চলচ্চিত্র পুরস্কার ২০১২ : সাহিত্য বাজার ময়মনসিংহ ঘোষণার প্রতিফলণ প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে

সদানন্দ সরকার

Khalil-PMবিশিষ্ট অভিনেতা খলিল উল্লাহ খানের আজীবন চিকিত্সার ব্যয়ভার নিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।শুধু তাই নয়, তার বক্তব্যে এ সময় সাহিত্য বাজার এর ৭ম প্রতিষ্টাবার্ষিকীতে প্রদত্ত ময়মনসিংহ ঘোষণারই প্রতিফলণ ঘটল। প্রধানমন্ত্রী এ সময় বলেছেন, ‘চলচ্চিত্রশিল্পীরা আমাদের সারা জীবন আনন্দ দেন। অথচ শেষ বয়সে অনেকে অভাবের কারণে চিকিত্সা নিতে পারেন না। এ জন্য সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি ট্রাস্ট ফান্ড গঠন করা হয়েছে। অবশ্য এ জন্য আরও করণীয় আছে।’

তিনি বলেন, ‘পত্রিকায় কোনো শিল্পীর অসুস্থতার খবর এলে আমি নিজে খোঁজ নিই। লোক পাঠাই। খলিল সাহেব দীর্ঘদিন আমাদের বিনোদন দিয়েছেন। চলচ্চিত্রের জন্য কাজ করেছেন। কিন্তু তিনি এখন অসুস্থ। আমি আজীবন তাঁর চিকিত্সার দায়িত্ব নিলাম।’ প্রবীণরা পথ দেখাবেন, নবীনরা এগিয়ে আসবে বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। গত ১০ মে শনিবার বিকেলে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার-২০১২ প্রদান অনুষ্ঠানে তিনি এ ঘোষণা দেন। খলিল উল্লাহ খানকে এ বছর আজীবন সম্মাননায় ভূষিত করা হয়।

সাহিত্য বাজার ময়মনসিংহ ঘোষণার অন্যতম একটি প্রস্তাবণা ছিল সাহিত্য সংস্কৃতির সাথে সম্পৃক্ত প্রবীণ ও অসুস্থদের চিকিৎসা সেবা প্রদানের জন্য সংস্কৃতিক মন্ত্রণালয় ও সরকারের সহযোগিতার বিষয়টি।

এছাড়াও ময়মনসিংহ ঘোষণার উল্লেখযোগ্য প্রস্তাব ছিল

alochona-3

ময়মনসিংহ ঘোষণা পাঠের মাধ্যমে শেষ হয় সাহিত্য বাজার উৎসব।

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালকে দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় কলা বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ের তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
বাংলা সাহিত্যের অমর আধুনিক কবি জীবনানন্দ দাশ এর স্মৃতির প্রতি  শ্রদ্ধা জানিয়ে বরিশালে শিল্প-সংস্কৃতি কেন্দ্রিক একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রতি রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা আবশ্যক।
রাষ্ট্রীয়ভাবে ময়মনসিংহকে শিল্প-সংস্কৃতির রাজধানী ঘোষণা করে ময়মনসিংহ কেন্দ্রিক শিল্প-সংস্কৃতির চর্চার নানা উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। এই জনপদে জন্মগ্রহণকারী বাংলাকাব্যের প্রথম নারী কবি চন্দ্রাবতীসহ সাহিত্যের কালজয়ীদের স্মৃতি সংরণের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
ময়মনসিংহ শহরের কাজী নজরুল ইসলাম সড়কটিকে সংস্কৃতিপল্লী হিসেবে গড়ে তুলতে হবে; এই সড়কে অবস্থিত ময়মনসিংহ সাহিত্য সংসদ ভবন ও জায়গার সংকট সমাধান করতে হবে।
ময়মনসিংহে রবীন্দ্র জাদুঘর, লোককৃষ্টি গবেষণা ও ফোকলোর একাডেমী করতে হবে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে শিল্প-সাহিত্যের জন্য স্বকীয় অধিদপ্তর খুলতে হবে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের বাজেটে শিল্প সাহিত্যের জন্য সুস্পষ্ট অর্থ বরাদ্দ দিতে হবে।
দেশের শিল্প-সাহিত্য রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার ক্ষেত্রে উপেক্ষিত। এই মাধ্যমে সম্পৃক্তদের জন্য প্রণোদনা নিশ্চিত করতে হবে এবং শিল্প-সাহিত্যের উন্নয়ন ও বিকাশে যথাযথ কর্ম-পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে।
দেশব্যাপী সাহিত্য ও শিল্পকলা চর্চায় সরকারী উদ্যোগকে সম্প্রসারিত করতে হবে। সাহিত্য ও জাতীয় ইতিহাস চর্চার উপর রাষ্ট্রীয় গুরুত্বারোপ নিশ্চিত করতে হবে।
প্রত্যেক উপজেলায় একজন করে সংস্কৃতি কর্মী/সংগঠক পর্যায়ের ব্যক্তিত্বকে উপজেলা সংস্কৃতি কর্মকর্তা পদ সৃষ্টি করে নিয়োগ প্রদান করতে হবে।
প্রত্যেক উপজেলায় গণগ্রন্থাগার স্থাপন করে সাহিত্য-সংস্কৃতির বিকাশে – বইপড়া ও লাইব্রেরি বিকাশকে সামাজিক আন্দোলনে ছড়িয়ে দিতে হবে। তথ্য-প্রযুক্তির সাথে লাইব্রেরী আন্দোলন ও শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির সমন্বয় ও যোগসূত্র স্থাপন করা জরুরি। নতুন প্রজন্মের সৃজনশীলতা ও জ্ঞানবিকাশে শিল্প-সাহিত্য চর্চা ও বইপড়াকে বাধ্যতামূলক করতে হবে। গ্রন্থালোকিত জীবন, আলোকিত মানুষ গড়ার পূর্বশর্ত। শহর ছাড়াও গ্রামপর্যন্ত বইপড়া আন্দোলনের ব্যাপ্তিকে ছড়িয়ে দিতে হবে এবং স্কুল-কলেজের শিার্থীদের প্রত্যেকের দেশ ও মানবিক চেতনার ১০টি গান, কবিতা, ৩টি উপন্যাস, ৩টি গল্প গ্রন্থ ও ৫টি প্রবন্ধ পাঠের অভিজ্ঞতা ও দতাকে মূল্যায়ন করতে হবে। একে একটি আন্দোলনে রূপ দিতে হবে – দেশব্যাপী তা মডেল হিসাবে ছড়িয়ে দিতে হবে।
সংস্কৃতির মৌল-মানবিক ও প্রগতির চেতনাকে ছড়িয়ে দিতে সারাদেশে গ্রামভিত্তিক সাংস্কৃতিক গণসংগঠন তৈরিতে সহায়ক উদ্যোগ ও ভূমিকা পালন প্রয়োজন।
ঐতিহ্যিক, ঐতিহাসিক শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির উল্লেখ্যযোগ্য অর্জনকে স্বীকৃতি প্রদান, সংরণ, ধারণ করার জন্য বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ আবশ্যক।
সারাদেশের জাতীয় আলোচনা অনুষ্ঠান বা মঞ্চে কবি-সাহিত্যিক-সাংস্কৃতিক কর্মীদের মতামত প্রকাশের অবকাশ প্রয়োজন। জাতীয় পর্যায় থেকে উপজেলা পর্যন্ত/তৃণমুল পর্যন্ত এই অন্তর্ভূক্তিকে বাধ্যতামূলক করা। বিভিন্ন কমিটিতে কবি-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবীদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে হবে।
প্রত্যেক জেলায় রাইটার্স বিল্ডিং নির্মাণ  করে কবি-সাহিত্যিক-সংস্কৃতিকর্মীদের মিলনস্থল হিসেবে গড়ে তোলা।
তৃণমূলে সাহিত্যের ও গবেষণার সংকলন, বা অন্যান্য প্রকাশনায় সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা এবং প্রকাশনা শিল্পের জন্য উৎসাহ প্রদান প্রয়োজন।
দুস্থ-বঞ্চিত লেখক-শিল্পী-সংস্কৃতিকর্মীদের প্রয়োজনীয় অর্থ সহায়তা প্রদান এবং সরকারী উদ্যোগে তাদের গ্রন্থ প্রকাশের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
সাহিত্যের সাথে জীবনধারা সম্পৃক্ত, জীবনের সাথে প্রকৃতি। ময়মনসিংহের প্রকৃতিকে বাঁচাতে আশু পদপেক্ষ গ্রহণ করতে হবে ‘ব্রহ্মপুত্র বাঁচাবার’। (উল্লেখ্য ২৬ মে শনিবার এ সাহিত্য বাজার উৎসবের শেষদিনে ময়মনসিংহ জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে এ ঘোষণা পাঠ করেন উৎসব আহ্বায়ক স্বাধীন চৌধুরী। ২৭ মে এ ঘোষণা সংস্কৃতিক মন্ত্রণালয়ের মাননীয় সচিব ড. রণজিৎ কুমার বিশ্বাসকে ই-মেইল করা হয়।)

২০১২ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারজয়ীদের হাতে পদক তুলে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আরো বলেন, “সমাজের দুঃখ-বেদনা জানাতে পারে- সেই ধরনের চলচ্চিত্র আমাদের একান্তভাবে প্রয়োজন। এই চলচ্চিত্র যেন আমাদের যুব সমাজকে বিপথে ঠেলে নিয়ে না যায়, সেদিকে বিশেষ দৃষ্টি দেয়ার প্রয়োজন রয়েছে। চলচ্চিত্র নির্মাণ এমন হবে, যেন মানুষের মহৎ গুণগুলো বিকশিত হতে পারে। মানুষের খারাপ দিকগুলোর পরিণতি যেন খারাপ হয়, তারও প্রতিফলণ ঘটাতে হবে।” সুস্থধারার চলচ্চিত্র নির্মাণে সরকারে পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাসও দেন সরকার প্রধান।

11প্রধানমন্ত্রী বলেন, “দর্শকরা যাতে ভালো পরিবেশে সিনেমা দেখতে পারে, সে পরিবেশ আমরা তৈরি করতে চাই। নির্মাতারাও এই পথে এগিয়ে আসবেন, যা সমাজ সংস্কারমূলক হবে।”

তথ্য মন্ত্রণালয় আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে কলাকুশলীদের পুরস্কার দেয়ার পাশাপাশি আজীবন সম্মাননা পুরস্কার দেয়া হয় অভিনেতা খলিলউল্লাহ খানকে।

এবার ঘেঁটুপুত্র কমলার জন্য শ্রেষ্ঠ পরিচালক ও শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যের পুরস্কার পান প্রয়াত হুমায়ুন আহমেদ। পুরস্কার নিতে দুই সন্তানকে নিয়ে আসেন তার স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওন।  খোদার পরে মা চলচ্চিত্রে অভিনয় করে শ্রেষ্ঠ অভিনেতার পুরস্কার শাকিব খান, চোরাবালিতে অভিনয়ের জন্য জয়া আহসান সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার নেন। উত্তরের সুরের জন্য শ্রেষ্ঠ কাহিনীকারের পুরস্কার পেয়েছেন শাহনেওয়াজ কাকলী। এই চলচ্চিত্র প্রযোজনার জন্য শ্রেষ্ঠ প্রযোজকের পুরস্কার পেয়েছেন ফরিদুর রেজা সাগর।

পুরস্কার পাওয়া অন্যরা হলেন 

120শ্রেষ্ঠ পার্শ্বঅভিনেতা এ টি এম শামসুজ্জামান (উত্তরের সুর), শ্রেষ্ঠ পার্শ্বঅভিনেত্রী লুসি তৃপ্তি গোমেজ (উত্তরের সুর), খলচরিত্রে শ্রেষ্ঠ অভিনেতা শহিদুজ্জামান সেলিম, শ্রেষ্ঠ শিশু শিল্পী মামুন (ঘেঁটুপুত্র কমলা), বিশেষ শাখায় শ্রেষ্ঠ শিশু শিল্পী মেঘলা (উত্তরের সুর), শ্রেষ্ঠ সংলাপ রচয়িতা রেদওয়ান রনি (চোরাবালি), শ্রেষ্ঠ সংগীত পরিচালক ইমন খান (ঘেঁটু পুত্র কমলা), শ্রেষ্ঠ গায়ক পলাশ (খোদার পরে মা), শ্রেষ্ঠ গায়িকা রুনা লায়লা (তুমি আসবে বলে), শ্রেষ্ঠ সুরকার ইমন সাহা (পিতা), শ্রেষ্ঠ চিত্রগ্রাহক মাহফুজুর রহমান খান (ঘেঁটুপুত্র কমলা), শ্রেষ্ঠ শব্দগ্রাহক রিপন সাহা (চোরাবালি), শ্রেষ্ঠ সম্পাদক সলিমুল্লাহ সেলিম (ঘেঁটুপুত্র কমলা), শ্রেষ্ঠ শিল্প নির্দেশক কালান্তর ও উত্তম সেন (রাজা সূর্য সেন), শ্রেষ্ঠ মেকআপম্যান খলিলুর রহমান (ঘেঁটুপুত্র কমলা) এবং শ্রেষ্ঠ সাজসজ্জা এস এম মইনুদ্দিন ফুয়াদ।

চলচ্চিত্রে ডিজিটাল পদ্ধতি ব্যবহারের ওপর জোর দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বতন্ত্র স্থায়ী ভবনে ফিল্ম আর্কাইভ প্রতিষ্ঠার কাজ অনেক দূর এগিয়ে গেছে। ‘বাংলাদেশ চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন ইনস্টিটিউট আইন’ প্রণয়ন করা হয়েছে। ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু হয়েছে। নতুন সিনেপ্লেক্স নির্মাণের ক্ষেত্রে কর অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। চলচ্চিত্র প্রদর্শনের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য সম্পূরক কর প্রত্যাহার করা হয়েছে। আধুনিক ডিজিটাল সার্টিফিকেশন প্রথা চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, “যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলচ্চিত্র এগিয়ে যাক, সেটাই আমরা চাই।”

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সুস্থধারার চলচ্চিত্র নির্মাণের লক্ষ্যে পাঁচটি স্বল্প ও পাঁচটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের জন্য অনুদান প্রথা চালু করা হয়েছে। এর মধ্যে কমপক্ষে একটি শিশুতোষ স্বল্পদৈর্ঘ্য এবং একটি শিশুতোষ পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মাণ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। প্রতিটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের জন্য ১০ লাখ টাকা অনুদান এবং দুই লাখ টাকার সার্ভিস এফডিসি থেকে দেয়া হচ্ছে। প্রতিটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের জন্য ৩৫ লাখ টাকা অনুদান এবং ১০ লাখ টাকার সার্ভিস এফডিসি থেকে দেয়া হচ্ছে।

Print Friendly