আয়ুর্বেদিক হাসপাতালে উপচে পড়া ভিড়: বিকল্প চিকিৎসায় বাড়ছে আস্থা, বিভাগীয় শহরে ১০০ শয্যার হাসপাতালের দাবি
বিশেষ প্রতিবেদক
রাজধানীর মিরপুরের সরকারি ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ঢুকতেই মনে হয়, যেন কোনো বিশেষ চিকিৎসা ক্যাম্প চলছে। হাসপাতালের টিকিট কাউন্টারের লাইন ভবনের সীমানা পেরিয়ে মূল সড়ক পর্যন্ত গিয়ে ঠেকেছে। ভিড়ে হাঁটার জায়গা নেই। দেশের দক্ষিণাঞ্চল ও উত্তরাঞ্চলসহ বিভিন্ন জেলা থেকে আসা মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন মাত্র ১০ টাকার একটি টিকিটের জন্য। কিন্তু রোগীর এই উপচে পড়া ভিড়ের বিপরীতে হাসপাতালের ব্যবস্থাপনায় দেখা যায় স্পষ্ট অপ্রস্তুতি। টিকিট কাউন্টারে দীর্ঘ সারি নিয়ন্ত্রণের কার্যকর ব্যবস্থা নেই। দূর-দূরান্ত থেকে আসা অনেকে টয়লেটের অবস্থানই খুঁজে পাচ্ছেন না। ব্যবহার অনুপযোগী টয়লেট নিয়েও অভিযোগ করেন রোগী ও স্বজনরা। হাসপাতালের প্রতিটি শয্যা রোগীতে পূর্ণ। ভর্তি হতে না পেরে অনেককেই চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়েই ফিরে যেতে হচ্ছে।
হাসপাতালটিতে সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে আরেকটি বিষয়ও চোখে পড়ে। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা কর্মীরা ছবি তুলতে বাধা দেন। তাঁরা জানান, কর্তৃপক্ষের নির্দেশ ছাড়া ছবি তোলা বা সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলা যাবে না। কয়েকজন কর্মীও একই ধরনের নির্দেশনার কথা বলেন। ফলে দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এদিকে হাসপাতালের দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র রোগীর চাপ, জনবল সংকট ও ওষুধের ঘাটতির তথ্য নিশ্চিত করেছে।
তাদের ভাষ্য, মাত্র দুই সপ্তাহ আগেও যেখানে প্রতিদিন এক থেকে দেড়শ রোগী চিকিৎসা নিতে আসতেন, এখন সেই সংখ্যা প্রায় দেড় হাজারে পৌঁছেছে। ১০০ শয্যার প্রতিটিই এখন রোগীতে পূর্ণ। আগে একজন চিকিৎসক দিনে ১০ থেকে ২০ জন রোগী দেখলেও এখন ১২০ জনেরও বেশি রোগী দেখতে হচ্ছে। অতিরিক্ত চাপ সামাল দিতে টিকিট কাউন্টারে কলেজের শিক্ষার্থীরা বাড়তি জনবল হিসেবে কাজ করছেন বলে জানা গেল। আগে তিন মাসে যে পরিমাণ বিনামূল্যের ওষুধ বিতরণ হতো, এখন তা একদিনেই শেষ হয়ে যাচ্ছে।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা ভোলার বিল্লাল হোসেন , গাজীপুরের মাহবুর রহমান, পল্লবীর আনিসুর রহমান ও মীরপুরের আলমগীর হোসেনের মতো অনেক রোগী জানান, দীর্ঘদিন বিভিন্ন চিকিৎসা নিয়েও কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়ায় তাঁরা এখানে এসেছেন। কেউ কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাসপাতালের কথা জেনে এসেছেন, কেউ আত্মীয়ের পরামর্শে এসেছেন। তাঁদের অনেকেরই অভিযোগ, দীর্ঘ অপেক্ষার পর চিকিৎসক দেখাতে পারলেও শয্যা না থাকায় ভর্তি হতে পারেননি।
বর্তমানে হাসপাতালটিতে আয়ুর্বেদিক ও ইউনানি চিকিৎসার পাশাপাশি আকুপাংচার, পঞ্চকর্ম, যোগব্যায়াম ও হিজামা থেরাপি দেওয়া হচ্ছে। এসব সেবার চাহিদাও কয়েক গুণ বেড়েছে। কিন্তু প্রশিক্ষিত জনবল ও অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতায় সেই চাহিদা পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
আরও উদ্বেগের বিষয়, ৬ আগস্ট বৃহস্পতিবার থেকে বেলা ১টার পর আর টিকিট বিক্রি হবেনা মর্মে তড়িঘড়ি করে নোটিশ ঝোলানো হয়েছে। চাপ সামলাতে না পেরেই এই নোটিশ দিয়েছেন বলে জানান কর্তৃপক্ষ। হাসপাতালের একটি সূত্র জানায়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রশাসনিক পরিবর্তনের পর ২৭ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন গত ২৮ মাস ধরে বন্ধ রয়েছে। তারপরও তাঁরা নিয়মিত দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। একই সঙ্গে হাসপাতালের নিজস্ব ওষুধ উৎপাদন ও গবেষণা কার্যক্রমও আগের মতো সচল নেই।
দেশে ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসার জন্য পূর্ণাঙ্গ সরকারি বিশেষায়িত হাসপাতাল কার্যত এই একটিই, যা মিরপুরের ১৩ নং সেকশনে অবস্থিত। তবে জেলা সদর হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বিকল্প চিকিৎসা কর্মসূচির আওতায় সীমিত সেবা থাকলেও জটিল রোগের জন্য পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল নেই। ফলে চট্টগ্রাম, বরিশাল, খুলনা, রাজশাহী, রংপুর কিংবা সিলেটসহ সব অঞ্চল থেকেই রোগীদের ঢাকায় ছুটে আসতে হচ্ছে।
এই বাস্তবতায় দক্ষিণাঞ্চলের চিত্র আরও বৈপরীত্যপূর্ণ। হাসপাতালের দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানায়, বরিশালে একটি ইউনানি- আয়ুর্বেদিক চিকিৎসাকেন্দ্র থাকলেও সেখানে দীর্ঘদিন ধরে মাত্র একজন চিকিৎসক দায়িত্ব পালন করছেন। সেটির অবস্থানও সরকারি সদর হাসপাতালের ভিতরে। প্রয়োজনীয় জনবল ও অবকাঠামোর অভাবে সেটি পূর্ণাঙ্গ সেবা দিতে পারছে না।
বরিশাল বিভাগের প্রায় এক কোটি মানুষের জন্য বর্তমানে কোনো পূর্ণাঙ্গ সরকারি ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক হাসপাতাল নেই। অথচ বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী, পিরোজপুর, ঝালকাঠি ও বরগুনা থেকে নিয়মিত রোগীদের ঢাকায় যেতে হচ্ছে। এতে একদিকে চিকিৎসা ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে রাজধানীর একমাত্র হাসপাতালটির ওপরও অসহনীয় চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।
স্বাস্থ্যনীতি বিশ্লেষকদের মতে, যেভাবে বিকল্প চিকিৎসার প্রতি মানুষের আস্থা বাড়ছে, তাতে জেলা পর্যায়ের সীমিত কর্নার বা একজন চিকিৎসক দিয়ে আর চাহিদা পূরণ সম্ভব নয়। প্রয়োজন প্রতিটি বিভাগীয় শহরে অন্তত ১০০ শয্যার একটি আধুনিক ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক হাসপাতাল। যেখানে বহির্বিভাগ, ভর্তি সেবা, আকুপাংচার, পঞ্চকর্ম, হিজামা, গবেষণাগার, ওষুধ উৎপাদন ইউনিট এবং প্রশিক্ষিত চিকিৎসক একসঙ্গে থাকবে।
একসময় অবহেলিত এই হাসপাতালটি এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোর মাধ্যমে মানুষের নজরে এসেছে। সেই প্রচারণার ফলেই রোগীর সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়েছে বলে হাসপাতালের কর্মকর্তারাও স্বীকার করছেন। কিন্তু যে গণমাধ্যম মানুষের কাছে হাসপাতালটির সেবা পৌঁছে দিয়েছে, সেই গণমাধ্যমের জন্যই যদি তথ্যপ্রাপ্তি ও ছবি সংগ্রহের পথ সংকুচিত করা হয়, তাহলে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট তথ্যের অবাধ প্রবাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়।
রাজধানীর একমাত্র সরকারি ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক হাসপাতালের সামনে প্রতিদিনের দীর্ঘ লাইন শুধু রোগীর ভিড়ের চিত্র নয়, এটি বিকল্প চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি মানুষের বাড়তে থাকা আস্থারও প্রতিফলন। স্বাস্থ্যসেবার এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় ঢাকা কেন্দ্রিক সেবা থেকে বেরিয়ে প্রতিটি বিভাগীয় শহরে অন্তত ১০০ শয্যার পূর্ণাঙ্গ সরকারি ইউনানি ও আয়ুর্বেদিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার দাবি এখন আর কেবল একটি প্রস্তাব নয়, সময়ের প্রয়োজন বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।







