Sharing is caring!
আমার সংস্কৃতি’ বনাম ‘তোমার সংস্কৃতির’ নয়: চাই দেশীয় সাংস্কৃতিক জাগরণ
(সাংস্কৃতিক মন্ত্রীর সাথে বিসিসি প্রশাসকের সাক্ষাৎএ বেড়েছে নতুন সম্ভাবনা )
, বিশেষ প্রতিবেদক
জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর বদলে গেছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা। সেই পরিবর্তনের ঢেউ লেগেছে সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও। কোথাও দেশীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের চর্চার দাবি জোরালো হয়েছে, কোথাও ধর্মীয় মূল্যবোধনির্ভর সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের বিস্তার ঘটছে। আবার দীর্ঘদিনের প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক ধারার সংগঠনগুলোও নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় নিজেদের পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে। বিভাগীয় শহর বরিশালও এর ব্যতিক্রম নয়। তবে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের নতুন তৎপরতার পাশাপাশি ভিন্ন মত ও আদর্শকে ঘিরে পৃথক সাংস্কৃতিক বলয়ও তৈরি হচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে- জুলাই-পরবর্তী বরিশালে কি সত্যিই নতুন বাংলাদেশীয় সাংস্কৃতিক জাগরণ শুরু হয়েছে, নাকি সংস্কৃতির অঙ্গনেও পুরনো বন্দোবস্তের নতুন মেরুকরণ ঘটছে?
ইতিপূর্বে বরিশালের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে জাতীয় কবিতা পরিষদ, প্রগতি লেখক সংঘ ও বরিশাল সাংস্কৃতিক সংগঠন সমন্বয় পরিষদের একচেটিয়া প্রভাব ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব সংগঠনের নেতৃত্বে ছিলেন বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত ছড়াকার তপংকর চক্রবর্তী, প্রয়াত নাজমুল হোসেন আকাশ, কাজল ঘোষ, শুভঙ্কর চক্রবর্তী, স্নেহাসু বিশ্বাস, অপূর্ব গৌতম, পার্থ সারথীসহ আরো অনেকে। তাদের নেতৃত্বে বরিশালের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বাম ঘরানার চিন্তা-চেতনার প্রভাব ছিল বলে বিভিন্ন মহলের অভিযোগ। ভিন্ন মতের কাউকে অনুষ্ঠান আয়োজন করতে দেখা গেলেই তাকে ‘মৌলবাদী’ ট্যাগ দিয়ে আটকে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
এর উদাহরণ হিসেবে ২০১১ সালে দক্ষিণ বাংলা সাহিত্য সম্মেলন এবং কবি শফিক আমিন ও দখিনের কবিয়াল জাহাঙ্গীর হোসাইন মানিকের আয়োজন পণ্ড করে দেওয়ার ঘটনা উল্লেখ করা হয়। পরে ‘সাহিত্য বাজার’-এর এক প্রতিবেদনে লেখকদের মধ্যে গ্রুপিংয়ের বিষয়টি উঠে আসে। সেখানে কবি শফিক আমিন মফস্বল সাহিত্য অঙ্গনে গ্রুপিং ও সিন্ডিকেটের কারণে সৃজনশীলতা নষ্ট হওয়ার কথা বলেন। অন্যদিকে অধ্যাপক তপংকর চক্রবর্তীও সাহিত্যচর্চায় গ্রুপিং ও সহনশীলতার অভাবের সমালোচনা করে সুস্থ পরিবেশ ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানান। এই বৈষম্যের কারণেই ২০২২ সালের জুন মাসে বরিশাল সাহিত্য সংসদ এবং ২০২৩ সালের মাঝামাঝি দক্ষিণ বঙ্গ সাহিত্য পরিষদ তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে।
২৪ এর জুলাই বিপ্লবের পর বরিশালে সাংস্কৃতিক অঙ্গনের নেতৃত্ব ও তৎপরতায় পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। নতুন করে জাসাস, বরিশাল সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও দেশীয় সাংস্কৃতিক জোটকে ঘিরে একটি ঐক্যবদ্ধ সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্ম কিছুদিন সক্রিয় ছিল। বিভিন্ন আয়োজনের মধ্য দিয়ে তারা নিজেদের অবস্থান জানান দেয়। পরে রাজনৈতিক বাস্তবতার পরিবর্তনের সঙ্গে সেই ঐক্যেও বিভাজন দেখা দেয়। বিএনপি নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর জাসাস ও দেশীয় সাংস্কৃতিক জোট নিজেদের মতো করে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড চালাতে থাকে। জেলা শিল্পকলাকে কেন্দ্র করে তাদের তৎপরতা থাকলেও প্রত্যাশিত মাত্রায় প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি বলে সংশ্লিষ্টদের অনেকে মনে করেন।
অন্যদিকে বরিশাল সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নিজেদের পৃথক সাংস্কৃতিক বলয় গড়ে তুলেছে। সীমিত পরিসরে হলেও নিয়মিত আয়োজন করছে তারা। হেরারশ্মিসহ কয়েকটি সংগঠনও বিভিন্নভাবে এ ধারার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। ফলে বরিশালের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এখন রাজনৈতিক পরিচয়ঘনিষ্ঠ সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি ধর্মীয় মূল্যবোধ ও দেশীয় সংস্কৃতিনির্ভর আয়োজনের প্রবণতাও দৃশ্যমান।
বরিশাল সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের পরিচালক সাংবাদিক ও লেখক আজাদ আলাউদ্দিনের অভিযোগ, পতিত ফ্যাসিবাদের সহযোগীরা বিভিন্ন কৌশলে নিজস্ব সাংস্কৃতিক বলয় তৈরি করে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে। জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি বিষয়টি দেখেও না দেখার ভান করছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তাঁর আশঙ্কা, অতীতের মতো তারাই একদিন বর্তমান সরকারের গলা চেপে ধরবে।
বরিশাল সাহিত্য সংসদের সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা মহিউদ্দিন মানিক বীরপ্রতীক মনে করেন, সাহিত্য-সংস্কৃতির চর্চা সমাজের সুন্দর মনের মানুষদের কাজ হওয়া উচিত এবং সেখানে দল-মত নির্বিশেষে দৃষ্টিভঙ্গির জায়গা থাকা প্রয়োজন। তাঁর অভিযোগ, বিগত সময়ে সবকিছু দলীয়করণ করা হয়েছে। ভিন্নধারা বা ভিন্ন মতের মানুষকে কখনো জঙ্গি, কখনো রাজাকার ট্যাগ দিয়ে দমিয়ে রাখা হয়েছে। জুলাইয়ের পর তিনি পরিবর্তন আশা করলেও তা হয়নি বলে তাঁর দাবি। তাঁর মতে, ৮৫ ভাগ মুসলমানের দেশে সাংস্কৃতিক চর্চায় ধর্মীয় ভাবধারার প্রভাব থাকা স্বাভাবিক এবং ইসলামি সংস্কৃতির জাগরণ সমাজে নৈতিকতা বাড়িয়ে অশ্লীলতামুক্ত সাংস্কৃতিক পরিবেশ গড়ে তুলতে পারে।
জাসাস বরিশাল জেলা দক্ষিণ শাখার আহ্বায়ক এস এম সাব্বির নেওয়াজ সাগরের কাছে সাংস্কৃতিক জাগরণের প্রধান বিষয় বাংলাদেশের নিজস্ব ইতিহাস, ঐতিহ্য ও লোকসংস্কৃতিকে তুলে ধরা। তাঁর ভাষ্য, বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যে নিজস্বতা রয়েছে, তাই লোক ঐতিহ্যকে সামনে আনা জরুরি। তিনি দাবি করেন, তারা কখনো বিভাজন চাননি। তবে গত ১৭ বছর উদীচী, ছায়ানট, বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোট, জাতীয় সাংস্কৃতিক জোটসহ বিভিন্ন সংগঠনের নামে বিভাজনের রাজত্ব কায়েম করা হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, ভারতের হিন্দি সাংস্কৃতিক বলয়ের উপকরণ বাংলাদেশের ঐতিহ্য হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে।
এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিচয় নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্কও সামনে এসেছে- কোনটি নিজস্ব সংস্কৃতি, কোনটি বহিরাগত প্রভাব এবং উপমহাদেশীয় সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানকে কীভাবে দেখা হবে? এর মধ্যেই বরিশালে নতুন করে সংগঠিত হয়েছে ‘গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্য’। ফকিরবাড়ি রোডে অনুষ্ঠিত এক সভায় বীর মুক্তিযোদ্ধা ও লেখক আবদুল মান্নানের সভাপতিত্বে নয় সদস্যের বরিশাল আঞ্চলিক কমিটি গঠন করা হয়। শাহ আজিজ খোকনকে আহ্বায়ক এবং অপূর্ব গৌতমকে সদস্যসচিব করা হয়েছে। সভায় কেন্দ্রীয় কমিটির অন্যতম সদস্য কামাল হোসেন বাদল, অধ্যাপক বীরেন রায়, অধ্যাপক পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়, রাজিব রায়, লামিয়া সাইমুন, শামীম মাতুব্বর, ডা. মনীষা চক্রবর্তীসহ অনেকে বক্তব্য দেন। সভায় জোটের ঘোষণা, লক্ষ্য ও কর্মসূচির খসড়াও পাঠ করা হয়।
জাতীয় পর্যায়ে ২০২৪ সালের ১৭ আগস্ট ঢাকায় বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ৩১টি সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন মিলে ‘গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্য’ গঠন করে। পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নতুন সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা এ জোটের ঘোষিত লক্ষ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সংগ্রামী ধারা অব্যাহত রাখা, অন্যায় ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা, গ্রামীণ ও লোকসংস্কৃতির চর্চায় রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মুক্ত সাংস্কৃতিক পরিবেশ তৈরি করা। তবে এই জোটও বিতর্কের বাইরে নয়। এখানের ঐক্যবদ্ধ প্লাটফর্মে পুরাতন বন্দোবস্তের নতুন যাত্রা স্পষ্ট।
বরিশালের এই নতুন সাংস্কৃতিক তৎপরতার মধ্যেই অতীতের সাংস্কৃতিক চর্চা নিয়ে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার অভিযোগ তুলেছেন দক্ষিণবঙ্গ সাহিত্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক কবি শাহিন ভূইয়া। তাঁর অভিযোগ, প্রগতি লেখক সংঘ ও জাতীয় কবিতা পরিষদের সঙ্গে যুক্ত থাকার সময় আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মৃত্যুর পর তাঁর রুহের মাগফিরাত কামনা করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দেওয়ার কারণে কোনো নোটিশ বা আলোচনা ছাড়াই তাঁকে সংগঠনের কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। পরে বিষয়টি জানতে পেরে ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি নিজেই দক্ষিণবঙ্গ সাহিত্য পরিষদ গড়ে তোলেন বলে জানান।
তবে এ অভিযোগ নাকচ করেছেন সাবেক সভাপতি কবি গৌতম দাস। বর্তমান গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্যের বরিশালের সদস্যসচিব অপূর্ব গৌতম বলেন, তৎকালীন প্রেক্ষাপটে জাতীয় সংগঠনের নীতিমালা অনুসরণ করেই সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে; কোনো ব্যক্তির একক মতামত এখানে গুরুত্বপূর্ণ নয়। তাঁর দাবি, গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক ঐক্য গড়ে তোলার অন্যতম উদ্দেশ্য সাংস্কৃতিক চর্চার বৈষম্য দূর করা। সরকারের সাংস্কৃতিক খাতে বাজেট নেই বললেই চলে, এর বিরুদ্ধেও তাদের অবস্থান রয়েছে।
অর্থাৎ একই ঘটনার দুটি ভিন্ন ব্যাখ্যা সামনে এসেছে। শাহিন ভূইয়ার ভাষ্যে বিষয়টি ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে সাংস্কৃতিক বঞ্চনার; অপূর্ব গৌতমের ব্যাখ্যায় সেটি ছিল সাংগঠনিক নীতিমালা অনুসরণের বিষয়। এখানেই বড় প্রশ্ন- একজন শিল্পীর ধর্মীয় বিশ্বাস বা রাজনৈতিক পরিচয় কি তাঁর শিল্পচর্চার সুযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রে বিবেচ্য হবে? একই সঙ্গে একটি সাংস্কৃতিক সংগঠনের নিজস্ব ধারা, মানদণ্ড ও সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত কি রাষ্ট্রীয় চেতনার বাইরে হওয়া উচিত?
জুলাই-পরবর্তী বাস্তবতায় প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে মুক্ত ও গণতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক পরিবেশের দাবি, অন্যদিকে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মীয় মূল্যবোধকে সাংস্কৃতিক চর্চায় প্রতিফলিত করার আকাঙ্ক্ষা, দুটি প্রবণতাই এখন শক্তিশালী।
তবে এর মধ্যেই বরিশালের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির জন্য নতুন একটি প্রাতিষ্ঠানিক সম্ভাবনার কথাও সামনে এসেছে। ১২ আগস্ট বুধবার বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট বিলকিস আক্তার জাহান শিরীন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন।বরিশাল নগরীর গুরুত্বপূর্ণ শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির সংরক্ষণ, গবেষণা ও উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখার লক্ষ্যেই তাঁর এ সাক্ষাৎ। ফলে সাংস্কৃতিক অঙ্গনের দীর্ঘদিনের বিতর্কের পাশাপাশি নগরীর শিল্প-সাহিত্য- সংস্কৃতিকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সংরক্ষণ ও এগিয়ে নেওয়ার বিষয়টিও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
বরিশালে অন্তত তিন ধরনের সাংস্কৃতিক প্রবণতা এখন স্পষ্ট, ইসলামি মূল্যবোধকে কেন্দ্র করে সাংস্কৃতিক চর্চার বিস্তার, দেশীয় ইতিহাস ও লোকঐতিহ্যকে সামনে আনার উদ্যোগ এবং গণতান্ত্রিক ও প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনের নামে নতুন সাংগঠনিক ঐক্য গড়ে তোলার চেষ্টা। এর সঙ্গে যদি নগর প্রশাসনের পক্ষ থেকে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির সংরক্ষণ ও গবেষণার প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ যুক্ত হয়, তাহলে এই বহুমাত্রিকতাই বরিশালের বড় শক্তিতে পরিণত হতে পারে।
কারণ সংস্কৃতি কোনো একক রাজনৈতিক দল বা মতাদর্শের সম্পত্তি নয়। বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে যেমন ইসলামি ঐতিহ্য ও মূল্যবোধ রয়েছে, তেমনি রয়েছে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য, লোকসংগীত, জারি-সারি, পালাগান, কবিতা, নাটক, আধুনিক সংগীত, আঞ্চলিক ঐতিহ্য এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নিজস্ব সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার। এগুলো পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী না হয়ে বৃহত্তর বাংলাদেশীয় সাংস্কৃতিক পরিচয়ের বিভিন্ন স্তর হতে পারে।
এই জায়গাটিই জুলাই-পরবর্তী বরিশালের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। জেলা শিল্পকলা একাডেমির মতো সরকারি প্রতিষ্ঠানে কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বা মতাদর্শিক বলয়ের নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ধারার সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের সুযোগ থাকা প্রয়োজন। কে কোন রাজনৈতিক দলের সমর্থক কিংবা কোন ধর্মীয় বিশ্বাসে বিশ্বাসী, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত শিল্পের মান, সৃজনশীলতা, আইন মেনে চলা এবং অন্যের সাংস্কৃতিক অধিকারকে সম্মান করা।জুলাইয়ের পর বরিশালে সাংস্কৃতিক তৎপরতা বাড়ছে, এতে নতুন সম্ভাবনাও রয়েছে। স্থানীয় ইতিহাস, লোকঐতিহ্য, তরুণদের সৃজনশীলতা, ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং আধুনিক সাংস্কৃতিক চর্চাকে পাশাপাশি জায়গা দেওয়া গেলে বরিশাল হয়ে উঠতে পারে বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণের উদাহরণ। কিন্তু সেই সম্ভাবনা নষ্ট হবে যদি ‘আমার সংস্কৃতি’ বনাম ‘তোমার সংস্কৃতি’ দ্বন্দ্বই প্রধান হয়ে ওঠে। তাই প্রতিযোগিতা হওয়া উচিত কে বেশি প্রভাব বিস্তার করল- তা নয়; বরং কে বেশি নতুন শিল্পী তৈরি করতে পারল, কে হারিয়ে যাওয়া লোকঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে পারল, কে তরুণদের সাংস্কৃতিক চর্চায় যুক্ত করতে পারল এবং কে ভিন্নমতের শিল্পীকেও নিজের পাশে দাঁড়ানোর জায়গা দিতে পারল।
জুলাই-পরবর্তী বরিশালের সামনে এখন তাই দ্বিমুখী সম্ভাবনা, সাংস্কৃতিক মেরুকরণ, অথবা সাংস্কৃতিক সহাবস্থান ও পুনর্জাগরণ। আর বিলকিস আক্তার জাহান শিরীনের সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীর সঙ্গে সাম্প্রতিক সাক্ষাৎ যদি নগরীর শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির সংরক্ষণ, গবেষণা ও উন্নয়নে কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে রূপ নেয়, তবে সেটিই হয়তো পুরনো বিভাজন পেরিয়ে বরিশালের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে।
Sharing is caring!








