বিশেষ প্রতিবেদক

ছবি সংগৃহীত
বিশ্ব ডিম দিবস উদযাপন উপলক্ষে পটুয়াখালী বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের খরচ লাখ টাকার উপরে। ডিমের পুষ্টিগুন প্রচারণা ছিলো এই দিবস উদযাপনের লক্ষ্য। আবার বরিশালের জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রবীণ দিবস উদযাপনের ব্যায় আনুমানিক অর্ধ লক্ষ টাকা। যদিও প্রবীণ বলতে উপস্থিত ছিলেন হাতেগোনা কয়েকজন নারী-পুরুষ। যারা সবসময় যেকোনো দিবসেই উপস্থিত থাকেন। এভাবে প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো দিবসের উদযাপন সংবাদ প্রকাশিত হচ্ছে বিভিন্ন গণমাধ্যমে। যার বেশিরভাগই গুরুত্বহীন এবং অপ্রয়োজনীয় বলে দাবী সচেতন নাগরিক সমাজের। অথচ জেলা প্রশাসনের এসব দিবস উদযাপনের আনুষ্ঠানিকতায় প্রতিদিন গড়ে সর্বনিম্ন ১০ হাজার টাকা খরচ ধরা হলেও বছরে তা গড়ে প্রায় কোটি টাকা। সে হিসেবে শুধু ৬৪ জেলার জেলা প্রশাসনের খরচ ৬৪ কোটি টাকার উপরে। এই টাকা খরচ করে সাধারণ মানুষের কতটুকু উপকার হচ্ছে বলে প্রশ্ন তোলেন সিনিয়র সিটিজেন ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের নেতৃবৃন্দ। তারা বলেন, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে যেসব দিবস উদযাপন হয়, তার কিছু তাদের নিজস্ব আবার বেশিরভাগ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা ও বরাদ্দ থাকে। নিজস্ব দিবস উদযাপন কম খরচে হলেও মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা বাস্তবায়নের দিবসগুলোতে কমপক্ষে ৪০-৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ হয়। অথচ এসব দিবস উদযাপন যাদের জন্য, তাদের সম্পৃক্ততা এতে নেই বললেই চলে বলে জানান সিনিয়র সিটিজেন নেতৃবৃন্দ।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বছরের প্রায় প্রতিদিনই এখন কোনো না কোনো দিবস উদযাপন হচ্ছে। আন্তর্জাতিক, জাতীয় বা স্থানীয়ভাবে প্রতিটি দিবস উপলক্ষে দেশজুড়ে হচ্ছে নানা আয়োজন। এসব দিবস উদযাপনে সরকারি দপ্তর, বিশেষ করে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের উদ্যোগে ব্যানার, মঞ্চ, র্যালি ও সেমিনারে ব্যয় হচ্ছে বিপুল পরিমাণ অর্থ। ফলে প্রশ্ন উঠছে— এসব দিবস উদযাপনের প্রকৃত সুফল কতটুকু?
বছরজুড়ে মাতৃভাষা দিবস, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, দুর্যোগ প্রস্তুতি দিবস, হাত ধোয়া দিবস, দুধ বা দুগ্ধ দিবস, মুখ ধোয়া দিবস, কৃষক দিবস, শ্রমিক দিবস, আমীষ বা নিরামিষ দিবস, মা-বাবা, আত্মীয় ইত্যাদি শতাধিক দিবস পালিত হচ্ছে দেশের সব জেলায়। প্রতিটি দিবস মানেই আলাদা প্রস্তুতি, মঞ্চ সাজানো, ব্যানার-ফেস্টুন, আপ্যায়ন, সভা ও রেলি বা মিছিল।
সরকারি হিসাব না থাকলেও মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মতে, শুধু এসব আনুষ্ঠানিকতায় সারাদেশে বছরে ব্যয় হচ্ছে কয়েক হাজার কোটি টাকা। এর বেশিরভাগই ব্যয় হয় প্রশাসনিক প্রস্তুতি, সরঞ্জাম ও আপ্যায়নে। একজন জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “অনেক সময় দিবসের আয়োজন বাধ্যতামূলক ভাবে করতে হয়। উদ্দেশ্য ভালো, কিন্তু বাস্তবে এটি অনেক সময় আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকে। জেলা প্রশাসনের আয়োজনে সাধারণ মানুষের কোনো সম্পৃক্ততা থাকেনা। ফলে এটি টেবিল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ বলে জানান তিনি।
আবার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দিবস উদযাপন সচেতনতা বৃদ্ধির কার্যকর মাধ্যম হতে পারে, যদি তা প্রকৃত অর্থে জনগণ কেন্দ্রিক হয়। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায়, এসব আয়োজন হয়ে দাঁড়ায় কেবল আনুষ্ঠানিক ছবি তোলা ও বক্তৃতা নির্ভর একটি প্রথা। সমাজবিজ্ঞানী ড. মাহবুব হোসেন মনে করেন, “দিবস উদযাপন মানে শুধুই অনুষ্ঠান নয়, এটি হতে পারে বাস্তব কর্মসূচির সূচনা। কিন্তু এখন এটি অনেক সময় প্রশাসনিক প্রদর্শনীতে পরিণত হয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
অন্যদিকে সাধারণ সচেতন নাগরিকদের অভিমত, এসব দিবস পালনে প্রশাসনের সময় ও অর্থ খরচ হয় অনেক, কিন্তু তার সুফল সাধারণ মানুষ তেমনভাবে পায় না।
বরিশালের সদর উপজেলার চন্দ্রমোহন ইউনিয়নের কৃষক বেলাল মৃধা বলেন, কৃষক দিবস বা শ্রমিক দিবসের কথা শুনেছি। কিন্তু কি হয় এ দিবসে তা জানিনা। কেউ কোনোদিন আমাদের ডাকেওনি বা আমাদের কাছেও আসেনি।
দেশে বছরে দুই শতাধিক দিবস উদযাপিত হয় জানিয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা বীরপ্রতীক মহিউদ্দিন মানিক বলেছেন, মুক্তিযোদ্ধা দিবস নামে একটি দিবস রয়েছে। জেলা প্রশাসনের উদ্যোগ ছাড়াও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলও এই দিবস উপলক্ষে লাখ টাকা খরচ করছে। এতে সাধারণ মানুষ বা মুক্তিযোদ্ধাদের কি আদৌ কোন উপকার হয়েছে? বরং ঐ টাকায় অসহায় হতদরিদ্র মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের পাশে সহযোগিতা নিয়ে দাঁড়ানো যেত বলে মনে করেন মহিউদ্দিন মানিক।
বরিশালের ষাটোর্ধ সিনিয়র সিটিজেন ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন এর সহসভাপতি কাজী মিজানুর রহমান বলেন, দিবস পালনের পাশাপাশি তার ফলাফল মূল্যায়নও জরুরি। অন্যথায় এটি কেবলই আনুষ্ঠানিক উৎসবে সীমাবদ্ধ থেকে যাবে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে যেসব দিবস উদযাপন হয়েছে, তার কয়েকটিতে উপস্থিত থাকার অভিজ্ঞতায় দেখেছি, যাদের জন্য এই দিবস তারা কেউই নেই। পুলিশের এসপি বা কমিশনার, দু-চারটি এনজিও প্রতিনিধি আর আমরা নগরীর দু-তিন জন। আবার এসব দিবস নিয়ে সাংবাদিকরা যে নিউজ করেন সেখানে আলোচ্য বিষয়ের কোনো গুরুত্ব নেই। জেলা প্রশাসনের আয়োজনই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আসছে। এটা অপচয় ছাড়া আর কিছুই নয় বলে জানান কাজী মিজানুর রহমান। ##