Sharing is caring!
নদী ও সাগরে মাছ ধরায় ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা শুরু : চালের সাথে নগদ টাকা চান জেলেরা/ সাগরে ভারতীয় জেলেদের প্রবেশ বন্ধের দাবী
বিশেষ প্রতিবেদক
৪ অক্টোবর মধ্যরাত থেকে বাংলাদেশের নদী ও সাগরে সব রকমের মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা জারী করেছে প্রশাসন। নিষেধাজ্ঞা চলাকালে মাথাপিছু ২৫ কেজি চাল বরাদ্দ হয়েছে। কার্ডধারী প্রতিজন জেলে পরিবার পাবেন এই চাল। এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় চার লাখ জেলে পরিবার। তাদের দাবি, শুধু চাল নয়, নগদ টাকাও সাহায্য প্রয়োজন তাদের। তানা হলে কি করে বাঁচবে একটি পরিবার? শুধু সাদা ভাত কি খাওয়া যায় না গেছে কখনো। সাথে ডাল, তেল, পিঁয়াজ, সবজি, মরিচ এগুলোতো জোগাড় করতে হবে। সেজন্য টাকার প্রয়োজন। কোনো কাজ না থাকলে টাকা কোথায় পাব বলে উল্টো প্রশ্ন করেন একাধিক জেলে। তারউপর বাংলাদেশে নিষেধাজ্ঞা চললেও একইসময় ভারতের জেলেদের সাগরে মাছ ধরা অব্যাহত রয়েছে। তারা যখনতখন বাংলাদেশের জলসীমা ব্যবহার করছে বলে অভিযোগ উপকুলীয় জেলেদের। যদিও চাল নিয়ে জেলেদের দাবী যৌক্তিক মনে করলেও ভারতীয় জেলেদের প্রবেশ মনগড়া বক্তব্য বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট প্রশাসন।অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বরিশাল বিভাগে সরকারি হিসাবে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ২ লাখ ৩০ হাজার ৩৮৯ পরিবার। এরমধ্যে বরিশাল জেলায় নিবন্ধিত জেলে রয়েছেন ৪৩ হাজার ২৮৯ জন, পিরোজপুরে ১৭ হাজার ৬৮২, পটুয়াখালীতে ৫০ হাজার ১৩৯, ভোলায় ৮৯ হাজার ৬০০, বরগুনায় ২৬ হাজার ৪৮৯ ও ঝালকাঠিতে ৩ হাজার ২০০ জন। যদিও বেসরকারি পরিসংখ্যান বলছে শুধু ভোলা জেলাতেই এ সংখ্যা দুই লাখের বেশি। বরগুনায় ও পটুয়াখালীতে এ সংখ্যা লাখের উপরে। সত্যি বলতে প্রকৃত জেলেদের সঠিক পরিসংখ্যান সরকারের কাছে নেই বলে জানালেন একাধিক জেলে নেতা।
এদিকে ৪ অক্টোবর সকাল ১১টায় বরিশালে কীর্তনখোলা নদীতে নৌর্যালী ও সতর্কতা অভিযান পরিচালনা করেছেন বরিশালের জেলা প্রশাসন ও মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তারা। এবারই প্রথম ড্রোন উড়িয়ে নদী পর্যবেক্ষণে রাখার ঘোষণা দিয়েছেন কর্তৃপক্ষ।
ইলিশের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে শুক্রবার মধ্যরাত থেকে শুরু হয়েছে মা ইলিশ সংরক্ষণের এই অভিযান। আগামী ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত নদী-সাগরে ইলিশসহ সব ধরনের মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। এবিষয়ে বরিশালের জেলা প্রশাসক দেলোয়ার হোসেন বলেছেন, নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে জেলেদের সহায়তায় ভিজিএফ কর্মসূচির আওতায় প্রত্যেক জেলেকে ২৫ কেজি করে চাল বিতরণ করা হবে।
তিনি বলেন, জেলেদের জন্য পর্যাপ্ত চাল বরাদ্দ রাখা হয়েছে। গত বছর দু একটি অপ্রিতেকর ঘটনা ঘটেছে। আমরা চাই এ বছর ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা সুষ্ঠ ও শান্তিপূর্ণ ভাবে পালন করবেন জেলেরা। ২২ দিন পর আবার জেলেরা নদীতে মাছ শিকার করতে পারবেন। এ জন্য সবাইকে সচেতন হতে হবে৷
ইলিশ সংরক্ষণ অভিযান সফল করতে বরিশালের জেলা প্রশাসন ও মৎস্য অধিদপ্তরের উদ্যোগে বেলা ১১টায় কীর্তনখোলা নদীতে র্যালী বের হয়। র্যালীতে প্রশাসনের সাথে মৎস্য অধিদপ্তর, র্যাব, নৌ পুলিশ এবং কোস্টগার্ড সদস্যরা অংশ নেন। র্যালীতে বরিশালের জেলা প্রশাসক, পুলিশের ঊর্ধত্বন কর্মকর্তা, মৎস্য কর্মকতারা উপস্থিত ছিলেন। এই র্যালী কীর্তনখোলা নদীছাড়াও বেলতলা, শায়েস্তাবাদ অংশের আড়িয়াল খাঁ নদী সহ অনান্য নদী প্রদক্ষিণ করে। এসময় জেলা মৎস্য কর্মকর্তা রিপন কান্তি ঘোষ জানান, বরিশালের মেঘনা নদীতে মাছ ধরা বন্ধ রাখতে নৌ পুলিশ ও হিজলা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার উদ্যোগে ড্রোন উড়িয়ে নজর রাখা হবে। এছাড়া অভিযান পরিচালনার জন্য জেলায় ৩০ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরো জানান, বরিশাল জেলায় মোট জেলের সংখ্যা ৭৯ হাজার ৬২৩ জন। এর মধ্যে কার্ডধারী জেলে ৬৬ হাজার ৫২৪ জন। কার্ডধারি জেলেদের জন্য ১ হাজার ৬৬৩ দশমিক ১ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রত্যেক জেলে ২৫ কেজি করে চাল পাবে। নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে মাছ শিকার করলে দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড অথবা ৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হবে বলে জানান তিনি।
তার এই বক্তব্যের সুত্র ধরে শায়েস্তাবাদ ইউনিয়নের জেলে সরদার খোরশেদ বলেন, ২৫ কেজি চাল দিয়ে সরকারি দায়িত্ব শেষ। চালের সঙ্গে আনুষঙ্গিক খাদ্য উপকরণ জেলেরা কোথায় পাবেন তা কি কেউ ভেবেছেন? আমাদের বরিশাল জেলার জেলেরা কোনোভাবে এটা ওটা কাজ জোগাড় করতে পারলেও উপকূলীয় জেলেদের কথা ভাবা উচিত। বিশেষ করে বরগুনা ও ভোলার জেলেদের জীবনযাপনে সম্পূর্ণ জাল নির্ভর।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সরকারি হিসেব অনুযায়ী বরগুনায় নিবন্ধিত জেলে রয়েছে ৪৬ হাজার। বেসরকারি হিসেবে এ সংখ্যা লক্ষাধিক। এর মধ্যে নিষেধাজ্ঞাকালীন সময় জেলেদের খাদ্য সহায়তা কর্মসূচির আওতায় ৩৬ হাজার জেলেকে ২৫ কেজি করে চাল প্রদান করা হয়। যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। চাল বিতরণেও রয়েছে স্বজনপ্রীতিসহ নানা অভিযোগ।
বরগুনা উপকূলের জেলেরা জানান, মৎস্য সম্পদ রক্ষায় সরকারের নির্দেশনা সবসময় মেনে চলেন তারা। তবে সাগরে না যাওয়ায় আর্থিক অনটনে ভুগেন বেশিরভাগ জেলে। তাছাড়া চালের পাশাপাশি আর্থিক সহায়তা পাওয়ার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানান তারা।
তারা আরো বলেন ,মৌসুমের শুরু থেকে এ পর্যন্ত অন্তত একাধিকবার দুর্যোগের কবলে পড়ে এবং মাঝখানে ৬৫ দিনের নিষেধাজ্ঞায় সাগরে ঠিক মতো জাল ফেলতে না পারায় কাঙ্ক্ষিত ইলিশ আহরণ করতে পারেননি বরগুনার জেলেরা। ফলে অধিকাংশ ট্রলার মালিক, আড়তদার ও ব্যবসায়ীরা রয়েছেন লোকসানে।
নিয়মিত সাগরে মাছ ধরায় অভ্যস্ত রাফি ট্রলারের মাঝি রতন বলেন, নিষেধাজ্ঞা শুনে যখন ফিরছিলাম তখনই দেখলাম শত শত ভারতীয় ট্রলার মাছ ধরতেছে এরকম প্রতি বছর তারা বাংলাদেশের নিষেধাজ্ঞার সময় মাছ ধরে নিয়ে যাচ্ছে, যদি এভাবে তারা মাছ ধরতে থাকে তাহলে তো আমরা কোন বছরই মাছ পাবো না তাই সরকারের কাছে দাবি জানাই, যেকোনো উপায়ে আমাদের জলসীমায় ভারতীয় জেলেদের প্রবেশ বন্ধ করুন।
বরগুনার জেলেদের অভিযোগ, সরকার নামমাত্র ২৫ কেজি চাল সহায়তা দিলেও তা অধিকাংশ জেলে পান না । আবার অনেকে জেলে নন, তাঁরাও এ সহায়তা পাওয়ায় প্রকৃত জেলেরা বঞ্চিত হন।
বরগুনার আরেক জেলে শামীম মাঝি বলেন, ইলিশ ধরা ২২ দিন নিষেধ। এই নিষেধ চলাকালে সরকারের সব নিয়ম আমরা মেনে চলি, কিন্তু আমাদের দাবি হচ্ছে ভারতীয় জেলেরা আমাদের জলসীমায় জাল পেতে মাছ শিকার করে যাচ্ছে। বাংলাদেশে যখন মাছ শিকারে নিষেধাজ্ঞা থাকে, এ সময় ভারতের জেলেরা অবাধে সাগরে মাছ শিকার করেন। আমরা চাই আমাদের সঙ্গে ওই দেশেরও মাছ শিকার বন্ধ থাকবে।
জেলে আলম বলেন, ২০ বছর ধরে সাগরে মাছ ধরি জেলে কার্ড আছে কিন্তু সময়মতো কোন সহযোগিতা পাচ্ছি না ২০ কেজি ২৫ কেজি চাল পাই এতে আমার সংসার চলে না। ছেলে মেয়েদের লেখাপড়া মা-বাবার ঔষধের খরচ, গেল বছর এনজিও থেকে লোন নিয়েছিলাম সেটা এখন পর্যন্ত শোধ করতে পারিনি এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন পার করছি।
বরগুনা জেলা মৎস্যজীবী ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী বলেন, শুধু মা ইলিশ রক্ষা করলেই হবে না। জেলেদের পাশে সরকারকে দাঁড়াতে হবে। জেলেদের জন্য সরকারের বরাদ্দকৃত যে চাল দেয়া হয় এতে তাদের সংসার চালানো সম্ভব নয়। চালের পাশাপাশি নগদ অর্থও দিতে হবে। অন্যথায় তারা ঋণের বোঝায় জর্জরিত হয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে বিপাকে পড়বেন।
একই দাবী ভোলা জেলার প্রায় দুই লাখ জেলে পরিবারের।
জেলেদের সঠিক পরিসংখ্যান তৈরির কাজ চলমান রয়েছে জানিয়ে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব আবু তাহের মুহাম্মদ জাবের বলেছেন, ২৫ কেজি চাল একটি পরিবারের ভাতের নিশ্চয়তা দিলেও আনুষঙ্গিক খাদ্যের নিশ্চয়তা নয়, এটা আমরাও বুঝি। আমরাও মনে করি এটি পর্যাপ্ত কোনো সহযোগিতা নয়। এজন্য জেলেদের নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে উপায় বের করতে হবে। তাদের সঠিক পরিসংখ্যান আগে প্রয়োজন। এ নিয়ে কাজ করছে মন্ত্রণালয় ও মৎস্য অধিদপ্তর। তবে ভারতীয় জেলেদের আমাদের জলসীমায় প্রবেশের অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমাদের কোস্টগার্ড, নৌপুলিশের নিয়মিত টহল রয়েছে সাগরে। রয়েছে নৌবাহিনীর টহল। এসব এড়িয়ে আমাদের জলসীমায় প্রবেশ অসম্ভব বলে জানান মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের এই সচিব।
Sharing is caring!









