Sharing is caring!
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ব্যাণার পোস্টারে দৃষ্টি ভোটারের: খুঁজছেন সৎ নেতা
বিশেষ প্রতিবেদক
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীর প্রচারণা সম্বলিত ব্যাণার পোস্টারে গভীর দৃষ্টি রাখছেন সাধারণ মানুষ ও ভোটাররা। তাদের অনেকেই বলছেন, ব্যাণার পোস্টারেই সৎ নেতার পরিচয় ফুটে উঠবে এবার। দলীয় চেয়ারপারসন ও প্রার্থীর ছবির সাথে একাধিক ছবি যুক্ত করে প্রচারণা মানেই ঐ প্রার্থীর পোস্টারও সুবিধাবাদীদের দখলে। প্রার্থী নিজে নয়, তার হয়ে অন্যরা চালাচ্ছে প্রচারণা এবং যে চালাচ্ছে তার ছবি প্রার্থীর চেয়ে বড়। তারমানে দলের ভিতরই তার প্রতি ভালোবাসা ও বিশ্বাস কম তা পরিষ্কার হচ্ছে এমন ব্যানার পোস্টারে। তাছাড়া দখল বাণিজ্য ও চিহ্নিত চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসীদের ছবি বা নামের ব্যবহার রয়েছে প্রার্থীর প্রচারণার ব্যানার বা পোস্টারের নীচে, যা তার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে বলে জানান একাধিক গ্রামবাসী।
অন্যদিকে যে প্রার্থীর ব্যাণার পোস্টারে শুধু তারই একক ছবি ঝুলছে, তারমানে দলীয়ভাবেও তিনি প্রভাবশালী এবং নেতাকর্মীদের ভালোবাসা তার প্রতি রয়েছে বলে জানালেন তারা। যদিও রাজনৈতিক দলের নেতারা বলছেন, তফসিল ঘোষণার পরতো শুধু লিফলেট থাকবে।ব্যানার পোস্টার থাকবে না। তখন সব ঠিক হয়ে যাবে বলে জানিয়েছেন বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী নেতৃবৃন্দ।
আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘীরে সবগুলো রাজনৈতিক দলের প্রার্থী ঘোষণা চূড়ান্ত হয়েছে। এই ডিসেম্বরের যেকোনো মূহুর্তে তফসিল ঘোষণার আভাসও পাওয়া গেছে। এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচনী প্রচারণায় মুখরিত বরিশালসহ বাংলাদেশের প্রতিটি জেলা উপজেলা ও গ্রাম। বলা যায়, নির্বাচনী হাওয়া বইছে বাংলার আকাশে বাতাসে এখন। বিএনপির চেয়ারপারসন ও বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব বেগম খালেদা জিয়ার চিকিৎসা সংক্রান্ত জটিলতা ছাড়া বাকী সবকিছু এখন নির্বাচনমুখী। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকেও নিয়েও বিএনপির ভিতর চলছে সংশয়। তার দেশে আসাটা নির্বাচনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন বেশিরভাগ সাধারণ মানুষও। এসব আলোচনা সমালোচনাকে পাশে রেখে বরিশাল কিম্বা ঢাকা, খুলনা কিম্বা রংপুর যেখানেই দৃষ্টি যায়, সড়ক-মহাসড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এই মুহূর্তে ঝুলছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীদের প্রচার প্রচারণা নিয়ে হরেকরকম ব্যানার পোস্টার। বিশেষ করে বরিশাল থেকে ঢাকার পথে ইতিমধ্যেই শতাধিক তোরণ তৈরি হয়েছে। যা বেশিরভাগ বিএনপির প্রার্থীদের প্রচারণা কৌশল। মহাসড়ক জুড়ে ঝুলন্ত এসব তোরণ, ব্যানার পোস্টারে প্রার্থীর পাশাপাশি প্রচারকারী নেতা ও তার অনুসারীদের ছবি ও নাম ঝুলছে বিএনপির প্রায় প্রতিজন প্রার্থীর ব্যাণার পোস্টারে। রয়েছে অন্যান্য রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামী, এনসিপি সহ আরো অনেকের প্রচার প্রচারণা।
আর এই ব্যাণার- পোস্টারে যদি চোখ বুলানো হয়, তাহলেই ঐ দলটির চরিত্র, দলীয় শৃঙ্খলাসহ অনেককিছু স্পষ্ট হয়ে ওঠে বলে জানান রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণও। বরিশালের রাজনৈতিক বিশ্লেষক কাজী মিজানুর রহমান, মাহবুব খান, ঢাকার সাংবাদিক হাসান শান্তনু, ইয়াসীর আরাফাত, আদিত্য আরাফাতসহ একাধিক বিশ্লেষক বলেছেন, এবারের নির্বাচন হবে পরিবর্তনের নির্বাচন। সাধারণ মানুষ ব্যাণার পোস্টার দেখে প্রার্থীর চরিত্র বুঝে নেবেন। তারউপর চাঁদাবাজি ও দখল বাণিজ্যের ছাপও এই ব্যাণার পোস্টারেই স্পষ্ট হয়ে আছে। সাধারণ মানুষ এ থেকে তাদের প্রার্থী চিনে নিতে পারেন। এমন সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না বলে মতামত বিশ্লেষকদের। সরেজমিনে এমনই কিছু ব্যাণার পোস্টারের চিত্র দেখা গেছে বরিশালের উজিরপুর, বাকেরগঞ্জ ও সদর উপজেলায়। আবার রাজধানী ঢাকার মীরপুর ১৪ ও ১৬ আসন ঘুরেও দেখা গেছে একইচিত্র । বরিশাল সদর উপজেলার চাঁদপুরা ইউনিয়নের তালুকদার হাট স্কুল এন্ড কলেজের প্রবেশপথে ঝুলানো বিএনপির প্রার্থী আইনজীবী মজিবর রহমান সরোয়ার এর পোস্টারের সাথে আরো অনেকের ছবি সাঁটানো । আগে থেকে জানাশুনা না থাকলে মজিবর রহমান সরোয়ার যে কোন ব্যাক্তি তা চিহ্নিত করা মুশকিল। কারণ ৭/৮জনের ছবির ভিতর থেকে তাকে খুঁজে বের করতে হিমশিম খেতে হবে নতুন ভোটারকে। একইসাথে যদি জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশ এর পোস্টারে চোখ বুলানো যায়, তাহলে সেখানে প্রার্থী ছাড়া আর কারো ছবি নেই। এমনকি দলীয় প্রধানের ছবিও ব্যবহার হয়নি প্রার্থীর প্রচারণা পোস্টারে। বরিশাল সদর আসনে বিএনপির প্রার্থী অত্যন্ত প্রভাবশালী এবং ইতিপূর্বে চার চার বার এই আসনের হর্তাকর্তা ছিলেন। আর তার সাথে এবারই প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছেন জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ এর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মোয়াযযম হোসাইন হেলাল ও ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশ এর নায়েবে আমীর সৈয়দ ফয়জুল করিম। একইচিত্র দেখা গেছে বাকেরগঞ্জ উপজেলার চরামদ্দি ইউনিয়নের বিএনপির প্রার্থী আবুল হোসেন এর প্রচারণা পোস্টারে।
অপরদিকে অনেক জল্পনা কল্পনা, দড়ি টানাটানি শেষে বরিশাল ৩ মুলাদি বাবুগঞ্জ আসনে বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য ও ভারবাহী নেতা জয়নাল আবেদীন এর মনোনয়ন চূড়ান্ত হয়েছে। সাথে সাথে তাকে অভিনন্দন জানিয়ে ফেসবুকে ও গণমাধ্যমে বক্তব্য দিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী অধ্যক্ষ জহির উদ্দিন মুহাম্মদ বাবর। অথচ পরদিনই তাদের প্রার্থীর প্রচারণা পোস্টার নষ্ট করে বিএনপির প্রার্থীর পোস্টার ঝুলানোর অভিযোগ প্রায় প্রতিটি আসনে। সাধারণ গ্রামবাসীর অনেকেই বলছেন, আগামী নির্বাচনে শুধুমাত্র বরিশাল ১ গৌরনদী আগৈলঝারা আসনটি ছাড়া বরিশাল জেলার অন্য পাঁচটি আসনই হাতছাড়া হতে পারে বিএনপির। কেননা প্রতিটি আসনেই নিজেদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব চরমে তাদের। কোথাও কোথাও ত্রিমুখী সংকটেও রয়েছে বিএনপির প্রার্থী। সে তুলনায় ইসলামি দলগুলোর ঐক্য সাদরে গ্রহণ করছেন সাধারণ মানুষ।এখানে বরিশাল ১ আসনে বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য জহির উদ্দিন স্বপনের কার্যক্রম ও প্রচারণা কৌশলের প্রশংসা করেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হাফেজ মাওলানা কামরুল ইসলাম খান। তিনি নিজেও যথেষ্ট ভালো প্রচারণার সুযোগ পাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন। আবার ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ (ইসা) প্রার্থী মুহাম্মদ রাসেল সরদার মেহেদী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)র প্রার্থী মাজহারুল ইসলাম নিপুর প্রচার প্রচারণার প্রশংসা করেন বিএনপির প্রার্থী জহিরউদ্দিন স্বপন। যদিও অন্য পাঁচটি আসনে এই সহনশীলতা ও সৌন্দর্য অনুপস্থিত। বিএনপির প্রতিটি প্রচারণা পোস্টারে অসংখ্য নেতাকর্মীর ওয়ার্ড, ইউনিয়ন সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকের ছবির এক কোনায় প্রার্থীর ছবি ঠাই পাচ্ছে। আবার বাস টার্মিনাল এলাকার চাঁদাবাজ হিসেবে চিহ্নিত ব্যক্তিবর্গের ছবি নিয়ে প্রার্থীর পোস্টার হওয়ায় অনেক ভোটারের বিরূপ মন্তব্য – চাঁদাবাজ নিয়ে যাদের প্রচার প্রচারণা তাদের থেকে কি আশা করা যায়।। ব্যাণারেই রয়েছে আঁকা নেতার পরিচয়।।
এ চিত্র দেখা গেছে রাজধানীর ১৫ ও ১৬ আসন ঘুরে। এখানে ১৬ আসনের প্রার্থীর প্রচারণা পোস্টারে তিনি যে কে? তা খুঁজে পেতে রীতিমতো বিএনপি স্থানীয় নেতাদের ডেকে জানতে হয়েছে। কেননা, আমিনুল ইসলাম এর পোস্টারে তার চেয়ে বড় করে ছাপা হয়েছে প্রচারকারী নেতাদের ছবি। পাশাপাশি উদাহরণ হতে পারে ১৪ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী আমীর ডাঃ শফিকুল ইসলাম। এ আসনটি আগে আওয়ামী লীগের কামাল মজুমদারের দখলে ছিলো। এবার এটি নিশ্চিত জামায়াতে ইসলামীর আসন হতে যাচ্ছে বলে জানালেন মীরপুরের কাজীপাড়া এলাকার একজন বিএনপি নেতা।
ব্যানার পোস্টারে দলীয় প্রার্থী ছাড়া প্রচারকারীদের ছবি অযৌক্তিক দাবী করেন বরিশাল মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান ফারুক। তিনি বলেন, এ রকম বেশকিছু পোস্টার আমি নামিয়ে দিয়েছি। আসলে তফসিল ঘোষণার আগমুহূর্ত পর্যন্ত এসব আটকানো কষ্টকর হবে। তফসিল ঘোষণার পরতো আর কোনো ব্যানার পোস্টার থাকবে না। শুধু লিফলেট বিতরণ করা হবে।
তিনি এসময় আরো বলেন, স্কুল কলেজের প্রবেশপথ ও দেয়াল ব্যানার পোস্টার মুক্ত রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এ জাতীয় ব্যানার পোস্টার সম্পর্কে কিছুই জানেন না বিএনপির বরিশাল সদর আসনের প্রার্থী আইনজীবী মজিবর রহমান সরোয়ার এবং ঢাকা ১৬ আসনের প্রার্থী আমিনুল ইসলাম।
বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য আবু নাসের মুহাম্মদ রহমতুল্লাহ জানালেন, মনোনয়নের আগে বিভিন্ন প্রার্থী সমর্থকদের পোস্টার ছাপা হয়েছিল এভাবেই। মনোনয়ন চূড়ান্ত হবার পর শুধুমাত্র প্রার্থীর ছবি পরিবর্তন করে সমর্থন বদলে দিয়েছে সচেতন কর্মীরা। তফসিল ঘোষণার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত এজাতীয় প্রচারণা দোষের নয়। তবে কারা, কোথায় কীভাবে তার প্রচারণা চালাচ্ছে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রার্থী নিজেও জানেন না এসব কর্মকাণ্ড সম্পর্কে। এ বিষয়ে দলীয় প্রার্থীকেই সচেতন হতে হবে বলে জানান তিনি। এদিকে সাধারণ মানুষের কাছে ইসলামি আন্দোলন ও জামায়াতে ইসলামীর প্রচারণা কৌশল ক্রমশ জনপ্রিয় হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বরিশালের অনেকেই।
Sharing is caring!








