একজন ওসমান হাদির মৃত্যু: বদলে দিয়েছে বাংলাদেশ তথা বিশ্বের রাজনৈতিক ভাবনা
(মাদ্রাসা থেকে জঙ্গি নয়, শহীদ হাদিদের জন্ম হয়)
বিশেষ প্রতিবেদক
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু নাম থাকে, যাদের প্রভাব কেবল ভৌগোলিক সীমার মধ্যে আবদ্ধ নয়—তারা সময়, চিন্তা ও বিবেককে স্পর্শ করে। ঝালকাঠির সন্তান শহীদ ওসমান হাদি তেমনই একজন মানুষ। তাঁর জীবন প্রমাণ করে দেয়—মাদ্রাসা মানেই জঙ্গিবাদ নয়, বরং সেখান থেকেও জন্ম নিতে পারে মানবমুক্তির সংগ্রামী, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এক সাহসী যোদ্ধা এবং শহীদ।
১২ ডিসেম্বর শুক্রবার নির্বাচনী প্রচারণার সময় ঢাকার পুরানা পল্টন এলাকায় ভারতীয় আওয়ামী সন্ত্রাসীর হাতে মাথায় গুলিবিদ্ধ হন ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদি। সর্বশেষ সিঙ্গাপুরের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ওসমান হাদি ১৯ ডিসেম্বর শুক্রবার মৃত্যুবরণ করেন। এ মৃত্যু শহীদী মৃত্যু। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেছেন, যারা আল্লাহর রাস্তায় নিহত হয়, তাদেরকে মৃত বলো না। বরং তারা জীবিত; কিন্তু তোমরা অনুভব করতে পার না। (সূরা বাকারা আয়াত ১৫৪)
গত ২০ ডিসেম্বর শনিবার রাষ্ট্রীয় শোক দিবস পালনের মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ওসমান হাদির জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই জানাজায় লাখো মানুষের উপস্থিতি ইতিহাস সৃষ্টি করেছে এবং আগামী রাজনীতিতে বিশাল পরিবর্তনের ঈঙ্গিত স্পষ্ট হয়েছে। তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের পাশে সমাহিত করা হয়েছে। বিদ্রোহী কবির পাশেই তাঁর চিরনিদ্রা যেন ইতিহাসের কাছে এক নীরব ঘোষণা—কবিতার বিদ্রোহ আর জীবনের বিদ্রোহ আলাদা কিছু নয়। এখানেই রচিত হয়েছে বাংলাদেশের নতুন ইতিহাস।
বরিশাল বিভাগের ঝালকাঠি জেলার এক সাধারণ পরিবারে ১৯৯৩ সালে জন্মগ্রহন করেন ওসমান হাদি। তাঁর শৈশব কেটেছে কীর্তনখোলা ও বিষখালী নদীর উদারতা গায়ে মেখে। ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার পৌর শহরের খাসমহল এলাকায় তাঁর বাড়ি। বাবা মাওলানা আব্দুল হাদি ছিলেন একজন মাদ্রাসা শিক্ষক। ছয় ভাইবোনের মধ্যে হাদি ছিলেন সবার ছোট। তাঁর বড় ভাই মাওলানা আবু বক্কর ছিদ্দিক বরিশালের গুঠিয়া জামে মসজিদের ইমাম ও খতিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। মেঝো ভাই মাওলানা ওমর ফারুক ঢাকায় ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত।
ওসমান হাদির শিক্ষাজীবনের শুরু হয়েছিল ঝালকাঠির ঐতিহ্যবাহী ঝালকাঠি এন এস কামিল মাদ্রাসায়। সেখান থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন তিনি। পরে উচ্চশিক্ষার জন্য ঢাকায় এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ২০১০–১১ শিক্ষাবর্ষে ভর্তি হন। সেখান থেকে তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। শিক্ষাজীবন শেষ করার পর শরিফ ওসমান হাদি শিক্ষকতাকেই পেশা হিসেবে বেছে নেন। সৎ জীবনযাপন ছিলো হাদির চারিত্রিক মাধুর্য। ওসমান হাদির তিন বোনের স্বামীরাও শিক্ষকতা ও দ্বীনি শিক্ষার সঙ্গে জড়িত। বড় বোনের স্বামী মাওলানা আমির হোসেন নলছিটি ফুলহরি আব্দুল আজিজ দাখিল মাদ্রাসার সুপার এবং একটি মসজিদের ইমাম। মেঝো বোনের স্বামী মাওলানা আমিরুল ইসলাম ঢাকায় ব্যবসা করেন। ছোট বোনের স্বামী মাওলানা মনির হোসেন নলছিটি ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করছেন।
তাঁর শিক্ষাজীবনের বড় একটি অংশ ছিল মাদ্রাসাকেন্দ্রিক। কিন্তু সেই শিক্ষা তাঁকে সংকীর্ণ করে তোলেনি; বরং ন্যায়, মানবিকতা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর শক্তি জুগিয়েছে। যে মাদ্রাসা শিক্ষাকে একশ্রেণির মানুষ জঙ্গিবাদের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলতে চায়, ওসমান হাদি তার জীবন্ত প্রতিবাদ। তিনি দেখিয়ে গেছেন—সঠিক চেতনায় গড়ে ওঠা মাদ্রাসা শিক্ষা মানুষকে নৈতিক, সাহসী ও প্রতিবাদী করে তোলে।
কৈশোর ও যৌবনে সমাজের বৈষম্য, রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও আন্তর্জাতিক অন্যায়ের চিত্র তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। ফিলিস্তিন, ইরাক, আফগানিস্তানসহ বিশ্ব রাজনীতিতে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তিনি ছিলেন উচ্চকণ্ঠ। একই সঙ্গে দেশের ভেতরে গণতন্ত্র, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের প্রশ্নে আপোসহীন অবস্থান নেন ওসমান হাদি। গড়ে তোলেন ইনকিলাব মঞ্চ। ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন তিনি, পাশে সহযোদ্ধা জাবেদ। জনপ্রিয় অ্যাক্টিভিস্ট ও কলাম লেখক পিনাকী ভট্টাচার্য, ড কনক সরোয়ার, মাসুম মাহবুব এবং ইলিয়াস হোসাইন এর অনুসরণ ও আলোচনায় প্রায় সবসময় থাকতেন ওসমান হাদি। যে কারণে ভারতীয় প্রশাসনের ভীতির কারণ হয়ে দাঁড়ায় বাংলাদেশের এই ৩২ বছরের তরুণ। এই অবস্থান তাঁকে কেবল স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখেনি; বরং তাঁর চিন্তা ও বক্তব্য ছড়িয়ে পড়ে আন্তর্জাতিক পরিসরেও। অনেকের মতে, তাঁর রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও প্রতিবাদী ভাষা বাংলাদেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্ব রাজনীতির নৈতিক প্রশ্নগুলোকে সামনে এনেছে। যে কারণে হুমকীর পর হুমকী, গোয়েন্দা নজরদারি, হয়রানি ও চাপের মুখে পড়তে হয়েছে তাকে বারবার । কিন্তু তিনি কখনো পিছু হটেননি।
সহযোদ্ধারা বলেন, “ওসমান হাদি জানতেন—চুপ থাকাই অন্যায়ের সবচেয়ে বড় সহযোগিতা।” এই বিশ্বাস থেকেই তিনি বারবার ঝুঁকি নিয়েছেন, জীবন বাজি রেখে কথা বলেছেন। বলেছেন, আমি শহীদী মৃত্যু চাই। শেষ পর্যন্ত আপোসহীন পথেই তিনি শহীদ হয়েছেন বলে জানান সহযোদ্ধা জাবেদ।
তাঁর মৃত্যু সংবাদ ছড়িয়ে পড়তেই বরিশাল, ঝালকাঠি, রংপুর, টেকনাফ থেকে শুরু করে রাজধানী ঢাকার অলিগলি, রাজপথ প্রকম্পিত হয়েছে। সর্বত্র শোকের ছায়ায় ছিলো জুলাই বিপ্লবের ব্যর্থতা দূরকরণের আহ্বান ও প্রতিবাদ। তাঁর জানাজায় শরীক হয়েছেন দলমত নির্বিশেষে সব রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দসহ সহকর্মী, আলেম, সাংস্কৃতিক কর্মী, লেখক, সাংবাদিক ও সাধারণ মানুষের ঢল। মানুষের চোখের জল বলে দেয়—ওসমান হাদি কেবল একজন রাজনৈতিক কর্মী ছিলেন না, তিনি ছিলেন মানুষের আস্থার জায়গা। যে কারণে তাঁর জানাজার মঞ্চে উচ্চারিত হয় কঠিন শপথ। সয়ং প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড মুহাম্মদ ইউনুস বলে উঠেন – আমরা আজকে তোমাকে প্রিয় হাদি, বিদায় দিতে আসিনি। আমরা তোমার কাছে ওয়াদা করতে এসেছি, তুমি যা বলে গেছ, সেটি যেন আমরা পূরণ করতে পারি।’
জানাজা শেষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদ্রোহী কবির কবরের পাশেই তাঁকে সমাহিত করা হয়েছে। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের পাশে তাঁর দাফন নিছক কাকতালীয় ঘটনা নয়। নজরুল যেমন সাম্য, মানবমুক্তি ও বিদ্রোহের প্রতীক, তেমনি ওসমান হাদি ছিলেন সেই দর্শনের বাস্তব রূপ। একদিকে কবিতার ভাষায় বিদ্রোহ, অন্যদিকে জীবনের লড়াই—দু’টি এক বিন্দুতে মিলিয়েছেন প্রিয় হাদী।
তাঁকে ঘীরে পিনাকী ভট্টাচার্য, ড কনক সরোয়ার, ইলিয়াস হোসাইন ও মাসুম মাহবুব লিখেছেন –
পিনাকী ভট্টাচার্য Pinaki Bhattacharya – পিনাকী ভট্টাচার্য
হাসতে হাসতে এই ছোট ছেলেটা জীবনটা দেশের জন্য কোরবানি দিয়ে জুলাইয়ের নিভু নিভু মশালটা আবারো জ্বালিয়ে দিয়ে গেলো দাউদাউ করে। বাংলাদেশের তরুণদের নতুন আইকন হাদি। যুগযুগ ধরে বাংলাদেশের তারুণ্যকে উদ্দীপ্ত করে যাবে হাদির জীবন ও কর্ম।
ড কনক সরোয়ার dr.kanak sarwar -ড.কনক সরওয়ার
সব মৃত্যু বেদনার। যার যায় সে বোঝে। হাদি সার্থক। তিনি শহীদী মৃত্যু চেয়েছিলেন। আল্লাহ তাকে কবুল করেছেন। তাঁর জানাজা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেন কনক সরোয়ার বলেন, অবিশ্বাস্য! অভাবনীয়! বর্ণনাতীত! হে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এমন আকূল ভালোবাসাময় জানাজা পাওয়ার সৌভাগ্য তুমি আমার জন্য কবুল করো! আমিন।
মাসুম মাহবুব Masum Mahbub
এই যে এতো প্রটোকল, এত দোয়া, এত ভালবাসা, এত গান, এত দ্রোহ, এত প্রতিবাদ কারণটা কী?
১. হাদী ইসলামের পক্ষে কথা বলতো।
২. হাদী ইন্ডিয়ান আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে কথা বলতো।
৩. হাদী মুখোশ পরা সুশীলদের বিপরীতে দাঁড়িয়েছিল।
৪. হাদী ন্যায় ও ইনসাফের পক্ষে দাঁড়িয়েছে।
৫. হাদী জুলাইকে বিক্রি করে লুটপাট করেনি, ক্ষমতা গ্রহণ করেনি, জুলাইকে রক্ষায় নিয়োজিত ছিলেন।
৬. ৭১ এর চেতনা ব্যবসা করতো না।
এরপর মাসুম মাহবুব অনেক ক্ষোভ নিয়ে লেখেন, আর কোন শোক নয়, মায়াকান্না নয়, এবার প্রতি*শোধ। খু*নিদের গুষ্টি শুদ্ধ জয় বাংলা করতে হবে। জুলাই বিপ্লবীরা পালাবে না, পালিয়ে বাঁচা যায় না। এবার স*ন্ত্রা*সী*দের বিরুদ্ধে ল*ড়া*ই শুরু।
এদিকে জনপ্রিয় সাংবাদিক ইলিয়াস হোসাইন 15Minutes তার এক পোস্টে লিখেছেন,
প্রিয় ওসমান হাদি। দেখো, তুমি কোথায় পৌঁছে গেছো। কয়েক শ বছর আগে তোমারই মতো আরেকজন বিপ্লবী এসেছিলেন পৃথিবীতে। যিনি কন্সটান্টিপোল বিজয়ের মাধ্যমে রাসূল (স.) এর ভবিষ্যত বানী পূর্ণ করেছিলেন।
যিনি জলপথে নয়, বরং স্থলপথ দিয়ে বিশাল পর্বতমালা পাড়ি দিয়ে কামানভরা নৌযান নিয়ে জালিমের দুর্গ গুড়িয়ে দিয়েছিলেন। সেই সুলতান মেহমেদের স্মৃতি বিজড়িত মসজিদ, ইস্তানবুলের ফাতিহ মসজিদে তোমার গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতো কিছু দেখার পরেও কি তুমি চুপ করে থাকবে। ফিরে আসার সুযোগ নেই আর জানি। তাই বলে, এতো তাড়াতাড়ি।
মাদ্রাসা কেন্দ্রীক রাজনীতির যে ভ্রান্ত ধারণা সুশীল নামধারী কিছু নাস্তিক নিয়মিত বিতরণ করছে, তার বিরুদ্ধে এক অনন্য উদাহরণ তৈরি করে গেছেন শহীদ ওসমান হাদি। তাঁর জীবন সবচেয়ে বড় যে বার্তাটি দেয়, তা হলো— মাদ্রাসা মানেই জঙ্গি নয়। বরং সেখান থেকেই জন্ম নিতে পারে ন্যায়বিচার, মানবিকতা ও আন্তর্জাতিক সংহতির রাজনীতি। তিনি সেই ধারণাকে নিজের জীবন দিয়ে প্রতিষ্ঠা করে গেছেন।
পরিশেষে, শহীদ ওসমান হাদি নেই, কিন্তু তাঁর চিন্তা, সাহস ও আদর্শ রয়ে গেছে। তিনি বদলে দিয়েছেন অনেক তরুণের দৃষ্টিভঙ্গি— বাংলাদেশের রাজনীতি কীভাবে বিশ্ব রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত, আর একজন মানুষ কীভাবে একা দাঁড়িয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে পারে তা দেখিয়ে গেছেন ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলার ক্ষণজন্মা এই আদর্শিক তরুণ শহীদ ওসমান হাদি। ঝালকাঠির এই সন্তান ইতিহাসে থেকে যাবেন একজন শহীদ হিসেবে। যিনি দেখিয়ে গেছেন, শিক্ষা যাই হোক, যদি চেতনা মানবিক হয়, তবে সেখান থেকেই জন্ম নেয় মুক্তির রাজনীতি। গণমানুষের আকাঙ্খা পূরণের পথ এখানেই স্পষ্ট হয়েছে আজ। আগামীর বাংলাদেশ হবে শহীদ হাদির বাংলাদেশ।







