Sharing is caring!
নির্বাচনী উত্তাপে বরিশাল: ছয়টি আসনেই বাড়ছে ইসলামি দলের সমর্থন (আলোচনায় জামায়াতে ইসলাম)
, বিশেষ প্রতিবেদক
আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বরিশালের ছয়টি আসনে রাজনৈতিক মাঠ এখন বেশ সরগরম হয়ে উঠেছে। এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টিকে বাদ দিয়ে এখন পর্যন্ত মাঠে দেখা গেছে — বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ (চরমোনাই পীরের দল), এনসিপি ও বাসদের সরব উপস্থিতি। এসব রাজনৈতিক দল ইতোমধ্যেই মাঠপর্যায়ে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। ঘুরছে দ্বারে দ্বারে, পরিচিত হবার চেষ্টা চলছে সাধারণ মানুষের সাথে। কোনো কোনো দলে প্রার্থী চূড়ান্তকরণের পরপরই চলছে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব–সমঝোতা। আবার কোথাও কোথাও ধর্মভিত্তিক ও রাজনৈতিক প্রচার প্রচারণা এবং ভোটারদের দোদুল্যমান মনোভাব, সব মিলিয়ে বরিশালের ছয়টি আসনেই জমজমাট নির্বাচনী প্রস্তুতি লক্ষ্য করা গেছে প্রতিটি রাজনৈতিক দলের কর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে । আমাদের প্রতিনিধি ঘুরছেন বরিশাল তথা দক্ষিণাঞ্চলের ছয় জেলার ২১টি আসনে। প্রতিটি আসন নিয়ে থাকবে আমাদের পূর্ণাঙ্গ পৃথক প্রতিবেদন। এ পর্বে বরিশাল জেলার ছয় আসনের সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরা হলো। এরপরই আসবে বিস্তারিত বিশ্লেষণ।বরিশাল-১ (গৌরনদী– আগৈলঝারা)
এই আসনে বিএনপি, জামায়াত এবং ইসলামী আন্দোলন, তিনপক্ষই রয়েছে শক্ত অবস্থানে। যদিও বিগত সময়ে এটি বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিলো। যে কারণে অনেকটা আটঘাট বেধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে মাঠে নেমেছে ইসলামি দলগুলো। এখানে বিএনপির প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা জহির উদ্দিন স্বপন। বরাবরই তিনি এখানে শক্তিশালী ও সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয়। তবে এবার তার নিজ দলের ভিতরে অন্ধকার রয়েছে বলে দাবী গৌরনদী বাস টার্মিনাল এলাকার ব্যবসায়ীদের। যে কারণে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হাফেজ মাওলানা কামরুল ইসলাম খান ভালো প্রচারণার সুযোগ পাচ্ছেন। আবার ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ (ইসা) প্রার্থী মুহাম্মদ রাসেল সরদার মেহেদী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)র প্রার্থী মাজহারুল ইসলাম নিপুকে ঘীরে চলছে জোর আলোচনা ও প্রচার প্রচারণা।স্থানীয় জনগণের কেউ কেউ বলছেন, এখানে হাড্ডাহাড্ডি অবস্থানে রয়েছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান। হিন্দু অধ্যুষিত এই এলাকার বেশিরভাগ ভোট যে কোন দলের পক্ষে যাবে তা বলার সময় এখনো আসেনি বলে জানান আগৈলঝারার গৈলা বাজারের বাসিন্দারা। তারা বলেন, এবারের নির্বাচন সহজ হবে না। কেননা তরুণ ভোটারদের একাংশ পরিবর্তনের পক্ষে। আবার ধর্মীয় চিন্তাভাবনা থাকা ভোটারদের মধ্যে ইসলামি দলের প্রভাব দৃশ্যমান। যদিও এখানের প্রত্যন্ত গ্রামের উন্নয়নে অতীতে দলমত নির্বিশেষে জহিরউদ্দিন স্বপন এর প্রশংসনীয় ভূমিকা রয়েছে বলে স্বীকার করেন অনেকেই। তাদের মতে, আওয়ামী লীগের বাঘা নেতা হাসনাত আব্দুল্লাহ সাথে লড়াই করা যোদ্ধা একজনই আছেন, তিনি জহিরউদ্দিন স্বপন। বিশেষ করে গত ৭ নভেম্বর জহিরউদ্দিন স্বপন এর বক্তব্যে প্রাণ ফিরে পেয়েছেন এ অঞ্চলের নিরব আওয়ামী লীগ সমর্থকরা। এসময় স্বপন বলেছেন, চিহ্নিত দাগী অপরাধী বাদে ধানের শীষের দরজা (বিএনপির) সকলের জন্য খোলা থাকবে। তার এ বক্তব্য ভাইরাল এখন বরিশাল জুড়ে।
বরিশাল-২ (উজিরপুর–বানারিপাড়া)
এই আসনটি বরিশালের সবচেয়ে আলোচিত প্রতিদ্বন্দ্বিতার একটি। দীর্ঘদিন সাংগঠনিকভাবে দূর্বল ছিলো এখানকার বিএনপি। আবার এখানে মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন অনেকেই। দলীয়ভাবে প্রার্থীর মনোনয়ন চূড়ান্ত হওয়ার পর থেকেই এখানে বিএনপির দলীয় কর্মীরা ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। আবার জামায়াতে ইসলামী সম্প্রতি মোটরসাইকেল শোভাযাত্রা, লিফলেট ও দ্বারে দ্বারে প্রচারণায় বেশ সক্রিয় দেখা গেছে। ইসলামী আন্দোলনও নিরবচ্ছিন্ন ও সুশৃঙ্খলভাবে মাঠপর্যায়ের কাজ করছে। এখানে বিএনপির প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য এস. সরফুদ্দিন আহমেদ (সান্টু)র জনপ্রিয়তায় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে তার বেশকিছু স্ববিরোধী বক্তব্যে। যে কারণে সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাস্টার আব্দুল মান্নান এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এর প্রার্থী মাওলানা মুহাম্মদ নেছার উদ্দীন। তাদের ভোটবাক্স যদি একটি হয়, তাহলে বিএনপিকে এই আসন ছাড়তে হবে বলে মনে করেন উজিরপুর উপজেলা সদরের বাসিন্দারা।
আবার বানারিপাড়ার মাধবপাশা, উজিরপুরের সাতলা ঘুরে বেশিরভাগ জনমত ধর্মভিত্তিক বলে মনে হতে পারে। যদিও এখানেও মোট জনসংখ্যার ৬০ ভাগ হিন্দু সম্প্রদায়। এদের ভোট এখানে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। একই সঙ্গে বিএনপির পুরনো ভোট ব্যাংক এখনও শক্তিশালী বলে জানা গেছে। (বিস্তারিত থাকবে আগামী পর্বে।)
বরিশাল-৩ (বাবুগঞ্জ–মুলাদি)
বিএনপির অভ্যন্তরীণ মনোনয়ন প্রতিযোগিতা এ আসনের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। যে কারণে এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত হয়নি এই আসনে বিএনপির মনোনয়ন। একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থী ও তাদের অনুসারীরা মাঠে সক্রিয় থাকায় বিভাজনের আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলন আগেভাগেই প্রার্থী ঠিক করে প্রচারণা ত্বরান্বিত করেছে। ইতিমধ্যেই প্রচার প্রচারণায় জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী অধ্যক্ষ জহির উদ্দিন মুহাম্মদ বাবর এর নাম প্রায় প্রতিদিনই সংবাদ শিরোনাম হচ্ছে। আবার ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এর প্রার্থী মাওলানা মুহাম্মাদ সিরাজুল ইসলামও এখানে সুবিধাজনক অবস্থায় রয়েছেন। অন্যদিকে গত ২০২২ সাল থেকে এখানে নিয়মিত সমাজসেবামূলক কার্যক্রম চালিয়ে আলোচনায় রয়েছেন আমার বাংলাদেশ পার্টি (ABI)র সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ। বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই আসনে বেগম সেলিমা রহমান ও আইনজীবী জয়নুল আবেদীন দুজনেই রয়েছেন আলোচনায়। এছাড়া দলের আরও একজন মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে ব্যারিস্টার মনিরুজ্জামান আসাদের নাম বলছেন এলাকাবাসী। তবে বেশিরভাগ সাধারণ মানুষের দাবী এ অঞ্চল এবার ধর্মভিত্তিক দলকেই গুরুত্ব দেবে। চরমোনাই ঘরানার কারণে ইসলামী আন্দোলন এখানে অতিরিক্ত সুবিধা পেতে পারে বলে মনে করেন অনেকেই।
বরিশাল-৪ (হিজলা–মেহেন্দিগঞ্জ)
নদীপাড়ের এই আসনটি দীর্ঘদিন ধরে ইসলামি দলের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। ইসলামী আন্দোলন এখানে বিশেষভাবে সক্রিয়। জামায়াতও মসজিদ–মাদ্রাসা নির্ভর প্রচারণা অব্যাহত রেখেছে। বিএনপির প্রার্থী গণসংযোগ শুরু করলেও দলের ভেতরকার সমন্বয় দুর্বল বলে মত অনেকের। এখানে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন রাজীব আহসান। সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপির উচ্চপর্যায়ের নেতা মেজবাহ উদ্দিন ফরহাদ এবং এ. এম. ব্যারিস্টার মাসুম এখানে মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন। তাদের অনৈক্য ও দ্বন্দ্বের সুযোগে এই আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী
মাওলানা আবদুল জব্বার এবং ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশ এর প্রার্থী মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ আবুল খায়ের এর অবস্থান ক্রমশ শক্তিশালী হয়ে উঠছে। নদী ভাঙন কবলিত মানুষের বেশিরভাগ জেলে সম্প্রদায়। আর তারা এখন ইসলামি প্রার্থীদের উপর নির্ভর করতে আগ্রহী।
বরিশাল-৫ (বরিশাল সদর)
শহরকেন্দ্রিক এই আসনে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা সবচেয়ে জটিল। বিএনপির শক্ত প্রার্থী থাকলেও, দলীয় বিভাজন ও নেতৃত্ব সংকট নিয়ে আলোচনা রয়েছে। এদিকে ইসলামী আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব সরাসরি যুক্ত হওয়ায় তাদের প্রচারণা দৃশ্যমান ও নিয়মিত। জামায়াতও ধারাবাহিক কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে। তবে এ আসনে জামায়াতে ইসলামীর সৎ ও বিনয়ী প্রার্থীর বিরুদ্ধে জমি দখল করে মসজিদ নির্মাণের অভিযোগ এই মুহূর্তে আলোচিত। যদিও তিনি বলেছেন, ওটি ভিন্ন সংগঠনের বিষয়। জামায়াতে ইসলামী এর সাথে জড়িত নয়। বাসদ এখানে বামধারার ছোট কিন্তু দৃশ্যমান উপস্থিতি নিয়ে লড়াই করছে। এই আসনে সাধারণ মানুষের চাওয়া উন্নয়ন, সুশাসন ও পরিবর্তন।এখানে বিএনপির প্রার্থী চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সাবেক মেয়র ও সংসদ সদস্য আইনজীবী মজিবর রহমান সরোয়ার। জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মোয়াযযম হোসেন হেলাল এবং ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশ এর প্রার্থী সৈয়দ ফয়জুল করিম। এনসিপি থেকে আবু সাঈদ মূসা এবং বাসদ নেত্রী ডাঃ মনীষা চক্রবর্তী রয়েছেন প্রচারণা মাঠে।
বরিশাল-৬ (বাকেরগঞ্জ)
১৪টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এ আসনে বিএনপি ও জামায়াত–ইসলামী আন্দোলন ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করেন অনেকেই। এখানে বিএনপির প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য আবুল হোসেন এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত হওয়ায় ঐতিহ্যগত ভোট তাদের শক্তি। তবে ইসলামী আন্দোলন ও জামায়াত গ্রামীণ এলাকায় ঘরোয়া নেটওয়ার্ক কাজে লাগিয়ে সূক্ষ্ম প্রচারণা চালাচ্ছে। ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশ এর সিনিয়র নায়েবে আমীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম এখানেও প্রার্থী হয়েছেন। পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মাওলানা মাহমুদুন্নবী চালাচ্ছেন প্রচারণা। দাড়িয়াল, দুধল, চরাদি ইত্যাদি গ্রামীণ এলাকায় ইসলামি দলগুলোর প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে।
সামগ্রিক চিত্র
ধর্মভিত্তিক দলগুলোর উত্থান
জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বরিশালের সব আসনেই আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি সুসংগঠিত ও নিয়মিত প্রচারণা চালাচ্ছে। মাঠপর্যায়ের নীরব কাজ, মসজিদকেন্দ্রিক যোগাযোগ, যুবসমাজের সঙ্গে ধারাবাহিক সংযোগ—এসবের কারণে তাদের জনসমর্থন বৃদ্ধি পেয়েছে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
তবে এসবের পরেও বরিশালে বিএনপির তৃণমূল ভোট এখনো শক্তিশালী। মনোনয়ন বিতর্ক, অভ্যন্তরীণ বিভাজন এবং প্রচারণায় অসামঞ্জস্যতা দূর করা তাদের বড় চ্যালেঞ্জ। একক নেতৃত্বের অভাব নির্বাচনী গতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
শুধু বরিশালেই নয়, সারা বাংলাদেশেই এখন ভোটারদের মধ্যে পরিবর্তন–আকাঙ্ক্ষা এবং নতুন নেতৃত্বের প্রতি আগ্রহ ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। পাশাপাশি ধর্মীয় প্রভাব ও ইসলামি মূল্যবোধকে বিবেচনায় নেওয়া ভোটারদের সংখ্যাও বাড়ছে বরিশাল অঞ্চলে। এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তরুণ ভোটাররা। আর বেশিরভাগ তরুণদের মধ্যে প্রশ্ন—“কারা বাস্তবে দেশের জন্য কাজ করবে?” এই তরুণ প্রজন্মের ভোটই নির্ধারণ করবে আগামীর সংসদ সদস্য।
উপসংহার
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশালের ছয়টি আসনই কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিএনপি, জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলন–এই তিন পক্ষের সক্রিয়তা পুরো রাজনৈতিক সমীকরণকে পাল্টে দিয়েছে। ভোটারদের মনোভাব এখনো পুরোপুরি স্থির না হলেও প্রচারণার তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক উত্তাপ আরও চরমে উঠবে বলে মনে করছেন স্থানীয় পর্যবেক্ষকরা।
Sharing is caring!







