<?xml version="1.0" encoding="UTF-8"?><rss version="2.0"
	xmlns:content="http://purl.org/rss/1.0/modules/content/"
	xmlns:wfw="http://wellformedweb.org/CommentAPI/"
	xmlns:dc="http://purl.org/dc/elements/1.1/"
	xmlns:atom="http://www.w3.org/2005/Atom"
	xmlns:sy="http://purl.org/rss/1.0/modules/syndication/"
	xmlns:slash="http://purl.org/rss/1.0/modules/slash/"
	>

<channel>
	<title>উপন্যাস &#8211; সাহিত্য বাজার</title>
	<atom:link href="https://shahittabazar.com/category/%e0%a6%b8%e0%a6%be%e0%a6%b9%e0%a6%bf%e0%a6%a4%e0%a7%8d%e0%a6%af/%e0%a6%89%e0%a6%aa%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%be%e0%a6%b8/feed/" rel="self" type="application/rss+xml" />
	<link>https://shahittabazar.com</link>
	<description>সাহিত্যের আয়নায় মানুষের মুখ</description>
	<lastBuildDate>Tue, 01 Mar 2016 16:38:33 +0000</lastBuildDate>
	<language>bn-BD</language>
	<sy:updatePeriod>
	hourly	</sy:updatePeriod>
	<sy:updateFrequency>
	1	</sy:updateFrequency>
	<generator>https://wordpress.org/?v=6.9.4</generator>
	<item>
		<title>বাংলাদেশ আমজনতা পরিষদ  = বাপ</title>
		<link>https://shahittabazar.com/%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%82%e0%a6%b2%e0%a6%be%e0%a6%a6%e0%a7%87%e0%a6%b6-%e0%a6%86%e0%a6%ae%e0%a6%9c%e0%a6%a8%e0%a6%a4%e0%a6%be-%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a6%bf%e0%a6%b7%e0%a6%a6-%e0%a6%ac%e0%a6%be/</link>
					<comments>https://shahittabazar.com/%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%82%e0%a6%b2%e0%a6%be%e0%a6%a6%e0%a7%87%e0%a6%b6-%e0%a6%86%e0%a6%ae%e0%a6%9c%e0%a6%a8%e0%a6%a4%e0%a6%be-%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a6%bf%e0%a6%b7%e0%a6%a6-%e0%a6%ac%e0%a6%be/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[আরিফ আহমেদ]]></dc:creator>
		<pubDate>Thu, 02 Jan 2014 10:23:49 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[উপন্যাস]]></category>
		<category><![CDATA[সাহিত্য]]></category>
		<guid isPermaLink="false">http://shahittabazar.com/?p=1425</guid>

					<description><![CDATA[<p>অনু-উপন্যাস<br /> বাংলাদেশ আমজনতা পরিষদ  = বাপ</p> <p>ভূমিকার বদলে</p> <p>এক<br /> লেখকের মাথায় ভুতের মতো চেপে বসেছে ভয়ংকর দুটি মতবাদ। অনেকটা পাগলের মতোই সে বিরবির করছে &#8211;<br /> স্টুডেন্ট বা</p><span><div class="readmore"><a href="https://shahittabazar.com/%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%82%e0%a6%b2%e0%a6%be%e0%a6%a6%e0%a7%87%e0%a6%b6-%e0%a6%86%e0%a6%ae%e0%a6%9c%e0%a6%a8%e0%a6%a4%e0%a6%be-%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a6%bf%e0%a6%b7%e0%a6%a6-%e0%a6%ac%e0%a6%be/">...বিস্তারিত &#8594;</a></div>]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<p><a href="http://shahittabazar.com/wp-content/uploads/2014/01/Untitled-11.jpg"><img decoding="async" class="size-medium wp-image-1426 alignright" src="http://shahittabazar.com/wp-content/uploads/2014/01/Untitled-11-228x300.jpg" alt="Untitled-11" width="228" height="300" srcset="https://shahittabazar.com/wp-content/uploads/2014/01/Untitled-11-228x300.jpg 228w, https://shahittabazar.com/wp-content/uploads/2014/01/Untitled-11.jpg 397w" sizes="(max-width: 228px) 100vw, 228px" /></a><strong>অনু-উপন্যাস</strong><br />
<strong>বাংলাদেশ আমজনতা পরিষদ  = বাপ</strong></p>
<p><strong>ভূমিকার বদলে</strong></p>
<p>এক<br />
লেখকের মাথায় ভুতের মতো চেপে বসেছে ভয়ংকর দুটি মতবাদ। অনেকটা পাগলের মতোই সে বিরবির করছে &#8211;<br />
স্টুডেন্ট বা ছাত্র-ছাত্রী শব্দটি নিয়ে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েরা যে আন্দোলনে নেমেছে তা কি অযৌক্তিক? ছাত্র সংসদ কেন ছাত্র-ছাত্রী সংসদ হবে না। যদি ছাত্র সংসদই হয়, তাহলে মেয়েদের আর ছাত্রী বলা চলবে না তারাও ছাত্র। তাহলেই ছাত্রলীগ বা ছাত্রদল শব্দটি মেনে নেয়া যায়। এতে ছাত্রের কোনো স্ত্রী লিঙ্গ থাকেনা। মেয়েদেরও আর ছোটো করা হয় না। তাদের এ দাবী অবশ্যই যুক্তিসংগত। তাহলে কিছু সংখ্যক বুদ্ধিজীবী ও মাদ্রাসার শিক্ষরা কেন তাদের বিরোধীতা করছেন?<br />
এ দেশের ভবিষ্যত দুটি রাজনৈতিক দলের হাতে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তালিকায় এরপর নেতা কে? শেখ রেহানা নাকি জয়? অন্যদিকে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের বিএনপিতে সভানেত্রী তার স্ত্রী সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া, এরপর তারেক জিয়া, তারপর কে হবেন নেতা? শেখ রেহানা বা জয়ের বংশধর নাকি তারেক রহমানের বংশধর। বংশক্রমিক রাজনীতির চর্চায় গণতন্ত্র কতটা সফল?<br />
এই কি তাহলে সফল গণতন্ত্রের নমূনা? নিজেরাই নিজেদের খুন করা বা দলীয় কোন্দলে পরে খুন হয়ে যাওয়া ? আর কতদিন এই অরাজগতা আর অশান্তির মধ্যে দিন কাটাবো আমরা ? আমাদের রাজনৈতিক অস্থিরতা, হানাহানি, নেতাদের অসদাচরণ ও বার বার প্রতারণা এতোটাই চরমে পৌঁছেছে যে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাচি’ অবস্থা। এমনকি দলীয় সাধারণ সমর্থকদের মাঝেও নিজ দলের নেতাদের প্রতি চরম অসন্তোষ ক্রমশ বাড়ছে। কেন এই দুরাবস্থা আমাদের? দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য যারা ভালো কিছু করতে চায় তারা আর যা-ই হোক কথা বলে সময়ের অপচয় করে না। কাজ করে দেখায়।</p>
<p><strong>দুই</strong><br />
আমার বাপ প্রায়শই একটা কথা বলতেন &#8211; যে নিজেকে ভালোবাসেনা সে কাউকে ভালোবাসেনা।<br />
বাপ’ কেন এ কথাটি বলতেন আজও তা ভালোভাবে বুঝে উঠতে পারি নাই। কারণ সব মানুষই নিজেকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে এটাই স্বাভাবিক। আর নিজেকে বেশি ভালোবাসে বলেই মানুষ কখনো কখনো অতিমাত্রায় স্বার্থপর। এই উপন্যাসটির লেখকের পাল্লায় না পরলে আমি কখনো বুঝতেই পারতাম না যে, নিজেকে ভালোবাসার মানেটা এতো সাধারণ নয়।<br />
পাঠক আপনি কি নিজেকে সত্যি-ই ভালোবাসেন? গভীরভাবে ভেবে দেখুনতো, কারণ এই উপন্যাসের নায়কের মতে &#8211; যে নিজেকে ভালোবাসে সে কখনো নিজের আত্মা বা বিবেকের অশান্তি হয়, এমন কোনো কাজ করতে পারে না। তাহলে নিজেকে ভালোবাসায় প্রচণ্ড ফাঁকি থেকে যায়। অশান্তি কখনো তার পিছু ছাড়েনা। এই ভালোবাসার-ই অপর নাম আল্লাহ-ঈশ্বর-ভগবান। তবে কি আমরা বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষই আজ নিজেকে ফাঁকি দিচ্ছি?<br />
লেখক সাহেব বলেন &#8211; নিজের বিবেককে কষ্ট দিয়ে আমরা বুদ্ধিকে প্রশ্রয় দিচ্ছি, মনের ডাক এড়িয়ে যুক্তিকে মেনে নিচ্ছি বলেই আজ আমাদের এই দশা। বাসে, ট্রেনে, স্টীমারে, রাস্তার মোড়ের চায়ের দোকানে মানুষের আলোচনায় একটু কান পাতলেই বোঝা যায়, তারা সবাই এখন বিকল্প একটা রাস্তা খুঁজছেন। বাপের উপর বাপ হতে পারে এমন একজন নেতার সন্ধানে সাধারণ মানুষ আজ প্রার্থনা করছেন আল্লাহ, ইশ্বর বা ভগবানের কাছে।<br />
সাধারণ মানুষের এই প্রার্থনা কতদিনে পূরণ হবে তা স্রষ্টা-ই বলতে পারেন। তবে এই উপন্যাসটি তাদের একটি স্বপ্ন দেখাতে পারে। নিষক একটি স্বপ্ন। যা বাস্তবায়ন খুব কঠিন নয়। পাঠক চাইলে এ স্বপ্নের পথটিতে নিজেই হাঁটতে পারেন, নিজেই উদ্যোগী হয়ে এটিকে বাস্তব রূপ দিতে পারেন। শুধু অনুরোধ &#8211; এ স্বপ্নটি বাস্তবায়ন করতে হলে বুদ্ধি বা যুক্তি নয়, বিবেক আর মনের ডাক শুনুন। এই উপন্যাসের ভিতরে লুকানো বাপ (ব +আ +আ +প) মানে বাংলাদেশ আমজনতা  পরিষদ বা পার্টি-এর গঠনতন্ত্র বুঝে নিন এবং গড়ে তুলুন আপনার স্বপ্নের দেশ। তবে প্রকৃত গঠনতন্ত্র হচ্ছে &#8211; ঈশ্বর রচিত মুসলমানদের জন্য কোরানুল করিম, হিন্দু সম্প্রদায়ের জন্য পবিত্র বেদ এবং খ্রীস্টান সম্প্রদায়ের জন্য তাদের ইঞ্জিল শরীফ বা বাইবেল (ওল্ড টেস্টামেন্ট)। এর বিকল্প কোনো উত্তম গঠনতন্ত্র হতেই পারেনা।<br />
(আজ রবিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০১৬ বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের জন্য বাপ’কে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম। আমি থাকি বা না থাকি এ বইটি তোমাদের নিয়ে যাবে আগামী সুন্দর জীবনের কাছে। যদি তোমরা এর প্রতিশ্রুতি পূর্ণ কর। শুধু শর্ত একটাই &#8211; তোমরা কেউ নাস্তিক হতে পারবেনা, সবাই যার যার ধর্মে আস্তিক হয়ে ঐক্যবদ্ধ ভাবে কাজ করো। ফল আসবেই ইনশাহআল্লাহ।)</p>
<p><strong>বাপ</strong></p>
<p><strong>এক</strong><br />
অবাস্তব ভাবনায় পটিয়সী একজন লেখক যখন তার সস্তা মানসিকতা নিয়ে গুরুগম্ভীর বা রাশভারী কিছু লিখতে চায়, তখন তা কতটা কষ্টদায়ক আর হাস্যকর হয়ে ওঠে তার প্রমাণ ‘এবং অভিনয়’ নামের উপন্যাসটি যারা পড়েছেন, তারা অক্ষরে অক্ষরে টের পেয়েছেন। বিশেষ করে আমার মতো আনাড়ি একজনকে জোর করে মঞ্চে তুলে দিয়ে অভিনেতা বানানোর চেষ্টাটা ছিল আরও বেশি হাস্যকর।<br />
লজ্জা ও ভয়ে আমি যে শুধু নাটকপাড়া ছেড়েছি তাই না, লেখকের পাল্লায় পরে আবার কোনো ভুল করে ফেলার ভয়ে, শহর ছেড়ে আস্তানা গেড়েছি দূর পাড়াগায়ে। দীর্ঘ সাতটি বছর এই পাড়াগায়ে মুদির দোকানে চা সিগারেট ও রকমারী পণ্য বিক্রির পাশাপাশি গ্রামের সাধারণ কৃষক-শ্রমিকদের সাথে আড্ডা দিয়ে বেশ ভালোই কাটছিল আমার একক সংসার। কিন্তু প্রবাদ আছে ‘সুখ বেশিদিন স্থায়ী হয় না, আর যেখানে বাঘের ভয় সেখানে রাত্র হবে-ই’।<br />
লেখক থেকে বাঁচার জন্য অজপাড়া গাঁয়ে লুকিয়ে থেকেও আমার শেষ রক্ষা হলো না। সাত বছর পর গন্ধ শুঁকে শুঁকে সালা আমাকে ঠিকই খুঁজে বের করে ফেলল। বাপ নামে কোনো একটা মঞ্চনাটকের প্রধান চরিত্রে আবার অভিনয় করতে হবে। আমি ‘না’ বলায় কি সব মানবিকতা, দায়বদ্ধতা ইত্যাদি কঠিন কঠিন শব্দ ব্যবহার করে আমাকে ছিন্ন ভিন্ন করার প্রয়াস পেল।</p>
<p>আমি মূর্খ মানুষ। শহুরে সংস্কৃতির সাথে মোটেও অভ্যস্ত নই। এই মুদি দোকানটিকে সম্বল করে বেশ ভালোই কেটে যাচ্ছে দিন, কারো সাথে প্যাঁচে নেই। স্ত্রী ছিল, এই সালা লেখকেরই বোন, দূরারোগ্য ব্যাধিতে সে চলে গেছে। কোনো সন্তান নেই। একেবারে ঝাঁড়া হাত-পা। যে কারণে কোথাও আমার কোনো দায়বদ্ধতা আছে বলে মনে হয়নি কখনো। এই সালা লেখক যখন-ই এসেছে, তখন-ই পিলে চমকানো সব বাক্যবাণে আমাকে কাবু করেছে। আমার এককীত্বের গর্ব খর্ব করে দিয়েছে। ওর এসব জটিল শব্দে আমি এবারও ভ্যাবাচ্যাকা খেয়েছি। তবে এবার আমি অনড়, অটল। ওর কথায় মোটেও নরম হবো না, এমন একটা জেদ নিয়েই ফিরিয়ে দিলাম। পরিস্কার বাংলায় বললাম &#8211; তুমি যত যাই বল, আমি আর তোমার সাথে নাই।<br />
স্বপ্ন ভেঙে গেলে মানুষের মুখটা কেমন হয় দেখার সৌভাগ্য আমার হয়নি, তবে বিষন্ন মনে লেখক যখন ফিরে যাচ্ছিল তখন ওর কাঁদো কাঁদো মুখটা দেখে আমার ঐ স্বপ্ন ভংগের কথাটাই মনে এল। অনেকটা দূর থেকে লেখক আবার ফিরে এসে বলল &#8211; সাধনরে! অনেক বদলে গেসছ তুই। একটা কথা সত্যি করে, বুকে হাত দিয়ে ভেবে দেখিস প্লিজ।<br />
বললাম &#8211; কী কথা?<br />
উত্তরে ও বিমর্ষ হাসলো &#8211; আমাকে উত্তর দিতে হবে না। নিজেকেই পরে উত্তরটা দিস। তুই কি সত্যি নিজেকে ভালোবাসিস সাধন? যদি বাসিস, তাহলে এই দেশের মানুষের প্রতিও তোর ভালোবাসা সমান হবে। কারণ যে নিজেকে ভালবাসে শুধু সেই পারে মানুষকে ভালোবাসতে। তুই একটা মানুষ, তুই-ই একটা দেশ। এই ভালোবাসার-ই অপর নাম আল্লাহ-ঈশ্বর-ভগবান। কথাটা ভেবে দেখিস।<br />
কথাগুলো বলে আর দাঁড়ায়নি লেখক। আমিও আর ওর কথায় গুরুত্ব না দিয়ে দোকানের কাজে ব্যস্ত হয়েছি, বলা যায়, ব্যস্ততায় ভুলে ছিলাম। রাতে ঘুমাতে গিয়ে-ই মনে হলো &#8211; ছোটবেলা বাবার মুখে এ কথাটি বহুবার শুনেছি। বাপ আমার প্রায়-ই বলতেন &#8211; শোন্ সাধন, সবসময় মনে রাখিস &#8211; যে নিজেকে ভালোবাসে না, সে কাউকে ভালোবাসে না। এ কথাটি বাপ শুধু আমাকে-ই কেন বলতেন? কী এর গুরুরহস্য? তা আজও আমার মাথায় ঢোকেনি। আমি যেটা বুঝি &#8211; এমন একজন মানুষ কি আছে পৃথিবীতে যে নিজেকে ভালোবাসেনা? মানুষ মাত্রই নিজেকে ভালোবাসবে এটাই স্বাভাবিক। তাহলে?<br />
ভাবনাটা আমাকে এতোটাই পেয়ে বসলো যে রাতে আর ঘুম এলো না। সকাল হতেই আমি ছুটে গেলাম স্থানীয় মসজিদের ইমাম, বরিশালের বাকেরগঞ্জ থানাধীন দুধলের পীরজাদা মুফতি মাওলানা সাইফুল্লাহ-এর কাছে। তার কাছে এ কথাটির ব্যাখ্যা জানতে চাইলে তিনি বললেন &#8211; কথাটি আসলে দুনিয়াদারী নিয়ে নয়, আখেরাত নিয়ে। আখেরাতের শাস্তির হাত থেকে নিজের দেহকে বাঁচাতে চাইলে, দেহের কোনো অংশকেই কোনোরকম পাপ কাজে উৎসাহ বা লিপ্ত করা যাবেনা। যে মানুষ নিজেকে আখেরাতের শাস্তি থেকে মুক্ত রাখতে চায়, সে অবশ্যই নিজেকে ভালোবাসবে এবং দুনিয়ায় কোনো পাপ, কোনো অন্যায় করবে না। আর যে নিজে অন্যায় করে না, সে অন্যকেও বিশেষ করে তার চারপাশের মানুষদেরকেও কোনো অন্যায় করতে দিতে চাইবে না এটাই স্বাভাবিক।<br />
পীরজাদা সাহেবের উত্তর আমার মনপুঃত হয়নি। আমার কেবলই মনে হচ্ছে এ কথাটি আরও জটিল, শুধু আখেরাত আর পাপ-পূণ্য বিচারে সীমাবদ্ধ হলে ছোটবেলা আমার বাপ আর আজ লেখক এ কথাটি এতো গুরুত্ব দিয়ে বারবার বলতো না।</p>
<p>মুদি দোকানের পণ্যসামগ্রী কিনতে শহরে এসেই পরলাম একটা মিছিলের সামনে। বিশাল লম্বা একটা মিছিল। কলেজ পড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রীদের দীর্ঘ লাইন। কৌতুহল থেকে জানতে পারলাম &#8211; জেলা শহরের চারটি কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা একত্র হয়ে এই মিছিল নিয়ে যাচ্ছে। মিছিলের সামনে কালো কাপড়ে সাদা রং-এ লেখা “শিক্ষাঙ্গনে দলীয় রাজনীতি বন্ধ কর” “মেয়েদের ছাত্রী বলা চলবে না”। তাদের এই মিছিলে ব্যবহার করা শ্লোগান গুলো আমার মনোযোগ কেড়ে নিল, আমি প্রতিটি শ্লোগান কাগজে লিখে নিতে চাইলাম।<br />
১<br />
রাজনীতির নোংরাচালে সাধারণ ছাত্র মরবে কেন?<br />
রাজনীতিবিদ জবাব দাও, দিতে হবে।<br />
২<br />
ছাত্রসমাজ, ছাত্রশিবির, ছাত্রদল আর ছাত্রলীগ,<br />
সকল প্রকার দলবাজী শিক্ষাঙ্গন থেকে বিদায় নিক।।<br />
৩<br />
নিরিহ ছাত্র আবু বকর মরলো কেন জবাব চাই, দিতে হবে।<br />
দলীয় কোন্দলে ফারুক, নোমান আর রিপনরা মরবে কেন,<br />
জবাব দাও, দিতে হবে।<br />
৪<br />
নেতাদের ছেলে মেয়ে<br />
বিদেশে শিক্ষা পায়<br />
দেশে ফিরে তারাই আবার<br />
বড় বড় নেতা হয়।<br />
৫<br />
আমজনতা আমরা তাই<br />
সু-শিক্ষার সুযোগ চাই<br />
শিক্ষাঙ্গনে রাজনীতি<br />
করবে এবার নির্দলীয় ছাত্ররাই।।</p>
<p>মিছিলটি আমাকে পার হয়ে চলে যাওয়ায় অন্য শ্লোগানগুলো আমি আর শুনতে পেলাম না। তবে কোথাও সেই ব্রিটিশ বা পাকিস্তান বিরোধী আন্দোলনের শ্লোগান যুক্ত হয়নি দেখে খুব ভালো লাগল। রাজনৈতিক দলগুলোর শ্লোগান মানেই- জালিয়ে দাও, পুড়িয়ে দাও, গদিতে আগুন দাও ইত্যাদি বস্তা পঁচা বাসি শব্দ। যা স্বাধীনতার পূর্বে বাংলাদেশের মানুষের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার ছিল। কিন্তু স্বাধীন দেশে কি ঐ শ্লোগান মানায়? এ কথাটি নেতারা একবারও ভেবে দেখেনি। আজ এই ছাত্রদের মিছিলটি কি তবে নতুন কোনো আশার আলো জ্বেলে গেল? ওরা শুধু নিরিহ ছাত্রদের হয়ে কথা বলছেনা রাজশাহীর ফারুক, যশোরের রিপন এবং ছাত্র শিবিরের নোমান হত্যারও নিন্দা করছে। এই তো সত্যিকার ছাত্রের কাজ। বাঃ চমৎকার! আমি তোমাদের সালাম জানাই। আপনমনেই বিরবির করে ওদের প্রতি শ্রদ্ধা জানালাম। ছাত্র-ছাত্রীদের এই শান্তিপূর্ণ মিছিলটির পিছনে ও সামনে পুলিশের প্রহরা ও তাদের উৎকন্ঠিত আচরণ ছিল রহস্যজনক। মিছিলটি চলে যাবার পর রাস্তার পাশে চায়ের দোকানে বসে পরলাম, দোকানিকে এককাপ চায়ের জন্য বলে মনোযোগ স্থির করলাম চারপাশে আমজনতার গুঞ্জনে। এই চায়ের দোকানগুলোই হচ্ছে খবরের এবং দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের প্রথম রাশিচক্র। আমি অন্তত তা-ই মনে করি। চায়ের কাপে চুমুক দেবার আগেই শুনতে পেলাম, কেউ একজন বলছেন &#8211; এত পুলিশ কেন বলতে পার?<br />
অন্য কেউ উত্তর দিলেন &#8211; শুনলাম! এই মিছিলে রাজনৈতিক দলের যে কেউ হামলা চালাতে পারে, তাই কলেজের প্রিন্সিপালরা সবাই একসাথে পুলিশ প্রোটেকশন চেয়েছেন।<br />
আর একজন কেউ বললেন &#8211; আরে ভাই আপনারা জানেন না, এরা এই মিছিল নিয়ে নামার আগে প্রতিটি রাজনৈতিক দলের কাছে চিঠি দিয়েছে এবং প্রত্যেকের নামে থানায় জিডি করে এসেছে, কোনো হামলা হলে-ই খবর আছে। সরকারী দলকেও বাদ দেয় নাই।<br />
আর একজন কেউ বলে উঠলেন &#8211; আরে বাপ, এদের তো বেজায় বুদ্ধি। এদের নেতা কে?<br />
আমজনতার মধ্যে থেকে এবার এক তরুণকণ্ঠ উত্তর দিল &#8211; আমাদের কোনো নেতা নাই, আমরা সবাই মিলে, পরামর্শ করে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছি। চায়ের কাপে শেষ চুমুকটি দিয়ে আমি তরুণ ছাত্রটিকে দেখলাম, তার কাঁধের ব্যাগ আর ঘামে জবজবে পোষাক বলে দিচ্ছে সে এই মাত্র মিছিল ছেড়ে এসেছে।<br />
আমি তাকে ভাইয়া সম্বোধন করে জানতে চাইলাম &#8211; আপনারা হঠাৎ এ রকম একটা সিদ্ধান্ত কেন নিলেন। সবাইকে একত্র করা তো খুব কঠিন কাজ, এটা কি করে সম্ভব হলো।<br />
তরুণ ছাত্রটি বললো &#8211; না এ হঠাৎ কোনো সিদ্ধান্ত নয়, বুয়েটের সনি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আবু বকরের মত নিরিহ ছাত্র আমরাও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কিম্বা অন্য কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যাবার পর কি তাহলে এভাবে লাশ হয়ে ফিরে আসবো আমরা? রাজনীতি করে সুবিধা নেবে বড় বড় পেশাদার নেতারা, আর আত্মহুতি দেবে সাধারণ ছাত্ররা। কেন? তাছাড়া এই যে দলীয় কোন্দলের শিকার হয়ে যে সব কর্মী মারা যাচ্ছেন, এতে ক্ষতিটা কার হচ্ছে? শুধু ঐ কর্মীটার পরিবারের বা আত্মীয়-স্বজন ছাড়া আর কারো কি কোনো ক্ষতি আজ পর্যন্ত হয়েছে। আমাদের বড় বড় নেতাদের ছেলে মেয়েরা বিদেশে পড়াশুনা শেষে দেশে এসেই মন্ত্রী-এমপি হচ্ছেন, অথচ দেশের শিক্ষাঙ্গনে পড়তে গিয়ে রাজনীতির পাল্লায় পরে প্রাণ দিচ্ছে কারা?<br />
প্রশ্নটা করে তরুণছাত্রটি নিজেই আবার উত্তর দিলেন &#8211; আমার, আপনার ভাই, কাকা অথবা সন্তানরা প্রাণ দিচ্ছে, বিনিময়ে নেতার ছেলে নেতা হচেছ, তাইনা?<br />
এবার আমজনতার অনেকেই বলে উঠলেন &#8211; একদম খাটি কথা, একদম সত্য, এটাইতো হচ্ছে।<br />
কেউ একজন ফোঁড়ন কেটে বললেন &#8211; নেতার পোলা নেতা হবে না তো কৃষকের ব্যাটা নেতা হবে?<br />
তরুণ ছাত্রটি আমার দিকে তাকিয়ে বলে উঠল &#8211; এই যে ঢাকায় ছাত্র-ছাত্রী শব্দটার ব্যবহার নিয়ে মেয়েরা আন্দোলনে নেমেছে। এতে কার কি ক্ষতি বলুন?<br />
আমি বললাম &#8211; বিষয়টা একটু বুঝিয়ে বলবেন? আমি এটার কথা কিছু শুনিনি।<br />
ছাত্রটি বলল &#8211; ঢাকার ইডেন কলেজ, রোকেয়া ও শামসুন নাহার হলের মেয়েরা এ নিযে প্রথম আন্দোলন শুরু করেছে। রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নেত্রীকে যখন নেতা, সংসদ নেতা বলা শুরু করেছে, তখন এটা দেখে মেয়েরা প্রথমে এ দাবী তোলে। পরে তারা ছাত্র শব্দের সাথে যৌথভাবে ছাত্রী ব্যবহার করার অনুরোধ জানায়। যেমন ছাত্র-ছাত্রী লীগ ও দল, ছাত্র-ছাত্রী সংসদ। কিন্তু কিছু বুদ্ধিজীবী ও মাদ্রাসার শিক্ষাকরা তাদের বাধা দিলে তারা আরও ক্ষেপে যায় এবং ছাত্রী শব্দের ব্যবহারই তুলে দিতে আন্দোলন শুরু করেছে। এতে তাদের উপর হামলা হয়েছে, তাই সারা দেশের নিরপেক্ষ ছাত্র-ছাত্রীরাও তাদের এ আন্দোলনে ঐক্যতা ঘোষণা করেছে। ‘ছাত্রী’ বলা চলবে না।<br />
আমি তরুণটির জন্য আরও এককাপ চা দিতে বললাম। সে নিতে চাইলো না, আমি জোর করায় না করতে পারলো না। চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে সে বলল &#8211; তারপর দেখেন, একটা দেশের সরকারের প্রধান কাজই হচ্ছে &#8211; সে দেশের উন্নয়নের জন্য, মানুষের ভালোর জন্য কাজ করা। বেকারত্ব দূর করতে উদ্যোগী হওয়া। অথচ সয়ং প্রধানমন্ত্রী এখানে ব্যস্ত নাম পরিবর্তন আর ক্ষমতা আঁকড়ে থাকার কৌশল তৈরি নিয়ে। এটা করতে যেয়ে তিনি তার কর্মিদের খুশি রাখছেন যেকোনো উপায়ে। যখন তখন বাড়াচ্ছেন জ্বালানী পণ্যসহ বিভিন্ন পন্যের দাম। এখন আবার বলছেন, সাধারণ মানুষ পাইপের গ্যাস লাইন পাবেনা, সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহার করবে। একশ্রেনীর বুদ্ধিজীবী আবার এটাকে সমর্থন করে উচ্চপ্রশংসিত কলাম লেখেন পত্রিকায়। ছিঃ কি লজ্জার কথা। কোথায় একজন দেশপ্রেমিক সরকার তার মানুষর সুবিধা আগে দেখবে তা নয়, বরং তার কর্মীরা কি করে রাতারাতি ধনী হবে এ সরকার তাই গুরুত্ব সহকারে দেখছেন। বিরোধী দলের নেতাদের এ নিয়ে কোনো প্রতিবাদ কি দেখেছেন? সবচেয়ে কষ্ট লাগে যখন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামবদলের কারণ নিয়ে এ দেশের একজন প্রধানমন্ত্রী বলেন &#8211; বিরোধীদলকে শিক্ষা দিতেই আমরা এটা করছি। তাদের শিক্ষা দেয়া উচিৎ। তাদের (আওয়ামী ও বিএনপির) সাপ বেজির লড়াই, এটা চলবেই।<br />
তার এ কথা শুনে আমাদের এক ছাত্র ছোটবেলায় পড়া উত্তম ও অধম কবিতাটিকে প্যারোডি করে লিখেছে &#8211; আসলে আমাদের প্রধানমন্ত্রী বলতে চান &#8211;<br />
কুকুর যখন কামড়ে দিল<br />
ভীষণ ব্যাথা লেগেছে আমার পায়<br />
তাই কুকুরকে কামড়ে দিলাম<br />
ওটাও বুজুক ব্যাথা কেমন হয়।।<br />
তরুণের এই প্যারোডি শুনে আমার সাথে অনেকেই হেসে উঠলেন &#8211; আসলেও তো ঠিক। কারণ কুকুরকে কামড়াতে একমাত্র কুকুরই পারে। (তাইতো ৯৬তে বিএনপি যে ভুল করেছে এখন এই ২০১৬ তে এসে সেই একই ভুল করতে যাচ্ছে নব্য সৌরাচার খ্যাত আওয়ামী লীগ সরকার।<br />
তরুনটি তখন বলছে &#8211; আমরা এই জেলার চারটি কলেজের সব সাধারণ ছাত্র-ছাত্রী একসাথে বসে ঠিক করেছি &#8211; এসব আর মানা যায় না। আমাদের প্রতিবাদ করা উচিৎ। আমরা ছাত্র। ইংরেজীর স্টুডেন্ট-এর সাতটি বর্ণেরই রয়েছে পৃথক পৃথক ব্যাখ্যা। ১) এস -স্ট্যাডি (পড়াশুনা বা জ্ঞান), ২) টি -ট্রুথনেস (সত্যবাদীতা), ৩) ইউ -ইউনিটি (একতা), ৪) ডি -ডিফেন্স (প্রতিবাদী), ৫) ই -এনার্জিটিক (পরিশ্রমি), ৬) এন -নিউট্রালিটি (নিরপেক্ষতা), ৭) টি -ট্রাস্টি (বিশ্বস্ততা)। (ছাত্রটি বলছে আর আমি দ্রুত কাগজ কলম বের করে লিখে নিলাম, কারণ এটা আমিও জানতাম না।) ইতিমধ্যে তরুণটির পাশে আরও কয়েকজন ছাত্র এসে দাঁড়িয়েছেন।<br />
তাদের একজন বললেন &#8211; এই সব ব্যাখ্যা একত্র করে দেখুন ‘ছাত্র’ নিজে-ই একটি পৃথক পূর্ণাঙ্গ সত্তা। এ সত্তাটি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের হাতে পরে খন্ডিত হয়েছে। আমরা আর তা হতে দেব না। যদি মেয়েদের দাবী মেনে নিয়ে সরকার ছাত্রী শব্দটি তুলে দেয় তাহলে আমরা ছাত্র সংসদ নামেই সরাসরি রাজনীতিতে অংশ নেব, অন্যথায় ছাত্র-ছাত্রী সংসদ লেখা হবে। চেষ্টা করবো খন্ডিত সত্তাগুলোকে অর্থাৎ ছাত্রলীগ, ছাত্রদল, ছাত্রমৈত্রী, ছাত্রসমাজ বা শিবির যা যা আছে সবাইকে একত্র করে পুরানো কাঠামো ফিরিয়ে আনতে। ইতিমধ্যেই শিক্ষাঙ্গন থেকে তাদের সব কার্যক্রম গুটিয়ে নেয়ার জন্য আমরা সবাইকে লিখিত অনুরোধ জানিয়েছি। দেশের সব শিক্ষাঙ্গনে ছাত্র সংসদ থাকবে, কিন্তু কোনো রাজনৈতিক দলের কোনোরকম ছায়া সেখানে থাকবে না। সাধারণ মানুষ ছাত্রদের কাছে আবার আশ্রয় চাইবে, তাদের সমস্যা নিয়ে ছুটে আসবে। আমরা সারা দেশের প্রায় পঁচিশ হাজার শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানকে পত্র দিয়ে যাচ্ছি, সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই এখন থেকে নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ ছাত্র সংসদ উম্মুক্ত করার অনুরোধ করেছি। শর্ত একটাই এই ছাত্র সংসদ সদস্যরা কখনো কোনো চাঁদাবাজী বা টেণ্ডারবাজীতে জড়াবে না। প্রতিজেলার যেকোনো অন্যায় অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রথমেই রুখে দাঁড়াবে এই ছাত্র বা ছাত্র-ছাত্রী সংসদ। যেটা ঘটেছেও অলরেডি, রাজশাহীতে একজন কলেজ ছাত্রী ধর্ষণের সাথে জড়িত তিন ধর্ষককে জনসমুক্ষে শাস্তি দিয়েছে এই ছাত্রজোট। তাদের লিঙ্গকর্তন করে যাবজ্জীবন সাজা আদায় করেছে তারা। আমরা সবাই সমর্থন দিয়েছি এতে। এখন থেকে এটাই হবে বাংলাদেশে।<br />
হঠাৎ করেই ছাত্র বন্ধুরা একযোগে আওয়াজ তুলল &#8211;<br />
আমরা ছাত্র<br />
আমরা জাতির ভবিষ্যত… আমরা ছাত্র।<br />
আমাদের মাঝে ছেলে-মেয়ে<br />
নাই কোন পার্থক্য ।<br />
আমরা আমাদের ভালোবাসি<br />
তাই দেশের প্রতি<br />
আমাদের রয়েছে অনেক দায়িত্ব ও কর্তব্য।<br />
আমরা ছাত্র।।<br />
একজন ছাত্রের হলে অপমান<br />
দেশের তথা বিশ্বের সব ছাত্রের হবে অপমান,<br />
একজন ছাত্র অপরাধী হলে<br />
বিশ্বের সব ছাত্রের থাকবে না যে মান।<br />
আমরা ছাত্র,<br />
আমরাই রাখবো আমাদের সম্মান।।</p>
<p>দ্বৈতকন্ঠে তারা কোরাস গাইতে গাইতে চলে গেল।<br />
চমকে উঠলাম আমি। এ কী করছে লেখক। এ তো সে-ই! ওর-ই কথার প্রতিশব্দ &#8211; যে নিজেকে ভালোবাসে না, সে কাউকে ভালোবাসে না। তবে কি ছাত্রদের ঐক্যতা সৃষ্টির একটা ব্যর্থ চেষ্টায় মেতেছে লেখক, এ সব তাহলে ওর-ই সাঁজানো চরিত্র।</p>
<p><strong>দুই</strong><br />
সকালবেলা মানুষের ভিড় ঠেলে বাসে চড়া আর বিশ্বজয় করা যেন সমান কথা। এরপর আছে একঘন্টার পথ পেরোতে তিনঘন্টার প্রস্তুতি। রোডজ্যামে আটকে থাকার সময়টা পেপার পরেই কাটিয়ে দেয় বেশিরভাগ অফিসগামী মানুষ। আর দশজনের মতো লেখক নিজেও জানালার পাশের একটি সিট দখল করে পেপার পড়ায় ব্যস্ত। জানে, ওর গন্তব্যে পৌঁছতে দু’ঘন্টা লেগে যাবে। পত্রিকার প্রথম পাতাটি লেখক সব শেষে পড়ে। আগে দেখে গ্রামগঞ্জের খবর, মফস্বল পাতা। কৃষকের সংবাদ ওর প্রধান আগ্রহের বিষয়। যদিও কৃষি সম্পর্কে কোনো ধারণা ওর নেই। তবু ভালো ফসল হয়েছে বা হবার সম্ভাবনা শব্দটি ওর খুব ভালো লাগে।<br />
হঠাৎ বাসের ভিতর তীব্র উত্তেজনা ও হট্টগোল শুনে পেপার থেকে মুখ তুলল লেখক। ভ্রু কুঁচকে বোঝার চেষ্টা করল কেন এই উত্তেজনা। কিন্তু মারমুখী যাত্রীদের আচরণে কিছুই বোঝার উপায় নেই। ও দেখল বাসের কন্ট্রাক্টর ছেলেটি সকলের হাতে পায়ে ধরে থামাবার চেষ্টা করছে আর বার বার বলছে &#8211; আগে আমাকে ভাড়া কাটতে দিন, তারপর আপনারা যা ইচ্ছা করেন। অবস্থা বেগতিক দেখে চালক রাস্তার একপাশে গাড়ি থামিয়ে দিল। ক্ষিপ্ত ও মারমুখী যাত্রীদের সব রাগ গিয়ে পরল এবার চালকের উপর, কেন সে গাড়ি থামাল? চালকের জামার কলার চেপে ধরার চেষ্টায় ব্যস্ত হলো একডজন হাত। উপায় না দেখে বেচারা গাড়ির জানালা দিয়ে বের হয়ে প্রাণ বাঁচাবার চেষ্টা করছে। যাত্রীরা কেউ কারো অনুরোধ শুনছে না। প্রায় সকলের মধ্যেই প্রকাশ পাচ্ছে চরম উত্তেজনা। কেউ কেউ বসে শ্রেফ মজা নিচ্ছেন। সব দোষই যেন এখন চালক ব্যাটার।<br />
অবস্থা বেগতিক দেখে লেখক চিৎকার করে উঠল &#8211; কী হচ্ছে এ সব। থামুন আপনারা। এ ভাবে গাড়ির ভিতর অশান্তি তৈরি করলে, অফিসে বা কর্মক্ষেত্রে গিয়ে কি হাসি মুখে কাজ করতে পারবেন কেউ?<br />
লেখকের বলার ভংগিতে নয়, শেষের বাক্যটিতেই হয়তো যাত্রীদের মধ্যের উত্তেজনা কিছুটা কমল, শান্ত একটা ভাব ফিরে এল। চেঁচামেচি থামলেও মৃদ গুঞ্জন থামল না। লেখক তখনও বলছে &#8211; এই যে ড্রাইভার ভাই, আপনি সিটে বসেন আর গাড়ি চালান। এদিকে যা-ই হোক আপনি কান দেবেন না।<br />
কথা শেষ করে লেখক তার সিট ছেড়ে সেখানে একজন বয়স্ক লোককে বসিয়ে দিল, নিজে চলে এল চালকের পিছনের আসনটিতে। ভাগ্যিস বাসটি চড়া ভাড়ায় সিটিং যাচ্ছিল, তাই দাঁড়ানো কোনো যাত্রী নেই। সব মিলিয়ে জনা চল্লিশে যাত্রী হবে। এতক্ষণ যে মধ্যবয়স্ক ভদ্রলোক খুব জোর গলায় সব রাজনৈতিক দলের গুষ্টি উদ্ধার করছিলেন, লেখক তার দিকেই প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন &#8211; জ্বী কাকা বাবু, আপনি-ই বলুন, সমস্যাটা আসলে কি? কেন সবাই এভাবে ক্ষেপে গেলেন?<br />
লোকটি আমতা আমতা করতে লাগলেন, যেন তার গলায় ব্যাঙ ঢুকেছে &#8211; আ.. আ.. আমি, না তো কই, এই&#8230;<br />
পাশেই বসা কঠিন চেহারার এক যুবক। গাঁয়ের রঙটা কালো হলেও খুব সু-দর্শন। সে গর্জে উঠলেন &#8211; কেন আপনাকে কি ব্যাখ্যা দিতে হবে নাকি?<br />
যুবকের কথার ধরণ আর ভাবসাব দেখে মনে মনে আৎকে উঠলো লেখক &#8211; না ভাই, ভুল বুঝবেন না। একটু আগে এ বাসটিকে আমার রণক্ষেত্র মনে হয়েছিল, এখন আপনি যে ভাবে আমার সাথে কথা বলছেন, ঠিক এই ভাবটা যদি আরও আগে দেখাতেন, তাহলে হয়ত আমাকে আমার সিট ছেড়ে এখানে আসতে হতো না।<br />
এ কথায় হেসে উঠল যুবক &#8211; না না আমি কোনো ভাব নিয়ে বলিনি, আমি এভাবেই কথা বলি। আসলে হয়েছে কি&#8230;<br />
যুবকের হেসে ওঠায় পরিবেশ বেশ হাল্কা হয়ে গেল, যুবকই আবার মুখ খুললেন &#8211; আসলে কথা উঠেছিল বাজারের অবস্থা নিয়ে। সিলেটে টমেটো চাষীদের বিক্ষোভ দিয়ে শুরু, হঠাৎ করে চালের দাম আবার বাড়ছে, এদিকে বিদ্যুতের দাম বাড়াবার ঘোষণা দিয়েছেন সরকার, এই বিদ্যুৎ প্রসঙ্গ উঠতেই যাত্রীদের কে যেন বলে উঠলেন যে, দেশে বিদ্যুতের উৎপাদন বৃদ্ধির কোনো চেষ্টা বা উদ্যোগ নেই অথচ প্রধানমন্ত্রী তার সব ভাষণেই ডিজিটাল সোনার বাংলা বানাচ্ছেন। এই সোনার বাংলা শব্দটি শুনেই কেউ একজন ফোঁরণ কেটে বলেছে ‘সোনার বাংলা’ বানাতে হলেতো দেশটা আবার ৭২ সালে ফিরিয়ে নিতে হবে। কারণ এটাতো ৭২-এ বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন ছিল।<br />
এবার কথা বললেন পাশের বৃদ্ধ &#8211; এই ৭২-এর কথা থেকে এসে গেল ৭৫-এর বঙ্গবন্ধুকে হত্যার প্রসঙ্গ। বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার যখন করা হচ্ছে, তাহলে জিয়া হত্যার বিচার কেন হচ্ছে না? জেনারেল মঞ্জুকে কেন কথা বলার সুযোগ না দিয়ে মেরে ফেলা হল? সে বিচারও হওয়া উচিত। সাধারণ মানুষতো আর এটা সমর্থন করতে পারে না। কিন্তু কে যেন এটার সাথে এই বিডিআর হত্যাকাণ্ডের তুলনা করে ফেলল। বলল &#8211; এ দেশের সরকারে যে যায় সেই রাবন হয়, তারা এ দেশের মানুষের মানসিকতাকে খুব ভালোভাবে পড়ে ফেলেছে। তারা জানে এ দেশের মানুষ ভয়ংকর সব ঘটানাগুলো তিনমাসের মধ্যে বেমালুম ভুলে যাবে। তাই ক্ষমতায় এসেই প্রথমে তারা জঘন্য আর নোংরা কাজগুলো আগে করে ফেলে। জানে তিনমাস পর এ নিয়ে আর তেমন কথা হবে না। যেমন হয়নি অতীতের অনেক বড় বড় ঘটনা নিয়ে, রমনার বোমা, উদীচীর বোমা, যশোর, খুলনার হত্যাযজ্ঞ গুলো যে ভাবে মাটি চাপা পড়েছে, তা থেকে এটা বলাই যায়।<br />
একটা বাসে জনাচল্লিশেক যাত্রী। তাদের কেউ নিরপেক্ষ আমজনতা, কেউ কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের সমর্থক। তাই দলীয় সমর্থক কেউ এ কথায় ক্ষেপে গিয়ে প্রতিবাদ করেছেন &#8211; কেন ভাই, এই যে বিডিআরে বিচার চলছে। আগে বিচার শেষ হতে দেন। তারপর না হয় দোষ দেবেন।<br />
আর একজন কেউ ফোঁড়ন কেটেছে &#8211; এ বিচার কোনোদিন শেষ হলে তো?<br />
ব্যস! এতেই শুরু হয়ে গেল লড়াই, তাই না? একটু ভেবে দেখুনতো এতে আপনাদের কার কতটা লাভ হলো? বরং ঝগড়ার কারণে বাস থামল, পথে বাড়তি লেট, তাই না? বলে হ্যাঃ হ্যাঃ করে হাসিতে ফেটে পরল লেখক। তার হাসি সংক্রমিত হল প্রথমে যুবক, পরে একে একে বাসের ভিতর প্রতিটি মানুষের মুখে। সকলে চুপ করলে লেখক আবার বলল &#8211; আচ্ছা আপনারা একটু আগে যে আচরণ করেছেন, সত্য করে বলুনতো &#8211; এখন সেটা ভেবে আপনাদের লজ্জা লাগছে না। মনে হচ্ছে না যে, কি ভুলটাই না হল? একে অপরের কাছে ক্ষমা চাইতে ইচ্ছা করছে না? একবার সকলে সকলের কাছে ক্ষমা চেয়ে দেখুন, মনটা ভালো হয়ে যাবে।<br />
বৃদ্ধ যাত্রীটি বললেন &#8211; তুমি বাবা একেবারে আমার মনের কথাটা বলেছো। সত্যিই আমার ক্ষমা চাইতে ইচ্ছা করছে, বলেই তিনি উঠে দাঁড়িয়ে সকলের উদ্যেশ্যে হাত জোড় করে ক্ষমা চাইলেন আর বললেন &#8211; কী বোকা আমরা দেখুন, কথা বলতে বলতে ভুলেই যাই, যে বিষয়ে কথা বলি বা যার পক্ষ নিয়ে ঝগড়া করি, সে বা তারা কোনোদিনই আমাদের কথা ভাবে না। না আওয়ামী লীগ না বিএনপি। তারাতো সবসময় তাদের নেতাকর্মীদের স্বার্থরক্ষায় ব্যস্ত। আজপর্যন্ত গরিবের জন্য কি তারা কোনো আন্দোলন করেছে? না ভবিষ্যতে করবে?<br />
এবারও বাসের মধ্যে মৃদু গুঞ্জন উঠল &#8211; ঠিক বলেছেন, একদম সত্য কথা।<br />
তারপরই যেন ক্ষমা চাওয়ার একটা হিড়িক পরে গেল বাসের ভিতর। লেখক সকলের উদ্যেশে আবার মুখ খুললো &#8211; আমার একটা অনুরোধ আছে আপনাদের সকলের কাছে। আজকের পর যদি আপনারা কখনো বাসের ভিতর রাজনীতি নিয়ে কথা বলেন, তাহলে সবার আগে, নিজের বুকে হাত দিয়ে, যা সত্য তা-ই বলবেন ও স্বীকার করবেন। আপনাদের দেখে, আপনাদের কথা শুনে ছোটরা শিখবে। তাই সবসময় খেয়াল রাখবেন &#8211; ওরা যেন কোনো ভুল বা অন্যায় না শিখে। যদি পারেন আপনাদের একান্ত সমস্যার কথাটি নিয়ে আলোচনা করবেন, দেখবেন আলোচনা থেকে একটা সমাধানের পথ তৈরি হয়ে যাবে। আর যদি কোনো রাজনীতিবিদদের নিয়ে কথা বলেন, তাহলে সবার আগে সৎ ও ভালো নেতাদের কথা বলবেন। ভালো যতটুকু জানেন, ততটুকু বলবেন প্লিজ।<br />
এ কথায় কেউ একজন আবার ফোঁড়ন কেটে উঠলেন &#8211; সৎ আর ভালো নেতা? এ দেশে?<br />
লোকটির চোখে চেয়ে কথা বলে উঠলো লেখক &#8211; ছিঃ ভাইয়া, নিজের শক্তিকে কখনো খাটো করে দেখতে নেই। শের-এ বাংলা এ কে ফজলুল হক, মাওলানা ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানসহ অনেক অনেক নেতা ছিলেন আমাদের। তারা তখনকার পরিবেশে, তাদের মতো করে সত্যিকার অর্থেই আপনার আমার তথা দেশের মঙ্গল করতে চেষ্টা করেছেন। এ সত্য অস্বীকার করা আর নিজের পূর্বপুরুষকে অস্বীকার করাটা সমান। আপনি যদি মানুষ হন, তাহলে অবশ্যই আপনি আপনার পূর্বপুরুষের প্রতি শ্রদ্ধাশীল।<br />
কিন্তু ভাই, বলেই লোকটি লেখকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে থামলো &#8211; এই যে ওয়ান-এলিভেন-এ সব রাজনৈতিক দলই যে বদলে যাওয়ার একটা লোভ আমাদের দেখালেন, এখন কি তা হয়েছে? তারা ঠিক তাদের আগের চরিত্রে ফিরে এলো না? প্রতিদিন জাতীয় সংসদের অনুষ্ঠান আমি দেখি, সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যদের আচরণ, তাদের ভাষার নোংরা ব্যবহার ও কর্মকাণ্ড দেখে মনে হয় না তারা জনপ্রতিনিধি? এর চেয়ে বাঈজীপাড়াও বুঝি অনেক ভালো। তাদের আচরণে মনে হয় এই দেশটা তারা কিনে নিয়েছে, যা ইচ্ছে বলছে, করছে, ভবিষ্যতেও তারা এমনই করবে।<br />
পাশের ভদ্রলোক এই প্রথম মুখ খুললেন &#8211; আসলে আমরা এই আওয়ামী লীগ বা বিএনপি ঘরাণার বাইরে কিছু চিন্তা বা আশা করতে পারি না। ভবিষ্যতেও পারবো না। এটা তারা বোঝে ও জানে বলেই আজ আমাদের এই দশা।<br />
এ কথায় গম্ভীর হলেন লেখক &#8211; না। আমাদের আজকের এই দশা’র জন্য তারা না আমরা-ই দায়ী। আমি অন্তত এটাই মনে করি। কারণ, আমরা একে-অপরকে বিশ্বাস করি না। আমাদের পরষ্পরের প্রতি কোনো শ্রদ্ধা, ভালবাসা এগুলো নেই। সত্যি বলতে কি জানেন? আমরা আমাদের নিজেকেই বিশ্বাস করি না, অন্যকে বিশ্বাস করবো কি করে? যেমন আমি, আমি যদি নিজের উপর খুব আস্থা বা বিশ্বাস রাখতে পারতাম, তাহলে এই মূহূর্তে বলতাম &#8211; ঠিক আছে, আগামী একবছরের মধ্যে আমি আপনাদের সামনে তৃতীয় একটি রাজনৈতিক দল এবং এক বা একাধিক বলিষ্ঠ-যোগ্য নেতা দাঁড় করিয়ে দেব। কেন তা বলতে পারি না জানেন। বিশ্বাসের অভাব তাই। আর এ বিশ্বাস আসবে কোথা থেকে? নিজের প্রতি নিজেরই গভীর ভালবাসা থেকে।<br />
ভালবাসা শব্দটা উঠলেই আমরা মনে করি নারীর প্রতি পুরুষের ভালবাসা বুঝি। না, এটা সত্যি না। ভালবাসা অনেক রকম হয়। মায়ের প্রতি ছেলের, সন্তানের প্রতি বাবা-মায়ের ভালোবাসা যেমন। আমরা আসলে নিজেকে ভালোবাসার নিয়মটাও জানিনা। আমরা সব ছেড়ে দেই স্রষ্টা বা নিয়তির হাতে। এমন একটা ভাব দেখাই যেন আমরা মানুষেরা প্রচন্ডভাবে আল্লাহ-ইশ্বর বা ভগবানের ভক্ত। কিন্তু তার কাছে কিছু চেয়ে না পেলে, তাকেও গালি দিতে ছাড়ি না। অথচ বুকে হাত দিয়ে বলেনতো &#8211; কোনো কিছু প্রাপ্তির আশা ছাড়া কেউ কি কখনো আল্লাহ, ঈশ্বর বা ভগবানের কাছে গিয়েছেন? কথাগুলো যদি পারেন ভেবে দেখবেন। বলেই বাস থেকে নেমে গেল লেখক, ওর গন্তব্য এসে গেছে। লেখক নেমে যাবার পর অনেকটা সময় বাসের ভিতর পিনপতন নিস্তব্দতা কাজ করল। তারপর কেউ একজন ফোঁড়ন কাটলেন &#8211; সালা, সুযোগ পেয়ে জ্ঞান ঝাড়লো। কেউ আর এ কথার প্রতিবাদ করল না। এমন ভাব যেন কেউ কিছু শোনেনি, দেখেনি। সকলেই ভদ্রলোক। যার যার গন্তব্যে নেমে যাবার অপেক্ষায় আছেন সবাই।</p>
<p>বাস থেকে নেমেই লেখক পরলো নির্দলীয় ছাত্র-ছাত্রীদের বিশাল এক মিছিলের সামনে। ছাত্রী শব্দটি তুলে দেয়ার আন্দোলনে নেমেছে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলে-মেয়েরা। একই সাথে ওরা রাজশাহীতে ছাত্রী ধর্ষকদের জনসমুক্ষে ফাঁসীর দাবী জানাচ্ছে। যাবজ্জীবন নয়, ওদের ফাঁসী কার্যকর করার এ আন্দোলনটি নতুন যুক্ত হয়েছে। এদের যুক্তি এই পশুদের জন্য কেন খামকা দেশের খাদ্য নষ্ট করছে সরকার? বাঃ চমৎকার মেয়েদের এই মিছিলে ছেলেদের দেখে লেখকের মনটা খুশিতে নেচে উঠলো। তারচেয়েও ভালো লাগলো সাথীকে মিছিলের সামনে দেখে। লেখকের সামনে বিরোধীতা করলেও সাথী সবসময়ই যে ওর পক্ষে তার প্রমাণ এই মিছিলে ওর অংশগ্রহণ। সাধনের কাছ থেকে ফিরে এসে খুব হতাশায় ভুগছিল লেখক। সাধন ওকে এভাবে মুখের উপর না করে দেবে আশা করেনি, খুব কষ্ট পেয়েছে ও সাধনের আচরণে। সাথী অবশ্য বলেছিল &#8211; তুমি বিনাকারণে টেনশন করছো, সব জানলে, দেখ সাধন ভাই নিজেই ছুটে আসবে।<br />
এই মূহুর্তে লেখক পাবলিক লাইব্রেরীতে গিয়ে সাথীর জন্য অপেক্ষা করবে। পকেটে টাকা নেই লেখকের। সাথীর কাছ থেকে টাকা নিয়ে ঢাকার বাইরে যেতে হবে। জেলাশহরের চারটি কলেজের অধ্যক্ষরা একত্র হয়ে তাকে নিমন্ত্রণ পত্র পাঠিয়েছেন। পত্রে তারা এটাও লিখেছেন যে, জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত লেখকের ধার্মিক ও বাপ দুটি উপন্যাস-ই পড়েছেন তারা। বরেছেন বাপ এর চিন্তাধারার সাথে তারাও একমত। অর্থাৎ তারা কি বিষয়ে কথা বলবে তা লেখক জানে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে সাথী কিছুতেই বাপ উপন্যাসের চিন্তাধারা মানতে পারছে না। সে ভয় পাচ্ছে। সাধন এখানে অভিনয় করবে না শুনে, সে আরও বেশি ভীত হয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় সাথীর থেকে টাকাটা নিতেও বিবেকের সায় পাচ্ছে না লেখক। যদিও সাথী সরাসরি কখনো লেখকের কোনো কাজে বাঁধা দেয়নি, বরং উৎসাহ দিয়ে এসেছে। কিন্তু এবারই প্রথম বেচারী ভয় পাচ্ছে। ভালোবাসার মানুষটিকে হারাবার ভয়। লেখকের বড় কোনো ক্ষতি হয়ে যাবার ভয়।</p>
<p><strong>তিন</strong><br />
সাধনের মুদি দোকানের সামনে জমায়েত হয়েছেন পাশাপাশি দুটি গ্রামের প্রধান ব্যক্তিবর্গ। চেয়ারম্যান, মেম্বার, কৃষি কর্মকর্তা ও কৃষকরা। এলাকার এমপি বা সাংসদ-এর পক্ষ থেকে এসেছেন তার মেয়ে ব্যারিষ্টার তানিয়া। গ্রাম্য শালিশ বা বিচার ব্যবস্থার এটাই নিয়ম। এভাবেই নিজেদের সমস্যা সমাধানের প্রথম চেষ্টা করেন, সকলে বসে, আলোচনার মাধ্যমে। যদিও এবারের শালিশের বিষয় ভিন্ন। গত কয়েক মাস ধরেই এদিকের গ্রামগুলোতে রাতে বিদুৎ থাকে না। সব মিলিয়ে চব্বিশ ঘন্টায় গড়ে বিদুৎ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র দু’ঘন্টার মতো। চাষীরা ক্ষেতে সেচ দিতে পারছেন না। মাঠের পর মাঠ কৃষিজমি ফাঁকা পরে আছে। গ্রামগুলোতে এ বছর কোনো চাষী আলু, পটল, মুলা, কলাই বা শরিষার চাষ করতে পারেন নাই। সামনে ধানের মৌসুম। মাঝরাতে সেচপাম্প চালাবার কথা থাকলেও বিদ্যুতের অভাবে এখনো তা সম্ভব হয় নাই। এ নিয়ে কৃষকদের অসন্তোষ ক্রমে বেড়েছে। মেম্বারদের কাছে বার বার অভিযোগ করার পরও তারা কোনো ব্যবস্থা দিতে পারেন নাই। রাগে ক্ষোভে গ্রামের মেম্বারদের ধাওয়া করেছেন কৃষকরা। তিনদিন আগে গ্রামের বাজারে দুই মেম্বার কে পেয়ে কৃষকদের কয়েকজন একজোট হয়ে তাদের মারতে গিয়েছিলেন। ভিড়ের মধ্যে দু’একজন জামার কলারও ধরতে ছাড়েন নি। সাধন বাধা না দিলে মেম্বর দু’জন হয়ত হাসপাতালে থাকতো এখন। তাই বিষয়টা নিয়ে আলোচনায় বসেছেন সবাই। এখানের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি সরকার দলীয় সাংসদ ফজলে রাব্বি সংসদ অধিবেশনে অংশ নিতে রাজধানীতে অবস্থান করায় তার মেয়ে তানিয়া এসেছেন বিশেষ নিমন্ত্রণে। তানিয়া দীর্ঘদিন বিদেশে থেকে আইন নিয়ে পড়াশুনা করেছেন। ব্যারিস্টারী পাশ করে সম্প্রতী দেশে ফিরে একটি মানবাধিকার সংস্থার হয়ে আইনি বিষয় দেখছেন তিনি। গ্রামের অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত মানুষের কাছে তার উপস্থিতি তাই সয়ং সাংসদের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ ও সম্মানজনক। এমনকি চেয়ারম্যানরাও তাকে বেশ সমিহ করে কথা বলছেন।<br />
সাধনের দোকানে এখন চা তৈরির পাল্লা দিচ্ছে দু’জন কিশোর। কে কত ভালো চা বানাতে পারে তার প্রতিযোগীতা করছে ওরা। সাধনই ওদের শিখিয়েছে কীভাবে থনথনি পাতা আর পুদিনা পাতার রসে ভালো চা বানাতে হয়। রং চা শরীরের জন্য উপকারী- এ খবরটি জানার পর থেকে সাধনের দোকানে দুধ চা বিক্রি বন্ধ হয়ে গেছে। গ্রামবাসীকেও দুধ চা  খাওয়া থেকে বিরত রাখার কঠিন দায়িত্ব পালন করছে ও। অবশ্য এটাও সত্যি যে এখানের আশেপাশের পনেরটি গ্রাম ঘুরে দশটি দুধেল গরু পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ। খাবারের সংকট হওয়ায় গ্রামবাসী এখন আর গরু-ছাগল পালার প্রতি কোনো আগ্রহ দেখাচ্ছে না বরং ভাড়ায় জমিচাষের ট্রাক্টর পাওয়া যাচ্ছে শোনার পর থেকে হালের বলদটিও বিক্রি করে দিতে ব্যস্ত সবাই। সাধন তাদের কাউকে কাউকে অনেকটা জোর করেই পতিত জমিতে ঘাসের চাষ করতে বাধ্য করেছে -এই বলে যে, তোমরা হালের গরু বিক্রি করে দিচ্ছ, কিন্তু একদিন আবার এই হালের গরু’র জন্য কাঁদবে। তেলের অভাবে ট্রাক্টর যখন চলবে না। কিছু চাষী অবশ্য সাধনের কথা শুনেছে, তারা অবশ্য গরু পালে না তবে শহরের খামারে ঘাস বিক্রি করে বেশ সুফল পেয়েছে। এই লোকগুলো তাদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে কারণে অকারণে ছুটে আসে সাধনের দোকানে।<br />
গ্রাম্যশালিশকে কেন্দ্র করে মোট পনেরটি চেয়ার আর তেরটি পাটি বিছিয়ে গ্রামবাসীদেরসহ সকলের বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। গ্রামের ছেলে-বুড়ো-মহিলারাও ভিড় করেছেন এ শালিশ শুনতে। সকলের দৃষ্টি এখন সাধনের দিকে। কারণ চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর খাঁ প্রথমেই জানতে চান &#8211; সেদিন বাজারে কি ঘটেছিল, কারা কারা মেম্বারদের মারতে চেয়েছে? প্রত্যক্ষদর্শী একমাত্র সাধন। তাই সাধনের বক্তব্য শোনার আগ্রহ সকলের।<br />
প্রথম থেকেই সাধন তীক্ষ্ন দৃষ্টিতে দেখছিল চেয়ারম্যান, মেম্বারদের আচরণ ও কথার ধরণ। তাদের চোখে লুকানো জ্বলজ্বলে প্রতিহিংসার ছবি সাধনের কানে কানে বলে দিল &#8211; এ ব্যাটারা এখন বেশ উদারতা দেখালেও পরে ঐ কৃষকদের ক্ষতি করতে একবিন্দু ভাববে না। সুতারং কে কে ছিল বিষয়টা এড়িয়ে যেতে হবে। অন্যদিকে কৃষকদের বেশিরভাগের চোখে করুণ মিনতী &#8211; আমাদের নাম বল না, ভাই।<br />
সবাই তাকিয়ে আছে সাধনের মুখের দিকে। কিছুটা বিরক্তি নিয়ে-ই তানিয়া বললেন &#8211; আপনার কিছু বলার থাকলে বলুন, অযথা সময় নষ্ট করবেন না।<br />
সাধন &#8211; বলার অবশ্যই আছে ম্যাডাম। তার আগে আপনারা বলুন, আপনারা এখানে কেন জমায়েত হয়েছেন? গ্রামের সমস্যার সমাধান করতে, নাকি মেম্বারদের সাথে যারা খারাপ ব্যবহার করেছে তাদের শায়েস্তা করতে?<br />
সঙ্গে সঙ্গে চেয়ারম্যান মেম্বারদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিল, মৃদু গুঞ্জন উঠল, মেম্বারদের কেউ কেউ প্রতিবাদ করে বলে উঠল &#8211; আগেই বলেছিলাম, এ ব্যাটা বেয়াদপ।<br />
পাশের দরিয়া গ্রামের চেয়ারম্যান কল্যাণ বাবু হিন্দু মানুষ। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের মাঝে নিজেকে তিনি অসহায় মনে করেন। না &#8211; এ জন্য কিন্তু মুসলমানরা দায়ী না। তিনি নিজেই নিজেকে গুটিয়ে রাখেন, এটা তার আত্মবিশ্বাসের অভাব, নিজেও তা স্বীকার করেন। তার ভয়ের কারণ অবশ্য সাধন জানে, তাই সাধনের সাথে খুব ভালো খাতির তার। সাধন অবশ্য প্রথম থেকেই চেষ্টা করছে তার ভয় দূর করতে। কিন্তু সুন্দরী যুবতী কন্যার বাবার মনে লুকানো ভয় দূর করা খুব কঠিন। এই ভীত বাবাটি তার আরও ভীত কণ্ঠে সবাইকে থামার জন্য অনুরোধ করলেন। তার অনুরোধে নিজ এলাকার মেম্বাররাই থামে না, আর এখানেতো অন্য এলাকার লোক বেশি। ব্যরিষ্টার তানিয়া সাধনের দিকেই তাকিয়ে ছিলেন, ওর পাল্টা প্রশ্নে তিনি কিছুটা অপমান বোধ করলেও বুঝতে পারলেন, সাধন কেন এ প্রশ্ন করেছে। তিনি নতুন চোখে সাধনকে দেখলেন, একইসাথে ধমকে উঠলেন &#8211; থামুন আপনারা, উনি তো ঠিক প্রশ্নই করেছেন, তাকে বা এই গ্রামবাসীকে তো জানতে হবে যে, আমরা এখানে তাদের সমস্যা সমাধান করতে এসেছি, মেম্বারদের সাথে খারাপ ব্যবহারের বিচার করতে না। সাধন সাহেব আপনি বলুন প্লিজ, আমরা সমস্যাটা জানতে চাই। নিশ্চিন্তে বলুন, আমরা কারো খারাপ আচরণ নিয়ে কথা বলবো না।<br />
এতে কাজ হলো, থেমে গেল সবাই। সাধন বলল &#8211; গত তিন মাসে এখানের কোনো গ্রামে ফসল উৎপাদন হয়নি। তাহলে কৃষকদের ঘরে খাবার আসবে কোথা থেকে বলুন? শীতের এই সময়টায় মৌসুমী ফসল, শাক-সবজী চাষ করে তা বাজারে বিক্রি করেই নিজেদের খাবার জোগায় কৃষকরা। এ সময়টা তারা পুরোপুরি সেচযন্ত্রের উপর নির্ভর থাকে। সেচ চলে বিদ্যুতের উপর নির্ভর হয়ে। সেই বিদ্যুৎ-ই যদি না থাকে? কৃষকরা কি করবে? এরা তো বসত ভিটায় বিদুৎ চায় না, চায় সেচপাম্পটি যেন ঠিক সময় বিদ্যুৎ পায়। কিন্তু কৃষকদের বার বার অভিযোগ সত্বেও চেয়ারম্যান সাহেব বা মেম্বারদের কেউ এদিকে নজর দেন নাই।<br />
না না নজর দিয়েছি কিন্তু&#8230; সাধনকে থামিয়ে প্রতিবাদ করে উঠলেন জাহাঙ্গীর খাঁ। তানিয়া হাত তুলে তাকে থামতে বলায় চুপসে গেলেন তিনি। তানিয়া &#8211; জ্বী সাধন, আগে আপনার কথা শেষ হোক, পরে চেয়ারম্যান সাহেবের কথা শুনবো।<br />
সাধন &#8211; আমরা কৃষকরা জানি যে বিদ্যুৎ চেয়ারম্যান সাহেবের হাতে না, তিনি চেষ্টা করেও হয়তো এর সমাধান করতে পারেন নাই। কিন্তু তিনি যে চেষ্টা করেছেন তা আমরা কি করে বুঝবো? যদি তিনি সেটা আমাদের বুঝিয়ে না বলেন। আমরা কৃষকরা বারবার অভিযোগ করি, কোনো ফল হয় না। এতে সাধারণ কৃষক যদি ক্ষিপ্ত হয় এবং কেন বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান হলো না, জবাব দাবী করে, তাহলে তাদের দোষ দেয়া যায় না। মেম্বার ও চেয়ারম্যান সাহেব যদি কৃষকদের পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতেন তাহলে আর যাই হোক আপত্তিকর কিছু ঘটতো না।<br />
জাহাঙ্গীর খাঁ আবার রেগে উঠলেন &#8211; আমি কেন ব্যাখ্যা দিতে যাবো। মেম্বাররা এসে বলেছে না যে বিদ্যুৎ আমার হাতে না, আমি চেষ্টা করছি। এমপি সাহেব কে জানিয়েছি, ডিসিকে স্মারকপত্র দিয়েছি।<br />
সাধন &#8211; আমার কথায় অপরাধ হলে মাপ করবেন চেয়ারম্যান সাহেব। একজন ভালো ও সৎ চেয়ারম্যান সবসময়ই তার এলাকার মানুষের কাছে তার সব কাজের ব্যাখ্যা দেন। আপনার এলাকায় এই সাত বছরে আমি আপনার কোনো দুর্নাম শুনিনি। আপনিও যে একজন সৎ মানুষ। সবাই আপনাকে ভালেবাসে ও মান্য করে বলেই আপনি পর পর দু’বার এ গ্রামের চেয়ারম্যান হয়েছেন। সাধনের এ কথায় চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর খাঁ বেশ লড়ে চড়ে বসলেন, তার মুখে আত্মতৃক্ষিপ্তর লাজুক হাসি।<br />
সাধন বলে চলছে &#8211; এখানের মানুষ এমপি সাহেবকে চেনে না, তিনি কি করবেন না করবেন তা জানতেও চায় না, কারণ আপনাকে চেনে তারা, আপনি এমপি সাহেবকে দিয়ে সব করিয়ে নেবেন এটাই তাদের বিশ্বাস। আর এ জন্যই যদু-মদু কাউকে চেয়ারম্যান না বানিয়ে আপনাকে বানিয়েছে। গ্রামবাসী সবাই আপনাকে ভালোবাসে, শ্রদ্ধা করে। আপনি এসে যা বলেন তা-ই তারা মেনে নেয়। আজ এই যে বলছেন &#8211; ডিসিকে স্মারকপত্র দিয়েছেন, ঐ সময় যদি এই চাষীদের কয়েকজন আপনার সাথে থাকতেন, তাহলে আপনার সম্মান আরও বেড়ে যেত এবং ঠিকই বিদ্যুৎ এসে যেত।<br />
সাধন চেয়ারম্যান সম্পর্কে গ্রামের মানুষের ভালবাসা আর শ্রদ্ধার কথা বলছিল, ওর চোখে তখন একটা দুষ্ট হাসি খেলছিল। ব্যারিষ্টার তানিয়া সেই প্রথম থেকেই একটু পরপরই দেখছিলেন সাধনের চোখে। ঐ চোখে কখন কি অনুভুতি তা যেন সে পড়ে নিচ্ছিল প্রতিটি মূহূর্তে। এখানের মানুষ এমপি সাহেবকে চেনে না, শব্দটা ব্যবহার করেই সাধন তাকিয়েছিল তানিয়ার চোখে, সে চোখে ও খুঁজে পেল প্রশ্রয়ের হাসি।<br />
থানা কৃষি কর্মকর্তাও সাধনের সাথে মিল রেখে একই কথা বললেন। তিনি অবশ্য আরও বললেন &#8211; এ আলোচনায় ডিসি বা এডিসি কাউকে রাখলে আরও ভালো হত।<br />
শালিশ শেষে ঠিক হলো &#8211; আশেপাশের গ্রামগুলো নিয়ে কৃষকদের একটা সমিতি হবে, সেই সমিতির কয়েকজন সদস্য একত্র হয়ে চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের নিয়ে ডিসি অফিস ও পল্লি বিদ্যুৎ অফিসে যাবে। বিদ্যুৎ না পাওয়া পর্যন্ত তারা গ্রামে ফিরবে না। ব্যারিষ্টার তানিয়া তাদের নেতৃত্ব দেবেন। প্রয়োজনে তারা ডিসি অফিস ও বিদ্যুৎ অফিস ঘেরাও করার কথা বললেন।<br />
এখানে বাঁধা দিলো সাধন। না ম্যাডাম, এটা ভুল সিদ্ধান্ত হবে। বিদ্যুৎ পর্যাপ্ত না থাকলে ঘেরাও করে কোনো ফল হবে না। বর্তমান সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার জন্য জোর দিচ্ছেন। অথচ ডিজিটাল শব্দটাই বিদ্যুৎ নির্ভর। বিদ্যুৎ না থাকলে ডিজিটাল এর ডিজি থাকবে না, টাল নিয়ে সরকার নিজেই বেতাল হয়ে যাবেন। আমরা বরং সরকারকে বিকল্প বিদুৎ উৎপাদনের একটা রাস্তা দেখাতে পারি কিনা সে চেষ্টা করা যাক। শুধু ততদিন যেন গ্রামে বিদ্যুৎ থাকে।<br />
তানিয়া &#8211; বিকল্প বিদ্যুৎ, সেটা কি আমাদের এখানে সম্ভব? এখানেতো খরস্রোতা নদী নেই।<br />
সাধন &#8211; ঠিক জানিনা ম্যাডাম, তবে শুনেছি বুয়েটের কিছু ছাত্র বিকল্প বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য গবেষণা করছে। ইতিমধ্যে তারা সৌরবিদ্যুৎ নিয়ে কিছু একটা করেছে। তাছাড়া বায়োগ্যাস নাকি টয়লেট থেকে&#8230;.।<br />
তানিয়া &#8211; আপনার এতো কষ্টকরে টয়লেট বলতে হবে না সাধন, আপনি নির্ভেজাল বাংলায় হাগুঘর বা পায়খানা বলতে পারেন, আমি কিছু মনে করবো না। আর এই আমাকে ম্যাডাম ম্যাডাম করতেও আপনার বেশ কষ্ট হচ্ছে বুঝতে পারছি, আপনি আমাকে তানিয়া বলেই ডাকুন।<br />
সাধন &#8211; ধন্যবাদ আপু, আসলে আমি শুনেছি সৌরবিদ্যুৎ নিয়ে গবেষণার জন্য বুয়েটের ছাত্রদের যে পর্যাপ্ত অর্থ ও স্থানের দরকার তা তারা পাচ্ছেন না। আবার বায়োগ্যাস প্রকল্পের জন্যও অনেক বড় জায়গা দরকার। যা আমাদের গ্রাম-গঞ্জে অভাব নেই। তাছাড়া গ্রামগুলোতে প্রতিটি বাড়িতে যে পায়খানা আছে, গরু-বাছুরের পায়খানা ও মানুষের পায়খানা একত্র করে সেটার ব্যবহারে বায়োগ্যাস বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব কিনা? আপনি যদি পারেন এ বিষয়টা একটু দেখুন।<br />
সু-মিষ্ট স্বরে হেসে উঠলেন তানিয়া, সাধনের সাথে তার এ হাসির ঝলকে চেয়ারম্যান মেম্বারদের চোখে জ্বলনি স্পষ্ট টের পেল সাধন। দূরে সরে যাওয়া মেম্বারদের কেউ কেউ আরও কাছে এসে কথা শোনার চেষ্টা করলো, তানিয়া তখন বলছেন &#8211; সাধন আপনি এই আপু শব্দটা খুব বিশ্রিভাবে উচ্চারণ করেন। শুধু তানিয়া বলুন। সৌরবিদ্যুৎ নিয়ে গবেষণা চলছে, এটা সত্যি। ঢাকায় প্রাথমিকভাবে বাড়িওয়ালাদেরকে এটা ব্যবহার করতে অনুরোধ করেছেন সয়ং প্রধানমন্ত্রী। তবে এটা নাকি খুবই ব্যয়বহুল। তাই শিল্প-কারখানায় এটা ব্যবহারের কথা চিন্তা করা যাচ্ছে না। আর বায়োগ্যাস সম্পর্কে আমারও কোনো জ্ঞান নাই, তবে এটা সম্ভব হলেতো সবার আগে রাজধানী ঢাকাতেই এর ব্যবহার সবচেয়ে সহজ। কারণ সেখানে অসংখ্য পাবলিক টয়লেট আছে, যার এক একটি পৃথকভাবে কাজে লাগানো যেত। শহরে বিদ্যুতের চাপ কমলে গ্রামে সংকটই হবে না। আমি অবশ্য বিদেশে অবস্থানকালে দেখেছি- ওরা উইন্ড মিল (এক ধরণের বিদ্যুৎ তেরির চাকা বা হুইল, যা বাতাস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সাহায্য কর) ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। আমাদের এখানে বাতাস এবং সূর্য দুটোই রয়েছে, অন্যসব দেশের তুলনায় অনেক বেশি-ই বলা যায়, তাহলে আমাদের দেশে কেন এটা সম্ভব হবে না।<br />
দরিয়া গ্রামের চেয়ারম্যান কল্যাণ বাবু এতোক্ষণ ওদের কথা শুনছিলেন, বললেন &#8211; আমি রংপুরে ব্রাক-এর এরকম একটা প্রজেক্ট দেখেছিলাম। সেটা অবশ্য বায়োগ্যাস না যেন কি?<br />
তানিয়া &#8211; কাকা বাবু, আপনি তাহলে ব্রাকের সাথে আলোচনা করে দেখেন, ওই রকম একটা প্রজেক্ট এখানে করা যাবে কিনা। আর জাহাঙ্গীর কাকা।<br />
চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর কাকা একটু দুরে তার মেম্বারদের নিয়ে আলোচনা করছিলেন, তানিয়ার ডাকে ছুটে এলেন &#8211; জ্বী মা বলেন।<br />
কাকা এই গ্রামে কতগুলো সেনিটারি পায়খানা আছে, কতগুলো বাড়ি তার একটা সঠিক হিসেব আমাকে কালই দেবেন। কাল জেলা প্রশাসকের সামনে আমরা এ বিষয়ে কথা বলবো। চলুন আজ যাওয়া যাক। আর সাধনের দোকানের চা ও অন্যান্য যে খরচ তা আমার থেকে আপনি নিয়ে নেবেন। এখন আপনি নগদে ওর বিল পরিশোধ করুন।<br />
সাধন বাঁধা দেয়ার জন্য না না বলতে চাইলে ওর গলা দিয়ে গো গো শব্দ হলো, তানিয়া ওকে বলল &#8211; আপনি অবশ্যই চেয়ারম্যান কাকাকে একটা হিসাবের রশিদ দেবেন। তানা হলে কিন্তু আমি দাম দেব না। বলেই নিজের হাতব্যাগ খুলে একটা ভিজিটিং কার্ড বের করে সাধনের হাতে দিলেন তিনি। মুখে বললেন &#8211; এতে আমার মুঠোফোন নম্বর আছে। আপনি যখন খুশি আমাকে ফোন করতে পারেন, যেকোনো প্রয়োজনে।<br />
একে একে সবাই চলে গেল। থেকে গেল শুধু দরিয়া গ্রামের চেয়ারম্যান কল্যাণ বাবু, তাদের একজন মেম্বর আমজাদ ও এই গ্রামের মেম্বর জাফরউল্লাহ, যার কলার ধরে কৃষকরা মারতে চেয়েছিল। সমবয়সী হওয়ায় সাধন তাকে নাম ধরেই ডাকে।<br />
সবাই চলে গেলে জাফরউল্লাহ অনেকটা ক্ষিপ্ত স্বরে বললেন &#8211; তোমাকে আমি বোকা শোকা ভালো মানুষ ভেবেছিলাম। তুমিতো দেখছি আমাদের বাপ। কি চালাকী করে কৃষকদেরও বাঁচালে আবার চেয়ারম্যানকেও খুশি করে দিলে। আবার এমপি সাহেবের মেয়েকে নাম ধরে ডাকার অনুমতিও পেয়ে গেলে। কী দারুণ। এবার বলতো আমার কলার যারা ধরেছে, তাদেরকে কি আমি চিনি না। তোমার কি মনে হয়?<br />
সাধন &#8211; দেখ জাফর মিয়া, তুমি তাদের হয়ত চেন, আবার চেনও না, কিন্তু তুমি যখন চিনেও তাদের নাম বল নাই, তাহলে তুমি অবশ্যই তাদের ভালো চেয়েছো বলেই বল নাই। কারণ তুমিও বিশ্বাস করো যে তারা আসলে অন্যায় কিছু করে নাই। সত্যি কথা কি জান জাফর, তুমি আসলে খুব খুব একজন ভালো মানুষ, খারাপ হবার চেষ্টা করেও পার নাই। আর কখনো খারাপ হতেই যেয়ো না।<br />
এ কথায় চেয়ারম্যান কল্যাণ বাবুসহ সবাই হেসে উঠল। জাফর মেম্বর সাধনকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলল &#8211; আমি না, তুমি আসলেই খুব ভালো মানুষ মিয়া, তাই সবাইকে ভালো বানাতে উঠে পড়ে লেগেছো। কারণ তুমি জান যে, খারাপ লোকটাও ভালো শব্দটা খুব পছন্দ করে। সাবধানে থেকো। আজ তুমি কিছু বন্ধু যেমন পেলে তেমনি শত্রুও পেলে। কী কল্যাণ বাবু আপনি থাকবেন না যাবেন? প্রশ্নটা করে জাফর মেম্বর তাকালেন কল্যাণ বাবুর দিকে।<br />
কল্যাণ বাবু &#8211; আজ যে সাধনের ঘরে আমার নিমন্ত্রণ আছে। দু’জন একসাথে খাব বলে কথা দিয়েছি আমার মেয়েকে। তুমি চাইলে আমাদের সাথে খেতে পার এ বেলা।<br />
জাফর &#8211; সাধনের ঘরে, ও তো একা থাকে। রান্নাটা করবে কে? এখান থেকে গিয়ে ওর রান্না, তারপর খাওয়া, সেতো রাত্র হয়ে যাবে।<br />
কল্যাণ বাবু &#8211; তুমি খাবে কিনা সেটা আগে ভেবে দেখ। ক্ষিদেয় আমার পেটে শিয়াল ডাকছে। তারউপর আমার মেয়ে আন্না’র হাতের রান্না, একবার খেয়ে দেখ, সারাজীবন ভুলতে পারবে না।<br />
জাফর মেম্বর &#8211; মানে আপনার মেয়ে শ্রীমতি আন্না রাণী এখন তাহলে সাধনের ঘরে রান্না করছে। তাহলে তো একবার স্বাদটা নিতেই হয়।<br />
কথার ফাঁকেই দোকান বন্ধ করছিল সাধন। শেষ ঝাঁপটা ফেলে তালা দিতে দিতে বলল &#8211; তার আগে তোমাকে ভেবে দেখতে হবে হিন্দু মেয়ের হাতের রান্না কিন্তু।<br />
জাফর &#8211; তোমার যদি তাতে অরুচি না হয়, আমার কেন হবে। তাছাড়া ছোটবেলা নাপিতের মেয়ের সাথে প্রেম করতে গিয়ে বাবার হাতে মার যখন খেতে পেরেছি, তখন তাদের কারো রান্না খেতে আপত্তি করার মতো ভালো লোক আমি নই। তবে হ্যাঁ এতোদিন লোকের মুখে শুনেছিলাম যে, তোমার কাছে জাত-ধর্ম বলে কোনো ভেদ নেই। আজ তা নিজেই প্রমাণ পেলাম। কল্যাণ কাকুর মত চেয়ারম্যন যখন নিজের মেয়েকে নিয়ে তোমার ঘরে এসে রান্না করে খায়, তখন বুঝতেই পারছি তুমি সাধারণ মুদি আর চা বিক্রেতা নও। সত্যি করে বলতো সাধন, তুমি আসলে কে? কেন পরে আছ আমাদের গ্রামে? সেদিন যে লোকটা তোমাকে শহরে নিতে এল সেই বা কে? সে যে কোনো সাধারণ লোক নয়, তা তার হাঁটার ভঙ্গিতেই আমরা টের পেয়েছি। সবচেয়ে বড়কথা, যেদিন শহরে নির্দলীয় ছাত্রদের মিছিল বের হল, সেদিন কলেজের প্রিন্সিপালদের সাথে তারও ছবি পেপারে ছাপা হয়েছে।<br />
কথা বলতে বলতেই সাধনের ঘরের দিকে সকলে হাঁটা ধরেছিল। সাধনের মনে তখন লেখককে নিয়ে ভাবনার ঝড় বইছে। লেখকের দেয়া শিক্ষাই আজ ওকে দিয়ে অনেক কথা বলিয়েছে, বলা যায আজ ও যা বলছে সবই লেখকের শিখানো কথা। হয়ত আজ এখানে থাকলে লেখক নিজেও এসব কথাই বলতো। পেপারে ছবি ছাপা হওয়ার বিষয়টা ওর মনোযোগ কাড়লো। জানতে চাইলো কোন পেপারে। জাফর বললেন &#8211; পল্লী বার্তা আর যুগান্তর পত্রিকায়। তুমি দেখতে চাইলে আমার কাছে কপি আছে, পরে পাঠিয়ে দেব। কিন্তু আমার প্রশ্নের উত্তর দিলে না।<br />
সাধন &#8211; সব-ইতো জানো, নতুন কিছু বলার নেই। আমার এই বন্ধুটি একজন লেখক। ওটাই ওর একমাত্র পরিচয়। আগে পৈত্রিকসুত্রে ধনি ছিল, এখন আর তা নেই। শিল্প-সাংস্কৃতির চর্চা করেই দিন কাটায়।<br />
কল্যাণ বাবু বাধা দিলেন &#8211; না সাধন, তোমার এই বন্ধুটি সাধারণ কোনো লেখক নয়, তার ‘বাপ’ নামে উপন্যাসটা আমি ‘দৈনিক বাংলার চিঠি’ পত্রিকায় ধারাবাহিক পড়েছি। ওটা শুধু উপন্যাস না। তৃতীয় একটি রাজনৈতিক শক্তি তৈরির দলিলপত্র। এ উপন্যাসটি যেদিন পূর্ণাঙ্গ বই আকারে বাজারে আসবে, সেদিন থেকে এ দেশে আর সে থাকতে পারবে বলে আমার মনে হয় না। আর যদি থাকে তাহলে সব শ্রেণী পেশার মানুষের ভালোবাসা নিয়ে সর্ব্বোচ্চ ক্ষমতায় সে-ই থাকবে।<br />
কি বলছেন কাকা বাবু?<br />
সত্যি বলছি। সাধন। <strong>বাপ</strong> &#8211; একটি নতুন রাজনৈতিক দলের পথ নির্দেশ। যে দলটি তৈরি হবে ধর্মীয় সম্প্রীতি আর আমজনতার প্রচন্ড ভালোবাসা নিয়ে, একটি সমিতি বা সমাজসেবা মূলক সংগঠনের আদলে। যে দলের শীর্ষ নেতারা কেউ কখনো নির্বাচনে অংশ নেবেনা। শিল্পপতিদের কাছে বা বিদেশী শক্তির কাছে সংগঠন চালানোর জন্য ভিক্ষা নেবে না এ সংগঠনটি। তারা নিজেদের ফাণ্ড তৈরি করতেই এ উপন্যাস বাজারে ছাড়বে। বেশি দরকার হলে সংগঠনের নামে দানবাক্স তৈরি করে সাধারণ আমজনতার থেকে দু’ টাকা এক টাকা করে দান নেবে, ঠিক যেভাবে পীর-আউলিয়াদের নামে দান বাক্স রাখা আছে রাস্তার মোড়ে মোড়ে, সেভাবে <strong>বাপ</strong> নামে দান বাক্স থাকবে, দানবাক্সের গায়ে লেখা থাকবে &#8211; দান করুন, সেবা নিন।(বাপ সদস্যরা ডাকা মাত্র সাদারণ মানুষকে সেবা দিতে বাধ্য থাকবে।) তবু শিল্পপতিদের কাছে জিম্মি হবে না এ সংগঠন।<br />
ওদের গঠনতন্ত্রে প্রথমেই লেখা আছে &#8211; ১) এ সংগঠনের সদস্যদের নিজ নিজ ধর্মের প্রতি গভীর বিশ্বাস ও ভালোবাসা থাকতে হবে। লোভ বা কিছু প্রাপ্তির আশা নিয়ে নয়, অন্তরের গভীর ভালোবাসা থেকে স্রষ্টাকে যারা ডাকেন শুধু তারাই এ সংগঠনের সক্রিয় সদস্য হতে পারবেন।<br />
২) পূর্ববর্তী সকল নেতাদের প্রতি শ্রদ্ধা নিয়ে কথা বলতে হবে, না জেনে কোনো উদ্ভট কথা <strong>বাপ</strong> -এর কোনো সদস্য বলবেন না।<br />
৩) সদস্যদের ভোটেই উপজেলা, জেলা ও কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তৈরি হবে। <strong>বাপ</strong>-এর সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ জেলা পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা কোনো নেতা স্ব-পদে বহাল থেকে কখনো নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। সাধারণ সদস্যদের ভোটেই দলীয় প্রধান নির্বাচিত হবে কিন্তু পর পর তিনবারের বেশি দলীয় প্রধান বা সভাপতি/সাধারণ সম্পাদক পদে কেউ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন না।<br />
এখানের এই দুটি বিষয় সাধন, এই যে বাপ -এর গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকা কোনো নেতা স্ব-পদে বহাল থেকে কখনো নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না এবং সাধারণ সদস্যদের ভোটেই দলীয় প্রধান নির্বাচিত হবে কিন্তু পর পর তিনবারের বেশি দলীয় প্রধান পদে কেউ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন না।  এটাই ‘বাপ’কে তার সন্তানদের কাছে জনপ্রিয় করে তুলবে। এরপর কথার সাথে যদি কাজের মিল পাওয়া যায়, তাহলে বিশ্বাস কর কেউ ঠেকাতে পারবে না ‘বাপ’ এর উত্থান। কিন্তু ভয় হচ্ছে &#8211; তোমার বন্ধুটি ততদিন বাঁচবেতো? এখনো হয়তো অন্যদলের নেতারা <strong>বাপ</strong> উপন্যাসটি বুঝে উঠতে পারে নাই। তাই সে ছাত্রদের নিয়ে কাজে নেমে যেতে পেরেছে। কিন্তু যখন বুঝবে যে &#8211; সামাজিক সেবা সংগঠন হলেও এটা অন্য রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য ক্ষতিকর কিছু, তখন কেউ-ই আর ছেড়ে কথা বলবে না।<br />
অবশ্য <strong>বাপ</strong> উপন্যাসটির পৃথক পৃথক পর্ব পড়ে <strong>পরিষদ</strong> শব্দের আঢ়ালে এটা যে একটি রাজনৈতিক সংগঠন -এর পথ নির্দেশ তা সহজে বোঝা যাবে না। কিন্তু শেষটায় পৃথক ভাবে ওদের গঠনতন্ত্র দেয়া আছে। যা বুঝতে তোমার সময় লাগবে। কিন্তু একসাথে বইটি হাতে পেলে যে কেউ এটা বুঝে যাবে। তখন তোমার বন্ধুর চরম বিপদ হবে। এদিকে ছাত্রদের নিয়ে সে ইতিমধ্যেই যা শুরু করেছে, তা <strong>বাপ</strong> উপন্যাসের প্রথম পর্বে আমি পড়েছি। ছাত্ররা ওর কথা ও কাজে মিল খুঁজে পেয়েছে। তাই ওকে বসিয়েছে বিশেষ সম্মানের স্থানে। আমার মেয়ে আন্না তোমার সাথে এ বিষয়েই কথা বলতে এসেছে। বলেই কল্যাণ বাবু আমজাদ মেম্বর ও জাফর মেম্বরকে দেখলেন, তাদের নাম ধরে ডেকে বললেন &#8211; তোমরা যা শুনছো, প্লিজ ভুলেও দু’কান করো না। এদেশে একটা পরিবর্তন খুব জরুরী তা তোমরাও জান। আমরা সবাই আসলে একজন নেতার অপেক্ষা করছি। নতুন একটি রাজনৈতিক দলের অপেক্ষা করছি। যারা শুধু স্বপ্ন দেখাবে না। কাজ করে দেখাবে। যদি পার তোমরাও বাপ উপন্যাসটি পড়ে ফেল। আমার মেয়ে আন্না ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলায় অনার্স শেষ বর্ষের ছাত্রী। ও ‘দৈনিক বাংলার চিঠি’ পত্রিকায় ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত বাপ উপন্যাসটির প্রায় সব পর্বই একত্র করেছে। সেগুলো দিয়ে কয়েকটি বইয়ের মত বাঁধাই করে এনেছে। তোমরা চাইলে নিয়ে পড়তে পার।</p>
<p><strong>চার</strong><br />
যখনই কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগি খুব অস্থিরতায় পেয়ে বসে আমাকে। নাওয়া-খাওয়া, ঘুম সবই প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। এরকম পরিস্থিতিতে আমি মসজিদে ছুটে যাই। নামাজে দাঁড়িয়ে চোখ বন্ধ করে মুখস্থ করা সূরাগুলো পড়ি, সেজদায় যাই এবং নামাজ শেষে আমি যখন মসজিদ থেকে বের হয়ে আসি &#8211; আপনা থেকেই আমি আমার করনীয় ঠিক করে ফেলতে পারি। আজও আমি ভীষণ অস্থিরতায় ভুগছি। কল্যাণ কাকুর মেয়ে আন্না আমাকে <strong>বাপ</strong>-এর একটি কপি দিয়েছে। তিনদিন ধরে সেটি পড়ছি, বার বার পড়ছি। লেখক আসলে কি চাচ্ছে তা বোঝার চেষ্টা করছি। কিন্তু এখনো আমার কাছে কিছুই পরিস্কার না। অথচ আন্না’র কথা শুনে আমি প্রচন্ড ভীত হয়ে পড়েছি। আন্না যা বলেছে তা যদি সত্যি হয়, তাহলে এ মূহুর্তে আমার লেখকের পাশে থাকা উচিত।<br />
আন্নারা অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা খুব আশাবাদী। ইডেন কলেজ, বদরুন্নেসা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া ও শামসুন্নাহার হলের মেয়েরা ইতিমধ্যে <strong>বাপ</strong>-এর দেখানো পথে হাঁটতে শুরু করেছে। ওরাই প্রথম নির্দলীয় ছাত্র-ছাত্রী সংসদ-এর দাবী তুলে আন্দোলনে নেমেছে। শুধু ছাত্র সংসদ লেখা যাবে না। তাহলে ছাত্রী শব্দটি তুলে দিতে হবে। এ আন্দোলন ইতোমধ্যে সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে।<br />
কেন ছাত্রী বলা যাবেনা? প্রশ্নের উত্তরে বইটিতে যে যুক্তি দেখানো হয়েছে তা তুলে ধরে আন্না বলল &#8211; ইংরাজী স্টুডেন্ট- শব্দটির কি কোনো স্ত্রী লিঙ্গ আছে? আমরা বাংলায় এটিকে ছাত্র ও ছাত্রী লিঙ্গান্তর করে ব্যবহার করি। অথচ দেখেন যখনি বৃহৎ প্রয়োজন হয় তখন কিন্তু ছাত্র শব্দটি দিয়েই ছাত্র-ছাত্রী উভয়কে বুঝানো হচ্ছে। যেমন ছাত্রলীগ বা ছাত্রদল শব্দে দেখুন। ঢাকায় ইডেনে আওয়ামী লীগ সমর্থক দু’গ্রুপ মেয়েদের মধ্যে সংঘর্ষের যে সংবাদ জাতীয় দৈনিক গুলোতে ছাপা হলো, সেখানে আহতদের ছাত্রী বলা হলেও একই সংবাদে পত্রিকায় লেখা হল ছাত্রলীগকর্মী বহিস্কার। এতে কি আমাদের খাটো করা হয় না? তাই আমাদের দাবী ছাত্রী বলে কোনো শব্দ আর থাকবেনা। সবাই ছাত্র। ছাত্র হবে উভয়লিঙ্গ। এ দাবীতে আন্দোলন শুরু করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েরা। স্কুল-কলেজের ছাত্রীরাও তাদের সাথে ঐক্যতা ঘোষণা করেছে। এক শ্রেণীর বুদ্ধিজীবী ও কিছু সংগঠন এ আন্দোলনের বিপক্ষে অবস্থান নেয়ায় পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। মেয়েদের মিছিলে হামলা করে তারা সারাদেশের শিক্ষাঙ্গনকে ক্ষেপিয়ে তুলেছে।</p>
<p>আন্না প্রায় দু’ঘন্টা ধরে আমাকে বুঝাতে চেষ্টা করেছে, আমরা খেতে খেতে কথা শুরু করেছি। চেয়ারম্যান ও মেম্বর দু’জনও অবাক হয়ে গিলেছে আন্নার কথা। সব শুনে আমার মনে হয়েছে &#8211; এ সবের পিছনে যে <strong>বাপ</strong> নামের কোনো উপন্যাস কাজ করছে তা হয়তো এখনো বুঝে উঠতে পারেনি সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীরাও। তাই এখনো লেখকের তেমন কোনো সমস্যা দেখা দেয়নি। কিন্তু আন্না’র বিশ্বাস আর বেশি দিন এটা লুকানো থাকবে না। কারণ বুদ্ধিজীবীদের চাপের মুখে মেয়েরা এখন মুলত ছাত্র-ছাত্রী শব্দের যৌথ ব্যবহার দাবী করছে সর্বত্র। আর ছাত্রী শব্দটি তুলে দেয়ার জন্য বিশেষ আবেদন করেছে বাংলা একাডেমী ও সংস্কৃতিক মন্ত্রণালয় বরাবরে। পুনরায় ডাকসু নির্বাচন দাবী তুলেছে ওরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেরাও এ আন্দোলনে মেয়েদের সঙ্গে একত্র হয়েছে। মধুর ক্যান্টিন থেকে-ই সব কার্যক্রম শুরু করছে তারা। এমনিতেই নিরিহ ছাত্র আবু বকর-এর মৃত্যুতে এখানে ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে একটা ঐক্যতা তৈরি হয়েই ছিল। লেখকের দেখানো পথে হাঁটতে তাই খুব কষ্ট হচ্ছে না।<br />
আন্না নির্দলীয় ছাত্র-ছাত্রীদের কাজের পদ্ধতী বিশ্লেষণ করে জানাল &#8211; সাধন ভাই, আপনি দেখলে অবাক হবেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা নিজেরাই একটা অলিখিত সংসদ তৈরি করে নিয়েছে। এই সংসদ সরকার ও বিরোধী দলের অনৈতিক কাজ গুলোর একটা তালিকা করে সেগুলোর নিচে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের সাক্ষর সংগ্রহ করে প্রতিবাদ লিপি পাঠিয়ে দিচ্ছে প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীনেত্রীর কার্যালয়ে। এমনকি ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া বা জাতীয় দৈনিকে কোনো মন্ত্রী, নেতা বা এমপি’র বারাবারি বক্তব্যকেও তারা ধরিয়ে দিয়ে, সে বক্তব্য তুলে নেয়ার অনুরোধ জানাচ্ছে। জাতীয় সংসদ অধিবেশন পর্যালোচনার জন্য সংসদ বার্তা নামে একটি বুলেটিন প্রকাশ করছে নিজস্ব অর্থায়নে। বলবেন অর্থ কোথায় পাচ্ছে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের তেত্রিশ হাজার ছাত্রছাত্রী। তাদের সবাই এখন ঐক্যজোট। তারা তাদের টিফিন খরচ থেকে যে যা পারছে দান করছে এই ছাত্র বা ছাত্র-ছাত্রী সংসদ ফাণ্ডে। এই ছাত্র সংসদের রয়েছে নিজস্ব ছায়া সরকার কাঠামো। সেখানে প্রতিদিন সংসদে যে যা বলে বা করে তার ছবিসহ বিস্তারিত তুলে ধরা হচ্ছে। কে কি মন্তব্য করছে, সে মন্তব্যে ওয়াক আউট করা যায কিনা তা নিয়ে বিশেষজ্ঞ ব্যাখ্যা দেয়া হচ্ছে। তুলে ধরা হচ্ছে সংসদ খাতে প্রতিদিনের আয়-ব্যয় ও লাভের পরিসংখ্যান। মন্ত্রী-এমপিদের আয় ব্যয়, বিদেশ ভ্রমণ ইত্যাদি অনিয়ম খুঁজে বের করে তা প্রকাশ করা হচ্ছে। এই বুলেটিন সাধারণ মানুষের কাছে ২ টাকা মূল্যে বিক্রি করছে ছাত্ররা। এতেও কিছুটা টাকার জোগার হচ্ছে। যদিও এতে জাতীয় সংসদের ভাবমূর্তি নষ্ট হচ্ছে দাবী করে নির্বাচিত সাংসদরা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠছেন, তারাও পাল্টা প্রতিবাদ শুরু করেছেন। তবে সরকার দলীয় কয়েকজন তরুণ সাংসদ এটা সমর্থন করছেন। ছাত্র ছাত্রী সংসদকে তারা উৎসাহও দিচ্ছেন, যা অকল্পনীয় সাধন ভাই।<br />
আন্না আরো বলেছে &#8211; সাধন ভাই, ছাত্র-ছাত্রীদের ভূমিকা সারা দেশে যেভাবে দ্রুত বদলে যাচ্ছে। তাতে সাধারণ মানুষ খুব স্বস্তি পাচ্ছেন। এমনকি সাধারণ কৃষকরাও এখন ছাত্রদের কাছে ছুটে যাচ্ছেন তাদের সমস্যা নিযে। <strong>বাপ</strong>-এর প্রথম পর্বে লেখক ঠিক এটাই দেখিয়েছেন। ছাত্র-ছাত্রীরা এসে কৃষককে ধান কাটায় সাহায্য করছে, তারা বাজারে ধান বিক্রিতে সাহায্য করছে। আলু-পটল, টমেটো ইত্যাদি গুদামজাতে সমস্যা হলে তা সরাসরি রাজধানীর বাজারে বিক্রির উদ্যোগ নিচ্ছে তারা। সরকারের কৃষিমন্ত্রীর সাথে কথা বলে তারা মন্ত্রণালয়ের সাহায্য এনে দিচ্ছে, যা সত্যি চমৎকার চিন্তা। আপনি পড়ে দেখুন। আপনার ভালো লাগবে। এসব শুরু হয়ে গেছে সাধন ভাই। ছাত্র-ছাত্রীদের ভয়ে এখন আর কেউ ঘুষ নিতে চাচ্ছে না। পুলিশও এখন আর নেতাদের তোয়াজ করে কথা বলছে না। লেখক ছাত্র-ছাত্রীদেরকে দিয়েই পরিবর্তনটা শুরু করতে চেয়েছেন, পরিবর্তন শুরু হয়েছে। আমাদের এখন তার পাশে দাঁড়ানো উচিৎ। তা না হলে <strong>বাপ</strong>-এর শেষ পর্বটা তিনি আর দেখাতে পারবেন না।<br />
আমি আন্নার কথা শুনে স্পষ্ট বুঝতে পারছিলাম, ও নিজেই এর সাথে জড়িয়ে গেছে। তাই ওকে প্রশ্ন করলাম &#8211; এ সব করে তোমরা পড়াশুনার বারটা বাজাচ্ছ না তো?<br />
আন্না খিলখিলিয়ে হেসে উঠল &#8211; কী যে বলেন না সাধন ভাই। এতে আরও পড়ার চাপ বেড়েছে। আমরা পালা করে সংসদের কাজ করছি, তাই ক্লাশের পড়ার ক্ষতি হচ্ছে না, বরং আমাদের বাড়তি জ্ঞান অর্জনের জন্য আরও বেশি পড়তে হচ্ছে। আমরা এখন ব্রিটিশ বা আমেরিকান পার্লমেন্ট-এর কাজের নমূনাও জানি। পড়ে পড়ে শিখেছি। আমাদের দেশের আদি ইতিহাস, দেশভাগ, মুক্তিযুদ্ধ এগুলো না জানলে আমরা সত্যটা বলবো কি করে?<br />
আন্নাকে নিয়ে ওর বাবা চলে যাবার পরও মেম্বর দু’জন অনেক সময় বসে গল্প করেছে আমার সাথে। তাদের গল্পের বিষয় <strong>বাপ</strong>-এর কাজ কতটা অকাজ। সত্যি কি এটি ছায়া সরকার রূপরেখা নিয়ে পথ চলবে? তাদের নিজস্ব মন্ত্রীসভা থাকবে? তারা টাকা পাবে কোথায়? বিদেশী কোনো সংস্থা’র স্পাই হবে না তো? গ্রামের ইউনিয়ন পরিষদের অশিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত দু’জন সদস্যের সচেতন প্রশ্ন শুনে আমি অবাক হয়েছি। আমাদের মানুষ কতটা রাজনীতি সচেতন বুঝতে পেরে আমার বুকটা গর্বে ভরে উঠল। তারা <strong>বাপ</strong> বইটি হাতে নিয়ে উল্টে পাল্টে দেখল &#8211; আমরা দু’জন একটা বই পড়ে দেখি সাধন, বলে বইটা নিয়ে চুপচাপ চলে গেল তারা।<br />
সবাই চলে যেতেই আমি ব্যস্ত হয়ে পাতা উল্টিয়ে দেখেছি ফটোকপি করা <strong>দৈনিক বাংলার চিঠি</strong>-এর লোগো সম্বলিত লেখাগুলো। এখানে শেষপর্ব নেই। আছে চলবে লেখা। উপন্যাসটি পড়ে পাগলামো ছাড়া আর কিছু মনে হয়নি। আমজনতার মধ্যে থেকে নতুন নেতা খুঁজে বের করার শপথ নিয়েছে এ উপন্যাসের নায়ক। সে দেশের বিভিন্ন স্থানে, অলিতে গলিতে, কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে একটা জরিপ চালিয়ে দেখেছে &#8211; বর্তমান রাজনীতি ও রাজনীতিবিদদের উপর সাধারণ মানুষের আর কোনো আস্থা নেই। সবাই মৌন-হতাশায় ভুগছেন। সকলেই চাচ্ছেন দৈবিক আশ্রয়। দেবদুতের মতো কোথাও থেকে এক বা একাধিক নেতা এসে তাদের উদ্ধার করবেন। নায়কের সাথে সাধারণ আমজনতার যে কথাবার্তা তাতে তারা শের-এ বাংলা এ কে ফজলুল হক, মাওলানা ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান-এর মতো আর একজন নেতাকে খুঁজে বেরাচ্ছেন এ দেশে? তাদের বিশ্বাস দৈব কিছু ঘটবে। ষোল কোটি লোকের মধ্যে থেকে কেউ না কেউ এক বা একাধিক নেতা বের হয়ে আসবেন। তাহলে দলবদ্ধ ভাবেই তৈরি হবে নতুন নেতৃত্ব। একজনের স্থানে দশজন মিলে সৃষ্টি করবে নতুন একটি রাজনৈতিক দল। এই দশজনের দলটিকে পরিচালনা করবে সয়ং আমজনতা। ছাত্র-শ্রমিক-কৃষক সব শ্রেণী পেশার মানুষের সাথে বসে আলোচনা করে কাজ করবে এই দশজন প্রতিনিধি।<br />
এ উপন্যাসের নায়ক ইতিহাসের ছাত্র। সে পড়েছে &#8211; বাংলায় পাল রাজবংশের উত্থানের ইতিহাস। জানে কীভাবে চরম অশান্তি আর অরাজগতা দূর করতে আমজনতা একত্রিত হয়ে তাদের মধ্যে থেকেই গোপাল নামের একজনকে রাজা বানিয়ে দিয়েছিল। এই গোপাল থেকে বাংলামূলুকে পালবংশের সূচনা হয়েছিল অতীতে। তাহলে আজ এই আধুনিক যুগে কেন তা সম্ভব হবে না। নায়ক বেচারা তাই প্রথমেই গিয়েছে ছাত্রদের কাছে, তাদের বুঝিয়েছে ছাত্র নিজেই একটা প্রচণ্ড শক্তি, একটা পৃথক সত্তা। এর কোনো ভাগ হতে পারে না। অন্য যেকোনো রাজনৈতিক দলের তুলনায় ছাত্র নিজেই অনেক বেশি শক্তিশালী একটি সত্ত্বা। এর কোনো স্ত্রী লিঙ্গ হতে পারে না। ছেলে-মেয়ে সবাই ছাত্র। যেমনটি মহিলা পুরুষ সবাই মানুষ। নায়কের দৃঢ় বিশ্বাস এই ছাত্রদের মধ্যে থেকেই তৈরি হবে আগামীর পথপ্রদর্শক। আর এটা লেখকেরও দৃঢ় বিশ্বাস।</p>
<p><strong>পাঁচ</strong></p>
<p>আমি দ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভুগছি। সত্যি বলতে তানিয়া ম্যাডাম, ব্যারিস্টার তানিয়াকে না দেখলে হয়তো এ গ্রাম ছাড়তে এতোটা কষ্ট আমার হতো না। যাবার আগে কি তার সাথে একবার কথা বলে যাব? সেটা কি ঠিক হবে? অথচ আমার যত তারাতারি সম্ভব লেখকের কাছে যাওয়া উচিত। ওর কাছে চলে যাওয়া মানেই এদিকে সব গুটিয়ে ফেলতে হবে। সাতবছর ধরে একটু একটু করে গড়ে তোলা ঘর, দোকান, এই গ্রাম, গ্রামবাসী মানুষের ভালবাসা, সব ত্যাগ করতে হবে। উফ! কি করা উচিৎ। আমি দ্রুত ছুটে গেলাম মসজিদে। জহুরের নামাজের আযান হয়ে গেছে। মসজিদের ইমাম পীরজাদা সাইফুল সাহেব আমাকে দেখেই ছুটে এলেন &#8211; আরে সাধন, আপনাকেই খুঁজছিলাম। সেদিন আমি আপনাকে সঠিক ব্যাখ্যা দিতে পারি নাই। শুনুন &#8211; যে নিজেকে ভালোবাসেন, সে আল্লাহ বা স্রষ্টাকে ভালোবাসেন। এই ভালোবাসা নির্মোহ, নির্লোভ, নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। আর আল্লাহকে ভালোবাসা মানেই আল্লাহ’র সৃষ্টিকে ভালোবাসা। এ পৃথিবীর সব, আসমান-জমিনের সব কিছু আল্লাহ’র সৃষ্টি। তাই এ সব কিছুকে যে ভালোবাসে না, সে আল্লাহ&#8217;কে ভালোবাসার কথা বলে কি করে। ভালোবাসার অপর নামই যে আল্লাহ-ইশ্বর-ভগবান। তাকে বাদ দিয়ে আমারতো কোনো অস্তিত্ব নাই। শুধু মসজিদে এসে নামাজ পড়লে বা রোজা রাখলেই আল্লাহ কে ভালোবাসা হয় না। নবীজী তার হুদায়বিয়ার সন্ধিতে দেখিয়েছেন ভালবাসার বিজয়। ঐ সন্ধি না হলে আজ সারা বিশ্বে ইসলামের জয় পতাকা উড়তো না।<br />
আমি পীরজাদার মুখের দিকে হ্যাঁ করে তাকিয়ে ছিলাম। এতোদিন তাকে আমি গোড়া ভেবে এসেছি। আজ সে-ই কি চমৎকার ভাবে আমাকে সমস্যার সমাধান দেখিয়ে দিলেন। ভালোবাসাই আল্লাহ-ইশ্বর-ভগবান। আমি তাকে জড়িয়ে ধরে মনের গোপনে লুকানো তার প্রতি জমে থাকা সব ক্ষোভ স্বীকার করে ক্ষমা চাইলাম। তিনি মৃদু হেসে বললেন &#8211; সাধন আমি আপনার বন্ধু লেখকের <strong>ধার্মিক</strong> উপন্যাসটি পড়েছি। যেখানে লেখক প্রতিটি মুসলমানকে পবিত্র কোরআনের বাংলা জানতে ও বুঝতে অনুরোধ করেছেন, আর জুম্মার খুতবার প্রথম পর্বে এলাকার সমস্যা নিয়ে আরেঅচনা ও সমাধান খোঁজা এবং দ্বিতীয় পর্বে বাংলায় পড়ার বাধ্যবাধকতা চেয়ে আবেদন জানিয়েছেন ধর্ম মন্ত্রণালয়ে। আপনি কখনো এখানে জুম্মা পড়তে আসেন নি, যদি আসতেন, দেখতেন &#8211; জুম্মার খুতবায় আমি বর্তমান সময়ের সমস্যা নিয়ে কথা বলি, বাংলায় বলি, আরবীতে বলি না।</p>
<p>আমি <strong>ধার্মিক</strong> বইটি পড়িনি। তাই ওটার কথা জানাও নেই। ঈমাম সাহেবের কথায় জানলাম, শুধু <strong>বাপ</strong> নয়, <strong>ধার্মিক</strong> নামের কোনো উপন্যাসও এবার লেখকের হাতিয়ার।<br />
নামাজ শেষে আমি দ্রুত বের হয়ে এলাম। আমার করনীয় কি তা জেনে গেছি। এখনই সব কিছু গুছিয়ে আমাকে ফিরে যেতে হবে লেখকের কাছে। এ বিপদ মূহূর্তে ওকে একা রাখা যায় না। গোঁছগাছ করতে সময় লাগবে। কিন্তু কে জানতো ঘরে আমার জন্য আরো বিস্ময় অপেক্ষা করছিল। ব্যারিস্টার তানিয়া পায়চারি করছেন আমার ঘরের সামনে। আমাকে দেখেই মিষ্টি হাসলেন &#8211; আপনার সঙ্গে জরুরী কথা আছে তাই নিজেই চলে এলাম।<br />
জ্বী বলুন, বলেই আমি আগ্রহ নিয়ে তার মুখের দিকে তাকালাম। সবুজীর ভিতর কালো ছোপের শাড়িতে দারুন লাগছে মেয়েটিকে। শাড়ি পড়ার কৌশলটাও দৃষ্টিনন্দন এবং চমৎকার রুচীশীলতার পরিচয় ফুটে উঠেছে। এমনকি বুকের উপর আঁচল পেঁচানোর ধরণটাও আলাদা। হঠাৎ করে কোনো পুরুষের নজর কাড়ে না শাড়ির ফাঁক গলে বেড়িয়ে থাকা শরীরের কোনো বাড়তি অংশ। এমন সুন্দর শাড়ি শুধু আমার মা পড়তেন। আজ তানিয়াকে অনেকটা মা মা লাগছে।<br />
আমার চোখের মুগ্ধতায় তিনি আরও গুটিয়ে গেলেন। বাংলার লজ্জাভূষণ নারীটির গাল ধীরে ধীরে লাল হতে দেখলাম। নার্ভাস ভাবটা কাটাতে তিনি তারাতারি বললেন &#8211; চলুন আমি গাড়ি নিয়ে এসেছি, যেতে যেতে পথে কথা বলি।<br />
আমি দ্রুত ঘরে ঢুকে কয়েকটি কাপড় একটা হাত ব্যাগে ভরে নিলাম, পেস্ট আর টুথব্রাশ নিতে ভুললাম না। ঘরটায় তালা দিয়ে গাড়িতে তানিয়া-জ্বীর পাশে বসতে সব মিলিয়ে বিশ মিনিট সময় অপচয় হল। কিছুটা অবাক চোখেই তানিয়া বললেন &#8211; জরুরী কোথাও কি যাচ্ছেন? যেখানেই যান আজ দুপুরের খাবারটা আপনি আমার সাথে খেয়ে তারপর যাবেন।<br />
একটু বিরতি দিয়ে তানিয়া আবার বললেন &#8211; গতকাল একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে। রাতে জেলা শহরের শিক্ষক সমিতির কয়েকজন শিক্ষক, সর্বদলীয় ছাত্র সংসদের দু’জন করে ছাত্র (নারী ও পুরুষ) এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীসহ তিনটি দল আমার কাছে এসেছিল। তাদের মধ্যে মেম্বর জাফরউল্লাহ ও আমজাদ সাহেবও ছিলেন। তারা সবাই মিলে কি এক আমজনতা পরিষদ নামে একটি সমবায় সমিতি করতে চাচ্ছেন। তারা নিজেরাই ভোটাভুটির মাধ্যমে আমাকে সমিতির প্রেসিডেন্ট এবং আপনাকে সেক্রেটারী বানিয়ে দিয়েছেন। আপনাকে রাজী করানোর দায়িত্ব দিয়েছেন আমাকে। তাদের কি করে এ বিশ্বাস তৈরি হয়েছে আমি জানি না, তারা ভাবছে আপনি আমার কথা ফেলতে পারবেন না। অথচ আপনার সাথে আমার পরিচয় হয়েছে মাত্র দু’দিন হলো। পুরো ব্যাপারটা আমার কাছে খুব রহস্যময় লাগছে। তবে তাদের সমিতির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য শুনে আমার ভালো লেগেছে।</p>
<p>যেমন &#8211; তারা এ সমিতির দ্বারা সারাদেশে শিল্প কারখানা স্থাপনের মাধ্যমে বেকারত্ব দূরীকরণ, যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নয়ন, সর্বস্তরের আমজনতার কর্মউদ্যোগ গ্রহণ ও বৃহৎ কোনো সমস্যার সমাধানে সবসময় কাজ করে যাবে। সমিতির সদস্যরা পাবে ঝুঁকিসেবা। তবে তারা তাদের সদস্য চাঁদা থেকে কোনো সুদ বা এককালিন কোনো মুনাফা পাবেন না, তারা পাবেন গড়ে ওঠা শিল্প প্রতিষ্ঠানের শেয়ার বা মালিকানার লভ্যাংশ।<br />
আমি হেসে উঠলাম &#8211; এতো স্পস্ট ভাওতাবাজী ম্যাম।<br />
তানিয়া &#8211; কেন, সেটা মনে হলো কেন?<br />
বললাম &#8211; সদস্যরা চাঁদা দেবে, কোনো মুনাফা পাবে না, পাবে প্রতিষ্ঠানের লভ্যংশ? যে প্রতিষ্ঠান কোনোদিন তৈরিই হবে না। একটা প্রতিষ্ঠান গড়তে কি পরিমান টাকার প্রয়োজন? সে ধারণা থাকলে&#8230;.<br />
সাধন, আগে পুরোটা শুনুন, আপনার মনে লুকানো সব প্রশ্নের উত্তর এখানে আছে -কথাটি বলে হাত নেড়ে একটা ভাজ করা কাগজ দেখালেন তানিয়া। বললেন &#8211; এ সমিতি সর্বসাধারণের জন্যও উম্মুক্ত থাকবে, প্রতিটি সদস্য সদস্যসংখ্যা বৃদ্ধির জন্য চেষ্টা করবে। সদস্যসংখ্যা একশ না হওয়া পর্যন্ত সমিতি ফাণ্ডের টাকা কোনোভাবেই ব্যবহার করা যাবে না।<br />
এখানে দেখুন বলে তানিয়া কাগজটি খুলে একটি সদস্য ফরম দেখালেন &#8211; কেউ এ সমিতির সদস্য হতে চাইলে ৫০ টাকা দিয়ে সদস্য ফরম কিনে সাধারণ সদস্য হতে পারবে। এই ৫০ টাকা ব্যয় হবে সমিতির খরচ খাতে। একজন সদস্য প্রতি মাসে মাত্র ১০ টাকা সমিতি সদস্য ফি দেবেন। এই ১০টাকা জমা হবে সমিতি ফাণ্ডে। বিনিময়ে তিনি পাবেন সব ধরণের ঝুঁকিসেবা। এই ঝুঁকিসেবা হচ্ছে &#8211; ধান কাটা মৌসুমে কৃষকের সাহায্য, জমিজমা সংক্রান্ত, স্কুল-কলেজে ভর্তি বা অন্য যেকোনো পারিবারিক বা ব্যত্তিগত ঝামেলায় এই সমিতি একে-অপরের সাহায্যে এগিয়ে আসবে। এমন কি আইনি সাহায্য পাবে বিনা খরচে। কেউ খামার বা এ জাতীয় উৎপাদনশীল কিছু করতে চাইলে সমিতি তাকে লোন দেবেনা, তবে তার সাথে যৌথ মালিকানায় টাকা বিনিয়োগ করবে। এরকম আরও অনেকগুলো বিষয়।<br />
কিন্তু আমার কাছে ওদের যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে সাধন, এই যে দেখুন &#8211; বলেই তানিয়া তার হাত ব্যাগ থেকে অন্য একটি ডাকে আসা কাগজ বের করলেন। খামটি এসেছে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক <strong>বাংলাদেশ আমজনতা পরিষদ (বাপ)</strong> নামে।</p>
<p>সাধন দেখল পেপারটিতে বেশ কয়েকটি প্রস্তাবণা রয়েছে। প্রস্তাবণার প্রথমেই লেখা আছে &#8211; দেশের প্রতিটি জেলায় ভালো সৎ ও পরিশ্রমি লোকদের নিয়ে <strong>বাংলাদেশ আমজনতা পরিষদ (বাপ)</strong> সমিতি কার্যক্রম গঠিত হবে। এই সৎ লোকেরা ভোটের মাধ্যমে তাদের যোগ্য নেতৃত্ব তৈরি করবেন। সমিতির মূল উদ্দেশ্য থাকবে নিজ জেলায় শিল্প-কারখানা স্থাপনের মাধ্যমে জেলাভিত্তিক কর্মসংস্থান তৈরি করার চেষ্টা।</p>
<p>যেমন -বরিশাল অঞ্চলের এই সমিতি অবশ্যই আটঘর কুড়িয়ানার আমড়া ও পেয়ারাকে ঘিরে জেলি কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করবে। যে সব অঞ্চলে নারিকেলের উৎপাদন বেশি, সেসব অঞ্চলে নারিকেল তৈল ও ছোবড়া থেকে উৎপাদনকৃত পণ্য তৈরি কারখানা স্থাপন করার কাজ এই সমিতির। আনারস, টমেটো, আখ কিম্বা পাট উৎপাদশীল এলাকায় অবশ্যই শিল্প কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নিতে হবে। জেলার রাস্তাঘাট তৈরি ও যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নতির জন্য এ সমিতির সদস্যরা প্রথমে সরকারী সহযোগিতা পেতে করণীয় যাবতীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। সরকার সহযোগিতা না করলে নিজ উদ্যোগে এলাকাবাসীর সহযোগীতা নিয়ে কাজ সম্পন্ন করতে হবে। এ রকম আরও কিছু প্রস্তাবণা রয়েছে। একদম নীচে একটি সাক্ষর ও সিল রয়েছে। তাতে লেখা &#8211; আহ্বায়ক- বাংলাদেশ আমজনতা পার্টি (বাপ)।<br />
প্রস্তবণাগুলো দেখে আমার চোখে বিস্ময় ঝরতে শুরু করেছে। আমি আর বাকরুদ্ধ থাকতে পারলাম না। চিৎকার করে উঠলাম &#8211; লেখক সালা তুই মরবি। আমার চিৎকারে তানিয়া চমকে উঠলেন। চালক ব্রেক কষে গাড়ি থামিয়ে পিছনে তাকাল। আমি লজ্জা পেয়ে তারাতারি বললাম &#8211; স্যরি।<br />
ইশারা পেয়ে চালক আবার গাড়ি চালু করলে তানিয়া জানতে চাইলেন &#8211; কোনো সমস্যা সাধন?<br />
বললাম &#8211; সমস্যা মানে, এই যে এখানে দেখেন, বলে আমি পেপারটির নীচে দিকে শেষ দুটি প্রস্তাবণা দেখালাম। সেখানে লেখা &#8211; একটি জেলায় অন্য অনেক সমিতি রয়েছে, থাকবে। এ সব সমিতি ইচ্ছে করলে তাদের সকল সদস্য নিয়ে এই সমিতির সদস্য হতে পারবে। সেক্ষেত্রে সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক যৌথভাবে চুক্তি সাক্ষর করবেন ও তাদের সকল সদস্যের মাথাপিছু হিসেব করে মাসিক ফি দিয়ে যাবেন। সাধারণ যেকোনো সদস্য যখন তখন সমিতি ফাণ্ডের হিসেব চাইতে পারবে। সমিতি ফাণ্ডের টাকা কোনো ভাবেই সুদের উপর ধার দেয়া বা ছোট কোনো কাজে ব্যয় করা যাবে না। মনে রাখতে হবে এ টাকার উপর ই গড়ে উঠবে একটি শিল্প প্রতিষ্ঠান যা এই জেলার বেকারত্ব দূর করবে।<br />
এরপর আমি তানিয়াকে নীচের সীল ও সাক্ষর দেখালাম। বললাম তানিয়া আমরা একটি রাজনৈতিক দলের সাথে যুক্ত হয়ে গেছি। এই সমিতি সেই দলেরই একটি শাখা মাত্র। দেশের সব জেলাতেই এ রকম একই নামে সমিতি তৈরি হচ্ছে এবং নিশ্চয়ই এর প্রধান কার্যালয়টি রাজধানীতে। এটি মূলত বাংলাদেশ আমজনতা পার্টি (বাপ)-এর নিয়ন্ত্রণে থাকবে। ঠিক যেমনটি আওয়ামী লীগ বা বিএনপির বিভিন্ন অঙ্গসংগঠন রয়েছে, তেমনটি।<br />
তানিয়া &#8211; কি বলছেন? এটা সত্যি হলে আমাকে বা আপনাকে কেন এর সঙ্গে যুক্ত করবে। আমার বাবা সরকার দলের সাংসদ। আপনাকে না হয় মানা যায় আমাকে?<br />
সাধন &#8211; আপনার বাবা সাংসদ হলেও আপনিতো কোনো রাজনৈতিক দলের সংগে যুক্ত নন, হয়তো তাই।<br />
তানিয়া &#8211; আপনি জানেন না তাই এ কথা বলছেন। আমি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয়া মহিলা লীগের গুরুত্বপূর্ণ পদে আছি এবং ওরা তা জেনেই আমাকে নির্বাচন করেছে। তাছাড়া আপনি হয়তো লক্ষ্য করেননি যে ওদের নীতিমালায় বলা আছে- এই সৎ লোকেরা ভোটের মাধ্যমে তাদের যোগ্য নেতৃত্ব তৈরি করবে।’ অর্থাৎ নির্বাচিত এই নেতৃত্ব যদি কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য হয়, তাতেও ক্ষতি নেই।<br />
সাধন &#8211; বিষয়টা আমার কাছে সত্যি বিস্ময়কর লাগছে তানিয়া জ্বী। ওদের নীতিমালা অনুযায়ী অন্য রাজনৈতিক দলের সদস্যরা যদি এ সমিতির সদস্য হতে পারে তাহলেতো এটা আর যাই হোক কোনো রাজনৈতিক দলের শাখা নয়। কিন্তু কেন্দ্রিয় একটা নিয়ন্ত্রণ না থাকলে এটির কার্যক্রম পরিচালিত হবে কীভাবে? এটা একটা উদ্ভট চিন্তা বলে মনে হচ্ছে আমার। আর এরকম উদ্ভট চিন্তা একজনই করতে পারে, সে হচ্ছে আমার বন্ধু ও স্যালক। যে বাপ নামে একটা উপন্যাস লিখে নিজেকে কেউকেটা ভাবতে শুরু করেছে।<br />
ঠিক এমন সময় তানিয়ার মুঠোফোনটি বেঁজে উঠল। কারো সাথে কথা বললেন তিনি। আমি কথার ধরণ ও কয়েকটি নাম শুনে বুঝতে পারলাম সাথী নামের কেউ ফোন করেছে এবং আমাকেই খুঁজে বের করার জন্য বারবার অনুরোধ করছে। হঠাৎ করেই সাথীকে চিনতে পারলাম আমি। লেখকের প্রেমিকা বা হবু স্ত্রী’র নাম সাথী। একবার দেখা হয়েছিল। ফোন রেখে তানিয়া খুব চিন্তিত হয়ে পরলেন। বললেন &#8211; এখন আমি বুঝতে পারছি, আপনি কেন একটু আগে ওভাবে চিৎকার করে উঠলেন। ঠিকই বলেছেন, এ সবের পিছনে লেখক আর বাপ নামের উপন্যাসটাই কাজ করছে। আমি না চিনলেও আপনার বন্ধু লেখক মশাই আমাকে চেনেন। কারণ সাথী আমার স্কুল ও কলেজের বান্ধবী, ঢাকায় গেলে আমি ওর সাথেই বেশি সময় কাটাই। সাথীও আপনার বন্ধুকে নিয়ে খুব দুঃশ্চিন্তায় আছে। ওর এখন আপনার সাহায্য দরকার। আমাকে বলেছে, যেভাবে হোক আপনাকে খুঁজে বের করে আমি যেন ঢাকায় পাঠিয়ে দেই। আপনি লেখককে ফিরিয়ে দেয়ার পর থেকেই নাকি সে বিমর্ষ হয়ে আছে। কারো সাথে, এমনকি সাথীর সাথেও কথা বলছে না। একা একা কি সব বিরবির করছে।<br />
সাধন &#8211; কিন্তু এদিকে এই সমিতির কি হবে? এরাতো আমাদের বিপদে ফেলে দিয়েছে। কোনো রকম আলাপ আলোচনা না করেই আমাকে সাধারণ সম্পাদক করে দিয়েছে। আমি আসলে ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না। তাছাড়া আমিতো ঢাকায চলে যাবার জন্যই আজ বের হয়েছি। জানি ওর কাছে গেলে সহজে আর ফেরা হবে না। তাই সব কিছু গুছিয়ে নিতে যাচ্ছিলাম।</p>
<p>তানিয়াদের বাড়ির সামনে গাড়ি ব্রেক করেছে। দু’জনের মনোযোগ একে অপরের প্রতি থাকায় গাড়ি ব্রেক করতেই আমরা ভারসাম্যহীন হয়ে পরে যাচ্ছিলাম, দু’জনই দু’জনকে ধরে ফেললাম। বিষয়টা দৃষ্টিকটু হলেও আত্মরক্ষার কারণে ক্ষমার যোগ্য। তাই অনেকটা জড়তা নিয়েই গাড়ি থেকে নামলাম। তানিয়া জ্বীর পিছু নিয়ে হেঁটে এলাম বসার ঘরে। দোতলা বাড়িটির বসার ঘরে রাখা সুন্দর দু’জোড়া সোফা ছাড়া আর কিছু আমার নজরে এল না। অনেকক্ষণ আমাদের কারো মুখে কথা ছিলনা। তানিয়া-জ্বী নিরবতা ভাঙলেন &#8211; দেখেন সাধন আমি সরাসরি কথা বলতে পছন্দ করি, তাই সরাসরি বলছি, আমার কথার ধরণ আপনার পছন্দ না হলে সরাসরি বলে দেবেন। এতোদিন আপনি বেচলর ছিলেন, তাই কোথাও আপনার যাবার প্রসঙ্গ এলেই ভেবে বসেন &#8211; সারা জীবনের জন্য যেতে হচ্ছে। আমাদের এখান থেকে ঢাকা মাত্র ছয় ঘন্টার পথ। আপনার যে কাজ, তাতে দু’দিন পর ঠিকই ফিরে আসতে পারবেন, প্রয়োজনে আবার যেতেও পারবেন। এই মূহুর্তে লেখকের পাশে আপনাকে দরকার, তাই আমিও আমার বান্ধবীটার ভালোর জন্য আপনাকে যেতে দিচ্ছি। মনে রাখবেন, আগে আপনার পিছু টান ছিল না, আজ আছে। বলেই তানিয়া লজ্জায় লাল হয়ে উঠলেন। দ্রুত উঠে ভিতর ঘরে চলে গেলেন। কাজের লোককে ডেকে টেবিলে খাবার দিতে বললেন। এমন সময় আবার বেজে উঠলো তানিয়ার মুঠোফোন &#8211; হ্যালো<br />
ও প্রান্তের কথা শোনা গেল না, একটু পরই তানিয়া এসে ফোনটা আমার হাতে দিল। আমি কানে ঠেকাতেই &#8211; ও প্রান্ত থেকে উচ্ছ্বসিত গালির ঝড় বইতে শুরু করলো, তারপর লেখক সালা বলল &#8211; ঢাকায় আসতে হবে না, আমার ছোট বোনটার কাছেই থাক সালা, আমরাই আসছি। তোদের ওখানেই প্রথম বাপ-এর মিটিং শুরু হচ্ছে। জেলার সব ছাত্র-ছাত্রী, শিক্ষকসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ী সমিতির নেতৃবৃন্দ কাল সকালে তোদের গ্রামে জড়ো হচ্ছে। তোদের দুজনকেই তাদের বুঝাতে হবে আগামীর পথটি। আমি সাথীকে নিয়ে আজ রাতেই পৌঁছে যাব। আর হাঃ , সব রাজনৈতিক দলের হেড অফিস ঢাকা কেন্দ্রিক হলেও বাপ এর হেড অফিস গ্রাম কেন্দ্রিক। বুঝলি উজবুক?<br />
আমি খুশিতে আটখানা হয়ে তানিয়াকে প্রায় জড়িয়ে ধরলাম। আমার মন থেকে একটা বোঝা যেন নেমে গেল। আমার দু’বাহুতে বন্দী তানিয়া অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে আমার চোখে &#8211; সাধন, এখন যদি তুমি এই বাঁধন ছেড়ে দাও, আমি কিন্তু পরে যাব।<br />
আমার হাতের উপর আমি ওর শরীরের ভর টের পাচ্ছিলাম। ছেড়ে দিলেই একবারে মাটিতে চিৎ হয়ে পরে যাবে তানি, একবার মনে হল ছেড়ে দিয়ে একটু মজা করি, পরক্ষণেই মন না বলে উঠল, এই মেয়েটিকে যে একটুও ব্যাথা পেতে দেব না আমি। আমার হাতের বাঁধন আরও শক্ত হল টের পেয়ে নিজেকে আমার বুকে এলিয়ে দিল তানিয়া। মুখে বলল &#8211; আমি তোমার সম্পর্কে সব জানি, সব। কিন্তু তুমি আমার কথা জান না।<br />
ওর মুখ চেপে ধরে বললাম &#8211; একদম যে কিছু শুনি নাই, তা ঠিক না। কিছু টা যা জানি তা খুব একটা ভালো কিছু না, তাই আর জানতে চাই না। অতীত থেকে আমরা শিক্ষা নেব, অতীত নিয়ে পথ চলবো না। (সমাপ্ত)</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://shahittabazar.com/%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%82%e0%a6%b2%e0%a6%be%e0%a6%a6%e0%a7%87%e0%a6%b6-%e0%a6%86%e0%a6%ae%e0%a6%9c%e0%a6%a8%e0%a6%a4%e0%a6%be-%e0%a6%aa%e0%a6%b0%e0%a6%bf%e0%a6%b7%e0%a6%a6-%e0%a6%ac%e0%a6%be/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
			</item>
		<item>
		<title>ধার্মিক (ধারাবাহিক উপন্যাস)</title>
		<link>https://shahittabazar.com/%e0%a6%a7%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%ae%e0%a6%bf%e0%a6%95-%e0%a6%a7%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%b9%e0%a6%bf%e0%a6%95-%e0%a6%89%e0%a6%aa%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%af/</link>
					<comments>https://shahittabazar.com/%e0%a6%a7%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%ae%e0%a6%bf%e0%a6%95-%e0%a6%a7%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%b9%e0%a6%bf%e0%a6%95-%e0%a6%89%e0%a6%aa%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%af/#respond</comments>
		
		<dc:creator><![CDATA[আরিফ আহমেদ]]></dc:creator>
		<pubDate>Fri, 20 Sep 2013 11:18:44 +0000</pubDate>
				<category><![CDATA[উপন্যাস]]></category>
		<category><![CDATA[সাহিত্য]]></category>
		<guid isPermaLink="false">http://shahittabazar.com/?p=271</guid>

					<description><![CDATA[<p>প্রথম পর্ব</p> <p><em>(পর্দা বা বোরখার ব্যবহার সম্পর্কে আপনার বক্তব্য কি? </em><br /> <em>আচমকা এ জাতীয় প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে ঈমাম সাহেবকে বিব্রত করে দিতে চাইলেন সাইখুল আশরাফ হুজুরের ভক্তরা। এর আগে</em></p><span><div class="readmore"><a href="https://shahittabazar.com/%e0%a6%a7%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%ae%e0%a6%bf%e0%a6%95-%e0%a6%a7%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%b9%e0%a6%bf%e0%a6%95-%e0%a6%89%e0%a6%aa%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%af/">...বিস্তারিত &#8594;</a></div>]]></description>
										<content:encoded><![CDATA[<div id="attachment_272" style="width: 310px" class="wp-caption aligncenter"><a href="http://shahittabazar.com/wp-content/uploads/2013/09/Painting-by-Rabindranath-Tagore.jpg"><img decoding="async" aria-describedby="caption-attachment-272" class="size-medium wp-image-272" alt="Painting-by-Rabindranath-Tagore" src="http://shahittabazar.com/wp-content/uploads/2013/09/Painting-by-Rabindranath-Tagore-300x196.jpg" width="300" height="196" srcset="https://shahittabazar.com/wp-content/uploads/2013/09/Painting-by-Rabindranath-Tagore-300x196.jpg 300w, https://shahittabazar.com/wp-content/uploads/2013/09/Painting-by-Rabindranath-Tagore.jpg 720w" sizes="(max-width: 300px) 100vw, 300px" /></a><p id="caption-attachment-272" class="wp-caption-text">অংকন : রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর</p></div>
<p><strong>প্রথম পর্ব</strong></p>
<p><em>(পর্দা বা বোরখার ব্যবহার সম্পর্কে আপনার বক্তব্য কি? </em><br />
<em>আচমকা এ জাতীয় প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে ঈমাম সাহেবকে বিব্রত করে দিতে চাইলেন সাইখুল আশরাফ হুজুরের ভক্তরা। এর আগে তারা এরফান এমপিকে জব্দ করতে অনেকবার চেষ্টা করেছেন, ইমামতি ফেলে রেখে একজন অসুস্থ বিধর্মীকে হাসপাতালে রেখে আসার দায়ে অভিযুক্ত এরফান এমপিকে তারা ইমামতির জন্য অযোগ্য ঘোষণা এবং যারা এরফানের পিছনে নামাজ আদায় করবে তাদেরও মুরতাদ ঘোষণা করেছেন। কিন্তু সরকারের সমর্থন থাকার কারণে এবং এলাকার মানুষের ভালবাসা থাকায় ইসলামী এ গ্রুপগুলো তার কোনো ক্ষতি এ যাবৎ করতে পারেনি।</em><br />
<em>অনেকদিন পর আজ তারা সুযোগ পেয়েছেন, ‘যত মত তত পথ’ নামের সরাসরি একটি অনুষ্ঠানে স্যাটেলাইট মিডিয়ার সামনে এরফান এমপিকে নাজেহাল করার। দর্শকের সদ্মবেশে তাই তাদের প্রতিটি প্রশ্নই আক্রমাত্বক।</em><br />
<em>সাইখুল আশরাফ হুজুরের ভক্তরা যে এরফানকে সহ্য করতে পারেন না, এটা এরফান জানতো, কিন্তু তারা যে তাকে এতোটা ঘৃণা কওে, তা এই প্রথম বুঝতে পারে এরফান। </em><br />
<em>মৃদু হেসে এরফান বলেÑ পর্দাÑ যদি আপনারা বোরখাকে পর্দা বলেন তাহলে আমি বলবোÑ ধর্মীয় ভাবাদর্শে যারা বিশ্বাসী তারা প্রত্যেকেই পর্দাপ্রথাকে গুরুত্ব দেন। পুরুষ-রমণী প্রত্যেকরই পর্দায় থাকা উচিৎ। শুধু নারীই পর্দায় থাকবেন আর পুরুষরা উদোম গায়ে ঘুরে বেড়াবেন আমি এটার পক্ষপাতি নই। তবে সকলের ক্ষেত্রেই মনের পর্দাটাকেই আগে শক্তিশালী করতে হবে। মা বোনদের জন্য বাহ্যিক যে পর্দা রয়েছে সেটাকে বোরখা বলি। প্রচ-ভাবে ধর্মীয় একজন নারী নির্দিধায় বোরখা ব্যবহার করেন, কিন্তু আধুনিক যুগে এর ব্যবহার প্রায় উঠে গেছে। আর প্রচ- গরমে বোরখার ব্যবহার সত্যি খুব কষ্টদায়ক। তারপরও আমি বলবো বোরখা পড়ে একজন মেয়ে হাজারো পুরুষের সামনে যতটা স্বাচ্ছন্দে চলতে পারবেন, ততটা স্বাচ্ছন্দে অন্যকিছু পড়ে চলতে পারবেন না। কিন্তু একজন পুরুষ যদি তার মনের উপর পর্দা তৈরি করতে না পারেন তাহলে শত বোরখা পড়েও কিন্তু একজন নারী ঐ পুরুষটির কুচক্ষু থেকে নিজেকে রক্ষা পারবেন না।</em><br />
<em>আপনি নারীর সাথে পুরুষের তুলনা করছেন?</em><br />
<em>কেন করবোনা যুক্তি দিন, ইসলাম ধর্ম সবসময়ই নারীকে সম্মানের আসনে, মর্যাদার আসনে বসিয়েছে। আপনাদের-ই হুজুরের বক্তব্যে এর অসংখ্য প্রমাণ পাবেন। কোরাণে কী শুধু নারীদেরই পর্দায় থাকতে বলা হয়েছে?</em><br />
<em>আপনি মসজিদের টাকা, আল্লাহর ঘরের জন্য দানকৃত টাকায় হিন্দু মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন-এটা যে কতটা নাফরমানী কাজ আপনি জানেন? এর জন্য আপনাকে অবশ্যই শাস্তি পেতে হবে। হঠাৎই এভাবে ক্ষুব্দ হয়ে উঠলেন সাইখুল আশরাফ হুজুরের ভক্তরা। তাদের সঙ্গে আরো আছেন আসমত আলী পীর সাহেবের দরগার কিছু মাদ্রাসা ছাত্র। তাদের ক্ষোবের বহিঃপ্রকাশ ঘটছে এখন এই টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে। দেশজুড়ে সরাসরি লাইভ সম্প্রচার চলছে- এই ‘যত মত তত পথ’ নামের ইসলামিক অনুষ্ঠান পর্বে। অবস্থা দৃষ্টে মনে হচ্ছে এরফান এমপিকে অপছন্দ করে এমন সকল মুসল্লিকেই নিমন্ত্রণ করা হয়েছে এ পর্বে।</em><br />
<em>আপনারা শান্ত হউন। উত্তেজিত মুসল্লিদের উদ্দেশ্যে এরফানের এ গম্ভীর উচ্চারণ। মুহূর্তেই সবাই চুপ। এরফান বলেনÑ আপনারা এ প্রশ্নের উত্তর আগেও পেয়েছেন। আমি আবারও বলছি। আমি আপনাদের মত কোন ধর্মীয় দীক্ষা নিয়ে আসিনি। আরবী ভাষায় আপনাদের মত পারদর্শী নই। কিন্তু একজন মানুষ হিসেবে আমি এ টুকু বুঝি যে, মানুষের মঙ্গলের জন্য, উপকারের জন্য ধর্ম তৈরি হয়েছে। মানুষের মাঝে মানুষের গভীর বন্ধুত্ব, ভালবাসা তৈরিই ধর্মের প্রধান উদ্দেশ্য। পৃথিবীর সব ধর্মেরই মূল উচ্চারণ হচ্ছে শান্তি। শুধু মসজিদ বা মন্দির নয়, পৃথিবীতে যতরকম উপসনালয় আছে এবং সে সব উপাসনালয়ে যত দান ক্ষয়রাত হচ্ছে তার সবই স্রষ্টা বা আল্লাহর নামেই হচ্ছে। আল্লাহ কী কখনো ঐ টাকা বা সম্পদ নিজের জন্য ব্যবহার করেন? ঐ টাকায় আমরা যেটা করি তা হচ্ছে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হয়ত মসজিদের বিভিন্ন সংস্কার বা ইমামের বেতন ইত্যাদি কাজে ব্যবহার করি। কিন্তু আমাদের আহঞ্জিবাড়ির মসজিদের এ জাতীয় কোন সংস্কার বা ইমাম সাহেবের বেতন প্রয়োজন হয়না। তাই আমি সে টাকা মানুষের উপকারে ব্যবহার করি। সে মানুষটা হিন্দু না মুসলমান তা দেখার প্রয়োজন আমার নেই। এতে আপনারা ক্ষুব্দ হন বা আমাকে মুরতাদ বলেন আমি পরোয়া করিনা। আপনারা একটা বিষয় কেন বোঝেন না, ইসলাম ধর্ম শান্তির ধর্ম, এক আল্লাহর ইবাদত যদি সবাই করেন তাহলে আপনাদের মধ্যে এত মতভেদ কেন? কেন ছোট্ট একটি জেলা শহরে এতগুলো ইসলামী দল বলতে পারেন? আমি আরবী জানিনা, তবে শুনেছি- আপনাদেরই নেতারা বিভিন্ন মাহফিলে ওয়াজ করেছেন, বিদায় হজ্বের মহত্ব বলেছেন, হুদায়বিয়ার সন্ধির কথা বলেছেন। আমি আপনাদের অনুরোধ করবো বিদায় হজ্বে হযরত মোহাম্মদ মোস্তফা (সাঃ)-এর বাণীগুলো আবার শুনুন, বুঝুন। তারপর ধর্ম পালন করুন। হুদায়বিয়ার সন্ধি দিয়ে নবীজী কী বুঝাতে চেয়েছেন ভালো করে ভেবে দেখুন।  একটি শিশুকে নবীজী মিষ্টি খেতে নিষেধ করবেন, সেইজন্য তিনি কী করেছিলেন তা বারবার স্মরণ করুন, দেখবেন আপনাদের সব প্রশ্নের উত্তর আপনারা পেয়ে গেছেন। আর একটা কথা&#8230;&#8230;.</em><br />
<em>আচমকা বিকট শব্দে কেঁপে উঠল ময়দান। কেঁপে উঠল টিভি স্ক্রীণ ও সারা দেশ। হৈ-হুল্লোর, চিৎকার আর আর্তনাদে আকাশ বাতাস একাকার হয়ে গেল। দেশের সব টেলিভিশন চ্যানেল এ তখন একটাই ছবি একটাই প্রশ্ন &#8211; কে এই এরফান ইমাম এমপি?)</em></p>
<p>এক</p>
<p>হে স্রষ্টা তুমি, পথ ভ্রষ্টা আমাদের ক্ষমা করো।।<br />
জ্বালো সত্য পিদীম জ্বালো, জ্বালো মঙ্গলশিখা জ্বালো ।<br />
আমাদের মনের গহীনে লুকানো অন্ধ কোঠায়<br />
পাপেরা সেখানে সাঁতার কাটে আর বড় হয়।।<br />
তুমি স্রষ্টা, সব দ্রষ্টা পাপেদের বিনাস করো,<br />
পাপীদের ক্ষমা করো।<br />
জ্বালো সত্য পিদীম জ্বালো, জ্বালো মঙ্গলশিখা জ্বালো।</p>
<p>ফজরের নামাজ শেষে এভাবেই প্রার্থনাসঙ্গীত চলছিল আহঞ্জীবাড়ির মসজিদে। হঠাৎ বাহিরে কান্নার শব্দ পেয়ে ঈমাম সাহেব দ্রুত প্রার্থনা শেষ করলেন। আমীনÑ বলে ঈমাম সাহেবের পিছন পিছন মুসুল্লীরাও বেরিয়ে এলেন মসজিদ থেকে। মুসুল্লী বলতে এই আহঞ্জীবাড়ির বাসিন্দারাই জনাকয়েক। বাহিরের বা আশেপাশের বাড়ির লোকেরা এ মসজিদে আসেনা। কারণ অনেক। এখানে নাকি সব ইসলাম বিরোধী, আল্লাহ&#8217;কে নারাজ করার কায়কারবার চলছে। এটা যদি গ্রামের চেয়ারম্যান বাড়ির মসজিদ না হতো তাহলে&#8230;&#8230;.। থাক! সে অনেক কথা, পরে সে বিষয়ে শোনা যাবে, আগে এই কান্নার উৎস কী সেটা জানাই প্রধান বিষয়।<br />
মুসুল্লীরা সবাই নামাজ শেষে বাহিরে এসে কান্নারত দু’জন মহিলা-পুরুষকে ঘীরে ধরেছে। তাদের সাথে তিন-চারটে বাচ্চাও কাঁদছে। মুসুল্লীরা যতই জানতে চায়- কী হয়েছে? ততই কান্নার বেগ বাড়ছে তো বাড়ছেই। তাদের কান্নার একটাই সুর ধ্বনিত হচ্ছেÑ ও চেয়ারম্যানসাব আমাগো বাঁচান। আমরা এহন কই যামু? কী খামু? আমাগোরে বিষ আইনা দেন, আমরা খাইয়া মরি। ও চেয়ারম্যানসাব গো আমাগোরে বাঁচান।<br />
ভিড়ের মধ্যে এবার ভরাট মিষ্ট একটি কণ্ঠ ধ্বণিত হলÑ এই তোমরা কান্না থামাও,  কী হয়েছে আগে বল, তারপর দেখি তোমাগোরে বিষ দিমু না অন্যকিছু।<br />
সাথে সাথে কান্না থেমে গেল।<br />
ভিড় একপাশে সরে গেল। কেউ একজন একটা চেয়ার এনে পেতে দিল মসজিদের সামনের দাওয়ায়। ৩৫ কী ৩৬ বয়সের একজন যুবক এসে সে চেয়ারটি সরিয়ে দিয়ে মসজিদের দুয়ারের পাদানীতে বসলো। সৌম্যসুন্দর সে যুবকের মুখাবয়ব। ক্লীনশেভ করা, সে মুখে খেলা করছে যেন কোনো দৈবজ্যোতি। পোড়খাওয়া তামাটে উজ্জল গায়ের রং, লম্বায় প্রায় ৫ফিট ৯ ইঞ্চি হবে। কথা বললে মনে হয় যেন মাউথপিস হাতে নিয়ে মাইকে কথা বলছে, এমনই ভরাট তার কণ্ঠস্বর। সে যখন আযান দেয়, শত্রুরাও তখন থমকে যায়, মনদিয়ে শোনে আযানের সুর। নিজের অজান্তেই বড় বড় আলেমÑ যারা ফতোয়া দিয়ে আহঞ্জীবাড়ির মসজিদে জুম্মার নামাজ আদায়ের উপর নিষেধাজ্ঞা জারী করেছেন, তারাও বলে উঠেন আহ্! কী দারুণ, একেই বলে আযানের সুর। ইস, বাংলাদেশের সব জায়গায় যদি এমন মিষ্টি সুরের আযান হত!<br />
এই কণ্ঠ ধ্বণিত হওয়া মাত্রই পিনপতন নিরবতা নেমে এল আহঞ্জীবাড়ির মসজিদ সীমানায়। পাখীদেরও বুঝি এখন শব্দ করা নিষেধ। তাই এতক্ষণ যে সব পাখী কিচির মিচির শব্দে ভোরের আগমন ঘোষণা করছিল সেগুলোও যেন চুপ হয়ে গেল।<br />
Ñ হ্যাঁ সুনীল কাকু বল কী হয়েছে? কেন বউ পোলাপান নিয়ে এই ফজরের সময় মসজিদের কাছে এসে কান্না করছো?<br />
সুনীল দাস তখনো ফুঁফিয়ে কান্না চাঁপার চেষ্টা করছে, ওর হাতে-গায়ে কালো কালো কালির ছোঁপ, বউটির শাড়ির বেশ কয়েক জায়গায় পোড়া, কপালের খানিকটা কেটে রক্ত শুকিয়ে জমাট বেধে আছে। হাতে পোড়াক্ষত। বাচ্চাগুলোর চোখেমুখে ক্ষুদা আর কষ্টের ছাপ। ক্রমশ সকালের আলো যতো পরিস্কার হচ্ছে ততই স্পষ্ট হচ্ছে বিভৎস একটা চিত্র।<br />
সুনীল নয়, কথা বলে উঠল সুনীলের বউ। তুমি গ্রামের চেয়ারম্যান। গরিবের মা-বাপ। বিপদে তোমরার কাছে আসমু না তো কই যামু কও বাপ? বলেই আবার কান্না চাঁপার চেষ্টা, এবার সুনীল বলে উঠলÑ পরশুদিন মাঝরাইতে কে বা কারা যেন আমাগোর ঘর জ্বালাইয়া দিল। বউ বাচ্চা লইয়া পুইড়াই মরতাম, যদি গরুঘর আগে না জালাইয়া বসতঘরে আগে আগুন দিত। গরুগুলোর ডাকাডাকিতে ঘুম ভাউঙ্গা গেল। দেখি দাউ দাউ কইরা আগুন জ্বলছে। কোনমতে জানডা বাচাঁইছি। ঘর-গৃহস্ত কিছু বাঁচে নাই, গরুগুলোর কি হইছে কইবার পারমু না। আশেপাশের লোকজন ছুইটা আইল। আগুন নেভানোর চেষ্টাও করেছে। লাভ হয় নাই।<br />
পাশ থেকে একজন মুরুব্বী ফোঁড়ন কাটলেনÑ এ তো দুদিন আগের কথা। শুনলাম তোমরা বিচার চাইতে শহরে তোমাগো সমিতিতে গেছ। তা এখন আবার চেয়ারম্যানের&#8230;?<br />
কাকা? আচমকা বাঁধা পেয়ে থেমে গেলেন মুরব্বী কাকা। তার কথা আর শেষ হল না।<br />
সুনীল ব্যাখ্যা দিলÑ আমরা নিম্নজাতের হিন্দু। তাই কী করমু বুঝবার পারি নাই, প্রথমে আমাগের সংঘ নেতাদের জানাইলাম, তাগোর আচরণ ও কথাবার্তা শুনে তেনারা কিছু কইরবার পারবো বইলা মনে হইল না। উল্টো তাগোর কাছে যাইয়া ছেলেমেয়েরা দুবেলা কিছু খাইবারও পারে নাই। তাই আবার তোমার কাছে ছুইটা আইছি বাজান, তুমি একটা ব্যবস্থা কইরা দেও।<br />
যুবক বলতে শুরু করলেনÑ তোমাদের ঘরে কারা আগুন দিছে সে খোঁজ দু-একদিনের মধ্যেই জানা যাবে। যারা আগুন দিয়ে তোমাগো সর্বশান্ত করেছে, তারাই তোমাদের সবকিছু আবার আগের মত ফিরিয়ে দেবে। আমি আজ পঞ্চায়েতে তাদের সব নিয়ে ৫দিন সময় দেব, এই পাঁচদিন তোমরা আহঞ্জীবাড়ির কাচারীঘরে থাকবে। নিজেরা রান্না করে খাবে। বাড়ির লোকেরা তোমাদের চাল-ডাল যা লাগে দিয়ে যাবে। কোনো অনিয়ম হলে আমাকে জানাবে। যাও, এখন তোমরা বিশ্রাম নাও।<br />
কাচারীঘরটি মূলত আহঞ্জীবাড়ির ঐতিহ্যের সাক্ষী। এখানে বসে এখনো বিচারাচার ও মেহমানদারীর কাজ পরিচালিত হয়। বাড়ির কোনো গৃহস্তের ঘরে বাড়তি মেহমান এলে তারা এখানে থাকেন। আবার মসজিদের বারান্দায় সকালবেলা বাচ্চাদের আরবী ও বাংলা শেখান যে মৌলভী সাহেব তিনিও থাকেন এই কাচারীঘরে। তাই স্বাভাবিকভাবেই হিন্দু পরিবারকে কাচরীঘরে জায়গা দেওয়া নিয়ে একটা গুঞ্জন উঠলো। গুঞ্জন তুললেন যুবকের বাবা এমাজউদ্দিন আহন স্বয়ং। তিনি বললেন- তোমার সব কাজে আমরা স্বায় দিচ্ছি বলে তুমি যা খুশি তা করতে পার না। কাচারীঘরে ওরা থাকলে মৌলভী সাহেব কোথায় যাবেন?<br />
যুবক- আহ্ বাবা। আমাদের কাচারীঘর কী এত ছোট? যেখানে একসাথে জনা পঞ্চাশেক লোক ঘুমাতে পারে, সেখানে মাত্র একজন লোকের জন্য পাঁচজন লোকের জায়গা হবে না।<br />
এ কথায় বাবার স্বর একটু নরম হল- না না আমি জায়গার কথা বলছি না, আমি মৌলভী সাহেবের দিকটায় ভেবে বলছি, ওখানেতো তার একটা খাট আর একটা আলমিরা রয়েছে, কোন পার্টিশনতো নেই। এমনিতেই আমাদের মসজিদ নিয়ে দূর্ণামের শেষ নেই। তারউপর মৌলভী সাহেব যদি&#8230;..<br />
এমনসময় পাগড়িটুপি মাথায, চাপদাঁড়িতে ঢেকে থাকা মুখাবয়বের অনেকটা হাজী হাজী দেখতে একজন যুবক কথা বলে উঠলেন- মাপ করবেন কাকা সাহেব। আপনাদের মসজিদ যখন ইসলামী সংস্থা থেকে অবাঞ্চিত ঘোষিত হয়েছে তারপরই কিন্তু আমি সব জেনে বুঝে এ মসজিদে মোসাহেব হয়ে এসেছি। আমি জানি এখানে এরফান সাহেব কিছু ভিন্নধারার প্রচলন ঘটাবেন এবং আমিও তার সাথে আছি, সবসময়। তাতে যদি আলেম সমাজ আমাকেও অবাঞ্চিত করে আমার কিছু যায় আসে না। সত্যিকার ইসলামের শিক্ষাই হচ্ছে আগে মানুষের হেফাজত, তারপর আল্লাহর ইবাদত। সুনীল কাকু ছাড়াতো আমিও অচল। এই যে আমার এত সুন্দর দাঁড়িমোচ দেখছেন এটা ঐ সুনীল কাকার হাত পড়েছে বলেই না এত সুন্দর হয়েছে। তার সাথে একত্রে থাকায় আমার কোন আপত্তি নাই। চাইলে কাকা তুমি তোমার বউ সন্তান নিয়ে খাটটা ব্যবহার করো, আমি এ পাঁচদিন মসজিদের বারান্দায় কাটিয়ে দেব।<br />
এ কথায় সবাই হেসে উঠলেন।<br />
জয় হোক বাবা তোমার, ভগবান তোমাদের ভাল করবেন। বলতে বলতে সুনীল আবার কান্না শুরু করলেন। বউ, সন্তানদের নিয়ে সুনীলকে কাচারীঘরে তুলে দিয়ে ঈমাম সাহেব অর্থাৎ এরফান চেয়ারম্যান চললেন ভিতর ঘরে, তার নিজের ঘরে।</p>
<p>চাঁপদাড়িতে অনেকটা হাজী হাজী দেখতে এই মৌলভী সাহেবের নাম ফুয়াদুল ইসলাম চৌধুরী। ডাকনাম ফুয়াদ। এ গ্রামের চেয়ারম্যান এরফান সাহেবের বাল্যবন্ধু তিনি এবং তিনি আসলেই একজন হাজী। যদিও নামের আগে তিনি তা ব্যবহার করেন না। একবার দু’বার নয় তিনি সাত সাতবার হজ্ব করেছেন। আসলে দীর্ঘ এগারটা বছর তার কেটেছে ইরাক, ইরান, মিশর ও সৌদী আরবের বিভিন্ন অঞ্চলে। ইসলাম নিয়ে গবেষণার জন্যই মূলত তার এ সৌদী আরবে অবস্থান। আর এ জন্য এরফানই তাকে উৎসাহ দিয়েছেন। ঘটনার সুত্রপাত যদিও ভিন্ন অঞ্চলে, ভিন্ন প্রেক্ষাপটে। আজকের চেয়ারম্যান ও পেশঈমাম এরফান আহন তখন নিতান্তই কিশোর।  ফুয়াদও তখন সবে ১২ বছরে পা দিয়েছে। এই অল্প বয়সে ১৪ বার কোরাণ শরীফ খতম দিতে পারার গর্বে গর্বিত ফুয়াদ প্রথম পরিচয়েই ঢাক্কা খেল এরফানের কথায়Ñ তুমি ১৪ বার কেন, হাজার বারও যদি কোরাণ শরীফ খতম দাও তাতে কারো কোন উপকার হবে না।<br />
এ কথায় অনেকটা ক্ষেপে যায় ফুয়াদÑ জানতে চায় কেন? কেন হবে না? আমার, আমার বাবা-মায়ের তো অনেক সোয়াব হচ্ছে।<br />
এরফান বলেছিল- কচু হচ্ছে। সোয়াব কী জিনিষ, তুমি কী তা দেখতে পারো? তুমি কী পড়লে, কেন পড়লে? যা পড়েছো, তা ভালো না মন্দ এটা যদি তুমি বলতেই না পারো তাহলে এই পড়া তোমার কী উপকারে এল? কোন উপকারেই যদি না এল, তাহলে এখান থেকে কী সোয়াব তুমি আশা কর?<br />
প্রশ্নকটি ছুড়ে দিয়েই কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছিল কিশোর এরফান। জানো বন্ধু, আমাদের মসজিদের ঈমাম সাহেবকে এই প্রশ্ন করেছিলাম বলেই আমাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এখন হয়তো তোমরাও তাড়িয়ে দেবে, কিন্তু একটু ভেবে দেখতোÑ আমি যা বুঝিনা, সেটা শিখে, মুখস্থ বলে আমার কী লাভ?<br />
এরপরই মূলত এরফানের সাথে বন্ধুত্ব ক্রমশ গভীর হয় ফুয়াদের। একইসাথে পড়াশুনায় মনোযোগী হয় এরফান ও ফুয়াদ। একইসাথে ফুয়াদ বাংলা ও আরবীতে পড়াশুনা চালিয়ে যায়। আর এরফান ওদের একটি রেষ্টুরেন্ট পরিচালনার পাশাপাশি ফুয়াদের কাছে বাংলাটা শিখে নেয়। দু’জনে ঐ বয়সেই একটা লক্ষ্য নিয়ে এগোতে থাকে। তারপর এরফানের পরামর্শে ইসলাম নিয়ে গবেষণা শুরু করে ফুয়াদ। ওরা দু’জনে মিলে প্রথমে বাংলা অনুবাদের কোরাণ শরীফগুলো সংগ্রহ করে। সেখানে অনেক কিছুই ওদের কাছে দুর্বোধ্য মনে হয়। অনেক ব্যাখ্যাই মনপূঃত হয় না ওদের।<br />
কোরাণশরীফ নাজিল হয়েছে মক্কার কোরাইশ বংশের ব্যবহৃত আরবী ভাষায়। তাই এরফানের দাবী আগে কোরাইশদের আরবীটা ভালো ভাবে রপ্ত করতে হবে। এরফান বলেÑ কোরাণকে সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান বলা হয়। তারমানে পৃথিবীর যাবতীয় জ্ঞান রয়েছে এই কোরাণে। অথচ আমরা যে ব্যাখ্যা পড়ছি সেখানে বেশিরভাগ অংশ জুড়েই শুধু ভয়-ভিতি প্রদর্শন করা আছে। আল্লাহ কোন ভয়ের শব্দ না। ভালবাসা আর শান্তির অনন্য একটি উচ্চারণ হচ্ছে- আল্লাহ্। কোরাণ-এর প্রকৃত মর্ম উদ্ধার করতে হলে প্রতিটি শব্দের সত্যিকার অর্থ উদঘাটন করতে হবে। আমাদের এই বাংলাদেশে যদি রাজশাহী, বরিশাল, খুলনা ও সিলেটে এক এক অঞ্চলের ভাষা এক একরকম হতে পারে তাহলে আরবী ভাষার ক্ষেত্রেও তা হতে পারে। তাই কোরাইশদের আঞ্চলিক আরবী জেনে তবেই কোরাণ নিয়ে গবেষণায় যাও। এটাই ছিল এরফানের একান্ত অনুরোধ। আর যে কারণেই দীর্ঘ এগারটি বছর বন্ধুকে ছেড়ে থেকেছে ফুয়াদ। ঘুরেছে মক্কা-মদিনা আর কাবা’র পথে পথে। দেখেছে, হেসেছে আর শিখেছে। জেনেছে যতটা ভুল চলছি আমরা তার চেয়েও অনেক বেশি ভুল পথে চলছে আজকের আরব জাতী। ইসলামের দেখানো পথ থেকে হাজারক্রোশ দূরে সরে এসেছে আজকের মুসলিম সমাজ। নিজেদের মধ্যে তৈরি করেছে হাজার হাজার বিভক্তি। এক আল্লাহরই ইবাদত যখন করবো, তখন কেন এত বিভক্তি? কিছুতেই এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পায় না ফুয়াদ ও এরফান।<br />
এ মুহূর্তে কাচারীঘরে সুনীল দাস পরিবারের বাচ্চাদের সামনে বিস্কুটের প্যাকেট বাড়িয়ে দিয়ে মৌলভী ফুয়াদ আর সুনীল দাস ব্যস্ত একটা পার্টিশন তৈরির কাজে। আপাতত রশি বেঁধে চাঁদর টানিয়েই পার্টিশনের কাজ ছাড়লো ওরা। যেহেতু সুনীলের বউ সাথে রয়েছে তাই এ পার্টিশন। তানা হলে সুনীলকে নিয়ে কোন চিন্তা ছিল না ফুয়াদের। বন্ধুকে সে জানে। খুব ভালো ভাবেই জানে। ও যখন বলেছে পাঁচদিনের মধ্যে সুনীল সমস্যার সমাধান হবে, তখন পাঁচদিনেই হবে।<br />
এদিকে একা পেয়ে সেই যে বকর বকর শুরু করেছে সুনীল কাকা, থামবার নাম নেই। তার বেশিরভাগ কথাই হচ্ছে এমপি সাহেবের বিরুদ্ধে। এমপি সাহেবই ইসলামী সংস্থাকে আহঞ্জীবাড়ির মসজিদের উপর খেঁপিয়ে তুলেছে। গ্রামের লোকদের উল্টাপাল্টা বুঝিয়ে এই মসজিদে নামাজ পড়তে নিষেধ করেছে। বলে কিনা এরফান চেয়ারম্যান বিদেশে খ্রিস্টানদের সাথে মিশেছে, চুক্তি করে এসেছে খ্রিস্টানদের ধর্ম এনে গ্রামের সব মুসলমানদেরও খ্রীস্টান বানিয়ে দেবে।<br />
: আহ্ কাকা থামোতো। কারো পিছনে কথা বলা ভালো নয় কাকা। তোমাদের ধর্মে কী এটা লেখা নেই?<br />
: থাকবেনা কেন বাবা, আছে। সব ধর্মে ভালো ভালো কথাই লেখা থাকে। আমরা সেগুলো মানলেতো।<br />
তয় কথা কী জানো বাবা, এই এরফান বাবাজী গ্রামে আসার পর থেইকাই গ্রামের মানুষগুলো সব কেমন ভালো হইয়া যাচ্ছিল। দেখলেনা চেয়ারম্যানী ইলেকশনে সবাই কেমন ওরেই ভোট দিল। আমরা অবশ্য দেই নাই, ভোট বেইচা দিছিলাম। নগদ টাকায় বেইচা দিছি বিরোধী পার্টির কাছে। আর এহন বলেই আবার কান্না শুরু করল সুনীল কাকা। এমন ভালো মানুষটারে ভোট দেই নাই অথচ হের দুয়ারেই&#8230;.।<br />
: থাক কাকা, এই সব কথা থাক। এখন তুমি কী করবা? হাটে যাইয়া বসতে পারবাতো?<br />
: না বাবা, খুর-কাচি কিছুইতো আর খুইজা লইতে পাই নাই। পোড়াবাড়ির মধ্যে খুজলে হয়তো পাইয়া যামু। তয়&#8230;.।<br />
: তোমার আর খুইজা কাজ নাই। এখন যাওতো, ঘাটে যাইয়া স্নান কইরা আসো। গায়েতো কালি ময়লার অন্ত নাই। নাপিত নাপিত গন্ধ আসতিছে।<br />
: এ কথায় হেসে দিল সুনীল দাস। নাপিতরে কও নাপিত নাপিত গন্ধÑ হাসাইলা বাবা।<br />
: আর হাসতে হবে না, তারাতারি যাও কাকা, সঙ্গে বাচ্চাদের নিয়ে যাও ওরাও বুঝি দুদিন স্নান করে নাই।<br />
: ঠিকই ধরছো বাজান, কিন্তু বাজান তুমি মৌলভী হইয়া যে বড় স্নান স্নান করতেছো? এতে তোমার পাপ হইবো না?<br />
: উহ্ কাকা যাও তো। অত পাপ-পূণ্যের বিচার তোমারে করতে হইবো না। যাও, এক্ষুনি আবার ভিতর থেইকা নাস্তা আইসা পরবো, খাইয়া তোমারে চেয়ারম্যান সাহেবের অফিসে যাইতে হইবো না?<br />
হহ হহ, যাই, বলে ব্যস্ত হলেন সুনীল কাকা।</p>
<p>ঘরতো নয যেন বিশাল একটি অট্টালিকা। এটাই এরফান আহন-এর ঘর। ওর দাদা-পরদাদাদের তৈরি স্মৃতি। সেগুন আর কড়াই কাঠের মিশ্রণে তৈরি দোতলা এই ঘরটিকে ছোটখাট রাজপ্রাসাদ বলাটাও অশোভনীয় হবে না। তবে পুরো বাড়িতে কিন্তু কোন ইটার ছোঁয়া নেই। সবই কাঠ আর টিন দিয়ে ঘেরা। বিশাল বড় এই আহঞ্জীবাড়ি। পুরো বাড়িতে প্রায় ২০/২৫টি ঘর রয়েছে। তারমধ্যে সবচেয়ে বড় ঘর এটি। বাড়ির অন্যান্য বাসিন্দারা সবাই একে অপরের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। চাচাত-মামাত-ফুফাত ভাইবোন, চাচা-চাচীদের বাস এ বাড়ী জুড়ে। প্রত্যেকের সাথে প্রত্যেকের মিলও প্রচ-। আহঞ্জীবাড়ির প্রধান ব্যক্তি ছিলেন ইয়ারউদ্দিন আহন। তিনি মূলত ইরান থেকে ধর্মপ্রচারের জন্য এ অঞ্চলে এসেছিলেন। এখানের মানুষের সাথে তার এতটাই বন্ধুত্ব হয়ে যায় যে তিনি আর নিজ দেশে ফিরে যান নাই। প্রবাদ আছে যে, জীনের বাদশার সাথেও নাকি তার খুব বন্ধুত্ব ছিল। সেই জ্বীনের বাদশা একরাতের মধ্যে তাকে এই বাড়ি তৈরি করে দেয় ও সূদূর ইরান থেকে তার বউ-সন্তানকে এই দেশে, এই অঞ্চলে এনে দেয়। সেই থেকে এ অঞ্চলে তাদের বসবাস। গ্রামের ধর্মগুরু ও পঞ্চায়েত প্রধান ছিলেন ইয়ারউদ্দিন আহন। আসলে ধর্মপ্রচারকারীদেরকেই তখন আহঞ্জী বলা হত। যে কারণে এ বাড়িটির নাম আহঞ্জীবাড়ি হয়েছে। এরফানের দাদা ইমতিয়াজ উদ্দিনও এ অঞ্চলের ধর্মপ্রধান ও পঞ্চায়েত প্রধান ছিলেন। মাঝখানে অল্পকিছুদিন এরফানের বাবার সময়টা থেকে গ্রামের চেয়ারম্যানী চলে যায় অন্য লোকের হাতে। সে সাথে এ গাঁ থেকে বিদায় নেয় পঞ্চায়েতী ক্ষমতাও। সম্প্রতী এরফান ফিরে এসে গাঁয়ে বসবাস শুরু করায় আবার সে ক্ষমতা ফিরে আসার একটা সম্ভাবনা দেখা দিলেও ধর্মিয় আচার অনুষ্ঠান নিয়ে ছেলের কথাবার্তা ও কার্যকলাপে শুধু গ্রামেরই নয়, জেলা শহরের ধর্মীয় নেতারাও ক্রমশ ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছেন। এ নিয়ে রিতীমতো আতংকিত এরফানের বাবা এমাজউদ্দিন আহন।<br />
সুনীলের বিষয়টা নিয়ে ছেলের সাথে কথা বলবেন বলে তিনি নাস্তার টেবিলে অপেক্ষা করছিলেন। আর যাই হোক সুনীল হিন্দু মানুষ, তাকে নিয়ে বাড়াবাড়ি করে আর শত্রু বাড়াতে দেবেন না, অনেকটা এমন প্রতিজ্ঞা করেই বসেছিলেন তিনি।<br />
ঘরে ঢুকেই এরফান বিষয়টা বুঝে নিয়েছে। বাবার সামনে বসে বললÑ বাবা, তুমি মনে হয় খুব দুশ্চিন্তা করছো? বিশ্বাস করো বাবা তোমার ছেলে এমন কোন কাজ করবে না যাতে অধর্ম হয় বা যা ইসলাম ধর্মের পরিপন্থী।<br />
বাবা- তাহলে তুই যে সুনীলকে বললি পাঁচদিনের মধ্যে ওর সব ফিরিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করবি। সেটা &#8230;?<br />
এরফান : সেটাতো চেয়ারম্যানের কাজ বাবা।<br />
বাবা : কিন্তু সুনীল হিন্দু মানুষ, এমনিতেই মসজিদ ফা-ের টাকা দিয়ে তুই দীনু মাঝিকে নৌকা কিনে দিয়েছিস, ভিখারী রাহেলার মেয়ের বিয়ে দিয়েছিস বলে মুসুল্লীরা সব ক্ষেপে আছে। এমন কী আমাদের বাড়ির অনেকেই আঢ়ালে আবডালে নানান রকম মন্তব্য করছে।<br />
এরফান : আহ্ বাবা, তোমরা কেন বোঝনা, তুমিতো তাদের বোঝাতে পার যে এই টাকাতো আর নষ্ট হচ্ছে না। দীনু মাঝির নৌকাটা ডুবে গেল। ও বেচারা না খেয়ে মরে যেত। আল্লার ঘরে টাকা পড়ে আছে, আর তার বান্দা না খেয়ে মারা যায় এটা ইসলাম ধর্ম কখনো মেনে নেবে না বাবা। তাছাড়া দীনু মাঝিতো প্রত্যেক শুক্রবারের জুম্মায় এসে কিছু কিছু করে টাকাটা ফেরৎ দিচ্ছে। আর রাহেলার মেয়েটার বিয়ে হওয়ায় গ্রামের একটা পূণ্যি হলো না বাবা, তুমিই বল। মেয়েটা বড় হয়েছে, ঠিক সময় ওর বিয়ে না হয়ে একটা কোন অঘটন ঘটলে তখন পুরো গাঁয়ের নাক কাটা যেত না? আমরা তো আর ছেলেকে যৌতুক হিসেবে টাকাটা দেই নাই। ছেলেটা যেন কিছু একটা কাজ করে বউ ও শ্বাশুড়িকে নিয়ে খেতে পারে সেজন্য একটা ভ্যান রিক্সা কিনে দিয়েছি। ওর আয় ভালো হলে ও টাকাটা ফেরৎ দিয়ে যাবে। তুমি কী দেখেছো বাবা রাহেলা খালা এখন আর ভিক্ষা করে না।<br />
বাবা : কিন্তু মসজিদ ফা-ের টাকায় এগুলো করা কী জরুরী ছিল? টাকাটাতো অন্যভাবেও জোগাড় করা যেত।<br />
এরফান : হ্যা বাবা যেত, তবে সেজন্যে অনেকের কাছে হাত পাততে হত। কেউ দিত, কেউ নানান কথা শোনাতো। এতে অনেক সময়ও বাজে খরচ হত। তার চেয়ে কি এটা ভালো নয় বাবা? মসজিদ ফা-ের সব টাকা এ গাঁয়ের প্রতিটি মানুষের দান। তারা আল্লাহর ঘরে দান করেছেন। আল্লাহ’র ঘরের টাকায় সকলের অধিকার আছে, ঐ রাহেলার যেমন আছে, তেমনি তোমার-আমারও আছে।<br />
বাবা : না বাবা তোমার সাথে যুক্তিতে আমি পারবো না তবে বলি কী সুনীলকে নিয়ে আবার যেন এমন কোন কা- করে বস না যা ধরে ধর্মিয় নেতারা তোমার উপর আরো ক্ষেপে যায়।<br />
এরফান : আচ্ছা বাবা সেরকম কিছু হবে না, যদি না ধর্মিয় নেতাদের কেউ ওর ঘর জ্বালানোর সাথে জড়িত না হন।<br />
বাবাÑ তোমার কী ধারণা, ওর ঘর ধর্মিয় নেতাদের কেউ জালিয়েছেন?<br />
এরফানÑ ঠিক জানিনা বাবা, তবে শুনেছি সমাজ সেবা কল্যাণ সংস্থা মসজিদের ঈমাম সাহেবের জন্য সুনীল কাকার জমিটা কিনতে চেয়েছিলেন এমপি সাহেব। হয়ত&#8230;<br />
বাবাÑ হয়ত সে সুযোগটাই নিচ্ছে অন্য কেউ, এটা হতে পারে না?<br />
এরফানÑ পারে বাবা, খুব সম্ভব সেটাই হয়েছে। এমপি সাহেবের সাথে আমার একটা বিরোধ তৈরির জন্য এটা কোন ষড়যন্ত্রও হতে পারে। আমি আজই একবার এমপি সাহেবের কাছে যাবো, খোলাখুলি কথা বলবো।<br />
বাবা : যেটা ভালো মনে করো, কিন্তু সাবধান এমপি সাহেব কিন্তু এমনিতেই তোমাকে পছন্দ করেন না। তুমি যাতে চেয়ারম্যান হতে না পার সেজন্য অনেক চেষ্টা তিনি করেছেন। কী করে যে তুমি চেয়ারম্যান হয়ে গেলে সেটা আমার কাছেও খুব রহস্যময় রয়ে গেছে।<br />
শুধু তোমার কাছে কেন বাবা আমার নিজের কাছেও বিষয়টা রহস্যময়ই বটে। বছর হয়নি গ্রামে এলাম অথচ এর মধ্যে এত ভোট আমি পাব আশাই করিনি। এটা সম্ভবত আমাদের পূর্বপুরুষদের ভালো কাজের ফল বাবা।<br />
বাবা : হ্যা তাই হবে। যাও বের হও, তবে তোমার মায়ের কবরটা একবার দেখে যেও। শেয়াল বুঝি আবার গর্ত করেছে।</p>
<p>এই আহঞ্জীবাড়িটির অবস্থান জেলা শহর থেকে নদী পার হয়ে প্রায় মাইল দশেক ভিতরে। গ্রামের নাম ইয়ার গাঁও। মূলত ইয়ারউদ্দীন আহঞ্জীর নামানুসারেই এ গাঁয়ের নাম হয়েছে ইয়ার গাঁও। শহরের অনেকে এ গাঁওটাকে বন্ধুপাড়া নামেও ডাকেন। বিশেষ করে এমপি সাহেবতো তার ভাষণে প্রায়ই বলেনÑ বন্ধুপাড়ার বন্ধুরা।<br />
অনেক বড় বড় লোকের আনাগোনা ছিল এ বাড়িতে। এমনকি মহাত্মা গান্ধি, লর্ড কার্জনও এসেছেন। যে কারণে এ বাড়ির প্রবেশ পথেই আভিজাত্যের নিদর্শন রয়েছে। পাকা রাস্তা শহর থেকে এসে সোজা চলে গেছে আহঞ্জীর হাট স্কুল ও কলেজে। পাশ ঘেষে সেই সড়ক যেন অনেকটাই হেটে ঢুকে পড়েছে আহঞ্জীবাড়ির উঠানে। সাড়ি সাড়ি দেবদারু আর মেহগণি গাছের পাহাড়া এসে থেমেছে বিশাল এক পুকুরের সাণ বাধানো ঘাটে। ঘাটে পথিকের বিশ্রামের জন্য রয়েছে চমৎকার ব্যবস্থা। ঘাটের পাশেই সিমেন্ট দিয়ে তৈরি বেশ কয়েকটি তাক। সেখানে থরে থরে সাঁজানো আছে প্লাস্টিকের বদনা। পুকুরঘাট থেকে পূর্বদিকে প্রায় ৫০০ গজ দূরে রয়েছে জোড়া পাকা পায়খানা  ও পশ্রাব ঘর। সাইনবোর্ডে তীরচিহ্ন দিয়ে লেখা আছে পুরুষদের পায়খানা ঘর। এ রকম বাড়ির ভিতরে আরো দুটি পুকুর রয়েছে। মহিলাদের জন্য পাকা পায়খানা ঘর ও গোসলখানাও আছে সেখানে।<br />
পুকুরঘাটে বসলেই আপনা থেকে চোখ আটকে যাবে পশ্চিমদিকের একটি ঘরে। মার্বেল পাথরের উপর খোদাইকরা আল্লাহু আকবর লেখাটি দৃষ্টি কাড়বেই। এটিই এ বাড়ির মসজিদ। একসময় এটাই ছিল এ গাঁয়ের প্রথম মসজিদ। মসজিদের পাশেই কাচারীঘর এবং মসজিদের সামনে ১০০ গজ এগিয়ে কবরস্থান।<br />
দৃঢ়পায়ে মায়ের কবরের পাশে গিয়ে দাঁড়ালো এরফান। কবরের পাশে কাঁদতে নেই তাই, নেমে আসা চোখের জল সামলাবার ব্যর্থ চেষ্টায় ও ব্যস্ত হল শেয়ালের তৈরি গর্তটা ভরাট করতে। একহাতে মাটি জড়ো করে গর্ত ঢাকার চেষ্টা করছে অন্য হাতে চোখের জল মোছার চেষ্টা। স্মৃতিজুড়ে মায়ের ঝাপসা মুখাবয়ব। সে মুখে এরফানের জন্য প্রচ- আকুতী। যেন এই কবর থেকেও মা ওকে ডাকছেনÑ বাবা এরফান, ফিরে আয় বাবা।</p>
<p>দুই<br />
এরফানের বয়স যখন সবে ৪ বছর তখনই ওকে ভর্তি করে দেয়া হল গ্রামের মাদ্রাসায়। মাদ্রাসা বলতে তখন আহঞ্জীর হাট স্কুলটিকেই ব্যবহার করা হতো। খুব সকালে ফজরের নামাজ শেষ হলেই মাদ্রাসার পড়াশুনা শুরু করতেন আহঞ্জীবাড়ি মসজিদের ইমাম ও মোহাদ্দেস দু’জনে গ্রামের ছেলেমেয়েদের আরবী শিখাতেন। বেলা ৯টা পর্যন্ত চলতো আরবী শিক্ষা কার্যক্রম। এখান থেকে প্রাথমকি শিক্ষা গ্রহণ শেষে ছেলেমেয়েদের ভর্তি করে দেয়া হতো হাফেজিয়া বা মোহাম্মদিয়া মাদ্রাসায়। দুটি মাদ্রাসাই শহরে অবস্থিত। আর যারা বাংলা পড়তেন তারা ভর্তি হতেন গ্রামের পাঠশালায়। শিশুবেলা থেকেই দাদা ইমতিয়াজ আখন এর কোলে চড়ে মসজিদে যেতে অভ্যস্ত এরফান। তাই মাদ্রাসায় যেতে ওর খারাপ লাগেনি। আলিফ-বা-তা-শা শিক্ষা গ্রহণ করতেও ভালোই লেগেছে যতদিন ও বুঝেছে যে আলিফ মানে অ, বা মানে আ। প্রথমদিকে মাদ্রাসার মৌলভী সাহেব এভাবেই বুঝিয়ে আরবী শিখাবার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু সমস্যা দেখা দিল আলিফ জাবর আ, আলিফ জের এ আলিফ পেশ উÑ আ এ উ নিয়ে। এ দিয়ে সে কিছুতেই ক, খ, গ মিলাতে পারছিল না। যে কারণে খুব সুন্দরভাবে আরবী লিখতে ও পড়তে পারলেও এরফানের মধ্যে আরবী শেখার প্রতি প্রচ- অনিহা দেখা দিল। বাধ্য হয়েই মা ও দাদার প্রশ্রয়ে এরফানকে মাদ্রাসা থেকে সরিয়ে ভর্তি করা হল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এরফানের বয়স যখন আটবছর ঠিক তখনই এক অদ্ভুত কা- করে বসলো ও। সেদিন ছিল শুক্রবার। মসজিদে জুম্মার নামাজের জন্য দূর দূরান্ত  থেকে আসা মুসল্লীদের ভিড় ছিল। দাদা ইমতিয়াজ আখন তখন আর বেঁচে নেই। দাদার পাগড়ীটা মাথায় দিয়ে এরফান এসে বসেছিল কাচারীঘরে পঞ্চায়েত প্রধানের চেয়ারে। এই চেয়ারে বসা নিষেধ থাকলেও যেহেতু দাদা নিজেই ওকে কোলে নিয়ে এখানে বসতেন তাই কেউ বাঁধা দিল না। কিন্তু সমস্যা হল জুম্মার নামাজে খুতবাটা যখন শেষ হলো- ইমাম সাহেব যেই বললেন- ওয়াশকুরুনি,ওয়াশকুরুকুম, ওয়াশকুরুনী ওয়ালা তাকফুরুণ’।<br />
অমনি এরফান হাততালি দিয়ে উল্লাস করে উঠলÑ এহে হুজুর আর কোন সূরা পারে না, এই একটাই প্রতিদিন পড়ে।<br />
এ ঘটনাটি খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়। একটি বাচ্চাছেলের আচরণে এটাই আশা করা স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু ঘটনাটি ঘটিয়েছে আহঞ্জীবাড়ির নাতি, তাও আবার পঞ্চায়েত চেয়ারে বসে। যে কারণে মুসল্লিদের মধ্যে মৃদু গুঞ্জন শুরু হয়। ইমাম সাহেব খুবই ক্ষুব্দ হলেন এবং এতে করে পঞ্চায়েত চেয়ারটি আহঞ্জীবাড়ি থেকে সরিয়ে ফেলা হল। যেহেতু ইমতিতিয়াজ সাহেব মারা গেছেন এবং এরফানের বাবা এমাজউদ্দিন খুব একটা দৃঢ়চেতা নন তাই বাধা দেয়ার আর কেউ ছিল না। এরফলে গ্রামবাসী তো বটেই এরফানের বাবাও ছেলের প্রতি কিছুটা ক্ষুব্দ হলেন। তার ভেতর একটা চাঁপা রাগ কাজ করতে লাগল। তের বছর বয়সে এরফান যখন নবম শ্রেণীতে পড়ছে ঠিক তখন একদিন ক্লাশে ইসলাম ধর্ম শিক্ষকের হাতে বেদম পিটনী খেল এরফান। ওর দোষÑ আরবী পড়া শিখে আসেনি। উল্টো শিক্ষকের মুখে মুখে তর্ক শুরু করে দিয়েছে। ওর যুক্তি হচ্ছে- যেহুতু আমরা বাংঙ্গালী। আমাদের মাতৃভাষা বাংলা, তাই আমরা কেন আরবীতে পড়বো। আরবীটাকেও আমাদের বাংলা করে কেন দেয়া হচ্ছে না। এ কথায় ধর্ম শিক্ষক খুব রেগে গেলেন এবং এরফানকে ‘বেয়াদপ’ আখ্যা দিয়ে মেরে ক্লাশরুম থেকে বের করে দিলেন। এ ঘটনায় বাবা-মায়ের মধ্যেও এরফানকে নিয়ে ঝগড়া হয়ে গেল।<br />
পরবর্তী ঘটনাটি ঘটল জুম্মার নামাজে। এরফান সরসরি মসজিদের ইমাম সাহেবকে বলল- হুজুর এই গ্রামের কেউ ই আরবী ভাষা বোঝেনা। আপনি আরবীতে কী বলছেন- তা ভালো না মন্দ? আমরা যদি নাই বুঝি তাহলে কী লাভ আরবীতে পড়ে। আপনি বাংলা করে বুঝিয়ে দিন।<br />
ইমাম সাহেব মিষ্টি হেসে বলেন- বাবারে আরবী ভাষা সয়ং আল্লাহর ভাষা তিনি এ ভাষায় কোরাণ নাজিল করেছেন। তুমি আমি না বুঝলেও এ ভাষায় কোরাণ পড়তে হবে। তাহলেও সোয়াব হবে।<br />
এরফান সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করে বলে উঠল- গত জুম্মায়ইতো আপনি বললেন- কোরাণ শুধু পড়লেই হবে না। আমলও করতে হবে। আমি যদি না-ই বুঝি তাহলে আমল করবো কী করে? আমাদের মসজিদে খুতবা পড়তে হলে আপনাকে আরবীসহ বাংলা বুঝিয়ে পড়তে হবে।<br />
এ কথায় হুজুর খুবই ক্ষেপে গেলেন এবং রেগে মসজিদ থেকে বের হয়ে গেলেন। গ্রামের মুসল্লিরা সবাই এরফানের নিন্দা করতে শুরু করল। রাগে ক্ষোভে এরফানের বাবাও প্রায় তার হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেললেন। তিনি ছেলেকে টেনে হিচড়ে মসজিদ থেকে বের করে নিলেন এবং একচোট উত্তম-মাধ্যম পিটিয়ে ছেলেকে বাড়ি থেকেও বের করে দিলেন। পঞ্চায়েতের চেয়ার তার বাড়ি থেকে সরে যাবার পর এতোদিন চেপে রাখা কষ্টটাও এখন তার ভিতর থেকে বের হয়ে এল। অনেকটা দাদার স্বভাব পেয়েছে এরফান। দাদার মতই প্রচ- একগুয়ে ও জেদী। বাবা আচরণে প্রচ- আহত হয়ে সেই যে গ্রাম ছাড়ল। পিছন থেকে মা তখন কী ডাকাটাই না ডাকল। বাবা যাসনে। বাবা এরফান কথা শোন&#8212;&#8211; যাসনে, ফিরে আয় বাবা।<br />
আর ফেরেনি এরফান। নিজ জেলা, নিজ দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছিল ভিন্ন দেশে ভিন্ন জেলায়। ভিন্ন গ্রামে। কী হতো বলা যায় না। তবে ভাগ্য ভালো যে ঐ সময় ফুয়াদের সাথে দেখা হয় ওর। ফুয়াদের বাবা-মাই ওকে আশ্রয় দেয় তাদের ঘরে, তাদেরই সন্তান হিসেবে বেড়ে ওঠে এরফান, অল্প বিস্তর পড়াশুনাও করে বটে, তবে আর দশটা যুবকের মত স্কুল বা কলেজে গিয়ে পাঠ গ্রহণ করা ওর ধাতে সয় না। ফুয়াদের বাবা খুব চেষ্টা করেন ওকে বুঝিয়ে সুজিয়ে স্কুলে ভর্তি করে দিতে। কিন্তু ওকে রাজী করানো কার সাধ্যি। বাধ্য হয়ে ফুয়াদই পড়াতো ওকে। নিজে যখন যা পড়তো তাই পড়াতো এরফানকে। আবার গল্প উপন্যাস আর ইসলামী বিভিন্ন অনুবাদ পড়ার প্রতি ওর আগ্রহ ছিল প্রচ-। যে কারনে ফুয়াদদের বাড়ির প্রায় সকলেই ওর জন্য বিভিন্ন স্থান থেকে বই সংগ্রহ করে আনতো। সে সাথে পাবলিক লাইব্রেরীতো ছিলই। এভাবেই বেড়ে ওঠে এরফান। পাবলিক লাইব্রেরী এবং জাতীয় ও স্থানীয় সংবাদপত্র হচ্ছে ওর শিক্ষা গুরু। যথারীতি আর দশটা যুবকের মতই প্রেমেও পরেছিল। আর এই প্রেমই আবার ওকে ফিরিয়ে আনে নিজ দেশে, নিজ গ্রামে।<br />
মায়ের কবরের পাশে বসে স্মৃতি হাতড়ে এরফান পুনরায় ঢুকরে কেঁদে ওঠে। নিজের ভালবাসার মেয়েটির কথা মনে হতেই বুকের মধ্যে চাঁপা একটা কষ্ট ঝন্ঝনিয়ে ওঠে। অজান্তেই বেরিয়ে আসে একটা দীর্ঘশ্বাস।</p>
<p>তিন<br />
বাবার উপর অভিমান করে ঘরছাড়া এরফান নদীর ঘাটে প্রথম যে লঞ্চটি  পেল সেটিতেই চড়ে বসল। লঞ্চের সারেং, কেরানী সবাই ওকে চেনে, তাই চুপি চুপি কাউকে কিছু না জানিয়েই নেমে পড়ল অপরিচিত এক ঘাটে। এটি ছিল ভোলার চরফ্যাশন। এখানে লঞ্চঘাটে ওর পরিচয় হয় মহেশখালীর ঘটিভাঙা দ্বীপের মাছ ব্যবসায়ী নুরু বদ্দারের সাথে। নুরু বদ্দার ওকে সাথে নিয়ে যান তার বাড়িতে। অর্থাৎ মহেশখালীর ঘটিভাঙা দ্বীপে। যে দ্বীপের মানুষেরা সবাই মুসলমান এবং সাগরে মাছ ধরাই যাদের প্রধান পেশা। শিক্ষার আলো বলতে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও তিনটি মসজিদ ছাড়া আর কিছু ছিলনা। তবে মসজিদের মৌলভীদের এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষকের দাপট ছিল পুরো গ্রাম জুড়ে। গ্রামটির অবস্থান মহেশখালী থানা সদর থেকে প্রায় ১০ মাইল দক্ষিণে, মাঝখানে মাইল দেড়েকের একটি বিল বা নিম্নভূমি ঘটিভাঙা দ্বীপটিকে মহেশখালী থেকেও বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। সাগরে জোয়ার এলে বিলটিতে হাটুপানি জমে কিন্তু বর্ষাকালে এ বিলটি ডুবে সাগরের অংশ হয়ে যায়। যে কারণে ঐ সময়টায় মহেশখালীর সাথে এই গ্রামের কোনো যোগাযোগই থাকেনা বলা যায়। এ সময় তারা বাজার সদায় করার জন্য সরাসরি জেলাসদর কক্সবাজারে চলে যায়। এমনিতেও সাগরের মাছ বিক্রির জন্য এদের কক্সবাজারই যেতে হতো। এরফানের কাছে সবচেয়ে অবাক লেগেছে যেটা- এ দ্বীপের ছেলে বুড়ো ও মহিলারা সবাই প্রাকৃতিক ডাকে সাড়া দিতে অনেকটা বিড়াল কুকুরের মতোই বালু খুড়ে সামান্য গর্ত তৈরি করে, কাজ সেরে আবার ঢেকে দেয়। দু’এক ঘর অবস্থাপন্নদের মহিলারা অবশ্য বাড়ির ভিতরে জঙ্গলের দেয়াল তৈরি করে নিয়েছে। এমন বাড়ি এখানে মাত্র ছয়-সাতটি। গ্রামটিকেও তারা ছয়-সাতটি মহল¬া বা পাড়ায় ভাগ করে নিয়েছে। প্রথমদিনই এই টয়লেট ব্যবস্থা দেখে প্রচ- অবাক হয় এরফান। নিজ উদ্যোগে নুরু বদ্দার ও তার বোটের লোকদের সাহায্য নিয়ে প্রথমেই সে টয়লেট তেরির কাজ শিখায় গ্রামের সবাইকে। এতে বোটে অবস্থানরত ভোলা ও বরিশাল অঞ্চলের জেলে কর্মিরা খুব খুশি হলেও স্থানীয় ঈমাম ও প্রধান শিক্ষক খুব রুষ্ট হন। যা এরফানের জানার কথা নয়।<br />
নুরু বদ্দারের দুই ছেলে ও এক মেয়েকে প্রাথমিক শিক্ষা দানের দায়িত্ব নিয়ে প্রায় তিনমাস কাটিয়ে দেয়ার পর এরফান আবিস্কার করে এখানের প্রতিটি মহল্লার সাথে প্রতিটি মহল্লার চলে শক্তির দাপট। নুরু বদ্দারের মহল্ল¬ায় একটি মসজিদ থাকলেও প্রাথমিক বিদ্যালয়টি পড়েছে আজমত মাস্টারের নিজ এলাকায়। যে কারণে আজমত মাস্টারের জ্ঞাতি-গুস্টি ও তার পেয়ারের লোক ছাড়া অন্যকারো ছেলে বা মেয়ে প্রাথমিক স্কুলে যেতে পারে না। পড়তেও পারে না।  এ সভ্যতার সাথে এরফান এতোটাই অপরিচিত যে ও যতই দিন যায় ততই সকলের শত্রু হয়ে উঠতে শুরু করে।  কোনো এক অজ্ঞাত কারণে প্রধান শিক্ষক আজমত মাস্টার এরফানকে খুব পছন্দ করতে শুরু করে। এরফানের সঙ্গে বসে গল্প করতে সে হুটহাট চলে আসে নুরু বদ্দারের ঘরে। নিজেই ডেকে নুরু বদ্দারের ছেলে-মেয়েকে স্কুলে ভর্তি কওে নেয়। এতে নুরু বদ্দার খুব খুশি হয়, কারণ স্কুলে ভর্তিতো দূওে থাক আজমত মাস্টার এতোকাল তার দিকে বন্দুক তাক করে রাখতো। এখন এরফানের কারণে সে বন্ধু হয়েছে। ধীরে ধীরে এরফানকেও সবাই মাস্টার বলে ডাকতে শুরু করে। এ দিকে এরফানের কথাবার্তা, আচার আচরণ ও গায়ের রং-এর সৌন্দর্য এই দ্বীপে মন্ত্রী-প্রেসিডেন্টের ছেলে বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছে ইত্যাদি গুজবের জন্ম দেয়। যে কারণে শিশু ও বুড়োরা খুব তারাতারি এরফানের বন্ধু হয়ে ওঠে এবং সবাই ওর কাছে পড়া শেখার জন্য ব্যস্ত হয়।<br />
অন্যদিকে মহিলারা বিভিন্ন অজুহাতে এরফানকে সমাদর শুরু করে। এরফান চা পছন্দ করে জেনে অনেক ঘর থেকেই নিয়মিত চা আসে নুরু বদ্দারের ঘরে। সত্যি বলতে এ সব চা সবই সাগর পারে যেখানটায় ইঞ্জিন চালিত নৌকাগুলো (বোট) বাঁধা থাকে সেখানের একটি দোকানে তৈরি। বদ্দারদের এই বোট রাখার স্থানকে এরা মাছঘাটা বলেন। এই গ্রামে সমুদ্রের তীর ঘেছে এরকম তিনটি মাছঘাটা রয়েছে। যেখানে চা দোকান, মুদি দোকান ও ভিসিআর ঘর তৈরি করে গ্রামের ছেলে-বুড়োদের বিনোদন চলে। বাড়িতে মহিলারা চা দূরে থাক ঠিকমত মাছটাও রাঁধতে জানেন না। পুরো গ্রাম জুড়ে মাত্র দুটি ভিসিআরঘর বা হিন্দি সিনেমা দেখার বিনোদন কেন্দ্র রয়েছে। ৫/১০ টাকা টিকিটের ব্যবস্থায় স্থানীয় প্রভাবশালীরা এটি পরিচালনা করছেন। এর একটি সাগর পাড়ে অন্যটি গ্রামের উত্তর প্রান্তে আজমত মাস্টারের এলাকায়। এই দুটি সিনেমা ঘরকে ঘিরে মাসের মধ্যে দুবার গ্রামে বন্দুকযুদ্ধ হবেই। প্রত্যেক ঘরে ঘরে বন্দুক রয়েছে। এরফান পরে জেনেছে, এদের পূর্বপুরুষেরা সবাই ছিল জলদস্যু।<br />
ঘটিভাঙা মূলত কক্সবাজার জেলার মহেশখালী থানাধীন একটি বিচ্ছিন্ন গ্রাম। কক্সবাজার থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমে বঙ্গোপসাগরের মাঝখানে অবস্থিত মহেশখালী দ্বীপটিকে প্রকৃতির লীলাভূমিও বলা যায়। নৈসর্গিক সৌন্দর্যের এ এক অনন্য রাজ্য। পাহাড়ের উপর পুরাতন ঐতিহ্যের সাক্ষ্য নিয়ে মথ, মন্দির আবার মসজিদও দাঁড়িয়ে আছে পাশাপাশি। ঘটিভাঙা দ্বীপে অবস্থানকালে এরফান মাত্র দু’বার মহেশখালী সদরে যেতে পেরেছিল। হলে কী হবে এখানের মানুষেরা বেশিরভাগই আরাকান থেকে আগত মুসলামানরা। যারা নিজেদের প্রকৃত মুসলমান বলে দাবী করে এবং অল্প কয়েকঘর মগ-চাকমা ও রাখাইনদেরকে নিজেদের দাস মনে করে। বিশেষ করে রাখাইন মেয়েরা খুব সুন্দর হবার কারণে প্রায়শঃই তাদের উত্যক্ত করে মুসলমান যুবকরা। আবার দ্বীপের যে অংশে মগ বা রাখাইনদের  বসত বেশি, সে অংশে মুসলমানদের যাতায়াতের অনেক সমস্যা। তবে চোলাই মদ ও গাজা খেতে হলে মগ ও রাখাইনদের কাছেই জিম্মি রাখতে হয় নিজম্ব সম্পদগুলো। আর জেলে মানেই এ অঞ্চলে মদ-গাঁজা, ভাং-এর উম্মক্ত প্রদর্শনী। প্রথমটায় এ দৃশ্য তেমন চোখে পড়েনি এরফানের। কারণ ও যখন এসেছে তখন ছিল শীতকাল। মাছ ধরার সুবর্ণ একটা সময় তখন। সাগর পাড়ের জেলেরা ছয়মাস মাছ ধওে, বাকী ছয়মাস বসে বসে খায়। কেউ কেউ এ সময় লোনা খেতে ফসল ফলাবার চেষ্টা করে। কেউ লবণ চাষ করে। কিন্তু বর্ষা মৌসুমটা শেষ হলেই দৃশ্য বদলে যায়। জেলেরা সব মেতে ওঠে আড্ডা আর নেশায়। যা এতোদিন চলেছে সাগরের উপর তা চলে জনসমক্ষে। মদ-গাঁজার আর জুয়োর অন্যরকম এক রাজ্য হয়ে ওঠে ঘটিভাঙা দ্বীপ। দুর দূরান্ত থেকে বোটে মেয়ে মানুষ আসে, আসে অন্য জেলেরাও। সবচেয়ে মজার বিষয় হচ্ছে যতই নেশা করুক আর জুয়ো খেলুক আজান শোনামাত্র এরা মাতাল অবস্থাতেই মসজিদে ছুটে যায়, নামাজ পড়ে। আবার একে অপরের নামাজে ভুল ধরে। যা দেখে রাগে গাঁ জ্বলে ওঠে এরফানের। এ সব দেখে দেখে ভিত এরফান এ অঞ্চল থেকে যখন পালাবার পথ খুঁজছে তখন একদিন রমজানের রাতে পেট খারাপ করে এরফানের। বহুকষ্টে এ অঞ্চলের খাবারে ও অভ্যস্ত হলেও হাঙর মাছের ঝোলটা খেতে অভ্যস্ত হয়নি। মাস্টার হাঙর খায় না- এ শুনে ছাত্র-ছাত্রিদেও সে কী হাসাহাসি। এতোদিন তাও সহ্য করে এড়িয়ে যেতে পারলেও নুরু বদ্দার ও আজমত মাস্টারকে এড়ানো গেল না। প্রায় ছ’মাস পর রমজানের একরাতে তাদের দু’জনের সাথে খেতে বসতে হলো এরফানকে। বোট নিয়ে সাগরে থাকায় বহুদিন পরে নুরু বদ্দারের সাথে দেখা। সমস্যার অনেক বিষয় নিয়ে কথা বলতে হবে। তাই খেতে খেতে কথা বলার ইচ্ছে নিয়ে একত্রে খেতে বসেছিল ওরা। হাঙরের গন্ধ পেয়েই এরফান সাবধান হয়ে ওঠে। কিন্তু হেড মাস্টার ও নুরু বদ্দার জোড় করে ওকে হাঙরের একঅংশ খেতে বাধ্য করে। সঙ্গে সঙ্গে বমি। এতে হেডমাস্টার ও নুরু বদ্দার খুব মজা পায়। তারা দুজনে ওকে নিয়ে হাসাহাসি করে। যেহেতু রোজার মাস তাই ভোররাতে নুরু বদ্দার নিজেই এসে ডেকে তোলে এরফানকে। বলে- মাস্টার এ বেলা খুব ভালো খাবার আছে। ওঠো। এদের খুব ভালো খাবার হচ্ছে- গরুর মাংস ও আলু দিয়ে রান্না করা এক পাতিল ঝোল। যাকে ডালও বলা যায় না আবার ঝোলও বলা যায় না। একেতো সন্ধ্যারাতে খেয়ে বমি করা, তার ওপর এখন এই ভালো খাবার স্মরণ করে ও এ বেলা খাবেনা বলতেই নুরু বদ্দার আৎকে উঠলেন। বললেনÑ সে কী মাস্টার, আপনি রোজা থাকবেন না, তা কী হয়?<br />
এ কথায় উঠে অনেকটা জোর করেই অল্প কিছু খেয়ে আবার শুয়ে পড়ে এরফান। কিন্তু ঘুমানো আর হয় না। পেটের যন্ত্রণা থেকে ডায়রিয়া শুরু হয়ে যায়। ভোর হতে না হতেই দশ/বারোবার টয়লেট হয়ে যায়। স্বাভাবিক কারণেই এতে রোজা থাকা সম্ভব হয় না। আশেপাশে ডাক্তার বলতেও ঐ প্রাথমিক স্কুলের প্রধান শিক্ষক। ঐ হাতুড়ে ডাক্তারের কাছে যেতে মন স্বায় দেয় না। ও নিজেই দোকান থেকে ছাত্রটাকে পাঠিয়ে আখের গুড় কিনে আনে। পানির সাথে গুড় মিশিয়ে তাতে একচিমটে লবন দিয়ে নিজেই খাবার স্যালাইন তৈরি করে খায়। কীভাবে যেন একথা পুরো ঘটিভাঙা দ্বীপে ছড়িয়ে যায় যে, মাস্টার রোজা রাখেনি। বিষয়টা যে অনেকেই জেনে গেছে তা নিয়ে প্রথম দুদিন এরফান কোন গুরুত্ব দেয় না। কিন্তু ও সুস্থ হবার ২য় দিনে পাড়ার বড় মসজিদের ঈমাম সাহেব হঠাৎই লোক পাঠিয়ে ওকে ডেকে পাঠালেন। আজমত মাষ্টারের এলাকার সাগরের পাড়ের একটি চায়ের দোকানে তখন মহেশখালী দ্বীপের ছয়টি মসজিদের ঈমাম এবং পুরো গ্রামের যত যুবক ও প্রবীণ আছে, সবাই জড়ো হয়েছে। শুধু নেই নুরু বদ্দার। জরুরী কাজে সে শহরে, মানে কক্সবাজারে গেছে। এরফান ঘটনাস্থলে পৌঁছে, অবস্থা দেখে ও বুঝে আতঙ্কে কান্নায় ভেঙ্গে পরল। এ কোন দেশরে বাবা। একটা অসুস্থ কিশোর রোজা না থাকার অপরাধে তার বিচার করতে বসেছে মসজিদের ঈমাম ও প্রাথমিক স্কুলের প্রধান শিক্ষক। আর বিচার দাবি করছে গ্রামের নেশাখোর কিছু যুবক। এরফানের কোনো জবাব না শুনেই বিচারের রায় হলোÑ পঞ্চাশ ঘাঁ জুতোর বাড়ি আর নুরু বদ্দারের ঘর ছেড়ে দিয়ে এলাকার সাধারণ নিম্ন আয়ের এক জেলের ঘরে গিয়ে তার ছেলেদের তিনবেলা পড়ানো, বিনিময়ে থাকার আদেশ দেয়া হলো এরফানকে। তবে জুতো মারার আগে ডাক্তার আজমত মাস্টার পরীক্ষা করে দেখবেন যে এরফান মাস্টার কতটুকু অসুস্থ? পঞ্চাশ ঘাঁ জুতো সইতে পারবেন কিনা। মাস্টারের সুপারিশে জুতো পেটার পরিমাণ কমানো যেতে পারে।<br />
অবিশাস্য এ রায় ঘোষণা মাত্রই পালাবার চেষ্টা করেছিল এরফান। কিন্তু চারদিক থেকে ওকে ঘিরে রাখা হলো। পিছন থেকে চেংরা যুবকদের দু-চারটে কিল চড়ও এসে পড়লো ওর পিঠে। এ সময় হঠাৎই হুঙ্কার দিয়ে দাঁড়ালেন আজমত মাস্টার। ডাক্তার আজমত।<br />
অনেকদিনের বন্ধুত্বের বদৌলতেই হয়তো তিনি সহমর্মিতা দেখালেন। অন্তত ঐ মূহুর্তে এরফানের তাই মনে হলো। তিনি বললেনÑ আমি এরফান মাস্টারকে নিয়ে শহরে যাচ্ছি। ওখানে তার চেকাআপ করিয়ে আনবো। বলেই তিনি এরফানের হাত ধরে অনেকটা টেনেই নিয়ে বোটে চড়লেন। মুখে বললেন- ছিঃ মাস্টার কী মেয়ে-ছেলের মতো কাঁদছেন। আরে এ সব গ্রাম্য মূর্খরা কী আপনার বিচার করতে পারে? আপনি হলেন আমার বন্ধু, আমার বন্ধুর বিচার করবো আমি।<br />
বাবার বয়সী এই ৪০-৪৫ বয়সের মাস্টারটিকে এতোদিন কেন যেন এরফান পছন্দ করতে পারেনি। আজ যেন তাকে সাক্ষাৎ ফেরেশতা বলে মনে হচ্ছে ওর। ওর ধারণা ছিল লোকটি অল্প শিক্ষিত, মূর্খদের গায়ে মোড়ল সেজে বসেছে। তাই একটা দূরত্ব বজায় রাখছিল এতোদিন। ওর ছোট্টমনে লোকটাকে নিয়ে লুকিয়ে থাকা সব শংসয় এই মূহুর্তে কেটে গেল। আজ তার আচরণে এবং অবলীলায় ওর মতো ছোটো একটি ছেলেকে নিজের বন্ধু দাবী করায় এরফান লোকটিকে বিশেষ সম্মানের স্থানে বসাতে চাইলো। বাবার মুখে ও শুনেছেÑ খুব জ্ঞানী লোকেরাই সবাইকে সহজে বন্ধু বানাতে পারে। তাদের কাছে ছোটো আর বড় কোনো ভেদাভেদ নাই। সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে, বোটের চালক যখন জানতে চাইলো মাস্টার আপনি রোজা ভাঙলা কেন? জান না রোজা ভাঙা আর জেনা করা সমান অপরাধ।<br />
তখন উত্তরটা আজমত সাহেবই দিলেনÑ এই কথা তুমি কই শিখলা পাইলট। চালককে এরা পাইলট বলে।<br />
পাইলট উত্তরে বললÑ কেন আমাগো মৌলভী সাবরাতো সবসময় এইডা-ই কয়? আপনি জানেন না ডাক্তার সাব।<br />
আজমত সাহেবরে এরা কেউ ডাক্তার বলে, কেউ আবার ডাকে মাস্টার বইলা। এদের নিজস্ব ভাষাটাও যেন কেমন। আপনি তুমি মিলিয়ে গোলমালে টানের একটা ভাষা। বড় ভাই মানে বদ্দা। ভালো মানে গম।<br />
আজমত সাহেব বললেন- হু তা জানি, তয় শরীরে যদি রোগ থাকে আর কেউ রোজা না রাখতে পারে তাইলে কী করবো? তা কী কইছে?<br />
প্ইালট : হ কইছিল তো, কী দান খয়রাত করতে। আর সুস্থ একজনরে তার বদলে রোজা রাখতে হইবো।<br />
এরফান এবার সাহস করে বলেই ফেলল : কেউরে যদি পাওয়া না যায়, কেউ যদি বদলি রোজা না রাখতে চায়, তাইলে কী করবো হেইডা কী কইছে?<br />
শাবাস মাস্টার! বলেই এরফানের পিঠে একটা বিশাল চাপড় বসালেন আজমত মাস্টার। একেতো বিশাল লম্বা-চওড়া তার উপর ইয়া মোটা এক একটা হাতের ওজন হবে তিনমন। আদুরে চাপড় পড়তেই এরফান ছিটকে সাগরে পড়ে যাবার উপক্রম হলো। মাস্টার নিজেই ওকে তারাতারি জড়িয়ে ধরে সাগরে পড়ে যাবার হাত থেকে বাঁচালেন। আর পাইলট টা তখন এমন ভাবে তাকিয়ে ছিল যেন বাংলা সিনেমার কোনো নায়িকাকে এই মাত্র নায়ক সমুদ্রে পড়ে যাবার হাত থেকে বাঁচালো। এতে বুঝি মাস্টারের ভাবমূর্তি একটু ক্ষুন্ন হলো। তাই সে খুব গম্ভীরভাবে পাইলটকে আবার জিজ্ঞেস করলেন- কী মৌলভীত কী এইডা নিয়া কথা কইছে? কেউ যদি বদলি রোজা না রাহিত চায়, তাইলে কী করবানে?<br />
পাইলট : না। ইভা তো ন’ কয়। জুম্মার দিন ইবা জিগাইবার হইবো।<br />
আরে মৌলভী কী কইবো, আরথুন শুন : তোমার শরীরডা এডা পাল¬াত চড়াই অন্য পাল¬ায় চাউল দিবা নাইলে টাকা দিবা। বুঝছো? এই কথার মানে হচ্ছে- এক পাল্লায় মানুষ ও অন্য পাল্লায় চাল ওজন করে, চালটা মসজিদেও ইমামকে দান করতে হবে। এটাই এই জেলার, এই কক্সবাজার জেলার নিয়ম বলে ঘোষণা করেছেন কিছু ইমামরা। আর সব স্থানের মতো এখানেও প্রভাবশালী নেতারা নিয়ন্ত্রণ করছেন ইমামদের ইমামতিকে।<br />
কথার ফাঁকেই শহরের কাছাকাছি এসে গেছে বোট। প্রায় তিনঘন্টা টানা চলতে হয়েছে। বিকেল তিনটার দিকে ওদের বোট সমুদ্রের সীমানা কেটে বাকখালী নদীতে প্রবেশ করল। মিনিট দশেক চলার পরই পাইলট ইঞ্জিন বন্ধ করে দিল। ঘাট এসে গেছে। সাইনবোর্ডে লেখা বাজারঘাটা। এই প্রথম কক্সবাজার শহরের চেহারা দেখল এরফান। প্রথমেই ওরা গেল একটি খাবার হোটেলে। আর হোটেলে প্রবেশ মাত্রই মুখটা কালো হয়ে গেল মাস্টারের। কারণ ভেতরে খাবার খাচ্ছিলেন নুরু বদ্দার। এরফানকে দেখে যেন খুব অবাক হলেন তিনি। কুশল বিনিময় শেষ না হতেই আজমত মাস্টার বলে উঠলেন- তোমার মাস্টার যে এতো অসুস্থ এইডা তো কও নাই। এইডারে ডাক্তার দেখাইতে গ্রামের সবাই পাঠিয়ে দিল।<br />
শুনে যেন চমকে উঠলেন নুরু বদ্দার। আর এই ফাঁকে আজমত মাস্টার যেন অনেকটা পালাতে ব্যস্ত হলেন। বললেনÑ মাস্টার তুমি নুরুর সাথে একটু বস আমি একটা সদয় নিয়া আসি। দ্রুত চলে গেলেন তিনি।<br />
নুরু বদ্দারকে সব ঘটনা খুলে বললো এরফান। বিচারের রায়, ওকে ডাক্তার দেখানোর কথা সব।<br />
সব শুনে নুরু বদ্দার এরফানের হাতে একহাজার টাকা গুজে দিয়ে বললেন- মাস্টার তুমি তোমার বাবা-মায়ের কাছে ফিরে যাও। আর ঘটিভাঙা ফিরে যেও না। পারলে আজ রাত্র হবার আগেই পালিয়ে যেও।<br />
নূরু বদ্দারের কথা শেষ না হতেই ফিরে এলেন আজমত মাস্টার। এসেই তাড়া দিলেন- চল মাস্টার, তোমারে ডাক্তার দেখিয়ে আনি, সন্ধ্যার আগেই আবার ফিরতে হবেতো।<br />
নূরু বদ্দার বিদায় নিয়ে তারাতারি চলে গেলেন। এরফানকে নিয়ে আজমত মাস্টার চেঁপে বসলেন রিক্সায়। বাজারঘাটা থেকে বড়জোর দশ মিনিটের হাঁটা পথে এসেই রিক্সা ছেড়ে দিলেন। প্রধান সড়ক থেকে হাতের বামের একটা ছোটো সড়কে প্রবেশ করতে করতে আজমত মাস্টার বললেন- মাস্টার তোমারে আজ একটা নতুন জিনিস দেখামু। দ্যাখবা।<br />
এরফান- কী জিনিস?<br />
আজমত মাস্টার- চল, গেলেই দ্যাখবার পাবা।<br />
এখানে শিলা ভিডিও নামের একটি দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আজমত মাস্টার দুজন লোকের সাথে আঞ্চলিক ভাষায় কী সব কথা বলল। এরফান যার বেশিরভাগই বুঝতে পারলো না, তবে সিনেমা দেখার বিষয়ে আলাপ চলছে তা পরিস্কার বুঝতে পারলো ও। অল্পসময়ের মধ্যেই ওরা প্রবেশ করল মলিবাশেঁর বেড়া দিয়ে তৈরি স্কুল ঘরের মত লম্বা একটি ঘরে। সেখানে মাদুর ও চেয়ার পেতে লোকেরা ভিসিআরে হিন্দি ছবি দেখছে। এরফানকে সাথে নিয়ে আজমত মাস্টার সে ঘরে প্রবেশ মাত্রই একটু আগে আজমত মাস্টার যাদের সাথে কথা বলেছেন-তাদের একজন এসে কিশোর বয়সীদের তাড়িয়ে দিল। এরফানকেও সে তাড়াতে চাইলো কিন্তু আজমত মাস্টার বাঁধা দেয়ায় লোকটি বিকৃতভাবে হেসে বললÑ ইবা লালপোয়া। ও বড্ডা আড়ে একখানা গাঁওত দিও। ওদের কথার মানে এরফান বুঝতে পারলো না, শুধু বুঝল এটি একটি সীনেমা হল। এ অঞ্চলে সম্ভবত এভাবেই সীনেমা দেখে লোকে। আজমত মাস্টারও সীনেমা পাগল লোক। খুব সম্ভব সে শহরে এলেই এখানে এসে হিন্দি ছবি দেখে। তাই এখানের অনেকের কাছেই সে বেশ পরিচিত।<br />
কিন্তু ছবি আরম্ব হওয়া মাত্রই ঘৃণায় শরীর গুলিয়ে উঠলো এরফানের। এ জাতীয় ছবির কথা ও শুনেছে, কিন্তু জীবনে প্রথম ন্যাংটো নারী পুরুষকে এভাবে ছবিতে দেখে লজ্জায় ওর চোখে পানি এসে গেল। ছিঃ ছিঃ একজন স্কুল মাস্টার কী করে এভাবে ন্যাকেট ছবি দেখতে আসে। তাও এরফানের মতো একটা বাচ্চা ছেলেকে সাথে নিয়ে। এরফান উঠে দ্রুত বাহিরে চলে যেতে চাইলে আজমত মাস্টার থাবা দিয়ে ওর হাত ধরে ফেলল। একটানে ওকে তুলে নিল নিজের কোলে।<br />
ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ব এরফান প্রচ- চিৎকার করে খাঁমচী বসিয়ে দিল আজমত মাস্টারের মুখে, এতোই দ্রুত যে আজমত মাস্টার ওকে কোলে তুলে অনেকটা মেয়েদের মতই আদুড়ে ঢংঙে ঝাঁপটে রেখেছিল, আচমকা খাঁমচী এসে ওর মুখে পড়তেই পিছন দিকে হেলে সরে যেতে চাইলো, কিন্তু চেয়ার উল্টে এরফানকে সহ নীচে পরে গেলে ফ্লিম দেখায় মগ্ন মানুষেরা পিছনে তাকাতে বাধ্য হলো। এতে আজমত মাস্টার লজ্জা পেল কি-না তা বোঝা না গেলেও দ্রুত এরফানকে ছেড়ে দিয়ে সে নিজেকে সামলাতে ব্যস্ত হলো। আর এই ফাঁকে এরফান একছুটে সীনেমা হল থেকে বের হয়ে গেল। এরফান চলে যাচ্ছে দেখে আজমত মাস্টার চেঁচিয়ে উঠলো- এই ওকে ধর। ধর।<br />
ততক্ষণে এরফান প্রধান সড়কের পথ ধরে সোজা ছুটছে। ও জানেনা কোথায় যাচ্ছে, তবে ছুটতে ছুটতে একসময় ও  যখন প্রচ- হাঁপাতে শুরু করল তখন থেমে দেখলো জনমানবহীন একটা এলাকায় চলে এসেছে ও। পাশেই একটা পাহাড় আর পাহাড়ে চড়ার একটা পায়ে চলা পথ। ধীরে ধীরে শ্বাস নিতে নিতে এরফান পাহাড়ি পথে উপড়ে উঠে যেতে লাগল। কিছু দূর এগোতেই ও দেখলো সম্মুখে অপূর্ব সুন্দর একটি চৌচালা কাঠের বাড়ি। সন্ধ্যার আবশা আলোতেও দূর থেকেই ভিতরে গৌতমবুদ্ধের বিশাল মুর্তিটি ওর নজর কাড়লো। বুঝলো, এটা কোনো আশ্রম বা মথ। আশেপাশে জনমানুষ্যির কোনো চিহ্ন চোখে পড়ল না ওর। আশ্রমের সামনের পাটাতনটা এতোই পরিচ্ছন্ন যে ক্লান্ত এরফান সেখানে শুয়েই ঘুমিয়ে পড়লো।<br />
আচমকা পেটে গুতো খেয়ে ঘুম ভেঙ্গে গেল এরফানের। সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারলো কেউ ওর প্যান্ট ধরে টানাটানি করছে, খোলার চেষ্টা করছে। জিন্সের প্যান্ট, বেল্ট দিয়ে বাঁধা, তাই সহজে খোলা সম্ভব হয়নি, টানাহেচড়ায় ওর ঘুম ভেঙ্গেছে। লাফিয়ে উঠে দাঁড়াতেই কেউ একজন প্রচ- চড় মারলো ওর গালে। এতোটা জোড়ে যে মাথা ঘুরে উঠলো ওর, চোখের পানি আর ধরে রাখতে পারলো না। চাঁদের আবশা আলোয় আজমত মাস্টারকে চিনতে পারলো ও। সেই চড় মেরেছে ওকে, সাথে অপরিচিত আরও দু’জন লোক। একজন বললÑ ইস্ বদ্দা, এইখানে না, হোটেলেত লিয়া চলো। বান্থেরা টের পাইলে&#8230;।<br />
আজমত- ইভা গম হইর। চল, তার আগে ওয়াইন লাগের। চল।<br />
একহাতে এরফানকে শক্ত করে ধরে, পাহাড়ের উপরই উল্টো দিকে চলতে লাগলো ওরা। আজমত মাস্টার চলছে আগে আগে, পথ দেখিয়ে। কিছুদূর যাবার পর নীচে নামার একটা পথ। সে পথে ওরা নেমে আসতেই সম্মুখে পড়লো অনেকগুলো মলিবাঁশের তৈরি ঘরবাড়ি। প্রতিটি বাড়ি বাঁশ দিয়ে তৈরি এবং দোতলা। এখানে ঘরগুলোতে বিদ্যুত সংযোগ রয়েছে। তবে সব ঘরেই অল্প পাওয়ারের বাল্ভ জ্বলছে। হয়তো সন্ধ্যারাত বলেই আলো কমিয়ে রেখেছে সবাই। এরই একটি ঘরে প্রবেশ করল ওরা। অপরিচিতদের একজন ডাকলো- ও মাসি ক’ডে গৈল।<br />
দোতলা থেকে মেয়েলি মিষ্টি কণ্ঠের উত্তর শোনা গেল- ইভা কোন, মাওওই ঘরোত নাই, কী লাগের?<br />
অপরিচিত লোকটিই আবার কী সব ভাষায় কথা বলল, যা এরফানের কাছে কিচির মিচির শব্দ বলে মনে হলো। আজমত বলল- ওয়া, ইয়ে গ্লাস আর সোডাও দেয় য্যান।<br />
দোতলা থেকে একটি মেয়ে নীচে নেমে এলো। ছেলেদের মতোই লুঙ্গি আর শার্ট পরনে। আধো আলো-অন্ধোকারে মেয়েটিকে অপূর্ব সুন্দরী কোনো পরী বলে মনে হল এরফানের। ওর মধ্যে ভয় চলে এল- ইস এই শয়তানগুলো যদি মেয়েটিকে ধরে ফেলে। যদি মেয়েটির ক্ষতি করে।<br />
এরফানের মনের কথা টের পেয়েই বুঝি মেয়েটি ওর খোঁপা থেকে একটা চিকচিকে ধারাল চাকু বের করে হাতে নিল। সঙ্গে সঙ্গে খোঁপা খুলে লম্বা চুল গড়িয়ে হাটুতে এসে ঠেকলো। দ্রুত হাতে মেয়েটি আবার অদ্ভুত কায়দায় চাকুটা দিয়ে তার খোঁপা বেধে ফেলল। এরফান দেখলো মেয়েটির হাতের চাকু দেখে অপরিচিত দু’জন বেশ ভীত হয়ে পড়েছে। ওদের আগের হাবভাবেও বেশ পরিবর্তন চলে এল। কিন্তু আজমতকে দেখে কিছু বোঝা গেল না।<br />
মেয়েটি চারটে গ্ল¬াসে কী সব পানিয় মিশিয়ে ওদের সামনে রেখে গেল। সাথে একটি বড়ো জাগ। প্রত্যেকে একটি করে গ্ল¬াস হাতে তুলে নেয়ার পর আজমত এরফানকেও একটা নিতে বলল। উদ্ভট বোটকা পঁচা গন্ধে ইতিমধ্যেই এরফান নাক চেপে ধরেছে। রক্তচোখে আজমত ধমকে উঠতেই এরফান দ্রুত গ্ল¬াসটা তুলে নিল। এতে সবাই হাসিতে ফেটে পড়ল। আর হাসির শব্দে মেয়েটি দোতলা থেকে উকি দিয়ে দেখতে লাগল কী ঘটছে। বিষয়টা অন্যরা কেউ টের পেল না। মেয়েটির নামার পথে এরফান সামনা সামনি বসে থাকায় শুধু ওর সাথেই চোখাচুখি হল মেয়েটির। এরফানের চোখের ভিতরটা হয়ত ও পড়ে ফেলে। তাই ইশারায় মেয়েটি ঠোঁটে আঙ্গুল চেপে ওকে চুপ থাকতে বলল।<br />
এদিকে এরফান খাচ্ছে না দেখে আজমত কিচির মিচির ভাষায় অপরিচিতদের কি যেন বলল। এই অপরিচিতদের একজনের নাম আলমগীর অন্যজন সন্দীপ বড়–য়া। এই সন্দীপ বড়–য়া এরফানের প্যান্ট খোলার চেষ্টা করেছিল। এখন আজমতের কথা শুনে নিজের শার্টের নীচে কোমড় থেকে মরচে ধরা একটা চাকু বের করল। চাকুটা এরফানের গলায় ধরে বলল- খা, খেতে তোকে হবেই। খা।<br />
এই সময় আবার ক্যাচকোচ শব্দে দোতলা থেকে মেয়েটি নীচে নেমে এল। ওদের সাথে কিচির মিচির ভাষায় কী সব কথা বলল। ওরাও কিচিরমিচির শব্দ তুলে উত্তর দিল। মেয়েটি হাত বাড়িয়ে আমার চিবুক ধরে যেন নতুন বউকে ধরছে এমন ভাব করল। ইশারায় এরফানকে ওর সাথে যেতে বলল। আজমত ও অপরিচিত লোক দুটোও এরফানকে ইশারা করে মেয়েটির সাথে যেতে বলল।<br />
এরফান অনেকটা ভিত-মাতালের মতোই মেয়েটির পিছনে পিছনে পুনরায় পাহাড়ে উঠে এলো। এবার মেয়েটি পরিস্কার শুদ্ধ বাংলায় কথা বলে উঠলো- ওরা তোমাকে কোথা থেকে ধরে এনেছে।<br />
এরফান অবাক চোখে মেয়েটিকে দেখলো- তুমি বাংলা জানো?<br />
মেয়েটি উত্তরে পাল্টা প্রশ্ন করলো- কেন বাংলাদেশ কী শুধু তোমাদের একার সম্পদ? আমরা রাখাইনরাা কী বাংলাদেশের মানুষ না। এখানে একটা বার্মিজ মার্কেট আছে, দিনের বেলা আমাদের ছেলে মেয়েরা সেখানে কাজ করে। তোমাদের অনেকের চেয়ে অনেক ভালো শুদ্ধু বাংলা বলে তারা। ইংরাজীও বলে। সে বাদ দাও, তোমার কথা বল, তোমাকে কোথায় পেল ওরা।<br />
এরফান বলল- আগে আমাকে তোমার নামটা বল।<br />
মেয়েটি বলল- নাইরি। এরফান বুঝতে না পেরে আবার জানতে চাইলো। মেয়েটি আবারো বলল- নাইরী।<br />
না বুঝে এরফান বলল- ঠিক আছে আমি তোমাকে না-ই-দি বলে ডাকছি।<br />
এতে মেয়েটি শরীর ঝাকিয়ে হাসিতে ফেটে পড়ল। এরফান ধীরে ধীরে ওর বাড়ি ছেড়ে আসা এবং ঘটিভাঙ্গা দ্বীপে অবস্থান, রোজা না রাখা, বিচার, শহরে আসা সীনেমা দেখা ইত্যাদি সব খুলে বলল।<br />
মেয়েটি বলল- তাহলে তোমার কাছে এখন একহাজার টাকা আছে?<br />
এরফান দ্রুত ওর প্যান্টের পকেট হাতিয়ে টাকাটা বের করল। গুনে দেখল ঠিক আছে।<br />
মেয়েটি বলল তারাতারি আমার সাথে পা চালাও। বাস ধরতে হবে। লাস্ট বাসটা ধরতে পারলে আমি তোমাকে চিটাগাং পর্যন্ত পৌছে দেব। এ পর্যন্ত আমার ভাড়াটা অবশ্য তোমাকে দিতে হবে। তবে তোমার খাবারটা আমি দেব। মেয়েটির পিছু নিয়ে এরফান একটা বাসে চেপে বসল। এটি যাবে রামু-ঈদগাহ নামক স্থানে। পাশাপাশি দুটো সিটে ওরা বসেছে। এবার না-ই-দি বলতে শুরু করল- ওরা ঐ সময় আমাদের রাখাইন ভাষায় কথা বলেছে। ওরা যা বলছিল তার অর্থ হলো- এটাকে মদ গিলিয়ে বেহুশ না করলে খুব ডিস্টার্ব করবে। দেখলিনা গায়ে হাত দিতেই ঘুম ভেঙ্গে গেল।<br />
ওরা তোমাকে মেয়েদের মতো ব্যাবহার করতে চেয়েছিল। ঐ যে আলমগীর নামের লোকটা এখানের খুব ধনি লোক, হিরামণ নামে একটি বড় হোটেলের মালিক ও। তোমাকে ঐ হোটেলেই রাতে নিয়ে যেতে চেয়েছে। আর একবার ওদের খপ্পরে পড়লে তোমার উপাধি হতো লালপোয়া।<br />
লালপোয়া? সেটা আবার কি?<br />
ইস্! আস্তে বলো। বলেই হেসে উঠলো না-ই-দি। বললÑ পরে বড় হলে বুঝবে। এবার একটা কথা বলতোÑ তুমি আমাকে ঐ ঘরে দেখা মাত্র খুব ভয় পেয়েছিলে তাই না?<br />
হ্যাঃ কারণ ওরা কতটা খারাপ তার পরিচয় জেনে গেছি তো তাই, ভয় পেয়েছিলাম, যদি তোমার কোনো ক্ষতি? অনেকটা স্বগোক্তির মতোই কথাটা বলল এরফান।<br />
মেয়েটি হেসে উঠল আবার। নাহ, তুমি সত্যি খুব ভালো ও অবুঝ। ওরা মেয়ে লোভী না, ওদের লোভ তোমার মতো সুন্দর ছেলেদের প্রতি। এ অঞ্চলে এ ধরণের পুরুষের সংখ্যাই বেশি।<br />
কিন্তু এই যে তুমি আমাকে নিয়ে পালিয়ে এলে, পরে যদি ওরা তোমার কোনো ক্ষতি করে।<br />
না, তা পারবে না। আমাদের রাখাইন মেয়েদের পোষাক-আশাক, সাজ-সজ্জা প্রায় সবারই একরকম। খুব ভালো ভাবে লক্ষ্য না করলে আলাদা করে মুখ চেনার উপায় নেই। ওরাতো আমাকে দেখেছে রাতের বেলা। দিনে চিনতেই পারবে না।<br />
না-ই-দির কথা শুনে এরফানের বুকের ভিতর থেকে বেশ বড় একটা বোঝা নেমে গেল।<br />
এরফানকে নিয়ে না-ই-দি যখন রামুতে নামল তখন রাত এগারটা। এখানের এই গ্রামে তখন মাঝরাত প্রায়। দু’একটি কুকুর ছাড়া রাস্তায় কোনো মানুষ চোখে পড়ল না এরফানের। অন্ধকার রাস্তায় অনেকটা গর্বিত ভঙ্গিতে এরফানের হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে হাঁটতে শুরু করল না-ই-দি। যেন নিজের আপন ছোট ভাইটি, হোঁচট খেয়ে পরে যেতে পারে এ ভয়ে সে তটস্থ। রাস্তা ছাড়িয়ে পায়ে চলা পথে কিছুটা পথ যেতেই একটি পুরাতন দালান ঘর। না-ই-দি আসবে, কারো জানার কথা নয়, কিন্তু বেশ বৃদ্ধ একলোক দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। দূর থেকেই তিনি জানতে চাইলেন- কে? নায়ওরি?<br />
না-ই-দি- বান্তে বলেই একছুটে তার কাছে গেল এবং পায়ে হাত দিয়ে ধুলো নিলেন- এরফান এটা দেখে ভাবলো- এই একটা জায়গায় বুঝি সবাই বাঙ্গালী। না-ই-দি ও বান্তের মধ্যে অনেক সময় নিজেদের ভাষায় কি সব আলোচনা হলো, আলোচনার মাঝে বারবার এরফানকে দেখছিলেন বান্তে। এটা লক্ষ্য করে এরফান বুঝেছিল- যে আলোচনা তাকে নিয়েই। এতে ও বেশ লজ্জাও পেল। এই অন্ধকারে ওর লজ্জা পাওয়াটাও চোখ এড়ালো না না-ই-দির। বান্তের হাতের ইশারায় দেখানো একটি ছোট্ট দালান ঘরে এরফানকে পৌছে দিতে এসে তাই না-ই-দি বলল- শোন, এতো অল্পতে লজ্জা পেলে, ঘর ছেড়ে বের হলে কেন? ঐ যে বয়স্ক লোকটিকে দেখলে উনি আমাদের ধর্মিয় গুরু, আবার আমার বাবাও। আমি হচ্ছি ওনার তিন নম্বর স্ত্রীর তিন নম্বর ও শেষ সন্তান। তাই উনি আমাকে ভীষণ ভালো বাসেন। আমার আসার কথা কেউ জানে না, অথচ উনি ঠিক-ই জানেন। এটা তুমি টেলিপ্যাথি ভাবতে পারো, তবে আমি জানি ওনার আধ্যাত্ম একটা শক্তি আছে। সেটা-এতটাই প্রখর যে উনি এখানে বসে বসেই অনেক কিছু বলতে ও করতে পারেন। বিশেষ করে আমার জন্য উনি সব সময় জাগ্রত। আমি যে অপরিচিত তোমাকে নিয়ে এলাম, উনি তা আগেই জানতেন। তোমার কথাও উনি বললেন, বললেন তুমি খুব ভালো ও ধার্মিক ছেলে। সামনে তোমার অনেক বিপদ আছে, তুমি ঘরে ফিরে যাবে, তবে অনেক দেরি আছে তার। বাবা অবশ্য তোমাকে ঘরে ফিরে যাবার জন্য বলছেন। তোমার বাবা এখনো রেগে আছেন, কিন্তু তোমার মা &#8230;।<br />
প্লি¬জ না-ই-দি স্টপ। মায়ের কথা শুনতে রাজি নয় এরফান। মা&#8217;কে মনে পড়লেই ছুটে যেতে ইচ্ছে হয়।<br />
না-ই-দি কিছুক্ষণ নিরব এরফানকে দেখল, তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ধীরে চলে গেলেন ঘর ছেড়ে। আর এরফান মাত্র সাজিয়ে দেয়া বিছানায় বসে গুমরে কেঁদে উঠলোÑ মা আমায় ক্ষমা করো।<br />
নাইদির পরের কথাটা আর এরফানে শোনা হলো না। যদি শোনা হত, তাহলে কি হত বলা যায় না। তবে এরফান নির্ঘাত ছুটে যেত তার বাড়িতে।<br />
খুব সকালে এরফানের চেয়েও বয়সে ছোট এক কিশোর নাস্তা নিয়ে এল। নাইদি এলো না। সকাল গড়িয়ে দুপুর পার হল, নাইদির দেখা নেই। অথচ এরফান কোন পথে, কিভাবে, কোথায় যাবে তা ও জানেনা। এরফান যখন নাইদির অপেক্ষায় ব্যাকুল সময় কাটাচ্ছে, ঠিক তখন পাশেই পাহাড়ি টিলার মন্দির ঘরের উঠোনে নাইদিকে বকাঝকা করায় ব্যস্ত তার মা। এরফানের জন্যই সকাল থেকেই নাইওরি বাবা-মায়ের কাছে বকার উপরে আছে। বকার একটাই কারণ, শহরের ওয়াইন ঘরে হামলা চালিয়ে আজমত ও আলমগীররা তাদের ঘরটি ভেঙ্গে দিয়েছে। রাতে রাখাইনপারায় এই নিয়ে বেশ গন্ডোগোল হলেও নাইওরি বা এরফানের বিষয়ে কোনো কথা ওঠেনি। তবে ঘটনাটা নাইওরির জন্যই হয়েছে এটা বুঝেছেন শুধু নাইওরির বাবা-মা। এরফানের ডাকা এই নাই দি সদ্য যুবতী মেয়ে। যেমন সুন্দরী, তেমনি বুদ্ধিমতি। তারওপর এখানের রাখাইন সর্দারের মেয়ে হওয়ার কারণে এলাকায় তার প্রভাব অনেক। এই মূহুর্তে তিনজন মায়ের বকা সহ্য করেও সে ভাবছে কিভাবে এরফানকে নিরাপদে কোথাও রেখে আসা যায়। তার এই ভাবনা কেউ ধরতে না পারলেও বাবা ঠিকই বুঝেছেন। মায়েদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে বাবা তাকে নিয়ে গেলেন মন্দিরের পিছনে। সেখানে একটি পাথরে বসে বাবা তাকে অনেক বিষয়ে বললেন। সবশেষে বললেন, এরফানকে তুমি পথ দেখাতে পার, তার ভাগ্য বদলাতে পার না। সে চেষ্টা না করে তুমি স্বাভাবিক নিয়মে যেটুকু করার তা-ই কর।<br />
এরফানের সাথে এরপর নাইদির দেখা হয় সন্ধ্যার একটু আগে। হঠাৎ করেই ঘরে ঢুকে নাইদি বলতে থাকেন &#8211; কি সারাদিন ঘরে বসে আছ। বের হও, বলে নিজেই এরফানের হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে আসেন পাহাড়ের উপর মন্দিরটার কাছে। এখান থেকে অনেক দূরে রাস্তা দেখা যায়, একটা ছোট নদীতে নৌকার ভেসে চলা তারও দূরে ঘন জঙ্গল। নাইদি বলে- ঐ যে দূরে জঙ্গল দেখা যায়, ওটা পার হয়ে গেলেই নাফনদী। ঐ দিকটায় বার্মারাজ্য। নাফনদী ধরে কিছুদূর এগোলে বার্মার ম-া বা আকিয়াব পরবে। তুমিতো বাড়ি ফিরে যাবে না, তাই না?<br />
এরফানের কঠিন উত্তর- না।<br />
আমরা আজ থেকে তিনদিন পর আকিয়াব যাব। বাবা আর আমি। বাবা বললেন তোমাকে সাথে নিতে। আকিয়াব বার্মিজরাজ্য হলেও ওখানে মুসলমানদের বসবাস অনেক। ওখানে বাবার বন্ধুরা তোমার একটা ভালো ব্যবস্থা করে দিতে পারবেন। তুমি কি যাবে আমাদের সাথে।<br />
কিশোর উর্তিণ্য এরফান কোনো জবাব খুঁজে পেলনা। শুধু ফ্যাল ফ্যাল করে নাইদির চোখে চেয়ে থাকল। নাইদিও গভীর মমতায় এরফানকে জড়িয়ে নিল তার বুকে। সেও কাঁদছিল আর রাখাইন ভাষায় বিরবির করে কিছু বলছিল। পরে এরফান জেনেছে- নাইদি তাকে ভাই বানিয়ে তার কাছেই রাখতে চেয়েছিল। বান্তে বাবা এতে রাজী না হওয়ায় নাইদি বিয়ে করতে চেয়েছিলেন এরফানকে। আর এই ইচ্ছাটার প্রকাশ ঘটিয়ে নাইদি সারাজীবনের জন্য তার বাবা ও আত্মীয়দের কাছে নিজের মুখ দেখানোর দরজা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। এরফলে নাইদির আর সামাজিকভাবে বিয়ে হওয়াটা সম্ভব ছিল না। কারণ, রাখাইন আইনে মেয়ে যাকে পছন্দ করবে তাকেই বিয়ে করতে হবে। নাইদি পছন্দ করেছিল তার চেয়ে বয়সে ছোট মুসলমান এক ছেলেকে। যা সমাজ- গোত্র মেনে নিতনা। এরফানকে আকিয়াবে একজন মৎস ব্যবসায়ীর কাছে পৌছে দিয়ে নাইদি ও তার বাবা যখন চলে যাচ্ছিল, তখন গোপনে নাইদি এরফানের হাতে গুজে দেয় একটা চিরকুট। বলে যেদিন এটা বুঝবে, সেদিন ঘরে ফিরে যাবে তুমি।<br />
বার্মিজ ভাষায় লেখা নাইদির ঐ চিঠি আজও আগলে রেখেছে এরফান। তখন ঐ কিশোর বয়সে এরফান যা বোঝেনি, আজ তা পরিস্কার বুঝতে পারে ও। জানে ঐ চিঠিতে নাইদি লিখে গেছেন তার শেষ ইচ্ছা, অনেক না বলা কথা। মৎস ব্যবসায়ী আব্দুর রউউফ এরফানকে পৌঁছে দিলেন ভারতের দক্ষিণারাজ্যে ফুয়াদদের বাড়িতে। অভিজাত মুসলিম পরিবারে আশ্রয় পেল এরফান। শুধু জানলো না ওর নাইদির আত্মত্যাগের কথা, ফেরার পথে সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পরে চলে গেল সে পৃথিবী ছেড়ে। আর বান্তে বাবা শুধু মৃদু হাসলেন। যেন এসবই তার আগে থেকে জানাছিল।<br />
সত্যিই ঐ চিঠি যেদিন প্রথম পড়তে পারলো এরফান, সেদিন অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল। চিঠি পরেই এরফান ছুটে গিয়েছিল নাইদির গ্রামে। সেখানে তখন নাইদির পরিবারের একজন সদস্য বুড়ো মা-ই শুধু বেঁচে ছিলেন। তার কাছেই এরফান প্রথম জানতো পারলো নাইদির আত্মহত্যার সংবাদ। সেখান থেকে নাইদির বুড়ো মাকে সাথে নিয়ে ফিরে আসে নিজের বাড়িতে।</p>
<p>চার<br />
জুম্মার নামাজ শেষ হতে না হতেই আহঞ্জী বাড়িতে জড়ো হতে শুরু করলেন গ্রাম পঞ্চায়েত সদস্যরা। কাচারী ঘরে তাদের বসতে দিয়ে আপ্পায়নের দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত হলেন এরফানের বাবা নিজেই। তাকে সাহায্য করছেন কাচারী ঘরের আশ্রিত সুনীল। এ মূহূর্তে সুনীলের বউ, ছেলে মেয়েদের নিয়ে ভিতর বাড়িতে অবস্থান করছে। হঠাৎ করে এরফান কেন নিজে যেয়ে জেলাধীন সব উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানসহ এমপিকেও দাওয়াত করে এলো এ নিয়ে নিজেদের মধ্যেই নানান জল্পনা কল্পনা শুরু করেছেন তারা। এরফান নিজেও যখন একজন উপজেলা চেয়ারম্যান তাই তার নিমন্ত্রণ গ্রহণ না করে উপায় ছিলনা। তারচেয়েও বড় কথা এরফানের জনপ্রিয়তা আশেপাশের উপজেলাতেও সমানে বেড়ে চলেছে। ধনিয়া উপজেলার চেয়ারম্যান হিযযত আলী তো নিজের এলাকার মানুষের মুখে কথায় কথায় এরফান চেয়ারম্যান এটা করতে পেরেছে, ওটা করতে পেরেছে এই প্রশংসা শুনতে শুনতে রীতিমত এরফানকে মারার ফন্দি এটে ফেলেছেন। যে কারণে এ নিমন্ত্রণ রক্ষা তার জন্য জরুরী। এদিকে এরফানের জনপ্রিয়তায় ঈর্ষাম্বিত হলেও নিজের ডক্টরেট করা মেয়ের আচরণে এরফানের প্রতি মুগ্ধতা দেখে এমপি সাহেব না এসে পারলেন না। খাওয়া-দাওয়ার পর্ব শেষে সকলে গোল হয়ে বসলেন। মিটিং শুরু হলো। ক্ষমতা বলে স্থানীয় এমপি সাহেবই এখানে এখন পঞ্চায়েত প্রধান। সরকার চেয়ারম্যানদের ক্ষমতায়নে এমপিদের যে অধিকার দিয়েছেন তারই ফলশ্রুতিতে এমপি সাহেব পঞ্চায়েত প্রধান তো হয়েছেন কিন্তু স্থানীয় চেয়ারম্যানরা এতে মোটেও খুশি হননি। প্রথম প্রথম এমপি সাহেবের কাজে বাধা প্রদান করলেও এখন মুখবুঝে সহ্য করে নিয়েছেন। তবে সুযোগ পেলেই সাপে নেউলে সম্পর্ক ফণা তুলে ওঠে। যার প্রমাণ দেখা যায় তাদের আচরণে। আশেপাশের ইউনিয়ন- উপজেলার মোট ১৭জন চেয়ারম্যান এবং একজন মাত্র সংসদীয় প্রতিনিধিকে নিয়ে এখানের এই পঞ্চায়েত ব্যবস্থা এখনো টিকে আছে। তবে তা নাম মাত্র। চেয়ারম্যানদের অনেকেই বিরক্তিতে নাক কুচকোচ্ছেন। শুধু এরফান চেয়ারম্যান ব্যক্তিগতভাবে সবাইকে নিমন্ত্রণ করেছেন বলেই তারা এসেছে, পঞ্চায়েতে নয় এটা বুঝিয়ে দিতে কেউ কেউ একই কথা বলছেন বারবার- জ্বী এরফান সাহেব বলেন, আমাদের কেন এভাবে নিমন্ত্রণ পাঠালেন। পঞ্চায়েত প্রধানের আসনে বসা এমপি সাহেব-ই এরফানের প্রধান টার্গেট। এখানে উপস্থিত চেয়ারম্যানদের মধ্যে দু’জন মাত্র বয়সে প্রবীণ, অন্যরা সবাই এরফানের বয়জৈষ্ঠ তবে প্রবীণ নয়। একমাত্র এমপি সাহেবই বয়সের দিক দিয়ে সকলের বড় এবং রাজনীতিতেও অভিজ্ঞ। অথচ তাকে অবজ্ঞা করছে সবাই, বিষয়টা এরফানের ভালো লাগেনি। সে গলা খাকারী দিয়ে শুরু করল- আজ রাতে সকলে তারাবী পড়বেন, কাল রোজা। পবিত্র রমজান মাসের শুরু। এরকম একটা সময়ে আপনাদের যে কারণে ডেকেছি তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমরা সবাই মুসলমান। আর মুসলমানদের জন্য রমজান মাস-মানেই আত্মার শুদ্ধতা ও দৈহিক সংযমের মাস।<br />
এরফান মিয়া তুমি আসল কথা কও, তোমার কাছে ধর্ম জ্ঞান নিতে আসে নাই কেউ। ব্যঙ্গ করে উঠলেন প্রবীণ উপজেলা চেয়ারম্যান হিযযত আলী।<br />
এরফান- জ্বী আসল কথা বলতে গেলে চাচা এই কথাগুলোর দরকার আছে। আমরা রমজান মাস আসলেই খুব পরহেজগার আর ধার্মিক হয়ে যাই। কিন্তু এই রমজানের মূল শিক্ষা থেকে অনেক দূরে সরে গিয়ে আমরা নাফরমানিতে মেতে উঠি, সেটা কি আপনারা জানেন? আমার মনে হয়েছে আপনারা জানলেও সেটা ভুলে গেছেন। তাই আপনাদেরকে ভুলে যাওয়া বিষয়গুলো মনে করিয়ে দিতেই আমি আগে রমজান বা রোজার বিষয়ে আগে কিছু বলবো। আপনারা আমার বয়সে বড়, আমিই একমাত্র এখানে সবচেয়ে ছোট। তাই আগেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। আপনারা অনেকেই শুনেছেন, গতদিন আমি গ্রামে ঘোষণা দিয়েছি যে- আগামী ৫দিনের মধ্যে নাপিত বাড়ির পুড়ে যাওয়া ঘর তারাই মেরামত করে দেবেন যারা আগুন জেলেছে।’<br />
এটা শুনে-ই এমপি সাহেব আমাকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। তার ঘরে আমি এ নিয়ে আলোচনা করতে চাই নাই। তাই আজকের এই আয়োজন। আপনাদের অনেকে এ নিয়ে অনেক রকম মন্তব্য করেছেন, আপনারা শুনতে চাইলে আমি নাম ধরে কে কি বলেছেন তা বলতে পারবো। এ কথায় মুরুব্বিদের অনেকেই গুটিয়ে গেলেন। কেউ কেউ গলা খাকারী দিয়ে প্রসঙ্গ পাল্টানোর ঈঙ্গিত দিলেন।<br />
এরফান বলে চলছে- আমি আমার বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিতেই আপনাদের নিমন্ত্রণ পাঠিয়েছি। কারণ আমি বিশ্বাস করি আমাদের চেয়ারম্যানদের মধ্যে ঐক্যতা প্রয়োজন এবং আপনারা আমার বয়সে বড়, আপনাদের পরামর্শ ও সহযোগীতা ছাড়া আমি একা কিছুই করতে পারবো না। আমি যে ঘোষণা দিয়েছি তা পালন করতে হলেও আপনাদের সাহায্য ও সম্মতি দুটোই আমার প্রয়োজন। নিজের এলাকার উন্নয়নে, এলাকার মানুষের ভালোর জন্য্ আমার নেয়া সিদ্ধান্তে যদি কোনো ত্রুটি থাকে আপনারা আমাকে ধরিয়ে দেবেন। আমি আবারও আজ এই পঞ্চায়েতের সামনে একই ঘোষণা দিচ্ছি। আর বাকি ৪ দিন, এর মধ্যে সুনীল কাকুর ঘর মেরামত না হলে যে এ কাজটি করেছে তার ঘরও একইভাবে পুড়ে যাবার কথা আগাম আপনাদের জানিয়ে রাখছি। পরে কেউ যেন আমাকে দোষ না দেন সেটাও আপনাদের জানিয়ে রাখা উচিত বলে আমি মনে করি। আমি রমজানের প্রসঙ্গ এনেছি কারণ, আপনারা সবাই ধর্মভীরু। ধর্মকে ভালোবাসেন। আপনারা বিশ্বাস করেন যে- অপরের ক্ষতি করে কখনো ধর্ম পালন হয়না, রোজার মাসে আমাদের প্রধান শিক্ষাই হচ্ছে এই ধর্মের সম্ভ্রম কীভাবে রক্ষা করতে হবে তার জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা লাভ করা।<br />
এমন সময় বাইরে থেকে একটি কণ্ঠ ভেসে আসে- কীভাবে রক্ষা করতে হবে বলো বলো, দেখি তুমি রমজানের কতটা জান? সবাই তাকিয়ে দেখে জেলাসদরের প্রধান ইমাম সাইখুল আশরাফ হুজুরের আগমন। কোনো নিমন্ত্রণ ছাড়াই চলে এসেছেন তিনি। সঙ্গে তার বিশাল বাহিনী। সবাই আল¬াহু আকবর ধ্বনিতে কাচারী ঘরের বহিরাঙ্গণ কাঁপিয়ে তুলছে। তাদের চিৎকারে ছেলে বুড়োরা বাড়ির ভিতর থেকে ছুটে এসেছে কিছু একটা দূর্ঘটনার আশংকায়।<br />
এই সাইখুল আশরাফ হুজুর-এর দলটি প্রথম থেকেই এরফান-এর উপর খুব খেপে আছে। তার অন্যতম কারণ এ জেলায় বসবাসরত খ্রিস্টান পল্লীর প্রায় সকলেই এরফানকে খুব মান্য করেন এবং তাদের যেকোনো উৎসব-পার্বণে এরফানকে তারা নিমন্ত্রণ করেন। যেটা নাকি ধর্মিয় দৃষ্টিকোণ থেকে মহাপাপ। সাইখুল আশরাফ হুজুরের লোকেরা এ বিষয়টিকে সবখানে খুব বিশ্রীভাবে উপস্থাপন করেন। তারাই এরফানের নিন্দায় পঞ্চমুখ হয়ে তাকে ইহুদী-নাছারাদের চেলা ঘোষণা দিয়ে আহঞ্জি বাড়ির মসজিদে জুম্মা পড়ার উপরও নিষেধাজ্ঞা জারী করিয়েছেন। এতেও তারা খান্ত না হয়ে ইমাম সমিতিকে এরফানকে মুরতাদ ঘোষণার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু ইমাম সমিতির সভাপতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদের ইমাম। তিনি উচ্চ শিক্ষিত ও ধর্মিয় চিন্তা-চেতনায় সম্মৃদ্ধ একজন সৎ মানুষ। তিনি এরফানের সব কাজকেই সমর্থন করায় সাইখুল আশরাফ হুজুর এখন তার বিরুদ্ধেও উঠে পরে লেগেছেন।</p>
<p>এই দ্বন্ধের সুত্রপাত হয়েছিল এরফান গ্রামে আসার কিছুদিন পর। জমি সংক্রান্ত কাজে গ্রাম থেকে শহরে যাবার পথে খ্রিস্টান পল্ল¬ীর সামনে একটা জটলা দেখে এগিয়ে যায় ও। দেখে একজোড়া ছেলে-মেয়েকে ঘীরে দাড়িয়ে আছে পাশাপাশি দুটি গ্রামের বাসিন্দারা, সকলের হাতে লাঠি-সোটা। সবাই খুব উত্তেজিত। অবস্থা এমন যে, মুসলমান আর খ্রিস্টানের মধ্য যেকোনো মূহূর্তে মারামারি শুরু হয়ে যাবে। এরফানকে চেনেন এমন কেউ কেউ এরফানকে সরে যেতেও বললেন। কিন্তু এরফান বিষয়টা কি তা না জেনে সরে যেতে রাজী নয়। পরে দু’পক্ষের দুজন এসে এরফানকে সব জানালো। তাদের থেকে এরফান জানতে পারলো যে, সিকদার বাড়ির অসিরুদ্দি সিকদারের ছেলে আনিস কলেজে পড়তে যেয়ে খ্রিস্টান পল্লীর অনু সরকারের মেয়ে রোজীকে ভালবেসে ফেলেছে। এ নিয়ে অনেকদিন ধরেই গন্ডগোল চলচিল। অসিরুদ্দি চায় মেয়ে মুসলমান হলে তাদের বিয়েতে সে আপত্তি করবে না। অন্যদিকে অনু সরকার চান ছেলে খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণ করুক। তাহলে সে বাধা দেবেনা। এ নিয়ে দু’পরিবারে এমনকি ধর্মিয় নেতাদের মধ্যেও দ্বন্ধ শুরু হয়ে গেছে। উপায় না দেখে ছেলে মেয়ে দু’জন গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছিল। এখন গ্রামবাসী তাদের হাতেনাতে ধরে ফেলেছে। এরফান ছেলে মেয়ে দু’জনকেই নিজের সাথে নিয়ে গ্রামে ফিরে এল। ওদের কথাবার্তা শুনে ও জানতে পারলো যে, মেয়েটি আনিসকে এতোই ভালোবাসে যে সে মুসলমান ধর্ম গ্রহণ করতে রাজী, আবার ছেলেটিও মেয়েটির জন্য সব ত্যাগ করতে প্রস্তুত।<br />
এরফানের হস্তক্ষেপে আপাতত যুদ্ধের সম্ভবনা বন্ধ হলেও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লো গ্রাম থেকে শহরেও। ছুটে এলেন মাওলানা সাইখুল আশরাফ হুজুর ও তার বাহিনী, ছুটে এলেন খ্রিস্টান সমাজের কেন্দ্রিয় নেতা ফাদার আলফ্রেড গঞ্জালেস ও তার দল।<br />
এই কাচারী ঘরেই সেদিন এরফান রুদ্রমূর্তি ধারণ করেছিল। গ্রামবাসী জড়ো হয়ে সেদিন প্রথম এরফানের ভাষণ শুনে মুগ্ধ হয়েছিলেন। উপস্থিত ধর্মিয় নেতাদের কাছে এরফান প্রশ্ন করেছিলÑ আমাকে আপনারা এই উত্তর দিন যে, পৃথিবীতে ধর্ম আগে এসেছে না মানুষ আগে? কেন ধর্ম পরে এল? ধর্ম আসার কারণ কি ছিল?<br />
মানুষের মাঝে হানাহানি, অন্যায়-অবিচার বন্ধের জন্য যদি ধর্ম সৃষ্টি হয়ে থাকে তাহলে ধর্মের কাজ তো ভালবাসা সৃষ্টি করা। একে অপরের প্রতি ভালবাসা সৃষ্টির জন্য যদি পৃথিবীর সব ধর্ম সৃষ্টি হয়ে থাকে তাহলে এই ছেলে- মেয়ে দুটির অপরাধ কোথায়? কেন তাদের নিজ নিজ ধর্ম ত্যাগ করতে বলছেন আপনারা? আপনারা কি আল¬াহ বা আমাদের প্রভুর সেই কথাটি ভুলে গেছেন? এটা আমাদের কোরাণ শরীফে যেমন আছে তেমনি খ্রিস্টানদের বাইবেল-এ উল্লে¬খ আছে Ñ ‘কারো মনের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাকে বাধ্য কর না। একমাত্র মন থেকে ডাকলেই আমি সাড়া দেই।’<br />
তাহলে আমরা কেন ওদের মনের ওপর জোড় খাটাবো। এই ছেলে-মেয়ে দুটির বিয়ে আমি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে করাবো। আপনারা চাইলে আপনাদের দু’ধর্ম বিধান অনুযায়ীই ওদের বিয়ে হবে এবং ওরা যার যার ধর্ম পালন করে সংসার জীবন যাপন করবে। যদি কখনো ওদের একে-অপরের মন নির্দিষ্ট কোনো ধর্মকে মেনে নিতে চায়, ওরা তা করবে আমরা বাদা দেব না।<br />
এ সময় সাইখুল আশরাফ হুজুর বললেনÑ কিন্তু ওদের সন্তানরা তখন কোন ধর্মে দীক্ষা নেবে?<br />
এরফান- ওদের সন্তানরা বড় ও বুঝদার না হওয়া পর্যন্ত উভয় ধর্মেই দীক্ষা পাবে। তারপর তাদের যেটা ভাল মনে হবে সেটা তারা বেছে নেবে।<br />
এরফানের এ ঘোষণায় ভরা মজলিশের সামনে ফাদার আলফ্রেড গঞ্জালেস এরফানকে জড়িয়ে ধরে বলে উঠলেন- ভাই, তুমি আজ যে দৃষ্টান্ত তৈরি করলে তা আমাদের কাছে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। আমরা আজ থেকে আর কখনো কোনো প্রেমিক-প্রেমিকার পথে ধর্ম নিয়ে বাঁধা হয়ে দাঁড়াবোনা, এই মজলিশে আমি প্রতিজ্ঞা করে গেলাম। তুমি যেভাবে ভালো মনে করো ওদের বিবাহ দাও।<br />
ফাদার আলফ্রেড গঞ্জালেস মেনে নিলেও তখন খ্রিস্টানদের অনেকে বিষয়টি মানতে পারেন নি। আবার গ্রামবাসী সাধারণ মানুষ এ বিচারে অত্যন্ত খুশি হলেও সাইখুল আশরাফ ও সমমনা মুসলমানরা এটা নিয়ে অনেক ক্ষোভ প্রকাশ করতে দ্বিধা করেন নি। কিন্তু তারা এ বিষয়টি ব্যাখ্যা করে যখন আরো বড়ো আলেমদের সাহায্য চাইলেন এবং সেই আলেমরা সব শুনে উল্টো এরফানেরই প্রশংসা করতে শুরু করলেন, তখন তারা চুপ হয়ে গেলেন। এরফান অনেকটা গ্রামবাসীর সাহায্য নিয়ে প্রথমে খ্রিস্টান ধর্মিয় নিয়মে এবং পরে ইসলাম ধর্মের নিতি অুনযায়ী আনিস সিকদার ও রোজী সরকারের বিবাহ সম্পন্ন করে দিল। সেই থেকে খ্রিস্টান সমাজের বেশিরভাগ অংশের মানুষেরা, এমনকি তাদের চার্চের প্রধান পর্যন্ত এরফানকে ভালবাসেন। নির্বাচনে হঠাৎ দাঁড়িয়ে এরফানের জিতে যাওয়াটায় এই ভালবাসাই ছিল প্রধান হাতিয়ার।</p>
<p>পাঁচ<br />
এ মূহুর্তে কাচারী ঘরের সামনে তাদের বিক্ষোভ প্রদর্শন ও কোনো পূর্ব সংবাদ না দিয়ে হঠাৎ আগমনকে এরফান একেবারেই উপেক্ষা করল। এমনভাব দেথাল যে সে আসবে তা ও আগেই জানতো। তাই হুজুরকে সালাম জানিয়ে স্বসম্মানে বসার আমন্ত্রণ জানাতে জানাতে ও বললÑ হুজুর আসতে বেশ দেরি করে ফেললেন, সভা যে প্রায় শেষের পথে। এরফানের উপর তারা যে প্রচ- ক্ষেপে আছেন সেটা বুঝিয়ে দিতেই সাইখুল আশরাফ হুজুর এরফানের সালামের কোনো জবাব না দিয়েই একটি চেয়ার টেনে বসে পড়লেন। বললেন- থামলে কেন মিয়া তুমি কী জান, কতটা জান তা আমাদেরও জানতে হবে তো। কও। কও দেহি রোজা কি কও?<br />
জ্বী হুজুর! আমি যদি কোনো ভুল বলি আপনি ধরিয়ে দেবেন। বলেই এরফান শুরু করল। রমজানে আমরা রোজা কেন রাখি? কেন নবীজী মুসলমানদের জন্য রোজা রাখা ফরজ বলে গেছেন? কারণ, রোজা রাখলে আমরা উপবাস থাকি। এতে শরীরের অনেক তেজ কমে যায়। শরীর মনের উপর প্রভাব ফেলে আমাদের দিয়ে অনেক পাপ কাজ করিয়ে নেয়। ক্ষুদার্ত শরীরে লোভ, লালসা, কাম, হিংসা, বিদ্বেষ ইত্যাদী প্রবণতা সহজে আসেনা। এটা আমাদের হানাহানি থেকে দূরে রাখে। একটানা একমাস এই সংযম যে পালন করে সে আত্মার শুদ্ধতা লাভ করতে পারে, যদি তার সংযম পালন সঠিক হয়। কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে অনেক সময়ই তা হয় না। আমরা উপবাস থাকি ঠিকই, কিন্তু রোজার সম্মান দিই না। আমাদের রোজা হয় না। কারণ ইফতার ও শিহরী বেলায় বসে এতোই খাই সারাদিন এ খাবার যোগারের চিন্তায় বেলা চলে যায়। আমাদের রিপুগুলো লোভ-লালসা ইত্যাদী কু-প্রবণতা মুক্ত হতে পারে না। রোজা রেখে কেউ যদি একটা মিথ্যা কথা বলেন তাহলে তার রোজা ভেঙ্গে যায়। কী হুজুর আমি ঠিক বলছিতো? এরফান হুজুরের কাছে জানতে চওয়ায় হুজুর গর্বিত ভঙ্গিতে বলেন- একদম ভাঙ্গে না মাকরু হয়ে যায়। তাহলে এবার আপনি-ই বলুন হুজুর- ইসলামে সবার আগে কী আছে? এরফানের হঠাৎ এ প্রশ্নে সাইখুল আশরাফ হুজুর ভ্যাবা চ্যাকা খেয়ে গেলেন- তিনি। সঙ্গে সঙ্গে বললেন- সবার আগে সেবার কথা বলা আছে।<br />
সেবার কথাই যদি থাকে, সেই সেবা নিশ্চয়ই পশু-প্রাণীর না।<br />
হুজুর ক্ষেপে উঠলেন- পশু-প্রাণীর হতে যাবে কেন মানুষের সেবার কথাই বলা আছে।<br />
তাহলে হুজুর এটাও দয়া করে বলে দিন যে সেখানে কোন মানুষের সেবার কথা বলা হয়েছে? উপস্থিত চেয়ারম্যানদের মধ্যে পিনপতন নিঃস্তব্দতা। সকলে এই আলোচনায় বেশ মজা পাচ্ছেন তা তাদের চোখেমুখে স্পষ্ট হয়ে আছে।<br />
অনেকটা ক্রদ্ধ স্বরেই হুজুর বললেন- বিপদগ্রস্থ ও অসহায় মানুষের সেবা প্রথমে।<br />
তাহলে হুজুর আপনিই বলুন- এই যে সুনীল কাকুর ঘর পুড়িয়ে দিল। এই অসহায় মানুষটার পাশে দাঁড়ানো কি অপরাধ?<br />
হুজুর এবার গম্ভীর হাসি দিলেন- এইতো তোমরা ছোকরারা দু’পাতা পড়ে শিখে এসেছো। সুনীল তো বেদীন, কাফের। কাফেরের সেবার কথা ইসলামে বলে নাই।<br />
কিন্তু হুজুর আপনিই বলেছেন- মানুষের সেবার কথা ইসলাম বলেছে। সুনীল কাকা আগে মানুষ না কাফের?<br />
এ প্রশ্নে আবার ভ্যাবাচ্যাকা খেলেন সাইখুল হুজুর। তিনি কোনো উত্তর খুঁজে পেলেন না।<br />
এরফান বলে যেতে লাগল- আগামীকাল থেকে পবিত্র রমজান মাস শুরু হচ্ছে। এই রমজান মাসের শিক্ষাই হচ্ছে উত্তম শিক্ষা। যারা সুনীল কাকুর ঘর পুড়িয়েছেন তারা মুসলমান হলে ৪ দিনের মধ্যেই তার ঘর আবার দাঁড় করিয়ে দেবেন। আর যদি অন্য ধর্মের হয় তাহলে ২দিন মাত্র সময় পাবেন। আজ আমাদের শ্রদ্ধেয় হুজুরের সম্মুখে এবং মাননীয় এমপি সাহেবের সম্মুখে আমি প্রতিজ্ঞা করে বলছি অন্যথায় তাদের ঘর আমি পুড়িয়ে দেব।<br />
এরফানের এ ঘোষণায় কাচারী ঘরে মৃদু গুঞ্জন উঠলো। এমপি সাহেব উঠে দাঁড়ালেন- পঞ্চায়েত প্রধান হিসেবে আমিও এরফান চেয়ারম্যানের সাথে আছি। কারণ আজ সুনীলের ঘর পুড়েছে, কাল ওরা হয়তো আমার ঘরটাই পুড়িয়ে দেবে। তাই আমিও এরফানের সাথে একমত। কিন্তু ৪ দিনের মধ্যে এটা না হলে এরফান কী করে তাদের সনাক্ত করবে এটাই আমার প্রশ্ন।<br />
অপর একজন উপজেলা চেয়ারম্যান মনির হোসেন বলে উঠলেন- এরফান তুমি যেভাবে বলছো, তাতে মনে হচ্ছে তুমি তাদের জানো। তাহলে তুমি কেন তাদের নাম বলছো না?<br />
এরফান মৃদু হেসে বলল- তাদের নাম আমি জানলেও বলতাম না কারণ, তারা সমাজের চোখে খারাপ হতে চায় না বলেই রাতের আধারে ঘর পুড়িয়ে দিয়েছে। সুনীল কাকাও তাদের জানে তাই তারা ঘুমন্ত মানুষকে পুড়িয়ে মারতে চেয়েছে। তাদের সাথে সুনীল কাকার নিজ ধর্মের লোকও জড়িত। তানা হলে গরু ঘরে আগে আগুন জ্বলতো না, জ্বলতো সুনীল কাকার বসত ঘরে।<br />
এরফানের এ ধরণের বক্তব্যের মাঝেই যেমনি হঠাৎ এসেছিলেন সাইখুল আশরাফ হুজুর, তেমনি কাউকে কিছু না বলে চলে গেলেন নিরবে।<br />
সভা শেষ হলো। সবাই বিদায় নিয়ে চলে যাবার পর বাবা জানতে চাইলেন- তুই কি পাগল হয়েছিস? এভাবে সবাইকে খেপিয়ে কি সুনীল-এর ঘর তৈরি করতে পারবি?<br />
এরফান মৃদু হেসে বলল- চিন্তা করনা বাবা। আজ রাতেই দেখবে সুনীল কাকু তার ঘর তৈরির কাজ শুরু করে দিচ্ছে। এবার চল খুব খিদে পেয়েছে।</p>
<p>(চলবে)</p>
]]></content:encoded>
					
					<wfw:commentRss>https://shahittabazar.com/%e0%a6%a7%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a7%8d%e0%a6%ae%e0%a6%bf%e0%a6%95-%e0%a6%a7%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a6%ac%e0%a6%be%e0%a6%b9%e0%a6%bf%e0%a6%95-%e0%a6%89%e0%a6%aa%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%af/feed/</wfw:commentRss>
			<slash:comments>0</slash:comments>
		
		
			</item>
	</channel>
</rss>
