নয়মাসেই বদলে গেছে শেবাচিম: সচল হয়েছে শতাধিক যন্ত্রপাতি 

আরিফ আহমেদ

Sharing is caring!

নয়মাসেই বদলে গেছে শেবাচিম: সচল হয়েছে শতাধিক যন্ত্রপাতি 
 বিশেষ প্রতিবেদক
চমৎকার পরিচ্ছন্ন পরিবেশ। বাহিরে নেই যানবাহনের ভিড়, গাড়ির হর্ন। হকারদের কোলাহল। দালালদের দৌরাত্ম। নেই ঔষধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের মোটরসাইকেলের ভিড়। ভিতরে হাসপাতাল ভবনের সিঁড়ি থেকে শুরু করে রোগীদের টয়লেট সবকিছুই এখন চমৎকার পরিচ্ছন্ন পাওয়া গেল ১৭ সেপ্টেম্বর  সরেজমিন অনুসন্ধানে। শুধু তাই নয় ছোটখাটো পরীক্ষানিরীক্ষার জন্য এখন আর কোনো রোগীকে ছুটতে হয়না বাহিরের ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। ভিতরেই এখন অনেক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা করতে পারছেন রোগী ও স্বজনরা। নার্স ও রোগীদের সাথে কথা বলে জানা গেল, বড়ো বড়ো পরীক্ষা যেমন সিটিস্কান, এমআরআই ছাড়া বাকী সব পরীক্ষানিরীক্ষা এখন হাসপাতালের ভিতরেই সম্ভব। এগুলো সহ ক্যান্সার চিকিৎসার সব উপকরণ আনার বিষয়েও কার্যক্রম চলছে বলে জানা গেল। ইতিমধ্যে হার্টের সফল অপারেশন, রিং পড়ানোসহ যাবতীয় চিকিৎসা সেবা সম্পন্ন হয়েছে। এ নিয়ে ভূয়সী প্রশংসা পেয়েছেন হাসপাতালের বর্তমান পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মশিউল মুনীর। বলা যায়, গত ২০ বছরের চিত্র নয়মাসেই বদলে দিয়েছেন তিনি। মশিউল মুনীর গত ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে শের ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (শেবাচিম) এর পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কাজে যোগদান করেই তিনি ২৮ নভেম্বর সংবাদ সম্মেলনে হাসপাতালের করুন অবস্থা তুলে ধরেন এবং এ সংক্রান্ত জটিলতা দূর করতে সকলের সহযোগিতা কামনা করেন। আশেপাশের লোকজনের অসহযোগিতার কারণে গত জুন ২০২৫ পর্যন্ত হাসপাতালে দৃশ্যমান কোনো উন্নয়ন সম্ভব হয়নি। তবে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আনার উদ্যোগ সম্পন্ন করেন। হাসপাতালের পরিবেশ ও উন্নত হয় কিছু। তারপরও গুরুত্বপূর্ণ কাজ এগুচ্ছে না। এমতাবস্থায় বরিশালের নাগরিকদের অভিযোগ ও অসন্তোষ আমলে নিয়ে স্বাস্থ্য খাতের সংস্কারের দাবীতে আন্দোলন শুরু করে ছাত্র জনতা। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি  আগস্টে পুনরায় সংবাদ সম্মেলনে তিনমাস সময় চেয়ে ছাত্র জনতার আন্দোলনকে সমর্থন দেন । ৫০ কার্যদিবসের সময় দিয়ে ছাত্র জনতা আন্দোলন স্থগিত করার পর গত ১৫ সেপ্টেম্বর তারা হাসপাতালের অগ্রগতি পরিদর্শনে এসে প্রায় শতাধিক পরীক্ষানিরীক্ষার যন্ত্রপাতি সচলসহ হাসপাতালের পরিবেশ দেখে সন্তোষ প্রকাশ করেন আন্দোলনের বরিশালের সমন্বয়ক সাব্বির হোসেন সোহাগ। এসময় সাব্বির বলেন, সিটিস্কান, এমআরআইসহ ক্যান্সার ও হার্টের জটিল সব পরীক্ষানিরীক্ষা এবং সুচিকিৎসার নিশ্চয়তা পেতে চাই আমরা। পরিচালকের আন্তরিকতা আমাদের ভালো লেগেছে। আমরাও তাকে সহযোগিতা করতে চাই। আশাকরি তিনি শীঘ্রই এই হাসপাতালটিকে আন্তর্জাতিক মানের একটি হাসপাতাল হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেবেন। ঢাকা বা বিদেশে নয়, বরিশালের শেবাচিমেই সব চিকিৎসার সুব্যবস্থা আমরা চাই বলে জানান সাব্বির।
তবে শেবাচিম উপপরিচালক নাজিমুল আহসান, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডাঃ উর্মী, ডাঃ মহসিন সহ বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মশিউল মুনীর দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই শেবাচিমের উন্নয়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়েছেন। যার বেশিরভাগ সময়সাপেক্ষ। স্বাস্থ্য খাতের সংস্কারের দাবীতে ছাত্র জনতার আন্দোলন এই ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা রাখতে সাহায্য করেছে। যে কাজ হতে ছয় মাস লেগে যেত সেই কাজ দুমাসেই সম্ভব হয়েছে। তারপরও জটিল বিষয়দির জন্য সময় দিতে হবে। ৫০ বছরের অনিয়ম, অপ্রাপ্তি এক বছরে দূর করা যায় না, এজন্য সময় দিতে হবে বলে জানান তারা।
বরিশাল তথা দক্ষিনাঞ্চলের চিকিৎসা ব্যবস্থার অন্যতম এই প্রতিষ্ঠানটি ১৯৬৮ সালে চালু হওয়ার পর থেকে ছয় জেলার মানুষের একমাত্র নির্ভরতা হয়ে আছে। প্রায় আড়াই লক্ষ মানুষের নির্ভরতা এই হাসপাতালের দশ শয্যা বিশিষ্ট আইসিইউর সাথে ২০২০ সালে করোনা বিভাগ এর কার্যক্রম শুরু হয় ১৮টি আইসিউ শয্যা ও ১৫০ টি নতুন বেড নিয়ে। সবমিলিয়ে আইসিইউ এখন ২৮ টি এবং শয্যা সংখ্যা ১১৫০টি থাকার কথা। এদিকে প্রচণ্ড ভাবে লোকবল সংকট এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সংকটে এই হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যবস্থা ভেঙে পরেছে বলে অনেকবারই স্বীকার করেছেন সাবেক পরিচালক ডাঃ সাইফুল ইসলামও। এখানের ডাক্তার সংকট এতোটাই যে, রাতে ডাক্তার কক্ষে অবস্থানরত চারজন ইন্টার্নি চিকিৎসক দেখছেন এই ১১৫০ বেড ছাড়াও ফ্লোরিং ও আইসিইউতে অবস্থান করা আরো প্রায় ৫০০ রোগীকে।
২০২১ সালে নতুনভাবে করোনা ওয়ার্ড বর্ধিত করে সেখানে চারতলা মেডিসিন ভবন করা হয় এবং সেই ভবনে চারটি লিফট তৈরি হলেও দুটো লিফট চালু আছে । তার একটি শুধু ডাক্তার ও ভিআইপিদের জন্য। অন্যটিতে দীর্ঘ লাইনে রোগীদের চলাচল। এখানে নতুন কিছু ভবন তৈরির প্রস্তাবণা আজ পর্যন্ত ঝুলে আছে। পুরাতন ভবনের নীচতল থেকে উপরতলা পর্যন্ত সংস্কার কাজ হয়েছে তবে তা এখনো ঝুঁকি মুক্ত নয়। সেনাবাহিনী থেকে পরিচালক আসার পর তার কাজেও বাধা সৃষ্টির চেষ্টা করেছে কতিপয় ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক ও ঠিকাদার। যাদের ষড়যন্ত্র এখনো চলমান। ছাত্র জনতার আন্দোলনে এই ষড়যন্ত্রকারীদের দৌরাত্ম কিছুটা কমলেও এখনো থেমে যায়নি। তবে পরিচালক মশিউল মুনীর দক্ষাতার সাথে মোকাবেলা করছেন এদের সহ হাসপাতালে ঔষধ কোম্পানির রিপ্রেজেনটেটিভ ও দালালদের প্রবেশ। এই মুহূর্তে এদের প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ শেবাচিম চত্বরেও। পরিচ্ছন্নতার পাশাপাশি শেবাচিম এর সব বিভাগেও এসেছে পরিবর্তন। বদল হয়েছে প্রশাসন ও কর্মচারীদের। নতুন হাওয়া লেগেছে প্যাথলজি বিভাগেও। যেসব যন্ত্রপাতি দীর্ঘদিন ধরে অচল পড়ে ছিল, রোগী আর চিকিৎসকের দুঃখ বাড়াচ্ছিল, সেগুলো একে একে ফিরে পেয়েছে কার্যক্ষমতা। একটি দুটি নয়, অন্তত ৯৫টি যন্ত্রপাতি এখন আবার সচল হয়েছে। এর ফলে সেবায় ফিরেছে স্বস্তি। রোগী, নার্স ও চিকিৎসকদের মুখেও হাসি ফুটে উঠেছে। এখন আর অল্পতেই ক্ষেপে ওঠা আচরণ করেন না কোনো নার্স ও চিকিৎসক।
হাসপাতালের বারান্দায় রিপোর্টের জন্য অপেক্ষায় থাকা রোগীর স্বজন আল আমীন বললেন, ‘আগে চিকিৎসক বললেও পরীক্ষা করা যেত না, মেশিনই ছিল অচল। এখন সেই অচল যন্ত্রে প্রাণ ফিরেছে।’ শুধু রোগীর স্বজন নয়, চিকিৎসক-নার্সরাও বলছেন, অচল যন্ত্র সচলের ফলে হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর আস্থা ফিরে আসছে এখন।
জানা গেছে, স্বাস্থ্য খাতে সংস্কারের দাবিতে চলমান আন্দোলনের চাপেই প্রশাসন নড়েচড়ে বসেছে। কয়েকদিন আগে ন্যাশনাল ইলেকট্রো ইকুইপমেন্ট মেইনটেন্যান্স ওয়ার্কশপ অ্যান্ড ট্রেনিং সেন্টার (নিমিউ অ্যান্ড টিসি) এর কারিগরি দলকে ডাকা হয়েচিল। পাঁচ দিনের নিরলস পরিশ্রমে তারা সচল করেছেন ৯৫টি অচল মেশিন। শিগগিরই আরো ২০টি গুরুত্বপূর্ণ মেশিন চালু হবার কথা এ সপ্তাহের মধ্যে। আইসিইউ ভেন্টিলেটর থেকে শুরু করে অপারেশন থিয়েটারের অ্যানেসথেসিয়া মেশিন, ব্লাড ব্যাংক রেফ্রিজারেটর, ডেন্টাল ইউনিট, হাই যেন ক্যানুলা, ওটি টেবিল, ইসিজি মেশিনসহ প্রায় সব বিভাগেই এখন চলছে কর্মব্যস্ততা। চক্ষু বিভাগে সচল হয়েছে লেসিক মেশিন। সার্জারিতে সি-আর্ন, রেডিওলজিতে এক্স-রে যন্ত্র সচল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই চিকিৎসার পরিধি অনেক বেড়ে গেছে।
হাসপাতালের টেকনোলজিস্টদের একজন জানালেন, ‘প্যাথলজি বিভাগে অনেক পরিবর্তন এসেছে গত দেড়মাসে। অচল, নিথর, মরচে ধরা যন্ত্রগুলো সংস্কারের ফলে হঠাৎ করেই যেন ফিরে পেয়েছে প্রাণ। দীর্ঘদিন ধরে হাসপাতালের রেডিওলজি, ইমেজিং, আইসিইউ কিংবা অপারেশন থিয়েটারের যেসব মেশিন শুধু বোঝা হয়ে পড়ে ছিল, সেগুলো কারিগরি দলের হাতের স্পর্শে আবার সচল হয়ে উঠেছে বলে জানান তারা।
ইতিমধ্যেই কারিগরি দলের উপসহকারী প্রকৌশলী হাফিজুর রহমান এর বক্তব্য পাওয়া গেছে জাতীয় দৈনিকে। তিনি বলেছেন, ‘শত বাধা সত্বেও আমরা ১৫টি মেশিন সচল করতে পেরেছি। ধাপে ধাপে সিটি স্ক্যান, এনজিওগ্রাম, এন্ডোসকপি, লিখোরিপটরসহ বাকি মেশিনগুলো একে একে চালু হবে। তবে যন্ত্রাংশ আমদানি সময়সাপেক্ষ বিষয়। তাই কয়েকটি মেশিন সচল করতে সময় প্রয়োজন হবে।’
হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম মশিউল মুনীর বলেন, এখন পর্যন্ত ৯৫টি মেশিন সচল হয়েছে। আরো ১৯টি মেশিন অচল আছে।  এর মধ্যে ৯টি মেশিনের যন্ত্রাংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হবে। অপর মেশিনগুলো সচল করতে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হবে। মন্ত্রণালয় থেকে অর্থ বরাদ্দ পাওয়া সাপেক্ষে এগুলো সচল করা হবে। আর আইসিইউ বিভাগের সবকিছু পরিবর্তন করে একদম নতুন করা হয়েছে। এমনকি বেডও বদলে দেয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
Print Friendly, PDF & Email

Sharing is caring!

About the author

ডিসেম্বর ৭১! কৃত্তনখোলার জলে সাঁতার কেটে বেড়ে ওঠা জীবন। ইছামতির তীরঘেষা ভালবাসা ছুঁয়ে যায় গঙ্গার আহ্বানে। সেই টানে কলকাতার বিরাটিতে তিনটি বছর। এদিকে পিতা প্রয়াত আলাউদ্দিন আহমেদ-এর উৎকণ্ঠা আর মা জিন্নাত আরা বেগম-এর চোখের জল, গঙ্গার সম্মোহনী কাটিয়ে তাই ফিরে আসা ঘরে। কিন্তু কৈশরী প্রেম আবার তাড়া করে, তের বছর বয়সে তের বার হারিয়ে যাওয়ার রেকর্ডে যেন বিদ্রোহী কবি নজরুলের অনুসরণ। জীবনানন্দ আর সুকান্তে প্রভাবিত যৌবন আটকে যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙ্গিনায় পদার্পন মাত্রই। এখানে আধুনিক হবার চেষ্টায় বড় তারাতারি বদলে যায় জীবন। প্রতিবাদে দেবী আর নিগার নামের দুটি কাব্য সংকলন প্রশ্ন তোলে বিবেকবানের মনে। তার কবিতায়, উচ্চারণ শুদ্ধতা আর কবিত্বের আধুনিকায়নের দাবী তুলে তুলে নেন দীক্ষার ভার প্রয়াত নরেণ বিশ্বাস স্যার। স্যারের পরামর্শে প্রথম আলাপ কবি আসাদ চৌধুরী, মুহাম্মদ নুরুল হুদা এবং তৎকালিন ভাষাতত্ব বিভাগের চেয়ারম্যান ড. রাজীব হুমায়ুন ডেকে পাঠান তাকে। অভিনেতা রাজনীতিবিদ আসাদুজ্জামান নূর, সাংকৃতজন আলী যাকের আর সারা যাকের-এর উৎসাহ উদ্দিপনায় শুরু হয় নতুন পথ চলা। ঢাকা সুবচন, থিয়েটার ইউনিট হয়ে মাযহারুল হক পিন্টুর সাথে নাট্যাভিনয় ইউনিভার্সেল থিয়েটারে। শংকর শাওজাল হাত ধরে শিখান মঞ্চনাটবের রিপোটিংটা। তারই সূত্র ধরে তৈরি হয় দৈনিক ভোরের কাগজের প্রথম মঞ্চপাতা। একইসমেয় দর্শন চাষা সরদার ফজলুল করিম- হাত ধরে নিযে চলেন জীবনদত্তের পাঠশালায়। বলেন- মানুষ হও দাদু ভাই, প্রকৃত মানুষ। সরদার ফজলুল করিমের এ উক্তি ছুঁয়ে যায় হৃদয়। সত্যিকারের মানুষ হবার চেষ্টায় তাই জাতীয় দৈনিক রুপালী, বাংলার বাণী, জনকণ্ঠ, ইত্তেফাক, মুক্তকণ্ঠের প্রদায়ক হয়ে এবং অবশেষে ভোরেরকাগজের প্রতিনিধি নিযুক্ত হয়ে ঘুরে বেড়ান ৬৫টি জেলায়। ছুটে বেড়ান গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। ২০০২ সালে প্রথম চ্যানেল আই-্র সংবাদ বিভাগে স্থির হন বটে, তবে অস্থির চিত্ত এরপর ঘনবদল বেঙ্গল ফাউন্ডেশন, আমাদের সময়, মানবজমিন ও দৈনিক যায়যায়দিন হয়ে এখন আবার বেকার। প্রথম আলো ও চ্যানেল আই আর অভিনেত্রী, নির্দেশক সারা যাকের এর প্রশ্রয়ে ও স্নেহ ছায়ায় আজও বিচরণ তার। একইসাথে চলছে সাহিত্য বাজার নামের পত্রিকা সম্পাদনার কাজ।