কণ্ঠশীলনের সভাপতি সোহেল রানা, সাধারণ সম্পাদক নুরুজ্জামান নান্নু

নিজস্ব প্রতিবেদক, সাহিত্য বাজার

Sharing is caring!

২০২৬–২৮ মেয়াদে কণ্ঠশীলনের সভাপতি সোহেল রানা, সাধারণ সম্পাদক নুরুজ্জামান নান্নু

নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বাচিক চর্চা, প্রমিত উচ্চারণ ও আবৃত্তির প্রসারে চার দশকের বেশি সময় ধরে কাজ করে আসা সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান কণ্ঠশীলনের ২০২৬–২০২৮ মেয়াদের নতুন কার্যকরী পর্ষদ নির্বাচিত হয়েছে। নতুন পর্ষদের সভাপতি হয়েছেন সোহেল রানা এবং সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন আবৃত্তিশিল্পী নুরুজ্জামান নান্নু।
গত ২৮ আগস্ট ঢাকার এলিফ্যান্ট রোডে ওয়াহিদুল হক মিলনায়তনে কণ্ঠশীলনের সাধারণ সভায় এই নতুন পর্ষদ নির্বাচিত হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন বিদায়ী সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার আহমাদুল হাসান। এতে সংগঠনের প্রশিক্ষক, পর্ষদ সদস্য, সাধারণ সদস্য ও প্রাথমিক সদস্যরা অংশ নেন।
সাধারণ সভায় গত দুই বছরের কার্যক্রমের প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন বিদায়ী সাধারণ সম্পাদক লিটন বারুরী। আর্থিক প্রতিবেদন দেন কোষাধ্যক্ষ মো. আব্দুল কাইয়ুম। প্রতিবেদন দুটির ওপর সদস্যরা আলোচনা করেন। পরে সর্বসম্মতিক্রমে কার্যক্রম ও আর্থিক প্রতিবেদন গ্রহণ করা হয়।
এরপর নির্বাচন আধিকারিক বিলকিস আহমদ কণ্ঠশীলনের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী নির্বাচন পরিচালনা করেন। এতে উপদেষ্টা হিসেবে মীর বরকত, গোলাম সারোয়ার, আহমাদুল হাসান হাসনু, রইস উল ইসলাম ও মো. আব্দুর রাজ্জাক এবং ১৫ সদস্যের নতুন কার্যকরী পর্ষদ নির্বাচিত হয়।
নতুন পর্ষদে সভাপতি সোহেল রানা, সহসভাপতি সালাম খোকন, সাধারণ সম্পাদক নুরুজ্জামান নান্নু, সংগঠন সম্পাদক নিবিড় রহমান, সহসংগঠন সম্পাদক আফরিন খান, শিক্ষা ও অনুষ্ঠান সম্পাদক অনন্যা গোস্বামী, সহশিক্ষা ও অনুষ্ঠান সম্পাদক মিনহাজুল বশির শোভন, কোষাধ্যক্ষ মো. আব্দুল কাইয়ুম এবং দপ্তর সম্পাদক তানজিনা খান দায়িত্ব পেয়েছেন। সদস্য হিসেবে রয়েছেন লিটন বারুরী, ইলা রহমান, শফিক সিদ্দিকী, ড. জাহিদ হোসেন শোয়েব, পারভীন আফরোজা আইভি ও কাজী সিরাজুম মুনীরা যুঁথী।
নতুন নেতৃত্বের যাত্রা শুরু হচ্ছে কণ্ঠশীলনের ৪২ বছরের ঐতিহ্যকে সঙ্গে নিয়ে। ১৩৯১ বঙ্গাব্দের ২ বৈশাখ, ১৯৮৪ সালের ১৫ এপ্রিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রে প্রতিষ্ঠানটির যাত্রা শুরু হয়। প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন প্রখ্যাত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ওয়াহিদুল হক, বাক্‌শিল্পাচার্য নরেন বিশ্বাসসহ আরও কয়েকজন সংস্কৃতিকর্মী। তাঁদের লক্ষ্য ছিল বাংলা ভাষার শুদ্ধ ও প্রমিত উচ্চারণের চর্চা ছড়িয়ে দেওয়া এবং সাহিত্যকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটি শক্তিশালী বাচিক আন্দোলন গড়ে তোলা।
কণ্ঠশীলনের কার্যক্রম তাই শুধু আবৃত্তি শেখানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। প্রমিত উচ্চারণ, শুদ্ধ বানান, আবৃত্তি, শ্রুতিনাট্য, নাট্যচর্চা ও সাহিত্যপাঠের মধ্য দিয়ে ভাষা ও সংস্কৃতির চর্চাকে মানুষের জীবন ও সমাজের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করেছে প্রতিষ্ঠানটি। একই সঙ্গে ভাষা ও সংস্কৃতির চর্চার মধ্য দিয়ে মানুষের মানবিক গুণাবলির বিকাশ এবং অসাম্প্রদায়িক, মুক্ত ও সংস্কৃতিমনস্ক সমাজ গঠনের প্রত্যয়ও কণ্ঠশীলনের কার্যক্রমে গুরুত্ব পেয়েছে।
দীর্ঘ এই পথচলায় নিয়মিত প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করেছে কণ্ঠশীলন। প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত প্রায় আট হাজার তরুণ-তরুণী বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রাথমিক পাঠ নিয়েছেন। তাঁদের অনেকেই পরবর্তী সময়ে কণ্ঠশীলনের সঙ্গে যুক্ত থেকে আবৃত্তি, শ্রুতিনাট্য ও মঞ্চনাটকের চর্চা করছেন। দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও তাঁদের অনেকে সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন।
প্রশিক্ষণের সেই ধারাবাহিকতা এখনো চলছে। চলতি বছরের আগস্টে কণ্ঠশীলন বিদ্যায়তনে শুরু হয়েছে ১১৬তম আবর্তন। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই প্রশিক্ষণ কার্যক্রমই প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম বড় অর্জন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। প্রজন্মের পর প্রজন্মকে বাংলা ভাষার সৌন্দর্য, উচ্চারণের শুদ্ধতা ও সাহিত্য পাঠের সঙ্গে যুক্ত করার ক্ষেত্রে এর ভূমিকা রয়েছে।
কণ্ঠশীলনের ইতিহাসে ওয়াহিদুল হক ও নরেন বিশ্বাসের অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। ওয়াহিদুল হক ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও পথপ্রদর্শক। তাঁর চিন্তায় বাচিক চর্চা ছিল মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ এবং মানবিক সম্পর্ক গড়ে তোলার একটি মাধ্যম। তাঁর বহুল উচ্চারিত একটি বাক্য হচ্ছে – “কথা মানুষকে কাছে টানে, কথা মানুষকে দূরে ঠেলে দেয়। কথা মানুষকে বন্ধু করে, কথা মানুষকে শত্রু করে।’ এই দর্শন কণ্ঠশীলনের ভাষা ও বাচিক চর্চার সঙ্গে আজও গভীরভাবে যুক্ত।
সময়ের সঙ্গে ভাষার ব্যবহারেও পরিবর্তন এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ডিজিটাল কনটেন্ট ও দ্রুত বদলে যাওয়া যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে নতুন প্রজন্মের ভাষা ব্যবহারে নানা পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। এ অবস্থায় প্রমিত উচ্চারণ, শুদ্ধ বানান ও সাহিত্যভিত্তিক বাচিক চর্চাকে তরুণদের কাছে আরও আকর্ষণীয় করে তোলা কণ্ঠশীলনের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ।
একই সঙ্গে সাংস্কৃতিক পরিসরকে রাজধানীর বাইরে ছড়িয়ে দেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কণ্ঠশীলনের ভবিষ্যৎ ভাবনায় দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে কার্যক্রম বিস্তৃত করা, আবৃত্তিকে কেন্দ্র করে সাংস্কৃতিক পরিসর গড়ে তোলা, স্থায়ী বিদ্যায়তনের ব্যবস্থা, নিয়মিত মঞ্চনাটক এবং প্রশিক্ষণ- উত্তীর্ণদের নিয়ে সম্মেলনের মতো উদ্যোগের কথা রয়েছে।
সোহেল রানা ও নুরুজ্জামান নান্নুর নেতৃত্বে নতুন পর্ষদের সামনে তাই একদিকে রয়েছে কণ্ঠশীলনের দীর্ঘ ঐতিহ্য ধরে রাখার দায়িত্ব, অন্যদিকে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সংগঠনটির কার্যক্রমকে আরও বিস্তৃত করার চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের সঙ্গে যুক্ত করা, আবৃত্তির চর্চাকে আরও ছড়িয়ে দেওয়া এবং সাংস্কৃতিক সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে মানবিক ও অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধকে শক্তিশালী করা হবে তাদের গুরুত্বপূর্ণ কাজ।
চার দশকের বেশি সময়ের পথ পেরিয়ে কণ্ঠশীলন আজ শুধু একটি আবৃত্তি সংগঠনের নাম নয়; এটি বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও বাচিক সংস্কৃতির একটি দীর্ঘস্থায়ী চর্চাকেন্দ্র। নতুন নেতৃত্বের হাত ধরে সেই পথচলা আরও বিস্তৃত ও সময়োপযোগী হবে- এমন প্রত্যাশা সংগঠনটির সঙ্গে যুক্ত সংস্কৃতিকর্মী ও শুভানুধ্যায়ীদের।

Print Friendly, PDF & Email

Sharing is caring!