজেদ মেমোরিয়াল গার্লস হাইস্কুল প্রতিষ্ঠায়ও তার ভূমিকা ছিল। পাশাপাশি গণগ্রন্থাগার, পাঠাগার, গ্রামীণ পুনর্গঠন সমিতি ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। তার স্মৃতি ও জীবনকর্ম সংরক্ষণে চাখারে রয়েছে শেরেবাংলা স্মৃতি জাদুঘর।
১৮৭৩ সালের ২৬ অক্টোবর তৎকালীন বাকেরগঞ্জ জেলার সাতুরিয়া গ্রামে মামার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন আবুল কাশেম ফজলুল হক। তার পিতা কাজী মুহাম্মদ ওয়াজেদ ছিলেন বরিশালের বিশিষ্ট আইনজীবী। বরিশাল জেলা স্কুলে পড়াশোনা শেষে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে উচ্চশিক্ষা এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে আইনশাস্ত্রেও ডিগ্রি নিয়ে আইন পেশায় যুক্ত হন।
রাজনৈতিক জীবনে অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী, কলকাতার মেয়র, পূর্ববঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী, পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নরসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন তিনি। কৃষক-প্রজার অধিকার প্রতিষ্ঠা, ঋণগ্রস্ত কৃষকদের সুরক্ষা, শিক্ষা বিস্তার ও সামাজিক বৈষম্য দূরীকরণে তার ভূমিকা তাকে গণমানুষের নেতায় পরিণত করে। ১৯৬২ সালের ২৭ এপ্রিল ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন এই বরেণ্য রাজনীতিবিদ। ঢাকার তিন নেতার মাজারে তাকে সমাহিত করা হয়।
স্মরণসভায় এসব ঐতিহাসিক অবদানের পাশাপাশি শেরেবাংলার মানবিক গুণাবলি ও অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক দর্শন নতুন প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। বরিশালের সাংবাদিক আনিসুর রহমান স্বপন, মুরাদ আহমেদ, আজাদ আলাউদ্দিন, কবি শফিক আমিন, পথিক মোস্তফা, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক রেজিস্ট্রার ও সংগঠক বাহাউদ্দীন গোলাপ, সংগঠক শাহিন ভূইয়সহ কবি-সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিকর্মীদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানটি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। আলোচনা শেষে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ গুণীজনদের সম্মাননা দেওয়া হয়।
এর আগের দিন ৩০ অক্টোবর শুক্রবার বরিশাল পাবলিক লাইব্রেরি মিলনায়তনে বাংলাদেশি সাংস্কৃতিক জোট, বরিশালের আয়োজনে দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হয় ‘শেরেবাংলা সাহিত্য সম্মেলন ২০২৬’। কবিতা, গল্প, গান, স্বরচিত কবিতা পাঠ ও সাহিত্য আলোচনা নিয়ে বরিশাল বিভাগের ছয় জেলা থেকে কবি, লেখক, সংস্কৃতিকর্মী ও সাহিত্যপ্রেমীরা এতে অংশ নেন। সম্মেলনের উদ্বোধনী পর্বে প্রধান অতিথি ছিলেন বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক, সাবেক সংসদ সদস্য ও বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন। সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশি সাংস্কৃতিক জোট বরিশালের আহ্বায়ক এস এম সাব্বির নেওয়াজ সাগর।
সম্মেলনের সমাপনী পর্বে প্রধান অতিথি ছিলেন দৈনিক যুগান্তরের সম্পাদক ও বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)-এর চেয়ারম্যান কবি আবদুল হাই শিকদার। সভাপতিত্ব করেন জাতীয় কবিতা পরিষদ বরিশাল শাখার সভাপতি কবি মুস্তফা হাবীব। সম্মেলনের আহ্বায়ক ও সঞ্চালকের দায়িত্ব পালন করেন দৈনিক নয়াদিগন্তের বরিশাল ব্যুরো প্রধান এবং বরিশাল সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের পরিচালক সাংবাদিক আজাদ আলাউদ্দিন।
নিবন্ধিত কবিদের স্বরচিত কবিতা পাঠ, আবৃত্তি, গান, গল্প ও সাহিত্যবিষয়ক আলোচনায় দিনভর মুখর ছিল মিলনায়তন। বরিশাল অঞ্চলের ছয় জেলা থেকে আসা অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ছিলেন অধ্যাপক মো. রফিকুল ইসলাম খান, সাংবাদিক জহিরুল ইসলাম জহির, কবি সেলিম আহম্মেদ, কবি শাহনাজ পারভীন, কবি আবদুর রহিম, কবি ও গবেষক মাহমুদ ইউসুফ, কবি মাসুদ আহমেদ রানা, সাংবাদিক শাহিন চৌধুরী, কবি সজীব তাওহীদ ও কবি জিল্লুর রহমান জিল্লু।
তবে সম্মেলনের আয়োজন ঘিরে সাহিত্যাঙ্গনে একটি অসংগতির অভিযোগও সামনে এসেছে। বরিশালের দীর্ঘদিনের পরিচিত ও প্রবীণ কবি-সাহিত্যিকদের অনেকেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন না। তাদের মধ্যে সাংবাদিক-সাহিত্যিক অরূপ তালুকদার, কবি ও ছড়াকার দীপংকর চক্রবর্তী ও তপংকর চক্রবর্তী, লেখক-গবেষক সাইফুল আহসান বুলবুল, কবি হেনরী স্বপন ও কবি শফিক আমিনের নাম উল্লেখ করেছেন অনুষ্ঠানে উপস্থিত কয়েকজন কবি। তাদের অভিযোগ, আয়োজকদের পক্ষ থেকে এসব কবি-সাহিত্যিককে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। যার উত্তর দিয়েছেন সাংবাদিক ও সম্পাদক আজাদ আলাউদ্দিন। তবে আরেকজন কবি ও সংগঠক আরিফ আহমেদ স্বীকার করেন, তাদের আমন্ত্রণ জানানো উচিত ছিল। না আসার দায় তাদের হতো, কিন্তু নিমন্ত্রণ না জানানোর দায় এখন আয়োজকদের ওপরই বর্তাবে।
এই ঘটনা শেরেবাংলার নামে আয়োজিত সাহিত্য সম্মেলনের অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। সাহিত্য কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক মতাদর্শ, সংগঠন কিংবা গোষ্ঠীর একক সম্পত্তি নয়। বরিশালের সাহিত্য-সংস্কৃতির ইতিহাস গড়ে উঠেছে বিভিন্ন সময়ের অসংখ্য কবি, লেখক, গবেষক ও সংস্কৃতিকর্মীর সম্মিলিত অবদানে। তাদের কাউকে বাদ দিয়ে বৃহত্তর সাহিত্য সম্মেলন আয়োজন করলে সেই আয়োজনের সর্বজনীনতা প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে যে নেতার জীবনদর্শনের অন্যতম ভিত্তি ছিল ভিন্ন মত ও পরিচয়ের মানুষকে সম্মান করা, তার নামে আয়োজিত সম্মেলনে আমন্ত্রণের ক্ষেত্রেও সেই উদারতার প্রতিফলন প্রত্যাশিত।
সম্মেলনের সমাপনী পর্বের প্রধান অতিথি কবি আবদুল হাই শিকদারের বক্তব্যেও সাহিত্য-সংস্কৃতির চর্চায় বিভাজনের ঊর্ধ্বে থাকার গুরুত্ব উঠে আসে বলে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। সাহিত্য ও সংস্কৃতির মান নির্ধারণে রাজনৈতিক অবস্থান কিংবা মতাদর্শের পরিবর্তে সৃজনশীলতা ও সাহিত্যিক অবদানকে গুরুত্ব দেওয়ার প্রত্যাশা তাদের।
সম্মেলনে ‘শেরেবাংলা স্মৃতিপদক ২০২৬’-এর জন্য মনোনীত হয়েছেন গৌরনদী সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. মোসলেম উদ্দিন শিকদার। আয়োজকদের ভাষ্য, শেরেবাংলার স্মৃতি, সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রতি তার অনুরাগ ও পৃষ্ঠপোষকতার ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা এবং দেশীয় সাহিত্যচর্চাকে সমৃদ্ধ করাই এ আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য।
সব মিলিয়ে বরিশালে পরপর দুই দিনের এই আয়োজন শেরেবাংলাকে নতুন করে আলোচনায় ফিরিয়ে এনেছে। তবে এই পুনর্জাগরণের প্রকৃত সার্থকতা কেবল জন্মবার্ষিকীর স্মরণসভা কিংবা সাহিত্য সম্মেলন আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং শেরেবাংলার নাম ও অবদানকে দলীয় রাজনৈতিক পরিচয়ের বাইরে এনে ইতিহাসের যথাযথ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠা করা, তার অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক দর্শন চর্চা করা এবং সাহিত্য-সংস্কৃতির অঙ্গনে দীর্ঘদিনের মতাদর্শিক দূরত্ব ও বিভাজন অতিক্রম করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। শেরেবাংলার জন্মভূমি বরিশালে তার স্মরণে যদি সব মত, পথ ও বিশ্বাসের মানুষের সম্মিলন ঘটানো যায়, তাহলেই এই পুনর্জাগরণ একটি স্থায়ী সাংস্কৃতিক ধারায় রূপ নিতে পারে।







