ঢাকায় সকাল থেকেই গ্যাস থাকেনা চুলোয়: চলছে সিলিন্ডার ষড়যন্ত্র

আরিফ আহমেদ

Sharing is caring!

(ঢাকায় চরম গ্যাস সংকট: সিলিন্ডার ষড়যন্ত্র নাকি অন্যকিছু) 
 বিশেষফ প্রতিবেদক 

oplus_2

এই মূহুর্তে গ্যাস নেই রাজধানীর পুরোন ঢাকাসহ মীরপুরের অনেক বাসাবাড়িতে। যা স্বীকার করেছেন তিতাসগ্যাস কর্তৃপক্ষ নিজেও। এজন্য জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টার বক্তব্যের রেফারেন্স তুলে ধরে বাসাবাড়িতে সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছেন তারা।

জানা গেছে, গত প্রায় ছয়মাস ধরেই গভীর রাত পর্যন্ত গ্যাস থাকেনা পুরোন ঢাকায়। এছাড়াও মীরপুর ৬ নং সেকশন এ ও বি ব্লক, শিয়ালবাড়ি, রূপনগর আবাসিক এলাকায় প্রায় প্রতিদিনই সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত গ্যাস থাকেনা বা গ্যাসের চাপ এতোটাই নেমে যায়, যে কিছুই রান্না করা সম্ভব হয়না বলে জানিয়েছেন বাসিন্দারা।
২৫ অক্টোবর শনিবার সকালে মীরপুর বাসীর এই অভিযোগের সত্যতার প্রমাণ পাওয়া যায় ৬ নং সেকশন বি ব্লকের ৪ নং সড়কে এসে। এখানে সড়কের দুপাশের প্রতিটি বাড়ির বাসিন্দারা তাদের রান্নাঘর দেখিয়ে বলেন, সকাল ৯টা থেকে একফোঁটা গ্যাস নেই চুলোয়। বেলা দুটোর পর হয়তো আসবে। কারণ বিগত ছয়মাস ধরে এই সমস্যার মধ্যে  আসি আমরা।
তারা আরো বলেন, এ নিয়ে তিতাসগ্যাস কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগও করা হয়েছে, কিন্তু কোনো সমাধান আজ পর্যন্ত পাইনি। বরং তিতাস কর্তৃপক্ষ আমাদের সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহার করতে পরামর্শ দিচ্ছেন।
এ কথা স্বীকার করে তিতাসগ্যাস এর কর্মকর্তারা বলছেন, শুধু মীরপুর বা পুরোন ঢাকাই নয়, রাজধানীর অনেক এলাকায়ই গ্যাস নেই। সামনে আরো থাকবেনা। এতে আমাদের কিছু করার নেই। সরকার সিলিন্ডার বা এলপিজি আমদানি করছেন বলে জানান তারা।
এদিকে বাসাবাড়িতে গ্যাস না থাকার জন্য জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টাকে দায়ী করছেন ভুক্তভোগীরা। তাদের মতে, উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খানের বক্তব্যের ভুল ব্যাখ্যা করে তিতাসগ্যাস কর্তৃপক্ষ ইচ্ছেকৃত এই ভোগান্তি সৃষ্টি করছে। জুলাই বিপ্লবের পরও এসব প্রতিষ্ঠানে ফ্যাসিবাদের দোসররা বসে আছে। তারা উপদেষ্টার বক্তব্যের পরপরই পাইপলাইন সংযোগ রয়েছে এমন সব বাসাবাড়িতে গ্যাস সংকট সৃষ্টি করে সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহারে বাধ্য করতে চাচ্ছে। কেননা, উপদেষ্টা স্পষ্ট বলেছেন, নতুন করে বাসাবাড়িতে গ্যাস সংযোগ দেয়া সম্ভব হবে না বা অসম্ভব।  তাই বলে পুরাতন সংযোগে কেন গ্যাস থাকবে না? এ প্রশ্ন তুলে একাধিক গ্রাহক বলেন, উপদেষ্টার বক্তব্যের পরপরই পাইপলাইন সংযোগ রয়েছে এমন সব বাসাবাড়িতে গ্যাস সংকট সৃষ্টি করা হচ্ছে। এজন্য এলপিজি ব্যবসায়ীদের থেকে তিতাসগ্যাস কর্মকর্তারা বড় অংকের উৎকোচ পাচ্ছে বলেও অভিযোগ গ্রাহকদের।
“আমাদের সিলিন্ডারে গ্যাসে অভ্যস্ত হতে হবে।’ গত ৮ অক্টোবর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল-বিশ্বরোড মোড়ে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের বেহাল অংশ পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান এরকম বক্তব্য রাখেন। তার এ বক্তব্যের প্রভাব পরেছে তিতাসগ্যাস কর্তৃপক্ষের উপর। এর আগে বিভিন্ন সময় উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান বাসাবাড়িতে আর গ্যাস সংযোগ দেয়া হবেনা বলে জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন ‘আমাদের নিজস্ব গ্যাস কমে গেছে। এখন আমরা ৬০-৬৫ টাকা করে গ্যাস আমদানি করি।” তার এ বক্তব্যের পর থেকেই রাজধানীতে গ্যাস সংকট চরম আকার ধারণ করেছে বলে দাবী গ্রাহকদের।
এদিকে পেট্রোবাংলার হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ২৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস মজুদ রয়েছে, যেখানে চাহিদা ৩৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ ২০২৫ সালে গ্যাসের অভাব বেড়ে ১০০০ মিলিয়ন ঘনফুটে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ধারাবাহিকভাবে গ্যাসের উৎপাদন কমছে। বন্ধ হচ্ছে একের পর এক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। ঘুরছে না শিল্পকারখানার চাকা। ঠিকমতো জ্বলছে না বাসাবাড়ির চুলা। নতুন গ্যাসক্ষেত্রের সন্ধান না পেলে এবং নতুন খনি থেকে উত্তোলন শুরু না হলে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) ওপর নির্ভরতা বাড়বে। ভুক্তভোগী হবে শিল্প খাত। উচ্চদামে এলএনজি কেনায় বাড়বে জীবনযাত্রার ব্যয়।
গ্যাস অনুসন্ধানে সরকার স্থলভাগে পুরোনো ৫০টি ও নতুন করে ১০০টি কূপ খনন ও সংস্কারের উদ্যোগ নিলেও এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য ফল পাওয়া যায়নি। সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধানের কোনো অগ্রগতি নেই। এ জন্য ২০৩০ সাল আসার আগেই প্রাকৃতিক গ্যাস ফুরিয়ে যাওয়ার ধাক্কা সামলাতে সরকারকে প্রস্তুতি নিয়ে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।
বর্তমানে দেশি গ্যাস ক্ষেত্র থেকে দিনে ১৮০ কোটি ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা হয়। ২০১৭ সালে ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা হতো। দেশি গ্যাসের প্রতি ইউনিটের (ঘনমিটার) দাম তিন টাকার মতো। বিদেশ থেকে আমদানি করা এলএনজির দাম ৫৫ টাকা। বাংলাদেশ তেল, গ্যাস খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) সর্বশেষ সমীক্ষা (২০১০) অনুযায়ী দেশে উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের মজুত আছে ২৮ দশমিক ৭৯ টিসিএফ (ট্রিলিয়ন বা লাখ কোটি ঘনফুট)। ২০২২-২৩ অর্থবছর পর্যন্ত ২০ দশমিক ৩৩ টিসিএফ গ্যাস উত্তোলন করা হয়েছে। বাকি আছে প্রায় ৯ (৮ দশমিক ৪৬) টিসিএফ গ্যাস। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন বলেন, ২০৩০-এর পর প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ এতই কমে যাবে যে বাণিজ্যিকভাবে তা ব্যবহার করা যাবে না। কোনো কারণে এটি কয়েক বছর পেছাতে পারে। গ্যাস শেষ হলে এলএনজি ব্যবহারের হার বাড়বে। শিল্পে প্রভাব পড়বে। জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়বে। দেশের ২৯টি গ্যাসক্ষেত্রের মধ্যে উৎপাদনে আছে ২০টি। ভোলার ইলিশা ও ভোলা নর্থ; সিলেটের জকিগঞ্জ এবং কুতুবদিয়া থেকে এখন পর্যন্ত কোনো গ্যাস উত্তোলন করা হচ্ছে না। কারণ পাইপলাইন ও অবকাঠামো তৈরি হয়নি। এ নিয়ে কোনো উদ্যোগও লক্ষ্য করা যায়নি।
আবার নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ, সিলেটের ছাতক, গাজীপুরের কামতা, ফেনী ও চট্টগ্রামের সাংগু- এই পাঁচ খনিতে ৬৬১ বিসিএফ গ্যাস থাকা অবস্থায় উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। এগুলো বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য নয়। দেশের গ্যাস খাতে সরবরাহ ও মজুত বাড়াতে স্থলভাগের চার গ্যাস ক্ষেত্রে ড্রিলিং বা গভীর কূপ খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রতি কূপে ১৫ থেকে ২৫ মিলিয়ন ঘনফুট পর্যন্ত গ্যাস পাওয়া সম্ভব বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। পেট্রোবাংলার তথ্যে, অন্তর্বর্তী সরকার ১০০টি কূপ খনন ও ওয়ার্কওভারের প্রকল্প নিয়েছে। এর মধ্যে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ৩১টি পুরোনো কূপ সংস্কারে জোর দেওয়া হয়েছে। বাকি ৬৯টি অনুসন্ধান ও উন্নয়ন কূপ। ২০২২ সালে তৎকালীন সরকার ৫০টি কূপ খননের পরিকল্পনা নেয়। তবে সেগুলোর বর্তমান অবস্থা জানা যায়নি।
জ্বালানি বিভাগ আশা করছে, দুই-তিন বছরে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হবে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে বছরে সরবরাহ করা হচ্ছে ১ হাজার ৮০০ এমএমসিএফডি গ্যাস। বছরে ২ হাজার এমএমমিএফডি গ্যাসের সরবরাহ ধরে রাখতে হলে বছরে অন্তত ১০টি কূপ খনন করতে হবে।
বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক সমিতির সভাপতি ড. বদরুল ইমাম বলেন, পৃথিবীতে যেসব বদ্বীপ এলাকা আছে সেখানে প্রাকৃতিক জ্বালানি থাকে। বাংলাদেশেও থাকার কথা। পাঁচ বছরের মধ্যে ১০০ কূপ খনন করে ভালো কিছু দেখাতে পারলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে জানান তিনি।
Print Friendly, PDF & Email

Sharing is caring!

About the author

ডিসেম্বর ৭১! কৃত্তনখোলার জলে সাঁতার কেটে বেড়ে ওঠা জীবন। ইছামতির তীরঘেষা ভালবাসা ছুঁয়ে যায় গঙ্গার আহ্বানে। সেই টানে কলকাতার বিরাটিতে তিনটি বছর। এদিকে পিতা প্রয়াত আলাউদ্দিন আহমেদ-এর উৎকণ্ঠা আর মা জিন্নাত আরা বেগম-এর চোখের জল, গঙ্গার সম্মোহনী কাটিয়ে তাই ফিরে আসা ঘরে। কিন্তু কৈশরী প্রেম আবার তাড়া করে, তের বছর বয়সে তের বার হারিয়ে যাওয়ার রেকর্ডে যেন বিদ্রোহী কবি নজরুলের অনুসরণ। জীবনানন্দ আর সুকান্তে প্রভাবিত যৌবন আটকে যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙ্গিনায় পদার্পন মাত্রই। এখানে আধুনিক হবার চেষ্টায় বড় তারাতারি বদলে যায় জীবন। প্রতিবাদে দেবী আর নিগার নামের দুটি কাব্য সংকলন প্রশ্ন তোলে বিবেকবানের মনে। তার কবিতায়, উচ্চারণ শুদ্ধতা আর কবিত্বের আধুনিকায়নের দাবী তুলে তুলে নেন দীক্ষার ভার প্রয়াত নরেণ বিশ্বাস স্যার। স্যারের পরামর্শে প্রথম আলাপ কবি আসাদ চৌধুরী, মুহাম্মদ নুরুল হুদা এবং তৎকালিন ভাষাতত্ব বিভাগের চেয়ারম্যান ড. রাজীব হুমায়ুন ডেকে পাঠান তাকে। অভিনেতা রাজনীতিবিদ আসাদুজ্জামান নূর, সাংকৃতজন আলী যাকের আর সারা যাকের-এর উৎসাহ উদ্দিপনায় শুরু হয় নতুন পথ চলা। ঢাকা সুবচন, থিয়েটার ইউনিট হয়ে মাযহারুল হক পিন্টুর সাথে নাট্যাভিনয় ইউনিভার্সেল থিয়েটারে। শংকর শাওজাল হাত ধরে শিখান মঞ্চনাটবের রিপোটিংটা। তারই সূত্র ধরে তৈরি হয় দৈনিক ভোরের কাগজের প্রথম মঞ্চপাতা। একইসমেয় দর্শন চাষা সরদার ফজলুল করিম- হাত ধরে নিযে চলেন জীবনদত্তের পাঠশালায়। বলেন- মানুষ হও দাদু ভাই, প্রকৃত মানুষ। সরদার ফজলুল করিমের এ উক্তি ছুঁয়ে যায় হৃদয়। সত্যিকারের মানুষ হবার চেষ্টায় তাই জাতীয় দৈনিক রুপালী, বাংলার বাণী, জনকণ্ঠ, ইত্তেফাক, মুক্তকণ্ঠের প্রদায়ক হয়ে এবং অবশেষে ভোরেরকাগজের প্রতিনিধি নিযুক্ত হয়ে ঘুরে বেড়ান ৬৫টি জেলায়। ছুটে বেড়ান গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। ২০০২ সালে প্রথম চ্যানেল আই-্র সংবাদ বিভাগে স্থির হন বটে, তবে অস্থির চিত্ত এরপর ঘনবদল বেঙ্গল ফাউন্ডেশন, আমাদের সময়, মানবজমিন ও দৈনিক যায়যায়দিন হয়ে এখন আবার বেকার। প্রথম আলো ও চ্যানেল আই আর অভিনেত্রী, নির্দেশক সারা যাকের এর প্রশ্রয়ে ও স্নেহ ছায়ায় আজও বিচরণ তার। একইসাথে চলছে সাহিত্য বাজার নামের পত্রিকা সম্পাদনার কাজ।