কোমরে আজও ব্যথা, তবু স্বপ্নে বাংলাদেশ: কুরপাড়ের ‘জুলাই কন্যা’ মিতু
বিশেষ প্রতিবেদক
কোমরের ব্যথাটা এখন আর শুধু ব্যথা নয়। সেটি যেন সোমাইয়া আক্তার মিতুর জীবনের সঙ্গে মিশে যাওয়া এক দীর্ঘ স্মৃতি। যে তরুণী একদিন নিজের পায়ে হেঁটে রাজপথে দাঁড়িয়েছিলেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলেছিলেন, মানুষের জন্য কাজ করার স্বপ্ন দেখেছিলেন- আজ তাঁকে হাঁটতে হয় কখনো হুইলচেয়ারে, কখনো পরিবারের কারও হাত ধরে। অথচ তাঁর চোখে এখনো স্বপ্ন আছে। কণ্ঠে এখনো প্রশ্ন আছে। আর আছে সেই অসমাপ্ত আকাঙ্ক্ষা- একটি বৈষম্যহীন, মানবিক বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন।
নেত্রকোনার কুরপাড়ের এই তরুণীর গল্প তাই শুধু আহত এক জুলাই জুলাই যোদ্ধার গল্প নয়। এটি এমন এক প্রজন্মের গল্প, যারা মনে করেছিল দেশ মানে কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়; মানুষের জীবনেও পরিবর্তন আসতে হবে।
মিতুর স্বাভাবিক জীবনটা বদলে যায় ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট। কুরপাড় এলাকায় আন্দোলনে অংশ নিতে গিয়ে আহত হন তিনি। আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার মধ্যে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য একটি দোকানে ছুটে যাওয়ার সময় শাটারের লোহার আঘাত লাগে তাঁর কোমর ও মুখের চোয়ালে- মিতুর ভাষ্য এমনই। এরপর শুরু হয় দীর্ঘ চিকিৎসা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা আর অপেক্ষার জীবন।
একসময় যে তরুণী মানুষের সেবার স্বপ্নে নার্সিং পেশায় প্রবেশ করেছিলেন, তাঁর চলার পথই এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষার জায়গা। শৈশবে মিতুর স্বপ্ন ছিল চিকিৎসক হওয়ার। কিন্তু পিতৃহীন বড় পরিবারের বাস্তবতায় সেই স্বপ্ন পূরণের সুযোগ হয়নি। পরে ২০২১ সালে সরকারি নার্সিং ইনস্টিটিউটে সুযোগ পেয়ে ডিপ্লোমা ইন নার্সিং সায়েন্স অ্যান্ড মিডওয়াইফারি সম্পন্ন করেন। চিকিৎসক হতে না পারলেও মানুষের সেবা করার স্বপ্নটি তখনও অটুট ছিল। নার্সিং পেশায় যুক্ত হয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু জুলাই তাঁর জীবনের গল্পে অন্য এক অধ্যায় লিখে দেয়।
আন্দোলনের শুরুতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদী লেখালেখি করতেন মিতু। আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা, নিহত ও আহত তরুণদের খবর এবং রক্তাক্ত ছবিগুলো তাঁকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দেয়। বিশেষ করে আবু সাঈদ ও ওয়াসিম আকরামের মৃত্যুর পর নিজেকে আর ঘরে আটকে রাখতে পারেননি। তাঁর ভাষায়, ‘রক্তাক্ত শহীদ ও আহত ভাইবোনদের চেহারা দেখে নিজেকে সামলাতে পারিনি।’
তারপর ফেসবুকের প্রতিবাদী লেখা থেকে রাজপথে। একজন নার্সিং শিক্ষার্থী ধীরে ধীরে হয়ে উঠলেন একজন প্রতিবাদী তরুণী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তাঁর কাছে হয়ে উঠল আরেকটি রাজপথ। রাজপথে যেমন বাধা এসেছে, তেমনি এসেছে হুমকিও।
মিতুর ভাষ্য অনুযায়ী, আন্দোলনের সময় তাঁকে হেনস্তার মুখে পড়তে হয়েছিল। পরিবারের পক্ষ থেকেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। তাঁকে ও তাঁর বড় বোনকে বিভিন্ন জায়গা থেকে হুমকি দেওয়া হয়েছিল এবং আন্দোলন সংক্রান্ত পোস্ট না দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া হয়েছিল। পরে পরিবারের সদস্যরা তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, ‘তুমি সবার মতো ন্যায্য প্রতিবাদ চালিয়ে যাও।’ সেই কথাই হয়ে উঠেছিল তাঁর সাহসের বড় উৎস।
মিতুর পাশে সবচেয়ে শক্তভাবে ছিলেন তাঁর বড় বোন কবি, লেখক ও উন্নয়নকর্মী তহুরা আক্তার। মিতুর ভাষায়, আপু শুধু বড় বোন নন, তাঁর সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। সিদ্ধান্তের দ্বিধায় সাহস দেওয়া থেকে শুরু করে বিপদের সময়ে পাশে থাকা- জুলাইয়ের কঠিন দিনগুলোতে তহুরা তাঁকে একা হতে দেননি।
তহুরার স্বামী কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক স্বাধীন চৌধুরীর কাছ থেকেও মুক্তচিন্তা, বিবেক, নৈতিকতা ও মানুষের পাশে দাঁড়ানোর শিক্ষা পেয়েছেন বলে জানান মিতু। তাঁর নিজের ভাষায়, কোনো বিষয়ে অন্ধভাবে বিশ্বাস না করে প্রশ্ন করতে এবং নিজের বিবেক দিয়ে ভাবতে তিনি উৎসাহ পেয়েছেন।
৪ আগস্টের আঘাতের পর শরীর যেন ধীরে ধীরে তাঁর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে। প্রথমে ব্যথা, তারপর হাঁটতে সমস্যা। একসময় স্বাভাবিক চলাফেরার সক্ষমতা কমে আসে। যে তরুণী রাজপথে হেঁটেছেন, মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন, আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন- তাঁর চলার গতি আটকে যায় হুইলচেয়ারে।
পরিবারের হিসাবে, এ পর্যন্ত চিকিৎসায় প্রায় ছয় লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। চিকিৎসা এখনো চলছে। মিতুর থ্যালাসেমিয়া মাইনর রয়েছে বলে পরিবার জানিয়েছে। পাশাপাশি কোমরের পিএলআইডি এবং মুখের চোয়ালের জয়েন্টের সমস্যার কারণেও দীর্ঘ চিকিৎসার প্রয়োজন হচ্ছে।
তবু আশ্চর্য, মিতুর সবচেয়ে বড় অভিযোগ নিজের শরীর নিয়ে নয়।
তাঁর প্রশ্ন- ৫ আগস্টের পর যে বাংলাদেশ তৈরি হওয়ার কথা ছিল, এটি কি সত্যিই সেই বাংলাদেশ? এই বাংলাদেশের জন্য কি তারা রাজপথে নেমেছিলেন?
মিতুর অভিযোগ, আন্দোলনের পর ভুয়া পরিচয়ে নিজেদের ‘জুলাই যোদ্ধা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা, কৃতিত্ব নেওয়ার প্রবণতা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন ধরনের হেনস্তা শুরু হয়েছে। ভুয়া আইডি থেকে গালিগালাজ, অপমানজনক মন্তব্য ও হুমকির কথাও বলেছেন তিনি। তাঁর প্রশ্ন, ‘৫ আগস্টের পরের বাংলাদেশ তো আমরা এমন চাইনি, যেখানে নারীদের নিরাপত্তা কমতে শুরু করবে?’
এই প্রশ্নে মিতুর ব্যক্তিগত কষ্টের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে একটি দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ।
তিনি নিজের জুলাইয়ের পরিচয়কে কখনো ব্যক্তিগত সুবিধা নেওয়ার পুঁজি করতে চাননি বলেও জানিয়েছেন। আহত হওয়ার পরও সামাজিক কাজে যুক্ত ছিলেন, কিন্তু নিজের আঘাতের কথা প্রচার করে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেননি। দীর্ঘদিন চিকিৎসা চললেও অনেকটা নীরবই ছিলেন।
সম্প্রতি চিকিৎসা ও নিরাপত্তা নিয়ে তাঁর জীবনে নতুন আশার একটি দরজা খুলেছে বলে জানান মিতু। জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবসের একটি অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর কথা হয়। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী তাঁর শারীরিক অবস্থার খোঁজ নেন এবং চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে সহযোগিতার আশ্বাস দেন। উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন হলে দেশের বাইরে পাঠানোর কথাও বলা হয় বলে জানান তিনি।
কিন্তু সেখানে মিতু শুধু নিজের চিকিৎসার কথা বলেননি। বলেছেন নারী নিরাপত্তার কথা। বলেছেন খেটে খাওয়া মানুষের খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থানের নিশ্চয়তার কথা।
তাঁর ভাষায়, ‘আমি একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে, একজন নারী হিসেবে আমাদের নিরাপত্তা আগে চাই। আর চাই একজন খেটে খাওয়া দিনমজুরের খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থানের নিশ্চয়তাটুকু।’
এই জায়গাটিই হয়তো মিতুকে আলাদা করে।
তিনি কোনো দলের জন্য বাংলাদেশ চান না। কোনো ব্যক্তির জন্যও নয়। তাঁর কাছে জুলাইয়ের অর্থ- মানুষের পক্ষে দাঁড়ানো। তাঁর ভাষ্য স্পষ্ট- ক্ষমতার কাছে নয়, নিজের বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ থাকাটাই তাঁর কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তাই শরীরের ভেতর যুদ্ধ চললেও তাঁর স্বপ্নের ভেতর কোনো পরাজয় নেই।
তিনি আবার হাঁটতে চান। নিজের পায়ে দাঁড়াতে চান। চাকরি করতে চান। উচ্চশিক্ষা নিতে চান। মানুষের জন্য কাজ করতে চান। বিশেষ করে পিছিয়ে পড়া নারীদের জন্য কিছু করার ইচ্ছা তার প্রবল।
মিতুর কাছে উন্নয়ন মানে শুধু বড় সেতু, প্রশস্ত সড়ক কিংবা উঁচু ভবন নয়। একজন শ্রমিক নিরাপদে কাজে ফিরতে পারছেন কি না, একজন নারী রাতে নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারছেন কি না, একজন দরিদ্র মানুষ চিকিৎসা পাচ্ছেন কি না—এসবও তাঁর কাছে উন্নয়নের মাপকাঠি।
তাঁর স্বপ্নের বাংলাদেশে মানুষ হবে আগে, ক্ষমতা পরে।
হয়তো এ কারণেই তাকে শুধু ‘জুলাই যোদ্ধা’ পরিচয়ে বোঝা যায় না। তিনি একজন তরুণী, একজন নার্সিং পেশায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখা মানুষ, একজন প্রতিবাদী নাগরিক, একজন আহত আন্দোলন- অংশগ্রহণকারী এবং একজন স্বপ্নবান বাংলাদেশি।
তাঁকে নতুন প্রজন্মের ‘প্রীতিলতা-কন্যা’ বলা যায় কি না- সে তুলনা নিয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে। প্রীতিলতার সময়, সংগ্রাম ও বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। মিতুর হাতে অস্ত্র নয়, ছিল স্মার্টফোন; তাঁর প্রতিবাদের ভাষা ছিল লেখা, প্রশ্ন ও রাজপথে দাঁড়ানো। কিন্তু অন্যায়ের সামনে নীরব না থাকার জায়গায় একটি প্রতীকী মিল খুঁজে পাওয়া যায়।
আজ কুরপাড়ের সেই তরুণীর কোমরে ব্যথা। হাঁটতে গেলে হুইলচেয়ার লাগে। চিকিৎসার খরচ পরিবারকে চাপে ফেলছে। সামনে অনিশ্চয়তা আছে।
তবু তাঁর স্বপ্ন থেমে নেই। তিনি অপেক্ষা করছেন- আবার হাঁটার জন্য, স্বাভাবিক জীবনে ফেরার জন্য, চাকরি ও উচ্চশিক্ষার জন্য। কিন্তু সবচেয়ে বেশি অপেক্ষা করছেন সেই বাংলাদেশের জন্য, যে বাংলাদেশের স্বপ্নে তিনি একদিন রাজপথে নেমেছিলেন।
যে বাংলাদেশে একজন নারী ভয় ছাড়াই কথা বলতে পারবেন।
যে বাংলাদেশে প্রতিবাদ মানেই হুমকি নয়।
যে বাংলাদেশে সাধারণ মানুষের অধিকার কোনো অনুগ্রহ নয়, রাষ্ট্রের দায়িত্ব হবে।
যে বাংলাদেশে বৈষম্যের বদলে থাকবে ন্যায়, ক্ষমতার বদলে থাকবে মানুষের মর্যাদা।
মিতু বলেছেন, ‘যে বৈষম্যহীন মানবিক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলাম, তা হয়ে ওঠেনি। অপেক্ষায় আছি সেই বাংলাদেশের।’ এই অপেক্ষাই এখন তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয়।
কুরপাড়ের সেই তরুণী জানেন, শরীর মানুষকে থামিয়ে দিতে পারে। একটি আঘাত কেড়ে নিতে পারে স্বাভাবিক হাঁটার ক্ষমতা। দীর্ঘ চিকিৎসা কেড়ে নিতে পারে জীবনের অনেকটা সময়।
কিন্তু একটি স্বপ্নকে থামিয়ে দেওয়া এত সহজ নয়।
তাই আগুনের সেই দিন পেরিয়ে গেলেও মিতুর চোখে আগুন এখনো জ্বলছে- কোনো প্রতিশোধের আগুন নয়, একটি বৈষম্যহীন, মানবিক বাংলাদেশ গড়া স্বপ্নের আগুন।
আর সেই কারণেই তাঁর গল্পের শেষ এখনো লেখা হয়নি।







