শেবাচিমে একজন মাত্র আবাসিক সার্জন : তাকেও বদলীর আদেশ স্বাস্থ্য দপ্তরের
বিশেষ প্রতিবেদক
সাধারণ রোগী ও স্বজনসহ বরিশালের রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গও চাচ্ছেন আবাসিক সার্জন ডাঃ উর্মীর বদলী আদেশ বাতিল করা হোক। সয়ং শেবাচিম পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মশিউল মুনীরও বদলী আদেশ বাতিল চেয়ে আবেদন করেছেন। তারপরও সাড়া নেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের। এতে ক্রমশ ক্ষুব্ধ হচ্ছেন বরিশালের সাধারণ মানুষ ও ছাত্র জনতা। তারাও এজন্য পুনরায় স্বাস্থ্য খাতের সংস্কারের দাবীতে আন্দোলনের হুশিয়ারী দিয়েছেন।
বরিশাল শের ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল শেবাচিম এ যোগদানের পরপরই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সংকট দূর করতে বেশকিছু পদক্ষেপ নেন পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মশিউল মুনীর। তারমধ্যে অন্যতম ছিলো আবাসিক সার্জন ও পলিয়েটিভ কেয়ার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডাঃ সাবেকুন নাহার উর্মী। এছাড়াও হৃদরোগ, ক্যান্সার ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সংকট দূর করতে স্বাস্থ্য বিভাগ ও মন্ত্রণালয়ে চাহিদাপত্র দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। এদিকে জরুরী প্রয়োজন মেটাতে গোপালগঞ্জ থেকে পলিয়েটিভ কেয়ার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডাঃ উর্মীকে শেবাচিমে বদলী করা হয় গত জুলাইতে। স্বাস্থ্য খাতের আন্দোলনের সময় তিনি বরিশালে দায়িত্ব পালন করছিলেন এবং ইতিমধ্যে রোগী ও স্বজনদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। এরই মাঝে ২২ সেপ্টেম্বর সোমবার সকালে চিকিৎসা সেবা নিতে এসে রোগীরা জানতে পারেন আবারও বদলী করা হয়েছে এই চিকিৎসককে। রোগীদের তিনি সে অনুযায়ী ব্যবস্থাপত্র দিচ্ছেন এবং বলে দিচ্ছেন আগামী মাস থেকে হয়তো আমি থাকবোনা, যদি এই বিভাগে চিকিৎসক না পান তাহলে ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ বা সিনিয়র কোনো চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন।
আসতে না আসতেই পলিয়েটিভ কেয়ার বিভাগের এই চিকিৎসকের চলে যাওয়ার সংবাদে রোগী ও স্বজনদের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। কেননা দীর্ঘদিন শারীরিক ও মানসিক কষ্ট ভোগ করা রোগীদের আশ্রয় হয়ে উঠেছেন ডাঃ উর্মী। তিনি একাধারে ক্যান্সার, নিউরো ও Palliative Care Medicine specialist সহজ ভাষায় বলতে গেলে, তিনি এমন একজন চিকিৎসক, যিনি গুরুতর অসুস্থতার কারণে কষ্ট পাওয়া রোগীদের এবং তাদের প্রিয়জনদের জীবনের মান উন্নত করার জন্য বিশেষায়িত চিকিৎসা ও সহায়তা প্রদান করেন। এমন একজন চিকিৎসক পেয়ে শেবাচিম যখন এ জাতীয় জটিল রোগীদের আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছে ঠিক তখনই তার বদলী গুঞ্জনে ক্ষুব্ধ রোগী ও স্বজনরা।
একাধিক রোগী ও স্বজনরা এ বিষয়ে স্বাস্থ্য খাতের আন্দোলনের শিক্ষার্থীদের হস্তক্ষেপ কামনা করছেন। বাকেরগঞ্জের মকিমাবাদ বাজারের বাসিন্দা নারী রোগী জানালেন, ক্যান্সার আক্রান্ত হয়ে কেমোথেরাপি নেওয়ার পর থেকে হাত-পায়ের জ্বালা যন্ত্রণা নিয়ে দীর্ঘদিন ভুগছিলেন তিনি। শেবাচিম এ মেডিসিন বিভাগের চিকিৎসা নিয়েও কিছু হচ্ছিল না। গত মাসের শেষদিকে আবাসিক সার্জন আপা আমাকে দেখে যে ব্যবস্থাপত্র দিয়েছেন তাতে অনেকটা উপকার হয়েছে । পনেরদিন পর আজ আপডেট জানাতে এসে শুনছি তিনি নাকি চলে যাবেন। এটাতো আমাদের জন্য ক্ষতি। কারণ এখানে এরপর আমাদের কে দেখবেন?
একইসময় কয়েকজন রোগী ও স্বজন স্বাস্থ্য খাতের আন্দোলনের শিক্ষার্থীদের বিষয়টি জানাতে হবে বলে দাবী করেন। তারা বলেন, এতোদিন আবাসিক সার্জন বলে কিছুই ছিলোনা এখানে। বয়স্ক ও জটিল রোগের চিকিৎসা বঞ্চিত ছিলেন অনেকে নারী। মফস্বলে বড় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আসতেও চায় না। সেখানে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এসেছেন তিনি। তাকে বদলী আটকাতে স্বাস্থ্য খাতের আন্দোলনের শিক্ষার্থীদের পদক্ষেপ নিতে হবে বলে জানান তারা।
নরসিংদির মেয়ে আবাসিক সার্জন ও পলিয়েটিভ কেয়ার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সাবেকুন নাহার উর্মী দীর্ঘদিন গোপালগঞ্জ হাসপাতালে কর্মরত ছিলেন। গত জুলাই এর শেষদিকে ৩০ জুলাই তাকে শেবাচিম এ বদলী করা হয় এবং আগস্ট থেকে তিনি নিয়মিত শেবাচিম এ চিকিৎসা দিতে শুরু করেন। তিনি বলেন, মেডিসিন বিভাগের নতুন ভবনের এই ১১২ নম্বর কক্ষের মহিলা রোগীদের ভিড় দেখুন। তাদের জন্য সঠিক চিকিৎসা সেবা দেওয়া আমার নৈতিক দায়িত্ব। সরকারি চাকুরী করি। স্বাস্থ্যসেবা দিতে সরকারের নির্দেশনা মেনে যেকোনো হাসপাতালে যেতে আমি বাধ্য। বরিশালে এসে এখানকার অবস্থা দেখে মনে হয়েছে এখানে আমাকে প্রয়োজন। আমিও চাই বরিশালের মানুষের পাশে সেবা নিয়ে আরো কিছুদিন কাটাতে। বাকীটা বলবেন সংশ্লিষ্ট প্রশাসন।
এ বিষয়ে অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ২০ সেপ্টেম্বর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) ডাক্তার এবিএম আবু হানিফ স্বাক্ষরিত পত্রে শেবাচিম এর আবাসিক সার্জন ডাঃ সাবিকুন নাহার উর্মীকে প্রমোশন দিয়ে পুনরায় গোপালগঞ্জের ২০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে বদলী করা হয়েছে। আসতে না আসতেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের এই বদলীর পিছনে গভীর ষড়যন্ত্র রয়েছে বলে মনে করছেন অনেকেই। এখানে রাজনীতি চলছে বলে দাবী করেন হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের বেশ কয়েকজন চিকিৎসক ও নার্স। তারা বলেন, গোপালগঞ্জ থেকে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এসেছেন। একদল অসাধু রাজনৈতিক নেতা সেটাকে পুঁজি করে তাকে সরিয়ে নিজেদের দলীয় অদক্ষ লোক নিয়োগের পায়তারা করছে। আমরা শুনেছি এ নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে দৌড়ঝাঁপ করছে তারা। এজন্য বড় অংকের টাকাও লেনদেন হয়েছে বলে জানা গেছে।
বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন স্বাস্থ্য খাতের আন্দোলনের সমন্বয়ক সাব্বির হোসেন সোহাগ। তিনি বলেন, স্বাস্থ্য খাতের আন্দোলনের পর থেকে শেবাচিম এ পরিবর্তন হতে শুরু করেছে। আমরা শুনেছি পলিয়েটিভ কেয়ার স্পেশিয়ালিস্ট ডাঃ উর্মী অত্যন্ত ভালো, পরিশ্রমী ও রোগীদের প্রতি দায়িত্ব সচেতন একজন চিকিৎসক। তিনি গোপালগঞ্জে বা টুঙ্গিপাড়া যেখান থেকেই আসুক না কেন তার চিকিৎসা সেবা আমরা চাই। এটা আমাদের প্রয়োজন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রতি অনুরোধ থাকবে জুলাই বিপ্লবের চেতনা নিয়ে কাজ করুন। ভালো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক শের ই বাংলা মেডিকেল কলেজ এর জন্য জরুরী প্রয়োজন। দূর্নীতি ও অনিয়মকে প্রশ্রয় দিয়ে তাদের বদলী করবেন না। স্বাস্থ্য খাতে আবারও অনিয়ম মাথাচাড়া দিলে আমরাও কিন্তু আবারও আন্দোলনে যেতে বাধ্য হবো বলে হুশিয়ারী জানান সাব্বির হোসেন সোহাগ।
এদিকে সয়ং শেবাচিম পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মশিউল মুনীর বলছেন, পলিয়েটিভ কেয়ার এর একমাত্র বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তিনি। তাকে শেবাচিম এ প্রয়োজন জানিয়ে মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে আবেদন করা হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত আমার আবেদন উপেক্ষিত হচ্ছে বলে জানতে পেরেছি। বিষয়টি কেন বা কি জন্যে তা আমি জানিনা। তবে আমি এখনো বলবো শেবাচিম এ তাকে প্রয়োজন।








