Sharing is caring!
অনৈতিক কার্যক্রম বন্ধ করার উদ্যোগে বাধা : বরিশালে ডিসি লেক নিয়ে সরগরম বামেরা
,বিশেষ প্রতিবেদক
হঠাৎ করেই ডিসি লেক নিয়ে সরগরম হয়ে উঠেছে বরিশালের বাম ঘরানার রাজনৈতিক দলগুলো। দেয়াল তৈরি শুরুর দুদিন পর তারা এই দেয়াল নির্মাণ বন্ধের আন্দোলনে নেমেছেন। তাদের এই আন্দোলনের নেপথ্যে অন্যকোনো উদ্দেশ্য রয়েছে বলে মনে করছেন একাধিক নগরবাসী। তারা জানান, সম্প্রতি ডাঃ মনীষা চক্রবর্তীর বাবার সম্পত্তির বিষয় তদন্ত দাবী করে আবেদন করেছেন বরিশালের জনৈক ব্যক্তি। গত ২৮ আগস্ট ঐ আবেদনের উপর তদন্ত শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে। যে কারণে ডাঃ মনীষা নগরবাসীর দৃষ্টি অন্যদিকে ব্যস্ত রাখতে চাইছেন বলে জানালেন অনেকে। তবে ঐ ঘটনার সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই বলে জানিয়েছে প্রশাসন।
ঘটনার অনুসন্ধানে জানা যায়, বরিশাল নগরীর ঐতিহ্যবাহী বেলস পার্ক ঘেঁষে গড়ে ওঠা শতবর্ষী ডিসি লেক দেওয়াল দিয়ে ঘেরার প্রতিবাদে ধারাবাহিক বিক্ষোভ চলছে নগরীতে। নির্মাণ বন্ধের দাবিতে গত এক সপ্তাহ ধরে গণস্বাক্ষর সংগ্রহ কর্মসূচী, মানববন্ধন ও জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপিসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে বাম ঘরানার রাজনৈতিক দলগুলো। সর্বশেষ এ নিয়ে মামলাও করা হয়েছে। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও চলছে জোর প্রতিবাদ। দেওয়াল নির্মাণ বন্ধে গত ৩০ সেপ্টেম্বর নগরীর কাউনিয়া ব্রাঞ্চ রোডের বাসিন্দা মো. হাফিজ আহমেদ বাবলু মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট আমলি আদালতে একটি মামলা করেছেন। বিচারক মো. সাদিক আহম্মেদ অভিযোগ আমলে নিয়ে কোতোয়ালী মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মিজানুর রহমানকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, তদন্ত চলমান রয়েছে। শেষ না হওয়া পর্যন্ত দেয়াল নির্মাণ বন্ধ রাখা হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, নগরীর রাজা বাহাদুর সড়কে জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার এবং জেলা ও দায়রা জজের বাসভবনের বিপরীতে বড় জলাধারটি ‘ডিসি লেক’ নামে পরিচিত। সম্প্রতি সেখানের উম্মুক্ত লেকে দুই শিশু খেলা করতে যেয়ে পরে যায়। এছাড়াও সকাল-সন্ধ্যা বখাটে আড্ডা, অসামাজিক কার্যকলাপ, সন্ধ্যার মাদকসেবীদের আড্ডা ও লেকের মাছ চুরির অভিযোগে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অর্ধেক দেয়াল ও অর্ধেক গ্রিল দিয়ে দৃষ্টিনন্দন উপযোগী করে ঘিরে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয় ডিসি লেক। আবার বেলস পার্কের অংশেও একইরকম দেয়াল শুরু থেকেই রয়েছে দেখা গেছে। কাজ শুরুর দুদিন পর দেয়াল নির্মাণের বিরোধিতা করে প্রথমে চারপাঁচ জনের একটি মানববন্ধন হয় লেকের পারে। লোকের অভাবে চারটার মানববন্ধন শুরু হয় সন্ধ্যার একটু আগে। সেসময় এ নিয়ে অনেকে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। নগরবাসীর ব্যানারে আয়োজিত মানববন্ধনে নগরবাসীর উপস্থিতি প্রায় নেই বললেই চলে। এভাবেই গত কয়েক দিন ধরে নানা কর্মসূচি পালন করছে বরিশালের বাসদসহ সমমনা কয়েকটি রাজনৈতিক দল। ৫ অক্টোবর এ নিয়ে শিশুদের জড়ো করে চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতাও করে তারা। এতে অল্পের জন্য উম্মুক্ত পুকুরে পরে যাওয়া থেকে একজন শিশু প্রতিযোগী রক্ষা পায় বলে জানিয়েছেন চিত্রাঙ্কন দেখতে আসা একজন দর্শক। এ প্রসঙ্গে বাসদ বরিশাল জেলা শাখার সমন্বয়ক ডাঃ মনীষা চক্রবর্তী বলেন, জেলা প্রশাসক আমাদের বলেছেন যে, লেকের মাছ চুরি হচ্ছে। পাশাপাশি সেখানে অসামাজিক কাজ, মাদক সেবন হচ্ছে। তিনি আরও বলেছেন যে, এটা জেলা প্রশাসকের জলাশয়। এটাকে বাউন্ডারি দেয়ার অধিকার জেলা প্রশাসকের আছে। কিন্তু আমরা তাকে বলেছি, সরকারি জলাশয়টিকে সরকারের মুখপাত্র হিসেবে জেলা প্রশাসক উন্নয়ন করতে পারেন কিন্তু দেয়াল দিয়ে আবদ্ধ করতে পারেন না।
বরিশাল গণসংহতি আন্দোলনের সমন্বয়ক আব্দুর রশিদ নিলু বলেন, ‘এই লেকটি ডিসির ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, এটা বরিশালবাসীর সম্পদ। কিন্তু বর্তমান জেলা প্রশাসক দেলোয়ার হোসেন অনেকটা আমলাতান্ত্রিক প্রভাব দেখিয়ে উন্মুক্ত জলাশয়ে দেয়াল দিয়ে এটিকে অবরুদ্ধ করছেন।’
এদিকে বরিশালের জেলা প্রশাসক দেলোয়ার হোসেন বলেছেন, নারী ও শিশুদের নিরাপত্তার কথা ভেবেই ডিসি লেকের চারপাশে দেয়াল হওয়া জরুরী। এতে সৌন্দর্য বা দর্শনার্থীদের কোনো সমস্যা হবে না।বরং আগের চেয়ে নিরাপদ ও দৃষ্টিনন্দন হবে ডিসি লেক। সেভাবেই দেয়াল তৈরি হচ্ছে জানিয়ে জেলা প্রশাসক আরো বলেন, কাজ শেষ করার আগেই বাধা দিয়ে না বুঝেই অনেকে লেকের সৌন্দর্য বৃদ্ধির পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছেন।
তিনি বলেন, আগে কাজটি শেষ করতে দিন, বেলস পার্ক অংশে যেরকম দেয়াল রয়েছে, একইভাবে ঘাট ব্যবহার উপযোগী রেখে চারপাশে দেয়াল হচ্ছে।
বরিশালের গণ্যমান্য অনেকেই জেলা প্রশাসকের বক্তব্যে সহমত পোষণ করে বলেছেন, বেলস পার্ক অংশে দেয়াল রয়েছে। একইরকম গ্রীল বসানো দেয়াল হলে ক্ষতি নেই।
ডিসি লেকের ঘাট উম্মুক্ত রেখে, প্রয়োজনে দু’প্রান্তে দুটো পুকুর ঘাট তৈরি করে দেয়াল হলে আরো ভালো হবে জানিয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা বীরপ্রতীক মহিউদ্দিন মানিক বলেছেন, ডিসি পুকুর বা লেকের সংরক্ষণের জন্য বুক পর্যন্ত দেয়াল হলে ভালো হবে। যাতে দর্শনার্থীদের দেখায় কোনো সমস্যা না হয়। এতে করে লেকের পানিতে ময়লা আবর্জনা, চিপ জাতীয় খাবারের প্যাকেট ফেলা বন্ধ হবে। আবার শিশুরা যখনতখন ছুটে পানিতে পরার ঝুঁকি থাকবেনা। তাছাড়া লেকের পাড়ে বসে অবৈধ ও অনৈতিক কার্যক্রমও বন্ধ হবে বলে জানান মহিউদ্দিন মানিক।
বরিশাল ৫ আসনের মনোনয়ন প্রত্যাশী বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আবু নাসের মুহাম্মদ রহমতুল্লাহ বলেন, অবৈধ ও অনৈতিক কার্যক্রম বন্ধ করতে হলে দেয়াল নির্মাণের বিকল্প নেই। তবে লক্ষ্য রাখতে হবে এই দেয়াল যেন লেকের সৌন্দর্য বৃদ্ধির পরিবর্তে দর্শনার্থীদের ভোগান্তি কারণ না হয়। ভ্রমনে আসা নারী শিশুদের নিরাপত্তা সবার আগে নিশ্চিত করতে হবে এবং অবশ্যই চারপাশে ওয়াকওয়ে থাকতে হবে বলে জানান রহমতুল্লাহ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ব্যবসায়ী মাহবুব খান বলেন, ভরদুপুরে লেকের পাশে স্কুল কলেজের ছেলেমেয়েদের দাপাদাপি শুরু হয়। সন্ধ্যায় বখাটে উৎপাত। ঐ পথে চলতে আমাদের লজ্জা লাগে। এখানে দেয়াল হওয়া জরুরী বলে জানান মাহবুব খান সহ আরো একাধিক নগরবাসী। তবে সকলেই চান দেয়ালের পাশাপাশি দৃষ্টিনন্দন সৌন্দর্যে ভেসে উঠুক ডিসি লেক।
ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, ১৮৯৬ সালে বৃটিশ শাসনামলে নিকোলাস বিটসন বেল বাকেরগঞ্জে (বর্তমানে বরিশাল) জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কাজে যোগ দেন। তিনি ছিলেন ভারত দরদি বৃটিশ নাগরিক। বরিশালের জন্য তিনি অনেক কল্যাণকর কাজ করে স্মরণীয় হয়ে আছেন। তৎকালীন সমাজসেবক খান বাহাদুর হেমায়েত উদ্দিনের সহযোগিতায় তিনি বরিশালে মুসলিম ছাত্রদের জন্য নির্মাণ করেন বেল ইসলামিয়া হোস্টেল। তরুণদের খেলার জন্য একটি পার্ক প্রতিষ্ঠা করেন। পরে পার্কটির নামকরণ করা হয় বেল’স পার্ক। এই বেলস পার্ক তৈরির সময় পাশেই একটি পুকুরও খনন করা হয়। যেটি আজ ডিসি লেক হিসেবে পরিচিত। জনশ্রুতি আছে বরিশালে রাজা পঞ্চম জর্জের আগমনকে স্মরণীয় করে তোলার লক্ষ্যে পার্ক ও পুকরটি তৈরি করেন বেল সাহেব। আর একাজে তাকে সহযোগিতা করেন খান বাহাদুর হেমায়েতউদ্দিন।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় এই মাঠেই মুক্তিযোদ্ধাদের সমরশিক্ষা দিতেন বরিশালের সেক্টর কমান্ডার মেজর এম এ জলিল। বর্তমানে সেই স্থানটি স্মরণীয় করে রাখতে সেখানে করা হয়েছে একটি মুক্তমঞ্চ। সাতশ ৫০ ফুট লম্বা ও পাঁচশ ৫০ ফুট প্রস্থ বেল’স পার্কটির পূর্ব পাশে বিনোদন উপযোগী করে লেক তৈরি হয়েছে। পশ্চিম পাশে রয়েছে ডিসি লেকের অবস্থান।
সবুজ ঘাসে ঢাকা মাঠ, চারদিকের ওয়াকওয়ে, বসার বেঞ্চ, ছোট বড় বাহারী বৃক্ষ, লেক মিলিয়ে পার্কটি হয়ে উঠেছে অনন্য।
বর্তমানে এই জায়গাটি পরিণত হয়েছে বরিশালের একটি পর্যটন কেন্দ্রে। উদ্যানটি ঘেষেই শিশুদের জন্য করা হয়েছে গ্রিন সিটি পার্ক। আর গ্রীণ সিটি পার্কের ঠিক পিছনে দৃষ্টিনন্দন সৌন্দর্য নিয়ে তৈরি হচ্ছে ডিসি লেক। যা অদূর ভবিষ্যতে বরিশালের সৌন্দর্য ও ইতিহাসের সাক্ষী হবে বলে মনে করেন নগরবাসী।
Sharing is caring!








