জীবনের স্ন্যাপশট-কলকাতার বই মেলায় একদিন : আদনান সৈয়দ

সাহিত্য বাজার

77জীবনের স্ন্যাপশট: কলকাতার বই মেলায় একদিন

আদনান সৈয়দ

শুনতে পাই, ভৌগলিক দিক বিবেচনা করে বাঙালিকে নাকি তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে। ১. বাংলাদেশের বাঙালি। ২.পশ্চিম বঙ্গ তথা ভারতের বাঙালি। আর ৩. বহির্বিশ্বের বাঙালি। আগেই বলে রাখি বহির্বিশ্বের বাঙালি বলতে যা বুঝায় আমি হলাম সেই কিসিমের এক প্রজাতি। জীবনের প্রয়োজনে, জীবিকার তাগিদে এই অধমের আপাতত আস্তানা ফিরিঙিদের শহর নিউইয়র্কে। কিন্তু আর সব প্রবাসী বাঙালির মতই দেহটা বিদেশের মাটিতে থাকলেও মন-প্রাণ কিন্তু সবটুকুই গেথে বসে আছে প্রিয় মাতৃভূমী বাংলাদেশের সবুজ আঁচলে। বছরের পাওনা ছুটিতো বটেই আরো কয়েক সপ্তাহ কুড়িয়ে বাড়িয়ে প্রতি বছরই মাস দুয়েকের জন্য বাংলাদেশ ভ্রমনে আসা হয় এই বই মেলাকে উপলক্ষ্য করে। বই মেলা! আহা! শব্দ দুটোতে নিঃসন্দেহে যাদু আছে!! তা নইলে এই বই মেলায় এত নেশা ধরবে কেন? সন্দেহ নেই বাংলাদেশে প্রতি বছর এই যে ফেব্রুয়ারীর বই মেলা উদ্যাপিত হয় তা  যেন পৃথিবীর যেকোন মহৎ শিল্প-সংস্কৃতিকে ঘিরে বড় বড় উৎসবকেও অবলীলায় হার মানিয়ে দেয়। এই অমর একুশকে সামনে রেখে আমাদের বাংলা একাডেমির বই মেলার প্রাঙ্গনে পাঠক-লেখক-প্রকাশক এর যে একটা আত্ত্বিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে এর তুলনা বাঙালির অন্য কোন পার্বনের সাথে কী চলে? যেখানেই বাঙালি সেখানেই বই মেলার পাখা গজাবে এটা কিন্তু এখন বাঙালির স্বাভাবিক আবদার। তাইতো দেখি বই মেলার এই ব্যাপ্তি ছড়িয়ে পড়েছে বাংলাদেশের ছোট্ট উঠোন পেরিয়ে লন্ডন, আমেরিকার ফিরিঙ্গিদের পাড়া অব্দি। বাংলাদেশে ফেব্রুয়ারীর  বইমেলার আমেজ শেষ হতে না হতেই শুরু হল কলকাতার বই মেলা। ভাবলাম হাতে ছুটির সময় আছে আরে মাস দেড়েক। এদিকে কলকাতার জনপ্রিয় লিটল ম্যাগ এর সম্পাদক কাজল চক্রবর্তী (আমাদের প্রিয় কাজল’দা )আমার এই ইচ্ছার আগুনে যেন আরো খানিকটা ঘি ঢেলে দিলেন। এর ফলাফলটা যা দাঁড়লো তাহল মোটামুটি এই যে মার্চের সাত তারিখ সন্ধায় কলকাতা আর আট তারিখ সোজা কাজল দা’র সল্ট লেক অ্যাপার্টমেন্টে মাছের মুড়ি ঘন্ট উদরস্থ করে বিকেল তিনটেয় বই মেলায় হাজির হয়ে যাওয়া। এখানে কাজল দা সম্পর্কে দুটো কথা বলার লোভ সামলানো কঠিন। কাজল দার জন্ম কলকাতায় কিন্তু তিনি পূর্ব বঙ্গের উত্তরসুরি। তবে কথায়, চলনে, বলনে কে বলবে কাজল চক্রবর্তী একজন কলকাতার বাসিন্দা? আমাকে ফোনে বার বার তারা দিচ্ছেন আর বলছেন” কি মিয়া, এত দেরি ক্যান? শোন, টেক্সিওয়ালা যদি বুঝে যে তুমি বাংলাদেশের তাইলে কিন্তু তোমার খবর আছে। তোমার টেক্সির মিটার তিন ডবল অইয়া যাইবো। সাবধান, ওইডা বুঝবার দিয়ো না।” কাজল ’দাকে যতই বলছি যে কোন অসুবিধা হবে না আপনি মোটেও ভাববেন না ততই তিনি যেন আমাকে নিয়ে আরো চিন্তিত হয়ে যাচ্ছিলেন। শেষমেস আমার ওপর ভরসা না রেখে তিনি সোজা বললেন, ” টেক্সি ড্রাইভারকে একটু ফোনটা দাওতো, কথা বলি” কিছুক্ষন গুজুর-গাজুর করে টেক্সিওয়ালাকে কি যেন বুঝিয়ে দিলেন আর আমাদের শ্রীমান ড্রাইভারটিও মাথা ঝাকিয়ে ”ঠিক আচে, কোন অছুবিদা নেই” বলে ফোন রাখলেন। এই হল আমাদের কাজল দা। মাথা থেকে পা পর্যন্ত একজন নিরেট কবি। অনেকটা গাটের পয়সা খরচ করে ত্রৈমাসিক লিটল ম্যাগাজিন ”সাংস্কৃতিক খবর” বের করেন। কলকাতার এবং ঢাকার নতুন-পুরানো কবিদের চিন্তার ফসল নিয়েই কাজল ’দা তার সাংস্কৃতিক খবরের তরী ভাসিয়েছেন।

কলকাতার বইমেলা আর বাংলাদেশের বই মেলার মধ্যে কি কোন পার্থক্য আছে?

হ্যাঁ, কিছুটাতো আছে বটেই। কিছু কিছু বিষয়ে বাংলাদেশের বইমেলা আমার কাছে কলকাতার বইমেলার চেয়ে অনেক বেশি প্রাণবন্ত মনে হয়েছে। আবার এমন অনেক বিষয় আছে যেখানে আমরা কলকাতার বই মেলার সুন্দর সুবিন্যস্ত ব্যবস্থাপনা থেকে শিক্ষা নিতে পারি। বাংলাদেশে বইমেলায় বটমূলে রাস্তায়, ফুটপাথে ফেরিওয়ালাদের চিৎকার চেঁচামেচি, বাতাসে ফুচকার ঘ্রান, ছোট ছোট শিশু-কিশোর,তরুন-তরুনী থেকে শুরু করে বয়স্করা পর্যন্ত গালে বাংলাদেশের লাল সবুজের পতাকা অথবা প্রাণের শহীদ মিনার আঁকিয়ে নেওয়ার জন্য লাইনে দাড়িয়ে থাকার নির্মল আনন্দ এসব কিছুই বাংলাদেশের বই মেলার স্বর্গীয় উপাদান। অন্যদিকে কলকাতার বইমেলা এ রস থেকে বঞ্চিত। অবশ্য এর জন্য আমাদের ২১ ফেব্রুয়ারীর স্পিরিট নিঃসন্দেহে এক বাড়তি পাওনা। অন্যদিকে বাংলাদেশের বইমেলায় লিটল ম্যাগ এর জন্য নির্ধারিত ছোট্ট পরিসরে যে কর্ণারটি  দেওয়া হয় তা কলকাতার বইমেলার কাছে রীতিমত নস্যি। বাংলাদেশের লিটল ম্যাগ এর স্টলগুলো কে যেমন ভাবে সংখ্যালঘু হিসেবে হেয় করা হয় সেদিক থেকে কলকাতার বই মেলায় লিটল ম্যাগের আধিক্যটা বেশ চোখে পরে। আরেকটা বিষয় না ছুঁয়ে গেলেই নয়। কলকাতার প্রতিটি বই এর স্টলে দর্শক সুবিধার্থে রয়েছে প্রবেশ এবং বহির্গমন এর সুব্যবস্থা। দর্শকরা লাইনে দাঁড়িয়ে বই এর দোকান গুলোতে একপথে ঢুকছেন আবার আরেক পথে বেড় হয়ে আসছেন।  তাতে করে বাড়তি কোন জট যেমন লাগছে না পাশাপাশি বই প্রেমিকরাও তাদের প্রিয় বইটি স্টল থেকে ঠিক খুজে বেড় করতে সমর্থ হচ্ছেন। বাংলা একাডেমির বই মেলার উদ্যোক্তাগণ এ বিষয়টি নিয়ে যদি একটু ভাবেন তাহলে যে বড় রকমের একটা সমস্যার সমাধান হবে এটা নিশ্চিত করে বলা যায়।

imagesএবার লেখকদের নিয়ে চারটে কথা। বই এর পাশাপাশি বইমেলার অন্যতম আকর্ষন লেখকদের সাথে পাঠকের আলাপ-চারিতা, লেখকদের অটেগ্রাফ নেওয়া, লেখকদের সাথে পাঠকদের একটা সখ্যতা তৈরি হওয়া। কিন্তু প্রশ্ন হল আমাদের বাংলা একাডেমির বই মেলার প্রাঙ্গনে কজন পাঠক তাদের প্রিয় লেখকদের গা ছুইয়ে দেখার সুযোগটা পাচ্ছেন? বরং খুব হৃদয়হীনভাবে আমাদের এর বিপরীত দৃশ্যটিই যেন দেখতে হয়। লক্ষ্য করা গেছে যে একজন লেখক একটু জনপ্রিয় হয়ে উঠলেই তিনি যেন ধরাকে সরা জ্ঞান ভাবতে শুরু করেন। অনেক জনপ্রিয় লেখকদের বই মেলার চত্বরে এমনভাবে হাঁটতে দেখা যায় তাতে মনে হয় ভক্তরা তাদের ছুঁলে যেন নির্ঘাত জাত চলে যাবে। বিশ্বাস করেন কলকাতার বই মেলায় এরকম কোন দৃশ্য অন্তত চোখে পড়েনি। হাসিমুখে নির্বাকভাবে হেঁটে যাচ্ছিলেন বিখ্যাত লেখক সৈয়দ আজিজুল হক। সাংস্কৃতিক খবরের স্টলের সামনে দিয়ে হেঁটে যেতেই কে যেন হাঁক দিল, ” একটু বসে যান”। আর কি। সেখানেই ধপাস করে বসে পরা আর চায়ের  চুমুকের তালে তালে সাহিত্য আড্ডায় নিমজ্জিত হওয়া। এরকমটা হয়েছে সুবোধ সরকার, মল্লিকা সেনগুপ্ত, সৈয়দ হাসমত জালাল, গৌতম দাশগুপ্ত, ঈশিতা ভাদুড়ী, জয় গোস্বামী সহ অনেক জনপ্রিয় লেখকদের বেলাতেই। তাই বলছিলাম, আমাদের লেখকরা হলেন আমাদের ভক্ত হৃদয়ের এক চিলতে ভালোবাসা। আমাদের অহংকার। কিন্তু ভালোবাসার এই দায়তো তাদেরকেই রক্ষা করতে হবে। নাকি?

সেদিন বই মেলায় পৌছতে পৌঁছতে বিকেল প্রায় চারটা বেজে গেলে। কলকাতার বই মেলার এদিক থেকে ওদিক থেকে আকাশ বাতাস বিদীর্ন করে বার বার ঘোষিকার নরম তুলতুলে কণ্ঠস্বর কানে এসে ধাক্কা খাচ্ছে। আজ বাংলাদেশ দিবস। এই বাংলাদেশ দিবস উপলক্ষে কাজল দা’র সাংস্কৃতিক খবর পথের পাঁচালি চত্বরে ফটাফট আয়োজন করে ফেলেন দুবাংলার ভালোবাসার কবিতা নিয়ে এক অপূর্ব কবিতা সন্ধ্যা ”ওপারে যে বাংলাদেশ, এপারেও সেই বাংলা”। কবিতা সন্ধ্যাকে সামনে রেখে কাজল চক্রবর্তীর তোরজোর যেন একটু বেড়ে গেল। নতুন-পুরাতন সব কবিদের কেই তাড়া দিলেন ’কবিতা যেন ঠিক সময় মত তৈরি থাকে’। একজন বাংলাদেশের বাঙালি হিশেবে গোটা বিষয়টাই খুব ভালো লাগছিল। সন্ধ্যে সাতটা ছুঁই ছুঁই। একে একে গঙ্গা আর পদ্মা পাড়ের বাঙালিরা জড়ো হতে লাগলেন পথের পাঁচালি চত্বরে। কাজল চক্রবর্তীর অনবদ্য উপস্থাপনায় সংগীত, কবিতা আর স্মৃতিচারনে নিমিষেই পথের পাঁচালির ছোট্ট চত্তরটি যেন এক চিলতে বাংলাদেশ হয়ে গেল। যে বাঙালিরা জীবনের প্রয়োজনে, জীবিকার তাগিদে অথবা রাজনীতির কূট ষড়যন্ত্রের কারনে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন নিমিষেই সব ভৌগোলিক সীমারেখার কাঁটা তারগুলো কোথায় যেন উধাও হয়ে গেল। বাংলাদেশের বাঙালি, নিউইয়র্কের বাঙালি, দিল্লির বাঙালি, কলকাতার বাঙালি সব একাকার হয়ে যেন মিশে গেল একটিমাত্র বাঙালি জাতিসত্বার অনন্য মোহনায়। ধন্যবাদ জানাই সাংস্কৃতিক খবর ম্যাগাজিনের সম্পাদক কবি কাজল চক্রবর্তীকে অপার ভালোবাসা দিয়ে এভাবে দু’বাংলার বাঙালিকে একই সুতায় গাঁথার জন্য।

রাত তখন প্রায় ন’টা। আমি,ঝন্টু,কাজল দা, স্বপ্নাদি পা বাড়ালাম বাড়ির দিকে। টেক্সিতে উঠতে যেয়েও শেষ বারের মত ঘাড় বাঁকিয়ে আলতো করে চোখ দিয়ে চেটে নিলাম কলকাতার বই মেলার প্রাঙ্গনটাকে। তখন বার বার শুধু মনে পড়ছিল সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের সেই বিখ্যাত কবিতার কয়েকটা লাইন।

”আমরা যেন বাংলা মায়ের চোখের দুটো তারা
মাঝখানে নাক উঁচিয়ে আছে, থাকুক গে পাহারা
দুয়ারে খিল, টান দিয়ে তাই খুলে দিলাম জানালা
ওপারে যে বাংলাদেশ, এপারেও সে বাংলা”।

Print Friendly