<?xml version="1.0" encoding="UTF-8"?><rss version="2.0"
	xmlns:content="http://purl.org/rss/1.0/modules/content/"
	xmlns:wfw="http://wellformedweb.org/CommentAPI/"
	xmlns:dc="http://purl.org/dc/elements/1.1/"
	xmlns:atom="http://www.w3.org/2005/Atom"
	xmlns:sy="http://purl.org/rss/1.0/modules/syndication/"
	xmlns:slash="http://purl.org/rss/1.0/modules/slash/"
	>

<channel>
	<title>গল্প &#8211; সাহিত্য বাজার</title>
	<atom:link href="https://shahittabazar.com/category/%e0%a6%b8%e0%a6%be%e0%a6%b9%e0%a6%bf%e0%a6%a4%e0%a7%8d%e0%a6%af/%e0%a6%97%e0%a6%b2%e0%a7%8d%e0%a6%aa/feed/" rel="self" type="application/rss+xml" />
	<link>https://shahittabazar.com</link>
	<description>সাহিত্যের আয়নায় মানুষের মুখ</description>
	<lastBuildDate>Mon, 27 Sep 2021 05:41:45 +0000</lastBuildDate>
	<language>bn-BD</language>
	<sy:updatePeriod>
	hourly	</sy:updatePeriod>
	<sy:updateFrequency>
	1	</sy:updateFrequency>
	<generator>https://wordpress.org/?v=6.9.4</generator>
	<item>
		<title>জল প্রেমিকের গল্প</title>
		<link>https://shahittabazar.com/%e0%a6%9c%e0%a6%b2-%e0%a6%aa%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a7%87%e0%a6%ae%e0%a6%bf%e0%a6%95%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%97%e0%a6%b2%e0%a7%8d%e0%a6%aa/</link>
					<comments>https://shahittabazar.com/%e0%a6%9c%e0%a6%b2-%e0%a6%aa%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a7%87%e0%a6%ae%e0%a6%bf%e0%a6%95%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%97%e0%a6%b2%e0%a7%8d%e0%a6%aa/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[আরিফ আহমেদ]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 02 Oct 2015 11:15:47 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[গল্প]]></category>
		<category><![CDATA[সাহিত্য]]></category>
		<guid isPermaLink="false">http://shahittabazar.com/?p=3010</guid>

					<description><![CDATA[<p>হঠাৎ তুফান এলো নদীতে। প্রচন্ড ঢেউয়ের আঘাতে দুলে উঠলো বিশাল বড় জলযানটি। ঢেউতো নয় যেন বিশালাকার পাহাড় আছড়ে পরছে নদীর জলে। আচমকা নদীর এই ক্ষেঁপে উঠার কারণ ভাবার সময় কারো</p><span><div class="readmore"><a href="https://shahittabazar.com/%e0%a6%9c%e0%a6%b2-%e0%a6%aa%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a7%87%e0%a6%ae%e0%a6%bf%e0%a6%95%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%97%e0%a6%b2%e0%a7%8d%e0%a6%aa/">...বিস্তারিত &#8594;</a></div>]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p><a href="http://shahittabazar.com/wp-content/uploads/2015/10/images-02.jpg"><img loading="lazy" decoding="async" class="alignleft size-medium wp-image-3020" src="http://shahittabazar.com/wp-content/uploads/2015/10/images-02-225x300.jpg" alt="images-02" width="225" height="300" srcset="https://shahittabazar.com/wp-content/uploads/2015/10/images-02-225x300.jpg 225w, https://shahittabazar.com/wp-content/uploads/2015/10/images-02.jpg 300w" sizes="auto, (max-width: 225px) 100vw, 225px" /></a>হঠাৎ তুফান এলো নদীতে। প্রচন্ড ঢেউয়ের আঘাতে দুলে উঠলো বিশাল বড় জলযানটি। ঢেউতো নয় যেন বিশালাকার পাহাড় আছড়ে পরছে নদীর জলে। আচমকা নদীর এই ক্ষেঁপে উঠার কারণ ভাবার সময় কারো নেই। প্রায় পাঁচশত যাত্রী বোঝাই এম ভি পর্বত নামের জলযানের ভিতর ভয়ার্ত আর্তনাদ আর মানুষের ছুটোছুটি ঠেকাতে ব্যস্ত লঞ্চের কর্মীরা। দীর্ঘ বছরের অভিজ্ঞ চালক নজীর আলী তার বয়সে কখনো এমন তুফান দেখেননি। পদ্মা-মেঘনার লড়াইয়ে পরেছেন বহুবার, সে অভিজ্ঞতাকেই কাজে লাগাবার চেষ্টা করছেন তিনি। লঞ্চের গতি সমান রাখছেন ঢেউয়ের তালে তাল মিলিয়ে, বারবার ঘুরাচ্ছেন তার স্টিয়ারিং হুইল। নীচের মানুষের ভয়ার্ত চিৎকার আর নিয়ন্ত্রকদের চেঁচামেচি তার কানে আসছে। এই উত্তাল পানিবাহী বাতাসের ঝাঁপটাতেও রিতিমত ঘেমে উঠেছেন নজীর আলী। চেষ্টা করছেন লঞ্চটিকে কাছাকাছি কোনো পাড়ে নিতে। কিন্তু ঢেউয়ের দাপটে কোথাও পাড় খুঁজে পাচ্ছেন না। বহুদিনের অভিজ্ঞতায় যে পথে তিনি চোখ বুঝে লঞ্চটি চালাতেন, সে পথ আজ হঠাৎ যেন তার অচেনা।<br />
নদী পথে ঢাকা থেকে ভোলা যেতে পদ্মা পাড়ি দেয়ার পর কালাভোদর ও আগুনমুখা নদী দুটি একটু ভিতিকর। কিন্তু এই ছোট তেতুলিয়া নদীতে হঠাৎ তুফানের কবলে পরবেন তা স্বপ্নেও ভাবেননি নজীর আলী। মনের ভিতর প্রচন্ড আতংক পাশের সহকারী হাসমতকে বুঝতে না দিয়ে একের পর এক নির্দেশনা দিচ্ছেন। হাসমত নির্দেশনা অনুযায়ী একটা শিকলে কখনো একসাথে দু’বার, কখনো পরপর তিনবার, আবার কখনো চারবার টান দিচ্ছেন। নীচে ইঞ্জিনকক্ষে একটি ঘণ্টি বেঁজে উঠছে এরফলে, এ নির্দেশনা ধরে জাহাজের গতি কমছে, বাড়ছে, স্থির হচ্ছে। ঢেউয়ের ধাক্কায় একবার কাত হচ্ছে লঞ্চ, একবার সোজা হচ্ছে আবার উঠে যাচ্ছে অনেক উপড়ে, ধপাস শব্দে আছড়ে পরছে জলে।<br />
তিনতলা এই লঞ্চের তৃতীয় তলা পুরোটা ও দ্বিতীয় তলার অর্ধেক কেবিনে পূর্ণ। নীচতলা ও দ্বিতীয় তলার বাকী অর্ধেকে যাত্রীরা বিছানা পেতে যাতায়াত করেন। কেবিনে যারা আছেন, তারা প্রথম দুলনীতে বেশ মজা পেয়ে আরো আয়েস করে ঘুমাবার আয়োজন করছিলেন, এমন সময়  লঞ্চটি এতোটাই কাত হল যে, অনেকেই বিছানা থেকে পরে গেলেন, কারো কারো মালপত্র পরে গেল। ভয়ে আতংকে মূহুর্তে টনক লড়লো তাদের। বাইরে উঁকি দিয়ে তাজ্জব বনে গেলেন সবাই। একইসঙ্গে নীচে নামার ও ছাদে যাওয়ার জন্য হুড়োহুড়ি শুরু করলেন তারা। উচ্চশিক্ষিত ও ধনীরাই বেশিরভাগ কেবিনের যাত্রী হন। তাদের বাঁধা দেওয়া কেবিন বয়দের সাধ্য নয়, তাদের হুড়োহুড়িতে  লঞ্চটি আরো বেশি বিপদে পরার আশংকা তৈরি হল।<br />
এদিকে ডেকের যাত্রীদের কাছে মোটা দড়ি ছুড়ে দিলে, তারা নিজেরাই লঞ্চের রেলিং এর সাথে আড়াআড়ি দড়ি বেঁধে তা ধরে নিজেদের নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছেন সবাই। আল্লাহ বাঁচান, খোদা বাঁচান, লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নিকুনতু মিনাজ জোয়ালেমীন- এ রকম যে- যা দোয়া জানেন, যাত্রীরা তা পড়ছেন চিৎকার করে। কেউ কেউ মানত করতে শুরু করেছেন বিভিন্ন পীর আউলিয়ার নাম ধরে। হিন্দু ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের যাত্রীরা কেউ কেউ তাদের ভগবানকে ডাকছেন, কেউ নিরবে ধ্যানে বসেছেন, তারা ছুটোছুটি করছেন না, যেটা মুসলমান সম্প্রদায়ের লোকেরা করছেন।  প্রচন্ড ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে নীচের ডেকে, পানি গড়িয়ে যাচ্ছে এ মাথা থেকে ও মাথায়। চারজন শ্রমিক পালা করে জাহাজের চাপকল চাঁপতে ব্যস্ত। যে করে হোক ভিতরে পানি জমতে দেবেনা তারা। হঠাৎই ঢেউটা এলো, জাহাজের সামনের দিক থেকে পাহাড়ের সমান উচ্চতা নিয়ে ঢেউটা এলো। চুকানী নজীর আলী ঢেউটিকে আসতে দেখে আতঙ্কে দোয়া পড়তে শুরু করলেন, তার ইচ্ছে হচ্ছে লাইফবয়া নিয়ে এখনি ঝাঁপ দিয়ে নদীতে পরেন, কিন্তু এতোগুলো মানুষকে রেখে তিনি এটা করতে পারেন না। দ্রুত মাউথপিস হাতে নিয়ে লঞ্চের সব যাত্রীকে সাবধান করলেন, সবাইকে লাইফবয়া আঁকড়ে ধরার পরামর্শ দিলেন। এমনসময় তার চোখ আটকে গেল নীচে ডেকের সম্মুখভাগে। জাহাজের সম্মুখপ্রান্তে সূচালো ডগার উপর উঠে দাঁড়িয়েছে এক যুবক। একহাতে আঁকড়ে ধরেছে জাহাজের নিশান লাগানো রডটি, অন্যহাতে কাউকে ইশারা করার ভঙ্গিতে ঢেউটিকেই যেন সে টা টা দিচ্ছে। চিৎকার করে যুবকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইলো নজীর আলী। কিন্তু বাতাস আর ঝড়ের দাপটে তার কণ্ঠ নিজের কাছেই অস্পষ্ট মনে হল। হাসমতকে বলল, এই পাগলটা কে? সরাও ওকে, ও তো মারা পরবে।<br />
অনেকক্ষণ যাবৎ এরফান মোহাম্মদ নামের এই যুবক ঢেউয়ের সাথে লঞ্চটির যুদ্ধ আর মানুষের আর্তনাদ দেখছিল। প্রথমদিকে কেবিনের বারান্দায় দাঁড়িয়ে উপভোগ করছিল তেতুলিয়া নদীর মাতাল হওয়ার দৃশ্য। শান্ত ছোট্ট এ নদীটি হঠাৎ কেন এতো ক্ষেঁপেছে তা বোঝার চেষ্টা করছে রেলিংএ ভর দিয়ে। ঢেউয়ের উচ্চতা ও বাতাসের দাপটে পানি এসে ওর চোখে মুখে ঝাঁপটা দিচ্ছে। মানুষের ছুটোছুটি আর ঢেউয়ের প্রবল আক্রমণ দেখে সে নিজেও মনে মনে বেশ আতঙ্কিত হল। ঘুরে দাঁড়িয়ে হুঙ্কার ছাড়লো &#8211; থামুন আপনারা। মুর্খদের মতো ছুটলে কি বিপদ কমবে?<br />
তার কণ্ঠে এমন কিছু ছিল যে সবাই থমকে গেলেন।<br />
এরফান বলছে &#8211; এভাবে ছুটলে যে লঞ্চটি কাত হয়ে পরবে। আপনারা সমান ভাগে ভাগ হয়ে লঞ্চের দুপাশে শক্ত কিছু আঁকড়ে ধরে চুপচাপ বসুন বা দাঁড়িয়ে থাকুন।<br />
কেবিনের প্রায় শ’দুয়েক যাত্রী মূহুর্তে তার কথা শুনলো। কেবিনের লোকদের শান্ত করে তাদের দু’ভাগে ভাগ করে নির্দিষ্ট স্থানে বসিয়ে দিল সে। তারপর দ্রুত ছুটে গেল নীচের মানুষগুলোকে শান্ত করতে। দড়ি দিয়ে জাহাজের দু’পাশে বেষ্টনী তৈরির বুদ্ধিটা দিয়ে, সে ছুটল সম্মুখ ডেকের দিকে। দরজা লাগানো, অনেক কষ্টে, ক্রুদের ধমকে দরজা খুলতে বাধ্য করল, তারপর বড় পাহাড়সম ঢেউটিকে আসতে দেখে দ্রুত উঠে দাঁড়ালো লঞ্চের সূচালো মাথার উপর। ওর বিশ্বাস ঢেউ ওর শরীরে আঘাত করবে না। তার আগেই ভেঙ্গে মিলিয়ে যাবে। আর যদি আঘাত করে, তাহলে সব যাত্রীর আগে ওর জীবনই যেন যায়।<br />
এটাকে দ্বৈব ঘটনা বলবো, নাকি প্রচন্ড বিশ্বাসের পরিণতি বলবো? নাকি এখানে অন্য কিছু লুকানো আছে, যা আমাদের জানা নেই। নজীর আলী আর হাসমত আতংকে চোখ বন্ধ করে ফেলেছিল, ওরা দেখলো প্রচন্ড ঢেউটি এসে সাপের ফণার ছোবলের মতোই আছড়ে পরছে জাহাজের উপর, আর এটা পরামাত্র এ জাহাজের সব শেষ হয়ে যাবে নিমিশেই। ডুবে যাওয়ার হাত থেকে এ জাহাজটিকে বুঝি আর বাঁচানো গেল না। এতগুলো যাত্রীর নিশ্চিত মৃত্যু বুঝি আর ঠেকানোর উপায় নেই।<br />
কিন্তু একী, ঐ যুবকের সামনে এসেই যেন নতজানু হয়ে গেল ঢেউটি। যেন এ আয়োজন সবটাই ঐ যুবককে একটু গোসল করাবার জন্য। যুবকের মাথার উপর এমনভাবে ঢেউটা ভেঙ্গে পরল যে হালকা ঝাঁপটা এসে গোসল করাল তাকে।<br />
পরমূহুর্তে একেবারে শান্ত হয়ে গেল নদী। যেন কখনোই কিছু ঘটেনি এ নদীতে।<br />
কাকতালীয় এ ঘটনাটি দেখলো শুধু নজীর আলী আর হাসমত। ব্যস্ত হাতে নজীর আলী লঞ্চটিকে একটি ঘাটে নোঙর দিতে দিতে হাসমতকে বলল, ঐ যুবকের কাছে যাও, সে কোথায়, কোন কেবিনে দেখ, আমি তার কাছে যাব।<br />
হাসমত ছুটে নীচে যেতে যেতে অদৃশ্য হয়েছে যুবক। তাকে আর কোথাও খুঁজে পাওয়া গেল না। পাবে কি করে। হাসমত আর নজীর আলী যে যুবককে দেখেছে, সে তখন ভেজা কাপড় পাল্টে নিয়ে কেবিনের একটি কক্ষে নাক ডাকিয়ে ঘুমে ব্যস্ত। তার পাশে একটি গীটার কোলবালিশের ভূমিকা পালন করছে।</p>
<p>দুই<br />
<a href="http://shahittabazar.com/wp-content/uploads/2015/10/images-03.jpg"><img loading="lazy" decoding="async" class="alignright size-medium wp-image-3021" src="http://shahittabazar.com/wp-content/uploads/2015/10/images-03-300x198.jpg" alt="images-03" width="300" height="198" /></a>ভোলা বন্দরে লঞ্চটি ভিড়েছে বেলা ১১ টায়। জাহাজের সব যাত্রীর চোখে মুখে কান্তি। তারা সবাই ঐ যুবককে খুঁজছে, যে রাতে তাদের নিরাপত্তা দেয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু যুবকটিকে কোথাও আর দেখা গেল না। যাবে কি করে জলযানটি জেটিতে ভিড়তে না ভিড়তেই লঞ্চের পিছনভাগ দিয়ে ভাড়াটে ইঞ্জিন নৌকায় চেঁপে হাওয়া হয়েছে যুবক। ওর গন্তব্য যে শহর থেকে আরো অনেক অনেক দূরে, চরদুয়ারের বাথান পাড়ায়। তাই রহস্যময় যুবকের এই নিখোঁজ হওয়ার গল্পে তখন নানান রকম কল্পকাহিনী যুক্ত হতে থাকলো। হাত দিয়ে ঢেউকে থামিয়ে দিয়েছে, এ মানুষ ছিলনা, কোনো ফেরেশতা এসে এটা করে গেছে, তাইতো আর খুঁজে পাইনি তাকে। আবার কেউ বলছে, আমার পীর তার হাত দিয়ে এটা থামিয়ে গেছে। পীরগুরু চরজামাই এসেছিলেন এই যুবকের বেশে। ইত্যাদি নানান রসময় মালাই যুক্ত হতে থাকলো ঐ ঘটনার সাথে।<br />
এদিকে আগুনমুখা নদীর জল চিড়ে ছুটে চলা ইঞ্জিন নাওয়ের মাথায় বসে গীটারে টুং টাং শব্দে গান ধরেছে তখন এরফান মোহাম্মদ। তার সুরেলা কণ্ঠে ধ্বণিত হলো &#8230;<br />
ও আমার দেশ ও আমার নদী<br />
ও আমার সুজলা সুফলা বাংলারে<br />
তোর কোলে মাথা রেখে<br />
আমি চিরসুখি&#8230; নিরবদি।।<br />
এই তো নদী চলছে ছুটে&#8230; দূর কোনো গাঁয়<br />
ঐ যে সবুজী কণ্যা সাঁজে &#8230; কাকে সে জানায় বিদায়।।<br />
তোর রুপের ঐ ¯িœগ্ধতায়<br />
আমি চিরসুখি&#8230;. নিরবদি।। ঐ<br />
যদি বাসো ভালো তারে&#8230;.<br />
সে যে বাসবে ভালো উজাড় করে<br />
ঐ আকাশ বাতাসের মিতালী যেমন<br />
ঢেউয়ের তালে&#8230; দূর পাড়া গায়ে।।<br />
হো হো হা হা<br />
নদীর এই ছুটে চলা পথ ধরে<br />
ভালোবাসা ফেরী করে<br />
আমি চিরসুখী&#8230; নিরবদি<br />
ও আমার দেশ ও আমার নদী। ঐ<br />
কেউ যদি খুব মনোযোগে লক্ষ্য রাখতো নদীর জলে, তাহলে সে দেখতে পেত, এরফানের গান শেষ হতেই ট্রলারের দুপাশের জলে মাছের লেজের ঝাপটার হাততালি। শুধু এরফান দেখলো দু’জোড়া করে চার জোড়া মাছের লেজ এরফানকে গার্ড অব অনার প্রদর্শন করছে। মৃদু হাসিতে ওদের প্রতি সম্মান জানালো এরফান। ব্যাগে হাত দিয়ে চারটে কমলা বের করে দুপাশের জলে ছুড়ে দিল খুবই নিরবে, মাঝি মাল্লা দু’জনের কেউই তা টের পেল না। প্রচন্ড রোদে ট্রলারের টিনের ছাদ তেতে আছে। সেই তাতানো ছাদের উপর দাঁড়িয়েই দুই রাকাত শুকরিয়া নামাজ পড়ল এরফান। এ সব কিছুই যে মহান ¯্রষ্টার অপরিসীম দয়া ও রহমত ওর প্রতি তা ওর চেয়ে ভালো আর কে জানে।<br />
আগুনমুখা নদী পার হয়ে আবারো মেঘনায় পরেছে ট্রলারটি। চরফ্যাশন শহরটিকে পাশ কাটিয়ে চর কটিয়া, তারপর চরমানিক পার হয়ে আরো দূরে চরদুয়ার বাথান পাড়ায় এরফান মোহাম্মদের গন্তব্য। চরদুয়ার মূলত মেঘনা নদী দিয়ে সাগরে প্রবেশের পথ। এই চরদুয়ার থেকে মাত্র ১৫/২০ মিনিটের পথ এগোলেই সাগরে পৌঁছবে যেকোনো নৌকা বা জাহাজ। এই অংশের মেঘনা নদী সরাসরি গিয়ে সাগরে মিশেছে। এখানে নদীর পানিও তাই খুব নোনা। চরদুয়ার এলাকায় তাই মিষ্টি পানির খুব অভাব। লোকবসতিও সবচেয়ে কম। এখানে যারা থাকেন তাদের মধ্যে কয়েকঘর অস্থায়ী জেলে পরিবার, সাগরে মাছ ধরাই যাদের একমাত্র পেশা, শুধু মাছ ধরার সময়টাতেই তারা এসে এখানে থাকেন। স্থায়ী বাসিন্দা বলে আসলে এখানে কেউ নেই। মহিষের তিনটি বাথান বা খামারের ৩০/৪০ জন শ্রমিক বা রাখাল এখানে স্থায়ীভাবে থাকেন বটে তবে তাদেও পরিবার পরিজন কেউ এখানে থাকেন না। সব মিলিয়ে একশত লোকও হবে না। ঝড় বন্যার আভাস পাওয়া মাত্র সবাই ছুটে যায় পাশের চরকটিয়া বা চরসোহাগ অথবা চরমানিকএলাকায়। ওখানে সরকারী আশ্রয় কেন্দ্র রযেছে। রয়েছে মিষ্টি পানির সুব্যবস্থা।<br />
চরদুয়ারে ইতিপূর্বে মাত্র একবার এসেছে এরফান। বাবার হাত ধরে এখানে এসেছিল মাত্র ৯ বছর বয়সে। বাবা ইউসুফ মোহাম্মদ উত্তরাধিকার সুত্রে এখানের একটি মহিষ বাথানের মালিক হয়েছেন। এখানের সবচেয়ে বড় বাথানটি বাবার। বাবা মারা যাওয়ার পর এ বাথানটি এখন এরফানের দায়িত্বে এসেছে। যদিও বাবা জীবীত থাকলে এরফানকে কখনোই এখানে আসতে দিতেন না। ঐ একবারের পর এরফান বহুবার এখানে আসার চেষ্টা করলেও বাবা ওকে আসতে দেয়নি। কিন্তু বাবাতো আর জানেন না, যে ভয়ে বাবা তাকে আসতে দিতেন না, সে ভয়কেই জয় করে তাদের চমৎকার বন্ধু হয়েছে এরফান। আর তা ঘটেছে ঐ ৯ বছর বয়সেই।<br />
এখনো সেই ঘটনাটি ভাসা ভাসা মনে আছে এরফানের।<br />
<a href="http://shahittabazar.com/wp-content/uploads/2015/10/12.jpg"><img loading="lazy" decoding="async" class="alignleft size-medium wp-image-3012" src="http://shahittabazar.com/wp-content/uploads/2015/10/12-300x250.jpg" alt="12" width="300" height="250" srcset="https://shahittabazar.com/wp-content/uploads/2015/10/12-300x250.jpg 300w, https://shahittabazar.com/wp-content/uploads/2015/10/12.jpg 341w" sizes="auto, (max-width: 300px) 100vw, 300px" /></a>চরদুয়ারের বাথানে বাবার পাশে শুয়েছিল ছোট্ট এরফান । হঠাৎ শুণ্যে ভেসে উঠলো ওর শরীর। তারপর নিমেশেই হাওয়ার বেগে কেউ ওকে নিয়ে ছুটেছে। ভয়ে, আতংকে বাবা বলে চিৎকার দেয় এরফান। কিন্তু সে চিৎকার হয়ত বাবা শুনেননি। বাতাসের গতি আর শীতল হাতের ছোঁয়ায় ভয়ে অজ্ঞান হয়ে যায় এরফান। যখন জ্ঞান ফিরে আসে ও দেখে, বালুচরে ওর সামনে অনেকরকম খাবার, ফুল আর সামনে বিশাল বড় নদী। শিশুবেলায়, হামাগুড়ি দেয়ার বয়সেই নদী আর পানির সাথে চমৎকার দোস্তি এরফানের। ও কাঁদলেই মা ওকে নিয়ে পুকুরের পানিতে পা ডুবিয়ে দোলাতেন। নদীর ঢেউ দেখাতেন। তাহলেই শান্ত হয়ে হাসতে শুরু করতো এরফান। একবার নাকি মামা বাড়ি যাবার পথে ঝড়ে পরেছিল নৌকা, সেকি ঢেউ নদীতে। মা আর মামারা তখন ভয়ে হাহাাকার করছিলেন আর তখনও নাকি এরফান হামাগুড়ি দিয়ে নদীর ঢেউকে ছুঁয়ে দেয়, ওর হাতের ছোঁয়া পেয়ে সাথে সাথে শান্ত হয়ে যায় নদী। এটা কেন , কিভাবে হল এ নিয়ে মা আর বাবা অনেক ভেবেও কোনো উত্তর পাননি। শুধু নানাভাই বলেছিলেন, এ নিয়ে খুব বেশি আলোচনা করো না। আমাদের এরফান হয়তো সেইসব ভাগ্যবান মুসলিমদের একজন, যাদের জন্য আল্লাহ নিজ হাতে পুরস্কার দেবেন এবং যারা নবীজীর কাছাকাছি থাকবেন। শুনেছি এসব দ্বৈব ঘটনা শুধু তাদের জীবনেই সম্ভব হবে।<br />
যাইহোক, এরফান আর নদীর মিতালী যেন শিশুবেলা থেকেই। তাই নদী দেখলেই খুশি হয়ে ওঠে ও। ওর সামনে বিশাল বঙ্গোপসাগরের একাংশ, ছোট্ট এরফান সাগরটাকেই এখন নদী ভাবছে, সেই নদীটিতে অনেক মাছের খেলা চলছে। খাবার আর নদীতে মাছের খেলা দেখে ভয় ভুলে যায় ছোট্ট এরফান। দু’জন অপূর্ব সুন্দর মা সেই মাছেদের সাথে সাঁতার কাটছিল। মা &#8211; বলতে এরফানদের পরিবার তখন সব মেয়েদের মা বলে চিনাতো। এমনকি বড়বোনকেও ১২ বছর বয়স পর্যন্ত এরফান ‘মা’ বলেই ডেকেছে।  ওদের পরিবার থেকে এভাবেই শিশুবেলা মহিলাদের চেনানো হয়। হাইস্কুল পাস করার পর ওরা মা, ফুফু ও বোনকে আলাদা করে চিনতে শেখে। যে কারণে মাছের সাথে খেলারত মহিলা দু’জনকেও এরফান ‘মা’ বলে ডাকে। আর এ ডাকেই চমকে ওঠে দুই মৎস মা। ওরা এরফানকে বুকে জড়িয়ে নিতে বালুয়ারীতে ওঠে এলে, এরফান ওদের শরীরের অর্ধেক মাছের মতোই দেখে নাকি খুব হেসেছিল। লেজে ভর দিয়ে হাঁটছে ওরা। এরফানকে বুকে জড়িয়ে সে-কী আদর। ছোট্ট এরফান তখনতো আর জানেনা যে এরা আসলে মাছও নয় এরা জ্বীন সম্প্রদায়ের অভিশপ্ত দুই পরী। আল্লাহর একজন নেক বান্দার সাথে মৎসকন্যা সেঁজে দুষ্টামী করার শাস্তিতে এরা সারা জীবনের জন্য মৎসকন্যা হয়ে গেছেন। এদিকে শয়তান একজন দরবেশের রুপ ধারণ করে এদের কাছে এসে বলেছে, কোনো নিষ্পাপ ৯ বছরের শিশুকে হত্যা করে তার তাজা রক্ত পান করলে এরা আবার পরী হতে পারবে ও ফিরে যেতে পারবে জ্বীন রাজ্যে। সেই থেকে এরা অপেক্ষা করছিল একজন ৯ বছরের শিশুর জন্য। কিন্তু এই চরদুয়ারে কোনো শিশু আসে না। যারা আসে তারা বয়স্ক লোক। এই প্রথম ওরা এরফানকে পেয়েছে, জেনেছে, এরফানের বয়স ৯ বছর হতে আর তিনদিন মাত্র বাকি। দীর্ঘ বছরের ওদের এই অপেক্ষায় ওরা এখানে সন্তান জন্ম দিয়েছে। আল্লাহর এ আরেক রহমত বা উদারতা বলতে হবে যে, কোনো পুরুষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই ওরা যে সন্তান জন্ম দিচ্ছে তারাও হচ্ছে মেয়ে সন্তান। এভাবেই বেড়েছে বংশ। ওদের বংশধররা এখন মৎসকুমারী নামে পরিচিত।<br />
শিশু এরফানের মুখের ‘মা’ শব্দটির উচ্চারণে দুই মায়ের মধ্যে একটি ছেলে সন্তানের জন্য প্রচন্ড আকুতী তৈরি হল। মা ডাকের প্রভাব এতোটাই যে এরফানকে হত্যা করে ওর রক্ত পান করার সিদ্ধান্ত সাথে সাথে বাতিল করে দিলেন দুই মা। না এই মায়েরা কিছুতেই ওকে মারতে পারবে না। দু’জনে যেই মাত্র এ সিদ্ধান্ত নিল, সাথে সাথে ওদের শরীরের মাছের খোলস ঝড়ে গেল এবং পরীদের পাখা ও পা জেগে উঠলো। দুই মা মুহুর্তে বুঝতে পারলেন যে, এই ছেলেটির জন্যই আজ, এই মাত্র তারা অভিশাপ মুক্ত হয়েছেন। খুশীতে উল্লসিত দুই মা আকাশের দিকে তাকিয়ে অদ্ভুত শব্দ করলেন। এরফান শুধু আল্লাহ শব্দটি বুঝতে পারলো। ও নিজেও তখন বলল &#8211; আল্লাহ।<br />
সঙ্গে সঙ্গে মায়েরা ওকে জড়িয়ে ধরল। আর তখনি অনেক অনেক মৎস নারী এসে ছোট্ট এরফানের চারপাশে জড়ো হলো। আলোয় আলোকিত হয়েগেল সমুদ্র এলাকা। অনেক অনেক সুন্দর যুবকেরা ছুটে এলো জড়িয়ে ধরলো দুই পরী মা কে। সেকী উল্লাস। ছোট্ট এরফান বোঝেনি যে ঐ আলোকিত যুবকরা আসলে জ্বীনদের একটি দল। যাদেও কেউ কেউ এরফানকে কোলে নিয়ে কপালে চুমু খেলেন। সবচেয়ে ছোট্ট মৎস মেয়েটি যার বয়স মাত্র তিনমাস, সে ওকে পিঠে নিয়ে সাগরে ছুটে বেড়ালো বেশ কিছুসময়। এভাবে পরী মা, মৎসকন্যা আর জ্বীনদের সাথে তিনদিন পার হলো। এরফান ৯ বছরে পা দিল। পরী মা দু’জন এরফানকে আবার রেখে এলেন সেই বাথানে। তিনদিন পর এরফানকে ফিরে পেয়ে বাবা যেন প্রাণ ফিরে পেলেন। এরফানের কপালে হাত রেখেই বাবা বুঝে গেলেন অনেক কিছু। মুহুর্তে দেরি না কওে সেইদিনই চরদুয়ার ত্যাগ করেন বাবা। এরপর বাবা বহুবার চরদুয়ারে এসেছেন, কিন্তু আর কখনো এরফানকে এখানে আসতে দেননি বাবা।<br />
সন্তান হারানোর ভয়ে ভীত বাবা তো জানেন না, যে ঐ ঘটনার পর থেকে পরী মা মাঝে মাঝেই এশার নামাজের পর এসে এরফানকে উড়িয়ে নিয়ে যেতো তার মেয়েদের কাছে, আবার ঘণ্টা দ’ুয়েকের ভিতরেই তাকে রেখে যেত বাড়ির ছাদে। মাঝে মাঝেই এরফান মৎসকন্যাদের পিঠে শওয়ার হয়ে ঘুরে বেড়াতো সাগরে। এতে করে মৎসকুমারী আর এরফানের মধ্যে তৈরি হয় চমৎকার বন্ধুত্ব। সাধারণত মাছদেরতো আর মানুষের মতো প্রবল অনুভুতি থাকেনা। কিন্তু ছোট্ট মৎসকুমারী জানবী ব্যতিক্রম ছিল। ওর অনুভুতি ছিল প্রবল। মিষ্টি পানিতে ওদের যাতায়াত নিষেধ হলেও জান্বী এরফানের জন্য ছুটে যেত মিষ্টি পানিতেও। এরফানকে দেখার জন্য ওর সঙ্গ পেতে জানবীর মতো ব্যকুল না হলেও ওর অন্য বোনেরাও ছুটে যায় যখন তখন। এরফান যখন সূরায় ইয়াছিন আবৃত্তি করে, ওরা তখন গভীর মনোযোগে শোনে। ঐ সময় বুঝতে না পারলেও এরফান এখন বোঝে যে, মৎসনারীরা পবিত্র কোরআনের প্রতিটি শব্দের অর্থ বুঝতে পারে, যা ও নিজে এখনো পারেনা। জানবী-ই প্রথম এরফানকে সূরা ইয়াছীনের ভাবার্থ ব্যাখ্যা করে শুনায়। এরপর থেকে এরফান যখন যে সূরাটি পড়েছে, তার অর্থটা আগে বুঝে নিয়েছে। খুব অবাক বিষয় হচ্ছে, এরফান শুধু জানবী আর পরী মা দু’জনের কথা বুঝতে পারে, অন্য মৎসকন্যাদের ভাষা সে বোঝে না।<br />
এরফানকে পিঠে নিয়ে ঘুরে বেড়াতে না পারলে জানবী স্বস্তি পেত না। মাঝে কিছু বছর এরফান বিদেশে পড়তে গেলে ঐ সময়টা খুব কষ্টে কেটেছে এরফানেরও। কারণ, ঐ সময়টায় সাগরে ঘুরে বেড়াতে পারেনি এরফান। গলা ছেড়ে গান করতে পারেনি। মৎসকন্যাদেরকে সুরা ইয়াছীন আর সূরা রাহমান শুনিয়ে হাততালি নিতে পারেনি। নিজের লেখা কবিতাগুলো জানবীকে শোনাতে পারেনি। এদিকে অনেকদিন পরী মা’দের কেউ আসেনা ওর কাছে। আসলে এটা ঘটেছে বাবার কারণে। পরী মা যে আসেন এটা বুঝি বাবা টের পেয়েছিলেন। আর তাইতো কি সব দোয়া পড়ে এরফানকে পড়াপানি খাইয়ে, মাথায় ফুঁক দিয়েছেন বিদেশে যাওয়ার আগ মুহুর্তে। সেই থেকে মা দু’জনের কেউই আর আসে না।<br />
বিদেশে বসেই বাবার মৃত্যুর আগাম সংবাদ জানতে পেরেছে এরফান মৎসকন্যা জান্বীর সুবাদে। লন্ডনের টেমস নদীতে এসে এ খবর পৌঁছে দিয়ে যায় জান্বী। জান্বীই হচ্ছে সে, যে প্রথম এরফানকে পিঠে চাপিয়ে সাগরে বেড়াতে নিয়ে গিয়েছিল। জান্বীই ওকে শিক্ষা দেয় কিভাবে নামাজ সহী করে পড়তে হয়। কীভাবে পবিত্র কোরআন পড়লে আল্লাহ সাথে সাথে সাড়া দেন। এরফান বলেছিল, তুমি এতো জানো কিভাবে? আর জানোই যখন তাহলে তুমি কেন অভিশাপ মুক্ত হচ্ছোনা?<br />
হেসে ওঠে জান্বী, দুর বোকা, আমিতো অভিশপ্ত নই। মা অভিশপ্ত ছিলেন। আমি জন্ম থেকেই মৎসকন্যা। আর আমাদের শিক্ষাগুরু সয়ং পানির বাদশা নিজে। যার আদেশে জ্বীনদের একটি দল আমাদের পবিত্র কোরআন শিক্ষা দেন। তুমি কি জানো পৃথিবীর যত পশুপাখি আর মাছ আছে, ওরা সবাই জন্ম থেকেই মুসলমান। এক আল্লাহর ইবাদত করে আসছে। শুধু জ্বীন আর মানুষেরা বিভিন্ন ধর্মে বিভক্ত হয়ে নিজেরা লড়াই করে।<br />
এরফান এ সব জানে না। সে মাথা নাড়ে। ওর মন খুব খারাপ হয়ে যায়, বলে: তাহলে তুমি মানুষ বা পরী হতে পারবে না?<br />
এবার খুব হেসে ওঠে জানবী : কেন, আমি মানুষ হলে তোমার কি লাভ হবে? তখন যে আমার এতো রুপ থাকবে না, আমি এতো সুন্দরও থাকবো না। হাজার বছর আয়ু থাকবে না। তাহলে মানুষ হয়ে কী করবো বলো। এখনতো আমি হাজার বছর আল্লাহর গুনকীর্তন করতে পারবো, তোমরা মানুষেরা যা পারো না।<br />
এবার এরফান বলল : তাহলে আমিও তোমার মতো মাছ হবো। হাজার বছর আল্লাহকে ডাকবো আর তার গুণকীর্তন করবো, আর তোমার সাথে থাকবো।<br />
কিশোর এরফানের এ কথা শুনে কিশোরী জান্বী খুব গম্ভীর হয়ে চলে যায় সেদিন। অনেকদিন আর দেখা হয়নি ওদের।<br />
বিদেশে প্রায় পাঁচবছর অবস্থান করেছে এরফান। ফাইনাল পরীক্ষার ঠিক আগ মূহুর্তে বাবার মৃত্যুর আগাম সংবাদ জানাতে এলো জান্বী। এখন এরফান পরিপূর্ণ যুবক। আগের চেয়েও অনেক বেশি সুদর্শন আর ধার্মিক। এই বিদেশের মাটিতে এসেও কখনো নামাজ কাঁযা করেনি, রোজা রাখায় অনিহা দেখায়নি। মৎসকুমারীদেরও কিছু অলৌকিক গুন থাকে, ওরা মানুষের মুখ দেখে তার ভিতরটা পড়তে পারে, আর যখন তখন অদৃশ্য হয়ে যেতে পারে। এরফানকে দেখেই জান্বী যেন ওর ভিতরটা সব পড়ে নেয়। গভীর শ্রদ্ধায় মাথা নত করে জানবী।<br />
পাঁচ বছর পর গভীর রাতে জান্বীকে দেখে এরফান খুব খুশী হয়ে ওকে জড়িয়ে ধরে, বলে : তুমি আগের চেয়ে আরো সুন্দর হয়েছো জান্বী।<br />
এই বিদেশে শুধু মাত্র কলম্বাস নামের এক যুবকই এতোদিনে ওর কিছুটা ঘনিষ্ট হয়েছে। খ্রিস্টান এই যুবকের পরদাদা কলম্বাস আমেরিকা আবিস্কার করে বিশ্বখ্যাত হয়েছেন। এই যুবকের বিশ্বাস তার পরদাদা করম্বাস পবিত্র বাইবেল ও কোরআন নিয়মিত পড়তেন এবং ঐ গ্রন্থে উল্লেখিত বৈজ্ঞানিক বিষয়গুলো পরীক্ষা করতেন। আর সে কারণেই তিনি আমেরিকা আবিস্কার করতে পেরেছেন।<br />
এরফান তখন জানতে চেয়েছিল, তোমার এ ধারণা কি করে হলো?<br />
কলম্বাস তখন হেসে বলল, আমাদের বাড়িতে একটি পুরাতন লাইব্রেরী রয়েছে, যেখানে আমার পরদাদার অনেক স্মৃতি আজো সাঁজানো আছে। তারমধ্যে অনেকগুলো ধর্মগ্রন্থ রয়েছে। হাতে লেখা কোরআনের কপিও আছে।<br />
যুবক কলম্বাসের এ কথা শুনে এরফান ওকে আসল বাইবেল, যেটা হিব্রু ভাষায় লেখা এবং ব্রিটিশ মিউজিয়ামে রয়েছে, সেটি পড়ার পরামর্শ দেয়। যুবক নিজেও হিব্রু ভাষা খুব ভালো জানে, আর তাই সে প্রতিজ্ঞা করে যে আগামি তিনমাসের মধ্যে আসল বাইবেলটি সংগ্রহ করে পড়ে ফেলবে ও এরফানকে তার ব্যাখ্যা শুনাবে। সেই থেকে যুবকের সাথে এরফানের একটা বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। যা গত চার বছরে অনেক ঘনিষ্ঠ হয়েছে, এবং মজার বিষয় হচ্ছে কলম্বাস এখন একজন নব মুসলিম। কারণ সে হিব্রু ভাষায় লেখা আসল বাইবেল পড়েছে ও সেটা মেনে চলতে যেয়ে তাকে মুসলমান হতে হয়েছে বলে কলম্বাসের দাবি। আর এটা যে ঘটবে, তা এরফানও জানতো।<br />
এরফান খুব দৃঢ় ভাবে বিশ্বাস করে যে, হিন্দুরা তাদের ধর্মগ্রন্থ বেদ এবং খ্রিস্টানরা তাদের বাইবেল যদি গভীর মনোযোগে অর্থ বুঝে পড়েন, তাহলে তারা নিজে থেকেই মুসলমান ধর্মে ফিরে আসবে। কারণ, তাহলেই তারা বুঝতে পারবেন যে, তারা আসলে সবাই মুসলমান হয়েই পৃথিবীতে এসেছিলেন।<br />
এই মুহুর্তে জানবীকে পেয়ে এরফান কলম্বাসের কথা একবারে ভুলে গিয়েছিল। কিন্তু জান্বী হঠাৎ বলল, তোমার বন্ধু কলম্বাস তোমাকে অনুসরণ করে এদিকে আসছে। এই লন্ডনের নদী এলাকা আমাদের জন্য নিরাপদ নয়। এরা আমাদের ধরার জন্য বিভিন্ন ফাঁদ পাতছে। শোনো এরফান তুমি মা’কে অভিশাপ মুক্ত করায় মায়েদের স্বামী দুই জ্বীন তোমার উপর ভীষণ খুশি। তারাও তোমাকে সাহায্য করতে একপায়ে দাঁড়িয়ে আছেন। কিন্তু কোনো কারণে তোমার কাছে তারা আসতে পারছেন না। জ্বীনেরা অনেক কিছু আগাম বলতে পারেন। তোমার বাবার মৃত্যু সংবাদ নিয়ে তারাই মায়েদের সাথে আলাপ করছিলেন, শুনে মা আমাকে বললেন তোমাকে জানাতে। ঐ জ্বীনদের একজন থেকে জানতে পারলাম, তোমরা মানুষেরা একবার সেজদা দিলে আল্লাহ যে খুশী হন, আমরা হাজার বছর সেজদা করলেও নাকি তিনি ততো খুশি হন না। আমার তাই তোমার মতো মানুষ হতে ইচ্ছে করে।<br />
কথাটি বলেই জান্বী অদৃশ্য হয়ে গেল। মিনিট দু’য়েক পরেই কলম্বাস এসে পাশে বসল &#8211; কী বন্ধু, তোমার কি মন খারাপ? এখানে একা কী করছো?<br />
<strong>তিন</strong><br />
<a href="http://shahittabazar.com/wp-content/uploads/2015/10/images-04.jpg"><img loading="lazy" decoding="async" class="alignright size-medium wp-image-3022" src="http://shahittabazar.com/wp-content/uploads/2015/10/images-04-300x225.jpg" alt="images-04" width="300" height="225" /></a>বিদেশের পাঠ চুকিয়ে এরফান দেশে ফিরে আসায় বাবা খুব রাগ করেছিলেন। এরফান বাবাকে বলতে পারেনি, ও কেন ফিরে এসেছে। বলেছে, তোমাদের জন্য মন খুব খারাপ হচ্ছিল বারবার, তাই চলে এলাম। বাবা হয়ত আসল বিষয়টা টের পেয়েছিলেন, তাই মৃদু হেসেছিলেন তিনি। এরফান ফিরে আসার তৃতীয়দিন মধ্যরাতে বাবা তাহাজ্জুতের নামাজ পড়ছিলেন। এমনসময় এরফানকে ডাকলেন। এরফান কাছে এলে বললেন &#8211; শোনো বাবা, আমি কিছুক্ষণের মধ্যে তোমাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছি। তুমি আমার একমাত্র ছেলে সন্তান। তোমার যদি কখনো নামাজ আর রোজা কাযা হয়, আমি খুব কষ্ট পাব। কখনো মিথ্যে বলবে না, তুমি মিথ্যে বলা মাত্র তোমার উপর থেকে আল্লাহর দয়া ও রহমত সরে যাবে। পরিবারের সকলের দায়িত্ব এখন তোমার। চরদুয়ারের বাথানটি আমাদের প্রধান আয়ের উৎস, ওটির যত্ন কর। আর সাগরের সাথে বন্ধুত্ব করবে খুব সতর্কের সাথে। শয়তানও ওখানেই বাস করে। এর কিছু পরই সেজদারত অবস্থায় বাবা চলে যান তার দেহ ছেড়ে।<br />
মা, বোন, চাচা-চাচীদের এরফানই ডেকে আনেন। তিনটি মাস পার হয়েছে শোকার্ত পরিবারের সাথে। শোক কাটিয়ে এরফান প্রথমেই চরদুয়ারের বাথানে চলেছে। ছোটবেলা থেকেই নামাজী এরফান প্রচন্ড ধর্মভীরু। মিথ্যে বলা বা মিথ্যের সাথে চলা ওর কখনোই হয়নি। বাবা ওকে এভাবেই তৈরি করেছেন। যে কারণে বন্ধু মহলেও ওর উপাধী সত্যবাণ বলে। যদিও বন্ধু সংখ্যা খুবই কম এরফানের। কারণ পরিচিতজনের মধ্যে মিথ্যেবাদীর সংখ্যা বেশি হওয়ায়, স্কুল-কলেজে ওর বন্ধু কাউকে খুঁজে পায়নি ও । দু’জন মাত্র যুবককে কিছুটা পছন্দ করে এরফান, কারণ ওরা মিথ্যেটা বললেও খুব কম বলে। আর তাই হিন্দু ধর্মের অনুসারী ও মন্দিরের পুরোহীতের ছেলে সমীর ব্রাহ্মণ আর বৌদ্ধ ধর্মের প্রসাদ বড়–য়াকে ও বন্ধু মনে করে। এরা দু’জনেই মুলত পাড়ার বন্ধু। স্কুল কলেজের নয়। সমীরকে এখন আধা মুসলমান বলা যেতে পারে। কারণ, এরফানের পরামর্শে সমীর সংস্কৃত ভাষা রপ্ত করেছে। এখন সে সংস্কৃতে লেখা বেদ নিয়মিত পড়ছে এবং তা ব্যাখ্যা করে শুনাচ্ছে মন্দিরের ধর্মসভায়। ওর বাবাকে ও অন্যন্য হিন্দু পরিবারকে বুঝাতে পেরেছে যে, বেদে মূর্তিপূজা করতে নিষেধ করা হয়েছে। সকলের অনুমতি নিয়ে তাই ওদের মন্দিরের মূর্তিপূজা বন্ধ করে দিয়েছে সমীর। আর বড়–য়া বন্ধুটি অবশ্য একেবারে সাদামাঠা আর সরল। নিজের ভালোটাও সে ভালো বোঝেনা। কারো সাথে প্যাঁচে থাকেনা। পারিবারিক অবস্থা ভালো তাই কোনো ভোগান্তিও ওর নেই। এই বন্ধুটাকে মুসলমান হিসেবেই বেশি মানাতো। কারণ, একজন সত্যিকারের মুসলমানের মধ্যে যেসব গুণ থাকা দরকার, যেমন সত্যবাদী, ধৈর্যশীল, নির্লোভ ও পরপোকারী &#8211; এর সবটাই ওর মধ্যে রয়েছে। শুধু গৌতম বুদ্ধের মূর্তিটাই বাঁধা। চরদুযার থেকে ফিরে এই বন্ধুটাকে নিয়ে বসতে হবে ভাবলো এরফান।<br />
এই দুই বন্ধুই এরফানের জন্য জান দিতে প্রস্তুত। বাবা মারা যাওয়ার পর এই তিনটি মাস ওরা ছায়া হয়ে এরফানকে সঙ্গ দিয়েছে। ওদের থেকে অনেক বিষয়ের জ্ঞান পেয়েছে এরফান। যেমন বাবা বলেছেন চরের বাথানটি ওদের প্রধান আয়ের উৎস? বিষয়টি এরফানের মাথায় প্রশ্ন তৈরি করেছিল, কারণ এরফান জানে ওদের প্রধান ব্যবসা আবাসিক ও খাবারের হোটেল। তাহলে চরের বাথানটির কথা বাবা কেন বলল?<br />
উত্তরটি দিয়েছে প্রসাদ বড়–য়া। বাবাকে ও জ্যাঠামশাই বলে ডাকতো। বলল, একবার জ্যাঠামশাই ঐ বাথানের গল্প করেছিলেন। তখন তোমাদের পরপিতামহ ঐ বাথানটি দিয়েই প্রথম জীবীকা শুরু করেছেন। ওখানেই থাকতেন তিনি। একবার দুধ ক্রেতা চওে না যাওয়ায় তিনি নিজেই দুধ বিক্রি করতে শহরে আসেন। শহওে তখন দুধের চেয়ে দধি আর ছানার খুব চাহিদা ছিল। লোকজন এতো তার কাছে এতো দুধ দেখে পরামর্শ দেন যে &#8211; তুমি ছানা তৈরি কেন করছো না। মহিষের দুধের দই তো করতে পারো? তখন তোমাদের ঐ মিষ্টির দোকানটি তৈরি করেন তিনি। দুধের ছানা দিয়ে মিষ্টি আর মহিষের দুধের দই শুধু এ অঞ্চলে তোমরাই তৈরি করতে শুরু করো। ধীরে ধীরে তোমাদের ব্যবসা বাড়তে থাকে। লক্ষ কওে দেখ তোমাদের চারটি খাবার হোটেলের সবটিতেই মিষ্টি রয়েছেই। এমনকি ঐ যে আবাসিক হোটেলটি করেছো শহরে, সেখানেও নীচে এক কোনায় মিষ্টির দোকান করেছে তোমার বাবা। তোমাদের কারখানায় তৈরি মিষ্টি শুধু এই শহরে নয়, সারা দেশে প্রসিদ্ধ। এ মিষ্টি তৈরি হচ্ছে দুধ ও ছানা থেকে। আর দুধ আসছে তোমাদের ঐ বাথান থেকে।<br />
চরদুয়ারের বাথান পাড়ায় এসে ট্রলারটি ভিড়তেই লাফিয়ে বালুচরে নামলো এরফান। ঘাটে আরো তিন’চারটে ইঞ্জিন চালিত নৌকা, (যাকে স্থানীয়রা ট্রলার বলে ডাকে) বাধা আছে। স্প্রীট বোটের মতো দেখতে একটি নৌকাও রয়েছে। তবে ইঞ্জিনটি নেই। খুলে নিয়ে গেছে হয়তো। বাথানের শ্রমিক মন্টু কাকা ওকে নেয়ার জন্য ঘাটে দাঁড়িয়ে আছেন। কাকাকে সালাম জানিয়ে কুশল বিনিময় করতে করতে বাথানের দিকে চলল এরফান। ওর পিছনে অনেক দূরে নদীতে একসাথে চারটি মানুষের মাথা তাকিয়ে ওর অদৃশ্য হওয়াটা দেখল, তারপর ওরা ডুব দিয়ে অদৃশ্য হল নদীর জলে। এরফান জানতেও পারলো না শয়তানের তোলা ঐ প্রচ- ঝড়টি থামাতেই মৎসকন্যারা ঝড়ের আগে আগে ছুটেছিল। মেয়েদেও বিপদ দেখতে পেয়ে ছুটে এসেছিল পরী মা দু’জন আর পরী মা’দেও রক্ষা করতে ছুটে এসেছিল তাদেও জ্বীন স্বামী দুজন। তারা যেয়ে আল্লাহর কাছে সেজদায় পড়েছিল পানির নীচে বাদশাহের সামনে থাকা স্বর্ণমসজিদটিতে। পানির বাদশাহ হযরত খিজির (আঃ)  সব দেখলেন। একদম শেষ মূহুর্তে প্রচন্ড ধমক দিলেন নদীর জলকে। সেই ধমকে শুধু নদী নয়, ভড়কে গেল সয়ং ইবলিশ শয়তান। আর এভাবেই এম ভি পর্বত লঞ্চের শত শত যাত্রীর সাথে বেঁচে গেল এরফান নিজেও। (চলবে)</p>
<p>বিঃদ্রঃ : ছবিগুলো গ্রিকপূরাণ তেকে সংগ্রহিত। গল্পটি সম্পর্কে আপনার মতামত খুবই উপকার আসবে। তাই দয়া করে মন্তব্য লিখুন।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://shahittabazar.com/%e0%a6%9c%e0%a6%b2-%e0%a6%aa%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a7%87%e0%a6%ae%e0%a6%bf%e0%a6%95%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%97%e0%a6%b2%e0%a7%8d%e0%a6%aa/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
			</item>
		<item>
		<title>ঈদ মোবারক।   রূপকথার গান, গানের রূপকথা : আতা সরকার</title>
		<link>https://shahittabazar.com/%e0%a6%88%e0%a6%a6-%e0%a6%ae%e0%a7%8b%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a6%95%e0%a5%a4-%e0%a6%b0%e0%a7%82%e0%a6%aa%e0%a6%95%e0%a6%a5%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%97%e0%a6%be%e0%a6%a8-%e0%a6%97%e0%a6%be/</link>
					<comments>https://shahittabazar.com/%e0%a6%88%e0%a6%a6-%e0%a6%ae%e0%a7%8b%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a6%95%e0%a5%a4-%e0%a6%b0%e0%a7%82%e0%a6%aa%e0%a6%95%e0%a6%a5%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%97%e0%a6%be%e0%a6%a8-%e0%a6%97%e0%a6%be/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[অতিথি লেখক]]></dc:creator>
		<pubDate>Thu, 11 Jun 2015 05:55:27 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[গল্প]]></category>
		<category><![CDATA[সাহিত্য]]></category>
		<guid isPermaLink="false">http://shahittabazar.com/?p=2954</guid>

					<description><![CDATA[<p>রূপকথার গান, গানের রূপকথা : আতাসরকার</p> <p>গান শোনা যায় কুয়োর পারে। গান জেগে ওঠে ব্যাঙের ডাকে। পানিতে ভেসে যায় কথার ভেলা। ভেলায় সাপে-কাটা মানুষ। চারপাশে লাল-নীল-শাদা-কালো-সবুজ-হলুদ পতাকা। বাতাসের ছন্দে ছন্দে</p><span><div class="readmore"><a href="https://shahittabazar.com/%e0%a6%88%e0%a6%a6-%e0%a6%ae%e0%a7%8b%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a6%95%e0%a5%a4-%e0%a6%b0%e0%a7%82%e0%a6%aa%e0%a6%95%e0%a6%a5%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%97%e0%a6%be%e0%a6%a8-%e0%a6%97%e0%a6%be/">...বিস্তারিত &#8594;</a></div>]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>রূপকথার গান, গানের রূপকথা : আতাসরকার</p>
<div id="attachment_2283" style="width: 310px" class="wp-caption alignleft"><a href="http://shahittabazar.com/wp-content/uploads/2014/05/Ata-sorkar.jpg"><img loading="lazy" decoding="async" aria-describedby="caption-attachment-2283" class="wp-image-2283 size-medium" src="http://shahittabazar.com/wp-content/uploads/2014/05/Ata-sorkar-300x225.jpg" alt="Ata-sorkar" width="300" height="225" srcset="https://shahittabazar.com/wp-content/uploads/2014/05/Ata-sorkar-300x225.jpg 300w, https://shahittabazar.com/wp-content/uploads/2014/05/Ata-sorkar.jpg 500w" sizes="auto, (max-width: 300px) 100vw, 300px" /></a><p id="caption-attachment-2283" class="wp-caption-text">সাহিত্য বাজার আয়োজিত ৭ম সম্মেলনে আতা সরকার</p></div>
<p>গান শোনা যায় কুয়োর পারে। গান জেগে ওঠে ব্যাঙের ডাকে। পানিতে ভেসে যায় কথার ভেলা। ভেলায় সাপে-কাটা মানুষ। চারপাশে লাল-নীল-শাদা-কালো-সবুজ-হলুদ পতাকা। বাতাসের ছন্দে ছন্দে পতপতায়। আর এসময়ই শোনা যায় গান। এ গান মর্মমূলে এসে বিঁধে। হৃদয় ছিঁড়ে যায়। আবার হৃদপিন্ড তড়পায়। জেগে ওঠে হৃদয়।<br />
: কে তুমি গো? ও গায়ক, আমাকে জাগাও। কাঁদাও। হাসাও।<br />
: আমিই তো তুমি। তোমার সাথে মিলে-মিশে আমি একাকার। আমাকে কি তুমি টের পাও না?<br />
: পাই বোধহয়। যখন মনের ভেতর বেড়ে ওঠা কষ্ট কান্না হয়ে ঝরে, তখন তুমি গান হয়ে বেজে ওঠো অন্তর জুড়ে।<br />
আকাশ জুড়ে মেঘ জমে। বানের পানি পাহাড় গড়িয়ে ধায় না, আকাশ ভেঙ্গে পড়ে। দিনের আলো লোপাট করে রাতের অন্ধকার ঘনিয়ে আনে। অন্তরের ভেতরও জমে ওঠে আঁধারের কালো। মনের পাড় ঝুপ-ঝুপ ভাঙ্গে। তখন বুকে মোচড় দেয়া দুঃখের কলি ঠোঁট ছাড়িয়ে বাতাসে ভাসে। মেঘ-বৃষ্টির সাথে পাল্লা দিয়ে অশ্রু গড়ায়।<br />
আর তখনি ঠোঁট জুড়ে হাসির বান নিয়ে এসে সামনে দাঁড়ায় মায়াবতী। হাসির ¯িœগ্ধতা আর মায়ার অঞ্জন বুলিয়ে ভরিয়ে তোলে সারাটা মন। শরীরটাকেও করে তোলে ঝরঝরে চনমনে।<br />
গানের কথা যায় পাল্টে। সুরও। নতুন আলোর উদ্ভাস নিয়ে সে গায় প্রাণের গান। তার জানতে ইচ্ছা করে না কে এই মায়াবতী, কোত্থেকে সে এসেছে, কেন এসেছে। সাধ জাগে, তার গান অফুরান হয়ে ছড়িয়ে যাক চারদিক। আর মায়া-কাড়া এই মেয়েটি তার পাশেই থাক অনন্তকাল।<br />
বুঝতে পেরে মেয়েটি ত্রস্ত হয়ে ওঠে: তা হয় কিগো, আমার স্বামী-সন্তানÑসংসার আছে না! আছে আমার ঘর-কন্না, বিষ্টির সাথে নেচে-নেচে খেলে বেড়ানোর নেশা। গানে গানে সময় গড়ানো জীবনের ষোলআনাইতো শেষ।<br />
গায়ক বলে: তাহলে থাকো একটুখানি।<br />
গায়কের মনের প্রশ্ন না থাকতে পারে, অন্যদের থাকবে না কেন? জিজ্ঞেস করে: কে তুমি, কোত্থেকে এসেছ?<br />
মায়াবতী কেমন হাসির আবীর ছড়িয়ে নেয় সারা মুখে। বলে: আমি এসেছি অলকানন্দ থেকে। আমি স্বপ্ন।<br />
গায়ক বলে: স্বপ্ন কি ছোঁয়া যায়? ধরা যায়? করা যায় কি আলিঙ্গন? নাকি মায়া নিয়ে মমতা নিয়ে ভালবাসা নিয়ে স্বপ্ন দাঁড়িয়ে থাকে দূর বলয়ে?<br />
মায়াবতী হাসে। হাসিতে মোমের কোমল আলো ছড়ায়। সব কিছু যেন নরম-নরম তুলতুলে। বলে, নাকি পাল্টা প্রশ্ন করে: তোমার কি মনে হয়?<br />
গায়ক বলে: তোমাকে রঙধনুতে দেখি, উঠোন জুড়ে ছড়ানো জোৎ¯œার আলোয় ভাসতে দেখি, তোমার শরীর থেকে নতুন ধানের মিষ্টি গন্ধে আকুল হই, বাঁকানো কাস্তের ডগায় শিশির-ফোঁটা দেখি। দেখি দূরে দাঁড়িয়ে; কিন্তু ছোঁয়া তো যায় না। ছুঁতে যে বড় সাধ হয়।<br />
মায়াবতী আনমনা হয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে বলে: অমন করে লোভ দেখিও না। বরং তুমি দরাজ গলায় গান গাও। তোমার গানে আমিও স্বপ্ন দেখি।<br />
কী অবাক করা কান্ড, তাইনা? স্বপ্নও দেখতে চায় স্বপ্ন। বর্তমানের স্বপ্ন। বাস্তবের স্বপ্ন। ভবিষ্যতের স্বপ্নের আকিবুকি। সবাই মিলে এ এক স্বপ্নে লীন হওয়া।<br />
মায়াবতী তাকায় স্বপ্ন-চোখে। তাকায় গায়ক। চোখে চোখে শত বিস্ফোরণ। গায়কের স্বরযন্ত্র কেঁপে ওঠে। সুর মূর্ছা যায়। চারপাশে গানের এক অলৌকিক পরিমন্ডল।</p>
<p>বাজে ভেঁপু। বাজে সাইরেন। মায়াবতীর খবর নেই। গায়কের খবর নেই। সুরে সুরে জীবনের জাগরণ।<br />
হঠাৎ কড়া নাড়া।<br />
তীব্র ঝাকুনি খায় মায়াবতী। গায়কের গানের তাল কেটে যায়।<br />
সচকিত মায়াবতী। চোখে-মুখে শংকা। সে হাত বাড়ায়। আকাশটাকে ছোঁয়।<br />
তার লম্বা হাত দিয়ে মেঘগুলোকে সরায়। দূর-আকাশে মেঘের আড়ালে সে হারিয়ে যায়।<br />
গায়ক বসে পড়ে মাটিতে। নুইয়ে আসে মাথা। দরজায় কড়া নেড়ে কে ডাকে: দরজা খোল হে, তোমার গানের জন্য খাঁচা এনেছি।<br />
১৭.৫.২০০৭</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://shahittabazar.com/%e0%a6%88%e0%a6%a6-%e0%a6%ae%e0%a7%8b%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a6%95%e0%a5%a4-%e0%a6%b0%e0%a7%82%e0%a6%aa%e0%a6%95%e0%a6%a5%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%97%e0%a6%be%e0%a6%a8-%e0%a6%97%e0%a6%be/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
			</item>
		<item>
		<title>কুয়াশা আদর</title>
		<link>https://shahittabazar.com/%e0%a6%95%e0%a7%81%e0%a7%9f%e0%a6%be%e0%a6%b6%e0%a6%be-%e0%a6%86%e0%a6%a6%e0%a6%b0/</link>
					<comments>https://shahittabazar.com/%e0%a6%95%e0%a7%81%e0%a7%9f%e0%a6%be%e0%a6%b6%e0%a6%be-%e0%a6%86%e0%a6%a6%e0%a6%b0/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[আরিফ আহমেদ]]></dc:creator>
		<pubDate>Tue, 23 Dec 2014 12:16:46 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[গল্প]]></category>
		<category><![CDATA[সাহিত্য]]></category>
		<guid isPermaLink="false">http://shahittabazar.com/?p=2766</guid>

					<description><![CDATA[<p>দূরের কোথাও থেকে ভোরের আযান ভেসে আসছে। অন্ধকার এখনো কাটেনি। কুয়াশায় ঢাকা চারিদিক। কুয়াশার দেয়াল ঠেলেই একটু একটু করে এগোচ্ছে যাত্রী বোঝাই লঞ্চটি। সার্চ লাইটের তীব্র আলোতেও কুয়াশার দেয়াল সরাতে</p><span><div class="readmore"><a href="https://shahittabazar.com/%e0%a6%95%e0%a7%81%e0%a7%9f%e0%a6%be%e0%a6%b6%e0%a6%be-%e0%a6%86%e0%a6%a6%e0%a6%b0/">...বিস্তারিত &#8594;</a></div>]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p><a href="http://shahittabazar.com/wp-content/uploads/2014/12/012.jpg"><img loading="lazy" decoding="async" class="alignleft size-full wp-image-2767" src="http://shahittabazar.com/wp-content/uploads/2014/12/012.jpg" alt="012" width="270" height="187" /></a>দূরের কোথাও থেকে ভোরের আযান ভেসে আসছে। অন্ধকার এখনো কাটেনি। কুয়াশায় ঢাকা চারিদিক। কুয়াশার দেয়াল ঠেলেই একটু একটু করে এগোচ্ছে যাত্রী বোঝাই লঞ্চটি। সার্চ লাইটের তীব্র আলোতেও কুয়াশার দেয়াল সরাতে ব্যর্থ লঞ্চের চালক।তাই মাঝে মধ্যেই লঞ্চ থামিয়ে রাখতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। ভোররাত থেকে এভাবেই চলছে লঞ্চটি। পদ্ম-মেঘনা পাড়ি দেয়ার পর প্রায় তিনঘণ্টা পার হয়েছে। শীতকাল না হলে এ সময়টায় লঞ্চ ঘাটে ভিড়ে যেত। কিন্তু এখন অনিশ্চিত ঘাটে পৌঁছানো।</p>
<p>কেবিনের জানালায় মাথা ঠেকিয়ে একটু পর পরই বাইরে উঁকি দিচ্ছিল তানভীর।না কানো ব্যকুলতা নেই, নেই কোনো তাড়াও। ইচ্ছে করেই ঢাকা থেকে বরিশাল যেতে লঞ্চ ভ্রমণটাকে বেছে নেয় ও, এই ভ্রমণটাকে খুব উপভোগ করে তানভীর। বিশেষ করে কেবিনের বারান্দায় দাঁড়িয়ে মুক্ত শীতল বাতাসের ছোঁয়াটাকে ভীষণ ভালবাসে তানভীর। শুধু এই ছোঁয়াটা উপভোগ করতেই বন্ধুদের প্লেনে তুলে দিয়ে নিজে একটা কেবিন নিয়ে লঞ্চে চড়ে বসেছে। প্রতিবারই বরিশাল বা ভোলা যেতে ও এটাই করে।</p>
<p>অফিসের কাজে বছরে অন্তত তিন থেকে পাঁচবার বরিশাল, ভোলা ও পটুয়াখালীতে যেতে হয় ওদের চারজনকে। অনীতা, মাহবুব আর পরাগ প্লেনে উঠেছে বিকেল ৫টায়। মাত্র একঘণ্টায় বরিশাল পৌঁছে ওরা যখন ফোন করে জানাল, তখন তানভীর মাত্র সদরঘাটে যাবার জন্য তৈরি হচ্ছে। কীর্তোণখোলা-৩ নামের এ লঞ্চটি রাত নয়টা ত্রিশে ঢাকা ত্যাগ করেছে। তানভীর সবসময় নদীর দিকের কেবিন ভাড়া করে।ইচ্ছে করলে কেবিনে বসেই বাইরের নদী ও প্রকৃতি দেখা যায় এতে। বন্ধুরা ভাবে তানভীর খুব আরাম প্রিয়, তাই লঞ্চে কেবিন নিয়ে লম্বা ঘুম দিতে দিতে পৌঁছতে চায়। আসলে এটা মোটেই সত্য নয়, বরং কেবিন নিলেও তানভীর কখনো বিছানায় শুয়ে দেখেনা। লঞ্চের বিছানা বালিশ ও কম্বল ব্যবহারে এলার্জী ওর। নিরাপদে নিজের লাগেজ রাখা, কাপড় পাল্টে, হাতমুখ ধূয়ে ফ্রি হয়ে এই যে মুক্ত বাতাসে ঘুরে বেড়াচ্ছে, এটাই তানভীরের সখ। ঘুমানোর সময়ই যেন নেই ওর, একটু চোখ বুঝলেই হয়তো প্রকৃতির এই রূপ অদৃশ্য হয়ে যাবে। যদিও রাতে লঞ্চ থেকে বিশ ত্রিশ গজের বেশি দেখা যায় না, তবে পাশ দিয়ে ছুটে চলা অন্য লঞ্চ বা জাহাজের আলো, জেলে নৌকার প্রদীপ আর ঢেউ তানভীরের দু’চোখের তৃপ্তি।চোখেমুখে দমকা বাতসের আছড়ে পরাটা খুব উপভোগ করে ও। কেবিন বয়কে ডেকে এ পর্যন্ত ১০ কাপ চা খেয়েছে। এখন আবার খেতে ইচ্ছে হচ্ছে, কিন্তু কাউকেই আশেপাশে দেখতে পেলনা। ইচ্ছে হলো ফোন করে বন্ধুদের জানায় ওর এখনের অবস্থান, পরক্ষণে ইচ্ছেটার গলা চেপে ধরে, হয়তো এখন গভীর ঘুমে মগ্ন ওরা।</p>
<p>কেবিনের দরজা খুলে বের হয়ে দ্রুত লঞ্চের সারেং বা চালকের কক্ষের দরজায় নক্ করে তানভীর। ব্যস্ত হাতে কেউ একজন দরজা খুলে দেয়। নিয়মিত যাতায়াতের ফলে এই লঞ্চের অনেকেই এখন তানভীরের ভালো বন্ধুতে পরিণত হয়েছে। চালক সেলিমও তাদের একজন।</p>
<p>তানভীরকে দেখেই সেলিম প্রশ্ন করল, আরে, স্যার এই ঠাণ্ডায় আবার বাইর হইলেন যে। চা খাইবেন?</p>
<p>কেবিন থেকে বের হতেই ঠাণ্ডা বাতাসের ঝাঁপটে ধরায় শীতে কাঁপুনী উঠে গেছে তানভীরের, কাঁপতে কাঁপতেই বলল, তাড়াতাড়ি চা দিন আগে।</p>
<p>দরজা খুলে দিয়েছে যে কিশোর ছেলেটি, সে তখন ফ্লাস্ক থেকে চা ঢেলে তানভীরের হাতে দিল। গরম রং চায়ের গ্লাশে চুমুক দিয়ে স্বস্তি ফিরে পেল তানভীর। জানতে চাইলো, আমরা এখন কোথায় আছি, বরিশাল পৌঁছতে আর কত সময় লাগবে?</p>
<p>সারেংরুমে অন্য কেবিনগুলোর তুলনায় শীতের তীব্রতা কিছু কম, কারণ এখানে একটা হিটার রয়েছে। তারপরও শাল পেচানো সেলিমের কাঁপুনী থামছেনা।কম্পনরত কন্ঠেই জানালো &#8211; ওই যে আযান শুনছেন&#8230; ওটা চরমোনাই থেকে ভেসে আসছে, কুয়াশার কারণে কিছু &#8230;. বলেই হর্ণ চেপে ধরল সেলিম&#8230; বিকট শব্দে বেজে উঠল লঞ্চের হুইসেল। বেশ ঘন ঘন তিনবার বাজিয়ে আবার হর্ণ ছেড়ে দিল। কুয়াশার দেয়াল চিড়ে একটা ক্ষীণ প্রদীপ অতি ধীরে ধীরে একপাশ থেকে অন্যপাশে চলে গেল। সেলিমের চোখের তীক্ষ্নতার প্রশংসা না করলেই নয়, হুইসেল না দিলে হয়তো লঞ্চের নীচে চাপা পরে যেত জেলে নাওটি।</p>
<p>সেলিম তখনও বলছে, অজগরের মতো যেভাবে চলছি, তাতে সকাল নয়টায়ও পৌঁছতে পারি কিনা সন্দেহ। শুনে মনে মনে খুশি হয়ে উঠলো তানভীর। সেলিমের হাতে একটা সিগারেট ধরিয়ে দিয়ে সারেংরুম থেকে বের হয়ে এলো। নিজের কেবিনের সামনের চেয়ারটায় হাত দিয়ে দেখলো শিশিরে ভিজে পানি জমেছে। কেবিনের দরজা খুলে একটা নিউজপেপার এনে পানি মুছে বসে পড়লো। আঢ়চোখে দেখলো পাশের কেবিনের দরজায়। ওখানে দু’জন রমনী ও চার বছর বয়সের একটি মেয়েশিশু নিশ্চিন্ত আরামে ঘুমাচ্ছে। লঞ্চছাড়ার মাত্র পাঁচ মিনিট আগে এসে উঠেছে ওরা। শিশুটির নাম অন্তরা। ভালো নাম জেসমীন জাহান। তানভীরের সাথে শুধু শিশুটিরই আলাপ হয়েছে।</p>
<p>আলাপের শুরুটা অবশ্যই খুব কঠিন, বেলকুনীতে ঝুকে বেশ আরাম করে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছিল তানভীর। শিশুটি ওপাশের চেয়ারে বসে দূরে দেখছিল আর ওর মা ও সাথের মেয়েটি কেবিনে লাগেজ গুছাচ্ছেন। হঠাৎ শিশুটি উঠে এসে তানভীরকে খুব ধমকের সুরে বলল, এই বেয়াদপ লোকটা, তুমি সিগারেট খাচ্ছ কেন? ফালাও, এখুনী ফালাও বলছি, জাননা, এটা ক্ষতি করে।</p>
<p>তানভীর প্রথমে খুব হকচকিয়ে যায়, মুগ্ধ হয়ে মিষ্টি শিশুটিকে দেখে। তারপর সিগারেটটি নদীতে ফেলে দিয়ে জানতে চায়, এটা ক্ষতি করে বুঝি? আপনাকে কে বলল?</p>
<p>ও মা.. তুমি জাননা, তুমি টেলিভিশণ দেখনা? এটাতো টেলিভিশনে প্রতিদিন বলে। কথাটা বলেই শিশুটি ছুটে যায় তার মায়ের কাছে, মা মা লোকটা জানে না সিগারেট ক্ষতি করে, এটা লোকটা জানেনা।</p>
<p>পিছন ফিরে থাকায় তানভীর দেখতে পায় না, কিন্থু শুনতে পায় ওর মায়ের ধমক &#8211; ছিঃ মা, তুমি ওনাকে বিরক্ত করনা। যাও চুপচাপ বসে থাকো।</p>
<p>শিশুটি তার আগের চেয়ারটায় যেয়ে চুপচাপ বসে পরে। তানভীর আর ওর মাঝে শুধু একটা পিলারের দুরত্ব। তাই তানভীর জানতে চায়, আমি কি আপনার নামটা জানতে পারি মা’মনি।</p>
<p>নিজের হাতে নিজের হাতকে চেপে, মুখে গালে দু’হাতের চাপ দিয়ে, অনেক ভেবে চিন্তে সে বলে- ও মা, আমি তো কত ছোট্ট, আমাকে আপনি বলছে এত্ত বড় লোকটা। আমাকে অন্তরা ডাকে সবাই বুঝেছো? আরো একটা নাম আছে আমার, জেসমীন জাহান। তোমার নাম কি?</p>
<p>তানভীর ওর কথায় মুগ্ধ হয়, বলে, আমার নাম তানভীর হুসেন। তোমার আব্বু আসেনি?</p>
<p>এ কথায় আবারো চুপ অন্তরা, তারপর বলে, আম্মু আর ফুপি এসেছেতো। তবে&#8230;কথা শেষ হতে পারে না, ওর মা এসে ওকে টেনে নিয়ে যায় কেবিনের ভিতরে। লাগিয়ে দেয় দরজা জানালা সবই। মাঝে একবার শুধু হাত ধূতে বের হয়েছিল ওরা, আর একবারও কেউই বের হয়নি।খুবই রহস্যময় মনে হয়েছে এদের আচরণ। তানভীর ওর অভিজ্ঞতায় জানে মেয়েরা তিন ঘণ্টায় অন্তত একবার টয়লেটে যাবে হিশু দিতে। কিন্তু এখানে ওর সেই অভিজ্ঞতা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। শিশুটি হয়তো প্যাম্পাস পরে আছে কিন্তু মহিলা দুজন? তারাও কি তবে প্যাম্পাস&#8230;?</p>
<p>দুরশালা, আমার কি? আমি কেন এদের নিয়ে ভাবছি? নিজেকেই গালি দিল তানভীর। মানছি অন্তরার মিষ্টি আচরণ মনের ভিতর খুব প্রভাব বিস্তার করেছে। কিন্তু তাই বলে আমি ওই শিশুটির জন্য অপেক্ষা করছি কেন? সারারাত জেগে বারান্দায় টহল দেয়ার পিছনে এটাও কি কোনো কারণ, হয়তো অন্তরা বের হয়ে আসবে। ওকে ডেকে গল্প করবে। এই ঠাণ্ডায় একটা শিশুর কাছে এটা আশা করা কি বোকামী না?</p>
<p>কুয়াশার চাদর ক্রমশ পুড়ো লঞ্চটিকে গ্রাস করে নিল। থেমে দাঁড়িয়ে আছে লঞ্চটি। একহাত দূরের কিছুই দেখা যাচ্ছেনা আর। মোটা জ্যাকেটের আবরণ ভেদ করে শরীরে কাটা ফুটাচ্ছে প্রচণ্ড ঠাণ্ডা। শীতের দাপটে দাঁতে দাঁত ঘর্ষণ হচ্ছে নিজের অজান্তেই। তবুও যেন গো ধরে বসে আছে তানভীর।ু খুট করে দরজা খোলার শব্দ হলো, কারো হাঁটার শব্দ এসে থামলো তানভীরের পাশে। আমরা কোথায় আছি বলতে পারেন? লঞ্চটা চলছে তো?</p>
<p>মেয়েলী কণ্ঠ কানে যেতেই চমকে তাকালো তানভীর। একহাতে চাদর জড়িয়ে ধরে অন্যহাতে নিজের চুল সামলাতে সামলাতে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে গতরাতে একপলক দেখা আপাতত ‘অন্তরার মা’ নামের মহিলাটি। রাতে তাকে দেখতে খুব একটা ভালো মনে হয়নি।বেশ মোটা আর খিটখিটে মেজাজের মনে হয়েছে। কিন্তু কুয়াশা ঢাকা এই ভোরে তাকে খুব স্নিগ্ধ আর সৌম্য মনে হচ্ছে।</p>
<p>একনজর তাকে দেখে নিজের পাশের চেয়ারটা দ্রুত মুছে দিয়ে বসার ঈঙ্গিত করতে করতে তানভীর জানালো, চরমোনাই পীরের এলাকায় কোথাও আছি আমরা। লঞ্চ এখন থেমে আছে।</p>
<p>তানভীরের পাশে বসতে বসতে অন্তরার মা বললেন, আপনি সারারাত ঘুমাননি? এই শীতে এভাবে বসে থাকতে কষ্ট হচ্ছে না?</p>
<p>লঞ্চে আমার ঘুম আসে না। তাছাড়া এটাতেই আমি অভ্যস্ত হয়ে গেছি। শীত লাগছে, কিন্তু প্রটেকশানতো আছে দেখুন &#8211; বলে নিজের গায়ের মোটা জ্যাকেটটি দেখালো তানভীর।</p>
<p>তানভীরের দেখানোর কৌশলে হেসে উঠলেন অন্তরার মা। একসময় আমিও খুব উপভোগ করতাম এই ঠাণ্ডা হাওয়া, নদীর উপর এই ছুটে চলাটাকে। এখন আর এগুলো আমাকে টানে না। অন্তরার জন্মের পরই সব বদলে গেছে। এখন আমার প্রাণচাঞ্চল্য সব ওকে ঘিরে।</p>
<p>ওকি ঘুমাচ্ছে?</p>
<p>হ্যাঁ । ঘুম থেকে জাগলেই বিপদ। এই ঠাণ্ডায় ওকে আমি বাইরে আসতে দেব না, আর ও বাইরে আসার জন্য পাগল হবে। বাবার আচরণটা পুরোমাত্রায় পেয়েছে যে।</p>
<p>এ কথায় উদাসী তানভীর। অন্তরাকে দেখতে না পাওয়ার বিষয়টা স্পষ্ট যন্ত্রণা দেয় ওর মনে। বলে, বাচ্চাদের এতে কিছু হয় না, বরং ওদের মন মতো চলতে না দিলেই ওরা অসুস্থ হয়ে পরে।</p>
<p>কি বলছেন? এতো ঠাণ্ডায় যদি একটা বাচ্চা বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকে কি অবস্থা হবে ভেবে দেখেছেন? রাতে ওকে কত কষ্টে যে আটকে রেখেছি, কতটা আবদার রক্ষা করে যে ঘুম পাড়িয়েছি তা শুধু আমার বোনটা-ই জানে।</p>
<p>না না আমার কথায় ভয় পাবেন না, আমি এতো ঠাণ্ডায় ওকে বাইরে পাঠাতে বলছি না, শুধু বলতে চাচ্ছি যে শিশুদের মন যখন যে কাজটা করতে চায়, সেটা করতে বাধা পেলেই ওরা অসুস্থ হয়ে পরে। তাই যতটা পারা যায় ওদের সাথে মানিয়ে নিতে হবে।</p>
<p>তাই বলে ও আগুনে হাত দিতে চাইলো আমি দিতে দেব, এটা কেমন কথা?</p>
<p>না না আপনি উল্টো বুঝছেন কেন? তবে কখনো কখনো আগুনের কাছে ওর হাতটা নিয়ে বুঝিয়ে দিতে হবে এটা আগুন, এর থেকে দূরে থেকো। একবার হাত না পুড়লেতো ও আগুনটাকে চিনবে না।</p>
<p>কি ভয়ানক চিন্তা আপনার, একটা বাচ্চা মেয়ের হাত আগুনে পুড়তে দিয়ে তাকে আগুন চিনাতে হবে?</p>
<p>হ্যাঁ, শুনতে খারাপ লাগলেও এটাই করতে হবে। তানা হলে আপনার অবর্তমানে ও হয়তো আগুনে ঝাপ দিয়ে গোসল করতে চাইতে পারে, তখন কি করবেন? বাদ দিন এসব, তা সাথের ভদ্রমহিলা বুঝি আপনার বোন?</p>
<p>নিজেকে আরো একটু চাদরে জড়িয়ে অন্তরার মা বলেন, হ্যাঁ দূর সম্পর্কের খালাতো বোন। আমাদের গ্রামের তিন গ্রাম পরের গ্রামে ওদের বাড়ি। তিন বছর হলো আমার কাছেই থাকে। আমি অফিসে গেলে অন্তরার ভার ওর উপরেই থাকে।আচ্ছা আমি উঠি। আপনাকে বিরক্ত করলাম। বলেই তানভীরকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই খুব দ্রুত চলে যায় অন্তরার মা।খুট করে দরজা লাগানোর শব্দ। আনমনে সিগারেট জ্বালায় তানভীর। নিজের ভিতর গভীর কোনো অরণ্যে হারিয়ে যায়&#8230;।</p>
<p>কোমল ছোট্ট হাতের পরশের সাথে মিষ্টি কণ্ঠের ডাক- এই তানভী&#8230; আবার সিগারেট খাচ্ছ? চমকে বাস্তবে ফিরে আসে তানভীর। দেখে ওর একেবারে গাঁ ঘেষে দাঁড়িয়ে আছে অন্তরা। এবার ওর গাঁয়ে ভারী শীতবস্ত্র। অনেকটা তানভীরের গাঁয়ের জ্যাকেটটির সাথে ম্যাচ করা। এ জ্যাকেট ঠেলে ঠাণ্ডার প্রবেশ বেশ কষ্ট সাধ্য হবে। মেয়েটির স্মরণ শক্তি আরো প্রখর। সেই রাতে তানভীর ওর নাম বলেছে, বাচ্চা মেয়েটি সেটাও মনে রেখেছে।</p>
<p>অন্তরার ডাকটা এবার এমন হলো যে, নিজের মায়ের ধমককে মনে করিয়ে দিল। দ্রুত শেষ হয়ে আসা সিগারেটটি কুয়াশার দেয়ালে ছুড়ে ফেলে অন্তরাকে কোলে তুলে নিল ও। মুখে বলল, মাপ করে দেও মা। আর কখনো হবে না। তুমি আসনিতো তাই খাচ্ছিলাম।</p>
<p>আমি তোমার কাছে থাকলে আর খাবেনাতো?</p>
<p>একদম খাব না।</p>
<p>আচ্ছা! লঞ্চ ঘাট না আসলে আমি তোমার কাছে থাকবো। কিচ্ছু দেখা যায়না কেন?</p>
<p>এই যে কুয়াশা, অনেক কুয়াশা তাই দেখা যায় না।</p>
<p>কুয়াশা কাকে বলে?</p>
<p>কুয়াশা কাকে বলে, ভাবনায় পরে যায় তানভীর।কীভাবে বোঝাবে ওকে। এই যে দেখ, এই সামনে যে ধূয়ার মতো দেখা যায়, এটা আসলে ধূয়া না, এটা হচ্ছে শীতের পানি। বাতাস চেন।</p>
<p>হ্যাঃ চিনিতো। বাড়িতে ফ্যানের বাতাস আছেতো।</p>
<p>না ফ্যানের বাতাস না মা। ওই যে ঝড় হলে বাতাস হয়, ওই বাতাস।দেখেছো কখনো?</p>
<p>হ্যাঃতো দেখেছিলাম, মা খুব ভয় পায় বাতাসে বলেই হিঃ হিঃ করে হাসিতে ফেটে পড়ে অন্তরা।</p>
<p>তানভীর দ্রুত পিছনে অন্তরাদের কেবিনে ঊঁকি দিয়ে দেখে। ওর মা আবার দেখছে নাতো। তারপর কানে কানে বলে, মা আগুনকেও খুব ভয় পায়, তাই না?</p>
<p>মাথা উপর নীচ করে অন্তরা স্বায় জানায়, এবার দুজনেই একসাথে হেসে ওঠে। ওদের হাসিতে এসে যোগ হয় অন্তরার মায়ের রাগি আর উদ্বিগ্ন কণ্ঠ, খবরদার তানভীর আমার মেয়েকে উল্টোপাল্টা কিছু শিখাবে না তুমি।এমনিতেই তোমার সব বদ গুনগুলো ও পেয়েছে।</p>
<p>আচমকা অন্য কণ্ঠস্বর শুনে আঁতকে উঠে অন্তরা, দ্রুত তানভীরের বুকে মুখ লুকায়। অনাবিল শান্তির পরশ তানভীরের সমস্ত শরীর ছুঁয়ে ওর সব কষ্ট, গ্লানী দূর করে দেয়।</p>
<p>খুবই মোলায়েম কণ্ঠে ভিন্ন এক তানভীর কথা বলে এবার, না শীলা- জেসমীন উল্টাপাল্টা কিছু শেখার মেয়ে নয়, তুমি-আমি ওকে যা শেখাবো ও তা-ই শিখবে।অযথা আর রাগ করনা।রাগ করে তিনটা বছরতো একা একা কাটালে, এই তিনবছর তুমি যতটা কষ্ট পেলে, তার তিনগুন কষ্ট আমাকে দিয়েছো। আমার মেয়ের থেকে আমাকে দূর করে রেখেছো? আর কতদিন, এভাবে অপরিচিতের মতো করে নিজের মেয়েকে দেখবো বলতে পারো? আমি যে আর পারছিনা। এবার ক্ষমা করো।</p>
<p>কে শোনে কার কথা, রাগি শীলা, অন্তরাকে নিয়ে হন হন করে কেবিনে চলে যায়।</p>
<p>লঞ্চঘাটে ভেড়ার শব্দ। হুইসেল, কুলিদের ডাক। নিস্তব্দ বসে থাকে তানভীর। মনের ভিতর কুয়াশার ঝড় চোখ বেয়ে নেমে যায়&#8230; আজ তিনবছর পর নিজের মেয়েকে দেখেছে তানভীর। ওর নিজের মেয়ে। সেই শিশুবেলা মাত্র দু’বার কোলে নিয়েছিল, তারপর আর দেখা হয়নি কারো।</p>
<p>ধীরে ধীরে সব যাত্রী নেমে যায়। অন্তরাদের দরজা খুলে বের হয়ে আছে অন্তরা। বাবা, আমাকে কোলে নাও, বলেই তানভীরের কোলে চেপে বসে অন্তরা।</p>
<p>তানভীরের চোখেমুখে খুশীর দীপ্তি খেলে যায়। একহাতে মেয়েকে অন্য হাতে বউ শীলাকে জড়িয়ে ধরে।</p>
<p>(সংক্ষিপ্ত)</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://shahittabazar.com/%e0%a6%95%e0%a7%81%e0%a7%9f%e0%a6%be%e0%a6%b6%e0%a6%be-%e0%a6%86%e0%a6%a6%e0%a6%b0/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
			</item>
		<item>
		<title>নস্টালজিয়া ০১ : আলমগীর রেজা চৌধুরী</title>
		<link>https://shahittabazar.com/%e0%a6%a8%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%9f%e0%a6%be%e0%a6%b2%e0%a6%9c%e0%a6%bf%e0%a7%9f%e0%a6%be-%e0%a7%a6%e0%a7%a7-%e0%a6%86%e0%a6%b2%e0%a6%ae%e0%a6%97%e0%a7%80%e0%a6%b0-%e0%a6%b0%e0%a7%87%e0%a6%9c/</link>
					<comments>https://shahittabazar.com/%e0%a6%a8%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%9f%e0%a6%be%e0%a6%b2%e0%a6%9c%e0%a6%bf%e0%a7%9f%e0%a6%be-%e0%a7%a6%e0%a7%a7-%e0%a6%86%e0%a6%b2%e0%a6%ae%e0%a6%97%e0%a7%80%e0%a6%b0-%e0%a6%b0%e0%a7%87%e0%a6%9c/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[অতিথি লেখক]]></dc:creator>
		<pubDate>Sat, 20 Sep 2014 06:44:04 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[গল্প]]></category>
		<category><![CDATA[সাহিত্য]]></category>
		<guid isPermaLink="false">http://shahittabazar.com/?p=2600</guid>

					<description><![CDATA[<p>নস্টালজিয়া ০১<br /> আলমগীর রেজা চৌধুরী</p> <p>চাচা মিয়ার দোকান থেকে বের হতে চোখে পড়লো কমলা রঙের স্নিগ্ধ বিকেল। বাঁ পাশে চলমান রাস্তা, নোমানদের বাসার সামনে কৃষ্ণচূড়া গাছ। ঝিরঝির করে ওর</p><span><div class="readmore"><a href="https://shahittabazar.com/%e0%a6%a8%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%9f%e0%a6%be%e0%a6%b2%e0%a6%9c%e0%a6%bf%e0%a7%9f%e0%a6%be-%e0%a7%a6%e0%a7%a7-%e0%a6%86%e0%a6%b2%e0%a6%ae%e0%a6%97%e0%a7%80%e0%a6%b0-%e0%a6%b0%e0%a7%87%e0%a6%9c/">...বিস্তারিত &#8594;</a></div>]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<div id="attachment_2601" style="width: 310px" class="wp-caption alignleft"><a href="http://shahittabazar.com/wp-content/uploads/2014/09/A-reja-chow.jpg"><img loading="lazy" decoding="async" aria-describedby="caption-attachment-2601" class="wp-image-2601 size-medium" src="http://shahittabazar.com/wp-content/uploads/2014/09/A-reja-chow-300x225.jpg" alt="A-reja-chow" width="300" height="225" srcset="https://shahittabazar.com/wp-content/uploads/2014/09/A-reja-chow-300x225.jpg 300w, https://shahittabazar.com/wp-content/uploads/2014/09/A-reja-chow.jpg 400w" sizes="auto, (max-width: 300px) 100vw, 300px" /></a><p id="caption-attachment-2601" class="wp-caption-text">আলমগীর রেজা চৌধুরী</p></div>
<p><strong>নস্টালজিয়া ০১</strong><br />
<strong>আলমগীর রেজা চৌধুরী</strong></p>
<p>চাচা মিয়ার দোকান থেকে বের হতে চোখে পড়লো কমলা রঙের স্নিগ্ধ বিকেল। বাঁ পাশে চলমান রাস্তা, নোমানদের বাসার সামনে কৃষ্ণচূড়া গাছ। ঝিরঝির করে ওর চিরল পাতাগুলো কাঁপছে। সামনে বুড়া বাবার মাজারে লাল চাঁদোয়া।<br />
ওরা আজকাল কেউ আসে না। কদাচিৎ আমার মতো হঠাৎ করে এসে চাচা মিয়ার দোকানের স্মৃতির উষ্ণ পরশ খুঁটে নিয়ে যার যার মেরুতে চলে যায়। থমকে দাঁড়িয়ে পুরনো জায়গাগুলো ভালো করে দেখে নেয়।<br />
চাচা মিয়ার দোকানের ঘিঞ্জি পরিবেশ থেকে বের হয়ে একটু অন্যরকম মনে হলো। ওরা কেউ আসবে না। অথচ এক সময় ছিলো বিকেল গড়িয়ে এলে আমরা কয়েক বন্ধু মিলে চাচা মিয়ার এই টি-স্টলে বসে রাত দশটা পর্যন্ত চা খেতে খেতে জীবনকে উত্থান থেকে পতন, পতন থেকে উত্থানে নিয়ে যেতাম। হেঁশেলের গনগনে আগুন চোখে লাগতেই কলেজ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত বন্ধু আতা সরকারের গল্পের কথা মনে পড়ে যেতো। কি চমৎকার বর্ণনা দিয়েছিলো! আমি চাচা মিয়ার হেঁশেল দেখিয়ে বলতাম, ‘আতার আগুন।’ এই রকম এক জীবনের চরম মুহূর্তকে কেন্দ্র করে আমাদের রাস্তাগুলো ভাগ হয়ে গেলো। আমাদের কয়েক বন্ধুর দুরন্ত আবেগের সাথে মিশে থাকে চাচা মিয়ার দোকান।<br />
ব্রহ্মপুত্রের জল এখন অনেক দূরে চলে গেছে। অনেক দূর। ওর বুক জুড়ে জেগে উঠেছে ধবল বালির চর। কলকল স্রোতধারার গতিবেগ শ্লথ হয়ে আসছে। তেমনি পরিবর্তিত হয়েছে এই শহরের মুখ। কিছুটা সময়ের ব্যবধানে পাল্টে গেছে জীবন প্রণালী। শুধু চাচা মিয়াকে মনে হলো ঠিক আগের মতো ক্যাশ বাক্সের ওপর হাত রেখে চারিদিক সুতীè দৃষ্টি নিয়ে তদারক করছে। বুড়া বাবার মাজারে আজকাল লোকজন আসে প্রচুর। গমগম করছে মানুষ। বাইরে সিন্দুকটায় যেখানে লেখা রয়েছে ‘এখানে ফেলুন’ একটা লোক টাকা ফেলতে এগিয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ করে আমার অনুভূতি অনেক পিছনে হেঁটে এলো।<br />
রিনির একটা ছবি ভাসতে লাগলো। ওর দুরন্ত স্বভাব অনুভব করতে এক দৃশ্যমান দিন হাসনাহেনার হালকা সুরভির মতো মুহূর্তটাকে সপ্তবর্ণের ক্যানভাসে আটকিয়ে রাখলো পিছনে তাকিয়ে দেখার জন্য। সাহেব কোয়ার্টার পার্কে বসে গল্প করতে করতে সন্ধ্যে নামলো। আমি রিনি হেঁটে যাত্রা করলাম। এখন ঘরে ফেরার পালা। মফস্বল শহরে ল্যাম্পপোস্টে টিমটিম করে আলো জ্বলছে। পাশ দিয়ে কলকল করে ব্রহ্মপুত্র বয়ে যাচ্ছে। নদীর ওপারে শম্ভুগঞ্জের পাটকলের বাতিগুলো এক আলোকিত স্বপ্নের বোধ হয়ে আমাদের মধ্যে ছায়া ফেলে। রিনির হাতে একটা শিউলি ফুলের মালা। তা থেকে একটু মিষ্টি গন্ধের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এই মুহূর্তে আমরা পরস্পরের মধ্যে প্রচ্ছন্নভাবে মিশে যাচ্ছি। বুড়া বাবার মাজারের কাছে এসে রিনি একটি টাকা এবং শিউলি ফুলের মালাটা সিন্দুকের ওপর রেখে পথ ধরলো।<br />
আমি বললাম, ‘বিশ্বাসকে সহজভাবে গ্রহণ করার অসীম মতা তোমার। আমার তেমন নেই। কোনো সময় ছিলো না। একটু কিছুতেই ভেঙে পড়া আমার জন্মের স্বভাব।’<br />
এইদিক দিয়ে রিনি ছিলো ব্যতিক্রম।<br />
একদিন সন্ধ্যেবেলা সকাল সকাল ঘরে ফিরতেই মা বলল, ‘অনু বাবা চলতো ওই যে রাস্তার শেষ মাথায় সাবরেস্টার সাহেব আছেন তার মেয়ে রিনি পেয়ারা গাছ থেকে পড়ে প্রচণ্ড রকম ব্যথা পেয়েছে। বাসায় খবর দিয়ে গেছে তাকে দেখতে যেতে হবে।’<br />
মা নিজেকে গোছগাছ করে রেখেছিলো। শুধু কারো অপোয় ছিলো। বাবা-মাকে ছোটবেলা থেকে দেখছি, সামাজিকতা রা করতে চেষ্টা করতেন। আমার এইসব খুব ভালো লাগতো। পাড়ার মধ্যে ভদ্রলোক বলে বাবার শুনাম ছিলো।<br />
নিঃশব্দ মনে হলো সমস্ত বাড়িটা। গেটের কাছে কামিনী ফুলের সুবাস নাক স্পর্শ করলো। ঘরে ঢুকে দেখলাম রিনি বিছানায় শুয়ে আছে। ওর মা মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। মুখে মলিনতার ছাপ। লাইটের আলোয় রক্তশূন্য পাণ্ডুর দেখাচ্ছে রিনির মুখ। ওর উজ্জ্বল চোখ দুটো চারিদিক তাকিয়ে দেখছে। মাকে দেখে ওর মা বলল, ‘ডাক্তার বলেছে কিছুই হয়নি হঠাৎ করে পড়ে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলো। ঠিক হয়ে যাবে। রেস্টের প্রয়োজন। তাছাড়া ওর বাবা বাইরে গেছে ফিরবে দু’একদিন পর। একেবারে ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।’<br />
সেই দিন আমার রিনিকে ভালো করে দেখা। এক দৃষ্টিতে ওর চেখের গভীরতায় হারিয়ে যাওয়া। কী চরম অর্থময় ছিলো সেই একটি রাত। উজ্জ্বল আলোজ্বলা ঘরে মা এবং রিনির মা সাংসারিক বিভিন্ন প্রসঙ্গ নিয়ে আলাপ করতে করতে রাত বাড়িয়ে তোলে। শুধু আমি তীè দৃষ্টিতে রিনিকে দেখছিলাম। কলেজে পড়া উনিশের যুবক হঠাৎ করে নাগরদোলায় ঘুরপাক খেতে খেতে এক সংগীত প্রবাহের অতলান্তে খুঁজে পেলো এক জীবনের মধুরতা। রিনিও আমাকে দেখছিলো। মনে হচ্ছে কতো জন্মের পরিচয় আমাদের। বাসায় ফিরে একটা উষ্ণবোধ আমাকে ক্রমাগত অনন্ত এক পথের দিকে ঠেলে নিয়ে গেলো। যেখানে আমি নিতান্তই ক্রীড়নক।<br />
একদিন ব্রহ্মপুত্রের বালির চরের সন্ধ্যাকালীন স্নিগ্ধ ফুরফুরে হাওয়ার সাথে রিনির চুলগুলো অবিন্যস্ত হয়ে চোখে-মুখে পড়ছিলো। রিনি বাঁ হাত দিয়ে বারবার সরাতে চেষ্টা করে।<br />
বিকেলবেলায় চর জেগে ওঠা ব্রহ্মপুত্রের বুক দিয়ে হেঁটে হেঁটে গল্প করা আমার রিনির প্রাত্যহিক কর্মের সাথে ছিলো জড়িয়ে। খুব ভালো লাগতো ওর। মনোরম এই সন্ধ্যার আবছায়ায় বালির ওপর বসে আমি রিনি সেদিনই প্রথম অনুভব করলাম কবোষ্ণ চুম্বনের আরক্ততা। কী স্বাভাবিক ভাবে ঘটে গেলো সবকিছু। রিনিকে কী বিপন্ন মনে হলো! রিনির প্রতি মমতায় মৃদু কম্পন হতে থাকে মনের ভেতর। নদীর তটে বসে কলকল শব্দে সুনীল দিগন্ত জোড়া আকাশ দেখতে দেখতে আমি রিনির জন্মের কাছে ঋণী হয়ে গেলাম। রিনি তখন অধরে আলতো লজ্জার ছোঁয়া মেখে নত্রের মৃদু আলোতে কল্লোলিত জলের পতন দেখছে। আসলে রিনির জীবনের সামান্যতম সুখ দেখতে আমার প্রচণ্ড ভালো লাগতো। ওর কোনোরূপ দুঃখ আমার কল্পনার মধ্যে এলে, কষ্ট অনুভব হতো। আমার সবকিছুতেই রিনির উপস্থিতি পরিলতি হতে থাকে।<br />
মৃদু হিন্দোলায় খসে গেলো সময়ের সেতুপথ। আমাকে দিয়ে বাবা-মা’র খুব বড় একটা আশার মধুচক্র গড়ে ওঠেছিলো। তাই ডিগ্রি পাস করার পর এই মফস্বল শহর ছেড়ে দিতে হয়। রিনি তখন বিয়ের পিঁড়িতে বসার স্বপ্ন দেখছে।<br />
রিনি বলে, ‘আমি ছাড়া ওর জীবন অর্থহীন?’<br />
শারদীয় পূর্ণিমায় ব্রহ্মপুত্রের জলে চাঁদের তুলকালাম কাণ্ড দেখতে দেখতে আমার পঞ্চইন্দ্রিয়ের মধ্যে রিনির জন্য মমতায় বেদনার প্লাবন প্রবাহিত হতে থাকে।<br />
আমি বললাম, ‘রিনি কাল আমি ঢাকায় চলে যাচ্ছি। নিজকে গুছিয়ে নিয়ে আমরা নতুন করে জীবন শুরু করবো।’<br />
রিনি কোনো কথা বলে না। জোছনার আলোয় ওর চোখের জল চিকচিক করতে থাকে। আমার কেবলি মনে হতে থাকে, ফের দেখা হবে রিনি। তোমার ভালোবাসার ঋণ আমি শোধ করে দেবো।<br />
রিনিকে নিয়ে এটাই আমার শেষ স্মৃতি। এই শহরে এলেই আমি স্মৃতি দ্বারা আক্রান্ত হয়ে পড়ি। নস্টালজিক এক জীবনের কাছে সমর্পিত দুঃখের স্বাদ গ্রহণ করতে ভালো লাগে। আমার নিজস্ব কোনো ভালো মন্দ নেই। একদিন চৈতী সন্ধ্যায় রেলওয়ে ওভারব্রিজে দাঁড়িয়ে রিনির চলে যাওয়া দেখে আমার সবকিছু বদলে গেছে। আজকাল এই শহর একেবারে পরিত্যাজ্য। বাইরে থাকতে মন চায়। দূর থেকে চৈতী হাওয়ায় শীতলতা বয়ে আনে স্মৃতির সুরভি। আকাশে নত্রের চোখ দেখতে দেখতে বোধ হয়-আমি তো রিনিকে মনে রেখেছি। এক জীবনের রিনিকে আজীবন মনে রাখার মাঝে আমার প্রথম প্রণয়ের অযাচিত সুখ লুকিয়ে। মাঝে মাঝে মনে হয়, রিনি তুমি আজ কার ঘরে, কোন পথে যেতে হয়?<br />
বুড়া বাবার মাজার পেরিয়ে নদীর চর দিয়ে হাঁটতে ব্রহ্মপুত্র নদের রুগ্ন রূপান্তরের সাথে আমার জীবনের এক অদ্ভুত সাদৃশ্য মনে হলো। ব্রহ্মপুত্র তার জীবনের অনাদিকালের চাওয়া-পাওয়ার ইতি ঘটিয়ে পরাজিত এক ছবিকে বুকে জড়িয়ে নীলস্রোতে বয়ে যাচ্ছে। এইভাবে ব্রহ্মপুত্র তার কুমারত্ব হারিয়ে এক যৌবনের স্বপ্ন দেখে। যেমন আমি এই মুহূর্তে ধবল বালির চর হাঁটতে হাঁটতে জীবনের উত্থান থেকে পতন, পতন থেকে উত্থানের স্বপ্ন দেখছি। শম্ভুগঞ্জের রেলওয়ে ব্রিজের উপর দিয়ে ট্রেন চলে গেলো তীব্র আলো ছড়িয়ে। পিছনে পরে রইলো দুঃসহ অন্ধকার। আমি তখন বাবার মাজারকে পিছনে ফেলে শহরমুখী হলাম। রাত বাড়ছে। মাজারে তখন এক তারায় টুং টাং করে গান ভেসে এলো, ‘খাঁচার ভিতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়।’</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://shahittabazar.com/%e0%a6%a8%e0%a6%b8%e0%a7%8d%e0%a6%9f%e0%a6%be%e0%a6%b2%e0%a6%9c%e0%a6%bf%e0%a7%9f%e0%a6%be-%e0%a7%a6%e0%a7%a7-%e0%a6%86%e0%a6%b2%e0%a6%ae%e0%a6%97%e0%a7%80%e0%a6%b0-%e0%a6%b0%e0%a7%87%e0%a6%9c/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
			</item>
		<item>
		<title>শীষ্</title>
		<link>https://shahittabazar.com/%e0%a6%b6%e0%a7%80%e0%a6%b7%e0%a7%8d/</link>
					<comments>https://shahittabazar.com/%e0%a6%b6%e0%a7%80%e0%a6%b7%e0%a7%8d/#comments</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[সদানন্দ সরকার]]></dc:creator>
		<pubDate>Tue, 12 Aug 2014 10:16:57 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[গল্প]]></category>
		<category><![CDATA[সাহিত্য]]></category>
		<guid isPermaLink="false">http://shahittabazar.com/?p=2473</guid>

					<description><![CDATA[<p>শীষ্</p> <p>আজ নিয়ে তিন মাস অতিবাহিত হচ্ছে আমরা লোকটাকে অনুসরণ করছি।<br /> সরকারের উপর মহলের হুকুমে সকাল থেকে রাত্র বারটা পর্যন্ত ছায়ার মত লেগে আছি লোকটির পিছনে। লোকটির ছোটো খাট</p><span><div class="readmore"><a href="https://shahittabazar.com/%e0%a6%b6%e0%a7%80%e0%a6%b7%e0%a7%8d/">...বিস্তারিত &#8594;</a></div>]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p>শীষ্</p>
<p><a href="http://shahittabazar.com/wp-content/uploads/2014/07/AZA_3509.jpg"><img loading="lazy" decoding="async" class="size-medium wp-image-2458 alignright" alt="AZA_3509" src="http://shahittabazar.com/wp-content/uploads/2014/07/AZA_3509-300x198.jpg" width="300" height="198" srcset="https://shahittabazar.com/wp-content/uploads/2014/07/AZA_3509-300x198.jpg 300w, https://shahittabazar.com/wp-content/uploads/2014/07/AZA_3509.jpg 400w" sizes="auto, (max-width: 300px) 100vw, 300px" /></a>আজ নিয়ে তিন মাস অতিবাহিত হচ্ছে আমরা লোকটাকে অনুসরণ করছি।<br />
সরকারের উপর মহলের হুকুমে সকাল থেকে রাত্র বারটা পর্যন্ত ছায়ার মত লেগে আছি লোকটির পিছনে। লোকটির ছোটো খাট সব দোষত্রুটি এখন আমাদের নখদর্পে। কোন সময় সে কি করবে, তাও প্রায় মুখস্থ। এই যেমন একটু অসস্তিতে পড়লেই লোকটি বৃড়ো আঙ্গুল মুখে দিয়ে শিশুদের মতো চুষতে থাকে। লুকিয়ে নামাজ পড়ার প্রতি আগ্রহ বেশি। সে সময় নামাজে দাঁড়িয়ে খুব কান্না করে। কখনো দাঁড়িয়ে প্রশাব করে না। খুবই সাদামাঠা আর ধার্মিক একটা লোক এই আরাফাত মন্ডল। অন্তত এখন পর্যন্ত আমাদের গবেষণায় তাই মনে হচ্ছে।<br />
তারপরও সরকারের উপর মহল বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী নিজে এ লোকটি সম্পর্কে যাবতীয় তথ্য চাচ্ছেন। কেন বা কি জন্যে তা জানার অধিকার আমাদের নেই। আমরা গোয়েন্দা বিভাগের দুই কর্মকর্তা আদাজল খেয়ে এই লোকটির পিছনে লেগে আছি। আমি কিরণ চৌধুরী ও আমার সহকর্মী মাহফুজা জেসমীন পালা করে লোকটিকে পাহাড়া দিচ্ছি। অথচ লোকটি এতই সাদামাঠা যে সে একবারের জন্যও তা টের পাচ্ছেন না। আসলে তার মতো এতটা সাধারণ একটা মানুষের পিছনে যে কোনো নজরদারী হতে পাওে, এটা যে শুনবে সে-ই হাসবে। তাকে নিয়ে আমাদের নিজেদের মধ্যেই এ নিয়ে কম হাসি ঠাট্টা হচ্ছে না।<br />
জেসমীন বলেন, এটা একটা ছাগল টাইপের লোক। আর ছাগল টাইপের লোকরা বোকা আর সৎ মানুষ হয়। এর পিছনে আমরা অযথা সময় নষ্ট করছি। প্রধানমন্ত্রীর আসলে বুদ্ধিলোপ পেয়েছে। যুদ্ধেও পওে জন্ম তাই এ লোকটাকে আর যা-ই হোক রাজাকার বানাতে পারবেনা, তবে জামায়াত শিবির বানানো যেতে পারে। কিন্তু সেক্ষেত্রে আবার আওয়ামী লীগের অনেক বড় নেতা ফেঁসে যাবেন এ লোকটির সাথে ভালো সম্পর্ক থাকার কারণে। অবশ্য যে প্রধানমন্ত্রী নারায়ণগঞ্জের গডফাদার খ্যাত শামীম ওসমানের পক্ষে এভাবে ওপেন দাঁড়িয়ে সংসদে কথা বলেন, তার মতো মানুষের কাছে এর চেয়ে বেশি আর কি আশা করা যায়?<br />
জেসমীনের কথায় আমি ভড়কে গেলাম, দ্রুত তার মুখে হাত চাঁপা দিলাম। কী যাতা বলছেন, চাকুরীটা হারাতে চান নাকি? অযথা কোথায়? সরকার তো এ জন্য আমাদের বেতন দিচ্ছে ম্যাম। আমার কথা শুনে রাসভারী চেহারার জেসমীন গম্ভীর হলেন। হুম। কিন্তু একটা বিষয় লক্ষ্য করেছেন স্যার?<br />
কি বিষয়?<br />
এই যে লোকটার লাইফটা তো একটা ফুটো শিকের মতো। না নিজের উপকারে আসছে না অন্যের উপকারে আসছে। ছেলে মেয়ে নেই, আতকুরা। বংশের বাতি কে দেবে? বউয়ের কষ্ট উপার্জিত টাকায় খাচ্ছে, ঘুমাচ্ছে আর ঘুরে বেড়াচ্ছে। এই বেচেঁ থাকায় কি লাভ? অথচ দেখেন, লোকটার এ নিয়ে কোনো টেনশনই নেই। দিব্বি শোয়া মাত্রই নাক টেনে ঘুম। এভাবে নিশ্চিন্ত ঘুম কত দিন ঘুমাইনা আমরা? এই একটা জায়গায় লোকটাকে খুব হিংসে হয় আমার।</p>
<p>কেন? আপনার এটা কেন মনে হচ্ছে, এটা একটা আন্ডার কভার বা খোলশও হতে পারে তাই না? তাছাড়া সে কারো ক্ষতিতো করছেনা। আর এই যে বললেন, বউয়ের উপার্জিত টাকায় সে খাচ্ছে আর ঘুমাচ্ছে এটাও তো ঠিক বলেননি। খাচ্ছে বটে, সে কিন্তু ঘুমাচ্ছে না। দেখছেন না, দেশের জন্য, মানুষের মঙ্গলের জন্য তার চিন্তা, তার চেষ্টা চলছে। নিজে কোনো অপরাধ করছেন না বরং অন্যায় দেখলেই প্রতিবাদ করছেন। এই প্রতিবাদ করাটা কি কোনো কাজ না? এটা ক’জনে করছে ম্যাডাম বলুন। আমার তো মনে হচ্ছে এই লোকটা সাধারণ কেউ নয়। তা না হলে প্রধানমন্ত্রী কেন তাঁর প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছেন?<br />
আমার কথা শুনে জেসমীন হাসিতে ফেটে পড়লেন। আপনার এখনো কি এটা মনে হচ্ছে যে, এই গবেটটা কোনো বিদেশী গোয়েন্দা সংস্থার গোপন এজেন্ট কিম্বা জামাত-শিবিরের ক্যাডার? আপনি মাসুদ রানা আর জেমস বন্ড পড়া বন্ধ করুন। আপনার মেয়েটাও কিন্তু মাসুদ রানার পোকা হচ্ছে।<br />
হাঁঃ আমার মেয়েটা মাসুদ রানার পোকা হচ্ছে এটা যেমন ঠিক, তমনি সে তার মায়ের মতই ভীষণ দুষ্ট আর কৌশলী হচ্ছে এটাও ঠিক।<br />
কী বললেন, তার মা বুঝি ভীষণ দুষ্ট? বলেই আমাকে মারার জন্য তেড়ে এলেন জেসমীন। আমি তার হাত চেপে ধরে বুকে জড়িয়ে নিলাম। জেসমীন আমার স্ত্রী। আমরা একসাথে কাজ করছি একই বিভাগে। তাই এ কাজটির দায়িত্বও আমরা পেয়েছি নজরদারীতে সুবিধা হবে বিবেচনায়। হচ্ছেও, আমরা নজরদারীর সময়টাকে তিনভাগে ভাগ করে নিয়েছি। সকাল থেকে বেলা ১২টা পর্যন্ত আমি লোকটিকে অনুসরণ করছি। অনুসরণ করতে খুব একটা কষ্টও হচ্ছে না। লোকটির ফোনে আগেই আড়িপাতা যন্ত্র লাগিয়ে রেখেছি। ঘরে মাত্র দুটি রুম, দুটি রুমেই রয়েছে লুকানো ভিডিও ক্যামেরা, বাথরুমেও রয়েছে একটি। রান্নাঘরে লাগাতে হয়নি, কারণ রুম থেকেই রান্নাঘর কভার হচ্ছে। লোকটির প্রতিটি কার্যক্রম আমরা ইচ্ছে করলেই দেখতে ও শুনতে পারি আর আমরা তা করিও, তবে রাত বারটার পর আর নজর রাখি না। দুপুর ১২টার পর জেসমীন নজর রাখে সন্ধ্যা পর্যন্ত। সন্ধ্যার পর রাত ১০টা পর্যন্ত আবার আমার পালা।<br />
এতে করে সুবিধা অনেক। আমাদের মেয়ে প্রান্ত এখন মাত্র ১১ বছর বয়স। বেশির ভাগ সময়টা সে তার নানীর কাছেই থাকে। তাই মেয়েকে নিয়ে আমাদের খুব একটা ভীত থাকতে হয় না। তারপরও মেয়েকে সময় দেয়ার একটা বিষয় থাকে, যা এই নজরদারীর ফাঁকে আমরা খুবই চমৎকার ভাবে দিতে পারছি। প্রথমদিকে রাত বারটা পর্যন্ত নজরদারী করতে হতে। অথচ মজার বিষয় হচ্ছে এই লোকটি আরাফাত মন্ডল রাত্র ৯টার পর কখনোই ঘরের বাইরে থাকে না। তার চেয়েও আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে হাতে গোনা মাত্র দুতিনজন বন্ধু তার। যাদের সাথে সে কিছুটা সময় কাটায়। তাও ফুটপাতের চা দোকানে। দুটো মাত্র বাঁজে অভ্যাস আবিস্কার করা গেছে এই তিনমাসে। এর একটা হচ্ছে ধুমপান করা। তবে খুব বেশি না দিনে ৭/৮টি সিগারেট ধ্বংস করে সে। কিন্তু অন্যটি খুবই স্পর্শকাতর আর এটা বলা একটু লজ্জাজনক। তবুও বলতেই হবে কারণ লোকটির খুটিনাটি সবই রিপোর্ট করতে হচ্ছে আমাদের, এমনকি তার এবং স্ত্রীটির মধ্যের সম্পর্কটুকুও। সব বাঁজে অভ্যাসগুলোও নোট করতে হবে। লোকটির এই ২য় বাজে অভ্যাসটি প্রথম লক্ষ করে জেসমীন। আমাকে দেখাতে যেয়ে ওর চোখ, কান, মুখ লজ্জায় লাল হয়েছিল। সে সাথে লোকটির উপর তীব্র ঘৃণা কাজ করছিল ওর মনে। বিবাহিত একটা লোক, যার ঘরে সুন্দরী স্ত্রী রয়েছে। স্ত্রীর সাথে যার সম্পর্ক খুবই চমৎকার এবং গভীর ভালবাসার বন্ধন স্পষ্ট, সেই লোকটি কেন বাথরুমে হস্তমৌথন করছিল? বিষয়টি প্রথম আমাদের কাছে খুবই রহস্যময় ছিল। বাথরুমে ভিডিও ক্যামেরা লাগানো থাকায় এ বাজে বিষয়টি আমাদের নজরে পরেছে। তানা হলে এ দিকটা জানাই হতো না। আমরা দেখলাম, সপ্তাহে একবার লোকটি এই জঘণ্য কাজটি করছে।</p>
<p>দুই<br />
জেসমীনের সমস্ত চিন্তা এখন এই গবেট আরাফাত মন্ডলকে নিয়ে। কেন লোকটি ঐ জঘণ্য কাজটি কওে তার উত্তর খুজে বের কওে আমরা আরো হতভম্ব হয়ে পড়লাম। তার জীবন সম্পর্কে জেনে এখন আর ঘৃণা নয়, মায়া হচ্ছে। সে সাথে একটা মমত্ব অনুভব করছি আমরা দুজনেই। বলতে দ্বিধা নেই যে, কিছু কিছু বিষয়ে এই গবেট লোকটি এখন আমাদের গুরু হয়ে উঠছেন। আমরা আঢ়ালে আরাফাতকে গবেট বলছি, রামছাগল বলছি বটে কিন্তু মনে মনে ক্রমশ শ্রদ্ধা আর সম্মান বেড়েই চলছে। আমার সাথে একটু কথা কাটাকাটি হলেই জেসমীনতো এখন রীতিমত লোকটিকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরে বলে, দেখেছ ওই লোকটি তার বউকে কত ভালবাসে?<br />
আমি তখন জেসমীনকে ক্ষেপাতে বলি, ওরকম বউয়ের পয়সায় ঘরে বসে খাওয়ার সুযোগ পেলে আমিও বউকে খুব ভালবাসতাম। খাওয়াবে?<br />
জেসমীন তখন বলেই ফেলেলো, তার মত পারবে? বউয়ের কোনোরকম শারীরিক সম্পর্কের সক্ষমতা নেই, এটা জেনেও অন্য মেয়ের কাছে না যেয়ে শুধু বউকে ভালোবাসতে পারবে, তবে খাওয়াবো।<br />
হাঁ তাই। বিষয়টা জেসমীনই প্রথম আবিস্কার করে। বাথরুমে লাগানো ভিডিও ক্যামেরায় ধরা পরল বিষয়টি। লোকটির স্ত্রী গোসল করছিল। তখনই চিৎকার করে ওঠে জেসমীন। আমরা দুজনে কম্পিউটার স্ক্রীনে দেখতে পাই ব্রেস্টবিহীন একজন নারীকে। কৌতুহল থেকেই আমরা তার অতীত ঘাটার চেষ্টা করি ও জানতে পারি আরো কঠিন সত্যকে। আরাফাত মন্ডল এর স্ত্রী খুবই সুন্দরী, ভালো প্রতিষ্ঠানে চাকুরীও করছেন বটে তবে তার শরীরে দুটি প্রধান আকর্ষণই অকেজো। ব্রেস্ট ক্যানসার এর ফলে তার দুটো ব্রেস্ট কেটে শরীর থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। জরায়ু পথও প্রায় বন্ধ। কেমোথেরাপি নষ্ট করে দিয়েছে বাচ্চাদানী। এই অবস্থায় স্ত্রী’র সেবা করতে যেয়ে ভালো পদের চাকুরী ছেড়ে ঘরে আশ্রয় নিয়েছেন আরাফাত মন্ডল। মাঝে মধ্যে পত্রিকায় দু’চারটি কলাম লেখাই এখন তার একমাত্র কাজ। তার যে বয়স সে অনুপাতে এখন আর কাজের জন্য মানুষের কাছে ধর্ণা দেয়ার মতো ধৈর্য্য বা সাহস কোনোটাই তার নেই।<br />
সৎ মানুষ বলেই হয়ত অনেকটা ঘাঢ়তেড়া স্বভাব তার। গত তিনমাসে তার পিছনে ঘুরে এটা পরিস্কার বুঝতে পারছি যে এ লোকটি মুখে যা বলে, কাজে কর্মেও তার প্রকাশ থাকে। এলাকা বা আশেপাশের প্রতিবেশী তার কাছে কোনো পাওনা নেই। কোনো দোকানে সে বাকী করেনা। বন্ধুদের দুজন তার কাছে মোটা অংকের কিছু টাকা পায় বটে, তবে সে টাকার দাবিতে কোনো বন্ধু কখনো ঘরে আসবে না। এটা টাকাটা নেয়ার আগেই শর্ত দিয়ে রেখেছে। বন্ধুরাও তার প্রতি খুব উদার, তাই এই কঠিন শর্ত জেনে বুঝেই অনেকটা জোর করে টাকা ধার দিয়েছে তাকে।<br />
মাঝে মধ্যেই দেশের রাজনীতি লোকটিকে অস্থির করে তোলে। বিএনপি, আওয়ামীলীগ দুটো দলের কোনোটাকেই তার পছন্দ নয়। নতুন একটি রাজনৈতিক দল তৈরির জন্য বিশিষ্টজনদের কাছে চিঠি দিয়ে এখন কান্ত হয়ে নিজেই একটি দল তৈরি করবে বলে ফেসবুকে ঘোষণা দিয়ে বেড়াচ্ছে।<br />
আসলে কাজ না থাকলে যা হয়। কয়েকদিন আগে সে একা একা বাজারে গিয়ে দোকানদারদের বুঝাতে চেষ্টা করেছে, কেউ ওজনে কম দেবেন না। খবরদার, সামনে রমজান মাস। রমজান মাস হচ্ছে ক্ষমা আর রহমতের মাস। এই মাসে ভুলেও কোনো ক্রেতাকে ঠকাবেন না। তাহলে কিন্তু আপনি আর মুসলমান থাকবেন না। কাফের হয়ে যাবেন। লোকটির এই আচারণ দেখেই জেসমীন লোকটিকে গবেট উপাধী দিয়েছে।<br />
ওর মতে, যেখানে তুমি পত্র পত্রিকায় লিখতে পারছো, সেখানে কেন এভাবে স্বশরীরে যেয়ে বুঝাতে চেষ্টা করছো। লোকেতো তোমাকে অপমান করছে। তোমাকে নিয়ে হাসছে।<br />
আমি বললাম, হাসছে, তবে দেখ দু’চারজনতো ভাবছেও। এটাতো সত্যি যে রোজা রেখে কেউ মিথ্যা বললে বা কোনো অন্যায় করলে তার রোজা রাখার কোনো দরকার নেই। এটা তো পবিত্র কোরআনেই লেখা আছে, তাই না?<br />
হাঁ লেখা আছে। মসজিদের ঈমাম সাহেবরাতো এ জন্য আছেন। তারা খুতবায় এ সব বলছেনও। এই পাগলটার কি দরকার এই ঝামেলায় যাওয়ার, জামাত শিবির বলে সন্দেহ করছে অনেকে। আমারতো মনে হচ্ছে এই জন্য ই আমরা লোকটার উপর নজর রাখছি। তাঁর লেখাগুলো পড়েছেন? ব্লগ ও পত্রিকায় তার সব লেখাই তো সরকার আর বিরোধী দলের বিরুদ্ধে যাচ্ছে। তারউপর নতুন রাজনৈতিক দলের প্রস্তাব। ঠিক যখন জামাত শিবির নিষিদ্ধ নাটক চলছে তখন তার এ সব লেখনী ও দল গঠনের চেষ্টাটা তাকে সন্দেহের তালিকায় ফেলতে পারে।<br />
জেসমীনের রাগাম্বিত বক্তব্য অনেকটা আমাকে আহত করলো। ও এমনভাবে কথাগুলো বলছে যেন, আমি নই, ওই লোকটি ওর স্বামী। আসলে লোকটার অনুসরণ করতে করতে আমরা তাকে ভালবাসতে শুরু করেছি। বিশেষ করে শবেবরাতের রাতে সে যখন তার পাড়ার মসজিদের ঈমাম সাহেবকে ডেকে কথা বলছিলেন, তখন আমি তার পাশেই দাঁড়ানো। আরাফাত সাহেব ঈমাম সাহেবকে সালাম জানিয়ে, খুবই বিনয়ের সাথে বললেন, মাপ করবেন হুজুর, আমার কথায় অপরাধ নেবেন না, যদি ভুল বলি ক্ষমা করবেন। আজ দয়া করে দান করার ফজিলত নিয়ে খুব বেশি কথা বলবেন না। বরং মসজিদের দানের টাকাটা যেন অসৎ আয়ের না হয়, এই দানের টাকায় কীভাবে মানুষের উপকার করা যায়, এই নিয়ে কিছু বলবেন। আর যদি পারেন, রমজানের জন্য মসজিদে একটা যুবকমিটি করে ফেলুন, যারা রমজান মাসে সেবার কাজ করবে, বাজারে ক্রেতা যেন না ঠকে তা নজরদারী করবে, ইফতার বিলি করবে। এ জন্য আলাদা একটা দান বাক্স করুন। মানুষ তার নিজের ভালোর জন্য দান করবে। জোর করে চেয়ে, লজ্জা দিয়ে নেয়া টাকা কখনো দান হয় না। এটা আমার চেয়ে আপনি ভালো জানেন।<br />
সব শুনে ঈমাম সাহেব বললেন, আমি সব জানি আরাফাত সাহেব, কিন্তু মসজিদ কমিটির হুকুম যে আমাকে মানতে হয়। তবুও আমি চেষ্টা করবো।<br />
এ ঘটনার কয়েকদিন পরেই রমজানের শুরু হল। পরিপক্ক রোজদার আরাফাত সাহেবকে দেখে আমিও এই প্রথম রোজা রাখার চেষ্টা করছি। ধর্ম বিষয়ে জেসমীনের জ্ঞান আমার তুলনায় অনেক বেশি। রোজা আর নামাজ সে কখনো কাঁজা করে না। জেসমীনের মতে, আরাফাত সাহেব একজন সত্যিকারের রোজদার। রোজার সব চেয়ে বড় যে বিষয় নিজের ইচ্ছের নিয়ন্ত্রণ, তা এই আরাফাত সাহেবই করছেন। লোকটির মধ্যে কোনো লোভ, লালসা, অন্য কোনো অন্যায় প্রবণতা আজ পর্যন্ত ধরা পরেনি।<br />
আমিও বিষয়টি খেয়াল করলাম যে, চার রোজা গত হয়েছে, লোকটি এখন কথা বলা অনেক কমিয়ে দিয়েছে। একটা মিথ্যে কথা বা অন্যায় কোনো কাজ সে করেনি। তবে তারাবির নামাজে সে ফাঁকি দিচ্ছে দেখলাম। প্রথম দুইদিন পুরো তারাবির নামাজই সে পরেছে জামাতে। তৃতীয়দিন সে অর্ধেক পরে বের হয়ে এল। চতুর্থদিন তারাবী না পরেই চলে গেল ঘরে। বিষয়টা জেসমীনকে জানাতে সে যা ব্যাখ্যা দিল তাতে আর অভিযোগ করার কিছু পেলাম না। জেসমীন আমাক বুখারী শরীফ থেকে নবীজীর তারাবী আদায়ের বিষয়টি পড়ে শোনালেন, নবীজী প্রথম দুদিন জামাতে পরেছেন। পরবর্তীতে তিনি আর জামাতে না পরিয়ে একা একা পরেছেন বলে উল্লেখ আছে বুখারী শরীফে। তখন এ নিয়ে একজন সাহাবী প্রশ্ন করায় নবীজী তাকে বলেছেন, এটা যেন তোমাদেও উপর ফরজ না হয়ে যায়, তাই আমি জামাতে আর তারাবি পড়ছিনা।<br />
আরাফাত সাহেবের ঘরে ইফতারের সময়টা খুবই আনন্দের সময় যেন। মিসেস আরাফাত অফিস থেকে ফেরেন ৫টার দিকে। এসেই শুরু হয় ইফতার তৈরির তোড়জোড়। না খুব ব্যয়বহুল কিছু নয়, তাদেও ইফতারের আইটেম ছোলাবুট, পিয়াজু ও আলুরচপের সাথে খেজুর আর শরবত। কখনো পিয়জু ও ছোলা বুটের বদলে চিড়াদই ও ফল। তাদের স্বামী স্ত্রীর এতো মধুর সম্পর্ক যে, তারা এখনো এক পেলেটে খাবার খাচ্ছে। এক গ্লাসে শরবত খাচ্ছে ও একে অপরকে খাইয়ে দিচ্ছে। যা দেখে জেসমীনও আমার কাছে সেটাই আশা করছে। এতে আমি একটু ক্ষুব্দও হচ্ছি। তবে জেসমীনের আমার ভালবাসার বন্ধনও কম নয়। মাত্র একহাজার এক টাকা কাবিনে আমাদের বিয়ে হয়েছে। আমাদের পরস্পরের প্রতি গভীর বিশ্বাসই আমাদের ভালবাসা।</p>
<p>তিন<br />
রোজার অষ্টমদিন দুপুরে হঠাৎ জেসমীনের ফোন। এই যে স্যার আপনার মহামানব আরাফাত একটা ঘটিয়া আর ভন্ড লোক, দেখবেন যদি তাড়াতাড়ি আসেন। জেসমীনের কণ্ঠ বলে দিচ্ছে মারাত্মক কোনো অপরাধ এবার ধরা পড়েছে। রোজার কারণে লোকটির গুষ্টি উদ্ধার করা বাঁজে গালি শোনা থেকে বেচে গেলাম বটে তবে গালিগুলো যে এই মূহুর্তে জেসমীনের পেটে ঘুরপাক খাচ্ছে তাও স্পষ্ট টের পেলাম।<br />
কেন কি হয়েছে? কি করেছে সে? বলতে বলতে আমি বাইক চালিয়ে ছুটে এলাম জেসমীনের কাছে। মাত্র দু’ঘণ্টা আগে জেসমীন ডিউটিতে এসেছে। আরাফাত তখন ঘরেই অনলাইনের পত্রিকা নিয়ে ব্যস্ত ছিল। আরাফাতের ঘরটি ঢাকার শেষ সীমানায়ও বলা যায়। মীরপুরের কালশী রোডের একটি বাড়িতে দুইরুম নিয়ে স্বামী স্ত্রীর থাকা। সাদামাঠা জীবন যাপন যাকে বলা যায় আর কি।<br />
কিন্তু এই মূহুর্তে আমি এসে থামলাম নয়াপল্টনের একটি হোটেলের নীচে। এখানের একটা পত্রিকার দোকানে দাঁড়িয়ে পত্রিকা পড়ার ভান করছে জেসমীন। পাশে দাঁড়াতেই সে আমার হাত ধরে নিয়ে চলল আরো দূরে যেখানে আমাদের কথা কেউ শুনতে পাবে না। জেসমীনের শরীর রাগে কাঁপছে। যেন আরাফাত সাহেব নয়, আমিই মস্ত অপরাধী। কী হয়েছে আরাফাত সাহেব কোথায়?<br />
ইশারায় পাশেই ধানসিড়ি নামের হোটেলটি দেখালো, বলল সে আজ রোজা নেই। গোগ্রাসে তুন্দল আর গুরুর মাংস খাচ্ছে। পরপর তিনবার ঐ হোটেলটায় ঢোকার চেষ্টা করেছে। আবার ঘুরে চলে এসেছে। এখন খাচ্ছে। ইশারায় জেসমীন যে হোটেলটা দেখালো, সেটাকে আমরা গোয়েন্দা বিভাগের সবাই চিনি। এ হোটেলে দেহজীবীদের বসবাস আছে। আরাফাত সাহেব সেখানে যাবার চেষ্টা করছেন শুনে আমি মৃদু হাসলাম।<br />
আমার হাসি দেখে জেসমীনের পিত্তি বুঝি আরো জ্বলে উঠলো, খুবই ক্ষীপ্ত স্বরে বলল, হাসছো কেন? তুমিও কি তবে&#8230;?<br />
জেসমীনের কথা শেষ হয়নি, এর মধ্যেই খাবার হোটেল থেকে আরাফাত বের হয়ে এসেছেন। সোজা হাটা ধরেছেন নির্দিষ্ট ঐ হোটেলের দিকে। ইশারায় জেসমীনকে দাঁড়াতে বলে আমি চললাম পিছনে পিছনে। আরাফাত সোজা ঢুকে গেলেন ভিতরে, হোটেল বয়কে ডেকে বাথরুম কোথায় জানতে চাইলেন, তারপর সোজা ঢুকে গেলেন বাথরুমে। বয়টা আমাকে দেখে এগিয়ে আসতে চাইল, ওকে চোখ পাকালাম, তারপর বসে পড়ে একটা পেপার হাতে নিয়ে পড়ার ভান করছি। এখানে রিসিপশনে বসে এই হোটেলের কিছুই বোঝা যাবে না। মেয়েরা থাকে ৩য় ও চতুর্থ তলায়। বাথরুম থেকে অনেকটা সময় পর বের হলেন আরাফাত। সোজা উঠে গেলেন তৃতীয় তলায়, আমিও অনুসরণ করলাম। তারপরই থমকে গেলাম। কারণ থমকে গেছেন আরাফাত নিজেও। তার সামনেই একসাথে কাতার বদ্ধ হয়ে চারজন দেহজীবী মেয়ে নামাজ আদায় করছেন। আর এটা দেখেই থমকে গেছেন আরাফাত। তার মুখ কালো হলো, পরক্ষণে ইয়া আল্লাহ, ক্ষমা করুন বলেই আমাকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে নীচে নামতে গেলেন, আমার হাত ধরে বললেন, দোহাই দাদা, এই রোজার মাসে ওদের কাছে আসবেন না। ওরাও তো আল্লাহর বান্দা। কথা শেষ না করেই ছুটে বের হয়ে গেলেন তিনি। যেন মহা কোনো শিক্ষা গ্রহণ করেছেন এমন একটা লজ্জা নিয়ে, নিজের গালে নিজেই মৃদু চড় দিতে দিতে একটি সিএনজি চালিত আটো রিকশায় চেপে বসলেন ভদ্রলোক।<br />
আমি আর জেসমীন আজ আর তাকে অনুসরণ না করে দুজনে চলে এলাম রমনা পার্কে। উপরে কি ঘটেছে তা সবটাই জেসমীনকে বললাম। আগের চেয়ে কিছুটা শান্ত জেসমীনের তাও একটাই প্রশ্ন আরাফাত কেন এখানে এলেন? কেন আসবেন? যেন আরাফাত নয়, এটা আমি করেছি। ওর প্রশ্ন গুলো যেন আমার জন্য।<br />
আমি ব্যাখ্যা দিলাম। গত ক’দিন থেকে তার শরীরে কিছু সমস্য তৈরি হয়েছে। অতিরিক্ত হস্তমৈথনের ফলে এটা হচ্ছে বলে তার এক ডাক্তার বন্ধু তাকে সাবধান করে দিয়েছেন। আমার সামনেই ঐ বন্ধু তাকে এই হোটেলের ঠিকানা দিয়েছিল। তাদের সব কথাবার্তা আমি শুনেছি, কেন কি ঘটছে তা আমি আগেই বুঝতে পেরেছিলাম বলে তখন হেসেছিলাম। জীবনে কখনো এসব হোটেলে আসেনি লোকটা, তাই আজ এসে সে প্রথমে সাহস সঞ্চয় করতে পারেনি। পরে ভরপেট খেয়ে সত্যি সত্যি তার বাথরুমের বেগ পেয়েছিল। তাই টয়লেটের খোঁজে খুব সহজেই সে ভিতরে প্রবেশ করতে পেরেছে।<br />
কিন্তু জেসমীনের তবুও একটাই প্রশ্ন সে কেনো আজ রোজা ছিল না? রাতেতো তাকে সিহরীভাত খেতে ও ফজরের নামাজ পড়তে দেখলাম।<br />
এবারও আমি হেসে ফেললাম, ওহ্ তোমার রাগের মূল কারণ তাহলে এই যে, সে কেন রোজা ভাঙ্গলো। চল বাসায় চল, তোমাকে দেখাচ্ছি।<br />
রমনা থেকে রাজারবাগ পুলিশ লাইনে আমাদের বাসায় আসতে খুব সময় লাগেনি। জেসমীনকে সকাল নটার পরের ভিডিও ফুটেজ দেখতে দিয়ে আমি গোসলের জন্য গেলাম। জানি বিষয়টা দেখে জেসমীন আবার লজ্জাপাবে। সেসময় আমি সামনে না থাকাই উত্তম।<br />
আরাফাত সাহেব ফজরের নামাজের পর ঘুমিয়ে পড়েন। ঠিক নটায় তার স্ত্রী অফিসে যাবার জন্য তৈরি হচ্ছিলেন হঠাৎ তার চোখ আটকে যায় বিছানায় ঘুমে বিভোর স্বামীর শরীরে। লুঙ্গি ঠেলে সটান দাঁড়িয়ে থাকা অঙ্গটা তার দৃষ্টি কাড়ে। অনেকখন তাকিয়ে সেটা দেখেন তার চোখে জল। ঝুঁকে কাপড়ের উপর দিয়েই অঙ্গটিতে চুমু খান তিনি। মূহুর্তে ঘুম ভেঙ্গে যায় আরাফাত সাহেবের। স্ত্রীকে জড়িয়ে তুলে নেন বুকের উপর। কি ব্যাপার কাঁদছো কেন? স্ত্রীর চোখের জল মুছে দিতে দিতে হাত দিয়ে কাপড় ঠিক করেন তিনি।<br />
তোমার ওটার যে খাবার দরকার। আমি দিতে পারছিনা, তুমি বাইরে কোথাও ব্যবস্থা নিতে পার না?<br />
দূর পাগলী, ওটার জন্য বাথরুম আছে। বেশি খাবার দরকার হলে হাত দিয়ে চালিয়ে দেব। যাও সোনা, অফিসে যাও, এ নিয়ে ভেব না।<br />
স্ত্রীটি উঠে অফিসে চলে যায়, দরজা বন্ধ করে দিয়ে আবার ঘুমিয়ে পরেন আরাফাত। কিছুক্ষণ পরই ধরমড়িয়ে লাফিয়ে ওঠেন। লুঙ্গিটা টেনে দেখেন নির্দিষ্ট জায়গাটা ভিজে গেছে। অর্থাৎ ধাতু নির্গত হয়েছে। দ্রুত বাথরুমে যান তিনি। আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, দিলেতো আমার রোজাটা ভেঙ্গে। আজ এটাকে কিছু একটা খাবার দিতেই হবে। দেখি কি করা যায়।</p>
<p><strong>চার (শেষ পর্ব)</strong><br />
এই ঘটনার অল্পদিনের মধ্যেই আরাফাত সাহেবের সাথে আমার খুব ভালো বন্ধুত্ব হয়ে গেল। প্রতিদিন সন্ধ্যার পর সে যেই চা দোকানটায় আড্ডা দেয়, সেখানে চা খেতে যেতেই আরাফাত সাহেব আমাকে দেখে এগিয়ে আসেন ও পল্টনের সেই হোটেলে আমাকে বাধা দেবার কথা স্মরণ করিয়ে নিজেই তার পরিচয় দেন। আমরা একসাথে চা খাই। আলাপের শুরুটা এভাবে হলেও মাঝখানে খুব খারাপ হয়েছিল। কারণ, শবে কদরের রাতে একটা সাদা মাইক্রোতে করে আমরা ঘুরতে যাবার নাম করে আরাফাত সাহেবকে তুলে নিয়ে গিয়েছিলাম। তাকে সোজা নিয়ে যাই প্রধানমন্ত্রীর নিজস্ব বাংলোয়। ইতিপূর্বেই তার সম্পর্কে বিস্তারিত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নিজেই পড়েছেন সব। পড়ে খুব কেঁদেছেন আবার লজ্জাও পেয়েছেন। স্পেশাল ব্রাঞ্চের চীফ অব কমিশনার এসপি মান্নান সাহেব প্রধানমন্ত্রীর নিজস্ব লোক। সম্পর্কে তিনি আমারও মামা শ্বশুর। অর্থাৎ জেসমীনের মামা। তাই আমি আর জেসমীন এ সময় উপস্থিত ছিলাম। আমাদের সম্মুখেই প্রধানমন্ত্রী তাকে ধরে আনার আদেশ দিলেন। তার আদেশের ধরণটা আমরা উত্তেজনায় লক্ষ করিনি। করলে সতর্ক হতাম। তিনি বলেছিলেন, বাদর টাকে ধরে আন এক্ষুনি। আমরা ধরে আনলাম অনেকটা আসামীর মত করে। কেন কি জন্যে তা বুঝতে না পেরেই আমাদের এই আচারণটি পরবর্তীতে আমাকে খুব লজ্জায় ফেলেছিল। আর এ জন্য বারবার ক্ষমা চাইতে গিয়ে আরাফাতের উল্টো ধমক খেতে হয়েছে।<br />
কেননা, আরাফাত সাহেবকে দেখেই প্রধানমন্ত্রী তাকে জড়িয়ে ধরে প্রচন্ড ভৎসনা ও গালাগাল দিতে শুরু করলেন যেন নিজের ছেলেকে বকছেন। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য অনেকটা এমন যে, কত লোক কতভাবে আমার থেকে সুবিধা নিচ্ছে, সাত-পাঁচ বুঝিয়ে দেশের অর্থ লুটে নিতে আসছে। আর আমার ছেলে হয়ে তুমি একটা বস্তিতে পরে আছ? একবার আমার কাছে আসলে কি মহাভারত অশুদ্ধ হত? ভাগ্যিস তোমার বাংলাদেশ আমজনতা পার্টির দাবিগুলো আমার আমার ফেসবুক আইডিতে লিংক দিয়েছিলে, তাইতো খুঁজে পেলাম। এই সব বন্ধ কর, আমার প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ কর আজ থেকেই।<br />
শুনেতো আমাদের পিলে চমকে উঠলো। একী বলছেন প্রধানমন্ত্রী, এই আরাফাত তার ছেলে কি কওর হয়? পরে জানলাম, প্রধানমন্ত্রীর স্কুল জীবনের বান্ধবীর ছেলে এই আরাফাত সাহেব। যেই বান্ধবীকে তিনি নিজের আপন বোন বলে দাবী করেন। শিশুবেলা আরাফাত সাহেব প্রধাননমন্ত্রীর কোলে শিস্ও করেছেন। প্রধানমন্ত্রী দেশে এসেই আরাফাতের পরিবারের লোকদের সন্ধানে লোক লাগান। কিন্তু কেউ কোনো খোজ দিতে না পারায়, পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেই তিনি গোয়েন্দা সংস্থাকে নিযুক্ত করেন তাদের খুঁজে বের করতে। কিন্তু গোয়েন্দাদের কাছে পরিপূর্ণ তথ্য না থাকায়, তারাও ব্যর্থ হন। এমন সময় বাংলাদেশ আমজনতা পার্টি ও আরাফাত মণ্ডলের নামে অভিযোগ আসে গণজাগরণ মঞ্চ থেকে।  কে এই আরাফাত জানতে স্পেশাল ব্রাঞ্চকে দায়িত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। সরাসরি তার কাছেই রিপোর্ট করতে বললেন।<br />
সে যাক, কিন্তু আমাদের তাজ্জব করে দিয়ে আরাফাত সাহেব যা বললেন তা শুনে সকলেই থ’ বনে গেলাম, সেজন্য না প্রধানমন্ত্রী প্রস্তুত ছিলেন, না আমরা কেউ। আরাফাত সাহেব বললেন, খালামনি, আমি তোমার প্রধান উপদেষ্টা হতে পারবো যদি তুমি এই মূহুর্তে দেশের শাসন ব্যবস্থায় কিছু জরুরী সংশোধনী এনে নিজে আগে পদত্যাগ কর।<br />
প্রথম পরিবর্তন আনো তোমার রাষ্ট্রীয় যাবতীয় আইন শৃঙ্খলাতে। পবিত্র কোরআন অনুসারে আদালত ও পুলিশী আইন কার্যকর কর। চুরি করলে হাত কেটে দেবে, ঘুষ, দুর্নীতি, খুন, ধর্ষণ ইত্যাদি প্রমাণ হলেই মৃত্যুদ্বন্ড।<br />
দ্বীতিয়ত, পরপর দুইবারের বেশি কেউ একই পদে কখনো থাকতে পারবে না। তুমিও না। দলের চেয়ে দেশ বড় এ মন্ত্রে চলতে হবে প্রতিটি নাগরিককে। তাই এই মূহুর্তে স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গঠন করে, আগামি তিনমাসের মধ্যে নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়ে তুমি পদত্যাগ কর। তবেই আমি তোমার উপদেষ্টা হতে পারবো। যদিও তখন আর তোমার কোনো উপদেষ্টারই প্রয়োজন হবে না। কারণ নিয়ম অনুযায়ি তুমি আর কোনোদিনই প্রধানমন্ত্রী বা দলীয় প্রধান হতে পারবে না। আমি বরং তোমার ছেলের উপদেষ্টা হব তখন। কথাগুলো বলেই আরাফাত সাহেব প্রধানমন্ত্রীর কক্ষ থেকে বের হয়ে গেলেন। ইশারা পেয়ে আমরাও তার পিছু নিলাম। মাইক্রোতে করে তাকে পৌঁছে দিলাম তার ঘরে। ঘরের সব আড়িপাতা যন্ত্র ছড়িয়ে নিলাম। সহকর্মীরা সবাই বিদায় নিলে আমি আনন্দে আরাফাত সাহেবকে জড়িয়ে ধরলাম।<br />
দু ‘দিন পরে চীফ অব কমিশনার থেকে জানলাম, আরাফাত সাহেবের কথাগুলো প্রধানমন্ত্রীকে খুব ভাবনায় ফেলেছে, তিনি এ বিষয়ে জরুরী পরামর্শ সভা করেছেন বিশ্বস্ত কয়েকজনের সাথে। এতে সেনাপ্রধান, পুলিশ প্রধান ও দলীয় মাত্র দুইজন নেতা উপস্থিত ছিলেন। তারা সকলেই সুন্দর একটি দেশ তৈরি করতে হলে আরাফাত যা বলেছেন তা করার পক্ষে একমত দিয়েছেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী তার ছেলের ভবিষ্যত প্রসঙ্গ তুলে ১৫ই আগস্ট এর মত কোনো ঘটনা যেন আর না ঘটে সেই বিষয়ে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এ ক্ষেত্রেও সবাই পবিত্র কোরআনের আইনকে অনুসরণ করার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। বলেন, এতে করে হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রীস্টান সম্প্রদায়ের মানুষেরাও শান্তিতে বসবাস করতে পারবে। সবশেষে নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠনে করনীয় বিষয়ে আলোচনা হয়, এতে আরাফাত সাহেব-এর মতো আরো চারজন মানুষকে খুঁজে বের করার দায়িত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। যাদের হাতে নির্বাচন কমিশনকে ছেড়ে দিতে পারবেন তিনি।</p>
<p>স্বাধীন নির্বাচন কমিশনকে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়েই পদত্যাগ করতে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী। বন্ধু আরাফাতকে জড়িয়ে ধরে এ তথ্য জানাতেই তিনি বললেন, আলাহ প্রদানমন্ত্রীর হায়াৎ বাড়িয়ে দিন, তিনি যেন আগামী সুন্দর দিনগুলো আমাদের সাথে আনন্দে কাটাতে পারেন।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://shahittabazar.com/%e0%a6%b6%e0%a7%80%e0%a6%b7%e0%a7%8d/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>3</slash:comments>
		
		
			</item>
		<item>
		<title>যোগ বিয়োগের সিঁড়ি : মনি হায়দার</title>
		<link>https://shahittabazar.com/%e0%a6%af%e0%a7%8b%e0%a6%97-%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a7%9f%e0%a7%8b%e0%a6%97%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%b8%e0%a6%bf%e0%a6%81%e0%a7%9c%e0%a6%bf-%e0%a6%ae%e0%a6%a8%e0%a6%bf-%e0%a6%b9%e0%a6%be%e0%a7%9f/</link>
					<comments>https://shahittabazar.com/%e0%a6%af%e0%a7%8b%e0%a6%97-%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a7%9f%e0%a7%8b%e0%a6%97%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%b8%e0%a6%bf%e0%a6%81%e0%a7%9c%e0%a6%bf-%e0%a6%ae%e0%a6%a8%e0%a6%bf-%e0%a6%b9%e0%a6%be%e0%a7%9f/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[অতিথি লেখক]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 25 Jul 2014 10:24:50 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[গল্প]]></category>
		<category><![CDATA[সাহিত্য]]></category>
		<guid isPermaLink="false">http://shahittabazar.com/?p=2429</guid>

					<description><![CDATA[<p>যোগ বিয়োগের সিঁড়ি</p> <p>আমাকে সবচেয়ে ভালো কে চেনে? আমিই তো আমাকে সবচেয়ে ভালো চিনি, চেনার কথা। অথচ এখন আমিই আমাকে চিনতে পারছি না। কেমন এক অচেনা সড়কের অলি-গলিতে আমাকে চেনার</p><span><div class="readmore"><a href="https://shahittabazar.com/%e0%a6%af%e0%a7%8b%e0%a6%97-%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a7%9f%e0%a7%8b%e0%a6%97%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%b8%e0%a6%bf%e0%a6%81%e0%a7%9c%e0%a6%bf-%e0%a6%ae%e0%a6%a8%e0%a6%bf-%e0%a6%b9%e0%a6%be%e0%a7%9f/">...বিস্তারিত &#8594;</a></div>]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p><strong>যোগ বিয়োগের সিঁড়ি</strong></p>
<div id="attachment_2430" style="width: 219px" class="wp-caption alignleft"><a href="http://shahittabazar.com/wp-content/uploads/2014/07/SAM_3343.jpg"><img loading="lazy" decoding="async" aria-describedby="caption-attachment-2430" class="size-medium wp-image-2430" alt="SAM_3343" src="http://shahittabazar.com/wp-content/uploads/2014/07/SAM_3343-209x300.jpg" width="209" height="300" srcset="https://shahittabazar.com/wp-content/uploads/2014/07/SAM_3343-209x300.jpg 209w, https://shahittabazar.com/wp-content/uploads/2014/07/SAM_3343.jpg 488w" sizes="auto, (max-width: 209px) 100vw, 209px" /></a><p id="caption-attachment-2430" class="wp-caption-text">মনি হায়দার</p></div>
<p>আমাকে সবচেয়ে ভালো কে চেনে? আমিই তো আমাকে সবচেয়ে ভালো চিনি, চেনার কথা। অথচ এখন আমিই আমাকে চিনতে পারছি না। কেমন এক অচেনা সড়কের অলি-গলিতে আমাকে চেনার জন্য আমি হেঁটে মরছি। কেনো আমার আমাকে আমি চিনতে পারছি না! আমার মধ্যে কি হরমোনের কোনো বিষাক্ত বিক্রিয়া শুরু হয়েছে? চৈতন্যের পুকুরে কোনো খাদক মাছ সাঁতার কাটছে? আমার আমাকে আমূল গিলে ফেলছে?<br />
না, তেমন তো কিছুই না। স্বাভাবিক মানুষের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে আমি বিছানায় বসে আছি। কেবল বসে না, বসে বসে ভাবছি। আমার আমাকে আবিষ্কার করার চেষ্টা করছি। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত গলির মোড়ে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা মেরেছি। সাত-আটটা সিগারেট ফুঁকেছি আয়েশ করে। পাশের বাসায় মেয়েটির সঙ্গে সর্বশেষ চোখাচুখি নিয়ে কথা বলছি॥এ পর্যন্ত সবই ঠিক ছিল বা আছে। আসল গণ্ডগোলটা বাধলো রাতে বাসায় এসে। সন্ধ্যেয় একটা টিউশুনি ছিল, কাস এইটের একটা ছেলেকে পড়াই। পড়িয়ে বাসায় ফেরার পথে সান্টুর সঙ্গে দেখা।<br />
সান্টুকে মাস কয়েক আগে আইন-শৃ´খলা রাকারী বাহিনী ধরে নিয়ে গিয়েছিল। ওর বাবা-মা অনেক চেষ্টা চরিত্র করে  সান্টুকে জেলহাজত থেকে বাঁচিয়ে এনেছে। তারপরের দিন সান্টু এলাকা ছাড়া। ঘটনা কি? অনেক জল ঘোলা করে জানা যায়। সান্টুকে গ্রামে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে॥নিরাপত্তা হেফাজতে। সেই সান্টুকে আচমকা পেয়ে যাওয়ায় দু’একটা সুখ-দুঃখের কথা বলতে বলতে ইটালি হোটেলে পরপর তিন দু’গুণে ছ’কাপ চা পান করলাম। পা চান করতে করতে সান্টু এক সময়ে তেড়ছা চোখে আকাশের দিকে তাকায়। দেখেছিস মুন্না কতো বড় চাঁদ?<br />
আমিও তাকাই। সত্যিই তো বড় একটা চাঁদ। অনেক অনেক দিন পর চাঁদের আলতো ছোঁয়ায় মাখামাখি হয়ে বাসায় ফিরি। দরজা খুলতেই দেখি মার মুখে অবিশ্বাস্য মধুর হাসিÑএসেছিস? আয়,ভেতরে আয়।<br />
মনে হলো কোনো নাটকের দৃশ্য। পরে মনে হলো কোনো ভুল জায়গায় এলাম নাকি! গত কয়েক বছরে বাসায় এমন সম্মানজনক সমাদর বা অভ্যর্থনা পাইনি। সবসময় একটি অস্বস্তিকর চাপের মধ্যে থাকতে হয়েছে। প্রাণ খুলে বাসায় কেউ কথা বলে না আমার সঙ্গে। ব্যতিক্রম ছোট বোন ঝর্না। ঝর্না আমার কষ্ট বোঝে। ও এ বছর মেট্রিক দেবে। কিন্তু বুদ্ধি বিবেচনা এমএ পাসের মতো।<br />
বাপজান অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী মোহাম্মদ সেলিম আমাকে আপদ নামে ডাকেন। গত তিন বছর ধরে এমএ পাস করে বসে আছি, খাই দাই ঘুমাই কোনো কাজ করি না। সংসারে আমি আপদ হবো না তো কে হবে? আমার ছোট দু’দুটো ভাই পশ্চিমের দেশে থাকে। তারা মাসে মাসে দিনার পাঠায়। আমি বসে বসে দেখি। ভাইয়েরা প্রস্তাব দিয়েছিল। এদেশে যখন কিছু হবে না তাদের সঙ্গে পশ্চিমের দেশে যোগ দেওয়ার জন্য। কন্তু আমি এদেশে ছেড়ে কোথাও থাকতে পারবো না। জানালে বাসার মধ্যে পরিস্থিতিটা উল্টে যায়। আরে বাবা উল্টে যাওয়ার কি আছে! আমি তো মিথ্যা কিছু বলছি না। সত্যি কথাটা বলেছি। বিদেশে গেলে আমি দমবন্ধ হয়ে মারা যাবো, আমি তো আমাকে চিনি। ওই সব দেশে গেলে কি বাংলা ভাষায় প্রাণ খুলে আড্ডায় বসতে পারবো? দিন নাই রাতই ঢাকার উন্মুক্ত রাস্তায় ঘুরতে পারবো? সময় এবং সুযোগ পেলে সুবর্ণাদের বাসায় যেতে পারবো? সুতরাং আমি বিদেশে যাবো না। বাবা তো আমার সঙ্গে কথা বন্ধ করে দিলেন। মাও দেখলাম ক্রামগত দূরের মানুষ হয়ে যাচ্ছেন।<br />
কি আশ্চর্য। সবাই স্বার্থের নৌকায় চড়নদার। অথচ আজ মা আমাকে দেখে খুশিতে হাসিতে আটখানা। ঘটনা কি? কোনো আশ্চর্য ঘটনা কি ঘটেছে আমাকে ঘিরে এই অচলায়তন সংসারে?<br />
কোথায় থাকিস সারাদিন? খেয়েছিস কিছু? মায়ের স্নেহকোমল জিজ্ঞাসা। আমি রীতিমত ভয় পেয়ে যাই। আমি কি কোনো দুঃস্বপ্নের ঘোরে আটকে পড়ছি? নাকি অলৌকিক কোনো স্বপ্নের নৌকায় উঠে লোলুপ নদী পাড়ি দিচ্ছি। আমি কি আমাকে ছিঁড়ে খুঁড়ে কোনো অন্ধকূপে ভাসিয়ে দিচ্ছি?<br />
কিরে মুন্না! কথা বলছিস না কেনো? মা আবার প্রশ্ন করেনÑখেয়েছিস কিছু?<br />
না মা।<br />
টেবিলে বস, আমি খাবারটা গরম করে দিচ্ছি। মা দ্রুত চলে যান ড্রইংরুম থেকে। আমি স্থির অনড় দাঁড়িয়ে থাকি। অনন্তকালের সুই আর সুতোয় আমি এফোঁড় ওফোঁড় গেঁথে আছি ড্রইংরুমের মেঝের সঙ্গে। মা আমার জন্য খাবার গরম করতে যাচ্ছেন! বিগত পাঁচ বছরে এ রকমটি হয়েছে , মনে পড়ে না। সংসারের আর পাঁচটা উল্কি আঁকা আসবাবপত্র চেয়ার টেবিল সোফা কাপ পিরিচের মতো জড় জীবন যাপন করে যাচ্ছি। নিজেকে য়ে য়ে নির্মাণ করার কোনো সাহস বা কৌশল আমার জানা নেই। কেমন করে যে লেখাপড়া করেছি এমএ টা পর্যন্ত পাস করেছি বুঝতে পারছি না। পড়াশোনার সময়ে আমি সংসারে খুব আদরনীয় ছিলাম। দিন-রাত পড়াশোনা নিয়ে থাকতাম। মা-বাবা বেশ গর্ব করে বলতেন আত্মীয় স্বজনদের কাছেÑ মুন্না আমাদের লক্ষ্মী ছেলে। ওকে নিয়ে আমাদের কোনো চিন্তা নেই।<br />
কিন্তু খুব ভালো ছাত্রও ছিলাম না। কোনোভাবে পাসের খেয়া পার হয়ে যেতাম। সমস্যাটা ধীরে ধীরে পাকিয়ে উঠলো যখন এমএ পাসটা সত্যি সত্যি করে ফেললাম, তারপর থেকে। বাবা একদিন ডেকে বললেন Ñ এমএ পাস ছেলে তুমি। তোমার পেছনে অনেক টাকা ব্যয় করেছি। এখন আর ঘরে বসে থেকো না, কাজটাজ একটা জুটিয়ে নাও। আমি আর ক’দিন?<br />
পান চিবুতে চিবুতে মা বললেনÑযাক আর কটা দিন। চাকরির চেষ্টা করছে ও। হয়ে যাবে।<br />
হলেই ভালো। বিরস বদনে বাবা আরও যোগ করেনÑএমএ পাস করাতে যে টাকা ব্যয় হয়েছে সেই টাকা দিয়ে ঢাকায় দশ কাঠা জমি রাখলে অনেক লাভ হতো।<br />
আমি রুম থেকে ছিটকে বেরিয়ে এলাম। এই শহরে এখন এমএ পাস ছেলের পিতার কাছে দশ কাঠা জমি মূল্যবান! মানুষ হিসেবে নিজেকে কেঁচো মনে হচ্ছে। আসলে কি আমি একজন মানুষ? মানুষ হলে কেমন মানুষ? আমার জীবনে কোনো সাফল্য নেই কেনো? অন্যের চেয়ে আমি একটু আলাদা, অন্যরকম কখনোই হতে পারলাম না।<br />
কী? আয়! মা ড্রইংরুমের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছেন। আমাকে স্থির দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অবাক Ñ কিরে। পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আছিস কেনো? আয় টেবিলে ভাত, গরম তরকারি দিয়েছি।<br />
যাচ্ছিÑআমি মাকে অতিক্রম করে বাথরুমে ঢোকার জন্য বাথরুমের সামনে দাঁড়াই। ভেতরে কে একজন আছে। অপো করছি। মা আমার সামনে এসে দাঁড়ান, মুখে আশ্চর্য সুন্দর হাসিÑতোর জন্য বড় চিংড়ি মাছ ভাজি করে রেখেছি।<br />
বাথরুমের দরজা খুলে যায় বেরিয়ে আসেন আমার পিতা, যিনি আমার মতো এমএ পাস পুত্রের চেয়ে ঢাকা শহরে দশ কাঠা জমিকে মূল্যবান মনে করেন। গামছায় ভেজা মুখ মুছতে মুছতে আমাকে বলেনÑকোথায় থাকিস সারাদিন!<br />
আমার পিতার কণ্ঠও আজ আমার প্রতি প্রসন্ন, উদার, মহিমানি¦ত। আমার শিরদাঁড়া বেয়ে ভয়ের ঠাণ্ডা স্রোত নামে। ঠাণ্ডা ভয়ের স্রোত নিয়েই বাথরুমে ঢুকি। হাত-মুখ ধুয়ে ছোট্ট অপরিসর অস্বচ্ছ আয়নায় নিজেকে দেখি। চিনতে পারছি তো? হ্যাঁ, আমি আমাকে নিশ্চিন্তে চিনেছি। গোলগাল মুখের উপর লম্বা খাড়া বেমানান নাক, কুঁচকানো কপাল, মোচড়ানো গাল। গালের উপর খোঁচা খোঁচা দাড়ি। ভাসমান হলুদাভ দুটি চোখ। এই নিয়ে আমি, আমাকে বেশ চিনেছি। কিন্তু বাসার মধ্যে এমন কি ঘটলো আজ হঠাৎ আমার সঙ্গে এমন মানবিক দয়ালু ব্যবহার করছে? আমি কি দুঃস্বপ্নের মায়াজালে আটকানো কোনো কুমির? যাই হোক বাথরুমে কাজ ছাড়া বেশিণ থাকা যায় না। দরজা খুলে বের হয়ে আসি। মা আমার অপোয় অপেমাণ। আমি সুবোধ বালকের মতো টেবিলে বসি। মা আমাকে পরিবেশন করছেন। পরিবেশন করে মা আমাকে খাওয়াচ্ছেন। নিকট অতীতের কোনো স্মৃতি আমার মনে পড়ে না। খিদেটা নেই, আমার পেটের খিদেটা কোনো বাঘে খেয়ে ফেলেছে। কিন্তু কি সেই বাঘ, কেমন তার রঙ বুঝতে পারছি না। মুখের মধ্যে ভাত-চিংড়ি মাছ ধুলোর মতো লাগছে। তবুও প্রাণপণ চিবানোর চেষ্টা করছি।<br />
মা হঠাৎ আমার খাবার থালার সামনে হাসি হাসি মুখে একটা লম্বা খাম রাখেন। আমি খামটা দেখে মায়ের দিকে তাকাই।<br />
খুলে দ্যাখÑমা গভীর আন্তরিকতায় বলেন।<br />
আমি খাম খুলে চিঠি পড়ে হতভম্ব। তাহলেও আমিও মানুষ! আমাকেও জয়েন করতে বলে কোনো কোনো কোম্পানি থেকে চিঠি লিখতে পারে। মাস চারেক আগে একটি বেসরকারি অফিসে চাকরির জন্য ইন্টারভিউ দিয়েছিলাম। ইন্টারভিউ ভালো হয়েছে। কিন্তু কখনও ভাবিনি আমার নামে জয়েনিং চিঠি আসবে। এতোণে আমার পিতা এবং জননীর এতো আন্তরিক অমায়িক ও মানবিক ব্যবহারের কারণ বোধগম্য হলো।<br />
তাহলে এখন আমি এই সংসারের সোনার ডিম পাড়া হাঁস? এখন আমি ঢাকা শহরের দশ কাঠা জমির চেয়ে মূল্যবান? হঠাৎ নিজেকে খুব অসহায় আর বিপন্ন একজন মানুষ মনে হচ্ছে। খেতে খেতে বারবার, অজস্রবার চিঠিটা পড়ছি। নামতার মতো পাঠ করছি। বুকের ভেতরটা ছাইয়ের গাদায় পরিণত হচ্ছে। পদের নামÑঅফিস এক্সিকিউটিভ, বেতন দশ হাজার টাকা। দশ হাজার টাকা! এতো টাকা দিয়ে আমি কি করবো?<br />
আমার প্রতিদিনের খরচ বিশ-পঁচিশ টাকা। কোথাও কোনো ইন্টারভিউ থাকলে শ’খানেক খরচ হয়। তাও মাসে গড়ে সর্বমোট এক থেকে দেড় হাজার টাকা। টাকাটা মা-ই দেন মুখ বেজার করে। সেই আমি এতো টাকা দিয়ে মাসে মাসে কি করবো? বিয়ে করে সংসারী হবার মতো সাহসও আমার নেই। এতোদিনে কড়ায় গণ্ডায় বুঝে গেছি।<br />
গল্পের শুরুতে সুবর্ণার কথা বলেছি। সুবর্ণা আমার খালাতো বোন। আমাদের দেশের অসাধারণ লাবণ্যময়ী এবং প্রতিভাবান অভিনেত্রী সুবর্ণা মুস্তাফার সঙ্গে আমার চরিত্র সুর্বণার খুব একটা মিল নেই। তবে সুবর্ণা অসম্ভব সুন্দরী। সেই সৌন্দর্যের টোটাল বর্ণনা আমি দিতে পারবো না কিন্তু সুবর্ণা আমার অস্তিত্বের নিভৃতচারী ছবির রোমান্টিক ক্যানভাস। কতো রাত-দিন সুবর্ণাকে আমার শারীরিক সংরাগের কল্পনায় মাস্টারবেশন করেছি। সুবর্ণা তার কিছু জানে না, আমি জানি। আর চরম আনন্দের মুহূর্তে সুবর্ণাকে কম্পিত আদরের সীমাহীন বন্যায় আমি ভাসিয়ে নিয়ে যাই। তারপরও পরম প্রার্থিত সুবর্ণাকে আমি মুখ ফুটে কিছু বলতে পারি না। আমার আজন্ম ভীতু মনটা আমাকে আমার যাবতীয় সুখ, ঐশ্বর্য, চাহিদার কোষাগার থেকে দূরে রাখে। সুবর্ণাকে স্রেফ দেখতে প্রায়ই ওদের বাসায় যাই।<br />
মেয়েরা শুনেছি চালাক চতুর বেশি হয়। সুবর্ণাও বুদ্ধিমতী। আমাকে দেখলেই মিষ্টি করে হাসে। হালকা দু’একটি কথা হয়। তারপরই উঠে পড়ে সুবর্ণাÑভাইয়া তুমি বসো, মাকে পাঠিয়ে দিচ্ছি। চড়–ই পাখির তীব্রগতিতে সুবর্ণা চলে যায়, আমি বসে বসে ওর শরীরের সুরভিত সৌরভ নাক দিয়ে টানি, টেনে টেনে বুকের গভীর মধ্যিখানে পাঠিয়ে দেই। বুকের গভীরে ঘুমিয়ে থাকা সুরভিজড়ানো সৌরভ। কতো দিন মনে মনে প্রস্তুতি নিয়ে গেছি। আজ সুবর্ণাকে সাহস করে বলবোÑসুবর্ণা?<br />
মরাল গ্রীবা বাঁকিয়ে তাকাবে আমার দিকেÑবলো।<br />
আমি বলবো&#8230;&#8230;কন্তু আর বলা হয় না। আশ্চর্য এক কুহকে, ভয়ে থেঁতলে যাই, দুমড়ে যাই মুচড়ে যাই। আমার আমিকে গলাটিপে হত্যা করি। আর আপন রক্তে মহিমানি¦ত সিংহাসন তৈরি করি। সেই আমি আজ দশ হাজার টাকা বেতনের একজন পাওনাদার! কোথাও কোনো গণ্ডগোল বা ভুলটুল নেই তো? আমার মুখের গহ্বরে ভাত ঢুকছে না। হাঁসফাঁস করতে থাকি। মা মুরগির মাংস গরম করে নিয়ে আসেন।<br />
কিরে কি হয়েছে? মা অবাকÑঘামছিস কেনো?<br />
মা গলায় কাঁটা বিঁধেছে।<br />
মায়ের চোখ দুটো বড় হয়ে যায়। অবিশ্বাস্য কণ্ঠে বলেনÑ মুন্না কি বলছিস তুই? তুই তো চিংড়ি মাছ আর লালশাক দিয়ে ভাত খাচ্ছিস! চিংড়ি মাছে কি কাঁটা থাকে। কথা বলতে বলতে মা পানির গ্লাস এগিয়ে দেন।<br />
আমি নিঃশব্দে হাঙ্গরের তৃষ্ণায় পুরোটা পানি এক নিঃশ্বাসে গিলে ফেলি এবং ভাত, মুরগির মাংস রেখে উঠে পড়ি। নিজের ছোট বিছানায় শরীর এলিয়ে দিয়ে যুদ্ধকান্ত একজন মানুষের মতো হাঁপাতে থাকি।<br />
পরেরদিনে কোথাও বের হই না। মা বারবার আসেনÑকি হয়েছে তোর? আজকে এমন খুশির দিনে তুই চুপচাপ বসে আছিস। বাইরে যা বন্ধুদের নিয়ে আয়। তোর ছোট খালার বাসায় মিষ্টি পাঠা। কুয়েতের দুই ভাইকে টেলিফোনে জানা সুখবরটা। মা আমার দিকে পাঁচশ’ টাকার দুটো নোট বাড়িয়ে ধরেনÑতোর বাবা দিয়েছে। ইচ্ছেমত খরচ করতে।<br />
ঠিক আছে, রাখো। আমি নিরাসক্তভাবে বলি। আগে মা একশ’ টাকা দিলে নেচে উঠতাম আর আজ এক হাজার টাকা দিচ্ছে। অথচ আমার ভেতরের আমিটা কোনো উল্লাস বোধ করে না, কেনো? মা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকেন এবং এক সময়ে দীর্ঘনিঃশ্বাস ত্যাগ করে চলে যান। আমি আড়মোড়া তুলে হাঁটু ভেঙ্গে বসে পড়ি বিছানার ওপর।<br />
সন্ধ্যায় বাবা এবং মা দু’জনে আমার রুমে আসেন। বাবা খুব গম্ভীর প্রকৃতির মানুষ। মুখটা সবসময় অজ্ঞাত কারণে কুঁচকে থাকে অথচ আজ বেশ প্রসন্ন। কণ্ঠে ভাসছে øেহের প্রাবল্য। প্রথমে খুক খুক কয়েকটি কাশ দিয়ে আমার পায়ের কাছে বসলেন। মা যথারীতি দাঁড়িয়ে। আমি পা দুটো গুটিয়ে নিলাম।<br />
শোনো, চাকরিটা খুব যতœ করে করবে। ঠিক সময়মতো অফিসে যাবে। অফিসের সবাইকে বন্ধু, সহকর্মী ভাববে। দেখবে কোনো সমস্যা হবে না। বাবা একটু হাসলেন। বুঝতে পেরেছি তিনি আরও কিছু বলবেন, সেজন্য এই বিরতি। বাবা আবার আরম্ভ করলেনÑআটত্রিশ বছর চাকরি করে কাটিয়ে দিলাম। কেউ কখনও কোনো বদনাম করতে পারেনি। যেদিন আমার ফেয়ারওয়েল হলো,সেদিন অফিসের বড় বস থেকে আরম্ভ করে কেরানি, পিয়ন, মালি পর্যন্ত কেঁদেছে। এটা অর্জন করতে হয়েছে আমাকে। আবার একটু বিরতি নিলেন এবং পরেই আসল কথাটা বললেনÑআশা করি আমার সম্মান তুমি রাখবে। কালকে অফিসে যাওয়ার সময়ে তোমার মায়ের কাছ থেকে একশ’ টাকা নিয়ে যেও। যতিদন বেতন না পাবে, নিয়ে যাবে। প্রাইভেট অফিস সবসময় ভালো জামা কাপড় পরে যাবে অফিসে। টাকা লাগলে তোমার মাকে বলবে। কোনো সংকোচ করবে না, বুঝেছ?<br />
আমি ঘাড় কাত করে বোঝার বিষয়ে কনফার্ম করি। বাবা উঠে পড়েন॥। পছনে পিছনে মাও চলে যান। আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচি।<br />
সকালে ঘুম থেকে সবার আগেই উঠি। সাধারণত ঘুম থেকে উঠতে আমার দেরিই হয়। এজন্য সংসারে অনেক কথা আমাকে শুনতে হয়েছে। কিন্তু আজ কি করে যে উঠলাম আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় আমাকে জানিয়ে দিয়েছে। সারারাত ঘুম হয়নি। শেষরাতের দিকে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। তারপরও যে উঠতে পারলাম। নিজের প্রতি বেশ কৃতজ্ঞতা বোধ করছি। সারারাত ঘুম না হওয়ার কারণ আমি আমাকে এবং আমার চাকরির জয়েনিং লেটারটা নিয়ে একটা নাটক সাজিয়েছিলাম। আমি একদমই এই নাটক লিখতে চাইনি। তারপরও অবচেতনে কে যেনো আমাকে দিয়ে নাটকের পাণ্ডুলিপি রচনা করিয়ে নিয়েছে আমি তাকে চিনতে পারিনি। সারারাত আমার মনে হয়েছে আমি সকালে খুব সেজেগুজে যথাসময়ে প্রায় বিশ-বাইশ মিনিট আগে অফিসে গিয়ে পৌঁছলাম। সিঁড়িতে বা গেটে পরিচয় দিতেই দারোয়ান সম্মানের সঙ্গে দরজা খুলে ভেতরে নিয়ে রিসিপশনের সুন্দরী একজন রিসিপশনিস্টের কাছে আমাকে হস্তান্তর করল।<br />
রিসিপশনিস্ট তার লেন্থমাপা নির্দিষ্ট হাসির চেয়ে সামান্য বেশি প্রসারিত হাসি দিয়ে গ্রহণ করলো এবং আমাকে ইঙ্গিতে সামনের নরম সোফায় বসতে বলে কানে ফোনের রিসিভার তুললো। ফোনে রিসিপশনিস্ট বেশ কয়েক মিনিট ভেতরে কথা বলার পর আমার হাত থেকে জয়েনিং চিঠিটা নিয়ে আমাকে বসতে বলে ভেতরে চলে যায়। আমি বসে বসে ঘামতে থাকি। ইতিমধ্যে অফিসে প্রচুর লোকজন এসেছেন। যে যার কাজ করে যাচ্ছেন। হঠাৎ দরজা খুলে যায় এবং রিসিপশনিস্ট দাঁড়িয়ে আমাকে ডাকছেÑ আসুন। ইশারায় ভেতরে প্রবেশ করার ইঙ্গিত দিয়ে যেন চকিতে দরজা থেকে সরে যায়। আমি রিসিপশনিস্টের শরীরের সোমরস গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে ভেতরে প্রবেশ করে দেখতে পাই ছোট ছোট রুমের মধ্যে বেশ কয়েকজন বসে কাজ করছেন। আর একটা রুম একটু বড় সামনে লেখা ‘জেনারেল ম্যানেজার’। জেনারেল ম্যানেজার সহাস্যে আমার দিকে এগিয়ে এলেন এবং হাত ধরে তার টেবিলের সামনে বসালেন। সঙ্গে সঙ্গে ধূমায়িত দু’কাপ কফি এসে যায়। তিনি আমাকে কাপ নেয়ার ইঙ্গিত দিয়ে নিজের কাপটা টেনে নিয়ে চুমুক দেন চেয়ারে হেলান দিয়ে আয়েশি আন্তরিকতায়। মুখে ধরা চমৎকার হাসি। তার সামনে টেবিলের ওপর বিছানো আমার জয়েনিং লেটার।<br />
মুন্নু কাপে চুমুক দিয়ে টেবিলে নামিয়ে রাখতেই তিনি বললেনÑ আমাকে আপনার সঙ্গে কয়েকটি জরুরি কথা বলা দরকার। আমি সরাসরি কথা বলা পছন্দ করি আশা করি কিছু মনে করবেন না।<br />
জ্বি না, কিছুই মনে করবো না। তাছাড়া আমিও সরাসরি কথা পছন্দ করি।<br />
গুডÑ জেনারেল ম্যানেজারের হাতে কফির কাপ নেই, তার হাতে উঠে এসেছে সুদৃশ্য একটি পেপারওয়েট। তিনি আপন মনে পেপারওয়েটটাকে খেলতে খেলতে বলছেনÑঅনিবার্য কারণবশত আপনাকে দেয়া নিয়োগপত্রটি গতকালের মিটিংয়ে বাতিল করা হয়েছে। কিন্তু আপনাকে জানানোর আগেই যখন নির্দিষ্ট দিনে এসে পড়েছেন সেেেত্র কোম্পানি আপনাকে তিপূরণ এবং দুঃখ প্রকাশের সঙ্গে এক মাসের বেতন দিয়ে দিচ্ছে। তিনি, জেনারেল ম্যানেজার ড্রয়ার খুলে একটা খাম বের করে রাশেদ হাসান মুন্নাকে ধরিয়ে দেন, হ্যান্ডশেক করে বিগলিত হেসে বলেন, আশা করি কিছু মনে করবেন না। এটা একটা ছোট্ট দুর্ঘটনা মাত্র।<br />
রাশেদ হাসান মুন্না জেনারেল ম্যানেজারকে পেছনে ফিরে আসতে আসতে শুনতে পায় তার নিয়োগপত্রটি ছেঁড়ার শব্দ। প্রতি মুহূর্তের শব্দ তার বুকের ভিতরে তীব্র রক্তপানের উৎসবে মেতে উঠে এই কল্পনা বা ভাবনা থেকে নিজেকে যতোই বিযুক্ত রাখার চেষ্টা করি না কেনো চিন্তাটা কল্পনার ভয়ংকর মানচিত্রটা এসে যায় আবছাভাবে। আমি ওই চিন্তা থেকে বিযুক্ত হাবার জন্য সুর্বণাকে নিয়ে ভাবতে থাকার চেষ্টা করি। সুবর্ণার সঙ্গে শারীরিক সংরাগে মত্ত হয়ে উঠি একা একা কিন্তু না, কোনোভাবেই কল্পনার ছায়া আমাকে ছাড়ছে না। বিকল্প হিসেবে আমি আমার সংগ্রহে রাখা বেশ কয়েকটি ন্যুড ছবির বই নিয়ে নারী শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের রূপ-রস-সৌন্দর্য চর্চায় মেতে উঠবার চেষ্টা করি। না, হচ্ছে না ভয়ংকর কল্পনা বা ছায়া আমার ভেতরে, করোটির খাঁজে ঢুকেই যাচ্ছে। সুবর্ণা যখন আমাকে কল্পনার ছায়া থেকে বিযুক্ত করতে পারলো না আমি হাল ছেড়ে দিয়ে শুয়ে থাকলাম বিছানায় চিৎ হয়ে। তারপর কখন ঘুমিয়ে পড়েছি জানি না।<br />
ফিটফাট হয়ে অফিসে যাবার সময় মা বললেনÑঅফিস শেষে সরাসরি বাসায় আসিস।<br />
কেনো?<br />
সুবর্ণাদের বাসায় যাবো বিকেলে।<br />
মা, কাউকে যখন জানানো হয়নি, এখন আর জানিও না।<br />
কেনো?<br />
পরে জানালে ভালো হবে।<br />
ঠিকই বলেছে মুন্না &#8211; বাবা কখন পেছনে এসে দাঁড়িয়েছেন টের পাইনি। প্রথম মাসের বেতন পেয়ে সবার বাসায় মিষ্টি দেবে তখন সবাই জানবে।<br />
কেনো জানি না বাবার এই পরিকল্পনা আমার খুব ভালো লাগে। আমি রাস্তায় এসে একটা সিএনজি নিয়ে সোজা মতিঝিলের আঠারো তলা ভবনের পনেরো তলায় নির্দিষ্ট অফিসের সামনে দাঁড়াই। কি চমৎকার মার্বেল পাথরের ওপর সোনালী রঙে অফিসের নাম লেখা। সেগুন কাঠের বিরাট দরজা। তখন থেকে প্রতিদিন আমিও অনেকের মেতো মহামূল্যবান দরজা পার হয়ে ভেতরে ঢুববো, বের হবো! এক অজানা ভয়ে শিহরণে রোমাঞ্চে আমি নার্ভাস ফিল করি। চারপাশটা একবার দেখে নিয়ে দরজার সামনে দাঁড়াই। দারোয়ান উঠে দাঁড়ায়Ñকোথায় যাবেন?<br />
আমি হাতের চিঠিটি বাড়িয়ে ধরে বলি জায়েন করতে এসেছি। সঙ্গে সঙ্গে দারোয়ানের চেহারা খুব পাল্টে যায়। ঠকাস শব্দে আমাকে অভিবাদন জানায়। দরজা খুলে আমাকে ভেতরে প্রবেশ করতে বলে যান স্যার, ভেতরে যান। ভেতরে ঢুকতেই একজন সুদর্শন তরুণী আমার কাছে এগিয়ে আসে &#8211; কার কাছে যাবেন? আমি আবার আমার হাতের চিঠিটা তার দিকে বাড়িয়ে ধরলে নিমেষে চিঠিটা হাতে নিয়ে তরুণী আমার দিকে আগ্রহের সঙ্গে তাকায় এবং বলে আসুন। তরুণী খুব দ্রুত হাঁটছে শরীরের ছন্দ তুলে। চারপাশের ডেস্কে কাজ করছে অনেকে। কেউ কথা বলছে টেলিফোনে, কেউ কম্পিউটার নাড়াচাড়া করছে। কেউ চোখ তুলে এক পলকে দেখছে আমাকে। হঠাৎ একটা করে সামনে দাঁড়িয়ে যাই। দরজা খুলে তরুণী ভেতরে প্রবেশ করে এবং আমাকে ঢুকতে বলে।<br />
ভেতরে ঢুকেই দেখতে পেলাম চমৎকার পরিপাটি করে সাজানো রুম। রুমটার মাঝখানে সুদৃশ্য চেয়ারে সৌম্য দর্শন একজন বসে আছেন। গভীর মনোযোগের সঙ্গে তিনি কাগজ পড়ছিলেন। আমাদের দিকে দয়া করে তাকালেন, তরুণীটি সঙ্গে সঙ্গে বলল &#8211; স্যার, ইনি রাশেদ হাসান মুন্না।<br />
ভদ্রলোক পরিপূর্ণ মনোযোগ দিয়ে আমাকে দেখছেন, দেখে তরুণীর হাত থেকে আমার নিয়োগপত্রটা নিলেন, টেবিলের ওপর রাখলেন, আমাকে বললেন &#8211; বসুন। ইশারায় তরুণীকে যেতে বললেন। তরুণী চলে যায়। আমি অফিসের ভেতরে ভদ্রলোকের মুখোমুখি। তিনি কথা বলতে আরম্ভ করলেন &#8211; মি. রাশেদ হাসান মুন্না, আপনাকে স্বাগত, তবে একটা ছোট্ট দুর্ঘটনা ঘটেছে।<br />
আমি কিছু বলতে চাইলে তিনি হাত উঠিয়ে থামিয়ে দিয়ে বললেন &#8211; আসলে আমাদের কম্পিউটার প্রোগ্রামের ভুলে আপনার নামে চিঠিটা চলে গেছে। ইতিমধ্যে ওই প্রোগামারকে আমরা চাকরিচ্যুত করেছি। এটা মারাত্ত্বক  অনিয়ম এবং আশাভঙ্গের কারণ বটে। যাই হোক আপনি একটা আশা নিয়ে এসেছেন, আপনাকে খালি হাতে ফেরাবো না।<br />
তিনি বেল টিপলেন সঙ্গে সঙ্গে সেই তরুণী প্রবেশ করে &#8211; স্যার!<br />
রাশেদ হাসান মুন্নাকে নিয়ে যাও। জেনারেল ম্যানেজারকে বলা আছেন ওনাকে পাঁচ হাজার টাকা দিতে।<br />
আসুন, তরুণী ঘুরে দাঁড়ায়।<br />
আমি উঠে দাঁড়ালাম । বললাম &#8211; হ্যাঁ, যাবো তবে আপনার সঙ্গে নয়, আমি একাই যেতে পারবো। আর ওই টাকা পাঁচ হাজার আমি আপনাদের দান করে গেলাম।<br />
খরগোশের চেয়েও দ্রুতগতিতে রুম থেকে বের হয়ে আসি। মেহগনি কাঠের দরজা পার হয়ে আসার সময় দারোয়ান বুট ঠুকে যথারীত সশব্দে অভিবাদন জানায়। দারোয়ান জানে না আমি মূলত একজন ব্যর্থ মানুষ। লিফট ছেড়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে থাকি আর গুনতে থাকি সিঁড়ির ধাপ এক, দুই, তিন, চার&#8230;.।<br />
গুনতে গুনতে নিচে নামতে নামতে ভাবি আদিগন্ত জীবনের এই পাঠশালায় আমার জীবনে কি কোনোদিন কোনো সিঁড়ি যোগ হবে না? কেবলই বিয়োগ? কেবলই বোনাসহীন মাইনাস? বাসায় ফিরে যাবো কিভাবে? মা-বাবার তিক্ত ব্যবহার, আমার হলুদ রঙ চারপাশ আমাকে ক্রমশ গিলে খায়। খেতে থাকে হাসতে হাসতে।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://shahittabazar.com/%e0%a6%af%e0%a7%8b%e0%a6%97-%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a7%9f%e0%a7%8b%e0%a6%97%e0%a7%87%e0%a6%b0-%e0%a6%b8%e0%a6%bf%e0%a6%81%e0%a7%9c%e0%a6%bf-%e0%a6%ae%e0%a6%a8%e0%a6%bf-%e0%a6%b9%e0%a6%be%e0%a7%9f/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
			</item>
		<item>
		<title>প্রকৃতির সুবাস ছোবল : নাসরীন জাহান</title>
		<link>https://shahittabazar.com/%e0%a6%aa%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%95%e0%a7%83%e0%a6%a4%e0%a6%bf%e0%a6%b0-%e0%a6%b8%e0%a7%81%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%b8-%e0%a6%9b%e0%a7%87%e0%a6%be%e0%a6%ac%e0%a6%b2-%e0%a6%a8%e0%a6%be%e0%a6%b8/</link>
					<comments>https://shahittabazar.com/%e0%a6%aa%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%95%e0%a7%83%e0%a6%a4%e0%a6%bf%e0%a6%b0-%e0%a6%b8%e0%a7%81%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%b8-%e0%a6%9b%e0%a7%87%e0%a6%be%e0%a6%ac%e0%a6%b2-%e0%a6%a8%e0%a6%be%e0%a6%b8/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[সাহিত্য বাজার]]></dc:creator>
		<pubDate>Wed, 26 Feb 2014 06:12:44 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[গল্প]]></category>
		<category><![CDATA[সাহিত্য]]></category>
		<guid isPermaLink="false">http://shahittabazar.com/?p=1929</guid>

					<description><![CDATA[প্রকৃতির সুবাস ছোবল : নাসরীন জাহান (ছোটোগল্প) <p>আসমানে মিহি সুতোয় বোনা মসলিনের শাড়ির মতোন পাতলা জমাট শিশিরে মোড়ানো প্রকৃতির মধ্যে পরানে হু হু এক নস্টালজিক আনন্দ কী বেদনার তুমুল ঘ্রাণ</p><span><div class="readmore"><a href="https://shahittabazar.com/%e0%a6%aa%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%95%e0%a7%83%e0%a6%a4%e0%a6%bf%e0%a6%b0-%e0%a6%b8%e0%a7%81%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%b8-%e0%a6%9b%e0%a7%87%e0%a6%be%e0%a6%ac%e0%a6%b2-%e0%a6%a8%e0%a6%be%e0%a6%b8/">...বিস্তারিত &#8594;</a></div>]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<h1><a href="http://shahittabazar.com/wp-content/uploads/2013/11/nasrin-jahan.jpg"><img loading="lazy" decoding="async" class="size-medium wp-image-903 alignright" alt="nasrin-jahan" src="http://shahittabazar.com/wp-content/uploads/2013/11/nasrin-jahan-197x300.jpg" width="197" height="300" srcset="https://shahittabazar.com/wp-content/uploads/2013/11/nasrin-jahan-197x300.jpg 197w, https://shahittabazar.com/wp-content/uploads/2013/11/nasrin-jahan.jpg 300w" sizes="auto, (max-width: 197px) 100vw, 197px" /></a>প্রকৃতির সুবাস ছোবল : নাসরীন জাহান (ছোটোগল্প)</h1>
<p>আসমানে মিহি সুতোয় বোনা মসলিনের শাড়ির মতোন পাতলা জমাট শিশিরে মোড়ানো প্রকৃতির মধ্যে পরানে হু হু এক নস্টালজিক আনন্দ কী বেদনার তুমুল ঘ্রাণ নওশীনকে বিমোহিত করে তোলে।</p>
<p>সহসা আত্মবুঁদ অবস্থা থেকে ফের রাজহাঁসের মতো গ্রীবা উচ্চকিত করে চারপাশের ধু-ধু প্রান্তর ধরে সোনার টুকরো দানার মতো ধানের কণা শত শত গাছের সম্ভারে এমনভাবে ঢেউ তুলছে যেন তা স্থির জলের এক কোনায় কেউ নেড়ে দিল… তাই কুচি-কুচি ঢেউ আঁচল তুলে তুলে অন্য প্রান্তে গিয়ে হাঁপ ছাড়ল।</p>
<p>বিকেলের বাতাসের এই ঘ্রাণ ঢেউ তোলা শস্যের না আসন্ন শীতের দূরবর্তী জায়গায় দাঁড়ানো প্রাণের মধ্যে না জানা কষ্টের বিরহ তোলা হেমন্তের, নওশীন জানে না।</p>
<p>এই হেমন্তেই জন্ম হয়েছিল তার, শহরতলীর এক ছিন্ন বিচ্ছিন্ন কক্ষে।</p>
<p>এই জন্যই কী সে আজন্ম তারিখ না জেনেও ইট-পাথরের মধ্যে থেকেও হেমন্তের গন্ধ পায়?</p>
<p>ক্ষেতের ভাঁজের মেঠোপথ ধরে সে রিকশা-ভ্যানে পা ঝুলিয়ে বসে চলতে চলতে নিজের বয়স, অবস্থানের ভেদ ভুলে যায়।</p>
<p>শহরে ননদের বাড়ি। হাজব্যান্ডের পিঠাপিঠি এই বোনটির কাছেই নওশীন চিরকাল অপূর্ব এক মাতৃছায়া পেয়েছে। তার দুই কন্যাও এই ফুপুটিকে ভালো করে চেনে, ফলে শাশুড়িকে নিয়ে শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার সময় তারা এখানে দু কন্যাকে রেখে যেতে নওশীন অসহজ বোধ করেনি। মুনিয়াকে নিয়েই চিন্তা ছিল বেশি। অপরিচিত কোথাও গেলে বোধ করে সাঁতার না জানা অবস্থায় তাকে জলে ফেলে দেওয়া হয়েছে। ননদের দু-মেয়ের বিয়ে হয়েছে। বাচ্চারা আসে বলে ওদের জন্য এ বাড়িতে কম্পিউটার রাখা হয়েছে। তাতেই দুবোন খড়কুটো পায়। মুনিয়ার বিপণ্নতা জেনে এক্ষেত্রে মৌটুসি তাকে যদ্দুর সম্ভব ছাড় দিয়ে বোনের পাশে রাখছে।</p>
<p>ঝাঁক ঝাঁক পাখি মিহি রোদ্দুরে ঝাপটাঝাপটি করছে। এ পাশের ধানের গোড়ায় এখনো কাস্তে পড়েনি। কিন্তু দূরে কোলাহলে ধান কাটার শব্দ শোনা যায়। শাশুড়ির পীড়াপিড়িতে হলেও মনে হয় নগর থেকে এখানে এসে যেন সে বহুদিন পর এক অনাবিল মুক্তির নিঃশ্ব্বাস নিচ্ছে।</p>
<p>পাকা রাস্তা দিয়েও আসা যেত।</p>
<p>কিন্তু মেঠোপথের এই মজাটা নওশীন নিতে চাওয়ায় গ্রামবাসীও মজা পেয়েছে।</p>
<p>ননদের বাড়ি ঢাকা থেকে প্লেনে আসার জার্নিটা গায়ে লাগেনি। ফলে বিকেলেই সে ননদ আর দু-কন্যার সাথে দিনাজপুর শহরের বড় মাঠে চক্কর খেতে গিয়েছিল। পাশেই অফিসার্স কোয়ার্টারের বাবা, মা, সহকর্মী, বন্ধু-বান্ধবী, ছেলেমেয়ে দলদের অনেকেই পায়ে কেড্স পরে হাঁটতে নেমেছিল। একটা তেপান্তরের মতো মাঠের ওপারে আরেকটা মাঠ। পুরো মাঠে হাঁপছাড়া মানুষের চলমান কোরাসের মধ্যেও যখন ছায়া নামছিল, একটি গাছে হেলান দিয়ে নওশীন দেখছিল প্রকৃতি মানুষকে কত বদলে দেয়, শহরে কারণে অকারণে চিরঅসুস্থ বড় বোনটিকে নিয়ে খিটমিট করলেও এখানে ঠিক যেন মুনিয়ার মা মৌটুসি, এমন কেয়ারিং-এ বড় বোনটির হাত ধরে ধীরে ধীরে তাকে চলতে সাহায্য করছিল। আচমকা হাতে এক বিন্দু শিশির কণা…</p>
<p>রীতিমতো শিহরিত নওশীন ভ্যান থেকে মাথা ঊর্ধ্বমুখী করে। শহরের কাছাকাছি একঘরে তাল গাছের নিচ দিয়ে তারা যাচ্ছে। শিশুর মতো চিল্লায় নওশীন—শিশির পড়েছে, এই সিজনেই? এতক্ষণ চুপ করে থাকা দেবর হাসে, অস্ফুটের কথায় আন্দাজ করা যায়, ভাবির চোখ মানুষী দেখে সে অবাক হয়ে কিছু মন্তব্য করেছে, যা আন্দাজ করে নিজের মধ্যেই নিঃশব্দে সেঁধিয়ে যায় নওশীন।</p>
<p>অল্প বয়সে ঢাকার ছেলের সাথে বিয়ে হয় ননদ শিউলী আপার। চাকরিসূত্রে তিনি তখন দিনাজপুর ছিলেন। শেষে অনেক শহর ঘুরে ননদের কাঙ্ক্ষাতেই দিনাজপুরে তারা স্থায়ী হলেও তাদের চাল-চলন, ভাষায় কোনো বিশেষ অঞ্চলের ভাষা মূর্ত হয় না।</p>
<p>ভোরে তেতুলিয়ায় যাওয়া হবে। মাইক্রোবাস ভাড়া থেকে সব আয়োজন করছে ননদ জামাই। ননদের চাচাত ভাই পঞ্চগড় জেলার ডিসি। সেই সূত্রে সেখানকার ডাক বাংলায় আজ রাতের মধ্যে কেউ না এলে ওরা ওখানে এক রাত কাটাবে।</p>
<p>এখানে আসার পর থেকেই নওশীনের শিরা-উপশিরায় শিরশির করছে হরিণিয়ার নাম। এখন সে কোথায়? গ্রামে এ প্রসঙ্গে এবার ওই অল্প সময়ের মধ্যে মুখ খোলেনি। শিউলী আপাও শহরে বসে তার খবর রাখে না বলেই মনে হয়। কিন্তু যে প্রসঙ্গ না শুনতেই প্রাণে আরাম হয়, তা জানতে কেন এত দুর্মর কৌতূহল?</p>
<p>রাতে আড্ডা শেষে ঘুমের আগে শফিউলের আকুতিময় কণ্ঠে নওশীন মুনিয়া মৌটুসিকে ‘আই মিস ইউ’ শুনে একটা স্বস্তির স্থিততা নিয়ে তলিয়ে যায়।</p>
<p>সকালে শিউলী আপা প্রচুর খাবার দাবার নিয়ে মাইক্রোবাসে উঠলে হাসে নওশীন, তুমি পারোও।</p>
<p>আমরা ঢাকা গেলে তুমি কম করো?</p>
<p>মাইক্রোবাস যাচ্ছে নাতিশীতোষ্ণ বাতাসের সে াত কেটে কেটে। ঠাকুরগাঁও আসতেই আরেকটা কারের মুখোমুখি দাঁড়ায় তারা।</p>
<p>চাচাতো দেবর নেমে এসেছেন। বলছেন, আমি সব ব্যবস্থা করে রেখেছি, কোনো প্রব্লেম হবে না। তাকে দেখে গাড়ি থেকে নেমে আসে নওশীনও, থ্যাংকস আপনাকে। একটা রেকর্ড করতে যাচ্ছি। টেকনাফ তো গিয়েছিই, তেতুলিয়ায় গেলেই পুরো বাংলাদেশ ঘোরার কৃতিত্ব নেব হা হা।</p>
<p>গাড়ির দিকে তাকিয়ে চাচাতো ভাই অবাক কণ্ঠে বলে, সফিউল আসেনি?</p>
<p>না, ঢাকায় ওর অনেক কাজ।</p>
<p>তাহলে অসুস্থ হরিণিয়া ভাবির কাছে কে আছে? তাকেও তো দেখছি না।</p>
<p>এক ভূমণ্ডল চক্করে নওশীনের সাথে সাথে সবাই যেন কেঁপে ওঠে। সরল মানুষটার চোখে এসব পড়ে না, সে নিজ মনেই বলে যায়, পরশু ঢাকার রাস্তায় বিকশায় দুজনকে দেখে আমি গাড়ি থামালাম, বলল, ভাবিকে ডাক্তার দেখিয়ে বাসায় নিয়ে যাচ্ছে শফিউল, লিফট দিতে চাইলাম, নিলো না।</p>
<p>গলায় নিঃশ্বাস আটকে নওশীন প্রাণপণে ব্যাপারটাকে সামাল দেয়, এই শহরে পড়াশোনা করা মানুষটা ওদের সম্পর্কের ব্যাপারে কিছু জানে না, বলে, এই জন্যইতো ছুটি নিয়ে শফিউল রয়ে গেল, এছাড়া আমার বাবার বাড়ির মানুষও আছে। আম্মা বাড়ি আসার জন্য এত অস্থির হলেন যে…।</p>
<p>চলো, দেরি হচ্ছে, যেন এতক্ষণ নিঃশ্বাস আটকে ছিল শিউলী আপা, দম ছাড়া কণ্ঠে তাড়া দিলে ফের গাড়ি চলতে থাকে।</p>
<p>দিনের মধ্যে ঢুকে যায় অন্ধকার আলোর হল্লোড়বাজি। ঠাকুরগাঁওয়ের ছিমছাম পথ। ছোট বড় নিরিবিলি বিল্ডিংয়ে চোখ রেখে জ্বালা জ্বালা বুক নিয়ে রীতিমতো কাঁপে নওশীন। বিয়ের অনেক পরে জেনেছিল সে, বিধবা ভাবির সাথে কৈশোর থেকেই শফিউলের দেহমন সর্বস্ব প্রেমের কথা। শেষে আত্মীয়-স্বজন এক হয়ে ভাবিকে বাপের বাড়ি পাঠালে কন্যাদের মাথা ছুঁয়ে কিরা কেটেছিলেন শফিউল। এখন আর হরিণিয়া ভাবির খোঁজ রাখে না সে।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://shahittabazar.com/%e0%a6%aa%e0%a7%8d%e0%a6%b0%e0%a6%95%e0%a7%83%e0%a6%a4%e0%a6%bf%e0%a6%b0-%e0%a6%b8%e0%a7%81%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%b8-%e0%a6%9b%e0%a7%87%e0%a6%be%e0%a6%ac%e0%a6%b2-%e0%a6%a8%e0%a6%be%e0%a6%b8/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
			</item>
		<item>
		<title>ইছামতির জলে বিষন্ন নক্ষত্র : মিশু মিলন</title>
		<link>https://shahittabazar.com/%e0%a6%87%e0%a6%9b%e0%a6%be%e0%a6%ae%e0%a6%a4%e0%a6%bf%e0%a6%b0-%e0%a6%9c%e0%a6%b2%e0%a7%87-%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%b7%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%a8-%e0%a6%a8%e0%a6%95%e0%a7%8d%e0%a6%b7%e0%a6%a4/</link>
					<comments>https://shahittabazar.com/%e0%a6%87%e0%a6%9b%e0%a6%be%e0%a6%ae%e0%a6%a4%e0%a6%bf%e0%a6%b0-%e0%a6%9c%e0%a6%b2%e0%a7%87-%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%b7%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%a8-%e0%a6%a8%e0%a6%95%e0%a7%8d%e0%a6%b7%e0%a6%a4/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[সাহিত্য বাজার]]></dc:creator>
		<pubDate>Tue, 18 Feb 2014 12:13:51 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[গল্প]]></category>
		<category><![CDATA[সাহিত্য]]></category>
		<guid isPermaLink="false">http://shahittabazar.com/?p=1843</guid>

					<description><![CDATA[<p>ইছামতির বুক<br /> কালোর ওপর হলুদ ছোপগুলো যেন তুলি থেকে ছিটকে পড়া রঙ, বেশ স্বাস্থ্যবান একটা জলঢোঁড়া অনায়াসেই ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করলো। বিনা পাসপোর্ট, বিনা ভিসায়! জলঢোঁড়াটির অস্তিত্ব টের</p><span><div class="readmore"><a href="https://shahittabazar.com/%e0%a6%87%e0%a6%9b%e0%a6%be%e0%a6%ae%e0%a6%a4%e0%a6%bf%e0%a6%b0-%e0%a6%9c%e0%a6%b2%e0%a7%87-%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%b7%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%a8-%e0%a6%a8%e0%a6%95%e0%a7%8d%e0%a6%b7%e0%a6%a4/">...বিস্তারিত &#8594;</a></div>]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<div id="attachment_1844" style="width: 310px" class="wp-caption alignleft"><a href="http://shahittabazar.com/wp-content/uploads/2014/02/saba-5m-protistha-uttsab-chobi.jpg"><img loading="lazy" decoding="async" aria-describedby="caption-attachment-1844" class="size-medium wp-image-1844 " alt="saba 5m protistha uttsab chobi" src="http://shahittabazar.com/wp-content/uploads/2014/02/saba-5m-protistha-uttsab-chobi-300x190.jpg" width="300" height="190" srcset="https://shahittabazar.com/wp-content/uploads/2014/02/saba-5m-protistha-uttsab-chobi-300x190.jpg 300w, https://shahittabazar.com/wp-content/uploads/2014/02/saba-5m-protistha-uttsab-chobi.jpg 324w" sizes="auto, (max-width: 300px) 100vw, 300px" /></a><p id="caption-attachment-1844" class="wp-caption-text">সাহিত্য বাজারের ৫ম বর্ষে পদার্পন উৎসবে আয়োজিত ৫দিন ব্যাপী সাহিত্য সম্মেলনে আলোচনা পর্বের দৃশ্য।</p></div>
<p><strong>ইছামতির বুক</strong><br />
কালোর ওপর হলুদ ছোপগুলো যেন তুলি থেকে ছিটকে পড়া রঙ, বেশ স্বাস্থ্যবান একটা জলঢোঁড়া অনায়াসেই ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করলো। বিনা পাসপোর্ট, বিনা ভিসায়! জলঢোঁড়াটির অস্তিত্ব টের পেতেই তড়িৎ গতিতে ভারতের দিকে ছুটলো এক ঝাঁক রুপালী পুটিমাছ। মেঘের শার্সি ভেদ করে সবে জলের আয়নায় তাকিয়েছিল সূর্য, জলঢোঁড়ার জলকাটা ঢেউয়ে সূর্যের প্রতিবিম্ব যেন হাত থেকে পড়ে যাওয়া ভাঙা আয়নায় রাগী মানুষের মুখ!<br />
কূলে ভেড়ানো নৌকার গলুইয়ে বসে নদীতে ছিপ ফেলে শালপাতার বিড়ি ফুঁকছিল মধ্য ত্রিশের জহির। লèীট্যারা চোখের দৃষ্টি জলঢোঁড়ার ওপর পড়তেই ডানে কাত হয়ে জল ছিটালো সে। অপ্রত্যাশিত বাধা পেয়ে জলঢোঁড়াটি অবশ্য ভারতে ফিরে গেল না। কিছুটা বা দিকে সরে গিয়ে কলমীলতার ঝোপ, জলজ উদ্ভিদের ভেতর হারিয়ে গেল।<br />
এখানে ীণকায়া ইছামতি উত্তর থেকে এসে কিঞ্চিৎ কোমর বেঁকিয়ে চলে গেছে দেিণ। পুবে যশোরের পুটখালি, পশ্চিমে উত্তর চব্বিশ পরগণার আংরাডাঙা। এখানে কাঁটাতারের বিভেদ গড়ে ওঠেনি। অরতি সীমান্ত। তবে দু-পাড়ের মানুষ জানে এক অদৃশ্য কাঁটাতারের বিভেদ গড়ে দেওয়া হয়েছে ইছামতির বুকে। ইছামতির বুকের একপাশ বাংলাদেশ, আরেক পাশ ভারত। এক স্তন লাল-সবুজ, আরেক স্তন আকাশী-সাদা! মানুষ জানে, কিন্তু ইছামতি কি জানে!<br />
পাতার বিড়ির শেষাংশ ইছামতির বুকে ছুঁড়ে দিল জহির। কানটুপিটা টেনে কান ঢেকে নিল ভাল মতো। উত্তরে হাওয়া বইছে। বিদায়বেলায় পিতৃগৃহ ত্যাগ করার সময় কনের তীব্র আহাজারি-কাঁন্নাকাটির মতো শীত এখন।<br />
সেই ভোরবেলা একটা দল পার করেছে জহির। তারপর থেকে নদীতে ছিপ ফেলে বসে আছে। পেয়েছে গোটা সাতেক পুটি আর একটা পোনামাছ। অর্ধেক জলে ডুবিয়ে রাখা খালুইয়ের মধ্যে শঙ্কায় ছুটোছুটি করছে মাছগুলো। বেলা বাড়লে জহিরের নয় বছরের ছেলে জামাল ভাত দিয়ে গেছে। ভাত খেয়ে সে আবার বসেছে ছিপ নিয়ে। এখন দুপুর হতে চললো।<br />
নদীতে ছিপ ফেলে মাছ ধরাটা আসলে অজুহাত মাত্র। তার আসল কাজ মানুষ পারাপার করা। এই পয়েন্টে রোজ তিন-চারশ মানুষ পারাপার হয়। আজ সকাল থেকেই লাইন খারাপ। লাইন ভাল হলে তার কাছে ফোন আসবে দু-পাড় থেকেই। তখন একটা ধকল যাবে। এ কাজের ধরণই এমন। দিন নেই, রাত নেই যখন তখন মানুষ আর মালামাল পারাপার করতে হয়। ভোর থেকে রাত অব্দি ঘাটেই থাকে সে। আবার কখনও কখনও কাঁচা ঘুম থেকে উঠে এসেও শক্ত হাতে ধরতে হয় বৈঠা।<br />
আরেকটা শালপাতার বিড়ি ধরালো জহির। শালপাতার বিড়ি খেতে তার দারুণ লাগে। আবার দামেও সস্তা। তবে এপাড়ে পাওয়া যায় না। ওপাড় থেকে আনতে হয়। সে অবশ্য মাসে একবার বনগাঁ যায়। তখন প্রয়োজনীয় জিনিস-পত্র কিনে নিয়ে আসে। সঙ্গে শালপাতার বিড়ি আর দু-চারটে বোতল। প্রায়ই সন্ধ্যার পর বন্ধুদের সাথে নৌকায় বসে সেই বোতলগুলো ভারমুক্ত করে। বন্ধু বলতে চোরাকারবারি আনিস, মোটর সাইকেল চালক রুবেল,  দালালের প্রতিনিধি আক্কাস আর নারী পাচারকারী হাবিবুল। লোকে বলে জালি হাবিব। বোতল ফুরিয়ে গেলে আক্কাস দেশভাগের জন্য দায়ী সংশ্লিষ্ট কর্তাদের বাপ-দাদাদের চৌদ্দ গুষ্টি উদ্ধার করে। তখন রুবেল বলে, ‘দেশটা ভাগ হলো বলেই না আমরা পেটে দুটো খেতে পাচ্ছি। নইলে এই আকালের দিনে কি খায়ে বাঁচতাম!’<br />
‘এখন এই রাত্তিরে মদ পাব কনে! দেশ ভাগ না হলি মতিনের মুদি দোকানে সয়াবিন তেলের বোতলের পাশে মদের বোতলও থাকতো। খাও ইচ্ছে মতো! আর শালা এখন মদ আনতে বনগাঁ ছোটো। একানকার বালের কেরুর যা দাম, এক বোতল মানষির রক্তের দামও অতো না’ আক্কাসের গলা থেকে আফসোস ঝরে পড়ে।<br />
চোরাকারবারী আনিস বলে, ‘হ্যারে হাবিব, তাজুল চাচার ছোট মাইয়েডারে কোন বনবাসে রাইখে আসলি ক দিনি? একনও ডাঁটো হয়নি। কচি। চোখের সামনে দিয়ে ঘুরে বেড়াতো। ফাইন লাগতো।’<br />
‘হু&#8230;ফাইন লাগতো! এই তোর ফাইন লাগায় কি ওর পেট ভরে! খালি তো চোখ দিয়ে চাটে চাটে দেখতি, হাতে কোনদিন পাঁচটা টাকা গুঁজে দিছিস? আমি রুটি রুজির ব্যবস্থা করে দিলাম। এহন একজনের কামাইতে পুরো সংসার ভাল মতো চলবিনি।’<br />
‘এহন আছে কনে?’<br />
‘সোনাগাছিতে। জমায়ে সংসার করতিছে। এহন ওরে দেকলি তোরা চিনতি-ই পারবিনে। ওকানে তো কি সব ওষুধ-ফষুধ খাওয়ায় ওগের। দুই দিনেই ফুলে-ফেঁপে সার দেওয়া ডাঁটার মতোন হয়ে যায়। আমি তো আবার দুডে মুরগি নিয়ে গিছিলাম। ওরে দেকে তো চু চড়ক গাছ। ছিল ছেঁড়া ন্যাতা, হয়ে গেছে জামদানী! আমারে দেকে এট্টু চোখের জল ফেললো। তারপর সাত হাজার টাকা দিয়ে কোলো, আব্বাকে দিও। এক হাজার কমিশন কেটে নিয়েছি।’<br />
‘তুই শালা সত্যিই জালি!’ জহির বলে।<br />
সেদিন গল্পে গল্পে ওদের মাঝরাত পেরিয়ে যায়।<br />
ফাতনাটা হাবুডুবু খাচ্ছে। লèীট্যারা চোখের দৃষ্টি আঁকড়ে ধরেছে ফাতনাটাকে। তখনই ফোনটা বেজে উঠলো।</p>
<p><strong>লুকোচুরির গল্প, শূন্যতা অল্প</strong><br />
বনগাঁর সেভেন্টি এইট বাসস্ট্যান্ডের টিকেট কাউন্টারের পিছনের ঘরটিতে যাত্রীরা অধীর অপোয় কেউ পায়চারী করছে, কেউ সিগারেট ফুঁকছে, কেউ বসে আছে, কেউবা পাশের দোকান থেকে শেষবারের মতো টুকিটাকি কিছু কিনে ব্যাগের খালি জায়গাটুকু ঠেসেঠুসে ভরাট করছে। রাষ্ট্রব্যবস্থা মতে এদের ভারতের মাটিতে থাকার বৈধতা নেই। অবৈধভাবে ভারতে অনুপ্রবেশ করেছিল, এখন বাংলাদেশে ফিরবে। আবার কেউ কেউ বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করবে। বাংলাদেশে ফেলে আসা স্বজনদের কাছে কয়েকটা দিন কাটিয়ে আবার ভারতে ফিরবে।<br />
দালালরা যাত্রীদের হাতে এক টুকরো করে কাগজ ধরিয়ে দিয়ে গেছে, তাতে ওপাড়ের দালালের নাম এবং ফোন নম্বর লেখা। দালালরা বাইরে যায় আবার কিছুণ পর পর এসে খোঁজ নেয় নতুন কেউ এলো কিনা! কালো বেটে মতো প্রদীপ নামে এক দালালকে একজন ষাটোর্ধ বৃদ্ধ জিজ্ঞেস করলেন, ‘আর কতণ বসায়া রাখবা?’<br />
বৃদ্ধ অসুস্থ। ডাক্তার দেখাতে এসেছেন নাতির সাথে। প্রদীপ দালাল বিরক্ত চোখে বৃদ্ধের দিকে তাকিয়ে বললো, ‘আরে কাকা, বলেছি তো লাইন খারাপ আছে।’<br />
‘সেই বিয়ানবেলা থেইকে কতেছো লাইন খারাপ। কতণে লাইন ভাল হবি?’<br />
উত্তর না দিয়ে ফোনে কথা বলতে বলতে চলে গেল প্রদীপ।<br />
ত্রিশের যুবক অনিন্দ্য ঘর থেকে বের হয়ে বাসস্ট্যান্ডের খোলা জায়গায় গিয়ে দাঁড়ালো। এই আধো আলো-ছায়াময় ঘরে আর কতণ থাকা যায়! বাসস্ট্যান্ডের পাশেই বাজার। চারপাশটা খুঁটিয়ে দেখছে সে। এই বর্ডারকে কেন্দ্র করে কত রকম মানুষের কত রকম পেশাই না গড়ে উঠেছে! বছর পুঁচিশের এক যুবক এসে অনিন্দ্যকে বললো, ‘দাদা, আপনি কি বরিশাল যাবেন?’<br />
অনিন্দ্য ভাল করে দেখলো যুবককে। যুবকের হাতে ছোট্ট একটা প্যাকেট। বললো, ‘কেন বলুন তো?’<br />
‘বরিশালের কাউকে পেলে আমার বাবার জন্য এই ওষুধের প্যাকেটটা পাঠাবো।’ যুবকের সরল উত্তর।<br />
‘না ভাই, আমি বরিশাল যাব না।’<br />
বরিশালের লোকের খোঁজে চলে গেল যুবকটি। একটি মোটর সাইকেল এসে থামলো। চালকের পিছনে দুজন তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ। একজনের পরনে জিন্স-শার্ট, অন্যজনের শাড়ী। জিন্স-শার্ট পরা জনের কাঁধে বেশ ভারী ব্যাগ। ব্যাগটি বেঞ্চের ওপর নামিয়ে পকেট খুলে কিছু বের করলো। হাতের তালুতে রেখে প্রক্রিয়া সম্পাদনের সময় বোঝা গেল-খৈনি! তখনই দালাল এসে তাড়া দিল অপেমান একটি বাসে ওঠার জন্য।<br />
বাস চলছে। যেন কোন অজানার উদ্দেশ্যে যাত্রা! অনিন্দ্য’র ঝিমুনি এসে গেল। কান্ত শরীর! ঝিমুনি ছুটে গেল বাসটি এক জায়গায় এসে দাঁড়ালে। জায়গাটা চেক পোস্ট। একজন বি এস এফ জওয়ান বাসে উঠে জেরা শুরু করলো বাসের পিছনের যাত্রীদের। অনিন্দ্য বসেছে বাসের মাঝামাঝি জায়গায়। জওয়ানটি একটু একটু করে এগোচ্ছে আর অনিন্দ্য’র বুক দুরু দুরু করছে। দালাল তো একবারও বললো না যে বাসে বি এস এফ চেক করবে! সে ভেবেছিল বাস থেকে নামার পর হয়তো চেক করবে। এখন জিজ্ঞেস করলে কি উত্তর দেবে! পিছনে জেরা চলছে &#8211;<br />
‘বাড়ি কোথায়?’<br />
‘বিরাটী।’<br />
‘কোথায় যাবি?’<br />
‘ঝাওডাঙা।’<br />
‘আইডি কার্ড দেখা।’<br />
‘আই ডি কার্ড সাথে নাই।’<br />
‘ঝাওডাঙা কি করতে যাচ্ছিস?’<br />
‘আমার বোনের বাড়ি যাতেছি।’<br />
‘যাতেছি’ বলার পর আর কিছু বলার সুযোগ দিল না জওয়ানটি। বললো, ‘ ওঠ, নিচে নাম।’<br />
‘নামবো ক্যা?’<br />
‘ওঠ, নিচে নাম।’<br />
‘স্যার, আমি সত্যি কতেছি ঝাওডাঙা বোনের বাড়ি যাব।’<br />
‘ওঠ।’ এবার ধমকালো জওয়ান। ছেলেটি কাঁদো কাঁদো হয়ে নিচে নামলো।<br />
এই শীতেও অনিন্দ্য যেন ঘামছে। তবু ভাল একটা নাম জেনেছে, ঝাওডাঙা। কিছু জিজ্ঞাসা করলে সেও ঝাওডাঙা যাবার কথা বলবে। তবে ভাগ্য ভাল বি এস এফ জওয়াটিও নেমে গেল। হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো অনিন্দ্য এবং আরো অনেকেই।<br />
রাস্তার দু-পাশে ঘন বাঁশ ঝাড়। জঙ্গুলে একটা জায়গায় এসে বাস থামলো। হেলপার বললো, ‘যারা বাংলাদেশে যাবেন তারা নামেন। নেমে দৌড় দিন।’<br />
বাস থেকে প্রায় অর্ধেক যাত্রীই নেমে পড়লো। নেমেই যে যার মতো দৌড়তে লাগলো বাঁশ ঝাড়ের নিচ দিয়ে সরু রাস্তা ধরে। অনিন্দ্য, তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ দুজন, দুজন মাঝ বয়সী মহিলা, একজন বিবাহিত তরুণী, একজন যুবক, একজন প্রৌঢ়, তিনজন যুবতী, একটি বালক। সবাই দৌড়চ্ছে। কেবল অসুস্থ বৃদ্ধকে নিয়ে অসহায় নাতিটি পিছে তাকাতে তাকাতে যতটা দ্রুত সম্ভব হাঁটার চেষ্টা করছে।<br />
ঘাটে নৌকা নিয়ে প্রস্তুতই ছিল জহির। সবার উঠতে যতণ। দাদু আর নাতি বাদে সবাই উঠলো। তারা দুজন এখনও অনেক দূরে! নৌকা ছেড়ে দিল জহির। কারো মুখে কোন কথা নেই। কেবল ঘন নিশ্বাসের শব্দ!<br />
নৌকা থেকে নেমেই জহিরের কথা মতো আবার দৌড়! মাঠটা পার হতেই বটগাছের নিচ থেকে দরবেশের মতো একজন দালালদের প্রতিনিধি বেরিয়ে এলো। তার মুখেও একই বোল, ‘দৌড়ান, দৌড়ান&#8230;।’<br />
দৌড়তে দৌড়তে একটা বাড়ির পাশের মেহগনি বাগানে এসে থামলো সবাই। সেখানে এই যাত্রীদের জন্য অপেমান দশ-বারোটি মোটর সাইকেল। যাক, আর তবে দৌড়তে হবে না! হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো সাবাই। তখনই আরেক বাইক চালক এসে নির্দেশ দিল, ‘লুকান সবাই, লুুকান। ঐ ঘরে যান।’ অগত্যা ঐ ঘরের উদ্দেশ্যে আবার দৌড়! একে একে সবাই ঘরে ঢুকে দরজাটি আটকে দিল। ঘরটি গোয়াল ঘর! গবাদী-পশুর মল-মূত্রের ঝাঁঝালো গন্ধ পেটে পাঁক দিচ্ছে। কিন্তু কিছু করার নেই। নিঃশব্দে ঘামটি মেরে রইলো সবাই। প্রৌঢ় লোকটি উঁকি দিয়ে বাইরেটা দেখতে যেতেই একজন মাঝ বয়সী মহিলা তাকে মুখ ঝামটা দিল। এতণে বোঝা গেল তারা স্বামী-স্ত্রী। অথচ দৌড়নোর সময় মনে হচ্ছিল কেউ কাউকে চেনেই না!<br />
প্রায় মিনিট বিশেক গোয়ালবাস শেষে দালালদের ডাকে বেরিয়ে এলো সবাই। যে যার আপনজনের সাথে বাইকে উঠে পড়তে লাগলো। কেবল একা হয়ে পড়লো অনিন্দ্য আর বিবাহিত তরুণী। ছিপছিপে এক বাইকচালক তাদের দুজনকে বাইকে উঠতে বলতেই অনিন্দ্য বললো, ‘আমার সঙ্গে একজন পুরুষ দিলে ভাল হয়। কাঁধের ব্যাগ নিয়ে আমাকে পিছনে বসতে হবে। ততণে পুরুষের ঘাটতি পড়ে গেছে। তরুণীটি চটজলদি বললো, ‘সমস্যা নেই, আপনার ব্যাগ আমার কাছে দিয়েন।’<br />
অনিন্দ্য জানালো, ‘ব্যাগটা অনেক ভারী।’<br />
পূণর্বার জানালো তরুণী, ‘সমস্যা নেই। আপনি দিল আমাকে।’<br />
সমস্যা যে নেই তা তরুণীর মজবুত শারীরিক গঠন দেখেই বুঝতে পেরেছে অনিন্দ্য। তবু নিছকই ভদ্রতা করে বলা।<br />
অতঃপর বাইক চলতে শুরু করলো এ বাড়ির উঠোন, ও বাড়ির আনাচ-কানাচ দিয়ে। একসময় উঠলো মাটির রাস্তায়। উচু-নিচু গর্ত আর ধুলোময় রাস্তা। তরুণীর কাঁধে অনিন্দ্য’র ব্যাগ। ডান হাতে অনিন্দ্য’র কাঁধ আর বা হাতে পেট জাপটে ধরেছে। কিছুণ পরপরই অনিন্দ্য’র পিঠের ওপর ঝুঁকে পড়ছে সে। এই প্রথম অনিন্দ্যকে কেউ এভাবে জাপটে ধরেছে, এই প্রথম অনিন্দ্য’র পিঠে এমন কোমল মাংস পিন্ডের চাপ লাগছে!<br />
অসমতল রাস্তায় ধুলা উড়িয়ে প্রি গতিতে বাইক চলছে। না, অনিন্দ্য’র মনে কোন কাম ভাব জাগছে না। এতণ গোল্লাছুট আর লুকোচুরি খেলার পর এখন তার বুকের ভেতরটা ধূ ধূ মাঠের মতো খা খা করছে। বুকের ভেতর শূন্যতা, চোখ দুটোতেও শূন্যতা! আহা, তার নিজের যদি এমন কেউ থাকতো!</p>
<p><strong>ইছামতির জলে বিষন্ন নক্ষত্র</strong><br />
বটগাছের নিবিড়, গম্ভীর অন্ধকার ছায়া থেকে একে একে চৌদ্দজন মানুষ বেড়িয়ে এলো নীল দেওয়া সাদা কাপড়ের মতো জোছনা মোড়ানো মাঠটিতে। চতুর্দিকে কানে তালা লাগানো ঝিঁঝিঁপোকার ডাক। পিছন পিছন আসা একটি কুকুরের নিচুস্বরে ঘেউ ঘেউ, কিংবা সামান্য দূরের গৃহস্থবাড়ির নারিকেল গাছ থেকে ইঁদুরে কাটা কচি ডাব ভূ-পাতিত হবার শব্দেও বুকের মধ্যে ছ্যাৎ করে উঠছে কারো কারো। এমনকি মানুষের পায়ের আওয়াজ পেয়ে দ্রুত পলায়নপর  চিকার চিক চিক শব্দেও আঁৎকে উঠছে কেউ কেউ!<br />
দালালদের প্রতিনিধি ছেলেটি তাড়া দিল, ‘দৌড় লাগান, দৌড় লাগান। জোছনা রাত তো, অনেক দূরের থেকেও দেখা যায়।’<br />
কেউ কেউ হাঁটার গতি বাড়ালো, ছেলে ছোকরারা দৌড়তে শুরু করলো। প্রত্যেকেরই হাতে, কাঁধে, মাথায় ভারী ব্যাগ। দলটির মধ্যে একই পরিবারের সদস্য আছে নয় জন। বিমল-শ্যামল দুই ভাই, তাদের স্ত্রী, বৃদ্ধা মা, বিমলের দুই ছেলে-এক মেয়ে আর শ্যামলের এক ছেলে।<br />
পরিবারটির বাড়ী ছিল যশোরের অভয়নগর, ভৈরব নদের পারে চাঁপাডাঙা গ্রামের মালোপাড়ায়। পরিশ্রমী দু-ভাইয়ের দু-খানা টিনের ঘর ছিল। নিজস্ব জাল-নৌকা ছিল। ছিল দুধেল গাই আর ছোট্ট একটা হাঁসের খামার। হয়তো বনেদীয়ানা ছিল না, কিন্তু দুই ভাই আর তাদের স্ত্রীদের অকান্ত পরিশ্রমে অভাব নামক কুৎসিত বাতাস পরিবারটিতে ঢুকতে পারেনি কখনও।<br />
এই সুখ-স্বচ্ছন্দে চলমান পরিবারটি এক রাতেই পথে বসে গেল! টিনের ঘর-গোয়াল পুড়ে ছাই হয়ে গেল। জাল পুড়লো, হাঁসের খামার পুড়লো। হাঁস পোড়া গন্ধে মালোপাড়ার বাতাসও হাঁফিয়ে উঠেছিল। নৌকাখানা কুপিয়ে ফালা ফালা করে রেখে গেল ভৈরব নদের পারে। কেউ-ই কিচ্ছুটি করতে পারলো না। পরিবার-পরিজন নিয়ে কোন মতে সাঁতরে আশ্রয় নিয়েছিল ভৈরবের নদের অপর পারে। মানুষের আকৃতিতে কয়েকশো হিংস্র পশুর তান্ডবে শেষ হয়ে গেল গোটা মালোপাড়া!<br />
সকালে যখন ভয়ে ভয়ে অন্য সকলের সঙ্গে বিমল-শ্যামল মালোপাড়ায় ফিরলো, তখন মালোপাড়া শ্মশান! গোয়ালের চালের ফাঁকে যে চড়–ইয়েরা বাসা বানিয়েছিল তারাও ঘর ছাড়া। ভীত-সন্ত্রস্ত চোখে আমগাছের ডালে লাফাচ্ছে! পোড়া বুক বের করে দাঁড়িয়ে আছে ঘরের খুঁটিগুলো। খামারে হাঁস পুড়ে মরে আছে। আধপোড়া জীবন্ত হাঁসগুলোর গলায় যন্ত্রনার কাতরতা। গত ভাদ্র মাসে বিমলের বাবা মারা গেছেন। তার দেহ ভষ্ম পুটলিতে করে রেখে দিয়েছিল গঙ্গায় বিসর্জন দেবার জন্য। ভেবেছিল আসছে চৈত্রে ভারতে গিয়ে বাবার দেহভষ্ম গঙ্গায় বিসর্জন দিয়ে তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করে আসবে। সেই দেহভষ্ম, ঘর পোড়া রাশি রাশি ভষ্মের মধ্যে হারিয়ে গেছে! বিমলের মা পাগলের মতো খুঁজেছিল স্বামীর দেহভষ্মের পুটলিটা। পায়নি, বৃদ্ধা হাজার চেষ্টা করেও কোথাও খুঁজে পায়নি প্রিয়তম স্বামীর দেহভষ্ম!<br />
এখন সেই পোড়া ভিটেটাও বেচে দিয়ে জন্মের মতো চলে যাচ্ছে ভারতে। কি দোষ ছিল তাদের? জন্মগতভাবে তারা হিন্দু! তারা এদেশে সংখ্যালঘু! তাই মৌলবাদী-সাম্প্রদায়িক শক্তি জামাতের রোষ আর ত্রাসের শিকার হয়ে পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি ফেলে এই দেশান্তর হওয়া!<br />
দলটিতে আছে এক মুসলমান দম্পতি। এরা কলকাতা যাবে ডাক্তার দেখাতে। বাড়ি ঝিনাইদহ। তাই আর উল্টে ঢাকা যায়নি পাসপোর্ট-ভিসার জন্য। প্রৌঢ় লোকটির অকাট্য যুক্তি,‘ঘরের কাছে কলকাতা। কুড়ি টাকার টিকিট কাটে বনগাঁ লোকাল এ উঠলি-ই চলে গেলাম। কিডা আবার পয়সা খরচ করে ঢাকা যায় পাসপোর্ট-ভিসার জন্যে!’<br />
দলটির বাকী সদস্য একজন বাউল আর তার সাধন সঙ্গীনি। বটগাছের নিচে দাঁড়িয়ে শ্যামল জিজ্ঞেস করেছিল বাউলকে, ‘আপনাগের বাড়ি কনে?’<br />
বাউল উত্তর দিয়েছিল, ‘আমাদের বাড়ি-ঘর নাইরে বাবা! পথই আমাদের বাড়ি, পথেই আমাদের সংসার! আজ কুষ্টিয়া, নড়াইল, যশোর তো কাল নদীয়া, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া।’<br />
একে একে সবাই নৌকায় উঠলে নৌকা ছাড়লো জহির। বিমলের বউ মুখে আঁচল চেপে কাঁদছে। বাউল সঙ্গীনি সান্ত্বনা দিল,‘কিসের জন্যে কাঁদিস রে মা! কিছুই তো সঙ্গে করে আনিস নাই, কিছুই সঙ্গে যাবে না।’<br />
নৌকা চলছে। বৈঠার ছপ ছপ শব্দ, দু-পারে ঝিঁ ঝিঁ পোকার খঞ্জনি। তবু যেন সব শব্দ ছাপিয়ে উঠছে এই মানুষগুলোর দীর্ঘশ্বাস আর নিশ্বাসের শব্দ! বাউল সঙ্গীনি গুনগুনিয়ে গেয়ে উঠলো &#8211;<br />
শূূন্য থেকে এসেছ মন<br />
শূন্যতেই মিলাবা<br />
মাঝখানে তে মায়ার জলে<br />
মায়ার সাতার খেলা!<br />
মায়ার ঘোরে, দেহের জোরে<br />
মিছে মোহের খোয়াব দেখা&#8230;.</p>
<p>নৌকা কূলে ভিড়তেই বাউল সঙ্গীনির সুর ছাপিয়ে ডুকরে কেঁদে উঠলো বিমলের বৃদ্ধা মা! তার আকর্ষিক কাঁন্নায় সবাই হতভম্ব হয়ে গেল!<br />
মানুষগুলো জোছনার সীমানা ছাড়িয়ে গাছের অন্ধকারে হারিয়ে গেল। জহির ইছামতির মাঝখানে এসে বৈঠা তুলে রেখে পাটাতনে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়লো। চাঁদটা এখন চোখ বরাবর। সে একটার পর একটা নত্রে চোখ বোলাতে লাগলো অতিশয় আদরে। আজ অব্দি অনেক মানুষ পার করেছে জহির। অনেককে চোখের জল ফেলতে দেখেছে, অনেক অন্যায় দেখেছে, হাবিবুল কত মেয়েকে পাচারের উদ্দেশ্যে নিয়ে এসে পার হয়েছে তার নৌকায়! কিন্তু কিছুতেই কিছু আসে যায়নি তার। সে মানুষ পার করেছে, বিনিময়ে পেয়েছে টাকা। স্ত্রী-সন্তানের মুখে ভাত তুলে দিতে পেরেই সে খুশি থেকেছে। কিন্তু আজ হঠাৎ ঐ বাউল সঙ্গীনির গান আর ঐ বৃদ্ধার কাঁন্না কেমন যেন করে দিল তাকে। জীবনে কোনদিন দু-মুঠো ভাতের বেশি চিন্তা করেনি। অথচ আজ তার মনে প্রশ্ন জাগছে, সে কোথা খেকে এসছে? কেন এসেছে? আবার কোথায় চলে যাবে? মানুষ কত দিন বাঁচে? ষাট, সত্তর, আশি, নব্বই বা একশো! তবে কেন এই হানাহানি! কেন  এই দেশান্তর হওয়া! ঐ গান আর কাঁন্নার সুর যেন তাকে ভাবতে শিখিয়ে গেল! আকাশের নত্র গুনতে শিখিয়ে গেল। একটা, দুইটা, তিনটা&#8230;.। ইছামতির জলেও কত নক্ষত্র! বিষন্ন নক্ষত্র!</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://shahittabazar.com/%e0%a6%87%e0%a6%9b%e0%a6%be%e0%a6%ae%e0%a6%a4%e0%a6%bf%e0%a6%b0-%e0%a6%9c%e0%a6%b2%e0%a7%87-%e0%a6%ac%e0%a6%bf%e0%a6%b7%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%a8-%e0%a6%a8%e0%a6%95%e0%a7%8d%e0%a6%b7%e0%a6%a4/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
			</item>
		<item>
		<title>এই যে, শুনুন (একটি বড় গল্প)</title>
		<link>https://shahittabazar.com/%e0%a6%8f%e0%a6%87-%e0%a6%af%e0%a7%87-%e0%a6%b6%e0%a7%81%e0%a6%a8%e0%a7%81%e0%a6%a8-%e0%a6%8f%e0%a6%95%e0%a6%9f%e0%a6%bf-%e0%a6%ac%e0%a7%9c-%e0%a6%97%e0%a6%b2%e0%a7%8d%e0%a6%aa/</link>
					<comments>https://shahittabazar.com/%e0%a6%8f%e0%a6%87-%e0%a6%af%e0%a7%87-%e0%a6%b6%e0%a7%81%e0%a6%a8%e0%a7%81%e0%a6%a8-%e0%a6%8f%e0%a6%95%e0%a6%9f%e0%a6%bf-%e0%a6%ac%e0%a7%9c-%e0%a6%97%e0%a6%b2%e0%a7%8d%e0%a6%aa/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[আরিফ আহমেদ]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 31 Jan 2014 10:29:23 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[গল্প]]></category>
		<category><![CDATA[সাহিত্য]]></category>
		<guid isPermaLink="false">http://shahittabazar.com/?p=1654</guid>

					<description><![CDATA[<p>‘এই যে, শুনুন’ &#8211; এই একটি মাত্র বাক্য আমার সমস্ত অস্তিত্বকে যেমন নাড়িয়ে দিয়েছিল। আবার আমার অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত সব, সবকিছু এই একটি বাক্যই তছনছ করে দিয়ে গেছে। সেদিন</p><span><div class="readmore"><a href="https://shahittabazar.com/%e0%a6%8f%e0%a6%87-%e0%a6%af%e0%a7%87-%e0%a6%b6%e0%a7%81%e0%a6%a8%e0%a7%81%e0%a6%a8-%e0%a6%8f%e0%a6%95%e0%a6%9f%e0%a6%bf-%e0%a6%ac%e0%a7%9c-%e0%a6%97%e0%a6%b2%e0%a7%8d%e0%a6%aa/">...বিস্তারিত &#8594;</a></div>]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<div id="attachment_1655" style="width: 250px" class="wp-caption alignleft"><a href="http://shahittabazar.com/wp-content/uploads/2014/01/IMG0028A.jpg"><img loading="lazy" decoding="async" aria-describedby="caption-attachment-1655" class="size-medium wp-image-1655 " alt="IMG0028A" src="http://shahittabazar.com/wp-content/uploads/2014/01/IMG0028A-240x300.jpg" width="240" height="300" srcset="https://shahittabazar.com/wp-content/uploads/2014/01/IMG0028A-240x300.jpg 240w, https://shahittabazar.com/wp-content/uploads/2014/01/IMG0028A.jpg 300w" sizes="auto, (max-width: 240px) 100vw, 240px" /></a><p id="caption-attachment-1655" class="wp-caption-text">আরিফ আহমেদ</p></div>
<p>‘এই যে, শুনুন’ &#8211; এই একটি মাত্র বাক্য আমার সমস্ত অস্তিত্বকে যেমন নাড়িয়ে দিয়েছিল। আবার আমার অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত সব, সবকিছু এই একটি বাক্যই তছনছ করে দিয়ে গেছে। সেদিন বেশ মেঘ ছিল আকাশে। আকাশে মেঘ দেখেই আমার ভিতরে কোথাও একটা ঝড় শুরু হয়ে গিয়েছিল। কারণ মেঘ মানেই বিষন্ন প্রকৃতি। বিষন্ন ভালবাসা। মেঘ কেটে গিয়ে যতণ না বৃষ্টি শুরু হত, ততণ স্বস্তি পেতাম না। মনে হত, এই বুঝি ও আমাকে ফেলে চলে যাচ্ছে। এই বুঝি ও খুব যন্ত্রণায় ছটফট করছে। ও বৃষ্টিকে খুব পছন্দ করে। বৃষ্টি মানেই ওর কাছে আমার ছোঁয়া। প্রায়ই বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে পথ চলত আর আমাকে ফোন করে বলত  &#8211; এই, আর একটু জোরে জড়িয়ে ধর না।<br />
আমি ওকে ধমকাতাম  &#8211; বৃষ্টিতে ভিজ না, ঠাণ্ডা লাগবে।<br />
উত্তরে ও বলত  &#8211; লাগতে দাও, তাহলেই তো ডাক্তারের কাছে যাওয়ার একটা রাস্তা হবে।<br />
হ্যাঃ পেশায় আমি একজন ডাক্তার। মোটামুটিভাবে আমার পেশায় আমি সুনামের সাথেই কাজ করছিলাম। আর এখানেই হচ্ছে যত সমস্যা। ঘর সামলানো, বাচ্চাকে সময় দেয়া, ওকে সময় দেয়া, সবার উপরে আমার পেশাগত দায়িত্ব। শুক্রবার বাদে সপ্তাহের ছয়দিনই আমাকে প্রচণ্ড ব্যস্ত থাকতে হয়। কখনো কখনো শুক্রবারটাতেও ফুরসত পাই না। গরীব-অসহায় কোন মা তাঁর সন্তানকে নিয়ে আমার কাছে আসলে তাকে আর নিরাস করতে পারিনা। বেশিরভাগ সময় গরীব রোগীদের ফ্রী চিকিৎসা দিতে হয়। এটা ওর বিশেষ অনুরোধ। ওর কথা হচ্ছে &#8211; অর্থাভাবে তোমার কাছ থেকে কোন রোগী যেন ফিরে না যায়। চেষ্টা করবে দিনের শুরুটা বিনামূল্যের চিকিৎসা দিয়েই শুরু করতে। তাতে কিছু না হোক আমার আত্মা শান্তি পাবে, কথাটা মনে রেখ।<br />
এমনিতেও কোন রোগীকেই আমি অবহেলা করতে পারি না। ও নিজেও সেটা পছন্দ করে না। ওর কথা হচ্ছে &#8211; যদি দেখ রোগীরা বসে আছেন কিন্তু তোমার প্রার্থনার সময় পার হয়ে যাচ্ছে, খবরদার রোগীদের বসিয়ে রেখে কখনো প্রার্থনা করতে যাবে না। তোমার কাজই তোমার প্রথম ধর্ম কথাটা মনে রেখ।<br />
ওর এ রকম বেশ কিছু কথা আছে, যা আমার খুব ভালো লাগে। আর এই একটি জায়গায় এসে আমি ওকে প্রচণ্ড ভালবাসি, প্রচণ্ড।<br />
আকাশে কালোমেঘ দেখেই বুকের ভিতর ছাৎ করে উঠল। আমাদের দেড় বছরের সম্পর্কে আমি এটুকু উপলব্দি করতে পেরেছি যে, কালোমেঘ মানেই আমাদের দুটি মনের দুরত্ব বেড়ে যাওয়া। কালোমেঘ মানেই অস্থির প্রকৃতির অস্থিরতার প্রভাবে আমাদের দুটি মনের কষ্ট বেড়ে যাওয়া। প্রকৃতির বিষন্নতায় মানুষের মনের উপর এতোটা নিবিড় প্রভাব ফেলতে পারে আগে কখনো বিশ্বাস হত না। ওর সাথে জড়িয়ে, এখন আর বিশ্বাস না করে উপায় নেই।<br />
প্রথমদিকে অবশ্য গুরুত্ব দিতাম না। ভাবতাম এটা ওর মনগড়া। কিন্তু সেদিন আকাশে মেঘ দেখেই ও বলে উঠল, সূর্য তাড়াতাড়ি শক্ত করে আমায় জড়িয়ে ধর। আমি তখন লজ্জায় ধরতে পারছিলাম না। মাত্র ৩ দিনের পরিচয়, এর মধ্যেই ঘরের বাহিরে এসেছি, এখন বলে জড়িয়ে ধর। আমি ধরছি না দেখে ও নিজেই আমার হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে আঁকড়ে রাখল, আর বলল &#8211; কখনো এটা করনা। এই যে প্রকৃতি দেখছো, ওরা আমার তোমার এই সম্পর্কটা তৈরি করে দিয়েছে। আকাশে কালোমেঘ মানেই প্রকৃতি বিষন্ন বা রুষ্ট। প্রকৃতি বিষন্ন দেখলেই আমাকে জড়িয়ে থেক, তা না হলে আমরা সিটকে যাব। আমাদের সম্পর্ক টিকবে না।<br />
আমি তখন ওকে বাঁধা দিয়ে বলেছিলাম &#8211; যাও প্রকৃতি চলবে তার নিয়মে, মানুষের সাথে কি তার তুলনা চলে। মানুষ আর প্রকৃতিতো এক নয়।<br />
উত্তরে ও বলল &#8211; সবাই নয়, এটা ঠিক। কিন্তু সবসময় মনে রেখ, দু’একজন মানুষ, তাদের স্বভাব-চরিত্র সবটাই প্রকৃতির সাথে বেশ মিলে যায়। আর আমার তোমার কথা বলছো? আমাদের সবটাই প্রকৃতির হাতে মনা। আদর করে ও আমায় কখনো সূর্য আবার কখনো মনা বলতো। ওর মনা ডাকটাই আমার সবচেয়ে বেশি পছন্দ, যদিও এ কথা ওকে কখনো বলা হয়নি।<br />
ও বলতো &#8211; তুমি সূর্য আর আমি পৃথিবী, হিসাবটা বোঝ? পৃথিবীতে যদি ঝড় হয়, আকাশে বিদ্যুত চমকাবেই। আর স্বাভাবিক নিয়মেই তখন সূর্য হারিয়ে যাবে মেঘের আড়ালে।<br />
না তখন ঠিক বুঝিনি হিসাবটা, তবে ধীরে ধীরে ল্য করেছি যে আকাশে কালোমেঘ মানেই আমার আকাশে বিদ্যুতের ঝলক, আর পৃথিবীতে ঝড়ের তাণ্ডব। কোন না কোন অজুহাতে আমাদের মধ্যে তখন মনমালিন্য দেখা দেবেই। কোন না কোন আঘাতে আমরা দু’জন সেদিন কাঁদবোই। মেঘ কেটে গেলেই আবার সব সুন্দর, ফকফকা। আবার আমরা আমাদের ভুলগুলো শুধরে নিয়ে আনন্দে মেতে উঠি। ছেলে আলাওলকে কাঁধে বসিয়ে ও তখন খেলা করে বেড়ায়। খেলার ফাঁকেই আলাওলকে চুমু খাওয়ার ছলে আমাকেও চুমু খেয়ে যায় সকলের অজান্তে। এমন গভীরভাবে কেউ কাউকে ভালবেসেছে কিনা আমার সন্দেহ আছে। তাই সেদিনও আকাশে কালোমেঘ দেখেই আৎকে উঠেছিলাম।<br />
হঠাৎ ঝড়ের মতই ও এল, বলল &#8211; ‘এই যে, শুনুন, অনেক কেঁদেছি আপনার জন্য, আর কাঁদতে চাই না’। বলেই আমার কপালে ও ললাটে চুমু খেয়ে বলল &#8211; ‘আল্লাহ হাফেজ’।<br />
আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই স্কুটারে চেপে চলে গেল ও। পিছন থেকে আমার ডাক ওর কানে পৌঁছলো কিনা জানি না। স্তম্ভিত আমি, মন্ত্রমুগ্ধের মত অনেকটা সময় দাঁড়িয়েছিলাম, তারপর কি ঘটেছে যখন বুঝতে পারলাম, তখনই ওর এসএমএস এল।<br />
তাতে লেখা &#8211; “স্যরি ম্যাডাম, আপনাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করেছিল, তাই হঠাৎ এসে দেখে গেলাম। আপনি এভাবে অপমান করবেন জানতাম না। করলেন, হলাম। তারপরও আপনাকেই ‘ভালবাসি’ বলে চিরদিনের জন্য হারিয়ে গেলাম। আই লাভ ইউ।”<br />
মাথাটা ঘুরে উঠল। কোথায়, কীভাবে ওকে অপমান করলাম বুঝতে পারলাম না। কোনভাবে অফিস থেকে বের হয়ে গাড়িতে চেপে বসেই জ্ঞান হারিয়েছিলাম হয়ত। কারণ গাড়ি বাসায় পৌঁছলে আমার মা-ভাইয়েরা আমাকে ধরাধরি করে নামাল এটা টের পেলাম শুধু।<br />
আমি একজন ডাক্তার, সেই আমাকেই ডাক্তারের চিকিৎসাধীন থাকতে হল প্রায় এক সপ্তাহ। প্রেসার বেড়ে গিয়েছিল। আর একটু দেরী হলে ঘাড়ের রগ ছিঁড়ে চিরদিনের জন্য পঙ্গু হয়ে যেতাম হয়ত। একটা পঙ্গু মেয়েকে নিয়ে কি করে কাটাতে বাকীটা জীবন?<br />
ধূৎ কাকে বলছি। যাকে বলছি সেতো কোনদিন আর ফিরে এলো না। একবারও বুঝতে চাইল না তার সূর্য শুধু তারই আছে। অন্য কারো নয়। কতটা মানসিক দকল সহ্য করে এখনো বেঁচে আছি, এখনো তোমার জন্য পথ চেয়ে ছেলেকে নিয়ে সেই গাছটির গোড়ায় গিয়ে অপো করি। আমাকে লেখা তোমার সেই কবিতাটি একটু ঘুরিয়ে এখন আমিই পড়ি প্রতিদিন। তুমি লিখেছিলে &#8211;<br />
গাঁও গ্রামের সরল সোজা মূর্খ ছেলে,<br />
সুযোগ পেলেই কবিতা লেখে ছন্দ ভুলে।<br />
সেই ছেলেকে ভালবাসার স্বপ্ন দিয়ে<br />
যেই মেয়েটি ছেড়ে গেল কষ্ট দিয়ে<br />
“আল্লাহ তাকে সুখে রাখুন”-এই দোয়াতে,<br />
সেই ছেলেটি কান্দে এখন পার্কে বসে।<br />
আমার একদিন একটু আসতে দেরী হওয়ায় তুমি এরকম ভয়ংকর একটি কবিতা এসএমএস করে পাঠিয়েছো আমাকে? কবিতাটি পড়ে কাঁদতে কাঁদতে আমি আমাদের গাছটির কাছে ছুটে এসে তোমাকে জড়িয়ে ধরেছিলাম। আজ আমি তোমার ঐ কবিতাটি একটু ঘুরিয়ে পড়ছি &#8211;<br />
শহরবাসী সরল সোজা মূর্খ মেয়ে,<br />
কাজের মাঝে ব্যস্ত হয়ে কষ্টগুলো থাকছে ভুলে।<br />
সেই মেয়েকে ভালবাসার স্বপ্ন দিয়ে<br />
যেই ছেলেটি ছেড়ে গেল কষ্ট দিয়ে<br />
“আল্লাহ তাকে সুখে রাখুন”-এই দোয়াতে<br />
সেই মেয়েটি কান্দে এখন পার্কে বসে।<br />
কত শতবার, অসংখ্যবার আমি এই কবিতাটি পড়ি, আর এদিক ওদিক তোমাকে খুঁিজ, কই আমার বুকে এসেতো তুমি ঝাঁপিয়ে পড়লে না সাধন। তুমি কি জান? তোমার যুদ্ধজয়ী ছেলেটা আজ কত বড় হয়েছে? আর কখনো কোন অসুখ-বিসুখ ওকে স্পর্শ করেনি। খোদা তোমার প্রার্থনা কবুল করেছেন হয়ত। তাই আমরা মা ও ছেলে শারীরিকভাবে সুস্থই আছি। ও এখন কলেজে পড়ছে। প্রায়ই ও প্রশ্ন করে &#8211; মা, আমরা এই গাছটার কাছে কেন আসি? কি উত্তর দেব ওকে? বলে যাও।<br />
লেকের পাড়ের এই গাছটি আমাদের ভালবাসার সাী। ওকে কি তা বলে দেব। ওর ভাবনায় তোমার কোন অবস্থান এখনো আছে কিনা জানিনা। তবে এখনো ও স্বপ্নে বাব্বা বাব্বা বলে কেঁদে ওঠে। আমায় প্রশ্ন করে &#8211; মা বাব্বাটা কে? আমি কেন ঘুমের মধ্যে বাব্বা, বাব্বা বলি?<br />
ওটা দুঃস্বপ্ন বলে এড়িয়ে যাই ওকে। নিজে বাথরুমে গিয়ে, দরজা বন্ধ করে কাঁদি। সে কান্না কি শুনতে পাও না?<br />
তুমি প্রকৃতির কান্না বোঝ!<br />
মানুষের কান্না বোঝ না?<br />
তুমি যখন ছিলে তখন বাবুর বয়স মাত্র একবছর তিনমাস। আজ সেই বাবু ১৬ বছরের যুবক। কত দীর্ঘ সময় আমাদের দেখা নেই। কি অপরাধে আমাকে ছেড়ে গেলে? কী অপমান আমি তোমাকে করেছিলাম? শুধু এই একটা প্রশ্ন তোমাকে করবো বলে এখনো বেঁচে আছি। কোথায় তুমি? কেমন আছ? আজ খুব জানতে ইচ্ছে করছে। আল্লার কসম, ভালবাসার কসম লাগে ফিরে এসে শুধু একবার বলে যাও আমার কি অপরাধ ছিল? আমি যে এখনো তোমার বুকে মাথা রেখেই মরতে চাই।</p>
<p>দুই<br />
ডাঃ সূর্যমূখী যখন এভাবে একের পর এক প্রশ্নবাণে নিজের ডায়রীর পাতা ভরছেন, ঠিক তখন কুয়াকাটার সমুদ্রের পাড়ে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে নিজের ডায়রীর পাতা উল্টাচ্ছেন সাংবাদিক সাধন তালুকদার।<br />
সূর্যমূখী। জানিনা কেমন আছ, তবে দোয়া করি আল্লাহ যেন সব সময় তোমাকে আর তোমার ছেলেকে ভালো রাখেন। আমার জীবনের বিনিময়ে হলেও আল্লাহ তোমাদের ভাল রাখবেন ইনশাহ্আল্লাহ। তোমার হয়ত অনেক প্রশ্ন আমার কাছে। জানি অসংখ্য ‘কেন’ জমে আছে তোমার মনে? বিশ্বাস কর! সব ‘কেন’র উত্তর তোমার কাছেই আছে। একটু ভাবলে পেয়েও যাবে। কিন্তু তুমি ভাববে না, আসলে ভাবার মত অবসরই তো তোমার নেই। এখনো কি তুমি আগের মতই মহাব্যস্ত? বাবাকে দেয়ার মত সময় টুকুও নেই হাতে।<br />
জানি না। শুধু জানি সূর্যের আলো ছাড়া পৃথিবী ক্রমশ ধ্বংসের দিকেই যাচ্ছে। তোমার পৃথিবীতে আজ আর কোন আবাদ নেই, কোন সৃজনশীলতা নেই। সাংবাদিকতা ছেড়ে সেই যে চলে এলাম আর কখনো কোন কিছু সৃষ্টি করতে পারিনি।<br />
তুমি হয়ত জানতে চাও আমি কেন ওভাবে তোমাকে ফেলে চলে এলাম? না এসে যে উপায় ছিলনা সূর্যমূখী। আমি তো বারবার তোমাকে বলেছি &#8211; তুমি সূর্যমূখী ফুল নও যে, তোমাকে দেখেই তৃপ্তি পাব। তুমি সূর্যমূখী চাঁদ। চাঁদ যেমন সূর্য থেকে আলো নিয়ে পৃথিবীকে জোৎস্না দেয়, তেমনি তুমিও আমার বুকে জোৎস্না ঢাল। তোমার স্পর্শেই আমার সজীবতা সূর্য।<br />
আমাদের সম্পর্ক তৈরির সেই প্রথমদিনটির কথা মনে আছে সূর্য? ঐদিনটি ছিল শুক্রবার। তোমার বাবার জন্মদিনে তোমরা বিশাল বড় অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলে। আমি অনুষ্ঠানে পৌঁছলাম বেশ দেরী করে। তুমি তখন চলে যাবার জন্য গাড়িতে চড়ছিলে। ‘এই যে, শুনুন’, বলে আমি তোমার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। আমাকে দেখেই তোমার গালে টোল পড়ল।<br />
বললে &#8211; এতো দেরী করলেন? অনুষ্ঠানতো প্রায় শেষ। আমি চলে যাচ্ছিলাম, চলুন আপনাকে পৌঁছে দিয়েই না হয় যাব।<br />
এ কথা বলে তুমি আমার সাথে চলতে শুরু করলে। আমি একটু অবাক হলাম, কারণ তোমার সাথে আমার পরিচয় প্রায় ৫ মাস হয়ে গেছে। কখনো এতটা আন্তরিকতা আগে দেখাও নি। আমার সাথেই তুমি লিফটে চড়লে। আমাদের গন্তব্য সাত তলার অডিটোরিয়ামে। কিন্তু হঠাৎই যেন নার্ভাস হয়ে পড়লে তুমি। ২য় তলায় লিফট থামতেই তুমি অনেকটা তাড়াহুড়ো করে ২য় তলায় নামতে নামতে আমাকে বললে- আপনি যান। আমি একটা রোগী দেখে আসছি।<br />
আমাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই নেমে গেলে তুমি। বিশ্বাস কর ঐ দিনটির আগমূহূর্ত পর্যন্ত তোমার প্রতি কোন আগ্রহ ছিল না আমার। কারণ আমি জানি তুমি স্বামী-সন্তান নিয়ে বেশ সুখে আছ। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে আমার মনটা বিষন্ন হয়ে গেল। আমি আর অনুষ্ঠানে গেলাম না। ঐ লিফটে চড়েই নীচে নেমে এলাম। আমার মনটা তখন এমনিতেই খারাপ ছিল। ঘরে আমার স্ত্রীর সাথে আমার সম্পর্ক ভালো যাচ্ছিল না। যে কারণে অফিসে কাজের তি হচ্ছিল এবং তোমার বাবা এ নিয়ে তোমার সাথে আলাপও করেছিলেন। তোমার বাবার কাছে তুমি যে আমার সম্পর্কে সব আগেই জেনে বসে আছ তা কিন্তু আমি জানতাম না। তোমার বাবার কাজ করতে বেশ ভালোই লাগছিল। কিন্তু তখনো তোমার প্রতি কোন আগ্রহ আমার ছিল না। তুমি পাগলামীটা না করলে হয়ত কোনদিন হতও না। কারণ আমি মানসিকভাবে প্রচণ্ড সৎ একজন মানুষ। যার নিজের কাছে নিজেকে কখনো জবাবদিহিতে পড়তে হয় না। তুমি হঠাৎ ওভাবে লিফট থেকে নেমে যাওয়ায় আমি খুব অপমান বোধ করলাম। নিজেকে খুব ছোট ও হীন মনে হল। একেতো ঘরে স্ত্রীর সঙ্গে বনিবনা হচ্ছিল না। তার উপর তোমার এ আচরণটায় মনে হল এ সমাজে মানুষ হিসেবে আমি বড় অযোগ্য।<br />
একদিন কাজের অবসরে তুমি বলছিলে &#8211; বাঃ সাধন সাহেব। বাবা এমনিতে সাংবাদিকদের পছন্দ করেন না। কিন্তু আপনাকে দেখি রীতিমত ভালোবাসেন।<br />
তখন আমি তোমাকে বলেছিলাম &#8211; জানেন ম্যাডাম, আমি না কোথাও বেশিদিন টিকতে পারি না। এই যে আপনার বাবা বা আপনি যে প্রশ্রয়টা দিচ্ছেন এর বয়স বড় জোর ৪ মাস। এরপর আপনারাই আমাকে তাড়িয়ে দেবেন।<br />
তুমি হেসে বলেছিলে &#8211; তাই নাকি? আচ্ছা দেখা যাক।<br />
তোমার বাবার কাজে গিয়ে কোথাও কোন পরামর্শ দরকার হলে, সেটা তোমার কাছে এসএমএস এর মাধ্যমে মেসেজ দিতাম। আমার মেসেজ পেলেই তুমি ফোন করে পরামর্শ দিতে। মাঝে মধ্যে বিরক্ত হতে তাও বুঝতাম। কিন্তু লিফট থেকে নেমে যাওয়ার পিছনে কি বিরক্তির আচরণ করেছিলাম তা মনে করতে পারিনি। আমার খুব কষ্ট লেগেছিল। প্রচণ্ড কষ্ট।<br />
আমি তাই তোমাকে একটা এসএমএস লিখলাম- ‘স্যরি ম্যাম, চার মাস না আজ থেকেই আমাদের যোগাযোগ শেষ হল। না আমি আর আপনাকে বিরক্ত করবো, না আপনি আর আমাকে ফোন করবেন। আপনি ফোন করলেও আমি তা আর রিসিভ করবো না। স্যরি এন্ড থ্যাঙ্কস ফর ইউর অল কাইন্ডনেস।’<br />
মেসেজটি পাঠিয়েই আমি আমার ফোন বন্ধ করে দিলাম। বাসায় ফিরে আবার সেই একই ঝামেলা। আমার স্ত্রী’র মধ্যেকার অবিশ্বাস, আমাকে নিয়ে তার সন্দেহ রোগ। যা আমি কোনদিন করিনি সেই সব সন্দেহ অভিযোগ তুলে ঝগড়া এবং রাগ করে বোনের বাড়িতে তার চলে যাওয়া। এ সব কারণে বিপ্তি মন আমার। আমিও দূরে কোথাও চলে যাওয়ার জন্য বাসে চড়ে বসলাম।</p>
<p>তিন<br />
দূরের এক জেলা শহরে নদীর তীরে বসে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিচ্ছিল সাধন তালুকদার। পাশ থেকে হঠাৎই বন্ধু গালিব অভিযোগ করে বসল &#8211; কিরে তোর কি হয়েছে বলতো? দু’দিন যাবৎ তোর ফোন বন্ধ। ঢাকা থেকে তোকে খুঁজতে অস্টিন, দুর্জয়, সেলিম, মানস, স্বীকৃতি সবাই আমাকে ফোন করছে। তোর অফিস থেকে নাকি ওদের কাছে বারবার ফোন আসছে। তোর কোন ট্রেস চাচ্ছে তারা। তুই কোন অঘটন ঘটিয়ে আসিছ নাই তো?<br />
বন্ধুর এ প্রশ্নে হেসে ফেলে সাধন &#8211; নারে ভয় নেই। কারো কোন তি করে আসি নাই যে তুই বিপদে পড়বি।<br />
গালিব উত্তর দেয় &#8211; সে ভয় তোকে নিয়ে কখনো করি না। তবে তোর স্ত্রীর সাথে তোর সম্পর্ক ভালো না থাকায়, তোর মনের অবস্থা ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। এত বিষন্ন থাকিস নাতো। ফোন খোল, সকলের সাথে কথা বল। দেখবি মন ভালো হয়ে যাবে।<br />
ঐ সময় ফোনটা বাসায় রেখে আসায় আর খোলা হয় না। আড্ডা শেষে ঘরে ফিরতে ফিরতে রাত্র একটা। ঘরে ফিরেই প্রথম ফোন খুলল সাধন। মিনিট পাঁচেক যেতে না যেতেই সূর্যমূখীর ফোন। রিসিভ করবে কি করবে না ভাবতে ভাবতেই বেশ ক’বার রিং হয়ে থেমে গেল। এরপর কল এল একটি টিএনটি নাম্বার থেকে। ধরতেই ও প্রান্তে সূর্যমূখীর করুণ কণ্ঠ ভেসে এল &#8211; প্লিজ আমার ফোনটা একটু রিসিভ করুন। আপনার সঙ্গে কথা আছে।<br />
উত্তরে সাধন বলল &#8211; স্যরি ম্যাম আমি খুব বিষন্ন, এখন কারো সাথেই কথা বলতে পারবো না। আমি আমার আচরণের ব্যাখ্যাটা এসএমএস করে দিচ্ছি। বলেই লাইন কেটে দিল সাধন।<br />
মিনিট পাঁচেক পর ও লিখল- ‘স্যরি এটা আপনার সমস্যা না আমার একান্তই ব্যক্তিগত সমস্যা। সম্ভবত আমি আপনাকে পছন্দ করি (সধু ন রষঁ)। তাই দয়া করে আর ফোন করবেন না’।<br />
মেসেজটি পাঠিয়েই আবার ফোন বন্ধ করে দিল ও। পরদিন আর খুলল না। তারও পরদিন মাঝরাতে ফোন খুলতেই একটি নতুন নম্বর থেকে অসংখ্য এসএমএস এসে ভরে গেল। একটা মেসেজ মাত্র পড়েছে, এর মধ্যেই ঐ নম্বরটি থেকে ফোন এল। এতরাতে কার ফোন। প্রথমে ভেবেছিল হয়ত ওর স্ত্রী ওকে পরীা করতে এটা করছে। কিন্তু কণ্ঠ শুনে বুঝল যে, এটা সূর্যমূখী। ফোন রিসিভ হতেই ওপ্রান্তে হাউ মাউ করে কান্না শুরু হল। কান্নার শব্দে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল সাধন। সূর্যমূখী নিজেই তার ভুলটা ধরতে পেরেছে, কাঁদতে কাঁদতে তাই সে বলল যে, সে নিজেও জানেনা কেন সে হঠাৎ ওভাবে লিফট থেকে নেমে এসেছে।<br />
সূর্যমূখীর জবাব শুনে স্তম্ভিত সাধন আর নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারল না। সোজাসাপ্টা প্রশ্ন করে বসল &#8211; ম্যাম, আর ইউ স্যূয়র, আপনি কোন কারণ ছাড়াই নেমে গেছেন?<br />
ও প্রান্ত থেকে উত্তর এল &#8211; হ্যাঃ। কোন কারণ ছিল না।<br />
সাধন জানতে চাইল &#8211; নাউ ইউ থিংক ইট প্লিজ। আর ইউ ই্ন লাভ উইথ মি।<br />
সূর্যমূখী &#8211; আই ডনট নো, বাট মে বি আই ফিল উইকনেস টু ইউ। বাট ইন নাউ আই লাভ ইউ। প্লিজ কাম ব্যাক ইন টুমোরো।<br />
সাধন- ইয়া, আই উইল ডু ইট। বাট, ইউ হ্যাব<br />
সূর্যমূখী- প্লীজ কাম ব্যাক, আমরা সামনাসামনি কথা বলবো।<br />
সাধন- ওকে, আই অ্যাম কামিং।</p>
<p>চার<br />
পরদিন সকালের ট্রেনেই ঢাকায় চলে এসেছিল সাধন। পথে আসতে আসতে আমার সাথে ওর অনেক কথা হয়েছিল। বাবার অফিসে চুক্তিভিত্তিক একটি গবেষণার কাজ করছিল ও। একই অফিসে আমি হাফবেলা কাজ করতাম। তাই সকালে এসে যখন ও আমার রুমে উঁকি দিল, মনে হল আমি আমার জীবনটা মাত্রই হাতে পেলাম। এর আগে এ উপলব্দি আমার কখনো হয়নি। জীবনটাকে ভালোভাবে বুঝে ওঠার আগেই বিয়ের পিঁড়িতে বসেছিলাম। যাকে বিয়ে করেছি তার সাথে কোন প্রেম ছিলনা তবে আমিই তাকে পছন্দ করেছিলাম। তখন অবশ্য ভালবাসা কি তা বোঝার বয়স আমার হয়নি। ঐ মূহুর্তে সাধনকে দেখেই নিজের মধ্যে প্রাণ ফিরে পেলাম যেন। মুখোমুখি বসে আমরা কথা বললাম। ওর লেখা একটি কবিতা সেদিনের পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। ও সেটি পড়ে শোনাল &#8211;<br />
দেহ তাঁর শ্যামলিমার মনমুগ্ধ হাসি<br />
চোখে দাঁড় বেয়ে যায় পদ্মার মাঝি<br />
চুল ছুঁয়ে উড়ে যায় পাখিরা নীড়ে<br />
সৌম্য মুখে তাঁর বেদনা ঘোরে।<br />
আমার পায়ে চলা প্রতিটা বাঁকে<br />
তারই হাতছানি দেখি, সে-ই আমায় ডাকে।<br />
আমি জানতে চাইলাম ‘সৌম্য মুখে বেদনা ঘোরে’ কথার মানে কি?<br />
উত্তরে ও বলল &#8211; যেমন আপনি। সব সময় হাসি খুশি একজন ডাক্তার। অথচ হাসির আড়ালে লুকানো কষ্টের পাহাড়।<br />
বললাম &#8211; যান, আমার কোন কষ্ট নেই।<br />
ও একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল &#8211; প্রার্থনা করি যেন না থাকে কখনো।<br />
এ কথায় আমি চুপসে গেলাম। অনেক সময় নিয়ে রোগী দেখলাম আর ফাঁকে ফাঁকে ওর সাথে কথা বললাম। কিন্তু কেউই কারো মনের কথা বলতে পারলাম না। সব কথাই হল কাজ আর ঘরের পরিস্থিতি নিয়ে। আমি ওর বউয়ের সর্বশেষ অবস্থা জানতে চাইলাম। ও অবাক হল দেখে মজা পেলাম। বললাম বাবা আমাকে সব বলেছেন। দেখলাম বউয়ের প্রতি ওর যথেষ্ট সম্মানবোধ। খুব বেশি ভাল না বাসলে এটা হয় না। ও তার কোন দোষই বলল না, বরং প্রশংসাই করল। শুধু এটুকু বলল যে, বেচারী আমাকে নিয়ে খুব কষ্টে ছিল।<br />
কিন্তু ও আমার স্বামী প্রসঙ্গে কোন কথা বলল না। তবে ছেলের কথা জানতে চাইল। আমাকে বোঝাল যে, আমি আসলে রাগের মাথায় একটা অন্যায় করতে যাচ্ছি। এটা ভালবাসা না জেদ। আমিও ভেবে দেখলাম, হয়ত সাধন ঠিক বলেছে। যাই হোক, সেদিন আমরা দু’জন দু’জনকেই অনেকটা সময় নিয়ে বোঝার চেষ্টা করলাম, তারপর দু’জনই দু’জনকে সৎ পরামর্শ দিয়ে ঘরে পাঠালাম। সকালে কথা হবে বলে বিদায় নিলাম আমরা।<br />
পরদিন অফিস বন্ধ। সকালে ওকে ফোন করলাম, দেখি ওর ফোন বন্ধ। ভাবলাম হয়ত বউ ফিরে এসেছে তাই ইচ্ছে করে ফোন অফ করে রেখেছে। ভাবনাটা মাথায় আসতেই আমি কেমন পোটে হয়ে উঠলাম। বার বার ফোন করছি আর এসএমএস করছি। তারপর টিকতে না পেরে একসাথে অনেকগুলো ঘুমের ঔষধ খেয়ে ফেললাম। মনে হচ্ছিল আমি মরে যাচ্ছি। ওকে বুঝি আর শেষ দেখাটাও দেখতে পাব না। আমার ঘরের লোকজন দ্রুত আমাকে হাসপাতালে নিয়ে গেল। হাসপাতালে আমার পেট ওয়াস করাল। দুপুরের পর সুস্থ হয়ে ঘরে এসে দেখি ওর ফোন খুলেছে। আমার এসএমএসগুলো সব ডেলিভার হয়েছে। একটু পরেই দেখি ওর ফোন। ও প্রান্তে ওর ভীত-অথচ উত্তেজিত কণ্ঠস্বর আমার খুব ভালো লাগছিল। আমার কণ্ঠশুনেই ও কিছুটা আঁচ করতে পেরেছে। প্রায় পাগলের মতই ছুটে এসেছে ও। আমি বাধা না দিলে হয়ত ঘরেই চলে আসত। আমার বাসার কাছে এসে দাঁড়িয়েছে শুনে স্বস্তি পেলাম। সাধারণত আমি চেম্বার করি বিকাল ৫টা থেকে। ঐদিন একটু আগেই গেলাম। বাসা থেকে বের হবার আগে আমি অনেকদিনপর নিজেকে একটু সাজালাম। ওর পছন্দের নীল রং শাড়ি পরলাম। বাহিরে তখন কড়কড়ে রোদ, তার উপর বৃষ্টি পড়ছে। বেশ একটা অন্যরকম দিনের স্বাদ পাচ্ছিলাম। এ রকম রোদ্রঝরা বৃষ্টি অনেকদিন দেখিনি। আমি চেম্বারে ঢুকে বসতে না বসতেই অনেকটা পাগলের মতই ও ঢুকল। ঢুকেই চেম্বারের দরজা বন্ধ করে উম্মাদের মত আমার গালে, কপালে, ঠোঁটে চুম্বন শুরু করে দিল। তারপর শান্ত হয়ে বসে জানতে চাইল কেন এ পাগলামী করেছি।<br />
আমি উত্তর দিলাম &#8211; জানিনা। তুমি কখনো ফোন বন্ধ করলে আমাকে বলে বন্ধ করবে কথা দাও। কখনো সকালে ফোন খুলতে দেরী করবে না, কথা দাও প্লিজ।<br />
ও আমাকে কথা দিল। সে সঙ্গে আমার ব্যাগ হাতিয়ে যে কটা ঘুমের ঔষুধ পেল সব নিয়ে ফেলে দিল। আমি জানিনা আমি কেন এটা করেছিলাম। শুধু বুঝতে পারলাম, বিশাল একটা পাপের পথ আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। আমার স্বামী আছে, ১০ বছর ধরে সাজানো সংসার আছে, আর আছে প্রাণের চেয়ে প্রিয় আমার সন্তান আলাওল। আলাওলের জন্য আমি হাসি মুখে ওকেও ছাড়তে পারি। সবচেয়ে বড় কথা আমার বাবা এ সমাজের প্রতিষ্ঠিত ও সম্মানীত একজন বড় মাপের মানুষ। সারা দেশের মানুুষ তাকে এক নামে চেনে। আর তার মেয়ে হয়ে আমি কিনা ছিঃ। তার উপর আবার আমি বাবা-মায়ের অমতেই আমার স্বামীকে বিয়ে করেছিলাম। সে নিয়ে সমস্যা এখনো যায় নি। যে কারণে এখনো আমাকে স্বামী-সন্তানসহ বাবার বাড়িতেই থাকতে হয়। এমন পরিস্থিতিতে সাধনের প্রতি আমার আকর্ষণ সমাজের চোখেই শুধু নয়, আমার নিজের কাছেও এটা পাপ ছাড়া আর কিছু নয়। বিষয়টা হয়ত বুঝতে পেরেই সাধন আমার কাছে এই প্রথম আমার স্বামীর কথা জানতে চাইল। আমি এড়িয়ে গেলাম। আমার মন ভালো করতে ও তৎণাৎ একটি কবিতা লিখে আমাকে পড়ে শোনাল &#8211;<br />
আর কোন কথা নয় মেয়ে<br />
নিশ্চুপ দর্শন ছেড়ে চলে এসো<br />
বাহুবন্ধে আমার।<br />
এখনো স্বপ্নজুড়ে তোমার চুলের বাঁধন;<br />
ছুঁয়ে নেমে যাওয়া নীল শাড়িটির মতন,<br />
আমার চোখে জড়িয়ে আছে<br />
তোমার সুন্দরম।<br />
তোমাকে ভাবতে ভাবতে<br />
কেটে যাক সময়, আমিও না হয়।<br />
সুন্দরের সান্নিধ্যে এসে হয়ে উঠব<br />
সুন্দরম একজন,<br />
তোমার উজালা চোখের ছোঁয়ায়।।<br />
আমার প্রতিটা দিন<br />
কেটে যাক তোমার প্রতীায়।।<br />
আর কোন কথা নয় মেয়ে<br />
নিশ্চুপ দর্শন ছেড়ে এসো চলে<br />
বাহুবন্ধে আমার,<br />
তা-না হলে এই যে, রোদ্র ঝরা<br />
প্রকৃতির কান্না দেখছো<br />
ও কিন্তু থামবে না আর।<br />
কবিতাটি পড়া শেষে হঠাৎ চুপ হয়ে গেল সাধন। কিছুণ পর ও স্পষ্ট বলল &#8211; দেখ ডাক্তার আমি মনে প্রাণে একজন সৎ মানুষ। অবৈধ কোন সম্পর্কে আমি বিশ্বাস করি না। বিশ্বাস করতেও চাইনা। যদিও এ কথা আমি আমার বউকে বুঝাতে পারিনি কিন্তু তুমি বুঝবে। আমার আচরণেই বুঝবে। তুমি যদি সত্যি আমায় ভালবাস, আর তোমার স্বামীর প্রতি তোমার যদি কোন টান না থাকে শুধু তাহলেই আমরা এগিয়ে যাব এবং বিয়ে করবো। বল আমার এ প্রস্তাব তোমার পছন্দ কিনা। অন্যথায় প্লিজ আর এগিয়ো না।<br />
আমি ওকে তখনও বুঝাতে চাইলাম &#8211; আমরা বন্ধু হয়ে তো থাকতে পারি।<br />
ওর সেই একই উত্তর &#8211; ছেলে-মেয়ের বন্ধুত্বে আমি বিশ্বাসী না। আমায় মা কর। ছেলে-মেয়েতে কখনো বন্ধুত্ব হয় না। আগুন আর মোম কখনো পাশাপাশি রেখ না। মোম গলে যাবেই।<br />
আমি বলতাম &#8211; এটা আধুনিক যুগ। এ যুগে ছেলে আর মেয়ে একই সাথে সব কাজ করছে? তবে কেন বন্ধুত্ব হবে না।<br />
ও যুক্তি দিত &#8211; এ জন্যইতো এ যুগে নারী নির্যাতন, ধর্ষণ আর এসিড নিেেপর মত জঘন্য ঘটনাগুলো ঘটছে।<br />
আমি বলতাম &#8211; ওটা সব যুগেই ছিল। প্রচার ছিল না বলে জানা যেত না।<br />
উত্তরে ও যা বলল তা শুনে ওর যুক্তিকেই মেনে নিতে হল। ও বলল &#8211; দেখ সূর্যমুখী, তুমি যা দেখনি, তা তুমি কল্পনা করতে পার না, সে যুগেতো সবাই খুব পর্দা মেনে চলত। এখনকার মত অর্ধদেহ দেখিয়ে ঘুরে বেড়াত না। পর্দার আড়ালের মেয়েটি কালো না ধলা, তার ফিগার কেমন? এ সব বোঝার উপায় ছিল না। তাই নির্যাতনটা খুব কম ছিল। তোমাদের এ যুগ মানে স্যাটেলাইট কালচার, তোমাদের পোশাক যত খুলছে, মানুষের রুচি ও চিন্তার ততই বিকৃতি ঘটছে। এক শ্রেণীর ব্যবসায়ীরা মেয়েদের নির্লজ্জভাবে ব্যবহার করতে ‘নারী স্বাধীনতার যুগ’ বলে শ্লোগান তুলছে আর একটু একটু করে তাদের আব্র“ খুলে নিচ্ছে। বিনিময়ে দু[হাতে টাকা কামাচ্ছে তারা।<br />
একটু ভেবে দেখ, বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত! যিনি নারী স্বাধীনতার অগ্রপথিক! তিনি কি এটা চেয়েছেন? তিনি কি কখনো তার স্বামীর অবাধ্য হয়েছেন? না তার কাপড় কেটে অর্ধেক করেছেন কখনো? বরং তার স্বামী তাকে সাহায্য করেছেন তাঁর প্রতিটি কাজে। তিনি কোথাও ছেলে-মেয়ের বন্ধুত্বকে স্বীকৃতি দিয়ে যান নি। ওটা পশ্চিমা ফ্রী সেক্স কালচার। বাংলাদেশে ওটা ব্যবহারের চেষ্টা কর না প্লিজ।<br />
কী আর করা অগত্যা ওর প্রস্তাব সমর্থন না করে আমার উপায় ছিলনা। কারণ কোন কিছুর বিনিময়ে আমি ওকে হারাতে রাজী ছিলাম না। আমি ভাবলাম &#8211; কিছুদিন যাক। ও যখন আমাকে গভীরভাবে ভালবাসবে তখন আমার প্রস্তাবেই ও ফিরে আসবে। একটা বিষয় আমি পরিস্কার বুঝতে পারলাম, আর যাইহোক আমার শরীরের প্রতি নোংরা কোন আকর্ষণ ওর নেই। ও চাইলে আমি ওকে সবই দিতে রাজী। কিন্তু জানি ও বিয়ে না করে কোনদিন আমার সাথে সেক্স করার কথা চিন্তাও করে না।<br />
ও বলে &#8211; সেক্স খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা অধ্যায়। ভালবাসার শেষ পরিণতি হয়ত ওটাই। কিন্তু সেটা বিয়ের পরে। আগে না। যে মেয়ে বিয়ের আগেই ওটা দিতে চাইবে, আমি বলবো তার মধ্যে কোন ভালবাসা নেই। সে কোন ভদ্র মেয়ে নয়। তাই বলে আবার এটাতেও আমি বিশ্বাসী না যে, সারা জীবন একে-অপরকে ভালই বেসে যাব, বিয়ে করবো না। না বাবা তাহলে আমায় মাপ করে দাও।<br />
আমার ভালবাসাকে নিয়ে আমার একটা স্বপ্ন আছে  &#8211; তুমি আবার পড়াশুনায় মনোযোগ দেবে, বড় ডাক্তার হবে। আমি তোমাকে ও আলাওলকে নিয়ে চলে যাব দূর অজপাড়া গাঁয়। যেখানে এখনো বিনা চিকিৎসায় মারা যায় অসংখ্য শিশু ও তাদের মায়েরা। তুমি ঐ সব অসহায় শিশু ও তাদের মায়েদের কম খরচে চিকিৎসা দেবে। আমাদের ঐ সেবাদান প্রতিষ্ঠানের একটা নাম থাকবে &#8211; ‘আলাওল-সুজানা মা ও শিশু স্বাস্থ্য কিনিক’। আমাদের মেয়ে সুজানা ওখানেই জন্ম নেবে। ও বেড়ে উঠবে বড়ভাই আলাওলের সাথে খেলা করতে করতে। এই স্বপ্নের ভুবনটায় যে আমাকে বিচরণ করতেই হবে সূর্য। তানা হলে এখানেই শেষ কর সব, আর এগিয়ো না প্লিজ।<br />
ওর আর একটা কথা আমার খুবই ভালো লাগে। ও বলে &#8211; ডাক্তার তুমি ‘ইউসুফ-জুলেখা’র গল্পটা জানো। সেখানে জুলেখা একজন বাদশার স্ত্রী ছিলেন। তার কোন সন্তান ছিল কিনা জানিনা। তবে তিনি ‘ইউসুফ’কে ভালবেসে ছিলেন এবং প্রার্থনা করে আল্লাহর কাছ থেকে ‘ইউসুফ’কে বিয়ে করার অনুমতি পেয়েছিলেন। সত্যিকারের ভালোবাসা থাকলে আল্লাহ যে মেনে নেন তার প্রমাণ এই ‘ইউসুফ-জুলেখা’। আমার কি মনে হয় জানো ডাক্তার? যুগ যুগ ধরে ‘ইউসুফ-জুলেখা’দের জন্ম হয়। সবযুগেই তারা থাকেন, যুগের সাথে তাল মিলিয়ে। তাই বুঝা যায় না। এই একবিংশ শতাব্দীতেও তারা এসেছেন, তোমার আর আমার রূপ ধরে। তাই প্রভু নিজেই আমাদের মিলন ঘটিয়ে দেবেন। প্রকৃতি আমাদের ভালবাসার সাী হবে। দেখ! প্রকৃতির সাথে আবার যুদ্ধ করতে যেও না। স্বাভাবিক নিয়মে যা ঘটবে তা ঘটতে দিও। তুমি বুদ্ধি খাটিয়ে সেটাকে নিয়ন্ত্রণ কর না। তাহলে ফল ভাল হবে না।<br />
ওর মধ্যে এ জাতীয় বেশ কিছু পাগলামী আছে। ওকে যে না বুঝবে তার জন্যে ওর সাথে তাল মিলিয়ে চলা খুবই কঠিন। এখন আমি বুঝি ওর সাথে তাল মিলিয়ে ওর বউ কেন চলতে পারেনা। ওর পোমীটা, ওর পাগলপনাকে আমি বুঝি আমার ডাক্তারী বিদ্যার গুণে। যে কারণে আমি ওকে যতটা বুঝতে পারি আর কেউ ওকে সেভাবে বুঝতে পারেনা। ওর মধ্যে কোন কপটতা নেই, খুব স্পস্টবাদী। মনের গভীরে আসা একটা খারাপ চিন্তাকেও প্রকাশ করে দেয়। সবসময় সত্যটা বলাই স্বভাব। অবশ্য ওর সত্য বলার ভঙ্গিটা বিরক্তিকর। মনে হয় যেন মিথ্যে বলছে। আসলে ও কখনোই মিথ্যে বলে না। ওর বলার ধরণটাই এমন যেন গাল-গপ্প করছে। হুট করে রেগে যাওয়া ওর স্বভাবের সবচেয়ে খারাপ দিক। রাগ হলে যা তা বলে বসে। নিজে যা বিশ্বাস করে না তাও বলে ফেলে। আবার খুব বেশি মন খারাপ হলে ফোন বন্ধ করে দেয়। কারো সাথে কথা বলতে চায় না। সোজা বাংলায় বলা যায়, সব রকম পরিবর্তনটাই ওর চেহারায় ফুটে ওঠে, যা ও লুকাতে পারে না। এটাই ওর স্বভাব। হুটহাট দূরে কোথাও চলে যেতে পারলে খুব আনন্দ পায়। এমন লোকের সংসার ধর্ম না করাই ভাল। অথচ ওকেই আমি ভালবাসি। প্রচণ্ড ভালবাসি।</p>
<p>পাঁচ<br />
অতীতের সব স্মৃতি গাঁথা,<br />
শোক গাঁথা; বন্ধুদের অসংখ্য ফোন,<br />
প্রেম নিবেদন,<br />
যদি পার আজ থেকে ভুলে যাও সব।<br />
নতুন জীবনে,<br />
এসো দু’জনে,<br />
হাতে রেখে হাত যাত্রা করি শুরু।<br />
তানা হলে আমাকেও ভুলে যাও।।<br />
সূর্যমুখীকে আমি বার বার এই একটা কথাই বলে এসেছি যে, তোমার স্বামী আছে সংসার আছে, এসব সত্ত্বেও আমার দিকে আকর্ষণ থাকাটা অন্যায় হবে। আমি কোন অন্যায়ের সঙ্গ দেব না। তুমি যদি সবাইকে সত্য বলে, তোমার স্বামীর কাছ থেকে ডিভোর্স আনতে পার, তাহলে আমি তোমাকে গ্রহণ করতে পারবো। আমি তোমাকে ভালবাসি এটা সত্যি, তাই বলে একটা অন্যায়কে আমি প্রশ্রয় দেব না।<br />
ও খুব যুক্তি দিত। বলত, বন্ধুত্বের কথা। পরে যখন ও বুঝতে পারল &#8211; আমি বন্ধুত্ব শব্দটাকে সত্যি অপছন্দ করি, তখন আমাকে খুশি করতেই বলত &#8211; আজ হোক, কাল হোক, বছর পরে হোক বিয়ে আমি তোমাকে করবোই।<br />
এ কথা শুনে আমি তখনকার মত খুশি হয়ে উঠতাম। যদিও একা হলেই আবার একটা পাপবোধ আমাকে পেয়ে বসত। বিষয়টা শেষ করা উচিৎ আর এগোতে দেয়া যায় না। আমার জীবনটা তো গেছে, এই সুন্দর মনের মেয়েটির জীবন আমি কেন নষ্ট করছি। বিষয়টি নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা করলাম, আমার সব বন্ধুগুলোই খুব ভালো মনের। ওরাও বিষয়টা বুঝতে পারলো, আমাকে বাধা দিল। এটা ঠিক না, তুই ওনার কাছ থেকে সরে যা।<br />
একজন বুদ্ধি দিল &#8211; এক কাজ কর, টাকা ধার চেয়ে দেখ। দেখবি আপনা আপনি কেটে পড়বে। যেহেতু সে ডাক্তার, অবশ্যই বুদ্ধিমতী। এত অল্পদিনের পরিচয়ে কখনোই সে তোকে টাকা ধার দিতে পারবে না। বরং তুই লোভী ভেবে সরে পড়বে। আর যদি টাকাটা ধার দেয় তাহলেতো বুঝতে হবে সত্যি তোকে ভালবাসে। তখন সোজা বিয়ে করে ফেলবি।<br />
বন্ধুদের এই পরামর্শ আমার মনঃপুত হয়নি। বিষয়টি নিয়ে একা একা আবার ভাবনায় পড়লাম। যদি ও আমাকে সত্যি ভালবাসে? তাহলে ও তো টাকাটা আমাকে দেবে। যদি দেয়, তাহলে কি হবে? অনেক ভেবে সিদ্ধান্ত নিলাম &#8211; একহাতে টাকাটা নেব, অন্যহাতে ওকে একটা চিঠি দিয়ে আসবো। চিঠিটি এমন ভাবে লেখা থাকবে পড়ে মনে হবে আমি ওর সাথে চিটিং করছি। ও আমাকে ঘৃণা করতে শুরু করবে। আর আমি ওর মায়ের হাতে টাকাটা দিয়ে চলে আসবো। হ্যাঃ অনেকটা বাংলা সীনেমার কাহিনীর মতই। আমি দ্রুত হাতে চিঠি লিখে ফেললাম। লিখলাম-<br />
‘প্রিয় সুর্যমুখী, সত্য হচ্ছে আগুন, যা কখনো চাঁপা থাকে না। আজ হোক, কাল হোক তোমার আমার এ সম্পর্ক প্রকাশ পাবেই। তাছাড়া আমাদের পরিণতি কি বলতে পারো? সারাজীবনতো এভাবে চলতে পারে না। একদিকে বলছো, স্বামীর প্রতি তোমার কোন টান নেই। অন্যদিকে বলছো, ঐ বেচারারতো কোন দোষ নেই যে, তাকে সন্তান ছাড়া করবে। আবার বলছো তোমার সন্তানকে বাবা ছাড়া করতে পারবে না। এ অনুরোধ যেন আমি না করি। তাহলে তুমিই বল, আমি কি করবো? তোমার সন্তানের এখন যে বয়স তাতে বাবার পরিবর্তনটা ও এখন বুঝতে পারবে না। কিন্তু বছর-দুই পরে ও সবই বুঝতে শিখবে। তখন ওর কাছে তোমার সম্মান কোথায় থাকবে বলতে পার? তাই আমিই সরে যাচ্ছি। চলে যাচ্ছি দূরে, বহুদূরে। আর একটা বিষয় হচ্ছে, আমি ল্য করেছি, তোমার স্বামীর প্রতিও তোমার যথেষ্ট শ্রদ্ধা রয়েছে। তাকে দেখেছি, তার সাথে আমার কথা হয়েছে। মনে হয়েছে যথেষ্ট উদার ও মহান মনের একজন মানুষ তিনি। তাহলে এই ভালমানুষটিকে কেন ঠকাচ্ছ? আমার প্রতি তোমার যে ভালবাসা তার কিছুটা তাঁকে দিয়ে দেখ, তোমাদের মধ্যে যদি কোন সমস্যা থেকেও থাকে তা দূর হয়ে যাবে। আমাকে আর খুঁজো না। প্লিজ।’<br />
চিঠিটা পকেটে নিয়ে যেখানে আমাদের সন্ধ্যার পর দেখা করার কথা সেখানে গিয়ে দাঁড়ালাম। আমি বরাবরই আধাঘন্টা আগেই চলে আসি। হঠাৎ কি হল জানিনা, রাস্তায় লোকজন ছুটাছুটি শুরু করে দিল। গুলি-বোমার শব্দ। একটু পরই পুরো ঢাকা শহরে কার্ফু জারীর ঘোষণা এল। রাত আটটা থেকে কার্ফু। বাধ্য হয়ে ওকে ফোন করে দেখাটা বাতিল করতে হল। রাত আটটার পর ফোনের যোগাযোগও বন্ধ হয়ে গেল।<br />
পরদিন, বেলা বারটার পর ওর সাথে কথা হল ফোনে, আমি ফোনেই ওকে বললাম, আমার খুব জরুরী বিশ হাজার টাকার দরকার। তুমি কি দিতে পারবে?<br />
আমার তখনও দৃঢ় বিশ্বাস এতো সামান্য টাকা, এটা ওর জন্য কোন বিষয়ই না। যথেষ্ট সম্ভ্রান্ত ও ধনী একটা পরিবারের মেয়ে ও। তার উপর ডাক্তার। চাকুরীর পাশাপাশি প্রাইভেট প্রাকটিসও করে। চাওয়া মাত্রই টাকাটা পাওয়া যাবে। আমি একহাতে টাকাটা নেব, অন্যহাতে চিঠিটা দিয়ে চলে যাব ওর ঘরে, ওর মায়ের হাতে টাকাটা দিয়ে, তাকে সব ঘটনা জানিয়ে হারিয়ে যাব দূরে, অনেক দূরে। ওর মাকে সব সত্য বলে যাব কারণ &#8211; যদি সূর্যমুখী আবার কোন দূর্ঘটনার জন্ম দেয়, আবার সুইসাইড করতে চেষ্টা করে তাহলে তিনি ওকে সত্যটা বলে দেবেন এবং আমাকে ডেকে পাঠাবেন। আমি তাকে আমার ঠিকানাটা দিয়ে যাব।</p>
<p>ছয়<br />
সব মিলিয়ে আমাদের প্রেমের বয়স মাত্র ছয়দিন। এর মধ্যেই ও আমার কাছে টাকা চাইতে পারল। তাও এক দু-হাজার নয়, একসাথে বিশ হাজার। আমি কোথায় পাব এত টাকা। আমার হাতে যে কখনোই কোন টাকা থাকে না, এ কথা আমি ওকে কি করে বোঝাবো? আমাদের দশ বছরের বিবাহিত জীবনে আমি চাকুরী করে যা আয় করি সবই আমার স্বামীর হাতে তুলে দেই। নিজের খরচ যা লাগে সব স্বামী বা মায়ের কাছে চেয়ে নেই। এ কথা ওকে বলতেই, ও অবিশ্বাস করল। আমাকে যা তা বলে গালাগালি শুরু করল। বলল জাতে মাতাল তালে ঠিক। ঘুমের ওষুধ খেয়ে আমার জন্য মরতে পার, আর টাকা চাইলে তখন অজুহাত দেখাও। তোমরা ধনীরা সব এ রকমই। জাতে মাতাল, তালে ঠিক। আর কখনো আমায় ফোন করবে না, বলেই লাইন কেটে দিল।<br />
ওর কথা শুনে আমার সারা শরীর কেঁপে উঠল। রাগে প্রায় অন্ধ হবার দশা। অফিস শেষে কোনভাবে ঘরে গেলাম। ঘরে গিয়ে সামনে যা পেলাম ভাংচুর করলাম। চিৎকার করে কাদঁতে শুরু করেছি। আমার অবস্থা দেখে আমার বড় ভাবি ছুটে এলেন। জানতে চাইলেন কি হয়েছে? আমার স্বামী ও ভাবীকে ঘটনাটি খুলে বললাম। রাগ হলে আমার হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। কি করছি বা কি বলছি তার কোন খেয়াল নেই। ভাবী আমাকে সান্তনা দিলেন, বললেন &#8211; সাংবাদিকদের থেকে দূরে থাক, ওরা খুব খারাপ হয়। আর এই ছেলেটিকে তো আমার একদম পছন্দ হয়নি। খুব সাবধান।<br />
এতকিছুর পরও আমি কেন জানিনা ওর মোবাইলে আবার ফোন করলাম। দেখি বন্ধ। আবার করলাম, আবার, যতবার বন্ধ পাচ্ছি, ততবারই আমার জেদ চেঁপে যাচ্ছিল। রাগে অন্ধ হয়ে সারা ঘর, ব্যাগ খুঁজে পাঁচটি ঘুমের টেবলেট পেলাম। একসঙ্গে সবকটা খেয়ে ফেললাম। তারপর ওর ফোনে একটা এসএমএস ছেড়ে দিলাম- “মরলে লাশটা একবার দেখে যেও।”<br />
আমার বুকের ভিতর খুব কষ্ট হচ্ছিল, আমি বিছানায় শুয়ে ছটফট করছি, এতগুলো ঔষধ আমার চোখে ঘুম নামাতে পারছিল না। চিৎকার করে আবার কাঁদতে যাব, ঠিক তখনই ওর ফোন এল।<br />
আমি রিসিভ করতেই ও প্রান্তে ওর উত্তেজিত গলা &#8211; কি করেছ তুমি, কয়টা টেবলেট খেয়েছো? আমি তোমার ঘরের সামনে দশ মিনিটের মধ্যে আমার কাছে না আসলে আমি ঘরে ঢুকে যাবো।<br />
আমি জড়ো জড়ো কণ্ঠে কোনমতে বললাম &#8211; এখুনি আসছি, তুমি বাসায় এস না, সবাই তোমার উপর েেপ আছে।<br />
দশ মিনিটের মাথায় কোনমতে একটু মাথাটা আচঁড়ে নিয়ে ওর সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। ও একটা সিএনজি স্কুটার ভাড়া করে আমাকে নিয়ে সেটায় চেপে বসল। আমি স্কুটারে চড়তেই ও পাগলের মত আমাকে জড়িয়ে ধরে হাউ মাউ করে কেঁদে ফেলল। ওর বুকে মাথা রেখে আমিও যেন স্বস্তি পেলাম। জানতে চাইলাম টাকাটা ওর কেন দরকার?<br />
ও বলল &#8211; দূর পাগলী! টাকা দিয়ে আমি কি করবো? আমিতো তোমাকে তাড়াতে টাকাটা চেয়েছিলাম।<br />
বললাম &#8211; পেরেছো তাড়াতে? আর কখনো এমন কাজ কর না। বলেই আমি ওর কাঁধে মাথা রেখে কাদঁতে শুরু করলাম। ঘরে যা যা করেছি, ভাবী ও স্বামীকে যা যা বলেছি সব বলে দিলাম। বললাম &#8211; আমার বেতন, রোগীদের দেয়া ফি সব কীভাবে কি করি।<br />
ও শুনতে চাইলো না। পকেট থেকে একটা চিঠি বের করে আমার হাতে দিল, মুখে বলল &#8211; এখন পড় না। ঘরে গিয়ে পড়, তবে এটার আর কোন মূল্য নেই এখন।<br />
চিঠিটা পড়ে আমি বুঝেছিলাম, ও সত্যি টাকাটা আমাকে তাড়াতেই চেয়েছিল। যদিও পরদিনই আবার ওর ফোন খুলতে দেরী হওয়ায় আমি পাগলের মত হয়েগিয়েছিলাম। ওর পরিচিত এলাকাগুলোতে ওকে খুঁজে বেরিয়েছি। না পেয়ে আবার আমি অনেকগুলো ঘুমের ওষুধ খেয়ে মরতে গিয়েছিলাম। ও ছাড়া জীবনটাকে অর্থহীন মনে হয়েছিল। কেন এ রকম হয়েছিল আজ তা বলতে পারবো না। কিন্তু আজো তুমি ছাড়া আমার জীবনটাকে অর্থহীনই মনে হয়।</p>
<p>সাত<br />
টাকা চেয়ে না পাওয়ার পরও সুর্যমূখীর প্রতি আমার কোন বিদ্বেষ জন্মালো না, বরং ওর প্রতি অদ্ভুত এক আকর্ষণ বোধ করতে শুরু করলাম। এই প্রথম আমার উপলব্দি এল যে জীবনে আমাকেও কারো প্রয়োজন আছে। আমার জন্যও কেউ স্বামী-সন্তান ফেলে মরতে চাইতে পারে। যদিও মনের মধ্যে একটা দ্বিধা রয়েই গেল। অবচেতনে কেউ বলছিল, দূর বোকা! ও একজন ডাক্তার, কি পরিমাণ ঘুমের ঔষধ খেলে কি হবে তা ও ভালোই জানে। ও শুধু তোমাকে ভয় দেখিয়েছে।<br />
আমি বলি &#8211; সে ভয় দেখাক, আর ভণিতা করুক। আমার জন্যইতো করেছে। অবশেষে আমাকে বিয়ে করতে রাজীতো হয়েছে। তাহলে আর অবৈধ সম্পর্কতো হল না। এখন বাকিটা আল্লাহর ইচ্ছা। দেখি তিনি নিশ্চয়ই আমার ও তার মনের কথা জানেন। তিনিই সব সুন্দর করে দেবেন।<br />
আজ প্রায় এক সপ্তাহ পর আমাদের দেখা হবে। আজই প্রথম ও ওর সন্তানকে আমার কাছে নিয়ে আসবে। যদিও ওর সাবধান বাণী &#8211; খবরদার তুমি কিন্তু বাবুকে ধরতে যেও না, তাহলে ও কান্না শুরু করে দেবে। আর থামানো যাবে না। শুনে আমি শুধু হাসলাম। ওদের আসার জন্য অপো করছি আর মনে মনে আল্লাহকে স্মরণ করছি &#8211; হে আল্লাহ! ওর সন্তান যেন আমার কোলে কান্না না করে, বরং আমাকে পেলে খুশি হয়ে ওঠে।<br />
অপোর সময় যেন কিছুতেই কাটতে চায় না। মনের মধ্যে নানান রকম ভয় কাজ করতে শুরু করল। যদি না আসে, যদি কেউ বাধা দেয়। এ সব ভাবনা তাড়াতে বসে বসে একটা কবিতা লিখে ফেললাম &#8211;<br />
তোমার একটু ছোঁয়া চেয়ে<br />
প্রাণ মন কেঁদে যায়<br />
কী ভীষণ যন্ত্রণায়<br />
বুকের ভিতর মুচড়ে যায়<br />
অদৃশ্য বাতাস।<br />
নির্ঘুম চোখে অন্ধকারে চেযে চেয়ে<br />
আঁকা স্বপ্নের বুনন ভেঙে যায়<br />
মূহূর্মুহু দীর্ঘশ্বাস।<br />
আগামী সুন্দরের প্রত্যাশায়<br />
এভাবেই স্বপ্ন এঁকে যাব<br />
অনাদিকাল।।<br />
একটু পরই ওরা এল। ওকে নয় আমি বাবুকে ছোঁয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠলাম। প্রথমবার হাত বাড়াতেই ফিরিয়ে দিল, একটু মোড়ামুড়ি করল, আসবে না। ওর মা বলল &#8211; যাও মাম্মা, মামার কাছে যাও। আমি অনেকটা জোর করেই বাবুকে কোলে নিলাম। সূর্যকে ধমকে বললাম &#8211; খবরদার! মামা বলাবে না। ও আমাকে বাব্বা বলবে।<br />
অদ্ভুত ঘটনা হল, আমি যে জোর করে ওকে কোলে নিলাম, ও কাঁদল না। মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই আমাদের চমৎকার বন্ধুত্ব হয়ে গেল। আমার পিঠে চড়ে সে ঘোড়া চালাতে শুরু করল। অদ্ভুত এক মায়ার বাঁধন আমাকে কানে কানে বলে দিল ওর নাম আলাওল। দেখ তোমার আর ওর নামের অর্থ কেমন একই। তারমানে আল্লাহ নিজেই ওকে তোমারই সন্তান বানিয়ে রেখেছেন।<br />
ওরা মা-ছেলে যখন ফিরে যাচ্ছিল তখন আমার ভিতরটা কষ্টে কেঁপে উঠছিল বার বার। ইচ্ছে হচ্ছিল চিৎকার করে বলি, সূর্যমুখী! তুমিতো এখন চেম্বার করবে, রোগী দেখবে, বাবুকে আমার কাছে রেখে যাও না, আমি ওকে নিয়ে খেলা করি। আলাওল খুব কান্না করছিল, ও যাবে না। কিন্তু উপায় নেই। সূর্যর চেম্বারে রোগীদের ভিড় জমে গেছে। বার বার ফোন আসছিল। বাবুকে আমার কাছে রাখা সম্ভব ছিল না, কারণ এ নিয়ে অনেক প্রশ্ন উঠবে। এমনিতেই সূর্য’র মা তার মেয়ের আচরণের পরিবর্তন নিয়ে সন্দেহ করতে শুরু করেছেন।<br />
এদিকে আমার ঘরে আমার স্ত্রী ফিরে এসেছেন। এসেই তিনি আমাকে একটা সিদ্ধান্তে আসার জন্য কান্নাকাটি শুরু করেছেন। এতদিন তার সন্দেহ ছিল &#8211; আমি অফিসের কাজে ঢাকার বাহিরে গিয়ে মেয়েদের সাথে সম্পর্ক করে বেড়াই। হোটেলে মেয়ে নিয়ে রাত্রী যাপন করি। এ নিয়ে তার সাথে প্রায়ই তর্ক হত। সম্প্রতি তার লেখা একটা ডায়রী পড়ে আমি বুঝতে পেরেছি, আমার প্রতি তার বিন্দু মাত্র শ্রদ্ধা বা বিশ্বাস নেই। সবচেয়ে বড় সমস্যা আমি তার তুলনায় অনেক কম শিতি। তার দৃষ্টিতে আমি মেরুদ্বন্ডহীন একটা প্রাণী মাত্র। এমতাবস্থায় আমি সিদ্ধান্তে নিলাম, যাই ঘটুক। তার সাথে আর একত্রে থাকা সম্ভব নয়। সামনে আমাদের একটি ধর্মিয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ রাত্র ছিল। শবেবরাতের রাত্র। এ রাতে নাকি আল্লাহ কাউকে খালি হতে ফেরান না। চাওয়ার মত চাইতে জানলে তিনি সকলের মনের কষ্ট দূর করে দেন। সকলকে তিনি মা করেন। আমি ঐ রাতেই সিদ্ধান্ত নেব বলে তাকে জানালাম। শবেবরাতের রাতে সারারাত প্রার্থনায় কাটালাম।<br />
আমার প্রার্থনা ছিল স্রষ্টার কাছে  &#8211; “হে স্রষ্টা &#8211; আপনি আমায় মা করুন। আমাকে সত্য ও সুন্দর পথে চালিত করুন। আমার প্রতিটি পদপে আপনি নিয়ন্ত্রণ করে দিন। আমি যেন কোন পাপ না করি। সূর্যমুখী যদি আমার পাপ হয়, ওর সাথে সম্পর্ক এখানেই শেষ করে দিন, অন্যথায় ওকে আমার সারা জীবনের সাথী করে দিন, আমায় সঠিক পথ দেখিয়ে দিন।”<br />
রাতে বেশিরভাগ সময়ই ফোন বন্ধ ছিল। শেষরাতে দু’বার ফোন খুলেছি। দু’বারই সূর্যমুখী ফোন করে আমার খোঁজ নিল, কিন্তু আমার স্ত্রী নিল না। ভোরবেলা প্রার্থনা শেষে প্রথমেই সূর্যমুখীর কপালে ও ললাটে চুমু খাবার ইচ্ছা প্রকাশ করলাম। ওকে ফোনে সে কথা জানাতেই ও অফিসে যাওয়ার জন্য একঘন্টা আগে ঘর থেকে বের হয়ে এল। এই প্রথম নিজের হাতে তৈরি নিয়ম ভাঙলো মেয়েটি।<br />
‘এত সকালে কোথায় যাচ্ছ’? মা ও ভাবি ওকে প্রশ্ন করে বিব্রত করল।<br />
তারপরও ও আমার কাছে চলে এল। সাত সকালে দু’জনে সিএনজি নিয়ে ঘুরলাম সংসদ ভবন এলাকায়। ওর কপালে ও ঠোঁটে মৃদু চুম্বন শেষে ওকে ওর অফিসের কাছে নামিয়ে দিলাম। নিজে ফিরে চললাম ঘরে।<br />
ঘরে প্রবেশ মাত্রই স্ত্রীর কটুক্তি কানে এল। খাবার চাইতেই সে খুব নোংরা ভাষায় বলল &#8211; সারারাত যার কাছে মারিয়ে আসলে সে খেতে দেয় নাই।<br />
হেসে এড়িয়ে গেলাম। না খেয়েই বের হয়ে গেলাম বন্ধুদের আড্ডায়। ফিরলাম রাতে। ঘরে ফিরতেই ভয়ঙ্কর এক দুর্ঘটনা জীবনের দর্শন পাল্টে দিল। স্ত্রী-মা-ছোটভাই তিনজন একসাথে জন্মদিল এই ঘটনার। তারা সবাই আমার স্ত্রীর প নিয়ে আমার সাথে দূর্ব্যবহার করল। পরদিনই আমি ঘর ছেড়ে চলে এলাম এক বন্ধুর বাসায়। আর আমার স্ত্রী সে চলে গেল তার বোনের বাসায়। আর আমি পুরো ঘটনাটির জন্য স্রষ্টাকে ধন্যবাদ জানালাম এই ভেবে যে, নিশ্চয়ই এর পিছনে তার মহৎ কোন উদ্দেশ্য রয়েছে।</p>
<p>আট<br />
শবেবরাতের রাতের পরদিন সকালে ওর সাথে দেখা করে অফিসে এসেই শুনি আমার মা ফোন করে ইতোমধ্যে দু’বার জানতে চেয়েছেন আমি পৌঁছেছি কিনা? আমি অফিসে পৌঁছতেই আবার মায়ের ফোন এল। তাঁর কণ্ঠ শুনেই বুঝলাম তিনি খুব চিন্তিত ছিলেন। আসলে আমার অফিস টাইম ন’টায়। আমি সাধারণত ঘর থেকে বের হই পৌনে ন’টায়। বাসার কাছেই অফিস হওয়ায় গত ৫ বছরে কোনদিন এর অন্যথা হয়নি। তার উপর এটি আমারই বাবার প্রতিষ্ঠান। স্বাভাবিকভাবেই আমার কোন আর্জেন্ট কাজ থাকলে তা বাবার জানার কথা। সেখানে একঘন্টা আগে ঘর থেকে বের হওয়া ও পৌনে একঘন্টার মধ্যে অফিসে না পৌঁছাটা সন্দেহজনকই বটে। যাই হোক একটা রোগী দেখতে গিয়েছিলাম বলে কাটিয়ে দিলেও অফিস শেষে ঘরে ফিরে অনেক জেরার মুখে পড়তে হল।<br />
এদিকে ছেলেকে নিয়ে হয়েছে আরেক জ্বালা। সাধন যে ওকে কি জাদু করেছে। ও এখন রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকে আর সাধনের মত কাউকে দেখলেই বাব্বা, বাব্বা বলে চিৎকার শুরু করে। ওর বাবার পিঠে চড়ে ঘোড়া দৌড়াতে চায়। আমি বুঝলেও বিষয়টা ওর বাবাতো বুঝে না। ছেলেকে শান্ত করতেই ওকে নিয়ে বিকেলটা ঘুরে কাটালাম। সন্ধ্যায় চেম্বারে গেলাম। হঠাৎ করেই আমার কি যেন হল। প্রচণ্ডভাবে সাধনকে দেখতে, ওর সাথে কথা বলতে ইচ্ছে হচ্ছিল। দুপুরে কথা বলেছি, বিকালেও অল্প কথা হয়েছে। ও ঘরে থাকবে তাই ওকে ফোন করা ঠিক হবে না। অথচ ওকে ফোন করার জন্য খুব অস্থির লাগছে। আমি জানি সাধন আমার কপালে, ললাটে যতই চুমু খাক না কেন, এখন পর্যন্ত ওর মনে আমি কোন দাগ কাটতে পারিনি। আমার চোখের পানি, আমার মরে যাবার চেষ্টা, এ সবের কারণে ও কিছুটা দূর্বল হয়েছে মাত্র। তবে শবেবরাতের রাতে নামাজ শেষে সকালে প্রথমেই আমার মুখ দেখতে চাওয়ায় আমি এতোটা আনন্দ পেয়েছি যে ভাষায় প্রকাশ করতে পারবো না। রাতে আমিও প্রার্থনায় বসেছিলাম। ওর মত সারারাত জাগতে পারিনি, তবে যতণ প্রার্থনায় ছিলাম, আমার চোখের সামনে ওর মুখটাই ভেসেছিল বার বার। তারপরও ওর মাঝে যে আমি এখনো পুরোপুরি স্থান করে নিতে পারিনি এ কথাটা আমি যে জানি বা বুঝি তা হয়তো সাধন জানে না বা বোঝেনা।<br />
ক্রমশ যত রাত হচ্ছিল, আমার ভিতরের অস্থিরতা ততই বাড়ছিল। অজানা এক শঙ্কায় বুকের ভিতরটা কাঁপছিল। বার বার মনে হচ্ছিল সাধনের কোন বিপদ হচ্ছে। আমি আর সইতে না পেরে ওকে ফোন দিলাম। দেখি ফোন বন্ধ। পরপর তিনটা এসএমএস পাঠিয়ে ঘুমাতে গেলাম। কিন্তু ঘুম এল না। ঘুমের ওষুধ আর খাব না। সাধনকে কথা দিয়েছি। সারারাত ছটফট করে কাটালাম। রাতে উঠে প্রার্থনায় বসলাম। কোরান শরীফ পড়লাম, আর বারবার প্রার্থনা করলাম &#8211; আল্লাহ ওকে ভাল রেখ।<br />
সকাল আটটায় ওর ফোন খুলেছে। আমার এসএমএস ডেলিভার হতেই ওর ফোন এল। বসে যাওয়া কণ্ঠে ও আমাকে শান্তনা দিতে চাইলো কিছু হয়নি, ও ভাল আছে বলে। কিন্তু ওর কণ্ঠই আমাকে বলে দিল ও ভাল নেই। জানতে চাইলাম &#8211; কি হয়েছে, সত্যি করে বল। আমাকে নিয়ে কোন সমস্যা হয়নিতো?<br />
উত্তরে ও যা জানাল শুনে আমি স্তব্দ হয়ে গেলাম। ওর সিদ্ধান্ত শুনে স্বস্তিও পেলাম। বললাম ঐ ঘরে তুমি সেদিন যাবে, যেদিন ছোটভাইটা এসে তোমার কাছে মা চাইবে। আর তোমার স্ত্রী’ সে হয়ত তার ভুল বুঝতে পারবে। তাকে মা করে দিও। কথাটা উদারতার সাথে বললেও মনের মধ্যে একটা খুশীর ভাব মনে হয় লুকাতে পারিনি। সাধন কিছুটা বোকাটে ধরণের তাই ও তা টের পেল না।<br />
এই বোকাটে, সরল সোজা ছেলেটাকে নিয়ে যে মেয়েটা শান্তিতে ঘর করতে পারলো না, তার কপালে অনেক দুঃখ আছে। কথাটা মাথায় আসতেই আমার মধ্যে একটা পাপবোধ জেগে উঠল। আমি কি করছি? আমি কি তাহলে ওকে বিয়ে করবো? সাথে সাথে ওর সামাজিক অবস্থান, ওর আয় রোজগার এবং আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক অবস্থানগুলোর বিভিন্ন দিক নিয়ে ভাবনা চলে এল মাথায়। আমি মানলেও আমার বাবা-মা ওকে কখনো মানবে না। সবচেয়ে বড় কথা আমি সাধনকে যতই ভালবাসি না কেন, আমি কখনোই আমার ছেলেকে ফেলে ওর কাছে যেতে পারবো না। এককথায় ছেলেটার ভবিষ্যত চিন্তা করেই আমি আমার ভালবাসার মানুষটাকে ধরে রাখতে পারবো না। কথাটা আমি স্পষ্টই বুঝে গেলাম। তাহলে কেন আর সাধনকে ধরে রাখা। চিন্তা করলাম, এ মূহূর্তে ওর মানসিক সাপোর্ট দরকার। ওকে আমি সেই সাপোর্টটা দিয়ে যাব। পরে ওকে বুঝিয়ে বলবো সব। ও যদি আমার বন্ধু হয়ে থাকে থাকবে, তানা হলে  &#8211; এই আর কি! ওকে বিদায় দিতেই হবে।<br />
আমার এইসব ভাবনার মাঝেই দিন পেরোচ্ছে। ও একবাসায় সাবলেট হিসেবে একটি রুম ভাড়া নিয়ে একা থাকছে। সে বাসার মহিলাকে আবার আমার সাথে ফোনে ফোনেই পরিচয় করিয়ে দিল। মহিলা আমাকে ওর স্ত্রী হিসেবেই চিনল। ভাবী সম্বোধন করল। ও অবশ্য বাসাটি ভাড়া নেওয়ার আগেই বলেছিল যে, বেচলর হলে কেউ বাসা ভাড়া দিবে না। তাই আমি বিবাহিতই বলবো। তবে বউ হিসেবে তোমাকেই কথা বলতে হবে।<br />
ও ঐ বাসায় ওঠার দু’দিন পরে বাবুকে নিয়ে ওর সাথে ঘুরতে বের হলাম। লেকের পাড়ে ও আর বাবু অনেক সময় খেলা করল। বাবু ওর গুটি গুটি পায়ে পানির দিকে ছুটে যায়, আর ও বাবুকে ধরে নিয়ে আসে। দু’জনে পানিতে ঢিল ছুড়ে খেলা করে। ও একটু সরে গেলে বাবু ‘বাব্বা’ বলে ওকে জড়িয়ে ধরে। এ দেখে আমার ভিতরটা খুশিতে ভরে ওঠে। এমন সময় আকাশে মেঘ দেখা দেয়, হঠাৎ ও এসে বলে &#8211; সূর্য আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধর।<br />
আমি বলি- কেন, হঠাৎ কি হল?<br />
ও আকাশে মেঘ দেখাল। ততণে চারদিক অন্ধকার হয়ে আসছে। আমি ওর কথার গুরুত্ব না দিয়ে ওর হাত ছেড়ে বাবুকে কোলে তুলে নিলাম। এখন আমাদের যেতে হবে। বাসায় সবাই চিন্তা করবে। আমি বাবুকে নিয়ে রিক্সায় চেপে বসলাম। পিছনে ও আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে অদ্ভুত এক বেদনার চোখে। বাসায় পৌঁছতেই ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি শুরু হল। আমি ফোনে ওর অবস্থান জানতে চাইলাম। ও তখন বৃষ্টিতে ভিজতে শুরু করেছে। বলল &#8211; জান এই বৃষ্টি মানেই তোমার ছোঁয়া।<br />
আমি ওকে ভিজতে বারণ করলাম। বললাম &#8211; তোমার এমনিতেই ঠাণ্ডার সমস্যা আছে। দেখ জ্বর হবে কিন্তু।<br />
ও বলল &#8211; ভালোই হবে। তাহলে অন্তত ডাক্তার দেখাতে হবে, মানে তোমার সেবা পাওয়া যাবে।<br />
আমি বললাম &#8211; তুমি মরে গেলেও সে সুযোগ আমার হবে না।<br />
ও হেসে বলল &#8211; মরে গেলে দরকারও হবে না। বলেই লাইন কেটে দিল।<br />
তারপরই ফোন বন্ধ। অসংখ্যবার ফোন করলাম ওকে। না সারারাত আর ফোন খুলল না। কি এমন অন্যায় করলাম বুঝতে পারলাম না। ওর ফোন বন্ধ পেয়ে আমি প্রায় পাগল হয়ে উঠলাম। সারারাত বৃষ্টি হল। সারারাত আমি কাঁদলাম আর আল্লাহর কাছে ওর ফোন খোলার জন্য মিনতি জানালাম। কেউ আমার মিনতি শুনল না, না আল্লাহ, না ও।<br />
সকালবেলাও বৃষ্টি থামেনি। আকাশের মেঘের সাথে পাল্লা দিয়ে আমার মনের মেঘ বাড়ছে। ইচ্ছে করেই বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে অফিসে যাচ্ছি আর স্মরণ করার চেষ্টা করছি  &#8211; ওর বাসাটা কোন এলাকায় বলেছে, কত নম্বর যেন বলেছে? তারপর এই বৃষ্টির ভিতরই অনেকটা আধাআধি ঠিকানা দিয়ে পরিচিত এক লোককে পাঠালাম। প্রায় ঘন্টা দুয়েক খোঁজাখুজি করে ভদ্রলোক ওর বাসা পেলেন। তার ফোন দিয়েই আমি ওর সাথে কথা বললাম। আবার মরে যাওয়ার হুমকি দিতেই ও ছুটে এল আমার অফিসে। অফিস শেষে দু’জন গিয়ে বসলাম একটা কফি হাউসে। জানতে চাইলাম &#8211; আমার কি দোষ হয়েছিল যে তুমি আমাকে এত বড় শাস্তি দিলে।<br />
উত্তরে ও বলল &#8211; তোমাকে না শাস্তি দিয়েছি আমি আমাকে। কারণ আমি মরে গেলেও যদি তুমি আমার কাছে যেতে না পার তাহলে এই সম্পর্ক কেন রাখবো, বলতে পার সূর্যমুখী? কী লাভ এ সম্পর্কে?<br />
ওর উত্তর শুনে আমি থমকে গেলাম। কান্নায় আমার কণ্ঠ জড়িয়ে এল। ওর শরীর ছুঁয়ে বললাম &#8211; কিছু না পারি তোমার জন্য মরতে পারবো। এই তোমাকে ছুঁয়ে বলছি, তোমার বুকে মাথা রেখেই মরবো আমি।<br />
আমি জানিনা ও আমার কথা কতটুকু বিশ্বাস করেছে। তবে সেদিন আমার মুখে হাসি ফুটাতে অদ্ভুত এক কাণ্ড করে বসল ও। বাহিরে তখনও বৃষ্টি হচ্ছে। হঠাৎ আমার হাত ধরে বৃষ্টির মধ্যেই বাহিরে বের হয়ে এল। বলল &#8211; কাল তোমাকে এত করে বললাম, আমায় শক্ত করে জড়িয়ে ধর, শুনলে না। দেখেছো বিনিময়ে দু’জনেই কী কষ্টটাই না পেলাম। আসো এখন প্রকৃতিকে খুশি করি। কথাটি বলেই ও আকাশের দিকে তাকিয়ে আবৃত্তি শুরু করল &#8211;<br />
অবশেষে অন্ধকারে আবার আলো জ্বলেছিল,<br />
আর দিনান্তের অস্তগামী সূর্যটা<br />
আবার ফিরে এসেছিল ধরার বুকে।<br />
আমি তারই প্রতিায় ছিলাম অনাদিকাল।।<br />
যুগান্তরের দিনলিপি লিখেছেন বিধি,<br />
কষ্টের সমুদ্রে কাটতেই হবে সাঁতার,<br />
আমি মানুষ!<br />
সাধ্য কি তাঁর? বিধির বিধান ভাঙার।।<br />
ভিজতে ভিজতেই রিক্সা নিলাম আমরা। রিক্সায় পর্দা দিয়ে এই প্রথম দু’জন দু’জনকে নিবিড় ভাবে স্পর্শ করলাম। ইচ্ছে মত আদর করলাম। ওর মুখে আমার জিহ্বা আবার আমার মুখে ওর জিহ্বার স্বাদ পেলাম। ও আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল &#8211; এবার হয়েছেতো বাপু। তোমার কান্না থামাও।<br />
আমি হেসে ফেললাম। আর সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতিও যেন হেসে উঠল। অবাক চোখে দেখলাম রোদ্রঝরা বৃষ্টির মাঝেই পশ্চিমাকাশে সূর্যটা অনেক হেলে গেছে। হাত ঘড়িতে দৃষ্টি দিয়ে চমকে উঠলাম। সাড়ে তিনটা বাজে। ওকে অনেকটা ধাক্কা দিয়ে রিক্সা থেকে নামিয়ে দিয়ে আমি ঐ রিক্সা নিয়েই দ্রুত বাসায় চললাম। ফোনে ওকে জানালাম &#8211; রাগ করনা লক্ষ্মীটি, আর কখনো এমন কাজ করনা। তুমি বললে আমি না করতে পারি না। অথচ আজ ঘরে আগুন জ্বলবে।</p>
<p>নয়<br />
অনেকদিন পর অনেকটা ফুরফুরা মন নিয়ে ঘরে ফিরলাম। ‘সূর্যমুখী শুধু আমার’ এই বোধটা আজ খুব বেশি মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। আমার একান্ত আদর পেয়ে ও অবশেষে কথা দিয়েছে আমরা একদিন বিয়ে করবোই। আল্লাহ নিজেই আমাদের সে সুযোগ তৈরি করে দেবেন। তিনিই সবদিক বজায় রেখে সূর্যকে পৃথীবীর আপন করে দেবেন। আজই ও আমাকে পৃথিবী নামে উপাধি দিয়েছে। ওর পৃথিবী আমি। একান্ত ওর। কিন্তু সন্ধ্যা পার হয়ে গেল ওর কোন ফোন আসেনি। এমনটাতো হয় না। গত তিন মাসে এমন ঘটেনি কখনো। দুশ্চিন্তায় ক্রমশ অস্থির হচ্ছিলাম। রাত আটটা বেজে গেল। কি করবো, আমি ফোন করতে পারছি না, পাছে ওর ঘরের লোকেরা ধরে এই ভয়ে। এমন সময় ওর ফোন এল। ঘরে থাকলে বাথরুমে গিয়ে ও আমায় ফোন করে। পানি ঝরার শব্দে বুঝতে পারলাম এখন ও ঘরে।<br />
আমি কিছু বলার আগেই ও বলে উঠল &#8211; আমি আমার কাপড়-চোপড় নিয়ে তোমার কাছে চলে আসছি। তুমি শাহবাগে এসে দাঁড়াও।<br />
আমি ওকে শান্ত করার চেষ্টা করলাম &#8211; দূর পাগলী! আগে বল কি হয়েছে। মা বকেছে?<br />
ওর উত্তর &#8211; শুধু বকেনি। নোংরা কথা বলতে শুরু করেছে। যাচ্ছে তাই বলে গালি দিচ্ছে। তোমাকেও দিচ্ছে। তবে জানে না তুমি টা কে?<br />
আমি বললাম &#8211; এতেই এত ভয় পেয়েছ? সত্যতো একদিন সবাই জানবেই। লক্ষ্মী মেয়ে, মাথা ঠাণ্ডা রাখ। মা বকলে কিছু হয় না। অফিস থেকে যেখানে দশ মিনিটে ফিরে যাও, সেখানে ২ ঘন্টা দেরী করলে মায়ের মনে সন্দেহ তো হবেই। আমরা আর কখনো এটা করবো না। ৫ মিনিটের বেশি আমি আর তোমার সাথে দেখা করবো না।<br />
এ কথাাটি আমি রেখেছিলাম। পরবর্তী একটা বছর কখনো পাঁচ মিনিটের বেশি ওকে আটকাইনি। ও যেতে চায়নি। আমি জোর করে ওকে পাঠিয়ে দিয়েছি। নিজে একা একা কষ্ট পেয়েছি। সবচেয়ে বেশি কষ্টের দিন ছিল শুক্রবারটা। এ দিন ওর স্বামী ঘরে থাকে। ওকে আর ছেলেকে নিয়ে ঘুরতে বের হয়। এ সময় আমার খুব কষ্ট হয়। আমার কষ্ট কমাতে ও আগেই এদিন ফোনের উপর নিষেধাজ্ঞা জারী করে রাখে। অথচ ঘন্টায় ঘন্টায় নিজেই ফোন দিয়ে আমার সাথে কথা বলে, আমাকে সঙ্গ দেয়। ও আমার জন্য কম ছাড় দেয় নি। অফিস থেকে পাওনা ছুটিগুলো বাতিল করে দিয়েছে। কারণ ছুটি নিলেই তো ঘরে আটকে থাকা অথবা স্বামীকে নিয়ে দূরে কোথাও বেড়াতে যেতে হবে। আমার সাথে দেখা হবে না। আমি বুঝি ও আগে যা ভেবেই আমার সাথে সম্পর্ক করুক, এখন ও আমাকে ছাড়া বাঁচবে না। আর আমি? ওকে ছাড়া আমি যে আর কিছু চিন্তাই করতে পারি না। তাহলে উপায় কী হবে? আমাদের পরিণতি কী হবে হে আল্লাহ’ তুমি বলে দাও। আমি যে অবৈধ কোন সম্পর্ক ধরে রাখতে রাজী না।<br />
এরমাঝে হঠাৎ একদিন আলাওলকে নিয়ে আমি খেলা করছি, এমন সময় ও হাসতে হাসতে বলল &#8211; এই তোমার বাসাটা আমাদের বাসার কাছে নিয়ে আসতো! আমি যেন মাঝে মধ্যে যেতে পারি।<br />
আমি অবাক হয়ে ওকে দেখলাম। বললাম &#8211; মাঝে মধ্যে কেন বলছ? একবারে কেন নয়।<br />
ও বলল &#8211; তা কি করে সম্ভব? বল? তুমি কি চাও আমার ছেলেটা বাবার স্নেহ বঞ্চিত হোক। তুমি যদি শুধু আমাকে চলে আসতে বল, তাহলে আমি যে কোন সময় আসতে রাজী।<br />
আমি বললাম &#8211; বলতে পারি, কিন্তু বাবাকে ছাড়া তুমি থাকতে পারবে?<br />
ও কোন উত্তর দিল না।<br />
আমি বললাম, আবার আমাকে ভাবনায় ফেললে সূর্য।<br />
ও মুখ খুলল &#8211; না না অত ভেব না। ‘ইউসুফ-জুলেখা’র সমস্যার সমাধান যখন আল্লাহ করেছেন, আমাদেরটাও আল্লাহ’কেই সমাধান করতে দাও। তিনি নিশ্চয়ই ভাল কিছু ঘটাবেন।<br />
দুদিন পর আমি ওর এলাকায় বাসা খুঁজতে বের হয়েছি। একটা বাসা দেখি আর ওকে ফোনে বর্ণনা দেই। ও বর্ণনা শুনে বাতিল করে দেয়, কোনটা আবার দর করতে বলে। একটা বাসা বেশ পছন্দ হয়। আমি বলি এটা তুমি এসে দেখে যাও।<br />
ও সঙ্গে সঙ্গে বলে ওঠে পাগল হয়েছো? আমি কি করে এসে দেখবো। এটা আমার এলাকা। সবাই এখানে আমায় চেনে। আমি যাদের চিনি না তারাও আমাকে চেনে। কেন বুঝ না সোনা, তোমার সূর্যমুখী মোটামুটি পরিচিত একজন ডাক্তার।<br />
আমি বললাম &#8211; তাহলে এখানে বাসা নিতে বলছো কেন? তুমি যদি নাই আসতে পার এখানে বাসা নিয়ে আমার কি লাভ?<br />
ও রেগে উত্তর দেয় &#8211; দেখ তুমি এই অসম্ভব স্বপ্ন কখনো দেখ না। আমি কখনোই তোমাকে বিয়ে করতে পারবো না, তোমার ঘরেও আসতে পারবো না। তাতে তুমি থাক আর না থাক।<br />
ওর কথা শুনে আমার আপাদমস্তক জ্বলে ওঠে, আমি কাণ্ডজ্ঞানহীন হয়ে পড়ি। খুব রেগে গিয়েছিলাম। ওকে খানকী, বেশ্যা ইত্যাদি যা-তা বলে গালাগাল করেছিলাম। তারপর প্রায় দু’ঘন্টা ফোন অফ করে রাখি। ফোন খুলে দেখি ও লিখেছে &#8211; নেভার ডিস্ট্রাব মি। তুমি কতটা নোংরা, আমি বুঝলাম।<br />
কোথা থেকে জানিনা হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হল। আমি বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে কাঁদছি আর আল্লাহ’র সাথে মুখ খিস্তি শুরু করেছি। আমি এতোটা আল্লাহ নির্ভর ছিলাম না। ও আমাকে ক্রমশ ধার্মিক বানিয়ে তুলেছে। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া, রোজা রাখা- এ সব করতে বাধ্য করেছে। ওর ও আলাওলের অমঙ্গল হবার ভয়ে জীবনে প্রথম আমি ত্রিশটি রোজা রেখেছি। কখনো ওর সাথে ঝগড়া হলেই আমি ছুটে গিয়েছি মসজিদে। আল্লাহর কাছে গিয়ে কান্না করেছি। প্রকৃতি আমাকে সঙ্গ দিয়েছে। আমার দৃঢ়বিশ্বাস, আমাদের এ সম্পর্কটা আল্লাহ-ই তৈরি করে দিয়েছেন। তিনিই এটার নিয়ন্ত্রক। মেঘ আর বৃষ্টি আমাদের পথপ্রদর্শক। ওরা আমাকে বলে দেয় আমার সূর্য কখন মন খারাপ করছে, কখন কাদঁছে, আবার কখন হাঁসছে। ভিজতে ভিজতেই আমি আমার ভাড়া করা ঘরে ফিরে এসে ফোন বন্ধ করে দিলাম। ইচ্ছে মত ফোনটাকে আছাড় দিয়ে ভাঙার চেষ্টা করলাম আর হু হু করে মেয়ে মানুষের মত কাঁদলাম। জায়নামাজে বসে আল্লাহ’র কাছে বারবার আবেদন জানালাম &#8211;<br />
হে স্রষ্টা, তুমি পথ ভ্রষ্টা আমাদের মা কর।<br />
জ্বালো সত্য পিদীম জ্বালো,<br />
জ্বালো মঙ্গল শিখা জ্বালো।<br />
পরদিন সকালে পাশের বাসার ভাবীর ডাকে আমার ঘুম ভাঙলো। দরজা খুলতেই তিনি তার ফোনটা বাড়িয়ে ধরলেন &#8211; নেন ভাবী ফোন করেছে।<br />
ফোনটা নিয়ে কানে ধরতেই ও পাশে সূর্যমুখীর কান্নার শব্দ শুনে বিচলিত হয়ে উঠলাম। মনে পড়ল সেবার যখন বাসায় লোক পাঠিয়েছিল তখনই ওকে এই ভাবীর ফোন নম্বর দিয়েছিলাম। ও প্রান্তে ওর তখন ফুফিয়ে কান্না চলছে আর বলছে &#8211; আর কি কি নোংরা গালি তুমি জান আজ সব আমাকে দাও আবার বল কী যেন বলেছিলে কাল। আমি খান&#8230;&#8230;.।<br />
ধমকে থামিয়ে দিলাম। অনেক করে বুঝালাম, রাগের মাথায় বলেছি ও সব। আমায় মা করে দাও প্লিজ। ও মা করে দিল কিনা জানি না। তবে সন্ধ্যায় আমাদের দেখা করার জায়গাটায় ওকে বুকে জড়িয়ে ধরে খুব আদর করে দিলাম। ওর কপালে চুমু খেতে আমার সবচেয়ে বেশি ভাল লাগে। তাই বার বার কপালে চুমু খেলাম। আর বললাম &#8211; সূর্যমুখী কেন ভুলে যাও, তোমার দেহের প্রতিতো আমার কোন আকর্ষণ নেই। সে জাতীয় কোন আচরণ কি কখনো পেয়েছো বল? আমি তোমাকে চাই দেহ-মন-প্রাণ এ সব নিয়েই তুমি। তাই তোমাকে চাই। তুমি যদি চাও কোনদিন আমাদের মধ্যে সেক্স হবে না। তারপরও আমি তোমাকে চাই, আমার বউ হিসেবে চাই।<br />
মুখে ওকে এ সব বলছি আর মনে মনে ভাবছি, আজই শেষ আর আমাদের দেখা হবে না সূর্য। এ নোংরা সম্পর্কটা আর টিকিয়ে রাখবো না। স্রষ্টা তোমাকে আর বাবাকে ভালো রাখবেন। আমার জীবনের বিনিময়ে হলেও তোমাদের তিনি ভালো রাখবেন।<br />
ওর থেকে বিদায় নিয়ে ঘরে ফিরতে ফিরতে একা একা অনেক ভালো মন্দ ভাবনা এল। সব ছাপিয়ে একটাই ভাবনা স্থান পেল মনে। আমি ওকে একটা এসএমএস পাঠালাম &#8211; সূর্যমুখী, আমি জানি তুমি প্রচণ্ড দোটানার মধ্যে আছ। একদিকে স্বামী-সন্তান, বাবা-মা, ভাই ও ভাবীরা। অন্যদিকে আমি। ওজনে আমার পাল্লা অনেক হাল্কা। আমার প্রতি তোমার ভালবাসাটাও তাই খুব হাল্কাই হবে। আমাদের সম্পর্ক বেশি দূর এগোবে না এটাও আমি ভালো জানি। তারপরও তোমাকে ভালবাসি, সত্যিই ভালোবাসি। আর ভালবাসি বলেই তোমাকে আমি কষ্ট দিতে পারি না। তিল তিল কষ্টের চেয়ে একেবারে কষ্ট পেয়ে মরা অনেক ভালো।<br />
এসএমএসটা পাঠিয়ে নিজেই যেন চরম অশান্তিতে ডুবে গেলাম। পরদিন সকালে দূর পাল্লার বাসে চেপে বসলাম। আবার হারিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলাম দূরে বহুদূরে।</p>
<p>দশ<br />
সকাল বেলা ফোন খুলে সাধনকে এসএমএস পাঠাতে গিয়ে দেখলাম ওর এসএমএস। মেসেজটি পরেই আৎকে উঠলাম। ফোন দিয়ে দেখি ওর ফোন বন্ধ। কান্নায় ভেঙে পড়লাম। সে সাথে একটা রাগ, একটা ঘৃণা এসে জায়গা নিল মনে। ঘৃণা নিজের প্রতি। যে বার বার আমার থেকে পালাতে চায় তার জন্য কেন এত কাঁদছি। তারপরও ‘তোমার সূর্য যে ডুবে যাচ্ছে’ বলে একটি এসএমএস পাঠিয়ে দিলাম। এসএমএসটি ডেলিভার হল না। আমিও ফোন বন্ধ করে রাখলাম। আমার দুটো ফোন, দুটোই বন্ধ করে দিলাম। সারাদিন আর ফোন খুললাম না। জানিনা কেন সেদিন সন্ধ্যায় কোন পূর্ব সংবাদ ছাড়াই তুমুল ঝড়বৃষ্টি শুরু হল। সাথে সাথে আমার মনের ভিতরও শুরু হল তুমুল ঝড়। এই ঝড়ই বলে দিল &#8211; আমার সাধন ভালো নেই।<br />
পরদিন সকাল বেলা কলিং বেলের শব্দে ঘুম ভেঙে গেল। আমার স্বামী নিজেই দরজা খুললেন। আমি উঁকি দিয়ে দেখি সাধন দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। আমার স্বামীর সঙ্গে হ্যান্ডশেক করছে। এই সাত সকালে ওকে দেখে আমার মনটা খুশিতে উৎফুল্ল হলেও একটা আতঙ্ক নিয়ে কুশল বিনিময় করলাম। ও নিজেই ভিতরে এসে বসল। ওকে দেখেই আলাওল ছুটে এসে ওর কোলে চেপে বসল। ও আলাওলকে নিয়ে মগ্ন হল। আর আমার ভিতর তখন আতঙ্ক চলছে। মিনিট বিশেক ও ছিল। শুধু চা খেয়ে চলে গেল। এই মিনিট বিশেক আমি ছিলাম মহা আতঙ্কে। একদিকে ওর সাথে কথা বলার প্রবল আকাঙ্খা, অন্যদিকে আমার স্বামী যদি কিছু সন্দেহ করে, যদি ধরা পড়ে যাই! এই ভয়। বুঝলাম এ পাগল সব পারে। সব। ওর উপর রাগ করে আর যাই হোক ফোন বন্ধ রাখা যাবে না।<br />
আমি অফিসে যাবার উদ্দেশ্যে বের হয়ে ওকে ফোন দিলাম। দুটো ফোন অফ রাখার জন্য ও আমায় ধমকালো। আমি ওকে বললাম &#8211; তুমি যে অফ রাখবে না কথা দিয়েও ফোন অফ রাখ তার কি হবে। আমি ওকে আমার দিব্যি দিলাম। বললাম, এরপর আমাকে না বলে ফোন অফ রাখলে আমার মরা মুখ দেখবে।<br />
সেদিনটা ভালোই গেল। দিনের মধ্যে অন্তত চল্লিশবার ওকে ফোন করেছি। দিন দুই পরের কথা। চেম্বার থেকে রাতে ঘরে ফিরে দেখলাম আমার ছেলেটার চোখ ওঠা রোগ হয়েছে। ওকে ফোন করে সে কথা বলতেই ও বলল, ভয় পেও না। কাল আমার কাছে নিয়ে এস ভালো হয়ে যাবে। সকাল বেলা আমার নিজেরই চোখ ওঠা রোগ হল। দুপুর যেতে না যেতে সেটা বেড়ে গেল। ওই অবস্থায় আমি কফি হাউসে ওর কাছে এলাম। ওর সাথে দেখা করে তবে ঘরে গেলাম। যদিও ও আমাকে ৫ মিনিটের বেশি থাকতে দেয়নি। বাসায় গিয়ে দেখি বাবুর চোখ আরও ফুলে উঠেছে। বাথরুমে গোসল করতে গিয়ে ফোনে ওকে জানালাম &#8211; তোমার ছেলের চোখ আরও ফুলেছে।<br />
ও বলল &#8211; বিকালে যেভাবে হোক ওকে নিয়ে পার্কে আস। আমি দেখব আমার ছেলের চোখে এ রোগ কি করে থাকে।<br />
ও একটা দাবী করলে সেটা না মানা আমার প্রায় অসাধ্য হয়ে উঠেছে। তাই বিকালে ২০ মিনিটের জন্য বাবুকে নিয়ে বের হলাম। পার্কের গেটে ও দাঁড়িয়েছিল। রিক্সা থেকে বাবুকে ও নিজেই কোলে তুলে নিল। আমি দেখলাম কি নিঃসঙ্কোচে ও আমার ছেলের দু’চোখে চুমু খেল। তারপর বাবুকে নিয়ে খেলা করতে ব্যস্ত হল। যে বাবু গত দু’দিন একটু হাসেনি। গায়ে জ্বর, শরীরে ব্যাথা নিয়ে সেই বাবু ওর গলা জড়িয়ে ধরে হাসছে। বাবুর সাথে খেলার ছলে হঠাৎ ঝুকে আমার চোখেও চুমু খেয়ে নিল দুষ্টটা।<br />
পরদিন সকালে অবাক বিস্ময়ে দেখলাম আমার বাবুর চোখ সম্পূর্ণ ভালো হয়ে গেছে। তবে আমারটা বেড়েছে। নতুন করে শুরু হয়েছে বাবুর বাপের। আমার মধ্যে একটা ভয় ছিল &#8211; চোখ ওঠা রোগী নিয়ে সাধন যেভাবে খেলা করেছে, চোখে চুমু খেয়েছে, তাতে ওর ও না এ রোগ হয়ে যায়। কিন্তু অদ্ভুত হলেও সত্যি যে ওর কিছুই হয়নি। একবার শুধু ফোন করে বলেছিল আমার চোখ ব্যাথা করছিল, একটু জাম্বুরার খোসা থেকে রস ছিটিয়ে দিয়েছি। ব্যস ব্যাথা ছেড়ে গেছে।</p>
<p>এগার<br />
সূর্যমুখীর ঘরে সাধনের যাতায়াত সুত্র ছিল সাংবাদিকতার প্রয়োজনে। সূর্যমুখীর বাবার যে গবেষণার কাজ সাধন করছিল, সেখানে তাদের ঘরের সকলের বক্তব্যও প্রয়োজন ছিল। এই সাাৎকার নিতে এসেই সূর্যমুখী, তার সন্তান ও তার স্বামীর সঙ্গে সাধনের প্রথম পরিচয় হয়েছিল। এটা তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক তৈরি হবারও পাঁচ মাস আগের কথা। বছর দেড়েক পর সূর্যমুখী ও সাধনের মধ্যে যখন নিবিড় ভালবাসার দেয়া নেয়া চলছে ঠিক তখন সাংবাদিক সাধন তালুকদারের মনে প্রচণ্ড পাপবোধ দানা বেঁধে ওঠে। সে ভেবে দেখে সূর্যমুখী আসলে কৌশলে সাধনকে তার সেই বন্ধু যুক্তিতেই বেঁধে রেখেছে। যে কারণে সাধন আর এ সম্পর্ক ধরে রাখতে আগ্রহী না। কষ্টে মরে যাবে, তবু সে আর সূর্যমুখীর সাথে সম্পর্ক রাখবে না স্থির করল। কিন্তু ছেলে আলাওলকে যে সে ইতিমধ্যেই নিজের ছেলে ভাবতে শুরু করেছে। তাছাড়া সূর্যমুখী নিজেও ছেলে সম্পর্কে ওকে কোন কথা বললে সেটা ‘তোমার ছেলে ওমুক করেছে। তোমার ছেলে আজ তমুক করেছে’। এভাবে পরিচয় দিয়েছে। কখনো ফোনটা ছেলের হাতে দিয়েছে সাধনের সাথে কথা বলতে। আলাওল ঐ দু চারটে শব্দ উচ্চারণ করতে পারে। গাড়ি, বাব্বা, পাম ও মা।<br />
এ মূহুর্তে চিরবিদায় নেয়ার ইচ্ছা হতেই প্রচণ্ডভাবে ছেলেকে একবার শেষ দেখতে ইচ্ছা হল ওর। সূর্যমুখীর কাছে ও শুনেছে ছেলে তার গত দুদিন ধরে কিছু খাচ্ছে না। রাতে সূর্যমুখীর এ সংক্রান্ত একটা এসএমএস ওকে খুব কাঁদিয়েছে। সূর্যমুখী লিখেছে &#8211; তুমি ভালো আছো তো? তোমার ছেলের যেন কি হয়েছে, সারারাত ঘুমায়নি কেঁদেছে আর কিছু খায় নি।<br />
এসএমএসটা পড়েই খুব অস্থির হয়ে ওঠে সাধন। আলাওলকে বুকে জড়িয়ে আদর করার জন্য ফন্দি খুঁজে বের করে ও। সূর্যমুখীর মায়ের একটা সাাৎকার এখনো গোছানো হয়নি। এই বলে সে ফোনে সূর্যমুখীর বাবার কাছে অনুমতি চায় তাদের বাসায় যাবার। সঙ্গে সঙ্গে অনুমতিও পেয়ে যায় সে। ব্যস সূর্যমুখী যখন অফিসের কাজে ব্যস্ত এই ফাঁকে বাসায় তার মায়ের কাছে গিয়ে হাজির হয় সাধন। ওর গলার শব্দেই আলাওল ছুটে আসে। আলাওলকে ওর কোলে চড়তে দেখে ঘরের সবাইতো খুব অবাক। বেশ অনেকণ আলাওলকে বুকে জড়িয়ে বাড়ির চারপাশে পাগলের মত ঘুরে বেড়ায় সাধন। কাজের লোকেরা বা সূর্যমুখীর মা সবাই হয়ত ওকে তখন ছেলে ধরা বা পাগল এ সবই ভাবছে। কেউ একবার বুঝতে চেষ্টা করছে না ছোট্ট বাচ্চাটির কষ্ট।<br />
সাধন বারবার তাদের অনুরোধ করে &#8211; একবার দরজার তালাটা খুলে দিন, আমি ওকে নিয়ে একটু রাস্তায় হেঁটে আসি, দেখবেন এরপর ওকে আপনারা যা খেতে দেবেন ও তাই খাবে।<br />
কেউ ওর কথায় কান দেয় না। শুধু নিষ্পাপ আলাওল ওর গলা জড়িয়ে থাকে। আলাওলের গালে, ঠোঁটে, গলায়, হাতে একের পর এক পাগলের মত চুমু খেয়ে চোখ বন্ধ করে ধ্যানী পুরুষের মতই আল্লাহ’র কাছে প্রার্থনা জানায় সাধন &#8211; ‘হে আল্লাহ, ওর আর আমার নামের অর্থ কাকতালিয় ভাবেই তুমি এক বানিয়ে দিয়েছো, আজ তাই আমার এ প্রার্থনা তুমি কবুল কর। ওর সব রোগ-ব্যাধি তুমি আমায় দান কর। প্রয়োজনে আমার জীবনের বিনিময়ে হলেও ওকে সারাজীবন সুস্থ রেখ প্রভু’।<br />
এ প্রার্থনা জানিয়ে আর দেরী করে না সাধন। কাজের লোকের কোলে আলাওলকে তুলে দিয়ে ঐ বাড়ি থেকে বের হয়ে যায় দ্রুত। পিছনে আলাওলের চিৎকারের সাথে তাল মিলিয়ে ওর চোখের জল ঝরতে থাকে। যা কারোই চোখে পড়ে না।<br />
ঘরে ফিরে সূর্যমুখী শোনে এক পাগলের গল্প। কাজের লোকেরা ওকে বলে সাংবাদিকটার নিশ্চয়ই কোন বদ মতলব ছিল। আর একজন বলে, ও ব্যাটা নেশা করে। দেখেন না কেমন হাত-পা কাঁপে। ধমকে ওদের থামায় সূর্যমুখী। কড়া কিছু বলতে পারে না, পাশে ওদের সম্পর্ক কেউ টের পেয়ে যায় এ ভয়ে। ফোন করে সাধনকে বলে &#8211; তুমি আর কোনদিন এ বাড়িতে এস না। এরা সবাই তোমাকে খুব অপমানকর কথা বলেছে।<br />
পাগলের মতই হ্যাঃ হ্যাঃ করে হাসে সাধন। ওর হাসিতে আরও ভড়কে যায় সরল মনের মেয়েটি। নিজের জালে যে সে নিজেই ফেঁসে গেছে। বুঝতে পারে না কি করবে। সাধনের সাথে পরিচয়ের পর ঠিকমত একটা দিন পড়তে পারে না। শ্রেণীকে সবসময় প্রথম স্থান অধিকার করা মেয়েটি এখন কেমন গুবেট বনে গেছে। ডিসিএইচ কোর্সটা করা হল না। এমআরসিপি পরীাটাও কি আর দেয়া হবে না? কি করবে ও? সাধন অবশ্য প্রথম থেকেই ওকে পড়ার ব্যাপারে খুব উৎসাহিত করছে। বিভিন্ন শর্ত দিয়ে ওকে পড়তে বসতে বাধ্য করছে। কিন্তু পড়া যে হয় না। পড়তে বসলেই সাধনের মুখটা ভেসে ওঠে মনের পর্দায়। আপন মনে নিজের সাথে কথা বলে সে। সাধনের সাথে স্বামীর সাথে সে কি তাহলে প্রতারণা করছে না? দু’ নৌকায় পা দিয়ে কতণ চলতে পারবে? কি করবে সে? আল্লাহ’র কাছে প্রার্থনা করেও কোন ফল হয় না। হঠাৎ ওর মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে যায়। হ্যাঃ এটাই উত্তম পথ। সাধনকে ওর আগের জীবনে, মানে ওর ঘরে ফিরিয়ে দিতে হবে। ওর স্ত্রীর কাছে ওকে ফেরত পাঠাতে পারলে একটু হলেও শান্তি পাবে ও। হায়রে মেয়ে, সাধন কোন জাতের তা যদি বুঝতে তাহলে এ চিন্তা ভুলেও করতে না।</p>
<p>বার<br />
আজ আমার জন্মদিন। ভোরবেলা ফোন খুলতেই দেখি সাধনের এসএমএস। জম্মদিনের অভিনন্দন জানিয়ে কবিতা পাঠিয়েছে।<br />
আজকে তোমার জন্মদিন<br />
আমি ছিলাম নিদ্রাহীন, জাগনা সারারাত।<br />
আজকে আমি আঁকবো ছবি<br />
নদীর ঘোলা জলে দেখা লুকিয়ে থাকা চাঁদ।<br />
সন্ধ্যায় আমার সামনে হাজির হল মিষ্টি আর বেশকিছু খুচরো টাকার ভান্ডিল নিয়ে। জানতে চাইলাম এটা কি। বলল &#8211; গত একবছর ধরে খুচরো নতুন যে টাকা জমিয়েছি তা তোমার জন্য নিয়ে এলাম।<br />
খুলে দেখি সত্যি কড়কড়ে তাজা সব দু টাকা ও পাঁচ টাকার নোট। সঙ্গে আমার একটা ছবিও বাঁধাই করে এনেছে। খুব আনন্দ পেলেও ওকে ধমকালাম। টাকাগুলো নিয়ে যেতে বললাম। মনে মনে লজ্জাও পেলাম এই ভেবে যে, আমার জন্য বেচারার ঘড়িটা চুরি গেল, হাতে ঘড়ি নেই। আমি ওকে ঘড়িটা কিনে দিতে পারছি না, আর ও কতগুলো টাকা খরচ করে আমার মন জয় করতে এসেছে। এইতো ভালবাসা। সত্যিকারের ভালবাসার স্বাদই ভিন্ন।<br />
বড় ঈদের উৎসব সামনে। মনে মনে ভাবলাম, ঈদের আগেই ওকে ঘড়িটা কিনে দেব। তাছাড়া ঈদের দিন পরার জন্য কিছু পোষাকও উপহার দেব ওকে। এ ভাবনা নিয়েই পরদিন ওকে আসতে বললাম। কিন্তু কাজের চাপ বেড়ে যাওয়ায় আর মার্কেটে যাওয়া হল না। কফি হাউসে ঘড়ি ধরা ৫ মিনিট মুখোমুখি বসে দু’জন দু’জনকে দেখি। আমাদের চোখ খেলা করে চোখের গভীরে। ওর চোখে তাকিয়ে থাকাতেই যেন আমার সব সুখ। ওকে আমি কি করে বোঝাবো যে এই চোখে তাকিয়ে আমার আর ঘরের কথা মনে থাকে না। কিন্তু ও ঠিকই ৫ মিনিটের বেশি আর বসতে দেয় না। যাবার পথে আমি অবশ্য কয়েকটা দোকান ঘুরে ওকে একটা ঘড়ি পছন্দ করতে বলি। কোন ঘড়িই ওর পছন্দ হয় না। অবশেষে জেন্ট ও লেডিস ঘড়ির যৌথ একটি সেট ওর পছন্দ হয়। বুঝতে পারি ঘড়ি নয় জোড়াটা ওর পছন্দ হয়েছে। ওর হাত থেকে আমরটা নিয়ে আমি রিক্সায় চেপে বসি। মিনিট দশেক পরেই ও ফোন করে জানায় &#8211; সূর্য! এতদিন তুমি ঘড়ি কিনতে পারনি কেন জান? আমি বলি &#8211; না কেন?<br />
ও উত্তর দেয় &#8211; এই জোড়া ঘড়িটা কিনবো বলে। আর এ জোড়াটা কেন পাওয়া গেল বলতে পার?<br />
আমি জানতে চাই &#8211; কেন?<br />
ও বলে &#8211; কারণ, এই ঘড়ি আজ থেকে আমাদের নিয়ন্ত্রণ করবে। যতদিন আমাদের ভালবাসা গভীর থাকবে, ততদিন এই ঘড়ি কখনো বন্ধ হবে না।<br />
আমি বলি &#8211; যাও, তা কি হয়? এটা ইলেকট্রনিক্স জিনিস। ব্যাটারী শেষ হলেই বন্ধ হবে।<br />
ও বলল &#8211; ব্যাটারী বদলে নেয়ার পরও যখন ঘড়ি চলবে না, তখন বুঝতে হবে আমাদের ভালবাসায় কোথাও সমস্যা হচ্ছে।<br />
ওর এ কথা শুনে আমি আর উত্তর খুঁজে পাই না। কারণ আমার মনের ভিতর ওকে নিয়ে অনেক ভয়। আমাদের মধ্যে যতটা না মিল তার চেয়ে বেশী ভুল বোঝাবুঝি কাজ করে। ও ওর মনে আসা একান্ত গোপন কথাটিও আমাকে বলে দেয় বলেই আমি জানি, আমাকে নিয়ে ওর মধ্যে অনেক ভয়। তবে সেটা আমাকে হারাবার ভয় না। আমার আচরণে, কথাবার্তায় নাকি স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে, এটাই ওর একমাত্র ভয়। ওর ধারণা &#8211; আমি যখন বুঝতে পারবো সাধন নামের ছেলেটি আমাকে প্রচণ্ড ভালবাসে। আমাকে ছেড়ে সে আর কোথাও যেতে পারবে না। ঠিক তখনই নাকি আমি ওকে ছেড়ে যাওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়বো। তখনই আমি আমার বন্ধুত্ব দাবীটাকে ফুটিয়ে তুলতে চাইবো।<br />
যদিও ওর ধারণা পরবর্তীতে মিথ্যে হয় নি। আসলেই আমি তাই চেয়েছিলাম। আমি ওর সাথে সারা জীবনের বন্ধুত্বই চেয়েছিলাম। তবে কখনো ওকে অখুশি করে নয়।<br />
আমি মাঝে মধ্যেই ওর কাছে ওর ঘরের খবর জানতে চাইতাম। ও কখনো কিছু লুকোয় না। সরাসরি সবই বলে দেয়। আমার খুব কষ্ট লাগে যখন শুনি ঘর থেকে কেউ একবার ওর খোঁজ নেয় না। কিন্তু সেদিন হঠাৎ ও ফোন করে জানাল যে, ওর ছোটভাই গিয়ে নাকি ওর স্ত্রীকে বাসায় নিয়ে এসেছে। ওর কোন এক খালা ওকে ফোন করে ঘটনাটা জানিয়েছে। শুনেই আমার মধ্যে একটা পরিবর্তন টের পেলাম। আমি ভাবলাম এই সুযোগ ওকে ঘরে পাঠাবার। বললাম, তারা যেহেতু তোমার স্ত্রীকে ঘরে ফিরিয়ে এনেছে, তারমানে তারা তাকে খুব পছন্দ করে। অর্থাৎ তাদের চোখে তুমিই অপরাধী। সে যাইহোক ঈদের দিন কেউ ডাকুক আর না ডাকুক তুমি মায়ের সাথে দেখা করতে যাবে।<br />
আমার ভাবনায় তখন অন্য চিন্তা চলছে। আমি কৌশলে ওর কাছ থেকে ওর স্ত্রী কোথায় চাকুরি করে তা জেনে নিয়েছি। পরদিনই ফোন গাইড থেকে ওই অফিসের নম্বর খুঁজে পেতে দেরী হল না। আমার পরিচয় না দিয়ে আমি ওর স্ত্রীর সাথে কথা বললাম। আমি ওর অবস্থা সব বললাম, সে সাথে একটু মন্দও বললাম, এতদিন স্বামীর খোঁজ না নেওয়ার জন্য। সব মিলিয়ে বুঝালাম ও অনেক কষ্টে আছে এবং এখনো তাকেই খুব ভালোবাসে। আমি যে তাকে ফোন করে এ সব বলেছি তা যেন সে সাধনকে না বলে বা বুঝতে না দেয়। সে অবশ্য আমার পরিচয় জানার খুব চেষ্টা করেছিল।<br />
রাতেই সাধন ফোন করে জানাল যে, ওর স্ত্রী আজ ওকে ফোন করেছে এবং ও ওর স্ত্রীকে সব সত্য কথা বলে দিয়েছে। আমি জানতে চাইলাম কি সত্য কথা বলে দিয়েছো?<br />
ও প্রচণ্ড একটা আত্মতৃপ্তি নিয়ে বলল &#8211; তোমার সাথে আমার সম্পর্কের কথা।<br />
ওর কথা শুনেই রাগে, ঘৃণায় আমার শরীর জ্বলে উঠল। আমি জানতে চাইলাম &#8211; কি বলেছো? কেন বলেছো?<br />
উত্তরে ও বলল &#8211; সে ফোন করে আগের মতই সন্দেহের সুরে কথা বলছিল। বলছিল যে, অসংখ্য মেয়ে বান্ধবীদের মাঝে আমি সুখে আছি, তাই সে আমাকে কোন ফোন করে ডিস্টার্ব করতে চায়নি। তাই তার সন্দেহ দূর করতেই আমি তাকে বললাম যে, আগে তুমি মিথ্যে সন্দেহ করে আমাকে ছেড়ে গেছ। এখন আর তোমার সন্দেহ মিথ্যে নয়। এই এক বছরে আমি সত্যি নতুন করে একজনের প্রেমে পড়েছি এবং আমি এখন তাকে প্রচণ্ড ভালবাসি। এই বলে আমি তোমার পরিচয় তাকে দিয়ে দিয়েছি। তবে নাম বলিনি।<br />
এমন বোকার হর্দ আমি জীবনে দেখিনি। ওকে খুব গালাগাল করলাম। ও রেগে ফোন কেটে দিল। আর আমি বোকার মত কাদঁতে শুরু করলাম। রাতের আকাশে তারার খেলা ছিল মিনিট পাচেঁক আগেও। হঠাৎ সেখানে কালো মেঘ দেখে ভড়কে গেলাম। মিনিট দশেকের মধ্যেই ঝড় শুরু হল। আমার মনের ভিতরও ঝড় চলছে। বুঝতে পারলাম, ওকে রাগিয়ে ভাল করিনি। প্রকৃতিও হয়ত বিষয়টা পছন্দ করেনি।<br />
পরদিন সকালে আমিই আবার ফোন করলাম। ওর ফোন বন্ধ দেখে পাশের ভাবীকে ফোন করে ওকে চাইলাম। ওর কণ্ঠ শুনে কিছুটা ধাতস্থ হলাম। ও ফোন খুললে আবার ওকে ফোন করলাম। বুঝালাম যে তুমি কথা ঘুরিয়ে নেবে, বলবে তুমি আসলে তোমার স্ত্রীকে খেপাতে এ সব কথা বলেছো, তোমার সঙ্গে আমার কোন সম্পর্ক নেই।<br />
ও বোকার মত হাসল আর বলল ঠিক আছে। আজ সন্ধ্যায় আমাদের দেখা হবে। তুমি গাছটার কাছে থেক। তারপর তুমি আমাকে সব শিখিয়ে দিও। আমি তোমার কাছে শিখে ঘরে গিয়ে তাই অবিকল বলবো। আমরা পার্কে লেকের পাড়ের একটা গাছকে বেছে নিয়েছি আমাদের ভালবাসার সাী হিসেবে। ঠিক টিনেজ ছেলে-মেয়েরা যা করে। এই গাছটির গায়ে হেলান দিয়েই ও আমাকে প্রথম ওর বুকে জড়িয়ে নিয়েছিল। আমার আসতে দেরী দেখে ও ঐ ‘গাঁও গ্রামের মূর্খ ছেলে’ কবিতাটি পাঠিয়েছিল। আজও সন্ধ্যার একটু পরেই আমরা দু’জন গাছটার কাছে এসে দাঁড়ালাম। ও আমার কপালে, ঠোঁটে, ঘাড়ে পাগলের মত চুমু খেল। তারপর বলল, তুমি এতো ভালো কেন সূর্য? আমি তোমাকে ছাড়া কেমন করে বাঁচবো বলতে পার?<br />
উত্তরে আমি বললাম &#8211; তোমাকে কোনদিনই আমাকে ছাড়া বাঁচতে হবে না। আমরা যেমন আছি চিরদিন এমনই থাকবো।<br />
এ কথা শুনে ওর মুখ কালো হয়ে গেল। আমি তাড়াতাড়ি কথা ঘুরিয়ে বললাম, না না বন্ধু থাকবো না, আমরা অবশ্যই বিয়ে করবো। সে সাথে আমি ওর থেকে কথা আদায় করে নিলাম যে ও ওর স্ত্রীর কাছে ফিরে যাবে। ওর স্ত্রী’র সাথে ভালো থাকার চেষ্টা করবে। আমার যে কষ্ট হবে তাও স্বীকার করলাম। ও হয়তো আরও কিছু বলতে চেয়েছিল কিন্তু হঠাৎ একজন সিরিয়াস রোগীর ফোন আসায় আমি দ্রুত সেদিন ওর থেকে বিদায় নিয়ে রোগী দেখতে চলে গেলাম।<br />
ঈদ পার হয়ে যাওয়ার চারদিন পর এক সকালে টানা বৃষ্টি চলছে। আকাশের মেঘ কাটছে না কিছুতেই। আর মেঘ দেখে আমার মধ্যে ভয় শুরু হয়েছে। আমি বৃষ্টিতে নিজেদের গাড়ি নিয়ে অফিসে গিয়েছি। খুব সম্ভব সাধন আমার আসার অপোয় ছিল। প্রবেশ পথেই আমাকে আটকাল, ঠিক প্রথম পরিচয়ের দিন যেভাবে ডেকেছিল সেই একই সুরে বলল &#8211; ‘এই যে, শুনুন’।</p>
<p>তের<br />
সাধন সূর্যমুখীকে দেয়া প্রতিটি কথা অরে অরে পালন করেছিল। ঈদের দিন সকালেই সূর্যমুখীর শুভেচ্ছা ও আদর সাথে নিয়ে সে তাঁর মা ও স্ত্রী’র কাছে ফিরে গিয়েছিল। দু’দিন স্ত্রীকে নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছে। তারপর ওর স্ত্রীকে বুঝিয়েছে যে, ওর মনে এখন আর কোথাও ওর স্ত্রীর জন্য এতটুকু ভালবাসা নেই। আছে শুধু পাঁচবছর একসাথে থাকার কারণে তৈরি হওয়া একধরণের মায়া এবং একটা দায়িত্ববোধ। সে তার স্ত্রীর কাছে জানতে চেয়েছে &#8211; এটা জেনেও কি সে ওর সাথে থাকতে পারবে? যদি পারে তাহলে সেও চেষ্টা করবে নতুন করে আবার সব সাজাতে। শুধু সে যেন কখনো সূর্যমুখীকে নিয়ে কোন কথা না বলেন।<br />
ওর স্ত্রী জানকী বেগম নিজেও খুব ভাল ও সৎ একজন মেয়ে। সে বিশ্বাস করে যেখানে ভালবাসা থাকেনা সেখানে আর কিছুই থাকেনা। তাই সে স্পষ্ট বলে ওঠেথ &#8211; সেটা কখনো সম্ভব নয়। তোমার জন্য এতোদিন আমি সবখানে পিছিয়ে ছিলাম, আর পিছনে থাকতে চাইনা। এবার আমি সামনে এগোতে চাই। কথাটি বলে সে জানতে চায় মেয়েটি কে?<br />
সাধন তখন তাকে সবই খুলে বলে। সাধন স্ত্রী’র সাথে শুনে সূর্যমুখী খুব খুশি হয়। রাতে ওকে বেশ পরামর্শ দেয়। পরামর্শ দিতে গিয়েই আবার মনমালিন্য দেখা দেয় ওদের মধ্যে। আবার শুরু হয় ঝড়-বৃষ্টি। আবার মরার হুমকী দিয়ে সূর্যমুখী সেই যে তাঁর ফোন বন্ধ করে, আর খোলেনা। ঈদের পরদিন দুপুর পর্যন্ত সাধন অপো করে সূর্যমুখীর ফোন খোলার জন্য। ওর অস্থিরতা ক্রমশ বাড়তে থাকে। তারপর হঠাৎ করেই ইলশে গুড়ি বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে স্ত্রীকে নিয়ে হাজির হয় সূর্যমুখীর ঘরে। প্রথম চমকে গেলেও সাধনের স্ত্রীকে খুব সম্মান দেখায় সূর্যমুখী। আলাওল ঘুমে থাকায় সাধন তাকে দেখতে পায় না। তবে সূর্যমুখীর স্বামীর সঙ্গে এই প্রথম খুব আন্তরিকতার সাথে কথা বলে সাধন। নিজের স্ত্রীকে পরিচয় করিয়ে দেয়। দুপুরের খাবার খায় তারা একসাথে।<br />
রাতে সূর্যমুখী ফোন করে সাধনকে। জানতে চায় ও কেন এভাবে ওর স্ত্রীকে নিয়ে তাদের বাসায় এসেছে। এটা কেন করেছে? ওর স্ত্রী কি তাহলে সব জেনে শুনেই ওর বাসায় গিয়েছে।<br />
সাধন উত্তর দেয় &#8211; হ্যাঃ। সে সব জানে। তুমিও তোমার স্বামীকে সব জানিয়ে দাও প্লিজ।<br />
ও প্রান্তে কান্নায় ভেঙে পড়ে সূর্যমুখী। সাধন ফোন কেটে দেয়। রাগে ােভে সে আবার ফোন করে সাধনকে। সাধনের স্ত্রীর সাথে কথা বলতে চায়। নিঃসঙ্কোচে সাধন ফোনটা বাড়িয়ে ধরে ওর স্ত্রীর দিকে। প্রায় দেড়ঘন্টা ধরে সূর্যমুখী আর সাধনের স্ত্রী জানকী বেগম কথা বলেন। কি বলেন তা তারাই জানেন। পরদিন সূর্যমুখীর ফোন বন্ধ। সারাদিন সে আর ফোন খোলেনা দেখে সাধন কান্নায় ভেঙে পড়ে। সাধনের কান্না দেখে ওর স্ত্রী নিজেও কান্নায় ভেঙে পড়েন। তিনি জানতে চান এখন সাধন কি করবে?<br />
সাধন তাকে জড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলে &#8211; দেখ, আমি যাকে এখন ভালবাসি, সে কোনদিন আমার বউ হতে পারবে না, তার সাথে হয়ত আমার আর কোন সম্পর্কও থাকবে না কোনদিন, হয়ত আর দেখাও হবে না। কিন্তু মনের মধ্যে থেকে আমি তাকে তাড়াতে পারবো না। তার সাথে আমার কোন শারীরিক সম্পর্কও তৈরি হয়নি কখনো। কোনদিন হবেও না। তারপরও তাকে আমি ভালবাসি, ভীষণ ভালবাসি। তার জন্যে আমি কষ্ট পাব, আর আমার কাছে থাকলে আমার কষ্ট দেখে তুমিও কষ্ট পাবে, এটা ভাল হবে না। তার চেয়ে এই ভাল আছি আমরা। আমাদের মধ্যে যখন কোন বাঁধন নেই। তখন তুমি নতুন জীবন বেছে নাও। আমি চললাম আমার মতন।<br />
সাধনের স্ত্রীর সাথে এই ছিল সাধনের শেষ কথা। আধুনিক মেয়ে জানকী বেগম বুঝতে পারেন, সে আগে আসলেই সাধনকে ভুল বুঝেছিল। এই প্রথম সে সাধনকে ভালোভাবে বুঝতে পারেন। বুঝতে পারেন, সাধন আগেও কখনোই তার সাথে মিথ্যে বলেনি। ইচ্ছে হয় চিৎকার করে বলেন যে &#8211; সাধন তুমি আমার কাছেই থাক। কোথাও যেওনা। আমি তোমার ব্যাথার ভাগীদার হয়েই বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেব। কিন্তু পরণে ভাবেন &#8211; সূর্যমুখী নামের ডাক্তার মেয়েটির কথা। ফোনে কথা বলতে গিয়ে সে ঐ মেয়েটির কাছ থেকে কথা আদায় করে নিয়েছে যে, সে আর কোনদিনই সাধনকে ফোন বা এসএমএস করবে না। মেয়েটি শপথ করে বলেছে, সে যেভাবে পারে সাধনকে তার পথ থেকে সরিয়ে দেবে। কেন জানি মনে হয়, সে কথা রাখবে। হে আল্লাহ এ আমি কি করলাম। ভুলবুঝে দুটো জীবনকেই হয়ত বিপথে ফেলে দিলাম। ঐ ডাক্তার মেয়েটির কষ্টের ভাগীদার এখন কে হবে? আল্লাহ! তুমি নিজে যা মেলাতে পার না পৃথিবীতে তা কেন ঘটতে দাও। নিরবে চোখের জল ফেলে জানকী বেগম চলে যায় তার বোনের বাড়িতে। বোন ছাড়া তার এ দুনিয়ায় আর কেউ নেই। আর সম্বল সাধনেরই দেয়া চাকুরিটা। এ চাকুরিতে সে এতোদিনে অনেক উন্নতি করতে পারতো। শুধু সাধনের জন্যই পারেনি। এবার নিশ্চিন্তে মন-প্রাণ উজার করে দেবে তার কর্মেেত্র, এটাই মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে সে।<br />
সাধন ফিরে যায় তার ভাড়া করা বাসায়। ইচ্ছে মত বিছানায় পড়ে কাঁদে। ওর কান্নার সাথে প্রকৃতি আজ আর পাল্লা দেয় না। শুধু কয়েক পশলা বৃষ্টি হয়েই ঝকমকে রোদ ওকে ব্যঙ্গ করে। প্রকৃতির এ রূপ দেখে ওর কান্না আরও বেড়ে যায়। আপন মনে চিৎকার করে ওঠে &#8211; হে আল্লাহ! আমার মনে তো কোন পাপ ছিল না। আমিতো সূর্যমুখী বা জানকী কারো সাথেই কোন প্রতারণা করিনি, তবে আমি কেন এত শাস্তি পাব। সূর্যমুখীর সাথে আমার কোন অবৈধ সম্পর্ক হোক, এটা আমি চাইনি। এটা না চাওয়া কি আমার অপরাধ? তাহলে কেন এই ভালবাসা তৈরি হতে দিয়েছিলে তুমি। কেন পবিত্র শবেবরাতের সকালে ওকে আমার কাছে আসার সুযোগ দিলে তুমি? তাহলে কি ও আমাকে সত্যিকার ভাবে ভালবাসেনি? সাধনের আর্তনাদ আল্লাহ শোনেন কিনা বোঝা যায় না। তবে এ সময় মাগরিবের আজান পড়ায়, কান্না থামিয়ে উঠে প্রার্থনায় বসে ও। এই একটা জায়গায় ও সূর্যমুখীর কাছে আজীবন ঋণি থাকবে। সূর্যমুখী ওকে সারা জীবনের জন্য নামাজ ধরিয়ে দিয়েছেন। তাই নামাজে দাঁড়িয়েই প্রথমে সূর্যমুখী ও তাঁর সন্তানের সুস্থতার জন্য নফল আদায় করে ও।<br />
পরদিন অনেকটা ঝরঝরা মনে অফিসে আসে। সূর্যমুখীর বাবার চাকুরিতে ইস্তফা দেয়। তারপর গিয়ে দাঁড়ায় সূর্যমুখীর সামনে। সূর্যমুখীর থেকে বিদায় নিয়ে সোজা ফিরে যায় ভাড়া বাসায়। আগেই সব গোছানো ছিল। সাবলেট বাসাটির ভাড়া পরিশোধ করে দেয়। প্রতিবেশী ভাবীটি অবশ্য জানতে চায় কি হয়েছে? অনেকদিন ভাবী ফোন করে না কেন? তার সাথে ভাল-মন্দ কোন কথাই বলে না সাধন। সামান্য হেসে তাদের থেকে বিদায় নিয়ে সামান্য মালামাল যা ছিল তা নিয়ে চেপে বসে দীণমুখী যাত্রীবাহী লঞ্চের ছাদে। পশ্চিমাকাশে সূর্যটা তখন ডুবু ডুবু। বুড়িগঙ্গার বুক চিড়ে লঞ্চটি ছুটে চলে, শীতের বাতাস শূল বিধায় ওর চোখে মুখে। কোন ভ্রুপে নেই ওর। চোখের কোনে জমাট পানি গাল বেয়ে নেমে যায়। হঠাৎ গলা ছেড়ে গান ধরে সাধন  &#8211;<br />
সূর্যমুখী, সূর্যমুখী শোন<br />
এই সূর্য ডোবা ভোরে<br />
ডাকছি তোমায় যখন<br />
আমি তখন<br />
যাচ্ছি হারিয়ে<br />
আলোহীন ঘরে<br />
ডাকছি শুধু তোমায়<br />
বিশুদ্ধ চিৎকারে<br />
ও সূর্য! আলো দাও আমারে।<br />
ও সূর্য! বাচাঁও আমারে।।<br />
বাঁচানোর মালিকতো আল্লাহ। সূর্যমুখী বা অন্যকারো সে মতা নেই। সে কথা কি সাধন ভুলে গেল? সাধনের শেষ কান্না আল্লাহ না শুনলেও ত্রিশ রোজা রাখতে গিয়ে প্রতিদিন সাধন যে প্রার্থনা জানিয়েছিল &#8211; ‘হে আল্লাহ, আমার বিশ্বাস সূর্যমুখী ও আমার সম্পর্কটা তুমিই তৈরি করেছো। তাই তোমার কাছে আবেদন, ওকে তুমি আমার সারা জীবনের সঙ্গী করে আমার স্বপ্নের কিনিকটি গড়তে দিও। আর তা যদি সম্ভব না হয়, তাহলে ওর আমার মৃত্যুকে তুমি কবুল কর হে রাব্বুল আলামীন। ওকে ছাড়া আমি বাঁচতে চাইনা, আমি আর পাপী হতে চাইনা, কারো কষ্টের কারণ হতে চাইনা।’ আল্লাহ হয়ত ওর এই প্রার্থনা ঠিকই কবুল করে নিয়েছিলেন।<br />
কারণ, এরপরের ঘটনাগুলো আর সাধনের ভাবনার সাথে মেলেনি। দণিাঞ্চলের সমুদ্রের পাড় ঘেঁষা জেরা শহরটিতে গিয়ে নিজের পরিচয় গোপন করে সাধন কাজ খুজে নেয় একটি বইয়ের দোকানে। কোন প্রকার ভার বহনের কাজ ওর জন্য নিষিদ্ধ। তা স্বত্বেও বইয়ের দোকানের ভারী কাজগুলো বেছে নেয় ও। সাইকেল চালিয়ে পাড়া গায়ের বিভিন্ন স্কুল ও লাইব্রেরীতে বই দিয়ে আসে। নিজেকে ব্যস্ত রেখে ভুলে থাকতে চায় সব কষ্ট। কিন্তু কষ্ট ভোলা কি এত সহজ? রাতে বিছানায় মাথা ঠেকাতেই সূর্যমুখী ও আলাওল চলে আসে ওর ভাবনায়। আলাওলকে নিয়ে দুঃস্বপ্ন দেখে গভীর রাতে ঘুম ভেঙ্গে কেঁদে ওঠে সাধন। স্বপ্ন দেখে আলাওল ‘বাব্বা বাব্বা’ বলে ওকে  লেকের পাড়ে ওকে খুজে বেড়াচ্ছে। সূর্যমুখীর কোল থেকে নেমে ছুটে যাচ্ছে লেকের দিকে। পিছন থেকে সূর্যমুখী ওকে ধরে রাখার চেষ্টা করছে কিন্তু পারছে না। ঝপাৎ করে আলাওল পরে যায় পানিতে। চিৎকার করে ঘুম ভেঙ্গে যায় সাধনের। এভাবে দু সপ্তাহ পার হতেই সাধন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। আলাওলের জন্য অস্থির হয়ে এক মাঝরাতে ওর বন্ধ থাকা সেলফোনটি খুলে দেয়। সঙ্গে সঙ্গে তিনদিন আগে পাঠানো সূর্যমুখীর একটি এসএমএস এসে প্রবেশ করে। ব্যাকুল আগ্রহ নিয়ে এসএমএসটি পড়ে সাধন। সূর্যমুখী লিখেছে  &#8211; সব সময় তুমিই জিতে যাও। আল্লাহর কসম, জীবনে একবার অন্তত আমাকে জিততে দাও। আমি কি সব সময় হেরেই যাব। ফোন বন্ধ করার আগে আমার সাথে একটু কথা বলতে। মেসেজটি পড়ে গুমরে কেঁদে ওঠে সাধন। মনে মনে বলে &#8211; একবার নয় সূর্য! আমি তোমাকে সারা জীবনের জন্য জিতিয়ে দেয়ার প্রার্থনা করেছি। আল্লাহ তোমাকে সব সময় জয়ী করবেন।<br />
পরদিনই কর্মস্থান ত্যাগ করে ও। বাসে চড়ে সন্ধ্যা নামার আগেই আবার ফিরে আসে ঢাকায়। লেকের পাড়ে সেই গাছটির কাছে গিয়ে বসে পড়ে। মনে মনে ভাবে ভালবাসা সত্যি হলে সূর্যমুখী এখানে আসবে। ওর টানে, মনের টানে ওকে আসতেই হবে। একে একে ঘন্টা পেরিয়ে যায়। গাছের গোড়ায় স্থির বসে মনে মনে স্রষ্টাকে ডাকতে থাকে সাধন। বিশ্বাস আর ভালবাসা যখন এক হয়ে যায় তখন অনেক কিছুই টের পায় মন। এ সত্য উপো করার সাধ্য কার আছে। সূর্যমুখীও পারেনি এ সত্যকে এড়িয়ে যেতে। নিজের অজান্তেই রাত আটটার দিকে সে বাসা থেকে বের হয়ে যায়। রাতে তাঁর এ বের হওয়া সকলের চোখেই অস্বাভাবিক মনে হয়। তারপরও গত ক’দিন ধরে ওর মনের অবস্থা ভালো না থাকায় কেউ এ নিয়ে প্রশ্ন তুলে না। সূর্যমুখী যখন গাছটার কাছে পৌছেছে তখন রাত পৌনে ন’টা। দেখে গাছের গোড়ায় বসে কাঁদছে সাধন। ছুটে গিয়ে ওকে বুকে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে হয়। কিন্তু একটা সঙ্কোচ ও লোক-লজ্জার ভয়ে তা পারে না। মুখোমুখি দাঁড়িয়ে দুজন দুজনকে দেখে। সূর্যমুখীর চোখের কোন বেয়ে গড়িয়ে যায় অশান্ত জলের ধারা। মুখে বলে  &#8211; কি পারলে না আমাকে ছেড়ে থাকতে? আমিও পারবো দেখো। এবার আর সঙ্কোচ মানে না সাধন। সূর্যকে বুকে জড়িয়ে হাউ-মাউ করে কেঁদে ওঠে। ওর চোখে মুখে চুমু খেয়ে বলে  &#8211; আমি কি করবো সূর্য? তুমি বলে দাও।<br />
সূর্যমুখী আবারও বলে একই কথা  &#8211; আমরা কেন সারা জীবন এভাবে একে অপরের বন্ধু হয়ে তাকতে পারবো না। আমরা তো কোন পাপ করছি না। কেন তুমি বার বার এভাবে কষ্ট দিচ্ছ?<br />
সাধন চুপ হয়ে যায় এ কথা শুনে। তারপর বলে  &#8211; তা সম্ভব নয় সূর্য।<br />
এসময় সূর্যমুখীর ফোন বেজে ওঠে। ও প্রান্তে বাবা ওকে খুজছে। কাল কথা হবে, কাল আমাদের দেখা হবে, দুপুরে অফিস ছুটির পরে। বলেই আবার অপেমান রিক্সায় চেপে বসে সূর্য।</p>
<p>চৌদ্দ<br />
পরদিন দুপুরে হঠাৎই সাধনের এসএমএস আসে। ও লিখেছে  &#8211; সূর্য, কেন জানি মন বলছে – অফিস ছুটির পর তোমার সাথে দেখা করা ঠিক হবে না। তাই দুপুরে নয়, বিকালে আমি তোমার জন্য লেকের পাড়ে অপো করবো। যদি সমস্যা না থাকে আমাদের ছেলেকে নিয়ে ওখানে এস প্লিজ।<br />
ও একটা অনুরোধ করলে সেটা রাখতে না পারার কষ্ট যে কি তা আমি জানি। যত সমস্যাই হোক আমি যে যাব তা ও ভালোই জানে। অথচ ওর এ সব আবদার রাখতে গিয়েই ঘরের মানুষ, মা-ভাবী ও আমার স্বামীর কাছে ক্রমশ সন্দেহভাজন হয়ে উঠছি আমি। এটা ও একবার বুঝতে চায় না। এসএমএসটা পড়ে প্রথম রাগ হলেও পরে নিজেকে বোঝালাম যে, ওর ভয়টা হয়ত মিথ্যে নয়। অফিসের শেষে ঘরে যেতে দেরি হলেই মা খোজাখুজি শুরু করেন। আর আজ এমনিতেই দেরি হবেই। তাই বাধ্য হয়েই ঘরে ফিরে গেলাম। বিকাল হবে পাঁচটায়। সময় যেন আর কাটে না। ওর কাছে যাবার জন্য ছেলেকে বার বার সাজাচ্ছি। ছেলেটাও যেন বুঝেঞ গেছে- আজ ওকে নিয়ে লেকের পাড়ে যাব। লেকের পাড় মানেই ওর কাছে পাম আর বাব্বা। তাই বার বার ও পাম আর বাব্বা বলে বাড়ি মাতিয়ে তুলছে। এ ঘর ও ঘর ছুটে বেড়াচ্ছে আর বলছে  &#8211; পাম, বাব্বা-পাম। ওর নাচানাচি দেখে মা এসে বলছেন  &#8211; বাহিরে যাবে? কাজের মেয়ে দুটোকে নিয়ে যেও।<br />
মায়ের চোখে সন্দেহের দৃষ্টি আমাকে আরও বিব্রত করে তুলল। এখন কি করি। কাজের মেয়েরা ওকে চেনে। ওর কাছে ওদের নেয়া যাবে না। তাহলে উপায়। এ সব ভাবনার মাঝেই আবার ফোন দেখছি। ওর কোন মেসেজ আসে কি না। না নেই। সেই যে দুপুরে একটা এসএমএস করে ওর ফোন বন্ধ করেছে আর খোলেনি। আমি যে কিছু বলবো সে সুযোগও নেই। সাড়ে চারটা বাজতেই অস্থির হয়ে উঠলাম। কাউকে কিছু না বলে ছেলেকে কোলে তুলে নিয়ে বের হয়ে এলাম ঘর থেকে। পিছনে মা ডাকলেন। কানে তুললাম না। রিক্সায় চেপে সোজা চলে এলাম পার্কের গেটে। আমার সেলফোনও বন্ধ করে দিলাম। যাতে ঘরের কেউ আমাকে ফোন করে বিরক্ত করতে না পারে। আমি ছেলেকে নিয়ে ওর সাথে আজ কিছুটা সময় একান্তভাবে কাটাতে চাই। কেউ বিরক্ত করুক তা চাইনা।<br />
ও পার্কের গেটেই আমাদের জন্য অপো করছিল। দেখেই এগিয়ে এসে ছেলেকে কোলে তুলে নিল। আমি রিক্সা ভাড়া মেটাতে মেটাতে আড়চোখে দেখলাম, ও পাগলের মত ছেলেকে চুমু খাচ্ছে আর বুকে জড়িয়ে ধরছে। ছেলেটাও ওকে পেয়ে যেন সাত রাজার ধন পেয়েছে। ওর খিল খিল হাসির শব্দ আমাকে ণিকের জন্য সব টেনশন মুক্ত করে দিল। আমরা তিনজন পার্কের ভিতরে, লেকের পাড়ে প্রায় ঘন্টা দেড়েক খেলা করে বেড়ালাম। আজ ও অদ্ভুত এক কাজ করে বসল। ছেলেকে নিয়ে খেলা করতে করতে হঠাৎ ঝুকে আমার স্তনের বোটায় আলতো কামড়ে দিল। আমি কপট ধমক দিলাম। ও হেসে উঠল, বলল  &#8211; আর তো সুযোগ হবে না। তাই একটু ছুয়ে দিয়ে তোমার ইচ্ছাটা পুরোন করলাম।<br />
মূহূর্তে বুকের ভিতরটা ছাৎ করে উঠল। তার মানে এই আমাদের শেষ দেখা? প্রশ্নটা না করে পারলাম না।<br />
অনেক কান্নারত কণ্ঠেই ও উত্তর দিল  &#8211; হ্যা সূর্য, এই শেষ দেখা।<br />
আমাদের আর কথা হবে না ?<br />
ওর গম্ভীর উত্তর  &#8211; জানি না।<br />
তাহলে কেন ফিরে এলে?<br />
বলল  &#8211; বাবার জন্য। ওর থেকে বিদায় নেয়া হয়নি তো তাই। আজ আমি ওর ঠোঁটে চুমু খেয়ে গেলাম। আল্লাহর রহমতে ওর আর কোনদিন বড় রকমের কোন অসুখ বিসুখ হবেনা ইনশাহ্ আল্লাহ।<br />
বলেই আমার ঠোঁটে ওর ঠোঁট ছুইয়ে দিল। তারপর বলল  &#8211; তুমিও রোগ-শোক মুক্ত থাকবে ইনশাহ্ আল্লাহ। ভালো থেকো সূর্য। এই বলে একটা রিক্সা ডেকে আমাদের তুলে দিল।<br />
আমার কান্না তখন আর বেগ মানছে না। বললাম  &#8211; এই কষ্টটা দিতেই কি এসেছিলে? এভাবে বার বার না মেরে কেন একেবারে মুখে বিষ তুলে দিচ্ছ না।<br />
ও কোন উত্তর দিল না। আমি ঘরে ফিরলাম সন্ধ্যার একটু পরে। মা রেগে আগুন। কারো সাথে কোন কথা না বলে আলাওলকে কাজের লোকদের কাছে তুলে দিয়ে সোজা নিজের রুমে গিয়ে ঢুকলাম। বিছানায় পরে অনেকণ কাঁদলাম। চেম্বারে যাবার সময় পার হয়ে গেছে। রোগীরা ভিড় করেছে জানিয়ে বার বার চেম্বার থেকে ফোন আসছে বলে মা শাসিয়ে গেলেন। প্রায় একঘন্টা বিছানায় পরে কেঁদে শান্ত হলাম। চোখমুখ ফুলে গেছে। এই অবস্থায়ই চেম্বারে গেলাম। বার বার ফোন দেখছি। দেখি ওর ফোন আসে কি না? নাহ, নেই। কোন ফোন, কোন এসএমএস নেই। কষ্টে বুকটা ভেঙ্গে যেতে চাইছে। অথচ কোন কিছু করার উপায় নেই। পরদিন সারাদিন গেল। সন্ধ্যার পর ঢাকার বাহিরে ওর বন্ধু গালিবের কাছে ফোন করলাম। জানতে চাইলাম  &#8211; ও আছে কি না। আমার মন বলছিল, ও ভালো নেই, যেখানেই থাকুক খুব কষ্টে আছে।<br />
গালিব জানালেন  &#8211; ও আছে এবং বিকালে ওর এখানে পৌছেছে। খুব কান্নাকাটি করছে।<br />
আমি ওকে ফোন দিতে বললাম।<br />
ওপ্রান্তে ও বসে যাওয়া কণ্ঠে ফোন ধরেই জানতে চাইলো কেন ফোন করেছো? আর কখনো করো না প্লিজ। বলেই ফোনটার লাইন কেটে দিল। আমি আবার করলাম। আবার। কিছুণ পর ওর ফোন থেকে একটা এসএমএস এল। সেই একই কথা  &#8211; তোমার স্বামীকে সত্যটা বলে দাও প্লিজ। আমি আমার স্ত্রীকে সত্য বলেছি। তাকে ছেড়ে চলে এসেছি। তুমি যদি তা না পার, আর কখনো আমাকে ফোন কর না। কোনদিন না।</p>
<p>পনের<br />
সূর্যমুখীকে এই এসএমএস পাঠিয়ে আমি পাগলের মত কান্নায় ভেঙ্গে পড়লাম। বন্ধুরা আমাকে অনেক বুঝাতে চেষ্টা করল। ওরা বলল  &#8211; দেখ, এটা আধুনিক যুগ। এ যুগে লাইলী-মজনু, শেরী-ফরহাদ, এদের কোন অস্তিত্ব নেই। তুই ভুল করছিস। ডাঃ আসলে তোর সাথে একটা শারীরিক সম্পর্ক তৈরি করে কিছুদিন আনন্দে কাটাতে চায়। এটা কোন ভালোবাসা না। আর যদি তোকে সত্যিই ভালোও বাসে তবু সে তাঁর স্বাবলম্বি স্বামী, অবস্থাপন্ন বাবা-মাকে ছেড়ে তোর কাছে আসবে না। তোর চাওয়াটা বড় অযৌক্তিক।<br />
এ সবই আমি বুঝি। সবচেয়ে বড় কথা আমি নিজেতো জানি, সূর্য তাঁর সন্তানকে কতটা ভালোবাসে। সন্তানের মঙ্গলের জন্যই সে কোনদিন আমার কাছে আসতে পারবে না। আমি নিজেও তা চাই না। তারপরও কেন যে মন মানে না। বন্ধু গালিব ও এখানের অন্যদের কথাবার্তা ভালো লাগে না আর। ওরা প্রায়ই এটাকে একটা বাঝে, কুৎসিত সম্পর্ক বলে বুঝাতে চায়। বাধ্য হয়েই ওদের কাছ থেকে কেটে পড়লাম। চলে গেলাম সিলেটের চা বাগান এলাকায়। ভাবলাম প্রকৃতির বিশালত্বের মাঝে কিছুটা হলেও শান্তি পাব। কিন্তু না। কোথায় শান্তি। সূর্যমুখী আর আলাওল এখানের প্রকৃতিকেও ঢেকে দিল। চোখ বন্ধ করলেই আলাওলের হাসির শব্দ। বাব্বা, বাব্বা বলে মধুর ডাক। হাতের ঘড়িটাকে দেখি, মনে হয় সূর্যমুখী করুণ চোখে তাকিয়ে আছে। কিছু বলতে চায়। পাগলের মত ঘড়িটাকে চুমু খাই।</p>
<p>ষোল<br />
সাধনের ভাবনায় সূর্যমুখী প্রচণ্ড সৎ ও ধার্মিক একজন মেয়ে। যে একদিন না একদিন তাঁর সততা প্রতিষ্ঠিত করতেই সত্য স্বীকার করবে। তাই সাধন ভেবেছে যে এ ঘটনায় সূর্যমুখী কিছুদিন অসুস্থ হয়ে বিছানায় পরে থাকলেও সুস্থ হয়েই সে সাধনকে খুঁজতে বের হবে। সাধন স্বপ্ন দেখে  &#8211; সূর্যমুখী প্রথমে ছুটে যায় সাধনের ভাড়া বাসায়। সেখানে ওকে না পেয়ে ফোন করে ওর বন্ধুদের কয়েকজনকে। তারপর ছুটে যায় সাধনের মায়ের কাছে। কেউ ওর সন্ধান দিতে পারে না। পাগল প্রায় সূর্যমুখী পথে ঘাটে সাধনকে খুঁজে বেড়ায়। জানকী বেগমকে ফোন করে তাঁর সাথে কথা বলে। সত্য স্বীকার করে মা চায়। জানকী বেগমও হাসি মুখে মা করে দেয় সূর্যমুখীকে। বলেন &#8211; মাতো আমার চাওয়া উচিত আপনাদের কাছে বোন। আমরা দুজনেই আসলে ভুল বুঝেছি ওকে। জানকী বেগমের কাছে সাধন ও তাঁর  সর্বশেষ কথা শুনে সে বুঝতে পেরেছে কত বড় ভুল সিদ্ধান্ত সে নিয়েছিল সেদিন। সাধনের সুন্দর জীবন ফিরিয়ে দিতে গিয়ে সে আসলে ওর সততাকে অপমান করেছিল।<br />
সাধন ওকে বারবার বলেছিল &#8211; সূর্যমুখী, দেখ! প্রকৃতির সাথে আবার যুদ্ধ করতে যেও না। স্বাভাবিক নিয়মে যা ঘটবে তা ঘটতে দিও। তুমি বুদ্ধি খাটিয়ে সেটাকে নিয়ন্ত্রণ কর না। তাহলে ফল ভাল হবে না। আর একটা কথা মনে রেখ, আমার ভিতর তুমি ছাড়া এখন আর কারো কোন অস্বিত্ব নেই। আমি জানকীর সাথে প্রতারণা করতে পারবো না। তাই ওকে সব সত্য বলে দিয়েছি। তুমি যদি সত্যিই আমায় ভালবাস, তাহলে যাও! ঘরে গিয়ে সব সত্য স্বীকার করে, তোমার স্বামীর কাছে মা চাও। যদি সে তোমায় মা করেন এবং তোমায় নিয়েই সংসার করতে চান, তাহলে আমি সরে যাবো। আর যদি সে তোমার উপর থেকে তাঁর দাবী তুলে নেন, তাহলেই আমরা বিয়ে করবো।<br />
সাধনের বলা এ কথা মনে আসতেই সূর্যমুখী ছুটে যায় তাঁর স্বামীর কাছে। সব সত্য খুলে বলে তাকে। মহৎ মনের মানুষ সূর্যমুখীর স্বামী নবকুমার। তিনিও জানকী বেগমের মতই জানতে চাইলেন একই প্রশ্ন &#8211; এখন তুমি কী চাও? তারপর বললেন &#8211; তুমি আজ সত্যটা বলতে পারছো দেখে আমার ভালো লাগছে সূর্য। সাধন সাহেব যেদিন খুব ভোরে এ বাসায় ছুটে এসেছিলেন। সেদিন থেকেই আমি তোমাদের সব এসএমএস পড়েছি। তখন থেকেই আমি সব জানতাম। তাঁর সততা, তাঁর সাহস দেখে তুমি শিখবে এটাই আমি আশা করেছিলাম। এখন বল কী চাও?<br />
সূর্যমুখী এই প্রথম স্পষ্ট উত্তর দিল তার স্বামীকে। প্লিজ নব তুমি আমায় ডিভোর্স দাও।<br />
হেসে ফেললেন নবকুমার &#8211; প্রায় ৫ বছর পর তুমি আমাকে নব বললে সূর্যমুখী।<br />
মৃদু হাসি নিয়ে সূর্যমুখী বলল &#8211; তুমিও তো একই কাজ করেছো। ৭ বছর পর আমাকে সূর্য বলেছো।<br />
তাহলে আলাওল ওর কী হবে? প্রশ্নটা সূর্যই করল।<br />
উত্তরে নবকুমার বললেন &#8211; ওতো যতোটা না আমার ছেলে, তারচেয়ে অনেক বেশি সাধন সাহেবের ছেলে হয়ে গেছে। বাবা ডাক শেখেনি কিন্তু বাব্বাটা উচ্চারণ করে নির্ভূল ভাবে। আমিতো বিদেশে চলে যাচ্ছি। কাগজপত্র সব তৈরি। ও তোমার কাছেই থাকুক। আর তোমার ডিভোর্স পেপারটাও আমি আগেই তৈরি করে সই করে দিয়েছি। শুধু তোমার সইটা বাকী। দিয়ে নিও।<br />
আর একটা সত্য কথা শোন &#8211; যদিও এ সত্য বলার সাহস আমাকে সাধন সাহেবই শিখিয়েছেন। আমিও তোমাদের মতই গোপনে আরেকজনকে ভালো বেসেছিলাম। তবে আমি গোপনেই তাকে বিয়ে করে ফেলেছি। সেখানে আমার এক সন্তানও আছে। আমি বিদেশে তাদের কাছেই ফিরে যাচ্ছি।<br />
সাধনের এ স্বপ্ন ঘোর কেটে যায় একমাস যেতে না যেতেই। কারণ বাস্তব বড় কঠিন। সেখানে প্রেম-ভালবাসার আদৌ কোন মূল্য নেই। একমাস পরে সাধন তখন ফিরে গেছে দণিাঞ্চলের সমুদ্র পাড়ের সেই ছোট্ট শহরটিতে। ও যাবার পরদিনই প্রলয়ংকারী ঝড় সিডর আঘাত হানে উপকূল অঞ্চলে। অল্পের জন্য প্রাণে বেচে যায় সাধন। কিন্তু লাখ লাখ মানুষ, ঘর-বাড়ি, শিশুদের প্রাণ তছনছ করে দিয়ে যায় সিডর। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসে মানুষের জন্য কিছু করতে ব্যাকুল হয়ে ওঠে ওর মন। ছোট্ট ছোট্ট শিশুদের হাত-ভাঙ্গা, কারো পা ভাঙ্গা দৃশ্য দেখে ওর মন কেঁদে ওঠে। ডায়রিয়া তখন সরিয়ে পড়েছে দণিাঞ্চলের গ্রামগুলোতে। ইচ্চে হয়  &#8211; এই সময় সূর্যমুখীকে ডেকে এনে এই অসহায় মানুষের পাশে দাঁড় করায়। ভাবনাটা মাথায় আসতেই ফোন খোলে ও। কিন্তু নিজের শপথ মনে পড়ে যাওয়ায় ফোন করতে পারে না। বন্ধুত্ব চেয়ে একটা এসএমএস পাঠায়। ভাবে এটা পেয়েই হয়ত সূর্যমুখী ফোন করবে। ফোন করলেই ওর স্বামীকে নিয়ে এখানে চলে আসতে বলবে। ওরা এসে এখানে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াবে। সাধন দু’ চোখ ভরে দেখবে ওদের। এ ভাবনার মাঝেই কয়েকদিন কেটে যায়, ফোন আর আসে না। মনে মনে ভাবে দু’দিন পরতো আমার জম্মদিন  &#8211; আমার জম্মদিনে আমাকে উইশ করবে তো সূর্য?<br />
দেখতে দেখতে ওর জম্মদিনটা এসে চলে যায়। অনেক আশা নিয়ে সেলফোনটা খুলে বসে থাকে সাধন। কেউ ওকে উইশ করে না। আশায় আশায় দিন কাটে সাধনের। যখন খুব কষ্ট হয় তখন সমুদ্রের কাছে গিয়ে পাগলের মত কান্না করে। এভাবেই একদিন সন্ধ্যায় ওর লাশ খুঁজে পায় কুয়াকাটা পুলিশ। ময়না তদন্তে দেখা যায় স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে সাধনের। স্রষ্টা এতোদিনে ওর প্রার্থনা কবুল করেছেন।<br />
নাহ সূর্যমুখীর তেমন দোষ দেয়া যায় না। সাধনের ভাবনার সাথে তাঁর আচরণ প্রায় সবটাই মিলেছিল। স্বামীকে সে সত্য স্বীকার করেছিল। তবে নিজের সন্তানের মঙ্গলের কথা চিন্তা করেই সত্যটাকে একটু ঘুরিয়ে বলেছে মাত্র। যে কারণে সব শুনে সূর্যমুখীর স্বামী নবকুমার সাহেবও তাকে মা করে দেন। তিনিও নিজের ভুলগুলো বুঝতে পেরেছিলেন। স্ত্রীকে সময় না দেয়া, স্ত্রীর সাথে রোবটের মত আচরণ করা এগুলো যে ঠিক নয় তা বুঝতে পেরে মনে মনে সাধনকে ধন্যবাদ জানান তিনি। প্রায় পাঁচবছর পর তারা দু’জনে আবার আগের মতই স্বাভাবিক জীবন-যাপনে অভ্যস্থ হয়ে পড়েন। দীর্ঘদিন সুখেই ছিলেন তারা। নবকুমার সাহেবের মৃত্যুর পর হঠাৎ একরাতে কলেজ পড়ুয়া আলাওল বাব্বা, বাব্বা বলে কেঁদে ওঠে। সঙ্গে সঙ্গে সাধনের জন্য কেঁদে ওঠে সূর্যমুখীর মন।</p>
<p>সমাপ্ত</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://shahittabazar.com/%e0%a6%8f%e0%a6%87-%e0%a6%af%e0%a7%87-%e0%a6%b6%e0%a7%81%e0%a6%a8%e0%a7%81%e0%a6%a8-%e0%a6%8f%e0%a6%95%e0%a6%9f%e0%a6%bf-%e0%a6%ac%e0%a7%9c-%e0%a6%97%e0%a6%b2%e0%a7%8d%e0%a6%aa/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
			</item>
		<item>
		<title>যে কথা এখনো বলা হয়নি : তানজীর হোসেন পলাশ</title>
		<link>https://shahittabazar.com/%e0%a6%af%e0%a7%87-%e0%a6%95%e0%a6%a5%e0%a6%be-%e0%a6%8f%e0%a6%96%e0%a6%a8%e0%a7%8b-%e0%a6%ac%e0%a6%b2%e0%a6%be-%e0%a6%b9%e0%a7%9f%e0%a6%a8%e0%a6%bf-%e0%a6%a4%e0%a6%be%e0%a6%a8%e0%a6%9c%e0%a7%80/</link>
					<comments>https://shahittabazar.com/%e0%a6%af%e0%a7%87-%e0%a6%95%e0%a6%a5%e0%a6%be-%e0%a6%8f%e0%a6%96%e0%a6%a8%e0%a7%8b-%e0%a6%ac%e0%a6%b2%e0%a6%be-%e0%a6%b9%e0%a7%9f%e0%a6%a8%e0%a6%bf-%e0%a6%a4%e0%a6%be%e0%a6%a8%e0%a6%9c%e0%a7%80/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[সাহিত্য বাজার]]></dc:creator>
		<pubDate>Mon, 23 Dec 2013 10:59:42 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[গল্প]]></category>
		<category><![CDATA[সাহিত্য]]></category>
		<guid isPermaLink="false">http://shahittabazar.com/?p=1336</guid>

					<description><![CDATA[<p>যে কথা এখনো বলা হয়নি : তানজীর হোসেন পলাশ</p> <p>২০০৮ সালের ৩ জানুয়ারি, বৃহস্পতিবার। সন্ধ্যার পর টাইমস নামের সমিতি অফিস কে বসে আছেন এলাকার ব্যস্ততম এবং জনপ্রিয় শিক মো. তরিকুল</p><span><div class="readmore"><a href="https://shahittabazar.com/%e0%a6%af%e0%a7%87-%e0%a6%95%e0%a6%a5%e0%a6%be-%e0%a6%8f%e0%a6%96%e0%a6%a8%e0%a7%8b-%e0%a6%ac%e0%a6%b2%e0%a6%be-%e0%a6%b9%e0%a7%9f%e0%a6%a8%e0%a6%bf-%e0%a6%a4%e0%a6%be%e0%a6%a8%e0%a6%9c%e0%a7%80/">...বিস্তারিত &#8594;</a></div>]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p><strong><a href="http://shahittabazar.com/wp-content/uploads/2013/12/5.jpg"><img loading="lazy" decoding="async" class="size-full wp-image-1194 alignright" alt="5" src="http://shahittabazar.com/wp-content/uploads/2013/12/5.jpg" width="130" height="101" /></a>যে কথা এখনো বলা হয়নি</strong> <strong>: তানজীর হোসেন পলাশ</strong></p>
<p>২০০৮ সালের ৩ জানুয়ারি, বৃহস্পতিবার। সন্ধ্যার পর টাইমস নামের সমিতি অফিস কে বসে আছেন এলাকার ব্যস্ততম এবং জনপ্রিয় শিক মো. তরিকুল ইসলাম। সবাই তাঁকে তারেক স্যার বলেই জানে। লম্বাটে ফর্সা গড়ন, চোখে চশমা পড়েন প্রায়ই। চুলগুলো বেশ বড় বড়। চেহারা দেখে কেউ তাকে শিক হিসেবে স্বীকৃতি দেবে এরকম লোকের সংখ্যা খুব কমই পাওয়া যাবে। সাহিত্যের পাগল, দার্শনিক, আর্ট শিল্পী বা মিডিয়াজগতের একজন কর্মী হিসেবে এক দর্শনে স্বীকৃতি মিলবে তার। গণিতের শিক হলেও সাহিত্য জগতে তার পদচারণা অনেক আগেই হয়েছে। অবশ্য তার এই চুল বড় করার কারণ কেউ অনুধাবন করতে পারেনি বিন্দুমাত্র।<br />
তারেক সাহেবের এক সময়ের ছাত্রী কাজল এসে বলল : স্যার, আপনার জন্য একটা সারপ্রাইজ এনেছি।<br />
কিছুটা অবাক হলেন তারেক সাহেব। তারপর কাজলের দিকে তাকাতেই ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে হালকা সবুজ বর্ণের এক টুকরা কাগজ স্যারের হাতে দিল কাজল। তারেক সাহেব ভাঁজ করা কাগজটি খুললেন &#8211; যা ছিল একটি স্কুলে চাকুরির বিজ্ঞপ্তি। সেখানে লেখা &#8211;<br />
ক্রিয়েটিভ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল (সৃজনশীলতাই যার একমাত্র ল্য)<br />
নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি<br />
ক্রিয়েটিভ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে বিভিন্ন পদে শিক নিয়োগ করা হবে।<br />
আগামী ৪ জানুয়ারি সকাল ১০টায় স্বহস্তে লিখিত দরখাস্ত নিয়ে সরাসরি সাাৎ করতে হবে।<br />
বিজ্ঞপ্তিটা দেখে অবাক হলেন তারেক সাহেব। এই বিজ্ঞপ্তি কাজলের মা পাঠিয়েছেন নিশ্চয়। কারণ তিনি ক্রিয়েটিভ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে চাকুরী করেন। হঠাৎ মাথায় আইডিয়া এল ইন্টারভিউ দিবেন তারেক সাহেব। কিন্তু একা একা ইন্টারভিউ দিতে যাবেন কি করে? সঙ্গে সঙ্গে তিনি আইডিয়াল ক্যাডেট একাডেমীতে তারেক সাহেবের বর্তমান কলিগ খন্দকার রিপন ও মিজানুর রহমানকে ফোন করলেন। সব শুনে তারাও ইন্টারভিউ দিতে রাজি হলেন।<br />
রাতে বাসায় ফিরে দরখাস্ত লেখা শুরু করলেন তারেক সাহেব। অনেক রাত পর্যন্ত চোখে ঘুম এল না। মাথার মধ্যে দুইটা দুশ্চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। প্রথমত: দীর্ঘ আট বছর আইডিয়াল ক্যাডেট একাডেমীতে কাজ করার পর তা ছেড়ে চলে যেতে হবে! পারবে তো ছেড়ে যেতে! দ্বিতীয়ত: যদি পরীা দিয়ে চাকুরী না হয়, তবে জানাজানি হলে আইডিয়াল ক্যাডেট একাডেমীতে মুখ দেখাবে কি করে! এসব ভাবনায় সকালের সূর্যটা আলো বিকিরণ শুরু করেছে চতুর্থ তলার ফাটের জানালা দিয়ে।<br />
৪ জানুয়ারি। শুক্রবার। ছুটির দিন থাকায় অনেকেই ঘুম থেকে ওঠেনি। অবশ্য যারা বাজার করতে অভ্যস্ত তারা অনেক আগেই বাজারে চলে গেছে। অথচ তারেক, মিজান ও রিপন সাহেবরা ভিন্ন উদ্দেশ্যে পথ চলছে তখন। ক্রিয়েটিভ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের সামনে একটি রিক্সা এসে থামল। যাত্রী তিনজন। সবার উদ্দেশ্য একই। ক্রিয়েটিভ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে ইন্টারভিউ দিবে। কিন্তু দু:খজনক হলো পরীার বিষয় তিনজনেরই ভিন্ন। অথচ তারা একই স্কুলে চাকুরী করেন। ছয়তলা ভবন বিশিষ্ট ক্রিয়েটিভ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের নিচ তলায় কাগজপত্র জমা দিলেন তিনজন। তারপর অপোর পালা। কিছুণের মধ্যেই সিঁড়ি দিয়ে উঠলেন সবাই। ভিন্ন ভিন্ন তলায় তিনজনের সিট পড়েছে। ক্রিয়েটিভ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের অনেকেই তারেক সাহেবের দিকে তাকিয়ে আছে। বিশেষ করে তার চুলের দিকে। একজন তো বলেই ফেললেন এ পাগল পরীা দিতে এসেছে কেন? এ তো পরীার আগেই বাদ পড়বে। তিনি অন্যদের ডেকে দেখালেন তারেক সাহেবকে। এ দৃশ্য চোখে পড়েনি তারেক সাহেবের। অনেকেই ভেবেছিল তিনি হয়ত ড্রইং বিষয়ে পরীা দিবেন। অথচ সবাইকে অবাক করে দিল যখন তাকে দেখা গেল গণিত বিষয়ের ক।ে এও কি করে সম্ভব! এত বড় আধ্যাত্মিক ধরনের চুলওয়ালা লোক কি করে গণিতের শিক্ষক হতে পারে!<br />
১৩ জানুয়ারি। ভাইভা পরীা। ডাক পড়ল মো. তরিকুল ইসলাম সাহেবের। খুব ভয়ে ভয়ে তিনি ভেতরে গেলেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় তাকে কেউ চিনতে পারল না। ভাইভা বোর্ডে বসা সকলের মধ্যে একজন বললেন, আপনি তো আমাদের প্রতিষ্ঠানে চাকুরী করার উদ্দেশ্যে অনেক বড় ঝধপৎরভরপব করেছেন। আপনার অনেক বড় চুল ছিল। নিশ্চয় অনেক শখ করে রেখেছিলেন। তিনি আরো বললেন, আমার বিশ্বাস আপনি পারবেন। আপনার সে যোগ্যতা নিশ্চয় আছে। আমাদের এখানে কাজ করে আপনি নিজেকে প্রমাণ করতে পারবেন। তার এই কথাগুলো তারেক সাহেবের খুব ভাল লাগল। তিনিই ক্রিয়েটিভ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের কর্ণধার। পদাধিকারবলে তিনি মহাপরিচালক ও প্রতিষ্ঠাতা। অত:পর চারদিন উবসড়হংঃৎধঃরাব কাস করার জন্য বলা হল তারেক সাহেবকে। কিন্তু তারেক সাহেবের আপত্তিতে দুই দিনের উবসড়হংঃৎধঃরাব কাস করার অনুমতি দেওয়া হল।<br />
১৬ ও ১৭ তারিখ তারেক সাহেবের উবসড়হংঃৎধঃরাব কাস হবে ক্রিয়েটিভ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে। তিনি আইডিয়াল ক্যাডেট একাডেমী থেকে ছুটি নিলেন দুই দিনের। ডেমো. কাস পছন্দ হল কর্তৃপরে। ১৮ তারিখে আবার সৌজন্য সাাতে মিলিত হলেন তারেক সাহেব। সেদিন মহাপরিচালক স্যারের সাথে একান্তে কথা হল। বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলাপচারিতার পর নিয়োগপ্রাপ্ত হলেন তারেক সাহেব। চাকুরীতে যোগদান করতে হবে ১৯ তারিখ। এবারও আপত্তি জানালেন তিনি। কারণ তিনি এই মুহূর্তে একটি প্রতিষ্ঠানে আছেন। তাদের সময় না দিয়ে চাকুরী ছাড়া ঠিক হবে না। তারপরও সেখানে সহকারী প্রধান শিক হিসেবে আছেন। তবে আরো একদিন সময় নিয়ে ২১ তারিখ যোগদানের কথা বললেন তারেক সাহেব।</p>
<p>১৯ জানুয়ারি। আকাশ যেন হালকা মেঘে আবৃত ছিল। শুধু এক কোণায় উজ্জ্বল সূর্যের কিরণ দেখা যাচ্ছিল। আইডিয়াল ক্যাডেট একাডেমীতে ঢুকলেন তারেক স্যার। ইতোমধ্যে অনেকেই জেনে ফেলেছেন তিনি চলে যাচ্ছেন এই বিদ্যাপীঠ থেকে। সুতরাং তিনি বিদ্যালয়ে ঢোকামাত্রই উৎসুক দৃষ্টি প্রশ্ন করল কি খবর স্যার? সহাস্য তার জবাব ভাল। এরপর একে একে বিভিন্ন কাসে গেলেন এবং ঘোষণা করলেন আগামি দিন থেকে তিনি আর আসবেন না। তার চলে যাবার খবর সকলের মধ্যে ক্রন্দনের বিহঙ্গ তৈরি করল। বেদনার্ত পরিবেশ সৃষ্টি হল আইডিয়াল ক্যাডেট একাডেমী প্রাঙ্গনে। বিদায়ের সুর যত কঠিন হোক না কেন, বিদায় তো নিতেই হবে। এই মানসিকতা তৈরি করেই গিয়েছিল তারেক স্যার। সুদীর্ঘ আট বছর যে প্রতিষ্ঠানে সময় দিয়েছেন, যার সুখে-দু:খে দিন কেটেছে তাঁর। চাকুরী জীবনের শুরুটা হয়েছে যে স্কুলের মাধ্যমে তার মায়া ছেড়ে চলে যাওয়া তো এত সহজ কাজ নয়। অবশ্য এর আগে তারেক স্যার বহুবার চেষ্টা করেছেন অন্য কোথাও চাকুরী করার। কিন্তু পারেননি স্কুলের মায়ায়। এবার আর পিছে ফেরার কোন পথ নেই। কিছু দূষিত হাওয়া স্কুলটাতে প্রবেশ করে পরিবেশ নষ্ট করে ফেলেছে। শিক প্রতিনিধি ছাড়া কমিটি নামক কিছু অবাঞ্চিত লোক স্কুলের কার্যক্রমে পান্ডিত্য প্রকাশ করে স্কুলের মর্যাদা নষ্ট করছে বলে তারেক সাহেবের এই হঠাৎ সিদ্ধান্ত। এই জন্যই মায়া কাটাতে পেরেছে। শেষপর্যন্ত বিদায় দেওয়া হল তারেক সাহেবকে। তবে আনুষ্ঠানিক বিদায় হয়নি। হয়ত হবেনা কখনোই।</p>
<p>২১ জানুয়ারি। তারেক সাহেব যোগদান করলেন ক্রিয়েটিভ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে। শুরু হল নতুন সংগ্রাম। নতুন অভিজ্ঞতা সঞ্চার হল। সব কিছুই নতুন তারেক সাহেবের কাছে। সব অপরিচিত। অথচ সবাই খুব আন্তরিক। সকলেই আন্তরিকতার সাথে নতুনদের গ্রহণ করল। কেবলমাত্র ছাত্র-ছাত্রী ছাড়া। কারণ কোন শিার্থীই চায় না তাদের এতদিনের পরিচিত শিক চলে যাক। যেমনি চায়নি আইডিয়াল ক্যাডেট একাডেমীর শিার্থীরা। তারা চায় না তাদের অতিপ্রিয় তারেক স্যার হারিয়ে যাক তাদের মধ্য থেকে। অনেকেই অবশ্য স্যারের কারণে ক্রিয়েটিভ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে ভর্তি হয়েছে। তারা মনে কওে, স্যার যেখানে নেই কি করে সেখানে লেখাপড়া করবে? অথচ তাদের কি দুর্ভাগ্য, তারেক স্যারের কোন কাস নেই তাদের। তবুও সান্ত্বনা এই ভেবে যে, স্যার যে স্কুলে আছেন সেখানে পড়ছি।<br />
বেশ কয়েকদিন হল তারেক সাহেব যোগদান করেছেন ক্রিয়েটিভ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে। এখানকার সব কিছুর সাথে মোটামুটি মানিয়ে নিয়েছেন তিনি। কাস রুটিনও পেয়েছেন। অবশ্য তার প্রিয় বিষয়ের কাস একটাও পাননি বলে কিছুটা মনে কষ্ট। তারপরও নিজেকে সান্ত্বনা দিয়েছেন। সেদিন ছিল সোমবার। রুটিন অনুযায়ী ৪০৮ নং কে দশম শ্রেণির পদার্থ বিজ্ঞান কাস। জনাকয়েক ছাত্রী গন্ডগোল করছে। অন্যভাবে বলা যায়, অপো করছে স্যার কাসে আসার। তারা তখনো জানে না কোন স্যার কাস নিবেন। তবে এটা জেনে ফেলেছেন নতুন শিকদের মধ্যে কেউ একজন আসবেন তাদের কাসে।<br />
৪০৮ নং কে ঢুকলেন তারেক সাহেব। দশম শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের শিার্থীদের কাস নিবেন তারেক সাহেব। ইতোমধ্যে অবশ্য এই শিার্থীদের সম্পর্কে বেশ বিরূপ ধারণা পেয়েছেন তারেক সাহেব। যেমন- তারা দুষ্টামী করে, নতুন শিককে সহজে গ্রহণ করতে পারে না; এই সব আর কি। কিছুণের মধ্যেই এর সত্যতা বুঝতে পারলেন তারেক সাহেব। প্রথম দিন শেষে বুঝতে পারলেন এদেরও গ্রহণ করার মতা আছে। তবে তাদের কাছে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে সময় লাগবে। প্রথম কাস ভেবে তারেক সাহেব তাদের উদ্দেশ্যে কিছু নীতিকথা শোনালেন। কে কার কথা শোনে। যার যার মত সেই সেই। এই বাস্তবতাকে বিশ্বাস করতে পারেন না তারেক সাহেব। তিনি মনে করেন তার আদর্শে অন্যদের তার মনের মত গড়তে পারবেন। এই ব্যাপারে তিনি ততটা সফল না হলেও একেবার ব্যর্থ হননি।<br />
বুধবার। সপ্তাহের শেষ কাস তারেক সাহেবের সাথে দশম শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের শিার্থীদের। বিগত দিনের পড়া আদায় করতে হবে এই মানসিকতা নিয়ে শ্রেণিতে প্রবেশ করলেন। সকলেই যথাযোগ্য মর্যাদা দিয়ে দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন করল। তারপর অমনোযোগি। ইতোমধ্যেই ওদের নাম জেনে নিয়েছে তারেক স্যার। অনামিকা ইংরেজি খাতা খুলে কি যেন লিখছে। তারেক সাহেব নিষেধ করলে অনামিকা বলল : স্যার, আর এক মিনিট লাগবে।<br />
বেশ কিছুটা সময় কেটে গেল। তবুও ইংরেজি খাতা বন্ধ করল না অনামিকা। মেজাজ খুব খারাপ হল তারেক সাহেবের। এটা আবার কেমন অভদ্রতা। পদার্থ বিজ্ঞান কাসে ইংরেজি বের করে কাজ করা। তাহলে পদার্থ বিজ্ঞান থেকে ইংরেজিটাই জরুরী ওর কাছে। নিজেকে অপমানিত বোধ করলেন তারেক সাহেব। তারপর সকলকে বাড়ির কাজ দিতে বললেন। সবাই বলল, স্যার আপনি তো কাজ করতে দেন নাই। এই কথা শুনে মেজাজ আরো খারাপ হয়ে গেল তারেক স্যারের। কাসের ফাস্ট গার্ল স্বর্ণালী স্যারের ভাবমূর্তি বুঝে বলল : হ্যাঁ স্যার, মনে পড়েছে। আপনি আমাদের পদার্থ বিজ্ঞানের একটি অংক করতে দিয়েছিলেন। কিন্তু অংকটাতো পারি না স্যার।<br />
: বাহ্ চমৎকার কথা সাজিয়েছো। এতণ তো মনেই ছিল না। এখন আবার বলছো হ্যাঁ দিয়েছিলেন স্যার। (ধমক দিয়ে) বেশ পারো। তোমাদের লেখাপড়া হবে না কোনদিনই।<br />
এতণ চুপচাপ থাকা উর্মি নামের মেয়েটি বলল : আসলে স্যার, আমাদের &#8230;&#8230;&#8230;.।<br />
উর্মি আরো কিছুই বলার আগেই তারেক স্যার অনামিকার একই অবস্থা দেখে প্রচন্ড রাগান্বিত হয়ে বললেন : চুপ কর। থাপড়ে সবগুলো দাঁত খুলে ফেলা দরকার। কি সব বেয়াদব মেয়ে, একটু চিন্তা করতে পারে যেহেতু বাসায় অংকটা করিনি, এখন চেষ্টা করি। তা না করে ইংরেজি লেখে। কত বড় সাহস। (অনামিকার দিকে তাকিয়ে) বন্ধ কর তোমার খাতা।<br />
অনামিকা বলল : স্যার আপনি এত রেগে যাচ্ছেন কেন? অংক তো করেছিই। এই যে দেখুন।<br />
অনামিকা ব্যাগের মধ্যে হাত দিয়ে কয়েকটা খাতা বের করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে বলে,<br />
ও স্যার, ভুল করে বাসায় রেখে এসেছি।<br />
স্বর্ণালী অনামিকাকে উদ্দেশ্য করে বলে,<br />
তুই চুপ কর অনামি।<br />
তারেক স্যার আর কোন কথা বলেনি সেদিন কাসে। ওদের কারো দিকে তাকায়নি। শুধু আসার সময় এক নজর তাকাতেই তিনি ল্য করলেন উর্মির চোখে অশ্র“। তখন তিনি রাগে টগবগ করছেন। ওর চোখের জল তার মন কাড়তে পারে নাই।<br />
উর্মির কান্না কেউ থামাতে পারছে না। স্বর্ণালীসহ সকলেই ওকে সান্ত্বনা দেয়। তাতেও কোন কাজ হচ্ছে না। ওর চোখ দিয়ে অঝর ধারায় পানি গড়িয়ে পড়ছে। উর্মিও কিছুতেই নিজেকে বোঝাতে পারছে না। কেন স্যার আমাকে রাগ করল? আমি তো তেমন কিছু বলিনি। স্বর্ণালী এই কথাই ওকে বোঝায় তুই তো কিছুই করিসনি, সব দোষ ঐ অনামির। নতুন স্যার, তার সাথে এমনটা না করলেই পারত। অংক করিসনি ভাল কথা। অস্বীকার করলি কেন? এটা ঠিক করিসনি অনামি। এভাবে অনামিকাকে যাচ্ছে তাই ভাবে বকাবকি করল সবাই। কিন্তু উর্মিকে বোঝাতে পারল না কেউ। চোখের অশ্র“তেই স্কুলের সময়টা অতিবাহিত করল উর্মি। স্যারের ঐ কথাটি ওর জীবনে প্রথম প্রাপ্ত শাস্তির মত মনে হল। কিছুতেই ঐ মুহূর্তের কথা ভুলতে পারলো না উর্মি। স্যারের ঐ রাগান্বিত মুখোদর্শন তার জীবনে যেন আর কখনো না ঘটে।<br />
স্কুলের কাস শেষে বাসায় ফিরে সারাটা দুপুর আজকের পদার্থ বিজ্ঞান কাসের ঘটনা স্মৃতিতে ভেসে ওঠে তারেক সাহেবের। কেন শিার্থীরা তার সাথে এমনটি করল। তারপর হঠাৎ অন্তর্দৃষ্টিতে এল উর্মির চোখের কয়েক ফোঁটা অশ্র“। ভাবনায় এল উর্মি। মেয়েটাকে এভাবে বলা ঠিক হয়নি বোধহয়। আসলে সমস্যা ঐ অনামিকা। মেয়েটা বড্ড বেশি কথা বলে। শিক হিসেবে শিার্থীদের আরো সহনশীলভাবে গ্রহণ করা উচিৎ ছিল তারেক সাহেবের। কিন্তু কিভাবে যে এ রকম হয়ে গেল তা বুঝতে পারলেন না তারেক সাহেব। শিকতা জীবনের এই দীর্ঘ সময়ে কখনো এ রকম সমস্যায় পড়তে হয়নি তারেক সাহেবকে। মনে মনে ভাবল পরবর্তী কাসে ওদের সাথে একটা কম্প্রোমাইজ করে নেবে। ওরাও নিশ্চয় বুঝে নিয়েছে স্যারের সাথে এমনটি করা উচিৎ হয়নি।<br />
তারেক সাহেব অপো করলেও সময় তার কাজের জন্য তাগিদ দেয়। বের হয় শিার্থীদের বাসায় পড়াতে। সাধারণত রাত ৮টার দিকে তারেক সাহেব পড়াতে যান সিনতাহাদের বাসায়। কিন্তু সেদিন কেন জানি মনের অজান্তেই কলিং বেলের শব্দ সৃষ্টি করলেন সন্ধ্যা ৬.৩০ মিনিটে। দরজা খুলে তো সিনতাহা অবাক। এই অসময়ে স্যার এসেছেন। সম্পূর্ণ অপ্রস্তুত সিনতাহা। আরো অবাক হওয়ার বিষয় ঘরে উর্মি এসেছে। সিনতাহা অবশ্য আগেই উর্মিকে জানিয়ে রেখেছে তারেক স্যারের কাছে পড়ার কথা। কিন্তু স্যার জানে না উর্মির সাথে তার এভাবে দেখা হবে। দরজা খুলে হা হয়ে থাকে সিনতাহা।<br />
ওর এই অবস্থা দেখে তারেক সাহেব বলেন,<br />
কি ব্যাপার মা, ভেতরে ঢুকতে দেবে না?<br />
আপনি এই অসময়ে? জিজ্ঞাসু মনে বলে ফেলে সিনতাহা।<br />
ভেতরে প্রবেশ করেন তারেক স্যার। দাঁড়িয়ে সালাম দেয় একটি মেয়ে। যাকে দেখে অবাক হন তারেক স্যার। এমন কি বিশ্বাস করতে পারেন না উর্মি এখানে আসতে পারে। তবুও সত্যি। তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে উর্মি নামের সেই মেয়েটি। যে কিনা ক্রিয়েটিভ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে দশম শ্রেণির পদার্থ বিজ্ঞান  কাসের সেই মেয়েটি। যার চোখের অশ্র“ এখনো জল জল করছে হয়ত। এ অশ্র“ একজন শুধু দেখতে পারছে। তারেক স্যারের সাথে সেদিন অনেক আলাপ হয় উর্মির। উর্মির প্রতি স্যারের অবিচারের কথাও বলেন। কিন্তু সব কিছুই অনামিকার কারণে হয়েছে। উর্মির কাছ থেকে তিনি জানতে পেরেছেন অনামিকা সবার সাথেই এরকম করে। কেউ কিছু বলে না তাই। স্যারের সাথে কথা বলে সকল অভিমান দূর হল উর্মির। তার প্রতি আর কোন রাগ রইল না। বরং স্যারের প্রতি এক ধরণের মায়া জন্মে গেল। কেন জানি তাকে অতি চেনা এবং অতি আপনজনদের একজন ভাবতে শুরু করল উর্মি। অবসান হল øেহের দূরত্বের।<br />
উর্মির সাথে আর প্রতিনিয়ত দেখা হয় না তারেক সাহেবের। মাঝে মাঝে সিনতাহার কাছে উর্মির খবরাখবর জানতে পারে। সেদিন সিনতাহাকে বললেন উর্মিকে দেখা করতে।<br />
কয়েকদিন পর হঠাৎ সেই হাস্যোজ্জল মুখ নিয়ে সামনে দাঁড়িয়ে উর্মি বলল,<br />
কেমন আছেন স্যার?<br />
মৃদু হেসে তারেক স্যারের জবাব<br />
ভাল। তুমি ভাল তো?<br />
জ্বী।<br />
লেখাপড়া কেমন হচ্ছে?<br />
আপনার দোয়ায় ভাল। স্যার আমাকে ডেকেছিলেন?<br />
তোমাকে দেখার জন্য, তোমার খোঁজ নেওয়ার জন্য।<br />
সত্যিই।<br />
হ্যাঁ কেন বিশ্বাস হয় না?<br />
তা নয়। ভাবছি এত বড় সোভাগ্য আমার।<br />
আসলে তা নয়। তোমাকে একটা জিনিস দেবার জন্য ডেকেছি।<br />
তারেক স্যার ড্রয়ার থেকে একটা বড় আকারের ছবি বের করে উর্মির দিকে এগিয়ে দেন। উর্মির উৎসুক চোখ জানতে চায় ছবিটি কার। তারেক স্যারের ছোট জবাব ছিল আমার মেয়ের। উর্মি খুব খুশি হয়। একজন ছাত্রী ছবিটা কার জানতে চায়লে উর্মি নি:সংকোচে উত্তর দেয় আমার ছোট বোনের। অবাক বিস্ময়ে উর্মির দিকে তাকিয়ে থাকে তারেক সাহেব। সেই দৃষ্টি কতণ স্থায়ী ছিল তা জানা নেই কারোর। তবে আজীবন থাকবে সেই øেহের দৃষ্টি তার মেয়ে উর্মি।<br />
প্রায় এক মাস যাবৎ দশম শ্রেণির কোন কাস নেন না তারেক স্যার। শনিবার দশম শ্রেণির সাধারণ গণিত কাস। নির্ধারিত শিক ছুটিতে থাকায় স্বাভাবিকভাবেই দায়িত্ব বর্তায় তারেক স্যারের উপর। কাসে যান তিনি। পূর্বের স্যারের নির্দেশ মোতাবেক কয়েকটা অংক করতে দেন শিার্থীদের। কয়েকজন দেখাতে সম হয়। বাকিরা ব্যর্থ। তবে যারা অংক করতে পারে তাদের মধ্যে উর্মিও ছিল। কিন্তু সামান্য ত্র“টি বিচ্যুতি ছিল যা সকল শিক এড়িয়ে চলেন। তারেক স্যার মনে করেন ভাল শিার্থীদের এ সম্পর্কে ধারনা পাওয়া দরকার। তাই তিনি সকলের উদ্দেশ্যে খুঁটিনাটি বিষয়গুলো দেখাতে শুরু করলেন। ইতিমধ্যে স্বর্ণালী বলল,<br />
স্যার এগুলো না করলে কোন সমস্যা হবে কি?<br />
না না কোন সমস্যা নেই। তবে এ জন্য নম্বর কাটলে কিছুই করার নেই।<br />
অনামিকার সেই বেশি বলার তালে স্যারকে উদ্দেশ্য করে বলা<br />
তাহলে তো দেখছি আপনার কাছ থেকে এখন আবার নিয়ম শিখতে হবে।<br />
তারেক স্যার কথাটি শুনেছেন। তবে না শোনার ভান করে কাস শেষ করে এসেছেন। রাগ হয়েছিল। কিন্তু উর্মির উদ্দেশ্যে নিয়ম দেখালেন বিধায় অনামিকাকে কিছুই বলেননি তারেক স্যার। বুঝতে পেরেছিলেন অনামিকা তাকে সহ্য করতে পারে না। হয়ত একদিন পারবে। অপোর সেই প্রহর কবে শেষ হবে তার প্রতীা করবেন তারেক সাহেব।<br />
স্যার বের হওয়ার পর দশম শ্রেণিতে শুরু হল প্রচন্ড মল্লযুদ্ধ। উর্মির চিৎকারে সবাই স্তম্ভিত হয়ে গেল। অনামিকার সাথে তো উর্মির প্রচন্ড ঝগড়া। কেউ কাউকে ছেড়ে কথা বলছে না। এমন কি এই যুদ্ধে স্বর্ণালীও যোগ দিল। একে একে কাসের সকল মেয়েরা যোগ দিল। বিষয়টা পাশের কাসের মেয়েদের মধ্যেও জানাজানি হয়ে গেল। ঝগড়ার ধরণটা ছিল ঠিক এ রকম &#8211;<br />
উর্মি বলে<br />
স্যারের সাথে এভাবে কথা বলা তোর ঠিক হয়নি অনামিকা।<br />
ঠিক বেঠিক তোর থেকে কম বুঝি না।<br />
বেশি বুঝিস বলেই তোকে এসব বলা বাদ দিতে হবে।<br />
স্বর্ণালী বলে<br />
স্যারের কাছে তোর মা চাওয়া উচিত।<br />
মা চাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। তোর দরকার হলে তুই যা। আমি এর কোন প্রয়োজন মনে করি না।<br />
উর্মি উত্তেজিত হয়ে বলে<br />
তোর মত অভদ্র বাজে মেয়ে আমার জীবনে দেখিনি। কেন যে তোর সাথে বন্ধুত্ব হয়েছিল?<br />
বন্ধুত্ব না রাখলে না রাখবি।<br />
দরকার নাই তোর সাথে বন্ধুত্ব।<br />
অত দেমাগ দেখাস না উর্মি। স্যার তোর কি হয়? দরদ উথলে ওঠে। তার জন্য তোর অত দরদ কিসের?<br />
স্যার আমার অনেক কিছু হয়।<br />
তাহলে তুই মা চেয়ে নিস। আমার যার তার সাথে অত সম্পর্ক দরকার নেই।<br />
চিৎকার দিয়ে উর্মি বলে<br />
খবরদার অনামিকা যার তার বলবি না।<br />
কেন? উনি কি তোর বাপ লাগে?<br />
হ্যাঁ, লাগে। তাতে তোর কি?<br />
তাহলে তুই যা। তোর বাপের কাছে তুই মা চেয়ে আয়।<br />
বেশ তাই যাচ্ছি। স্বর্ণালী যাবি আমার সাথে?<br />
স্বর্ণালী ও উর্মি কাস থেকে বের হয়ে যায় তারেক স্যারের খোঁজে। চার তলায় শিক মিলনায়তনে গিয়ে জানতে পারে তারেক স্যার কোন কাজে বাইরে গেছেন। ব্যর্থ হয়ে ফিরে আসে উর্মি ও স্বর্ণালী। মনটা খুব খারাপ হয়ে যায় উর্মির।<br />
গত দিনের ঘটনা সারা রাত বাসায় ভেবেছে অনামিকা। তারপর সিদ্ধান্ত নিয়েছে আর এ রকম আচরণ করবে না তারেক স্যারের সাথে। পর দিন স্কুলে এসে তারেক স্যারকে হন্য হয়ে খুঁজেছে। এখনো আসেননি তিনি। উর্মি ও স্বর্ণালীকে অনামিকা বলে তোমরা কি তারেক স্যারকে দেখেছো। উনার কাছে আমি মা চেয়ে নেবো। আমি বুঝতে পেরেছি আমার এ রকম করা ঠিক হয়নি। অনামিকার কথায় খুব খুশি হয় উর্মি। নিজেকে ধন্য মনে করে। উর্মির মনে হয় এই মুহূর্তে যদি স্যারকে বাবা বলে ডাকতে পারতাম! যদি বলতে পারতাম দেখো বাবা তোমার মেয়েরা তোমার আশির্বাদ নিতে এসেছে! ওদের ভাবনায় বাঁধা দিতে এল হাঁফাতে থাকা সিনতাহা। উর্মি বলল<br />
কি রে সিনতাহা, এত হাঁফাচ্ছিস কেন? কি হয়েছে?<br />
সিনতাহা হাঁফাতে হাঁফাতে বলে<br />
তাড়াতাড়ি চল। সবাই বড় রাস্তার দিকে যাচ্ছে।<br />
অনামিকা বলে<br />
কেন?<br />
তা জানি না। তবে শুনলাম, আমাদের স্কুলের কে যেন এ্যক্সিডেন্ট করেছে।<br />
সবাই তাড়াতাড়ি ছুটে চলল বড় রাস্তার দিকে। রাস্তায় প্রচন্ড ভীড়। বন্ধ হয়ে আছে যান চলাচল। উত্তেজিত জনতা বেশ কয়েকটা গাড়ি ভাংচুর করেছে। সমস্ত এলাকা জুড়ে আইন শৃঙ্খলা রাকারী দলের লোকজন কর্তব্যরত আছে। রাস্তার চারিদিকে বিভিন্ন স্কুলের ছাত্র-ছাত্রী ও শিকবৃন্দ। দুর্ঘটনা কবলিত স্থান ঘিরে রয়েছে সকল জনতা। ভীড় ঠেলে যাওয়ার মতো কোন পরিস্থিতি নেই। পেছনে দাঁড়িয়ে আছে ক্রিয়েটিভ ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের শিার্থীবৃন্দ। তাদের এক পাশে উর্মি, অনামিকা, স্বর্ণালী, সিনতাহা। ওরা চারজন চুপচাপ। এখনো জানতে পারে নাই কে এ্যক্সিডেন্ট করেছে। মহাপরিচালক স্যার এসে বললেন তোমরা কি দেখেছো? ওদের না জবাবে তিনি দেখার জন্য সুযোগ করে দিলেন। সবাই যাচ্ছে লাশ দেখতে। কিন্তু উর্মির পা কেন জানি চলছে না। ওর গা শির শিরিয়ে উঠছে। সারা শরীর যেন মুহূর্তে ঠান্ডা হয়ে গেছে। চোখ বন্ধ করে আছে উর্মি। অনামিকা, স্বর্ণালী ও সিনতাহা ওকে এক প্রকার টেনে নিয়ে আসে লাশের কাছে। ওরা উর্মিকে বলে চোখ খুলতে। উর্মি চেষ্টা করছে আপ্রাণ। কিন্তু পারছে না কিছুতেই। কানে একবার শব্দ এল তারেক স্যার নামটি। উর্মির কান যেন বধির হয়ে যাচ্ছে। ও আর কিছুই শুনতে চায় না। বান্ধবীরা আবার উর্মিকে চোখ খুলতে বলে। উর্মি তো পারবে না চোখ খুলতে। ও চোখ যে øেহের ছায়ায় বাঁধা পড়ে আছে। উর্মির চোখ থেকে অশ্র“ বেরিয়ে এসে ওর ওষ্ঠে মৃদু আঘাত করে বলে ও মুখের ভাষা কি বোবা হয়ে গেছে? তোমার বাবাকে ডাকবে না? সে যে চলে যাচ্ছে দূরে। তোমার জীবন থেকে সে হারিয়ে যাচ্ছে। তাকে ফেরাতে ডাকবে না তুমি? উর্মির ঠোঁট দুটো মূহূ মূহূ বিশ হাজার কম্পাঙ্কের বেশি শব্দ করে ডাকছিল বাবা.. আ &#8230; আ&#8230;। কেউ শুনতে পায়নি সে শব্দ। শুনবেও না কোনদিন। যার শোনা উচিত ছিল সে তো মিশে গেছে রাস্তার পিচের সাথে রক্তাক্ত হয়ে।<br />
উর্মির অশ্র“ তারেক সাহেবের রক্তের সাথে মিশে লুটোপুটি খেল। তৎনাৎ কেঁপে উঠল সারা পৃথিবী। মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল পাখিদের কলরব, আকাশের মেঘেরা ছুটে এল সূর্যের অহমিকা নস্যাৎ করতে। প্রকৃতির নিরবতায় সাড়া দিয়ে বৃষ্টির বারতা জানিয়ে দিল উর্মি তুমি কেঁদো না। তোমার শব্দ কেউ না শুনলেও বিধাতার রাজ্যের সকল বাবারা বুঝতে পেরেছে। সকলে ঘরে ফিরতে শুরু করেছে। কিন্তু উর্মি কি করে ফিরবে? কি করে তাঁকে রেখে যাবে, যাঁকে এখনো বলা হয়নি সেই কথাটি; বাবা। পারবে না বলতে আর কোনদিন। কখনো।</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://shahittabazar.com/%e0%a6%af%e0%a7%87-%e0%a6%95%e0%a6%a5%e0%a6%be-%e0%a6%8f%e0%a6%96%e0%a6%a8%e0%a7%8b-%e0%a6%ac%e0%a6%b2%e0%a6%be-%e0%a6%b9%e0%a7%9f%e0%a6%a8%e0%a6%bf-%e0%a6%a4%e0%a6%be%e0%a6%a8%e0%a6%9c%e0%a7%80/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
			</item>
	</channel>
</rss>
