মঞ্চনাটক কোন পথে?

মাজহারুল হক পিন্টু

image2সংকট তৈরী হলেই আসে উত্তরণের প্রশ্ন। সংকট মানেই স্থবিরতা। বাংলাদেশের মঞ্চ নাটকের সফলতা সবাই জানেন। জানেন নাট্য শিল্পের জনপ্রিয় হয়ে ওঠার ইতিহাসও। আজ আমরা সেদিকে যাবো না। কারণ, শিল্প সতত সঞ্চারণশীল, নতুন কিছু সৃজনে তার চলা। যখনই তা সংকটের আবর্তে পড়ে ঘুরপাক খায়, তখন তা হয়ে ওঠে এক ঘেঁয়ে বিরক্তিকর। আমাদের নাট্যজগতে গত এক দশকে তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য সৃষ্টি নেই যা ব্যাপক আলোচনায় আসতে পারে। অথচ বর্তমান সময়ে নাট্যদল, নাট্যকার, নির্দেশক, অভিনয় শিল্পীর অভাব নেই। প্রাতিষ্ঠানিকভাবেও প্রতিবছর বেরিয়ে আসছে প্রচুর ছেলে মেয়ে।  তারপরও তালিকায় যোগ হয় না সেলিম আল দীন, সৈয়দ শাসসুল হক, আবদুল্লাহ আল মামুন, মামুনুর রশীদ বা মান্নান হীরার মত নাট্যকার। মঞ্চ মাতায় না কীর্তনখোলা, কেরামত মঙ্গল, নুরলদীনের সারাজীবন, ওরা কদম আলীর মত কোনো নাট্য প্রযোজনা। অথচ এখন শুধু মহিলা সমিতিই সব নয়, তৈরী হয়েছে আধুনিক মঞ্চ ও স্টুডিও থিয়েটার, নাট্যদলগুলোও পাচ্ছে বিভিন্ন রকম সুযোগ সুবিধা। তারপরও কেন এই শূন্যতা, কেন এই সংকট। আসলেই কোন পথে হাঁটছে আমাদের মঞ্চনাটক ? সে কি আলোকিত কোন স্বর্ণ শহরের দিকে যাত্রা না কি মরীচিকার পেছনে ধাবমান?

তার-ই অনুসন্ধানে আমাদের দীর্ঘ এক বছরের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন।

 

চায়ের দোকানদার থেকে শুরু করে দর্শক ও নির্দেশক পর্যন্ত সকলের কাছে আমাদের প্রতিদিনের জিজ্ঞাসা ছিলো বাংলাদেশের মঞ্চ নাটক কোন পথে।

এ প্রতিবেদনে আমরা সারাদেশের মঞ্চকর্মীদের কাছে আরো জানতে চেয়েছিলাম- কোন উদ্দেশ্য নিয়ে মঞ্চনাটক বা গ্র“প থিয়েটার করতে এসেছেন?  সেই উদ্দেশ্য কতটা সফল হয়েছে। বর্তমান সময়ের মঞ্চনাটকের অবস্থা ও অবস্থান সম্পর্কে আপনার ভাবনা বা মতামত কি? কেমন দেখতে চান মঞ্চনাটকের ভবিষ্যত?

এক একজন নাট্যকর্মী এক একরকম উত্তর দিয়েছেন, কেউ কেউ এড়িয়ে গেছেন মূল বিষয়টি, কেউ কোনোরকম সাড়া দেননি। যা আমরা পাঠকের কাছে কোনোরূপ পরিবর্তন বা পরিমার্জন ছাড়াই তুলে ধরেছি। এই প্রতিবেদনের সাক্ষাতকারগুলো গ্রহণ করেছেন পত্রিকার সম্পাদক আরিফ আহমেদ।

মঞ্চনাটক কোন পথে। এটা বলা মুশকিল কারণ আমাদের সবক্ষেত্রেই একটা অস্বচ্ছ ভাব থাকে। মনে হয়, কোনো লক্ষ্য নির্ধারিত নেই, করতে হবে তাই যেন করা, আসলে বিষয়টা বোঝানো খুব শক্ত। জাতীয় নাট্যশালার সামনে এক সন্ধ্যায় নাট্যকর্মীদের আড্ডায় কথাগুলো বলছিলেন তরুণ নাট্যকর্মী ও নির্দেশক জাহিদ রিপন।

মহিলা সমিতির সামনের পান সিগারেট বিক্রি করেন শাজাহান। তাকে জিজ্ঞেস করা হলো আপনি নাটক দেখেন কিনা? উত্তরে তিনি বললেন- হ্যাঁ মাঝে মাঝে দেখি তো। আমি এইখানে মানুষের আনাগোনা দেখলে বুঝি কোন দলটা ভালো কোনটা খারাপ। তবে আগে এইখানে নাটকের দলের ছেলেমেয়েরা আড্ডা দিত এখন আসে প্যাকেজ নাটকওয়ালারা।

রেজা সাহেব প্রায়ই নাটক দেখতে আসেন স্বপরিবারে। তাঁর অভিযোগ গুরুতর- ‘নাটক দেখি প্রায় দশ পনের বছর যাবত, তবে এটুকু বলতে পারি আন্তরিকতার অভাবেই হোক, অথবা জীবীকার তাগিদ পূরণ করার কারণেই হোক নাটকগুলো দেখে এখন আর শান্তি পাওয়া যায় না, কেমন যেন এক ধরনের গা ছাড়া ভাব লক্ষ্য করা যায়। সুস্থ বিনোদন চাই বলেই পয়সা খরচ করে নাটক দেখতে আসি ভালো কিছু দেখবো এই আশায়, কিন্ত বেশির ভাগ সময় হতাশ হতে হয়। প্রযোজনার মান ভালো না, হাস্যকর অভিনয়। আমার মনে হয় নাট্যদলগুলোর ভাবনা চিন্তা করে নাটক করা উচিত। তাঁর স্ত্রী শাহিদা খানম একই কথা বললেন, আসলে আমাদের দেশে যে কোনো কাজেই দেখেছি যে শুরুটা খুব সুন্দর হয় কিন্ত এরপর যেন সবাই খেই হারিয়ে ফেলে।

অন্য ধরণের হতাশা ব্যক্ত করে টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রের একজন তরুণ অভিনেতা- ‘ভাই টিভি-চলচ্চিত্রে অ্যাকটিং করি। দ’ুদিন লাগুক আর তিনদিন লাগুক সর্বনিম্ন দু হাজার টাকার একটা খাম হাতে আসে কিন্তু মঞ্চনাটক করলে?

 

রাখতে হবে। অভিনয় শেখার জন্য মঞ্চনাটক করবো? তাহলে ইনষ্টিটিউটের দোষ কি? এগুলো আসলে আমাদের নাট্যজনদের ভাবা উচিত। শুধু আবেগ দিয়ে এখন আর দুনিয়া চলে না।

শিল্পকলা একাডেমীর এক্সপেরিমেন্টাল হলে একটি নাট্য সংগঠন কমেডি নাটক করছিলো কোনো এক শুক্রবার। মাঝপথেই বেরিয়ে এলেন এই প্রতিবেদকেরই এক বন্ধু আমার একসময়ের নাট্যসাথী (আলম)। তাকে জিজ্ঞেস করলাম, কিরে নাটক দেখলি? ‘দেখিনি তবে চেষ্টা করেছি দেখার শেষপর্যন্ত টিকতে না পেরে বেরিয়ে এলাম। কমেডির নামে যেভাবে সুড়সুড়ি দিয়ে হাসানোর চেষ্টা চলছে তাতে না হেসে বরং রাগে গালাগালি দিতে ইচ্ছে হয়েছে।

কে বলেছে মঞ্চনাটক খারাপ, আমি তো বেশ কয়েকটা মঞ্চনাটক দেখেছি, প্রোডাকশনের মানতো খুবই চমৎকার। যাঁরা বলে তারা আসলে চায় না বাংলাদেশে মঞ্চনাটক হোক। পরিষ্কার জবাব দিলেন প্রথম শ্রেণীর একটি নাট্যদলের একজন কর্মী রাকিব। অবশ্য গ্র“প থিয়েটার ফেডারেশান কর্তাদেরও অনেকে বলেছেন এ কথা।

‘এটা তো কুয়ার ব্যাঙের সমুদ্র দর্শনের মত। এতো এতো নাট্য সংগঠন, এতো এতো নাটক, তার মধ্যে দু‘চারটা যদি ভালো না থাকে তাহলে তো কিছুই থাকল না। কিন্ত এটা দিয়ে কি সামগ্রিক বিষয়টা বিবেচনা করা সম্ভব? বলছিলেন রাকিবেরই সহযাত্রী আরেক নাট্যকর্মী।

একটা নাটকের মানদন্ড কিভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব? আসলে মানদন্ডের বিষয়টা নির্ভর করে ব্যক্তির ওপর। একজন মানুষের মেধা, মননশীলতা তার বেড়ে ওঠার পরিবেশ, সামাজিকতা সবকিছু মিলিয়েই তৈরি হয় একজন মানুষের রুচিবোধ। তাই বলে কি অন্যেরা নাটকে আসবে না? অবশ্যই আসবে। কারণ, নাটক এখন প্রাতিষ্ঠানিক ভাবেই শেখানো হচ্ছে। যার ভেতর শিল্পবোধ আছে সেই পারবে।

নাট্যজন মাসুদ আহমেদ চৌধুরীর ব্যাখ্যাটা একটু অন্যরকম। গ্র“প থিয়েটার হচ্ছে আদর্শভিত্তিক নাট্য সংগঠন। প্রতিটা গ্র“প থিয়েটার এর রয়েছে নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি, আদর্শ, উদ্দেশ্য। জনগনের রাজনৈতিক চেতনাকে জাগ্রত এবং উৎসাহিত করাই তাদের লক্ষ্য।

গ্র“প থিয়েটারগুলো যখন তৈরি হয় তখন শিল্পবোধ, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বদেশ প্রেমের তাড়নায় ছেলেমেয়েরা কাজ করতে আসে। এর সাথে অর্থের কোন যোগ ছিল না। এখন কি তা হচ্ছে? সম্ভব নয় কারণ, জীবিকার প্রয়োজনেই জীবন অনেক জটিল হয়ে গেছে। সেক্ষেত্রে আমার মতে, পেশাদার থিয়েটারের বিকাশটা খুব বেশি প্রয়োজন কিন্ত এ ব্যাপারে তেমন কোন উদ্যোগ চোখে পড়ে না।

পেশাদার থিয়েটার বিকাশে যে কাঠামো দরকার তাইতো আমাদের দেশে নেই। আর পেশাদার থিয়েটার বিকাশে গ্র“প থিয়েটার ফেডারেশান-এর উচিত সবচে’ বড় ভূমিকা রাখার। পেশাদারিত্ব তৈরি না হলে নাটকের বিকাশও আটকে থাকবে। কিন্ত পেশাদার থিয়েটার যে করবেন,

আপনার মঞ্চ কোথায় ? একটি নাট্য সংগঠনকে নাটক করতে হলে মঞ্চের জন্য মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয়। সেখানে পেশাদার থিয়েটার কিভাবে সম্ভব। আপনার তো আগে ঘর ঠিক করতে হবে। সবাইকেই বিষয়টা বুঝতে হবে। আর আমি বর্তমান প্রজন্মকে দায়ী করবো না। ওরা যথেষ্ট আন্তরিক। যে কোন কাজেই। মুশকিল হচ্ছে, ওদের সঠিক পথে চালনা করা। ওদের সামনে কোন উদাহরন নেই যা আছে তা ভন্ডামি। আর প্রতিষ্ঠানগুলোর নাট্যবিভাগ থেকে যারা পাশ করে বেরিয়ে আসছে তারা অধিকাংশই খোঁজে টেলিভিশনের চাকরি আর বাকীরা প্লাটফরমের অভাবে কেরানীগিরি করতে বাধ্য হয়।’ কথাগুলো বললেন নাট্যকর্মি পুলক রাহা।

এতো গেল রাজধানীর কথা। ঢাকার বাইরের চিত্রটা আরো করুণ। মঞ্চনাটকের দর্শক নেই বললেই চলে কারণ একটি নাটকের বড়জোর কয়েকটি প্রদর্শনী হয়। আর রাজধানীতে আসার সুযোগ মেলে খুব কম দলেরই। তাহলে আমরা কিভাবে বলি নাট্যশিল্পের বিরাট সফলতার কথা?

দেখতে বেলা তো কম গড়ায়নি। তবে হ্যা, এটুকু বলা যায় যে, নাট্যচর্চা বিস্তৃত হয়েছে। একসময় হয়তো আমরা যে স্বপ্ন দেখছি তা পূরণ হবে। এই আশা ব্যক্ত করলেন, প্রবীণ নাট্যশিল্পী জহিরুজ্জামান। তিনি আরও বলেন, এ বিষয়ে সরকারের ভূমিকা রাখা উচিত আরও আন্তরিকভাবে, অন্যান্য দেশে নাটকের ক্ষেত্রে সরকার পৃষ্ঠপোষকতা করে কিন্তু আমরা হতভাগা, এক শিল্পকলার মঞ্চ নির্মাণ করে দেয়া ছাড়া আর কোন ভূমিকা নেই সরকারের। সংস্কৃতিমনা সরকার ক্ষমতায় এসে উল্টো সংস্কৃতি খাতেই বাজেট কমিয়ে দিলেন। কি মজা।’

নাট্যতত্ত্ব থেকে পাশ করে বেরিয়ে আসা আলীম আল রাজী বললেন, ‘থিয়েটারের ব্যাপক দর্শক সমাগম কোন কালে কোন দেশেই ছিল না। তারপরও অন্যান্য দেশে দর্শকের যে পরিমাণ তার এক অংশও আমাদের এখানে হয় না। আসলে মঞ্চনাটক দেখার মানসিকতা তৈরির দরকার আছে। আর সেটা হতে হলে শিক্ষার প্রয়োজন আছে। শিক্ষার হার যখন সারাদেশব্যাপী বাড়বে তার সাথে মঞ্চনাটকের দর্শক এবং দর্শক প্রিয়তাও বাড়বে।


কিন্তু সরকারের সদিচ্ছার অভাব আছে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া কোন বড় পরিকল্পনা বাস্তবায়ণ সম্ভব নয়। আমি অবশ্য এই সাথে যারা নাট্যজগতের হর্তাকর্তা তাদের সদিচ্ছার অভাবের কথাও বলবো কারণ একটা প্রবাদ তো আমাদের সকলেরই জানা আছে। ‘ যে যায় লঙ্কায় সেই হয় রাবণ। আমাদের দাবী থাকবে যে, নাটককে স্কুল পর্যায় থেকে পাঠ্য করা হোক। তাতে দেশের বেকারত্ব কিছুটা হলেও কমবে কারণ যারা নাট্যতত্ব থেকে পাশ করে বের হচ্ছে তারা কাজ করতে পারবে এবং তাতে থিয়েটারেরও লাভ হবে।’

একই দাবী তুলেছেন বাংলাদেশ গ্র“প থিয়েটার ফেডারেশান-এর বর্তমান সেক্রেটারী জেনারেল ঝুনা চৌধুরীও। তাহলে আমাদের কি করা উচিত বা কোন পথে হাঁটা উচিত?

এতসব মতামতের ভিত্তিতে প্রশ্ন করা হয়েছিল রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত ও নাট্যতত্ত্ব থেকে পাস করে আসা নাট্য গবেষক ড. খন্দকার তাজমী নুরকে। তাঁর বক্তব্য হচ্ছে ‘সমস্যা বহুমুখী। একসঙ্গে এত সমস্যার সমাধান করতে গেলে কোনোটাই হবে না, এক এক করে করতে হবে। তবে তারও ধারাবাহিকতা থাকতে হবে। একটি একটি করে সমস্যার সমাধান করতে হবে। তবেই হয়তো সঠিক পথ পাওয়া যাবে। কে কোন ধারায় নাটক করলো সেটা পরের বিষয়। প্রথমেই নাটকের দেখার বিষয়

টমওয়ার্ক, অভিনয়ের মান, তারপর অন্যান্য সব। এসব করতে হলে এর জন্য সময় দিতে হবে, চর্চা করতে হবে। আন্তরিক চেষ্টা থাকতে হবে। থিয়েটারের জন্য কেউ কি পারবে অঢেল সময় দিতে ? আমরা আসলে সময়ের হাতে বন্দী। সময় বলে দেবে কি হবে।’

‘এটা আসলে গাছাড়া কথা। অনেকটা দায় এড়ানোর মত। আসলে ব্যাপারটা হচ্ছে সকলেরই ভাবতে হবে বিষয়টা নিয়ে। বিশেষ করে ভাবা উচিত নাট্যজনদের। যারা বাংলাদেশের মঞ্চনাটকের দিকপাল, তাদের কাছে সবারই অনেক প্রত্যাশা। তারাই তো দিক নির্দেশনা দেবেন কি করা উচিত।’ আর নাটকে নিরীক্ষার নামে যা করা হচ্ছে সেটাও ভাববার বিষয়।’ ‘ কিন্তু যে দেশের নব্বই ভাগ মানুষই জানে না মঞ্চনাটক যারা করে এটা তাদের পেশা না সখ সে দেশে নিরীক্ষা করার আগে বেশী করে মঞ্চনাটক দেখার দর্শক তৈরী করা উচিত আগে’। কথাগুলো হচ্ছিল আজিজ মার্কেটে নাট্যকর্মীদের এক আড্ডায়। আড্ডা অবশেষে একমতে পৌঁছাল যে, আপনি যে ভাবেই করেন এটা গণমাধ্যম, সুতরাং দর্শককে আপনার নাটক দেখাতে হবে। দর্শক যেহেতু নিজের গাঁটের পয়সা খরচ করে টিকিট কেটে আপনার নাটক দেখবে। অতএব, তার সাথে প্রতারণা চলে না, নাটকের নামে যা মনে হলো তাই করে ফেলবেন এটা গ্রহণযোগ্য নয়। আরো কিছু ব্যাপারে বলতে হয় যে, বাইরের দেশের ভালো নাট্যদলগুলোকে মাঝে মাঝে নিয়ে আসা উচিত, তাতে করে যেমন আমাদের জানার পরিধিটা বাড়বে তেমনি তুলনা করাও সম্ভব হবে যে বিশ্ব প্রেক্ষাপটে নাটকে আমাদের অবস্থান কোথায় ? বলছিলেন এক সময়ের নাট্যকর্মী স্থপতি শামীম আমিনুর রহমান। তিনি আরো বলেন, এখন যেভাবে নানারকম প্রতিযোগিতা চলছে মঞ্চনাটকেরও এমন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা যায়, তাতেও নাটকের মান কিছুটা বাড়তে পারে। তাছাড়াও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যে নাট্যদলগুলো আছে তাদের নিয়েও নাট্য প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে পারে ফেডারেশন। এতে করে মঞ্চে যারা কাজ করে তাদের ভেতর একটা আগ্রহ তৈরী হবে।

একসময় একদল সাহসী তরুন স্বপ্ন দেখেছিলো বাংলাদেশে নিয়মিত নাট্যচর্চা হবে, দর্শনীর বিনিময়ে মানুষ মঞ্চনাটক দেখবে। নাট্যশিল্প বিকশিত হবে। সেই তরুনদের স্বপ্ন কিছুটা হলেও সফল হয়েছে কিন্তু সেই তরুনরা কি এটা ভেবেছিলো তাদের পরবর্তী প্রজন্ম কি করবে? কিভাবে এগোবে?

এই প্রতিবেদন শেষ করছি আলীম আল রাজীরই একটা দুঃখবোধ দিয়ে‘ আমাদের এখানে সবই সম্ভব কিন্তু হয় না একটা কারণে, সেটা হচ্ছে সমন্বয়ের অভাব। সবই আছে কিন্তু কোনো কিছুর সমন্বয় নেই। নেই আত্মসমালোচনা, নেই ভালোকে ভালো বলবার খারাপকে খারাপ বলবার মত উদার মানসিকতা। সমালোচনা আছে, নেই সহযোগিতার মনোভাব। সব কিছুকেই আগলে রাখতে চাই নিজের পকেটে, আমিই সেরা আর সব…।

এতসব আলোচনা থেকে এটাই বেরিয়ে এসেছে, মঞ্চনাটককে জনপ্রিয় করতে হলে যারা সত্যিকারেরই নাট্যপ্রেমিক তাদের এক প্লাটফরমে আসতে হবে, নাটকে পেশাদারিত্ব আনতে হবে, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা অবশ্যই দরকার, প্রাথমিক শিক্ষায় নাটককে অন্তর্ভূক্ত করতে হবে। তবেই হবে প্রত্যাশিত পথে আমাদের যাত্রা।

 

ম ঞ্চ  হ চ্ছে  সু – না ট্যে র  সু তি কা গা র

আলী যাকের

 


নাটকের প্রতি আমার ভালবাসা আর সৃজনশীল শিল্পকর্মের দ্বারা একটা অভিব্যক্তি খুঁজে পাবার জন্যই নাট্যচর্চার প্রতি আগ্রহ আমার।

আমি যে দর্শন নিয়ে মঞ্চনাটকে এসেছি তা অনেকটা পূরণ হয়েছে। তবে দুনিয়ার কোথাও কোনো শিল্পীর আশা সবটা পূরণ হয়না বলেই আমার ধারণা।

আমি মঞ্চনাটককে একটি সর্বব্যাপী, সৃজনশীল, নিয়মিত চর্চিত শিল্প মাধ্যম হিসেবে দেখতে চাই। আমাদের বর্তমান প্রযোজনা কাঁঠাল বাগান, নুরলদীনের সারাজীবন, রক্তকরবী। এগুলোর একটির বক্তব্যের সঙ্গে অন্যটির কোনো মিল নেই।

নিদের্শনায় আমি বিশেষ কোন কৌশল অবলম্বন করায় বিশ্বাসী নই। আমি সবসময় আশা করি, যে মঞ্চায়নের জন্য নির্বাচিত অভিনেতা অভিনেত্রীরা অভিনেয় ভূমিকার অন্তর্নিহিত সত্য আবিস্কার করে তাদের নিজস্ব মেধা অনুযায়ী চরিত্রটিকে তৈরী করবে। এ বিষয়ে আমি নিদের্শক হিসেবে তাদেরকে আমার ব্যাখ্যা বিশদভাবে যুক্তিসহযোগে বুঝিয়ে দিই। আমার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার আমি আবিস্কার করেছি যে কুশীলবদের যুক্তি, প্রভিতা এবং ক্ষমতার উপরে নির্ভর করলে নাটকের প্রতি সুবিচার করা যেতে পারে।

আমাদের মঞ্চ নাটকে হলের সমস্যা সর্বব্যাপী এবং সর্বগ্রাহী। বর্তমানে শিল্পকলা একাডেমী প্রাঙ্গণে স্টুডিও থিয়েটার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এ বিষয়ে কিছুটা লাভবান হয়েছি আমরা সবাই।

মঞ্চ হচ্ছে সু-নাট্যের সুতিকাগার। মঞ্চ থেকেই ভাল অভিনয় এবং নিদের্শনা ভালভাবে আয়ত্ব করা সম্ভ^ব। মঞ্চকে সম্পুর্ণভাবে না জেনে অন্যকোন মাধ্যমে  আগ্রহী হলে শিক্ষা অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

আমি নিশ্চিত যে বাংলাদেশে মঞ্চ নাটক আরো উন্নত হবে, আরো বেগবান হবে এবং আরো অর্থবহ হবে । আমাদের তরুণ নাট্যজনদের মধ্যে সেই লক্ষণ স্পষ্ট প্রতিভাত।

 

দলগুলোর উপর অবজারভেশন রাখতে হবে

নাসিরউদ্দীন ইউসুফ বাচ্চু

 


দীর্ঘদিনের ঔপনিবেশিক শিল্পরীতি এবং সংস্কৃতির শাসনে থাকা বাংলা মঞ্চ মুক্ত হয়ে নিজের মত করে ভাবতে ভুলে গেছে। সে কারণে এটি দীর্ঘ চর্চার প্রয়োজন আছে। আমাদেরকে অনুসরণ করাটাও একধরণের ঔপনিবেশিক মানসিকতা। আমরা বার বার বলছি যে জাতীয় নাট্যআঙ্গীকগুলোর বিবেচনা এক একজন পরিচালক এক একভাবে করবেন।

কিন্তু আমাদের ঘরানার বাইরে যে থিয়েটার হচ্ছে সেটা তো পশ্চিমাজাত থিয়েটার। সেই পশ্চিমাজাতো, পশ্চিমের অনুপ্রীতির যে থিয়েটার সেটাতো সারা দেশে একইরকম হচ্ছে। শুধু অভিনয়ের তারতম্য ঘটছে, কারো অভিনয় ভালো, কারো খারাপ। যে দোষে আমাদের ঐতিহ্যবাহী নাট্যআঙ্গীকের ব্যবহারে ঢাকার দলগুলোকে দুষ্ট বলছেন, সেভাবেতো ঢাকায় যারা পশ্চিমাজাতো ভালো নাটক করছেন তাদের যারা অনুকরণ করছে, তাদের কথা বলছেন না। তারাও তো একই দোষে দুষ্ট। আসল কথা হচ্ছে, কোন আঙ্গীকে করল, সেটা বড় কথা না। বড় কথা হচ্ছে-  নাটকের শিল্প মান হারাচ্ছে কিনা। যদি শিল্প মান হারিয়ে থাকে তাহলে দুই ধারাতেই হারাচ্ছে। সেখানে এক ধারাকে দোষী করবেন কেন?

এটা চিন্তা, চেতনা ও মননশীলতার উপর নির্ভর করে। বলতে পারেন এটা দলীয় ব্যর্থতা। একটি সংগঠনকে সবার আগে তার দলীয় মান বৃদ্ধির জন্য চেষ্টা করতে হবে। বিভিন্ন কর্মশালা আয়োজনের মাধ্যমে কর্মীদের উপযুক্ত করে তুলতে হবে। এজন্য তারা গ্র“প থিয়েটার ফেডারেশান-এর সহযোগিতা নিতে পারে। ফেডারেশান আছে কেন?

ঢাকার ভিতরও কিন্তু অত্যন্ত খারাপ খারাপ নাটক হচ্ছে, সেটা আমরা বলছি না, ঢাকার বাইরে কী হচ্ছে তা দেখি। ঢাকার বাইরে যেমন খারাপ হচ্ছে, তেমনি ভালোও হচ্ছে, আবার ঢাকার ভিতরও যেমন ভালো নাটক হচ্ছে তেমনি খারাপ নাটকও হচ্ছে। যে কারণেই আমি বলবো গ্র“প থিয়েটার ফেডারেশানের দায় ও দায়িত্ব অনেক বেশি। আমি মনে করি তারা তাদের দায়িত্বের প্রতি রীতিমত অমনোযোগী। আজকে চট্টগ্রামে তীর্যক-এর আহমেদ ইকবাল হায়দার একক চেষ্টায় কী একটা মিলনায়তন করে ফেলেছে না। সেখানে এখন নিয়মিত নাটক হচ্ছে। তীর্যক অত্যন্ত ভালো নাটক করে।

আমরা গ্রাম থিয়েটার থেকে আগামী ৬ মাসের মধ্যে মহিলা নাট্যকর্মী সম্মেলন, নির্দেশক কর্মশালা করবো। নাট্যকার করে ফেলেছি। এদের আবার প্রতি ৬ মাস পরপর ঢাকায় ডেকে এনে কার কতটা উন্নতি হয়েছে তা নিয়মিত পর্যালোচনা করা হবে। কর্মশালা করিয়ে থেমে থাকা যাবে না। এ দলগুলোর উপর অবজারভেশন রাখতে হবে। ফেডারেশান চাইলে এটাই আরও ভালোভাবে করতে পারবে। তাদের তো নিজস্ব স্পন্সর সুবিধা আছে।

১৯৭৩ সালে আমরা ঢাকা থিয়েটার করলাম। এরপর তো আর থেমে থাকা নেই, সেলিম আর আমি একসাথে, ও লিখেছে, আমি নির্দেশনা দিয়েছি।

কেরামত মঙ্গল-এ আমি ছোট একটা চরিত্রে অভিনয় করেছিলাম, কিন্তু অভিনয় আমাকে কখনো টানেনি। আমার মনে হয়েছে এ কাজ আমার নয়, আমার কাজ নির্দেশনা দেয়া। কারণ আমার মনে হয়েছে এ কাজটায় চ্যালেঞ্জ অনেক বেশি, ডিজাইনিং-এর কাজটা অনেক গভীরভাবে করতে হয়। একটা প্রযোজনা কেমন করে দাঁড়াবে, তার রংটা কেমন হবে, চরিত্র, কস্টিউম, সেট- লাইট কেমন হবে? স্পীচটা কেমন হবে, কোরিওগ্রাফটা, সঙ্গীতটা কেমন হবে, এই সব কিছু মিলিয়ে এই যে ডিজাইনিংটা এটা আমাকে খুব টানে। এটা খুব জটিল একটা প্রক্রিয়া, চ্যালেঞ্জিং এবং খুব কষ্টদায়ক আবার একই সাথে আনন্দের একটা কাজ বলেই আমার মনে হয়।

 

এ খ ন  ক মি ট মে ন্টে র  খু ব ই  অ ভা ব

মামুনুর রশীদ

 

মঞ্চনাটক করতে কেন এলেন? এ প্রশ্নের উত্তর অনেকবার দিয়েছি, প্রচণ্ড একটা ভাললাগা, একটা কমিটমেন্ট থেকে আমি মঞ্চনাটক করতে এসেছি। আমার কমিটমেন্ট ছিল প্রথেম শিল্পের প্রতি, যে শিল্প সম্মত নাটক করবো, মানুষের জন্য কাজ করবো। এই দু’টি কমিটমেন্ট থেকেই এ পর্যন্ত নাটক হয়েছে।

এক অর্থে সফল হয়েছি অনেক, একটা হচ্ছে, পাকিস্তান আমলেতো নিয়মিত নাট্যচর্চা ছিল না, ১৯৭২ সাল থেকে এই ২০০৯ এ এসে নানাদিকে প্রসারিত হয়েছে নাটকের কাজ। সুতরাং সফলতা বিশাল। আজকে বিশ্বব্যাপী বাংলা নাটকের পদচারণা।

এখন কমিটমেন্টের খুবই অভাব। এর  জন্য আমরাই দায়ী। রাজনীতি দায়ী। ষাটের দশকে আমাদের ছিল মাও সেতুং, চে গুয়েভারা। সোভিয়েত ইউনিয়ন তখন জীবন্ত। এক ধরনের আদর্শিক লক্ষ আমাদের সামনে ছিল তখন। মুক্তিযুদ্ধ সবে শেষ হয়েছে। আমাদের সামনে মডেল ছিল। তাদের দেখে আমরা এগিয়েছি, এখনো এগুচ্ছি। এখন তো কোন মডেল নেই, কোন লক্ষ আমরা তো তৈরি করতে পারিনি। কমিটমেন্ট চেতনারই রং বহন করে। কিন্তু এখন তা ফিকে হয়ে গেছে।

গ্র“প থিয়েটার ফেডারেশান এর কাছে প্রত্যাশা করবো তারা যেন বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় যে নতুন মঞ্চ নির্মাণের কাজ চলছে, সেগুলোর যেন নির্মাণ ত্র“টি না থাকে। নিজেরাই যেন ত্র“টি ধরিয়ে দিয়ে একটি উপযুক্ত মঞ্চ নির্মাণের উদ্যোগ নেন। যে সব মঞ্চ সংস্কারের প্রয়োজন তা যেন অচিরেই সংস্কার করে ফেলেন। আর বাংলাদেশের নাট্যচর্চাকে বেগবান করার জন্য যা যা করা প্রয়োজন, এখন একটি সংস্কৃতিমনা সরকার (যদিও সংস্কৃতিখাতেই বাজেট কমিয়ে দিয়েছেন তারা) তাদের থেকে অনুদান নিয়ে দেয়া। যদিও চলমান রাজনীতিতে এটা দূরহ কাজ তবে একটু আশাও আছে- আমাদের সাংসদের এখন ৮০ ভাগই যে ব্যবসায়ী।

 

দর্শক যেন নাটকটা দেখে বিষয়টা বোঝেন

সারা যাকের

মঞ্চনাটক নিয়মিত মাধ্যম হিসেবে থাকবে। এখানে সব ধরনের কাজ হবে। ট্রেডিশনাল এবং এক্সপেরিমেন্টাল। তবে মঞ্চে আমরা যাই করি তা যেন, মানুষকে স্পর্শ করে। দর্শক যেন নাটকটা দেখে বিষয়টা বোঝে। তা না হলে ভালো নাটক হবে না।

বাংলাদেশ গ্র“প থিয়েটার ফেডারেশানের ভূমিকা হওয়া উচিত দেশের সব নাট্যদলের জন্য সুস্পস্ট কার্যক্রম হাতে নেয়া। নাট্যকর্মীদের জন্য মঞ্চনাটক করার প্রক্রিয়াকে সহজতর করে তোলা। সরকারের সাথে এই বিষয়ে দেন দরবার করা।

 

আমার উপর অভিনেতাদের অভিনয়শৈলী নির্ভর করছে

নাসিরুল হক খোকন

বর্তমান সময়ের মঞ্চনাটক মানেই আলো আর অভিনয় একই সুতোয় গাঁথা। নাটকের নির্দেশনাও এখন নিয়ন্ত্রণ হচ্ছে আলোক নির্দেশকের সাথে সমন্বয় করে। আধুনিক রক্তকরবী, প্রাচ্য, রাঢ়াঙ এসব নাটকের প্রকাশভঙ্গী, আবেগ, অনুভুতি এবং নিখূঁত আবহচিত্র ফুটিয়ে তুলতে আলোর ব্যবহার এতোটাই দর্শক প্রশংসিত হয়েছে যে, আলোক নির্দেশকের প্রয়োজনীয়তা নতুন করে উপলব্ধি করতে শিখেছে মফস্বলের ছোট্ট থিয়েটার দলটিও। শুধু অভিনয় নয়, মঞ্চের পিছনে কাজ করেও যে অভিনেতার চেয়ে বেশি সম্মান অর্জন করা যায় এ ভাবনা এখনকার তরুণদের মঞ্চের পিছনে কাজের জন্য উৎসাহিত করে তুলছে।

আমি আসলে সরাসরি আলোক নির্দেশনায় আসিনি, প্রথম এসেছিলাম মঞ্চে কাজ করার জন্য। ১৯৮৬-৮৭ এর দিকে নাগরিক নাট্য সম্প্রদায়ের সঙ্গে যুক্ত হলাম। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন তখন সবে দানা বেঁধে উঠছে, এমন একটা সময় আমি নাটকে এলাম। নাটকে এসে প্রথমদিকে অভিনয়ের জন্যই কাজ করছিলাম। সবাই তাই করছিল। তখন একটা কর্মশালা শুরু হল। এ কর্মশালার কর্মীদের দিয়ে যে নাটক তৈরি হবে, সে নাটকের মেকআপ, লাইট, কস্টিউম সব নিজেদেরই করতে হবে। দেখা গেল সবাই অভিনয় করতে চায়, কেউই পিছনের কাজগুলো করতে চায় না। বিশেষ করে লাইটিং-এ কাউকেই পাওয়া গেল না। তখন একটা পর্যায়ে আমি বললাম যে, আমি লাইটের কাজটা করবো। এই লাইটের কাজটা করতে গিয়ে, আমার মনে হল, বাঃ এটা তো বেশ কষ্টসাধ্য এবং বেশ মজাদার একটি কাজ। আমার উপর অভিনেতাদের অভিনয় শৈলী নির্ভর করছে। সবচেয়ে বড় কথা এ মাধ্যমটি এতোটা শক্তিশালী যে এর মাধ্যমে আমি আমার ভাবনাকে পৃথকভাবে উপস্থাপন করতে পারছি। এখন যেমন বাইরের কোন নাট্য দলের নাটকে লাইটের ডিজাইন করতে গেলে আমি শেষের দিকে যাই। গিয়ে কাজটা করে দিয়ে আসি। তখন এটা পারতাম না। তবে নিজের দলের লাইটিংটা আমি এখনও প্রথম থেকেই নাটকটির পর্যবেক্ষণে থাকি। কারণ একটা নাটকের গভীরে যেতে হলে নাটকটির পিছনে সময় দিতে হয়, নিজেকে নাটকটির প্রতিটি চরিত্রের গভীরে নিয়ে যেতে হয়। সেটা সম্ভব হয় না বলেই আমরা সফল হতে পারি না। আমার ক্ষেত্রে নিজের দলে এটা সম্ভব হয়, কিন্তু বাইরের দলে সময়টা পুরো দিতে পারি না। এখন যারা আমার অনুজ, লাইটের ডিজাইন করছে, তাদের প্রতি একটা বিষয় বলব যে, যে নাটকটির ডিজাইন করবো, প্রতিদিন সেই নাটকটির রিহার্সেল দেখতে পারলে, প্রতিদিনই কিছু না কিছু নতুন চিন্তার খোরাক তৈরি হবে, কিছু নতুন মাত্রা যোগ হবে।

 

তৌফিক হাসান ময়না

বগুড়া থিয়েটার

ময়না বলেন- আমার অন্যতম ইচ্ছে হচ্ছে গ্রাম থিয়েটারকে আরও শক্তিশালী ও প্রতিষ্ঠিত রূপে গড়ে তোলা। নাট্যপূরোধা সেলিম আল দীনের স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করতে চাই। নাটককে নিয়ে যেতে হবে গ্রামের মানুষের কাছাকাছি। তৃণমূল পর্যায়ে নাটককে নিয়ে গেলে তবেই নাটক হবে স্বয়ং সম্পূর্ণ।

 

আহমেদ ইকবাল হায়দার

দলীয় প্রধান, তীর্যক নাট্যদল, চট্টগ্রাম

প্রতিনিয়ত ভেতরে ভেতরে তৈরী হওয়া নিজের ভাবনাগুলো প্রকাশের জন্যতো একটি মাধ্যম চাই। মনে হয়েছিল এ মাধ্যমেই আমি সচ্ছন্দে কিছু প্রকাশ করতে পারি। আরেকটি ব্যাপার ছিল তা হোল Ñ সকল শিল্প মাধ্যমের সমন্বিত রূপ হল অভিনয়। সুতরাং এর ভিতর দিয়ে আরো অনেক নতুন জগতে প্রবেশাধিকার, সেতো মঞ্চেই সম্ভব।

যেভাবে যেটুকু করতে চাই সবটা কি পারছি? তাই বলে নিজেকে ব্যর্থ ভাবি না। আবার আত্মতুষ্টিতে মজে থাকার মানুষও আমি নই। আরো ভালো করে ভালো কিছু করে যেতে চাই। সবসময়।

অনেক বেশি দর্শক নাটক দেখছেন, পৃষ্ঠপোষকতা করছেন সমাজের সকল স্তরের মানুষ, সত্যিকারের অভিনেতা আর কলাকুশলীতে সমৃদ্ধ হচ্ছে নাট্যাঙ্গন, এ রকম স্বপ্নই দেখি। কিন্তু বাস্তবতা কি এর বিপরীত নয়?

গত কয়েক বছর ধরেই পুরোনো কয়েকটি প্রযোজনার নিয়মিত প্রদর্শনী চলছে। রবীন্দ্রনাথের রক্তকরবী, বিসর্জন, রথযাত্রা এবং নজরুলের মধুমালা।

সমগ্র দেশের নাট্যদলগুলোর কর্মকাণ্ডে গ্র“প থিয়েটার ফেডারেশনের প্রতক্ষ্য ভূমিকা আরো কার্যকরী হওয়া খুব জরুরি বলে মনে করি। আশাকরি ফেডারেশনের নতুন কার্যকরী পরিষদ অবশ্যই নতুন করে এ সব নিয়ে ভাববেন। সেই সঙ্গে দরকার সরকারী, বেসরকারী, বহুজাতিক সংস্থা ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতা পাবার ক্ষেত্রে তাঁদের সঙ্গে ফেডারেশনের কার্যকর যোগাযোগ। কারণ অর্থাভাবে অনেক দলের নাট্য প্রযোজনা কিংবা এই সংক্রান্ত কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে যাচ্ছে।

দর্শক কমছে না বাড়ছে এটা বলা মুশকিল। কারণ এক হিসাবে বাড়ছে। কারণ নাটকের দল এখন অনেক বেড়েছে। দর্শক ভাগ হয়ে গেছে। আগে মহিলা সমিতিতে ২৫০ আসনে নাটক দেখতো, এখন ৭০০ আসনের মঞ্চে এসে তারা নাটক দেখছেন।

 

অধ্যাপক নিখিল সেন

প্রতিষ্ঠাতা, বরিশাল থিয়েটার

এখানে বরিশালের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এখন একটা ঝিমানো সাদা ভাব চলছে। একমাত্র নাট্যাঙ্গনে তাও শুধুমাত্র শব্দাবলী গ্র“প থিয়েটার নিয়মিত প্রদর্শনী করছে ওদের স্টুডিও থিয়েটারের প্রতি সপ্তাহে প্রদর্শনী হচ্ছে এটা অসাধ্য কাজ ওরা করছে। প্রতি শুক্রবার একটা নাটক করা সহজ ব্যাপার না। এজন্য সৈয়দ দুলাল কে আমি আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানাই। নতুন নতুন নাটক সে দেখাচ্ছে, উন্নত স্ক্রিপ্ট নিয়ে নিয়মিত এক্সপেরিমেন্ট করছে। বলা যায় নাট্যদলটাকেই শুধু নয় এটা পুরো সংশিষ্ট সাংস্কৃতিক অঙ্গনটাকেই ওরা চাঙ্গা করে রেখেছে। তবে দুঃখ যে, বরিশালের একমাত্র মঞ্চটি বহুদিন হরো মেরামতের নামে অকেজো হয়ে আছে।

 

মিন্টু বসু

পরিচালক, খেয়ালী গ্র“প থিয়েটার, বরিশাল

বরিশালে মঞ্চনাটক বলতে এখন দুটি সংগঠনের মধ্যেই সীমিত। একটা শব্দাবলী, যারা নিয়মিত নাটক করছে। অন্যটি খেয়ালী, নিয়মিত না হলেও মাসে একটি প্রদর্শনী করছে। উদীচী বা বরিশাল থিযেটার মাঝেমধ্যে এসে আমাদের একটি নিজস্ব ১৫০ আসনের মঞ্চ আছে, এখানে নাটক করছে। এখানে তো মঞ্চনাটক যেটা সেটা করা যাবে না। বরিশালের একমাত্র মঞ্চটিতো অকেজো হয়ে পড়ে আছে।

 

শাহাদাত হোসেন খান হীলু

বহুরূপী থিয়েটার, ময়মনসিংহ

নাটক একটি চলমান প্রক্রিয়া, যদিও জেলা শহরে নাটক মঞ্চায়ন করা কোন কোন সময় খুবই কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়ায় নানাবিধ কারনে তবুও আমরা প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি একদিন এর সফলতা আসবেই এই প্রত্যাশায়।

আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ এখনো নাটককে বিনোদনের একটি অংশ হিসাবেই দেখতে অভ্যস্ত। মঞ্চনাটকের রীতিনীতি নিয়ে অনেক পরিক্ষা নিরিক্ষা হয়েছে এবং চলছে অনেক ক্ষেত্রে সফল হয়েছে। বাংলাদেশের পটভূমিকায় আমাদের মঞ্চনাটককে আরও এগিয়ে নিতে হবে- নাট্যদলগুলোকে সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে প্রতিটি জেলাতে নাটকের জন্য আধূনিক মঞ্চ তৈরী করতে হবে এবং সেই সাথে নাটক মঞ্চায়নের জন্য সকল প্রকার বাধা দুর করতে হবে।

 

ইদানিংকার যে নাটক, তা মূলত কোরিওগ্রাফ ও সংগীত নির্ভর হয়ে মূল নাটক থেকে সরে গেছে। সাধারণ দর্শকদের জন্য এখন আর মঞ্চনাটক তৈরি হচ্ছে না। ঢাকা থিয়েটার বা নাগরিক বা এই শব্দাবলীরই কিছু নাটক আছে যা সাধারণ দর্শকের জন্য না। তবে কী নাটক দেখতে হলে নাটক নিয়ে পড়াশুনা করে তবেই নাটক দেখবে? এটা আমার একটা প্রশ্ন।

 

আফজাল হোসেন

সাধারণ সম্পাদক , নাট্যলোক, সিলেট

সিলেটের বর্তমান যে নাটকের অবস্থা তা হচ্ছে ২/৩টা শো করার পরে আর দর্শক খুঁজে পাওয়া যায় না। যে কারণে একটি নাটকের অনেকগুলো প্রদর্শনী এখানে সম্ভব নয়। অথচ একটা নাটক তৈরি করতে যে খরচ, এ টাকাতো উঠে আসে না। আমাদের এখানে যে মঞ্চটি আছে, সেটি দর্শকঅনুপাতে অনেক বড়। আবার ভাড়াও বেশি। আমাদের যে দর্শক তাতে এখানে প্রয়োজন একটি স্টুডিও থিয়েটার। এখানে মোট ৬টি নাট্য সংগঠন আছে যারা বাংলাদেশ গ্র“প থিয়েটারের ফেডারেশানের সদস্য। তারা প্রত্যেকে তখন নিয়মিত নাটকের প্রদর্শনী করতে পারবে। সরকারী বা বেসরকারী উদ্যোগে সিলেটে যদি একটা স্টুডিও থিয়েটার নির্মাণ করা হয় তাহলে আমাদের নাট্যাঙ্গন অনেক সমৃদ্ধ হত।

ফয়জুল ইসলাম মানিক

সভাপতি ও  নাট্যকার, ফেঞ্চুগঞ্জ যুব নাট্য সংঘ, সিলেট

আমাদের এখানে শিল্প সাহিত্যচর্চার পুরোটাই সারকারখানা কেন্দ্রিক। সাধারণের জীবীকাও এই কারখানাকে ঘিরে। দীর্ঘদিন ধরে সারকারখানা এলাকায় শিল্পের চর্চা বন্ধ হয়ে আছে। যে কারণে এখানের নাটকের অবস্থাও ভালো নয়। পথনাটকের চর্চা ছাড়া এখানে আর কোনো নাট্যচর্চা নেই। তাও বিভিন্ন দিবসকে কেন্দ্র করে।  আনন্দ পেয়েছি। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে আধুনিক নাটক কিছু আমার মাথায় ঢোকেনি। কিছুদিন আগে বগুড়া থিয়েটারের নুরলদীনের সারাজীবন দেখলাম, এটা ভালো লেগেছে।

 

কামার উল্লাহ সরকার কামাল

সভাপতি, রাজশাহী থিয়েটার

স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের নাট্যকর্মীরা মঞ্চে যে কমিটমেন্ট নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন রাজশাহীর ক্ষেত্রে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগঠনগুলো ছাড়া আর নগরীতে ২/১ টি সংগঠন বাদে তেমন চেতনা সমৃদ্ধ দল নেই বললেই চলে। ফলে সংঘবদ্ধ নাট্যান্দোলন দানা বেঁধে উঠছে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের চিত্রটি শহরের ঠিক বিপরীত। বাংলাদেশের কোন বিশ্ববিদ্যালয়ই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যচর্চার সমপর্যায়ে আসে না। এখানে প্রায় ১০/১২টি থিয়েটার সংগঠন নিয়মিত কাজ করে চলেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগঠনগুলো রাজশাহীর দলগুলোকে চাঙা করতে বরাবরই কর্মশালা, নাট্যপ্রদর্শনী ও বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে আসছে।

 

পার্থ প্রতীম সেন

প্রধান সমন্বয়কারী, পথিকজন হবিগঞ্জ

বিশ্বদর্শনে একীভূত হবার ভাবনা থেকেই মঞ্চ নাটকে আসা। ভাবনা কতটা সফল সেটা বলার সময় এখনও আসেনি। সম্ভাবনা অপরিসীম বলা যায়।

গ্র“প থিয়েটার ফেডারেশান  বা গ্রাম থিয়েটারে’র অর্জন কোন অবস্থাতেই খাটো করে দেখার জো নেই। যে, একটা স্বতপ্রণোদিত  এবং স্বেচ্ছাশ্রম এবং নিজের পকেটের টাকার আদর্শ ব্যবস্থায় সারা দেশে যে বি¯তৃতি ঘটেছে এর মাধ্যমে আমাদের সাহসী কন্ঠে দৃপ্ত উচ্চারণ আমরা শখের দল হলেও পেশাদার মনোভাব নিয়ে থিয়েটার করি। এই অর্জনটা দরিদ্রদেশের দরিদ্র থিয়েটারকর্মী হিসেবে প্রেরনা দেয়। কিন্তু এই প্রেরনা কতটুক সময় পর্যন্ত  ঠিকে থাকবে। একটি সুস্থ এবং আগামী সুন্দরের প্রত্যাশায় গ্র“প থিয়েটারের সৃষ্টি। এটি অনস্বীকার্য যে  সময়ের সাথে সাথে অভ্যাস রুচি চিন্তা চেতনার পরিবর্তন ঘটে। চিন্তা চেতনা এবং আগামীর প্রয়োজনে সঠিক রূপরেখা প্রনয়ন দরকার। নতুন করে ভাবতে হবে কয়েকটা দাবী’র মধ্যেই সীমারেখা টানলে হবে

 

রাজ্জাক মুরাদ

সাধারাণ সম্পাদক , রংপুর নাট্যকেন্দ্র

মানুষ হয়ে যখন জন্ম নিয়েছি তখন সমাজের প্রতি আমার একটা দায়বদ্ধতা আছে। সেই দায়বদ্ধতা থেকে আমি নাটক করি। অন্য যে কোন মাধ্যমের চেয়ে মঞ্চকেই আমি নাটকের জন্য শ্রেয় বলে মনে করি। তাই মঞ্চনাটক করি।

Print Friendly