আহ্বায়ক কমিটি নির্ভর বরিশাল বিএনপি : প্রভাব বিস্তারের দ্বন্দ্বে চলছে বহুমুখী বিভক্তি
বিশেষ প্রতিবেদক
বরিশালের রাজনীতিতে এখন সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হচ্ছে – উন্নয়ন নয়, প্রশাসনিক ও সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ। ক্ষমতার কেন্দ্র কার হাতে থাকবে? তা নিয়ে চলছে নীরব কিন্তু তীব্র বহুমুখী লড়াই। মহানগর ও জেলা উভয় স্থানেই প্রবল নেতৃত্ব সংকটে রয়েছে বিএনপি। তাদের গঠিত সরকারের ১০০ দিন পার হলেও বরিশালে এখনো কোনো একক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়নি। একক নেতৃত্বই শুধু নয়, এখানে আদৌ কোনো নেতৃত্ব আছে কিনা তা নিয়েও জনমনে রয়েছে সংশয়। আর এ সংশয় গত প্রায় পাঁচ বছর ধরে চলমান। বিশেষ করে বরিশালের রাজনীতি থেকে মজিবর রহমান সরোয়ারকে সরিয়ে নেওয়ার পরপরই শুরু হয়েছে নেতৃত্বের কোন্দল। বহুবার পরিবর্তন হয়েছে আহ্বায়ক কমিটিও। গত ১২ ফেব্রুয়ারীর নির্বাচনে বিএনপির জয় লাভের পর থেকে বরিশালে এই নেতৃত্বহীনতা আরো স্পষ্ট হয়েছে। বিশেষ করে বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন বরিশাল সিটি করপোরেশনের (বসিক) প্রশাসক নিযুক্ত হওয়ার পর থেকে এ দ্বন্দ্ব যেন অনেকটা প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেছে।
বরিশাল ৫ সদর আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মজিবর রহমান সরোয়ার, বরিশাল ১ গৌরনদী আগৈলঝারা আসনের সংসদ সদস্য ও বর্তমান তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন এবং বরিশাল সিটি করপোরেশন (বসিক) প্রশাসক ও বিএনপির বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন এর বরিশালের কার্যক্রম, তাদের সভ সমাবেশে নেতাকর্মীদের উপস্থিতি৷, বাস টার্মিনাল স্থানান্তর, বাণিজ্য মেলা বন্ধ ও চালু হওয়া নিয়ে বিএনপি নেতা এবায়দুল হক চান ও শিরিনের ইগো দ্বন্দ্ব, জেলা পরিষদের দায়িত্ব নিয়েও আরেক সাংগঠনিক সম্পাদক আকন কুদ্দুসুর রহমানের দায়িত্ব এড়িয়ে চলা ইত্যাদি বিষয় পর্যালোচনা করে এটা নিশ্চিত যে এখানে বিএনপির দলীয় রাজনীতি ও প্রশাসনিক বলয়ের ভিতর বহু বিভক্তি স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
গত মার্চ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বরিশালের বিভিন্ন মন্ত্রীদের আগমন, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন, হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা, সিটি করপোরেশনের কার্যক্রম এবং রাজনৈতিক কর্মসূচির নেপথ্যে এই বহুমুখী দ্বন্দ্বের প্রভাব টের পেয়েছেন বরিশালের সাধারণ মানুষও। যে কারণে এ নিয়ে চায়ের দোকানসহ সামাজিক জটলাতেও চলছে মুখরোচক আলোচনা। কেউ কেউ শিরিনের কার্যক্রমকে বাহবা দিলেও চুপিসারে বলছেন, বরিশালের রাজনৈতিক মুরব্বি মজিবর রহমান সরোয়ার। তার সাথে পরামর্শ করেই পদক্ষেপ নেওয়া উচিত শিরিনের। আবার কেউ বলছেন, মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বরিশালে আসলে সরোয়ার শিরিন কেউই বরিশালে থাকেন না। আবার জেলা ও মহানগর বিএনপির নেতৃবৃন্দ কাউকেই দেখা যায়নি মন্তী- প্রতিমন্ত্রীর আশেপাশে। এটাও জটিলতা তৈরি করছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন স্বপন বরিশালের এমপি হলেও তিনিতো এখন বাংলাদেশের প্রতিটি জেলার মন্ত্রী। তার আগমনে বা উপস্থিতিতে সদর আসনের সংসদ সদস্য ও সিটি করপোরেশনের প্রশাসক, জেলা পরিষদের প্রশাসকের অনুপস্থিতি দৃষ্টিকটু। বরং সবাই যখন বিএনপির নেতা, তাদের সবাইকে একই মঞ্চে পাশাপাশি দেখতে চায় সাধারণ মানুষ।
যদিও মহানগর বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আগামী ৩০ মে এরকম কিছু হবে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাহাদাৎ বার্ষিকী আয়োজনে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অনেকেরই ধারণা ছিল দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী নেতা মজিবর রহমান সরোয়ার সহজেই একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবেন। কারণ তিনি বরিশাল-৫ আসন থেকে মেয়র ও চার চারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন এবং কেন্দ্রীয় রাজনীতিতেও তার অবস্থান অনেক শক্তিশালী। কিন্তু সবাইকে হতাশ করে তার জনসমর্থন দিনকে দিন কমেছে। ১২ ফেব্রুয়ারী তিনি পঞ্চমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও তা অত্যন্ত দূর্বল কাঠামোর উপর দাঁড়িয়েছে, কেননা সবসময় ২০ হাজারের কাছাকাছি ভোট পাওয়া ইসলামি আন্দোলন প্রার্থী মুফতি মাওলানা ফয়জুল করিম ৯০ হাজারের বেশি ভোট পেয়েছেন। অন্যদিকে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়ে বরিশাল ১ আসনের সংসদ সদস্য জহির উদ্দিন স্বপনের প্রভাব দ্রুত বাড়তে থাকে। একইসঙ্গে বরিশাল সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হন বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন। এতে প্রশাসনিক ও সাংগঠনিকভাবে আলাদা শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হন তিনি। দীর্ঘদিন রাজনীতির মাঠে সক্রিয় জেলা ও মহানগর বিএনপির অনেক নেতা এতে ক্ষুব্ধ হন এবং কেউ কেউ প্রকাশ্যে শিরিনের বিরোধিতা শুরু করেন। জেলার সাবেক সভাপতি এবং কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবায়দুল হক চান, মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব জিয়াউদ্দিন সিকদার, সাবেক সদস্য সচিব মীর জাহিদ প্রমুখের মধ্যে স্পষ্ট ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটে।
তবে স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক কাজী মিজানুর রহমান এর মতে, বরিশালে এখন প্রকাশ্য বিরোধের চেয়ে “নিয়ন্ত্রণের নীরব যুদ্ধ” বেশি চলছে। কে প্রশাসনে প্রভাব রাখবে, কে উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ন্ত্রণ করবে, কে দলীয় কমিটি ও মাঠের কর্মীদের ধরে রাখবে—এসব হিসাবেই রাজনীতি এগোচ্ছে।
আবার রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাহবুব খান বলেন, আসলে ৫ আগস্টের পর দল থেকে বহিস্কৃত নেত্রী বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন হঠাৎ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক এটা মেনে নিতে অনেকের কষ্ট হয়েছে। তবে শিরিন তার কাজ ও আচরণ দিয়ে সবাইকে জয় করে নিতে শুরু করেছেন। ২৫ মে বিকালে নগর ভবনের মিলনায়তনে তার কিছুটা প্রমাণও পাওয়া গেছে। এখানে জেলা ও মহানগর বিএনপির প্রায় অনেকেই উপস্থিত ছিলেন। যারা ইতিপূর্বে শিরিনকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করেছেন তাদের অনেকেও ছিলেন বলে জানান রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাহবুব খান।
এসবের মধ্যে সম্প্রতি প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন নথুল্লাবাদ বাস টার্মিনাল স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নিলে সংকট আরো প্রকট আকার ধারণ করে। বাস ও ট্রাক মালিক সমিতির নিয়ন্ত্রণ মজিবর রহমান সরোয়ার এর আপন ভাই ও শ্যালকের হাতে থাকায়। শিরিনের সিদ্ধান্ত বিরোধী অবস্থান তৈরি হয় এই টার্মিনালকে ঘীরে।
যদিও গত ২০০৬ সাল থেকেই বরিশালের সবচেয়ে আলোচিত ইস্যুগুলোর একটি নথুল্লাবাদ কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল স্থানান্তর পরিকল্পনা। নগর পরিকল্পনাবিদ ও ট্রাফিক বিশেষজ্ঞদের দীর্ঘদিনের দাবি—শহরের কেন্দ্র থেকে বাস টার্মিনাল সরিয়ে বাইপাসসংলগ্ন এলাকায় নেওয়া না হলে যানজট, শব্দদূষণ ও জনদুর্ভোগ কমবে না।
২০১৪ সালে প্রয়াত মেয়র শওকত হোসেন হিরন এজন্য উদ্যোগী হন এবং নগরীর প্রবেশদ্বার সংলগ্ন সড়কের পাশে সাড়ে বারো একর জমিতে বাস টার্মিনাল স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়ে জমি ক্রয় চূড়ান্ত করেন। পরবর্তীতে এটি ধামাচাপা পরে যায় ও সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ এসে কাশিপুর স্কুল এন্ড কলেজ সংলগ্ন সড়কের পাশে ট্রাক টার্মিনাল তৈরি করে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি করেন। এ নিয়ে মামলা এখনো চলমান থাকলেও কলেজ কর্তৃপক্ষ বলেছেন, গড়িয়ার পাড়ে বাস টার্মিনাল স্থানান্তর না হওয়া পর্যন্ত কাশিপুর ট্রাক টার্মিনালকে বাস টার্মিনাল করা যেতে পারে। এতে তাদের কোনো আপত্তি না থাকলেও বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বাস ও ট্রাক মালিক সমিতির নেতারা। এই টার্মিনাল স্থানান্তরের দাবি নতুন নয়। অন্তত কয়েক বছর ধরেই নগর পরিকল্পনাবিদ, ব্যবসায়ী ও পরিবহন সংশ্লিষ্টদের একটি অংশ এ দাবি জানিয়ে আসছিল। তবে বিএনপি সরকার গঠনের পর সিটি করপোরেশন প্রশাসক বিষয়টি নতুন করে সক্রিয় করলে তা রাজনৈতিক মাত্রা পেতে শুরু করে।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের অভিযোগ, সরোয়ার পরিবারের ঘনিষ্ঠ পরিবহন সংশ্লিষ্ট একটি অংশ এই পরিকল্পনার বিরোধিতা শুরু করেছে। অভিযোগ রয়েছে, টার্মিনালকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের আর্থিক ও প্রভাবভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ হারানোর আশঙ্কা থেকেই এই বিরোধিতা। জানা গেছে ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরপরই বরিশালের বাস ও ট্রাক টার্মিনালের দখল নিয়েছেন বরিশাল-৫ আসনের সংসদ সদস্য মজিবর রহমান সরোয়ারের ঘনিষ্ঠরা। তার ছোট ভাই মোশারফ হোসেন বাস মালিক সমিতির সভাপতি। ট্রাক মালিক সমিতির সভাপতি সাইদুর রহমান মামুন সরোয়ারের শ্যালক।
পরিবহন খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, নথুল্লাবাদ শুধু একটি টার্মিনাল নয়; এটি বরিশালের অন্যতম বড় অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র। প্রতিদিন শত শত বাস চলাচলের কারণে এখানকার নিয়ন্ত্রণ মানেই শ্রমিক সংগঠন, পরিবহন রুট ও আর্থিক প্রবাহের ওপর প্রভাব। ফলে প্রশাসনিক পর্যায়ে ফাইল অগ্রগতি ধীর হয়ে যায় এবং সিটি করপোরেশনের একাধিক উদ্যোগ কার্যত থমকে পড়ে।
সিটি করপোরেশনের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “টার্মিনাল স্থানান্তর শুধু উন্নয়ন প্রকল্প নয়, এটি বরিশালের প্রভাবের রাজনীতির অংশ হয়ে গেছে। কে নিয়ন্ত্রণ করবে, সেটিই এখন মূল বিষয়।”
সাবেক একজন গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন সংশ্লিষ্ট নেতা বলেন, “টার্মিনাল সরানো মানে পুরোনো নিয়ন্ত্রণ কাঠামো বদলে যাওয়া। এজন্য ভেতরে ভেতরে অনেক চাপ কাজ করছে।”
প্রশাসক শিরিনকে অসহযোগিতার অভিযোগ
বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন দায়িত্ব নেওয়ার পর নগর পরিচ্ছন্নতা, অবৈধ দখল উচ্ছেদ, হোল্ডিং ট্যাক্স পুনর্বিন্যাস, বাড়ির প্লান হস্তান্তর এবং জলাবদ্ধতা নিরসনে একাধিক উদ্যোগ নেন। কিন্তু তার প্রশাসনিক কার্যক্রমে দলীয় পর্যায় থেকেই বাধা তৈরি হচ্ছে—এমন অভিযোগ এখন বিএনপির অভ্যন্তরেও আলোচিত বিষয় ।
সিটি করপোরেশনের কয়েকজন সাবেক কাউন্সিলর অভিযোগ করেছেন, গুরুত্বপূর্ণ সভা বয়কট, প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি তৈরি, ঠিকাদার নিয়ন্ত্রণ এবং মাঠপর্যায়ের কর্মসূচিতে লোক সমাগম কমিয়ে দেওয়ার মতো নীরব অসহযোগিতা চলছে। যদিও প্রকাশ্যে কেউ এ দায় স্বীকার করছেন না।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন, নিয়োগ, ঠিকাদারি ও উন্নয়ন কার্যক্রমে “কার প্রভাব থাকবে”—তা নিয়েও মহানগর বিএনপির মধ্যে দ্বন্দ্ব লক্ষ্য করা গেছে। সদস্য সচিব জিয়াউদ্দিন সিকদার এর অবস্থানও বিতর্কিত হয়েছে বারবার। প্রশাসনিকভাবে দায়িত্বে থাকলেও রাজনৈতিকভাবে শিরিনকে চাপে রাখার চেষ্টা চলছে বলে তার ঘনিষ্ঠদের অভিযোগ।
অন্যদিকে বিভিন্ন আয়োজনে বেশ কয়েকবার বরিশালে এসেছেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। তার ঐ মঞ্চে সংসদ সদস্য মজিবর রহমান সরোয়ার এবং প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন কিম্বা জেলা পরিষদের প্রশাসক আকন কুদ্দুসুর রহমান এর অনুপস্থিতি জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে। বরিশালে স্বপনের উপস্থিতি কেউ স্বাভাবিক ভাবে নিচ্ছে না বলেও একাধিক অভিযোগ রয়েছে।
একজন সাবেক ছাত্রদল নেতা বলেন, বরিশালে এখন প্রশাসন আর রাজনীতি আলাদা নেই। কে কাকে ছাড়িয়ে যাবে, সেটিই মূল প্রতিযোগিতা। যার প্রমাণ পাওয়া গেছে শের ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (শেবাচিম) ও নির্মানাধীন শিশু হাসপাতাল ইস্যুতে। শেবাচিম নিয়েও সম্প্রতি যে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে তা হাসপাতালের পরিচালনা পর্ষদ গঠন নিয়ে। স্বাস্থ্য মন্ত্রীর ঘোষণা এবং সভাপতি হিসেবে কারো নাম চূড়ান্ত হয়েছে বলার পরপরই অনুসন্ধানে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনের নাম আলোচনায় আসে। দুদিনের মধ্যে গেজেট হওয়ার কথা থাকলেও অজ্ঞাত কারণে আজ পর্যন্ত তার নাম ঘোষণা বা গেজেট প্রকাশ হয়নি। পাশাপাশি এরপর থেকেই প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তারের নতুন হিসাব শুরু হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
গত মার্চে হাসপাতালের একটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা, ডাক্তার ও নার্সের দায়িত্ব অবহেলায় দুজন শিশুর মৃত্যু ঘটনার পর স্বাস্থ্যখাতের অব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক দুর্বলতা নতুন করে আলোচনায় আসে। এর মধ্যেই নির্মাণাধীন শিশু হাসপাতালকে শেবাচিম হাসপাতালের প্রশাসনিক কাঠামো থেকে পৃথক করার আলোচনা শুরু হলে বিষয়টি রাজনৈতিক রূপ নিতে থাকে।
বিশেষ করে নির্মাণাধীন শিশু হাসপাতালকে শেবাচিম হাসপাতালের প্রশাসনিক কাঠামো থেকে পৃথক করার প্রক্রিয়া নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। হাসপাতাল সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা ও চিকিৎসক মনে করছেন, এটি কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অংশ।
একজন চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “শিশু হাসপাতাল আলাদা হলে নিয়ন্ত্রণও আলাদা হবে। এ কারণে বিভিন্ন পক্ষ সক্রিয় হয়ে উঠেছে।”
অভিযোগ রয়েছে, শেবাচিমের অভ্যন্তরেও শিরিন, স্বপন ও সরোয়ারপন্থী হিসেবে পরিচিত বলয় তৈরি হয়েছে। এছাড়াও প্রভাব রয়েছে মহানগর বিএনপির একাধিক নেতার। এখানে পদায়ন, ঠিকাদারি, ক্রয় প্রক্রিয়া এবং পরিচালনা কমিটিতে প্রভাব বিস্তার নিয়ে নীরব প্রতিযোগিতা চলছে। এমনকি পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মশিউল মুনীর সেনাবাহিনীর লোক হয়েও এদের হাতের পুতুল বলেও একাধিক অভিযোগ রয়েছে। কেননা, ৫ আগস্টের পর পালিয়ে যাওয়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও তাদের লোককে খুঁজে এনে আবারও কাজে লাগানো হয়েছে শেবাচিমে।
হাসপাতাল সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, “স্বাস্থ্যখাত এখন শুধু চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার বিষয় নয়, বরং রাজনৈতিক প্রভাবের অংশ হয়ে উঠেছে। এরসাথে জড়িত রয়েছে ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য। কারো কারো জন্যে এখানেও ভোটব্যাংক ফিলোসোফি কাজ করছে বলে জানান সচেতন চিকিৎসকরা।
১০০ দিনে দৃশ্যমান বিভক্তি
বিএনপি সরকারের প্রথম ১০০ দিনে বরিশালে বড় ধরনের প্রকাশ্য সংঘাত না হলেও অভ্যন্তরীণ বিভক্তি ক্রমেই দৃশ্যমান হচ্ছে। নগর উন্নয়ন, হাসপাতাল প্রশাসন, দলীয় পূর্নাঙ্গ কমিটি না হওয়া, পরিবহন খাত এবং ঠিকাদারি—সবখানেই এখন “কোন বলয়ের প্রভাব বেশি”—সেই হিসাবে চলছে নেতাকর্মীদের সমাগম ও সমর্থন।
বিশেষ করে—
* সিটি করপোরেশনের উন্নয়ন বড়ো প্রকল্পে ধীরগতি,
* পরিবহন খাতে নিয়ন্ত্রণ প্রশ্ন,
* হাসপাতাল প্রশাসনে বলয়ভিত্তিক অবস্থান,
* দলীয় কর্মসূচিতে আলাদা উপস্থিতি এবং স্থানীয় কমিটি পুনর্গঠনে মতবিরোধ
এসব বিষয় এখন রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, সরোয়ারের দীর্ঘদিনের সাংগঠনিক ভিত্তি, স্বপনের মন্ত্রিত্বজনিত প্রশাসনিক প্রভাব এবং শিরিনের সাংগঠনিক ও সিটি করপোরেশন নিয়ন্ত্রণ – এই তিন শক্তির সংঘাত আগামী দিনে আরও স্পষ্ট হতে পারে। তদুপরি এখন পর্যন্ত আহ্বায়ক কমিটি নির্ভর বরিশালের বিএনপি। বারবার পূর্নাঙ্গ কমিটির প্রতিশ্রুতি পিছিয়ে যাওয়া নেতৃত্বের সংকট তৈরি করছে বলে মনে করেন অনেকেই।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের একজন শিক্ষক বলেন,
“বরিশালে এখন মূল লড়াই আদর্শের নয়, নিয়ন্ত্রণের। কে প্রশাসন, উন্নয়ন ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে শেষ কথা বলবে—তা নিয়েই চলছে প্রতিযোগিতা।”
যদিও এ প্রতিযোগিতায় নিজেকে রাখতে রাজী নয়, জহির উদ্দিন স্বপন। তিনি বলেন, সদর উপজেলা আমার নানাবাড়ি। আমি জন্মেছি ওখানে তালুকদার হাটের তালুকদার বাড়িতে। তাই ভালোবাসার টানে ওখানে যাই।
দলমত নির্বিশেষে সদর উপজেলার সকলের প্রতি আমার গভীর ভালবাসা ও শ্রদ্ধা রয়েছে দাবী করে স্বপন আরো বলেন, স্বার্থ সংশ্লিষ্ট যেকোনো বিষয় আমি এড়িয়ে চলতে পছন্দ করি। বিভক্তি নয়, ঐক্যবদ্ধ বিএনপির নেতৃবৃন্দের জন্য আমার দরজা সবসময় খোলা।
এদিকে সিটি করপোরেশন প্রশাসক বিলকিস আক্তার জাহান শিরিন বাস টার্মিনালটি স্থানান্তরের বিষয়ে অটল। তিনি জানিয়েছেন, খুব শিগগির প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে ট্রাক টার্মিনালে অস্থায়ী বাস টার্মিনাল করা হবে। তবে বরিশাল সিটি করপোরেশন ও বিএনপি একই সুতোয় গাঁথা। এখানে কোনো বিভক্তি নেই বলে দাবী করেন তিনি।
যদিও তার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নিয়েছেন জেলা বাস মালিক সমিতি ও জেলা ট্রাক মালিক সমিতি।
বাস মালিক সমিতির ভাষ্য, অন্যত্র স্থায়ী বাস টার্মিনাল না হওয়া পর্যন্ত তারা নথুল্লাবাদ টার্মিনাল ছাড়বেন না। আর ট্রাক মালিক সমিতি বলছে, তাদের জন্য নির্মিত টার্মিনালে বাস রাখতে দেওয়া হবে না। এ দুটি সংগঠন জোটবদ্ধ হয়ে টার্মিনাল স্থানান্তর ঠেকাতে প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে । এরফলে প্রবীণ নেতা মজিবর রহমান সরোয়ারের সাথে দ্বন্দ্বটা প্রকাশ্যে আসতে যাচ্ছে বলে মনে করেন অনেকে।
এ বিষয়ে কথা বলতে বরিশাল ৫ আসনের সংসদ সদস্য সাবেক মেয়র ও হুইপ মজিবর রহমান সরোয়ার এর সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলে তিনি অসুস্থ বলে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।




