রক্তকরবী ফুলটিও একটি মিথ : আরিফ হায়দার

সাহিত্য বাজার

raktokorobiএকজন নাট্যকারের নাটক যখন নাট্য নির্দেশকের হাতে পরে তখন তিনি তার চিন্তাচেতনা দিয়ে নতুনভাবে ভাবতে শুর” করেন, ঐ নাটকের মধ্য থেকে নিগুড় রস বের করায় মত্ত থাকেন নির্দেশক। অতএব এক একজন নির্দেশকের চিন্তা এক একরকম হতেই পারে। সেই রকম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রক্তকরবী নাটকটি যখন মঞ্চে উপস্থাপন করা হয় তখন আমরা যারা সাধারণ দর্শক, তাদের দেখতে ভালোই লাগে। কিš’ যখন একই নাটকের উপস্থাপনে ভিন্ন ভিন্নমাত্রা যোগ হয় তখন সাধারণ দর্শক হিসেবে একটু বিভ্রান্ত হই বৈকি।

বর্তমানে বাংলাদেশের দু’টিদল নাগরিক নাট্যসম্প্রদায় এবং প্রাঙ্গনেমোর নাট্যদল, অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগ যখন নিয়মিত রক্তকরবী নাটকটি প্রদর্শন করছে এবং নির্দেশনার ক্ষেত্রেও তিনটি মাত্রা যোগ করেছে, তখনই মনে হয়, মঞ্চ নাটকের নির্দেশক আসলে নাট্যকারের নাটকের কোন বিষয়টির উপর বেশি জোর দিচ্ছেন? আসল কথা নাট্যকার রবীন্দ্রনাথ কি বলতে চেয়েছেন সেটিই বিবেচ্য। একজন সাধারণ দর্শক হিসেবে রক্তকরবী নাটকটির নামকরণ অনুসারে মনে হয়েছে রক্তকরবী ফুল একটি মিথ মাত্র। আর সেই মিথ থেকে এতোগুলো অনুসারী।
রবীন্দ্রনাথের রক্তকরবী বিংশশতকের একটি অত্যাধুনিক সমস্যার ভিত্তিতেই দাঁড়িয়ে আছে। অথচ নাটকের অভিভাষণে রবীন্দ্রনাথ বললেন- ‘আাধুনিক সমস্যা বলে কোনো পদার্থ নেই, মানুষের সব গুরুত্বর সমস্যাই চিরকালের।’
সদ্যতনকে সনাতনের সাথে, সাম্প্রতিককে শাশ্বতের সাথে অবিচ্ছেদে এক করে দেখার জন্যই ‘রক্তকরবী’র ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এই অভিভাষণে রবীন্দ্রনাথ বারবার মিথের ভাষায় কথা বলেন। রক্তকরবীতে ধনতন্ত্রের স্বৈরাচারী স্পর্ধার ফলে উদ্ভুত সমস্যার মীমাংসায় যেটা সবচেয়ে রাবীন্দ্রিক চিন্তা – ধনতন্ত্রের অন্তর্গত বৈধ। নিজেরই মৃত্যুকে নিজেরই মধ্যে লালন। সেটিকেও রবীন্দ্রনাথ আগাগোড়া মিথের বুনোটেই শিল্পিত করে তুলেছেন। রক্তকরবীর আলোচনায় একটি দিকই বারবার মনে হয় যে
ক) আধুনিক ধনতন্ত্রের সমস্যা কি করে মিথের ভাষায় রূপকল্পিত হচ্ছে।
খ) আধুনিক ধনতন্ত্রের ওই অন্তর্বিরোধ কি করে নাটকের আদ্যন্ত একই মিথের পরস্পর বিরোধী।

মনের মধ্যে প্রশ্ন উদিত হওয়াই স্বাভাবিক যে, রক্তকরবীর ঘঁটনাস্থল কোথায়? রক্তকরবীর ঘটনাস্থল যপুরী। যে ‘যপুরী’ নামের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন- ‘পৌরাণিক যপুরীতে ধনদেবতা কুবেরের স্বর্ণসিংহাসন। যে জায়গাটির কথা হচ্ছে, সেখানে মাটির নিচে যরে ধন পোঁতা আছে। তারই সন্ধান পেতে পাতালে সুড়ঙ্গ খোদাই চলছে, এই জন্যই লোকে আদর করে একে যপুরী নাম দিয়েছে।’
এখানে একটু পরিস্কার করে বলে রাখা যায় যে, ভূগর্ভস্থ এই যপুরীর কল্পনা প্রথম পাওয়া যাবে রক্তকরবী’রও বহুকাল আগে লেখা ‘সম্পত্তি সমর্পণ’ গল্পে। যপুরীর কেন্দ্রবিন্দু খুঁজতে গিয়ে পাওয়া যায় কুবের গড়ে। তবে পুরাণে কুব সম্পর্কে জানা যায়, কুব উত্তরদিকের অধিপতি। আর সেই কারণে কুবকে উত্তরদিকের সূর্যরূপে গ্রহণ করা হয়। শীতকালে সূর্যের যখন উত্তরায়ণ শুরু হয়, তখনই ফসল ওঠার সময়। সুতরাং ধনাধিষ্ঠাতৃত্বের সাথে সম্পর্ক আছে। এখানে বোঝা যায়, পৌষের নাটক রক্তকরবী‘তে নিজের নিঃসঙ্গতা বোঝাতে গিয়ে যরাজ নন্দিনীকে বলেছিলেনÑ‘ আমার সঙ্গী? মধ্যাহ্নসূর্যের কেউ সঙ্গী আছে?’
অন্যদিকে রক্তকরবীর দ্বিতীয়, তৃতীয় এবং চতুর্থ পান্ডুলিপিতে সর্দার, মেজো সর্দারকে বলছে- ‘আমার স্ত্রীকে ভাবছি মš’রপুর থেকে এগিয়ে নিয়ে আসবো।’
রক্তকরবীর বর্তমান পাঠে অবশ্য এই সংলাপটি নেই। তবে রক্তকরবীর মুদ্রিত চারটি পান্ডুলিপিতেই চন্দ্রা বলেছে- অঘ্রাণ শেষ হয়েছে।
অগ্রাহায়ণ থেকেই সূর্যের উত্তরায়ণ শুরু বলে প্রাচীনকালে অগ্রাহায়ণ কাল থেকে শুরু হতো সৌরবৎসর গণনা। রক্তকরবীর বর্তমান পাঠে চন্দ্রা বলেছে- ‘নবান্নের সময় এল বলে’…।
আসন্ন এই নবান্ন উৎসবের সূত্রেই পৌষের আবাহন-সঙ্গীতটি হয়েছে নাটকের প্রাণসঙ্গীত। উত্তরাভিমুখে সূর্যরূপী কুবেরের অয়ন – কাল ফসল ওঠার সময়, তাই গাওয়া হয়েছে- ‘ডালা যে তার ভরেছে আজ পাকা ফসলে’। উত্তরদিকে এই যপুরীর একটি আভাস মিলবে ১৮৯৮ সালে ‘ভারতী’ পত্রিকায় প্রকাশিত রবীন্দ্রনাথের লেখা একটি গ্রন্থের সমালোচনায়। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন- ‘উত্তর-আমেরিকার কন্ডাটক নামক দুর্গম তুষার মরুর মধ্যে স্বর্ণখনির সংবাদ পাইয়া লোভোম্মক্ত নরনারীগণ দীপাশিখালুব্ধ পতঙ্গের মতো কেমন উর্ধ্বশ্বাসে ছুটিয়াছে। পথের বাধা, প্রাণের ভয়, অন্নকষ্ট কিছুই তাহাদিগকে রোধ করিতে পারে না। সে ব”ত্তাš- সংবাদপত্রে সকলেই পাঠ করিয়াছেন …। ইহার উদ্দীপক দুর্দাš-, লোভ।’
এখান থেকেই বোঝা যায়, রবীন্দ্রনাথ ‘রক্তকরবী’ লিখতে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে পশ্চিমের। যেমন, উত্তরদিকের যপুরীর সাথেই কল্পনায় মিশে গিয়েছে- পশ্চিমদিকের যপুরী। স্বভাবতই এস্ট্যাব্লিষ্ট মিথ-এর সাথে এখানে সংযুক্তি হয়েছে ক্রিয়েটিভ মিথ। আসলে তার সমকালীন ধনতান্ত্রিক পাশ্চাত্যকেই রবীন্দ্রনাথ নতুন করে পশ্চিম যপুরীর নব্য-পৌরাণিক রূপকল্প স”ষ্টি করেছেন। ১৯৮০ সালে দ্বিতীয় বার ইউরোপ যাত্রার সময় রবীন্দ্রনাথের পশ্চিমাভিমুখী জাহাজ যখন স্বদেশের উপকূল ত্যাগ করলো। তখন তার কবিচিত্ত শুনেছিলো ভারতবর্ষের এই কর”ণ পিছু ডাক- ‘বৎস কোথায় যাস! কোন দূর সমুদ্রের তীরে? কোন যগন্ধর্বদের স্বর্ণপুরীতে?

রক্তকরবী’তে বিশুর স্ত্রী ঘরের যে জানালাটি দিয়ে দেখছিলো যপুরীর স্বর্ণচূড়া। সেই জানালাটিকে নাটকের প্রথম পান্ডুলিপিতে বিশেষিত করা হয়নি। কিš’ নাটকের দ্বিতীয় পান্ডুলিপি থেকেই সেটি ‘পশ্চিমের জানালা’। রক্তকরবীর যরাজ কি তাহলে পশ্চিমের জানালায় এখনো বসে? তাই কি যরাজ শুধু সোনার তালের তাল-বেতালকেই বাঁধতে চাননি, তিনি অমরত্বও পেতে চেয়েছিলেন। সেই রকম ভাবনায় রবীন্দ্রনাথ আগে থেকেই সর্তক করে দিয়েছেন। রক্তকরবীর মধ্য দিয়ে পশ্চিমার চরিত্র। তাইতো রক্তকরবীর যরাজের মুখ দিয়ে রবীন্দ্রনাথ সংলাপ লিখলেন- আমি যৌবনকে মেরেছি, এত দিন ধরে আমার সমস্ত- শক্তি দিয়ে কেবল যৌবনকে মেরেছি। মরা যৌবনের অভিশাপ আমাকে লেগেছে।
কিš’ শেষপর্যš- যরাজ মকর নন্দিনীকে গ্রাস করতে পারেনি। কি আশ্চার্য কৌশলে রবীন্দ্রনাথ কুবের আর মদনের পরস্পর বিরোধী শক্তির সংগ্রাম মুখোমুখি করিয়ে দিলেন। আর ধনতন্ত্রের অন্ত-র্বিরোধের ইঙ্গিত নিয়ে সমস্ত-নাটক জুড়েই এক জাতীয় মিথের দু’মুখো দ্বৈরত।

একদিকে ইন্দ্রের যাদু অন্যদিকে যরে যাদু। একদিকে ইন্দ্রের সোমরস অন্যদিকে যরে মরণরস, একদিকে যরে টোটেম কৃর্ম অন্যদিকে বিষ্ণুর টোটেম কৃর্ম, একদিকে ইন্দ্রের সৌন্দর্যজাল অন্যদিকে যরে জানালার জাল। একদিকে মকরের দাঁত অন্যদিকে বরাহের দাঁত।
এতসবের মধ্যে আমাদের নাট্যমঞ্চে রক্তকরবীর উপস্থিতি, আর সেই উপস্থিতির মধ্যে কতটুকু তার যন্ত্রণা উঠে এসেছে এখন সেটিই বিবেচ্য বিষয়।

 

 

Print Friendly