সাংবাদিক কেন চাঁদাবাজ? শতাধিক নিউজ মিডিয়া ও পত্রিকা শুধু বরিশালেই
বিশেষ প্রতিবেদক
মোটরসাইকেল চালিয়ে ও ক্যামেরা বা স্মার্টফোন হাতে নিয়ে একসাথে চার-পাঁচ জনের একটি দল হানা দিচ্ছে গ্রামগঞ্জের বিভিন্ন মাদ্রাসা, আবাসিক হোটেল, বাজারের বড় দোকান বা ইটভাটায়। বেশিরভাগ অনিয়মিত পত্রিকা বা অনলাইন মিডিয়ার সাংবাদিক পরিচয়ে তারা দেখতে চায় এতিমখানা বা মাদ্রাসার নথিপত্র, পরিবেশ দপ্তরের ছাড়পত্র বা ওজন পরিমাপক যন্ত্র নিয়ে টানাটানি। যার কোনটাই দেখতে চাওয়ার অধিকার তার নেই। আবার কখনো পিকনিক, কখনো বন্ধুর বিয়ে, অসুস্থতায় চিকিৎসা খরচ কিম্বা ঢাকায় যাওয়ার পথখরচ দাবী করে অবিনব পন্থায় চাঁদাবাজি করছে এসব সাংবাদিক পরিচয়ধারী যুবকরা। বরিশাল নগরীর অনেক বড় বা সিনিয়র সাংবাদিকদের নামেও রয়েছে এরকম একাধিক অভিযোগ। এদের কেউ কেউ ঢাকায় যাওয়ার প্রয়োজন হলেই বড় ঠিকাদার বা লঞ্চ মালিককে ফোন করে যাতায়াতের খরচ আদায় করেন বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগী লঞ্চ মালিক ও ঠিকাদাররা। আর বড় বা সিনিয়রদের এই চাঁদাবাজির গল্প শুনে, উদ্ভুদ্ধ হয়ে তরুণ প্রজন্মের সংবাদ কর্মীদের অনেকেই ছুটছেন একই পন্থায় ছোটখাটো ব্যবসায়ী বা গ্রামগঞ্জের মাদ্রাসা ও ইটভাটায়।
এমনই একটি ঘটনার প্রমাণ মিলেছে দুদিন আগে ইউরো কনভেনশন হলে। বরিশাল রিপোর্টার্স ইউনিটির সাধারণ সম্পাদক খালিদ সাইফুল্লাহ এর নেতৃত্বে আটক হয়েছে দুজন চাঁদাবাজ সাংবাদিক। এদিকে সদর উপজেলার চাঁদপুরা ইউনিয়নের পোস্ট মাস্টার মোকলেছুর রহমানের কাছেও পিকনিকের নামে চাঁদা দাবি করেছে। তার ও রূপা ইটভাটার মালিকের কাছে চাঁদা দাবি করে বাকেরগঞ্জ উপজেলা প্রেসক্লাবের কয়েকজন সাংবাদিক। য়দিও পরে জানা যায়, তারা বাকেরগঞ্জ প্রেসক্লাবের কেউ ছিলোনা। নাম সর্বস্ব পত্রিকার পরিচয়পত্র হাতে পেয়েই চাঁদাবাজিতে নেমে পরেছে এরা। ঐ সময় বরিশালের একজন সিনিয়র সাংবাদিক মোকলেছুর রহমানকে পরামর্শ দেন, ওদের তালুকদার হাট পোস্ট অফিসের দূরাবস্থা নিয়ে একটি সংবাদ লিখতে বলুন। বিনিময়ে তাদের চাহিদা অনুযায়ী টাকা দেওয়া হবে।
সংবাদ লিখতে না জানা ঐ সাংবাদিকরা পোস্ট অফিসের ছবি নিয়ে চলে যায়, আর ফেরেনা। কারণ, সংবাদ লিখতেতো ওরা জানেইনা। কেউ একজন লিখে দিলে সেটি কপি পেস্ট করে অভ্যস্ত এইসব সাংবাদিকদের বেশিরভাগ অংশ।
যতদূর জানা গেছে, বরিশাল থেকে প্রকাশিত ৪৫টি পত্রিকার বেশিরভাগ অংশেরই কোনো বেতনভুক্ত সাংবাদিক বা রিপোর্টার নেই। একজন মাত্র নামসর্বস্ব বার্তা সম্পাদক, তিনিই কম্পিউটার কম্পোজার এবং রিপোর্টার। সাথে একজন গ্রাফিকস ডিজাইন পারদর্শী দিয়ে চলছে এখানের লোকাল দৈনিকগুলো। দু একটি ব্যতিক্রম রয়েছে তবে তাদেরও পর্যাপ্ত রিপোর্টার নেই। ১০টি উপজেলাসহ বরিশাল জেলার মোট সাংবাদিক সংখ্যা প্রায় ৫ শত জন। এদের বেশিরভাগই শুধু পরিচয়পত্র বা কার্ডধারী সাংবাদিক। বাকীরা সংগঠন নির্ভর হয়ে দান ছদকায় জীবন কাটান। বরিশালের সাংবাদিক ও সংবাদপত্র বিষয়ে খোঁজ নিতে গেলে এমন চিত্রই তুলে ধরলেন জেলার সাংস্কৃতিকজন, সুশীল সমাজ ও সাংবাদিক নেতারাও।
সরজমিনে বরিশালের স্থানীয় সংবাদপত্র ও সাংবাদিক সংগঠন অফিসগুলো ঘুরে দেখা গেছে, রিপোর্টার্স ইউনিটির সামনের দেয়ালে প্রতিদিন ১০/১২টি পত্রিকা ঝুলছে। আর রিপোর্টার্স ইউনিটি অফিস সহকারী বাবু জানান, ১৮/২০টি পত্রিকা কমবেশি আমাদের কাছে আসে। তবে নিয়মিত ১০/১২টির বেশি নয়। আবার পাশেই পত্রিকা বিক্রেতা বোবার দোকানে পাঁচটির বেশি স্থানীয় পত্রিকা খুঁজে পাওয়া যায়নি। সংবাদপত্র বিক্রয়ের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান আলম পেপার ঘরের মালিক আলমের কাছে সবমিলিয়ে আটটি পত্রিকা নিয়মিত আসে বলে জানালেন আলম নিজেই।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এখানে বেশিরভাগ সংবাদপত্র মূলত ব্যবসায়িক ঢাল হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে। আবাসিক হোটেল ব্যবসায়ী, ইলেকট্রনিকস পণ্যের ড্রিলার, ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর মালিক ও গণপরিবহনের মালিকদের এই ঢালগুলোও আসলে বড়ো দূর্বল ঢাল। কেননা ডিক্লারেশন নীতিমালার সামান্যতম বিষয়গুলোর কোনোটাই অনুসরণ করছেন না এখানকার কোনো সংবাদপত্র মালিক। একই ব্যক্তির বিভিন্ন নামে চারপাঁচটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার চলছে। চলছে গণপরিবহন ও অন্যান্য বৈধ অবৈধ বিভিন্ন ব্যবসা। আর সাংবাদিকদের বেশিরভাগ এখানে ঠিকাদারি কাজ বাগাতেই সাংবাদিকতার পরিচয়পত্র কিনছেন চড়া দামে। এদের মধ্যে লোকাল পত্রিকা ও অনলাইন মিডিয়ার মালিকও রয়েছে। যা আড়াল করতে তারা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন সংবাদপত্রকে। প্রশাসনের চোখের সামনেই নিয়মহীনতার নিয়মে চলছে এসব পত্রিকা ও অনলাইন মিডিয়া। অনলাইনগুলোর বেশিরভাগ আবার অনুমোদন হীন। কেউ কেউ শুধু ফেসবুক ও ইউটিউব নির্ভর পেজ খুলেই বুম হাতে ঘুরছেন, মোটরসাইকেল এর সামনে লাগিয়েছেন ঐ নামের স্টিকারও। বরিশাল জেলা প্রশাসনের অনুমোদিত লোকাল দৈনিক রয়েছে প্রায় ৫০টি। যার মধ্যে নিয়মিত প্রকাশিত হয় সাত-আট টি এবং অনিয়মিত ১৮/২০টি পত্রিকা। বাকীগুলো সপ্তাহ বা মাসে একবার ডামি হিসেবে প্রশাসনের চোখে ধূলো দিচ্ছে প্রতিনিয়ত।
সাংবাদিকদের অধিকার রক্ষায় অঙ্গিকার বদ্ধ হলেও এসব বিষয়ে সাংবাদিক সংগঠনগুলো এখানে অন্ধ হয়ে আছে। প্রতিটি সংগঠন এখানে দু তিনভাগে বিভক্ত। জেলায় প্রেসক্লাব আছে কয়েকটি, সাংবাদিক ইউনিয়নের রয়েছে দুটিভাগ। তবে নতুন নেতৃত্বে সাংবাদিক আজাদ আলাউদ্দিন অংশের সাংবাদিক ইউনিয়ন কিছুটা কর্মচঞ্চল ও সচেতনতা তৈরির পথে এগুচ্ছে। অন্য অংশ এই মুহূর্তে অস্তিত্বহীন প্রায়। আরো কিছু সাংবাদিক সংগঠন ও পরিষদ রয়েছে, যাদের কাজ শুধু ফুল দেয়া আর সরকারি কর্মকর্তাদের সাক্ষাৎ পাওয়া। বরিশাল বিভাগীয় প্রেসক্লাব, সাংবাদিক কল্যাণ সমিতি ইত্যাদি নামে চাঁদাবাজির অভিযোগ অহরহ। গ্রামে গ্রামে ইটভাটা ও বিয়ে-শাদি, অপমৃত্যু ইত্যাদি ক্রাইম খুঁজে ঘুরে বেড়ানো সাংবাদিক নামধারীদের বেশিরভাগ এই বরিশাল বিভাগীয় প্রেসক্লাব ও সাংবাদিক সমিতির সদস্য বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন ইটভাটা মালিক। শুধু মাত্র ঐতিহ্য ধরে রেখে গর্বিত পথচলার দাপট এখানে বরিশাল রিপোর্টাস ইউনিটির। তবে তারাও এখানে রাজনৈতিক প্রভাব মুক্ত হতে পারেননি এখনো। বিগত প্রায় সতের বছর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের তাবেদারী এই রিপোর্টার্স ইউনিটির ভাবমূর্তি মলিন করে দিয়েছে। জুলাই বিপ্লবের পটপরিবর্তনে ক্ষমতার হাতবদল ঘটেছে এবং মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়ানোর জন্য আনিসুর রহমান স্বপন ও খালিদ সাইফুল্লাহ পরিষদ রীতিমতো যুদ্ধ করছেন বলে জানালেন স্থানীয় উল্লেখযোগ্য পত্রিকার সম্পাদকরা।
বরিশালের উল্লেখযোগ্য পত্রিকা আজকের বার্তার বর্তমান সম্পাদক কাজী রাসেল, আজকের পরিবর্তনের সম্পাদক কাজী মিরাজ মাহমুদ, দৈনিক দক্ষিণাঞ্চল সম্পাদক প্রিন্স তালুকদার, দৈনিক মতবাদের সম্পাদক এসএম জাকির বর্তমানে বরিশাল প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এবং বাংলাদেশ বাণী পত্রিকার সম্পাদক আজাদ আলাউদ্দিন একজন দক্ষ সাংবাদিক, সংগঠক এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে চমৎকার ভূমিকা পালন করছেন বরিশালে। এই সম্পাদকরা ছাড়াও ডিবিসি নিউজ বরিশালের প্রতিনিধি সালেহ টিটু, যুগান্তর ও এনটিভির প্রতিনিধি আক্তার ফারুক শাহীন, মানবজমিন এর জিয়া শাহীনসহ জাতীয় দৈনিকের জেলা প্রতিনিধিদের সাথে কথা বলে এটা স্পষ্ট যে, এখানে এই জাতীয় দৈনিক প্রতিনিধি হতেও এখন টাকা দিতে হয় ঢাকা অফিসে। টাকা না দিলেও বিজ্ঞাপন দিয়ে তার ঘাটতি পূরণ করতে হবে। এমন প্রমাণও আছে বেশকিছু। যে কয়টি পত্রিকা নিয়মিত প্রিন্ট হচ্ছে, সেগুলোর নিউজ মান ও বানান ভুলের পরিমাণ হিসাব করলে সম্পাদকের যোগ্যতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
আবার ইদানীং ফেসবুকে নতুন পত্রিকার বিজ্ঞাপন এ চোখ রাখলেই অসংখ্য মন্তব্য দেখা যায় – কার্ডের জন্য কত দিতে হবে? কেউ কেউ পরিষ্কার টাকার অংক বলেই দিচ্ছেন।
জাতীয় দৈনিক তার ঢাকার প্রতিনিধিকে নির্দিষ্ট বিষয়ে কাজ করিয়ে বেতন দেন। আর জেলা প্রতিনিধি সবরকম বিষয় নিয়ে কাজ করার পরও উল্টো টাকা বা বিজ্ঞাপন খুঁজে দেন। তারপরও একজন জেলা প্রতিনিধিকে ঠিকমতো সম্মানী দিতে না চাওয়াটা কি অপরাধ নয়? এটা কি প্রেস আইনের অধীনে নয়? তাহলে জাতীয় প্রেসক্লাব ও সাংবাদিক সংগঠন এর কাজ কি শুধু পত্রিকা মালিকদের স্বার্থ রক্ষা করে চলা? এমন প্রশ্ন তুলে বরিশাল প্রেসক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক কাজী মিরাজ মাহমুদ আরো বলেন, সাংবাদিক সংগঠনগুলোর উচিত এ বিষয়গুলো সামনে নিয়ে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। তানা হলে সাংবাদিকতার নামে চাঁদাবাজি বন্ধ করা যাবেনা। পাশাপাশি অনলাইন মিডিয়া বা নিউজ পোর্টালগুলো অনুমোদিত কিনা তাও যাচাই-বাছাইয়ের পরামর্শ কাজী মিরাজের।
অন্যদিকে জেলা শহরের বেশিরভাগ পত্রিকা দুই পাতার কতগুলো চিরকুট । দু একটি চারকালার হলেও বেশিরভাগ পত্রিকা সাদাকালো মানহীন প্রিন্ট। কেন এই মান-দায়হীন পত্রিকার প্রকাশনা তবে? এই প্রশ্ন তুলে বরিশালের প্রবীণ সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, বহুল আলোচিত মাসিক আনন্দ লিখন ও দৈনিক আজকের পরিবর্তন পত্রিকার সাবেক প্রকাশক ও সম্পাদক সৈয়দ দুলাল বললেন, নীতিমালা অনুসরণ করে পত্রিকা চালানো খুবই কঠিন কাজ। একটি দৈনিকের জন্য সর্বনিম্ন বার্তা সম্পাদক ছাড়াও ৭ জন নিজস্ব প্রতিনিধি দরকার। যাদের কম হলেও দশ হাজার টাকা বেতন দিতে হবে। ওয়েজবোর্ড অনুসরণতো দূরের কথা। নূন্যতম জীবনযাপন সুবিধা কি এখানে কেউ পাচ্ছে?
সৈয়দ দুলাল আরো বলেন, এখানে বিজ্ঞাপন বলতে শুধু সরকারি কিছু বিজ্ঞাপন, তাও ক্রমশ কমছে। এ ছাড়া সংবাদপত্রের প্রধান কাঁচামাল নিউজপ্রিন্টের ওপর আমদানি শুল্ক ও ভ্যাট মিলে ল্যান্ডেড কস্ট হিসেবে প্রায় ২৬% পরিশোধ করতে হচ্ছে। সম্ভবত সংবাদপত্রই একমাত্র পণ্য, যার উৎপাদন খরচ পণ্যের বিক্রয় মূল্যের থেকে ৩ গুণ বেশি। বিজ্ঞাপন আয় কমে যাওয়ায় এই ঘাটতি পূরণ করে প্রতিষ্ঠান চালানো অসম্ভব পর্যায়ে চলে যাচ্ছে। বাঁচতে হলে বেতনবিহীন সাংবাদিক দিয়েই চালাতে হবে। পরিচয়পত্র পেলেই খুশি এমন সাংবাদিক তখন মাঠে কাজ করবে আর মানহানী ঘটবে সাংবাদিক পেশার। যেটা আমি পারিনি বলেই ছেড়ে দিয়ে চলে এসেছি বলে জানান সৈয়দ দুলাল।
বরিশাল জেলা মেট্রোপলিটন প্রেসক্লাবের সভাপতি ও দৈনিক শাহনামা পত্রিকার সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ বলেন, এখানের সাংবাদিকতা এখন শুধু কে প্রথম কে দ্বিতীয় এই বিষযের প্রতিযোগীতায় সীমাবদ্ধ। ইতিহাস জ্ঞান অধিকাংশেরই নেই। লিখতে জানেনা অথচ সাংবাদিক দাবিদারের অভাব নেই এই শহরে। সাংবাদিকতা করতে হলে পড়তে হয এটাই এখন এরা মানতে রাজী নয় বলে জানান তিনি।
বরিশালের সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অতি পরিচিত নাম অধ্যাপক তপংকর চক্রবর্তী। সুশীল সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি বলেন, বরিশালে সাংবাদিক পেশার প্রতি খুব একটা সমীহ কারো নেই। এখানে জেলায় প্রায় ৪-৫ শত সাংবাদিক আছেন বটে। তবে মুলধারার সাংবাদিক কতজন তা নিয়ে বিতর্ক আছে। ৪০ /৫০টি পত্রিকা এই জেলা থেকে ডিক্লেয়ারেশন রয়েছে। কয়টা নিয়মিত প্রকাশিত হয় প্রশাসনের তা নজরদারি প্রয়োজন। বেশিরভাগ সাংবাদিক এখানে হতদরিদ্র অবস্থায় আছেন। তারা কোনো বেতন ভাতা ছাড়াই কাজ করছেন। হাতেগোনা কয়েকজন ঢাকার গণমাধ্যম থেকে বেতন ভাতা পান। বাকীরা কীভাবে চলেন তা কি সাংবাদিক সংগঠনগুলো খোঁজ নেয় কখনো?
তপংকর চক্রবর্তী আরো বলেন, বরিশাল প্রেসক্লাব, সাংবাদিক ইউনিয়ন, রিপোর্টাস ইউনিটি। এভাবে সংগঠন ভুক্ত যারা তারা কিছুটা ভালো থাকলেও অন্যদের অবস্থা এতোটাই শোচনীয় যে নিজেরাই নিজেদের কাউকে ঘরভাড়া বা টাকা ধার দেবেনা। অভাবে স্বভাব নষ্ট, ফলে না হয় ভালো সাংবাদিকতা না হয় ভাগ্যের উন্নয়ন। এই ক্ষেত্রে সরকারের ডিকলারেশন দেয়ার আগে ভাবা উচিত। জেলার সাংবাদিকদের মানসম্পন্ন বেতন নিয়ে রাষ্ট্রকে ভাবতে হবে। সংগঠনগুলো কি এ নিয়ে কিছু করছে? তাহলে সংগঠন এর প্রয়োজন কি?
এ প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যান প্রায় সব সাংবাদিক নেতা। তবে প্রবীণ অভিজ্ঞতা সম্পন্ন সাংবাদিকদের মতে, বরিশালে বেশিরভাগ সাংবাদিক এখন শুধু কার্ডধারী। টাকা দিয়ে পত্রিকার কার্ড কিনে ছাত্রনেতা, কন্ট্রাক্টর, হোটেল বয়, কেবিন বয় এরাও এখন নিজেকে সাংবাদিক দাবী করে বলে নিজেই ক্ষোভ প্রকাশ করেন বরিশাল রিপোর্টার্স ইউনিটির প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ও বর্তমান সভাপতি আনিসুর রহমান স্বপন। ঢাকা থেকে প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য দৈনিকে সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা নিয়ে অসংখ্য সুযোগ হাতছাড়া করে ভালোবাসার টানে বরিশালেই পরে থাকলেন যে মানুষটি, আজ তিনিও ক্ষুব্ধ বরিশালের সংবাদপত্রের প্রতি। তিনি বলেন, ঢাকায় একটি জাতীয় দৈনিকে বিভিন্ন বিট ভিত্তিক সাংবাদিক কাজ করেন। সেখানে জেলা শহরের একজন সাংবাদিক একাই সবধরনের বিট সামলাতে হয়। স্বাভাবিক কারণেই তাদের মর্যাদা আরো বেশি হওয়া উচিত ছিলো। অথচ হয়েছে উল্টোটা। অপসাংবাদিকতার আড়ালে হারিয়ে গেছে সাংবাদিকতা এখানে।
বর্তমানে ঢাকা ট্রিবিউন এ কর্মরত সাংবাদিক আনিসুর রহমান স্বপন এর দৃষ্টিতে সব দোষ বরিশালের স্থানীয় সাংবাদিকদের। তিনি বলেন, নিজেদের দোষেই বরিশালের সাংবাদিকরা আজ মর্যাদাহীন। তারা বেতন বা সম্মানী ছাড়াই কাজ করতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে এখানে। হাতেগোনা দুই তিনটি বাদে কোনো পত্রিকায়ই এখানে নিজস্ব কোনো সংবাদদাতা বা সাংবাদিক নেই। তারপরও দুইপাতা বা চারপাতার পত্রিকা তো বের হচ্ছে। অনিয়মিত ভাবে হলেও বেরতো হচ্ছে। কীভাবে বের হচ্ছে? কারা সংবাদ প্রেরণ করছে? স্থানীয় সাংবাদিকদের যদি আত্মসম্মানবোধ থাকতো তাহলে একটি পত্রিকাও তাদের সংবাদ নিয়ে ছাপা হতোনা। সবটাই ঐ কম্পিউটারের লোক দিয়ে নিউজ টেনে নিয়ে প্রকাশ করতে হতো। যা বের হয় তাওতো অত্যন্ত নিম্নমানের পত্রিকা।
আনিসুর রহমান স্বপন আরো বলেন, বরিশালের সাংবাদিকদের তাদের আত্মমর্যাদা রক্ষা করতে হলে সবার আগে পেশাদার হতে হবে। যাই ঘটুক পেশাদারিত্বের জায়গায় কোনো ছাড় দেয়া যাবেনা। বিশেষ করে, সাংবাদিক সংগঠনগুলোকে এ নিয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে হবে। শুধু ফুল দেয়া আর সরকারি কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সাথে সৌজন্য সাক্ষাৎ করাটাই সংগঠনের দায়িত্ব নয়। সাংবাদিকতার স্বার্থ রক্ষার জন্য উদ্যোগী হতে হবে। শুধু সংগঠনের সদস্যদের সরকারি অনুদান পাইয়ে দেয়ায় কোনো কৃতিত্ব নেই, সাংবাদিকতার মুল চরিত্রের সব চাহিদা আদায় করে দেয়াটাই সংগঠনের প্রধান কাজ হওয়া উচিত। পত্রিকাগুলো বেতন দিচ্ছে কিনা, ওয়েজবোর্ড নীতিমালার অনুসরণ হচ্ছে কিনা, ডিক্লারেশন নীতি পালিত হচ্ছে কিনা এগুলোর জন্যই প্রেসক্লাব বা অন্যান্য সংগঠনের ভূমিকা হওয়া উচিত। এই জায়গায় তাদের দায়িত্বশীল হতে হবে। প্রেসক্লাব, রিপোর্টার্স ইউনিটি ও সাংবাদিক ইউনিয়নের মর্যাদা বজায় রাখতে হলেও এ কাজগুলো করে দেখানো জরুরী বলে মনে করেন আনিসুর রহমান স্বপন।
বরিশাল সাংবাদিক ইউনিয়ন এর বর্তমান সভাপতি আজাদ আলাউদ্দিন বলেন, বরিশাল সিটিতে সাংবাদিক ইউনিয়ন, প্রেসক্লাবসহ বিভিন্ন সংস্থায় প্রায় ২০০/২৫০ জন সাংবাদিক কাজ করছেন। এছাড়া অনলাইন ও স্থানীয় পত্রিকায় ৫০/৭০ জন হবে হয়তো। গড়ে এটা ৩৫০ বা ৪০০ এর বেশী নয়। আর দশটি উপজেলায় গড়ে দশজন করে ১০০ জন নিয়ে মোট ৫০০ সাংবাদিক বরিশাল জেলায় কাজ করছেন। বরিশাল জেলায় সর্বমোট ৪৫টা পত্রিকা আছে। অথচ রিপোর্টার আছে বড়োজোর ২৫/৩০ জন। এদের অধিকাংশই নিয়মিত বেতন বা সম্মানী পান না। আমরা আমাদের সংগঠনের সদস্যদের যেভাবে হোক যতটুকু হোক সহায়তা দেয়ার চেষ্টা করি। চলতি বছর ইউনিয়নের বাইরেও কিছু সাংবাদিককে সহায়তা প্রদানের জন্য অনুরোধ জানিয়েছিলাম। যা এখনো প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
বরিশাল রিপোর্টারস ইউনিটির সাধারণ সম্পাদক ও নয়া দিগন্ত পত্রিকার সাংবাদিক খালিদ সাইফুল্লাহ বলেন, মফস্বলের বেশিরভাগ সাংবাদিক উপার্জনহীন। তাদের নূন্যতম মাসিক উপার্জন নেই বলতে গেলে। তাই আমাদের সাংবাদিকদের জন্য এখন রেশনিং ব্যবস্থা খুব জরুরী প্রয়োজন। ত্রাণ নয় রেশন দিন শ্লোগানে আমাদের আন্দোলনে নামতে হবে হয়তো রাগ ও ক্ষোভের সাথে কথাগুলো বললেন খালিদ সাইফুল্লাহ। তিনি বলেন, তারপরই প্রয়োজন অনলাইন সাংবাদিকতার জন্য নীতিমালা। এখন অবস্থা এমন হয়েছে যে স্মার্টফোন ও ফেসবুক পেজ আছে যার সেই নিজেকে সাংবাদিক দাবী করে হাতে বুম ও ফোন নিয়ে ঘুরছে। এটি অনেক বড়ো সমস্যা। তিনি আরও বলেন, একটি বিভাগীয় শহর এই বরিশাল। গত ৩০ বছরে এ বিভাগীয় শহরের অবকাঠামোগত কোনো উন্নয়ন আপনি খুঁজে পাবেন না। নেই কোনো উন্নয়ন কমিটি। নাগরিকদের সংগটিত হওয়ার কোনো সংগঠনও এখানে নেই। নেই কোনো ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন। অথচ সুযোগ আছে। তেমনি সাংবাদিকতা পেশাকে পেশাদারিত্বের জায়গায় দাঁড় করানোর সুযোগও এখানে আছে। সেজন্য যে একতা দরকার তা আমাদের কোথাও নেই। আমরা মফস্বল সাংবাদিকরা আজীবন ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো একটা দল বা গোষ্ঠী। এখনো আমাদের এভাবেই দেখে সবাই। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি বড় পত্রিকা ও মিডিয়ার প্রতিনিধি ছাড়া কেউই এখানে সঠিক সম্মান ও সম্মানী পাননা। নতুন নতুন অনলাইন হচ্ছে। সঠিকদের মূল্যায়ন না হওয়ার কারণে সেখানে অযোগ্য লোক এসে ভরে যাচ্ছে। মূলধারার সাংবাদিকতা এখন বিলুপ্ত বলা যায়। খালিদ সাইফুল্লাহ আরো বলেন, বেতনহীন সাংবাদিকতার কারণে জেলায় হলুদ সাংবাদিকতা ও চাঁদাবাজি বেড়ে গেছে। প্রায়শই এ নিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে অভিযোগ পাচ্ছি। প্রায় অর্ধশত পত্রিকা রয়েছে। এসব পত্রিকা মালিক ও সম্পাদকদের তাদের সাংবাদিকদের তালিকা দিতে হবে। তালিকা ধরে কে কোথায় কি করছে তা জবাবদিহির আওতায় আনা কঠিন হবেনা। তবে এজন্য জেলা প্রশাসনের সহায়তাও প্রয়োজন বলে জানান খালিদ।
বরিশালের সংবাদপত্র ও সাংবাদিকদের চাঁদাবাজি বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে বরিশালের জেলা প্রশাসক দেলোয়ার হোসেন বলেন, সাংবাদিকতা একটি মহান পেশা যাদের বস্তুনিষ্ঠ ও বিশ্লেষণধর্মী সংবাদ সমাজকে নানাভাবে সহায়তা করে। একবিংশ শতাব্দীতে এই পেশায় নিয়োজিত মানুষ যেকোনো সংবাদ প্রকাশ করার আগে তথ্যসূত্র সম্পর্কে নিশ্চিত হবেন এটাই স্বাভাবিক। সাংবাদিকদেরকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, আপনাদের তথ্যবহুল ও পর্যবেক্ষণ নির্ভর সংবাদ সমাজের অসংগতি রোধ করতে ভুমিকা পালন করছে এবং করবে। তাই আপনাদের আরো দায়িত্বশীল ও অপ-সাংবাদিকতা হতে সচেতন থাকতে হবে। এসময় ডিক্লারেশন প্রাপ্ত সংবাদপত্রের বিরুদ্ধে শর্ত লংঘনের সত্যতা পাওয়া গেলে আইনী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানান বরিশালের জেলা প্রশাসক দেলোয়ার হোসেন।







