আফসান চৌধুরী সম্পাদিত বাংলাদেশ ’৭১ গ্রন্থ থেকে : গ্রামীণ সমাজ ও ’৭১

সাহিত্য বাজার

5পাঠক শুভানুধ্যায়ীদের সবাইকে বিজয় দিবসের অভিনন্দন

বাংলাদেশে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে গ্রামীন সমাজের যে চিত্র অংকিত হয়েছে আফসান চৌধুরী সম্পাদিত বাংলাদেশ ’৭১ – নামের গ্রন্থে। বিজয়ের এই দিনে সেটাই আমরা হুবহু তুলে ধরেছি সাহিত্য বাজারের এই বিজায়াজোনে।

বিষয় :গ্রামীণ সমাজ ও ’৭১

পরিচিতি 

33

আফসান চৌধুরী

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মানুষের জীবনযাত্রার সার্বিক দিক সম্পর্কে তথ্য আহরণের প্রচেষ্টা হিসেবে ৭১ (একাত্তর) জনের সাক্ষাকার গ্রহণ করা হয়েছে। কাজের এরিয়া ছিল- কুষ্টিয়া সদর থানার জিয়ারোখী, হরিনারায়ণপুর ও আব্দালপুর ইউনিয়ন এবং কুষ্টিয়া পৌরসভা। কুমারখালী থানার পান্টি, চাপড়া, জগন্নাথপুর, চাঁদপুর, বাগুলাট, কয়া ও নন্দলালপুর ইউনিয়ন এবং কুমারখালী পৌরসভা। সদর থানাতে ১৩ জনের সাক্ষাকার গ্রহণ করা হয়। এর মধ্যে জিয়ারোখীর রাতুলপাড়াতে ১ জন, হরিনারায়ণপুরে ১ জন, আব্দালপুরের হাতিয়াতে ৬ জন এবং চরপাড়া ও বৈদ্যনাথপুরে ১ জন করে এবং পৌরসভাতে ৩ জন।

অপরদিকে কুমারখালী থানার পান্টি ইউনিয়নের ৯টি গ্রামে ৩০ জন (রামনগর ২জন, পান্টি ১৫ জন, ওয়াশী ১ জন, নগরকয়া ৩ জন, বাগবাড়িয়া ১জন, বিরিকয়া ৩ জন, ডাঁশা ২ জন, রামদিয়া ২ জন এবং ভালোুকা ১জন)।

চাঁদপুর ইউনিয়নের ৩টি গ্রামে ৪ জন (শ্রীপুর ২ জন, চাঁদপুর ১ জন ও কুশলীবাসা ১জন)। চাপড়া ইউনিয়নের ৬টি গ্রামে ১০ জন (ধর্মপাড়া ১ জন, কাঞ্চনপুর ৩ জন, ছেউরিয়া ১ জন, সাঁওতা ৩ জন, পাহাড়পুর ১ জন ও পাইকপাড়া ১ জন)।

জগন্নাথপুর ইউনিয়নের ৪টি গ্রামে ৮ জন (দয়ারামপুর ৩ জন, জোতপাড়া ১ জন, মহেন্দ্রপুর ৩ জন ও হোগলা ১জন)।

নন্দলালপুর ইউনিয়নের সোপুকুরিয়াতে ১ জন, কয়া ইউনিয়নে ১ জন এবং বাগুলাট ইউনিয়নের নাতুড়িয়াতে ১ জনের সাক্ষাকার গ্রহণ করা হয়। এ ছাড়া কুমারখালী পৌরসভার ২ জনের এবং ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা থানার কাঁচেরকোল ইউনিয়নের হামদামপুরের ১ জনের সাক্ষাকার গ্রহণ করা হয়- যিনি এখন (২৫.১১.০৩) কুমারখালী থানার চাঁদপুর ইউনিয়নের মোহন নগরে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। অর্থা কুমারখালীর ৫৮ জনের সাক্ষাকার নেওয়া হয়েছে।

সর্বমোট ৭১ জনের মধ্যে পুরুষ ৬২ জন এবং  মহিলা ৯ জন। এদের মধ্যে ১৯ জন হিন্দু (মহিলা ৩ জন) রয়েছে। মহিলাদের মধ্যে গৃহিনী ৬ জন, ডোম ১ জন, ছাত্রী ১ জন এবং শিশু ১জন (বর্তমানে বয়স ৩৯ বছর) রয়েছে।

পেশাজীবীদের মধ্যে কৃষিজীবী ৯ জন, কামার ৩ জন, কামলা ৩ জন, ব্যবসায়ী ৪ জন, চাকরিজীবী ৪ জন, ঘোষ ২ জন, জোতদার ২ জন এবং তাঁতী, মুচি, গাড়োয়ান, দফাদার, কাঠমিস্ত্রি, নাপিত, কুমার, হেকিম(গ্রাম্য কবিরাজ) প্রত্যেক শ্রেণী থেকে ১জন করে, ছাত্র ২ জন, মাতবর ১ জন, মুক্তিযোদ্ধা ১৫ জন, সংগঠক ৫ জন, রাজাকার ২ জন, আলবদর ১ জন এবং বিহারি ১ জনের সাক্ষাকার নেওয়া হয়েছে। তাছাড়া কুষ্টিয়ার ঐতিহ্য লালন সাঁইর আখড়া থেকে ১ জন বাউলের সাক্ষাকারও গ্রহণ করা হয়েছে।

এক নজরে :

       জেলা                  : ২টি

       থানা                  : ৩টি

       পৌরসভা        : ২টি

       ইউনিয়ন               : ১১টি

       গ্রাম                  : ৩১টি

       সাক্ষাকারের সংখ্যা: ৭১টি

       পুরুষ                  : ৬২ জন

       মহিলা                 : ৯ জন

       হিন্দু                  : ১৯ জন

       মুসলমান               : ৫২ জন 

জীবনের ঝুঁকি : ব্যক্তিগত ও পারিবারিক

3মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে ধনী-গরিব,নারী-পুরুষ, শিশু, পাকিস্তানপন্থি কিংবা স্বাধীনতার পক্ষে অর্থা সর্বস্তরের জনগণ চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগেছে। মুলত পাকসৈন্যরা যে এলাকায় গেছে, সে এলাকার লোকদের মধ্যে মৃত্যু ভীতি কাজ করেছে। কারণ পাকসৈন্যদের প্রথম প্রবেশের সময় অনেক ক্ষেত্রে তারা দেখা মাত্র গুলি করে। যেমন- কুমারখালী থানার ভাঁড়রা গ্রামে ১ জ্যৈষ্ঠ অভিযান করে চারজনকে গুলি করে। বাগবাড়িয়াতে জিতেনকে হত্যা করে। ১৬ এপ্রিলের পরবর্তী কয়েকদিন কুষ্টিয়ার পাশের গ্রাম ছেউড়িয়াতে ওমর আলী, মোহাম্মদ আলী, কিনু, সামসুদ্দিন আহমেদকে হত্যা করে। ২২ জুলাই কয়াতে আলিম উদ্দিন মোল্লা ও দুই ছেলে ইব্রাহীম ও হানিফ মোল্লাকে পুড়িয়ে হত্যা করে। সেপ্টেম্বরে (দ্বারিকগ্রামে) শিলাইদহ অভিযানে কানাই, মোংলা, ভোলোা, শ্রীপদ, খলিশা, হুজুর আলী (দোকানদার) মাজগ্রামের কিতাই ও খোর্দ্দবন গ্রামের আদালতকে হত্যা করে। আশ্বিন মাসে মহেন্দ্রপুর অভিযানে চরভবানীপুর, জোতপাড়া, হোগলা ও মহেন্দ্রপুর থেকে ১১ জন সাধারণ গ্রামবাসীকে ধরে দারোগার আমবাগানে নিয়ে জবাই করে হত্যা করে। দয়ারামপুর অভিযানে দিবক সর্দার, সুধীর ঘোষ, হালদারদের জামাই এবং আরও ৬ জনকে গুলি করে হত্যা করে। কুমারখালী থেকে পাশের সদকী ইউনিয়নে বিভিন্ন সময়ে ২০/২৫ জনকে হত্যা করে। হাসিমপুর থেকে ধরে নিয়ে মুজাহিদ ক্যাম্পে কিংবা পান্টি অভিযানে আশেপাশের গ্রাম (আসা ও যাওয়ার পথে) মোহননগর, পান্টি বাজারে আসা ৭জন ও গণেশপুরের ২ জন, রামচন্দ্রপুরে ১ জন এবং নিয়ামত বাড়িয়াতে ১ জন হাফেজকে হত্যা করে(নভেম্বর মাসে)।    

এরা শুধু কুষ্টিয়ার কুমারখালী থানার বিভিন্ন অঞ্চলে পাকবাহিনীর অভিযানে নিহত হয়। এদের মধ্যে অবস্থাপন্নœ লোক, শিল্প মালিক থেকে মুচি, সাধারণ কৃষক, কামলা, কসাই, মওলানা বা ধর্মীয় নেতাও রয়েছেন। আর এদের কেউই মুক্তিযুদ্ধের সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন না। শুধুমাত্র অভিযানকালে সামনে পড়ে যাওয়াতে কিংবা পালানোরত অবস্থায় অথবা জীবনের ভয়ে মাঠে পালিয়ে থাকা অবস্থায় তারা নিহত হন। সুতরাং জীবনের ঝুঁকি ছিল সবচেয়ে বেশি এবং সামান্য ভুলের জন্য জীবন দিতে হয়েছে।

22শুধুমাত্র পাকসৈন্যদের অভিযানেই যে নিরাপত্তা বিঘিœত হয়েছে এমন নয়। রাজাকাররা সদরপুরের ইয়াজউদ্দিন মোল্লা ও তার দুই ছেলেকে গুলি করে। এক ছেলে নজরুল বেঁচে গেলেও অন্য দু’জন মারা যায়। শালঘর মধুয়াতে আগুন ধরিয়ে দিলে জুলমত শেখের বৃদ্ধা মা পুড়ে মারা যায়। নন্দলালপুরের রাখাল চন্দ্র প্রামাণিক ও তালেব ডাক্তারকে হত্যা করে। ওয়াশীর জুমারত শেখের বাড়িতে ডাকাতি করতে এসে রাজাকাররা গুলি করলে গৃহকর্তা গুরুতর আহত হয়। রামদিয়ার ললিতকে রাজাকাররা ডেকে নিয়ে গিয়ে মেরে ফেলে।

 

রাজাকারদের থেকে জীবনের ভয় ছিল ভিন্ন ভিন্নœ প্রকৃতির। অনেকক্ষেত্রে দেখা যায়, রাতে ডাকাতি করার সময় চিনে ফেলার কারণে গৃহস্বামীকে গুলি করেছে। আর যদি কোনোভাবে গৃহকর্তা পালিয়ে গিয়ে থাকে তবে পরিচিত সেই রাজাকার তাকে খুঁজে বেড়ায়, তবে প্রকাশ্যে নয়। যেটা ঘটেছে পান্টির বড় ব্যবসায়ী আবদুল হাকিম শাহ এর জীবনে। মোহননগরের ফকির মোল্লাকে পান্টি বাজারে কিছু রাজাকার ধরে। তার বাড়িতে শেখ মুজিবের ছবি আছে এরূপ অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের চেষ্টা করে। যদি থেকে থাকে তাহলে তা নামিয়ে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি লাগাতে বলে। ফকির মোল্লা সবাইকে শুনিয়ে বলে যে, “আমি ছবি ঝুলাইছি তাতে তোদের কি? তোরা যা খুশি বলিস না কেন আমি ছবি নামাব না”। এ ছাড়া সে রাজাকারদেরকে গালিও দেয়। এ-কারণে অস্ত্রধারী রাজাকাররা তাকে ধরে নিয়ে নরেন কামারের দোকানে বেঁধে মারতে থাকে। তাকে কোথায় মেরে ফেলা হবে এরকম পরামর্শ করে। (তবে সেদিন ফকির মোল্লা রক্ষা পায়। কারণ পরামর্শ শুনে কামার তার ছোট ছেলেকে পাঠায় পান্টির রাজাকার মকবুল মণ্ডলকে ডেকে নিয়ে আসতে। মকবুল মণ্ডলকে দেখে রাজাকাররা ফকির মোল্লাকে তার হাতে দিয়ে তখনই গুলির নির্দেশ দিয়ে অন্য জায়গায় চলে যায়। মকবুল মণ্ডল তাকে নিয়ে গ্রামের অপরদিকে এসে তাকে ছেড়ে দিয়ে কয়েকমাস দূরে থাকতে বলে, আর ফাঁকা দু’টি গুলি করে)। আবার বাগবাড়িয়ার রণজি মণ্ডল (তখন ছাত্র) যুদ্ধ শুরুর কিছু পরে ভারত থেকে এলে পান্টি ইউনিয়নের রাজাকাররা পান্টি বাজার থেকে তাকে ধরে। তাকে মুক্তিযোদ্ধাদের এজেন্ট, ভারতের গুপ্তচর, রাজাকারদের সংবাদ নেওয়ার জন্য এসেছে প্রভৃতি বলে ধরে এবং হত্যা করতে মাঠের দিকে নিয়ে যেতে থাকে। কিন্তু একই গ্রামের রাজাকার জলিলকে দেখে রণজিতকে তার কাছে দিয়ে গুলি করতে বলে ওরা চলে যায়। (অবশ্য জলিল তাকে নদীর ধারে (ডাকুয়ানদী) নিয়ে গিয়ে বলে “সাঁতরে চলে যাও, বেশ কিছু দিন সামনে এসো না।”)

 

অর্থা রাজাকাররা যাকে সন্দেহ করত তাকেই ধরতো। তবে রাজাকার সদস্যরা উচ্চবংশ বা বিত্তশালী না হওয়ার কারণে সমাজে তাদের খুব বেশি মর্যাদা ছিল না। তাদেরকে কেউ কখনও সম্মান করে চলত না এবং তারা কাউকে ধমক দিলে দ্বিগুণ জোরে তাদের উপর লোকেরা ধমক দিত। এ-কারণেই ফকির মোল্লার এ দশা হয়। বরং অনেকের ডাকাতিতে উসাহ ছিল বেশি। আর এক্ষেত্রে তারা নিজ গ্রাম বা এলাকাকে বাদ দিয়ে অন্য গ্রামে যেত। তবে এ জন্য একজন সে গ্রামের পরিচিত লোক দরকার হতো। আর এই পরিচিত লোককে চিনে ফেললেই হতো বিপদ।

 

পাবনাতে প্রতিরোধযুদ্ধের পরে যখন পাক-আর্মি আবার ঐ এলাকা দখল করে নেয় তখন অনিল দারোগা (যুদ্ধে থানার অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করেছিল) সপরিবারে জোতপাড়ায় দূর সম্পর্কের আত্মীয় বাড়িতে পালিয়ে আসেন। উদ্দেশ্য এখান থেকে নিরাপদে ভারত যাওয়া। প্রায় এক দেড় মাস পরে তারাসহ অনেক হিন্দু পরিবার এবং মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার জন্য কিছু লোক ভারতের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। কীভাবে যেন সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে যে, তার কাছে ১ কেজি সোনা (সোনার গহনা) আছে। কুমারখালি ঘাটে নৌকায় উঠার পরে তারা রাজাকারদের আক্রমণের শিকার হয়। কোনোরকম ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ না দিয়ে তারা দারোগা ও তার ছেলেকে হত্যা করে। অর্থা যোদ্ধা হিসেবে নয় শরণার্থী হিসেবেও জীবনের ঝুঁকি একইরকম ছিল।

 

প্রতিরোধযুদ্ধের পরে নকশালরা জীবনের হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। তাদের লক্ষ্য ছিল দু’টো- প্রথমত, প্রতিরোধযুদ্ধের সময় যারা থানা থেকে অস্ত্র পেয়েছিল এমন লোকদের আক্রমণ করে অস্ত্র কেড়ে নেওয়া। দ্বিতীয়ত- একটা সুসজ্জিত সশস্ত্র গ্রুপ তৈরি করা এবং এজন্য অবস্থাপন্ন লোকদের নিকট থেকে অর্থ আদায়। দাবিকৃত অর্থ দিতে বিলম্ব হওয়ায় কয়াতে আবদুল গফুরকে এবং অর্থ দিতে অস্বীকার করায় আঃ সামাদ খানকে হত্যা করে (জুন মাসে)। খুব দ্রুতই ভারত থেকে সবেমাত্র আসা মুক্তিযোদ্ধারা তাদের টার্গেটে পরিণত হয়। মুক্তিযোদ্ধারা তাদেরকে অস্ত্র ও গুলি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে একত্রিত হয়ে রাজাকার কমান্ডারের বিরুদ্ধে অভিযান করে সফল হয়। এ অভিযান পর্যালোচনা ও পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণের জন্য গোপনে রাধার গ্রামে পরিত্যক্ত এক হিন্দুবাড়িতে মিটিং আহ্বান করা হয়। এখানে সুকৌশলে নকশাল বাহিনীকে নিরস্ত্র করে এবং তাদের নেতাকে হত্যা করে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। এটা কুমারখালীর কয়াতে ঘটেছিল। কিন্তু নকশালদের এক শক্তিশালী বাহিনীর মুখোমুখি হতে হয় মুক্তিযোদ্ধাদের পাবনার চরে। এখানে কুষ্টিয়ার কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা তিনদিন একটানা যুদ্ধ করে তাদেরকে পরাস্ত করে।

 

এ ছাড়াও যুদ্ধ শুরু হলেই বিশেষ কিছু লোক ঝুঁকির সম্মুখীন হয়। এরা হচ্ছেন প্রতিটি ইউনিয়নের চেয়ারম্যানরা। এখানে কুষ্টিয়ার তিনজন চেয়ারম্যানের নাম উল্লেখ করা যায়- প্রথমজন পান্টি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান খিলাফত উদ্দিন। তিনি ছিলেন ’৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর কাছে পরাজিত মুসলিম লীগ প্রার্থী ও শিল্পপতি আফিল উদ্দিনের ভাই। তিনি কুষ্টিয়ার প্রথম প্রতিরোধযুদ্ধে- ইউনিয়নবাসীরা কে কি পরিমাণ রুটি, ডাব, নারকেল, মুড়ি, চিড়াগুড়সহ অন্যান্য সামগ্রী দিবে তা নির্ধারণ করেন। নির্দিষ্ট দিন তা ইউনিয়ন পরিষদে জমা হওয়ার পর তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করে সেগুলো পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। এ কাজে গ্রামের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ছাড়াও সর্বস্তরের জনগণের সহযোগিতা লাভ করেন এবং সবাইকে এই বলে আশ্বস্ত করেন যে, যেকোনো বিপদের মুখে তিনি সবাইকে নিয়ে এভাবেই ইউনিয়নকে রক্ষা করবেন। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই পরিস্থিতি পালটে যায়। কুষ্টিয়া পুনর্দখলের পরে তিনি পাকিস্তানিদের অনুগত হয়ে পরেন। পিসকমিটির চেয়ারম্যান হওয়ার পর ইচ্ছামত আর্মি-বিহারি নিয়ে আসা, বাড়ি বাড়ি খোঁজ নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের ধরা, ইউনিয়নে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নির্মূল করা, একইসাথে ৫ জন মুক্তিযোদ্ধাকে গুলি করে হত্যা করা, বাড়ি পোড়ানো ও লুটসহ পান্টি বাজার সম্পূর্ণরূপে পুড়িয়ে দেওয়ায় নেতৃত্ব দেন।

 

দ্বিতীয়জন জিয়ারোখী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এবং রাতুল পাড়ার সবচেয়ে অবস্থাপন্নœ এদবার রহমান বিশ্বাস। প্রতিরোধযুদ্ধে সহায়তাকারী এই চেয়ারম্যানও পিসকমিটির সভাপতি হন। তিনি রাজাকারদেরকে নিয়ন্ত্রিতভাবে পরিচালনা করার পাশাপাশি নিয়মিতভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তাও করেছেন। তার ভাষায়, “আমার বাড়িতে নিয়মিত তিন হাড়ি ভাত রান্না হতো। রাজাকারদের জন্য, বাড়ির লোকদের জন্য আর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য।” সর্বদা সতর্ক থাকতে হতো কেউ যেন এ বিষয়গুলো প্রকাশ না করে। তার অবস্থান ছিল ‘ধারালো ছুরির মাঝখানে’থ- এদিক ওদিক হলেই নিশ্চিত মৃত্যু। তাকে ৩/৪ বার পাক-আর্মি নিয়ে যায় বিভিন্ন ধরনের অভিযোগের প্রেক্ষিতে। প্রথমবার দুর্বাচারাতে তার ভগ্নিপতি উজানগ্রাম ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সলিম বিশ্বাসকে না পেয়ে তাকে ধরে। সৈন্যদের সাথে সাথে তাকেও প্রায় দৌড়ে ৪ কিলোমিটার দূরে দুর্বাচারার ক্যাম্পে যেতে হয়- এটা রাত্রিতে এবং চারিদিকে ছিল শুধু পানি। সেখানে তাকে বসিয়ে রেখে তার কতগুলি ছেলেমেয়ে, নাম, কে-কি করে ইত্যাদি শোনার পর সলিমের কয় ছেলেমেয়ে, কি নাম, কে কি করে ইত্যাদি জিজ্ঞাসা করতে থাকে পাক-আর্মি। কিছু সময় পরপরই জিজ্ঞাসা করে “সলিম কাঁহা?” অনেক সময় ‘আমি জানি না’ ধরনের উত্তর দেওয়ার পরও যখন একই প্রশ্ন করতে থাকে তখন বিরক্ত হয়ে এক সময় তিনি বলেন, “সলিম ভারত যাওয়ার পথে ছেলেমেয়ে নিয়ে ডুবে গেছে নদীতে।” একথায় অফিসারটি উফুল্ল হয় এবং তারাও একই কথা শুনেছে বলে তাকে ছেড়ে দেয় রাত একটার দিকে। তিনি বলেন,“ আরেকদিন আর্মি আমাদের বাড়িতে এসে আমার বৈঠকখানায় বসে এবং আমাকে সাথে করে কুষ্টিয়া নিয়ে যায়। সেখানে আমাকে একটা ভারতীয় সংবাদপত্রের ছেড়া অংশ দেখায় যেটা আমার বৈঠকখানাতে টেবিলের উপর থেকে নিয়ে গিয়েছে। এ ছাড়া  আবারও আমার ও সলিম বিশ্বাসের ছেলেমেয়ের নাম জিজ্ঞাসা করে এবং “সলিম কাঁহা” বারবার বলতে থাকে। আমি আগের দিনের মতোই বললে ‘ঠিক বলেছ’ বলে ছেড়ে দেয়।” তিনি আরও বলেন,“ আরেকদিন দুইজন রাজাকার এসে আমাকে সাথে নিয়ে বিত্তিপাড়া ক্যাম্পে যায়। এখানে আঃ মজিদ খান ওরফে মজিদ কসাই ছিল প্রধান ব্যক্তি। সে খুব ভয়ঙ্কর লোক ছিল এবং বিভিন্ন এলাকা থেকে যে মানুষগুলোকে ধরে নিয়ে আসা হতো তাদেরকে সে জবাই করত। আমাকে তার সামনে অনেক সময় বসিয়ে রাখা হয়। তারপর সে আমার মেজ ছেলের নাম জানতে চায়। এরপর বলে যে, সে মুক্তিযোদ্ধা হয়েছে এবং ভারতে গেছে। আমি সাথে সাথে অস্বীকার করি এবং বলি যে, সে কুৃষ্টিয়াতে চাচার বাসায় আছে। উল্লেখ্য,, ও সত্যিই মুক্তিযোদ্ধা হয়েছে এবং ভারতে গিয়েছিল। কিন্তু ফিরে এসে চাচার বাসায় উঠেছে এবং দিনের বেলাতে থানায় গিয়ে দারোগার সাথে দেখা করে এসেছে। আমার উপর যেকোনো সময় বিপদ হতে পারে ভেবেই এটা করে। মজিদ সাহেব কুষ্টিয়াতে দারোগার কাছে সংবাদ পাঠিয়ে ঐ নির্দিষ্ট বাসাতে আমার ছেলে আছে কিনা জানতে চায়। দারোগা জানায়, সে আজই তার সাথে দেখা করেছে। ফলে আবার দুইজন রাজাকার আমাকে বাড়ি পৌঁছে দিতে বলে। আমার ভাগ্নে বাবু মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ছিল এবং প্রায়ই দল নিয়ে আমার বাড়িতে সন্ধ্যার পরে এসে খেয়ে যেত। তবে আমার বাড়িতে থাকত না কখনও। এভাবে আমাকে বারবার আর্মি-বিহারিরা ডেকে নিয়ে যেত। আর প্রতিবারই যাওয়ার সময় মনে হতো এই শেষ যাওয়া। আমার ফিরতে দেরি দেখলে গ্রামের পুরুষ মহিলারা সেই জায়গায় যেত। তবে বলতে হয় যে, দুই নৌকায় পা দিয়ে আমি সত্যিই জীবনের ঝুঁকি নিয়েছিলাম।” (চলবে)

পাঠক শুভানুধ্যায়ীদের সবাইকে বিজয় দিবসের অভিনন্দন

বাংলাদেশে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে গ্রামীন সমাজের যে চিত্র অংকিত হয়েছে আফসান চৌধুরী সম্পাদিত বাংলাদেশ ’৭১ – নামের গ্রন্থে। বিজয়ের এই দিনে সেটাই আমরা হুবহু তুলে ধরেছি সাহিত্য বাজারের এই বিজায়াজোনে।

গ্রামীণ সমাজ ও ’৭১

কুষ্টিয়া

পরিচিতি
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মানুষের জীবনযাত্রার সার্বিক দিক সম্পর্কে তথ্য আহরণের প্রচেষ্টা হিসেবে ৭১ (একাত্তর) জনের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়েছে। কাজের এরিয়া ছিল- কুষ্টিয়া সদর থানার জিয়ারোখী, হরিনারায়ণপুর ও আব্দালপুর ইউনিয়ন এবং কুষ্টিয়া পৌরসভা। কুমারখালী থানার পান্টি, চাপড়া, জগন্নাথপুর, চাঁদপুর, বাগুলাট, কয়া ও নন্দলালপুর ইউনিয়ন এবং কুমারখালী পৌরসভা। সদর থানাতে ১৩ জনের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়। এর মধ্যে জিয়ারোখীর রাতুলপাড়াতে ১ জন, হরিনারায়ণপুরে ১ জন, আব্দালপুরের হাতিয়াতে ৬ জন এবং চরপাড়া ও বৈদ্যনাথপুরে ১ জন করে এবং পৌরসভাতে ৩ জন।

অপরদিকে কুমারখালী থানার পান্টি ইউনিয়নের ৯টি গ্রামে ৩০ জন (রামনগর ২জন, পান্টি ১৫ জন, ওয়াশী ১ জন, নগরকয়া ৩ জন, বাগবাড়িয়া ১জন, বিরিকয়া ৩ জন, ডাঁশা ২ জন, রামদিয়া ২ জন এবং ভালোুকা ১জন)।

চাঁদপুর ইউনিয়নের ৩টি গ্রামে ৪ জন (শ্রীপুর ২ জন, চাঁদপুর ১ জন ও কুশলীবাসা ১জন)। চাপড়া ইউনিয়নের ৬টি গ্রামে ১০ জন (ধর্মপাড়া ১ জন, কাঞ্চনপুর ৩ জন, ছেউরিয়া ১ জন, সাঁওতা ৩ জন, পাহাড়পুর ১ জন ও পাইকপাড়া ১ জন)।

জগন্নাথপুর ইউনিয়নের ৪টি গ্রামে ৮ জন (দয়ারামপুর ৩ জন, জোতপাড়া ১ জন, মহেন্দ্রপুর ৩ জন ও হোগলা ১জন)।

নন্দলালপুর ইউনিয়নের সোপুকুরিয়াতে ১ জন, কয়া ইউনিয়নে ১ জন এবং বাগুলাট ইউনিয়নের নাতুড়িয়াতে ১ জনের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়। এ ছাড়া কুমারখালী পৌরসভার ২ জনের এবং ঝিনাইদহ জেলার শৈলকুপা থানার কাঁচেরকোল ইউনিয়নের হামদামপুরের ১ জনের সাক্ষাৎকার গ্রহণ করা হয়- যিনি এখন (২৫.১১.০৩) কুমারখালী থানার চাঁদপুর ইউনিয়নের মোহন নগরে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। অর্থাৎ কুমারখালীর ৫৮ জনের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে।

সর্বমোট ৭১ জনের মধ্যে পুরুষ ৬২ জন এবং  মহিলা ৯ জন। এদের মধ্যে ১৯ জন হিন্দু (মহিলা ৩ জন) রয়েছে। মহিলাদের মধ্যে গৃহিনী ৬ জন, ডোম ১ জন, ছাত্রী ১ জন এবং শিশু ১জন (বর্তমানে বয়স ৩৯ বছর) রয়েছে।

পেশাজীবীদের মধ্যে কৃষিজীবী ৯ জন, কামার ৩ জন, কামলা ৩ জন, ব্যবসায়ী ৪ জন, চাকরিজীবী ৪ জন, ঘোষ ২ জন, জোতদার ২ জন এবং তাঁতী, মুচি, গাড়োয়ান, দফাদার, কাঠমিস্ত্রি, নাপিত, কুমার, হেকিম(গ্রাম্য কবিরাজ) প্রত্যেক শ্রেণী থেকে ১জন করে, ছাত্র ২ জন, মাতবর ১ জন, মুক্তিযোদ্ধা ১৫ জন, সংগঠক ৫ জন, রাজাকার ২ জন, আলবদর ১ জন এবং বিহারি ১ জনের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। তাছাড়া কুষ্টিয়ার ঐতিহ্য লালন সাঁইর আখড়া থেকে ১ জন বাউলের সাক্ষাৎকারও গ্রহণ করা হয়েছে।

এক নজরে :
জেলা            : ২টি
থানা            : ৩টি
পৌরসভা        : ২টি
ইউনিয়ন            : ১১টি
গ্রাম             : ৩১টি
সাক্ষাৎকারের সংখ্যা    : ৭১টি
পুরুষ            : ৬২ জন
মহিলা            : ৯ জন
হিন্দু            : ১৯ জন
মুসলমান             : ৫২ জন

জীবনের ঝুঁকি : ব্যক্তিগত ও পারিবারিক
মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে ধনী-গরিব,নারী-পুরুষ, শিশু, পাকিস্তানপন্থি কিংবা স্বাধীনতার পক্ষে অর্থাৎ সর্বস্তরের জনগণ চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগেছে। মুলত পাকসৈন্যরা যে এলাকায় গেছে, সে এলাকার লোকদের মধ্যে মৃত্যু ভীতি কাজ করেছে। কারণ পাকসৈন্যদের প্রথম প্রবেশের সময় অনেক ক্ষেত্রে তারা দেখা মাত্র গুলি করে। যেমন- কুমারখালী থানার ভাঁড়রা গ্রামে ১ জ্যৈষ্ঠ অভিযান করে চারজনকে গুলি করে। বাগবাড়িয়াতে জিতেনকে হত্যা করে। ১৬ এপ্রিলের পরবর্তী কয়েকদিন কুষ্টিয়ার পাশের গ্রাম ছেউড়িয়াতে ওমর আলী, মোহাম্মদ আলী, কিনু, সামসুদ্দিন আহমেদকে হত্যা করে। ২২ জুলাই কয়াতে আলিম উদ্দিন মোল্লা ও দুই ছেলে ইব্রাহীম ও হানিফ মোল্লাকে পুড়িয়ে হত্যা করে। সেপ্টেম্বরে (দ্বারিকগ্রামে) শিলাইদহ অভিযানে কানাই, মোংলা, ভোলোা, শ্রীপদ, খলিশা, হুজুর আলী (দোকানদার) মাজগ্রামের কিতাই ও খোর্দ্দবন গ্রামের আদালতকে হত্যা করে। আশ্বিন মাসে মহেন্দ্রপুর অভিযানে চরভবানীপুর, জোতপাড়া, হোগলা ও মহেন্দ্রপুর থেকে ১১ জন সাধারণ গ্রামবাসীকে ধরে দারোগার আমবাগানে নিয়ে জবাই করে হত্যা করে। দয়ারামপুর অভিযানে দিবক সর্দার, সুধীর ঘোষ, হালদারদের জামাই এবং আরও ৬ জনকে গুলি করে হত্যা করে। কুমারখালী থেকে পাশের সদকী ইউনিয়নে বিভিন্ন সময়ে ২০/২৫ জনকে হত্যা করে। হাসিমপুর থেকে ধরে নিয়ে মুজাহিদ ক্যাম্পে কিংবা পান্টি অভিযানে আশেপাশের গ্রাম (আসা ও যাওয়ার পথে) মোহননগর, পান্টি বাজারে আসা ৭জন ও গণেশপুরের ২ জন, রামচন্দ্রপুরে ১ জন এবং নিয়ামত বাড়িয়াতে ১ জন হাফেজকে হত্যা করে (নভেম্বর মাসে)।

এরা শুধু কুষ্টিয়ার কুমারখালী থানার বিভিন্ন অঞ্চলে পাকবাহিনীর অভিযানে নিহত হয়। এদের মধ্যে অবস্থাপন্নœ লোক, শিল্প মালিক থেকে মুচি, সাধারণ কৃষক, কামলা, কসাই, মওলানা বা ধর্মীয় নেতাও রয়েছেন। আর এদের কেউই মুক্তিযুদ্ধের সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন না। শুধুমাত্র অভিযানকালে সামনে পড়ে যাওয়াতে কিংবা পালানোরত অবস্থায় অথবা জীবনের ভয়ে মাঠে পালিয়ে থাকা অবস্থায় তারা নিহত হন। সুতরাং জীবনের ঝুঁকি ছিল সবচেয়ে বেশি এবং সামান্য ভুলের জন্য জীবন দিতে হয়েছে।

শুধুমাত্র পাকসৈন্যদের অভিযানেই যে নিরাপত্তা বিঘিœত হয়েছে এমন নয়। রাজাকাররা সদরপুরের ইয়াজউদ্দিন মোল্লা ও তার দুই ছেলেকে গুলি করে। এক ছেলে নজরুল বেঁচে গেলেও অন্য দু’জন মারা যায়। শালঘর মধুয়াতে আগুন ধরিয়ে দিলে জুলমত শেখের বৃদ্ধা মা পুড়ে মারা যায়। নন্দলালপুরের রাখাল চন্দ্র প্রামাণিক ও তালেব ডাক্তারকে হত্যা করে। ওয়াশীর জুমারত শেখের বাড়িতে ডাকাতি করতে এসে রাজাকাররা গুলি করলে গৃহকর্তা গুরুতর আহত হয়। রামদিয়ার ললিতকে রাজাকাররা ডেকে নিয়ে গিয়ে মেরে ফেলে।

রাজাকারদের থেকে জীবনের ভয় ছিল ভিন্ন ভিন্নœ প্রকৃতির। অনেকক্ষেত্রে দেখা যায়, রাতে ডাকাতি করার সময় চিনে ফেলার কারণে গৃহস্বামীকে গুলি করেছে। আর যদি কোনোভাবে গৃহকর্তা পালিয়ে গিয়ে থাকে তবে পরিচিত সেই রাজাকার তাকে খুঁজে বেড়ায়, তবে প্রকাশ্যে নয়। যেটা ঘটেছে পান্টির বড় ব্যবসায়ী আবদুল হাকিম শাহ এর জীবনে। মোহননগরের ফকির মোল্লাকে পান্টি বাজারে কিছু রাজাকার ধরে। তার বাড়িতে শেখ মুজিবের ছবি আছে এরূপ অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের চেষ্টা করে। যদি থেকে থাকে তাহলে তা নামিয়ে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি লাগাতে বলে। ফকির মোল্লা সবাইকে শুনিয়ে বলে যে, “আমি ছবি ঝুলাইছি তাতে তোদের কি? তোরা যা খুশি বলিস না কেন আমি ছবি নামাব না”। এ ছাড়া সে রাজাকারদেরকে গালিও দেয়। এ-কারণে অস্ত্রধারী রাজাকাররা তাকে ধরে নিয়ে নরেন কামারের দোকানে বেঁধে মারতে থাকে। তাকে কোথায় মেরে ফেলা হবে এরকম পরামর্শ করে। (তবে সেদিন ফকির মোল্লা রক্ষা পায়। কারণ পরামর্শ শুনে কামার তার ছোট ছেলেকে পাঠায় পান্টির রাজাকার মকবুল মণ্ডলকে ডেকে নিয়ে আসতে। মকবুল মণ্ডলকে দেখে রাজাকাররা ফকির মোল্লাকে তার হাতে দিয়ে তখনই গুলির নির্দেশ দিয়ে অন্য জায়গায় চলে যায়। মকবুল মণ্ডল তাকে নিয়ে গ্রামের অপরদিকে এসে তাকে ছেড়ে দিয়ে কয়েকমাস দূরে থাকতে বলে, আর ফাঁকা দু’টি গুলি করে)। আবার বাগবাড়িয়ার রণজিৎ মণ্ডল (তখন ছাত্র) যুদ্ধ শুরুর কিছু পরে ভারত থেকে এলে পান্টি ইউনিয়নের রাজাকাররা পান্টি বাজার থেকে তাকে ধরে। তাকে মুক্তিযোদ্ধাদের এজেন্ট, ভারতের গুপ্তচর, রাজাকারদের সংবাদ নেওয়ার জন্য এসেছে প্রভৃতি বলে ধরে এবং হত্যা করতে মাঠের দিকে নিয়ে যেতে থাকে। কিন্তু একই গ্রামের রাজাকার জলিলকে দেখে রণজিতকে তার কাছে দিয়ে গুলি করতে বলে ওরা চলে যায়। (অবশ্য জলিল তাকে নদীর ধারে (ডাকুয়ানদী) নিয়ে গিয়ে বলে “সাঁতরে চলে যাও, বেশ কিছু দিন সামনে এসো না।”)

অর্থাৎ রাজাকাররা যাকে সন্দেহ করত তাকেই ধরতো। তবে রাজাকার সদস্যরা উচ্চবংশ বা বিত্তশালী না হওয়ার কারণে সমাজে তাদের খুব বেশি মর্যাদা ছিল না। তাদেরকে কেউ কখনও সম্মান করে চলত না এবং তারা কাউকে ধমক দিলে দ্বিগুণ জোরে তাদের উপর লোকেরা ধমক দিত। এ-কারণেই ফকির মোল্লার এ দশা হয়। বরং অনেকের ডাকাতিতে উৎসাহ ছিল বেশি। আর এক্ষেত্রে তারা নিজ গ্রাম বা এলাকাকে বাদ দিয়ে অন্য গ্রামে যেত। তবে এ জন্য একজন সে গ্রামের পরিচিত লোক দরকার হতো। আর এই পরিচিত লোককে চিনে ফেললেই হতো বিপদ।

পাবনাতে প্রতিরোধযুদ্ধের পরে যখন পাক-আর্মি আবার ঐ এলাকা দখল করে নেয় তখন অনিল দারোগা (যুদ্ধে থানার অস্ত্র দিয়ে সাহায্য করেছিল) সপরিবারে জোতপাড়ায় দূর সম্পর্কের আত্মীয় বাড়িতে পালিয়ে আসেন। উদ্দেশ্য এখান থেকে নিরাপদে ভারত যাওয়া। প্রায় এক দেড় মাস পরে তারাসহ অনেক হিন্দু পরিবার এবং মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার জন্য কিছু লোক ভারতের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। কীভাবে যেন সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে যে, তার কাছে ১ কেজি সোনা (সোনার গহনা) আছে। কুমারখালি ঘাটে নৌকায় উঠার পরে তারা রাজাকারদের আক্রমণের শিকার হয়। কোনোরকম ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ না দিয়ে তারা দারোগা ও তার ছেলেকে হত্যা করে। অর্থাৎ যোদ্ধা হিসেবে নয় শরণার্থী হিসেবেও জীবনের ঝুঁকি একইরকম ছিল।

প্রতিরোধযুদ্ধের পরে নকশালরা জীবনের হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। তাদের লক্ষ্য ছিল দু’টোÑ প্রথমত, প্রতিরোধযুদ্ধের সময় যারা থানা থেকে অস্ত্র পেয়েছিল এমন লোকদের আক্রমণ করে অস্ত্র কেড়ে নেওয়া। দ্বিতীয়তÑ একটা সুসজ্জিত সশস্ত্র গ্র“প তৈরি করা এবং এজন্য অবস্থাপন্নœ লোকদের নিকট থেকে অর্থ আদায়। দাবিকৃত অর্থ দিতে বিলম্ব হওয়ায় কয়াতে আবদুল গফুরকে এবং অর্থ দিতে অস্বীকার করায় আঃ সামাদ খানকে হত্যা করে (জুন মাসে)। খুব দ্রুতই ভারত থেকে সবেমাত্র আসা মুক্তিযোদ্ধারা তাদের টার্গেটে পরিণত হয়। মুক্তিযোদ্ধারা তাদেরকে অস্ত্র ও গুলি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে একত্রিত হয়ে রাজাকার কমান্ডারের বিরুদ্ধে অভিযান করে সফল হয়। এ অভিযান পর্যালোচনা ও পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণের জন্য গোপনে রাধার গ্রামে পরিত্যক্ত এক হিন্দুবাড়িতে মিটিং আহ্বান করা হয়। এখানে সুকৌশলে নকশাল বাহিনীকে নিরস্ত্র করে এবং তাদের নেতাকে হত্যা করে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। এটা কুমারখালীর কয়াতে ঘটেছিল। কিন্তু নকশালদের এক শক্তিশালী বাহিনীর মুখোমুখি হতে হয় মুক্তিযোদ্ধাদের পাবনার চরে। এখানে কুষ্টিয়ার কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা তিনদিন একটানা যুদ্ধ করে তাদেরকে পরাস্ত করে।

এ ছাড়াও যুদ্ধ শুরু হলেই বিশেষ কিছু লোক ঝুঁকির সম্মুখীন হয়। এরা হচ্ছেন প্রতিটি ইউনিয়নের চেয়ারম্যানরা। এখানে কুষ্টিয়ার তিনজন চেয়ারম্যানের নাম উল্লেখ করা যায়Ñ প্রথমজন পান্টি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান খিলাফত উদ্দিন। তিনি ছিলেন ’৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর কাছে পরাজিত মুসলিম লীগ প্রার্থী ও শিল্পপতি আফিল উদ্দিনের ভাই। তিনি কুষ্টিয়ার প্রথম প্রতিরোধযুদ্ধেÑ ইউনিয়নবাসীরা কে কি পরিমাণ রুটি, ডাব, নারকেল, মুড়ি, চিড়াগুড়সহ অন্যান্য সামগ্রী দিবে তা নির্ধারণ করেন। নির্দিষ্ট দিন তা ইউনিয়ন পরিষদে জমা হওয়ার পর তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করে সেগুলো পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। এ কাজে গ্রামের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ছাড়াও সর্বস্তরের জনগণের সহযোগিতা লাভ করেন এবং সবাইকে এই বলে আশ্বস্ত করেন যে, যেকোনো বিপদের মুখে তিনি সবাইকে নিয়ে এভাবেই ইউনিয়নকে রক্ষা করবেন। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই পরিস্থিতি পালটে যায়। কুষ্টিয়া পুনর্দখলের পরে তিনি পাকিস্তানিদের অনুগত হয়ে পরেন। পিসকমিটির চেয়ারম্যান হওয়ার পর ইচ্ছামত আর্মি-বিহারি নিয়ে আসা, বাড়ি বাড়ি খোঁজ নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের ধরা, ইউনিয়নে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নির্মূল করা, একইসাথে ৫ জন মুক্তিযোদ্ধাকে গুলি করে হত্যা করা, বাড়ি পোড়ানো ও লুটসহ পান্টি বাজার সম্পূর্ণরূপে পুড়িয়ে দেওয়ায় নেতৃত্ব দেন।

দ্বিতীয়জন জিয়ারোখী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এবং রাতুল পাড়ার সবচেয়ে অবস্থাপন্নœ এদবার রহমান বিশ্বাস। প্রতিরোধযুদ্ধে সহায়তাকারী এই চেয়ারম্যানও পিসকমিটির সভাপতি হন। তিনি রাজাকারদেরকে নিয়ন্ত্রিতভাবে পরিচালনা করার পাশাপাশি নিয়মিতভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তাও করেছেন। তার ভাষায়, “আমার বাড়িতে নিয়মিত তিন হাড়ি ভাত রান্না হতো। রাজাকারদের জন্য, বাড়ির লোকদের জন্য আর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য।” সর্বদা সতর্ক থাকতে হতো কেউ যেন এ বিষয়গুলো প্রকাশ না করে। তার অবস্থান ছিল ‘ধারালো ছুরির মাঝখানে’থÑ এদিক ওদিক হলেই নিশ্চিত মৃত্যু। তাকে ৩/৪ বার পাক-আর্মি নিয়ে যায় বিভিন্ন ধরনের অভিযোগের প্রেক্ষিতে। প্রথমবার দুর্বাচারাতে তার ভগ্নিপতি উজানগ্রাম ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সলিম বিশ্বাসকে না পেয়ে তাকে ধরে। সৈন্যদের সাথে সাথে তাকেও প্রায় দৌড়ে ৪ কিলোমিটার দূরে দুর্বাচারার ক্যাম্পে যেতে হয়Ñ এটা রাত্রিতে এবং চারিদিকে ছিল শুধু পানি। সেখানে তাকে বসিয়ে রেখে তার কতগুলি ছেলেমেয়ে, নাম, কে-কি করে ইত্যাদি শোনার পর সলিমের কয় ছেলেমেয়ে, কি নাম, কে কি করে ইত্যাদি জিজ্ঞাসা করতে থাকে পাক-আর্মি। কিছু সময় পরপরই জিজ্ঞাসা করে “সলিম কাঁহা?” অনেক সময় ‘আমি জানি না’ ধরনের উত্তর দেওয়ার পরও যখন একই প্রশ্ন করতে থাকে তখন বিরক্ত হয়ে এক সময় তিনি বলেন, “সলিম ভারত যাওয়ার পথে ছেলেমেয়ে নিয়ে ডুবে গেছে নদীতে।” একথায় অফিসারটি উৎফুল্ল হয় এবং তারাও একই কথা শুনেছে বলে তাকে ছেড়ে দেয় রাত একটার দিকে। তিনি বলেন,“ আরেকদিন আর্মি আমাদের বাড়িতে এসে আমার বৈঠকখানায় বসে এবং আমাকে সাথে করে কুষ্টিয়া নিয়ে যায়। সেখানে আমাকে একটা ভারতীয় সংবাদপত্রের ছেড়া অংশ দেখায় যেটা আমার বৈঠকখানাতে টেবিলের উপর থেকে নিয়ে গিয়েছে। এ ছাড়া  আবারও আমার ও সলিম বিশ্বাসের ছেলেমেয়ের নাম জিজ্ঞাসা করে এবং “সলিম কাঁহা” বারবার বলতে থাকে। আমি আগের দিনের মতোই বললে ‘ঠিক বলেছ’ বলে ছেড়ে দেয়।” তিনি আরও বলেন,“ আরেকদিন দুইজন রাজাকার এসে আমাকে সাথে নিয়ে বিত্তিপাড়া ক্যাম্পে যায়। এখানে আঃ মজিদ খান ওরফে মজিদ কসাই ছিল প্রধান ব্যক্তি। সে খুব ভয়ঙ্কর লোক ছিল এবং বিভিন্ন এলাকা থেকে যে মানুষগুলোকে ধরে নিয়ে আসা হতো তাদেরকে সে জবাই করত। আমাকে তার সামনে অনেক সময় বসিয়ে রাখা হয়। তারপর সে আমার মেজ ছেলের নাম জানতে চায়। এরপর বলে যে, সে মুক্তিযোদ্ধা হয়েছে এবং ভারতে গেছে। আমি সাথে সাথে অস্বীকার করি এবং বলি যে, সে কুৃষ্টিয়াতে চাচার বাসায় আছে। উল্লেখ্য,, ও সত্যিই মুক্তিযোদ্ধা হয়েছে এবং ভারতে গিয়েছিল। কিন্তু ফিরে এসে চাচার বাসায় উঠেছে এবং দিনের বেলাতে থানায় গিয়ে দারোগার সাথে দেখা করে এসেছে। আমার উপর যেকোনো সময় বিপদ হতে পারে ভেবেই এটা করে। মজিদ সাহেব কুষ্টিয়াতে দারোগার কাছে সংবাদ পাঠিয়ে ঐ নির্দিষ্ট বাসাতে আমার ছেলে আছে কিনা জানতে চায়। দারোগা জানায়, সে আজই তার সাথে দেখা করেছে। ফলে আবার দুইজন রাজাকার আমাকে বাড়ি পৌঁছে দিতে বলে। আমার ভাগ্নে বাবু মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ছিল এবং প্রায়ই দল নিয়ে আমার বাড়িতে সন্ধ্যার পরে এসে খেয়ে যেত। তবে আমার বাড়িতে থাকত না কখনও। এভাবে আমাকে বারবার আর্মি-বিহারিরা ডেকে নিয়ে যেত। আর প্রতিবারই যাওয়ার সময় মনে হতো এই শেষ যাওয়া। আমার ফিরতে দেরি দেখলে গ্রামের পুরুষ মহিলারা সেই জায়গায় যেত। তবে বলতে হয় যে, দুই নৌকায় পা দিয়ে আমি সত্যিই জীবনের ঝুঁকি নিয়েছিলাম।”

Print Friendly