‘কিছুই বদলায়নি’- মির্জা ফখরুলের আক্ষেপের প্রতিচ্ছবি যেন মিরপুরের শিশুদের পাঠশালায়
দুই বছরেও সরেনি ভাগাড়, শিশুদের আকুতি – ‘আঙ্কেল, ‘আঙ্কেল, আমাদের স্কুলের সামনে থেকে এই ভাগাড়টা সরিয়ে দিন না..’
বিশেষ প্রতিবেদক

দুই বছরেও সরেনি ভাগাড়, শিশুদের আকুতি – ‘আঙ্কেল, ‘আঙ্কেল, আমাদের স্কুলের সামনে থেকে এই ভাগাড়টা সরিয়ে দিন না..’
“আমি দেখছি যে কিছুই বদলায়নি। আমি পরিবর্তন দেখছি একজন মানুষের মধ্যে, তিনি তারেক রহমান।” জুলাই বিপ্লবের দুবছর উদযাপন সময়ে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের এই বক্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে যেমন আলোচনা তৈরি করেছে, তেমনি ৪ আগস্ট সকালে রাজধানীর মিরপুর-১০-এর সেনপাড়া পর্বতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে দাঁড়ালে সেই আক্ষেপের বাস্তব প্রতিফলনই যেন চোখে পড়ে।
ক্যামেরা হাতে সংবাদ সংগ্রহ করতে যেতেই বিদ্যালয়ের কয়েকজন কোমলমতি শিক্ষার্থী দৌড়ে এসে ঘিরে ধরে এক নিঃশ্বাসে বলে ওঠে, “আঙ্কেল… আঙ্কেল… আমাদের স্কুলের সামনে থেকে এই ভাগাড়টা সরিয়ে দিন না।”
কোনো রাজনৈতিক ভাষণ নয়, কোনো শিখিয়ে দেওয়া কথা নয়, শিশুদের এই সরল আবেদনই যেন বলে দেয়, পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা তাদের কাছে একটি পরিচ্ছন্ন ও নিরাপদ স্কুলপথ।
দুই বছর আগে যে চিত্র দেখে মন ভারাক্রান্ত হয়েছিল, জুলাই অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তির প্রাক্কালেও সেই দৃশ্যের তেমন কোনো পরিবর্তন চোখে পড়েনি। বিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনেই এখনো স্তূপ করে ফেলা হচ্ছে আশপাশের এলাকা ও বাজারের বর্জ্য। দুর্গন্ধ, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা আবর্জনা আর দখল হয়ে যাওয়া সড়কের মাঝ দিয়েই প্রতিদিন বিদ্যালয়ে যাতায়াত করছে শত শত শিক্ষার্থী।
সরেজমিনে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের দেয়ালঘেঁষে বর্জ্য ফেলা হচ্ছে। নির্ধারিত কোনো ডাস্টবিন নেই। বরং বিদ্যালয়ের প্রবেশপথ ঘেঁষেই উন্মুক্তভাবে ময়লা ফেলে দখল করা হয়েছে সড়কের একটি বড় অংশ। একই জায়গায় ভাসমান হকারদের অবস্থান, রিকশার সারি এবং পথচারীদের চলাচলের বিশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তুলেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, হকার ও রিকশাচালকদের কেউ কেউ শিশুদের সামনেই প্রকাশ্যে প্রস্রাব করেন। দুর্গন্ধে কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থাকাও কষ্টকর হলেও এই পথ দিয়েই প্রতিদিন বিদ্যালয়ে আসে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। ভাসমান খাবার বিক্রেতার কাছ থেকে খাবার কিনে এই ময়লার স্তূপের পাশে দাঁড়িয়ে তা খাচ্ছে ওরা।
এমন পরিবেশ নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের ক্ষোভ নতুন নয়। দুই বছর আগেও একই সমস্যা নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতির কোনো কার্যকর পরিবর্তন হয়নি। বরং বাজারের বর্জ্য, ফুটপাত দখল এবং অব্যবস্থাপনার কারণে এলাকাটি আরও অস্বাস্থ্যকর ও চলাচলের অনুপযোগী হয়ে উঠেছে।
বর্তমানে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন। বিষয়টি জানতে তার কার্যালয়ে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। পরে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের কল সেন্টারের পরামর্শে ৩ নম্বর ওয়ার্ড প্রশাসক বেনজির আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, এই সমস্যা সমাধানে প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন নিজেই এলাকায় এসে স্থানীয়দের সহযোগিতা চেয়েছিলেন। কিন্তু ভাসমান হকারদের উচ্ছেদে সহযোগিতা না পাওয়ায় স্থায়ী সমাধান সম্ভব হয়নি।
বেনজির আহমেদ বলেন, “এখানে হকারদের রাজত্ব। হকারদের উচ্ছেদ করা না গেলে এটি সরানোও অসম্ভব। এজন্য এলাকাবাসীর সহযোগিতা প্রয়োজন। মানুষ অভিযোগ করেন, কিন্তু উচ্ছেদ অভিযানে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পাওয়া যায় না।”
ওয়ার্ড প্রশাসকের এই বক্তব্য কার্যত স্বীকার করে যে, বিদ্যালয়ের সামনে দীর্ঘদিন ধরে চলা এই অস্বাস্থ্যকর পরিস্থিতির অন্যতম কারণ অবৈধ হকারদের দখল। স্থানীয়দের দাবি, মিরপুর-১০ গোলচত্বর, হোপের গলি থেকে মাজার রোডের বিস্তীর্ণ অংশ দীর্ঘদিন ধরেই ভাসমান হকারদের নিয়ন্ত্রণে। বিএনপি ও এনসিপি নেতারা ভাগাভাগি করে নিয়ন্ত্রণ করে এই হকারদের। ফলে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা এবং স্থায়ীভাবে বর্জ্য অপসারণ – দুই কাজই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
এদিকে এই এলাকাটি ঢাকা-১৬ আসনের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত। স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রশ্ন, রাজধানীর একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনে বছরের পর বছর ধরে কীভাবে একটি উন্মুক্ত ভাগাড় বহাল থাকে? শিশুদের স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করা কি সংশ্লিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠানের অগ্রাধিকার নয়?
মীরপুরের একজন যুবদল নেতা সিটেনসহ স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা বিদ্যালয়ের সামনে থেকে দ্রুত বর্জ্য অপসারণ, বিকল্প স্থানে বর্জ্য ফেলার ব্যবস্থা, নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা এবং অবৈধ হকার উচ্ছেদের দাবি জানিয়েছেন। তাদের ভাষ্য, বিদ্যালয়ের সামনে ভাগাড় রেখে আধুনিক, পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য নগর গড়ার দাবি বিশ্বাসযোগ্য হতে পারে না।
জুলাইয়ের পরিবর্তনের দুই বছর পূর্ণ হলো। বদলেছে সরকার, বদলেছে জনপ্রতিনিধি, বদলেছে প্রশাসন। কিন্তু সেনপাড়া পর্বতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের আবেদন বদলায়নি। তারা এখনো ক্যামেরা দেখলেই ছুটে এসে বলে – “আঙ্কেল, আমাদের স্কুলের সামনে থেকে এই ভাগাড়টা সরিয়ে দিন না।” রাজধানীর বুকে এই ছোট্ট আবেদনটি শুধু কয়েকজন শিশুর নয়; এটি একটি নগরের বিবেকের কাছেও উচ্চারিত এক নীরব প্রশ্ন।







