হাসপাতালে কবি ওমর আলী : আবারও কবিতা লিখতে চাই

সাহিত্য বাজার

KOBI-OMAR-2

হাসপাতালে কবি ওমর আলী । ছবি সময় টিভির সৌজন্যে

দীপন নন্দী  (অতিথি লেখক) : নিভৃতেই ছিলেন দীর্ঘদিন। গতবছর স্ট্রোক করার পর কিছুটা খবর মিলেছিল পঞ্চাশ দশকের অন্যতম প্রধান কবি ওমর আলীর। এরপর গত কয়েক দিন আগে শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি। বিভিন্ন গণমাধ্যমে সে খবর পেয়ে দায়িত্ব নিলেন খোদ প্রধানমন্ত্রী। এগিয়ে এলো ল্যাবএইড হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তাদের প্রচেষ্টায় বুধবার রাতে পাবনা থেকে সরাসরি ভর্তি হলেন ল্যাবএইড কার্ডিয়াক সেন্টারে। সেখানকার ইন্টেনসিভ কেয়ার ইউনিটের (আইসিইউ) ৬১৫ নম্বর কেবিনে শুয়ে আছেন তিনি। মুখে নল দিয়ে প্রবেশ করাতে হচ্ছে খাদ্য। অশ্রুসজল নয়ন যেন না বলেও বলে দিচ্ছে অনেক কথা। অস্ফুট স্বরে তিনি বর্তমানকে জানালেন, আবারও তিনি কাব্যজগতে প্রবেশ করতে চান। সফেদ কাগজ ভরিয়ে দিতেন চান পঙিক্তমালায়।
এরই মাঝে বৃহস্পতিবার দুপুরে কথা হলো তার সঙ্গে। পরিচয় দিতেই চোখের কোণে জমে উঠল অশ্রুকণা। যেন টোকাতেই ঝরে পড়বে অশ্রুধারা। কেমন আছেন— জানতে চাইলে কথা বলার আপ্রাণ চেষ্টা। কিন্তু গত বছরের স্ট্রোকের পর তিনি যে কথা বলতে পারেন না। তাই তো অস্ফুট স্বরে জানালেন, ‘আগের চেয়ে কিছুটা ভালো আছেন।’ তারপর আইসিইউতে নেমে এলো নীরবতা। সেই নীরবতা ভাঙলেন তিনিই। অনেক কিছু বললেন। কিন্তু শোনা গেল না তার কিছুই।
এ সময় ওমর আলীর জামাতা রফিকুল ইসলাম বলেন, গত বছর স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার পর থেকে তিনি কথা বলতে পারেন না। পরিচিত কাউকে দেখলে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন। তবে কাগজে লিখে কিছু জিজ্ঞাসা করলে, মাথা নাড়িয়ে উত্তর দেয়ার চেষ্টা করেন।
চিকিত্সার দায়িত্ব নেয়ার পর বৃহস্পতিবার ল্যাবএইড হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ গঠন করেছে মেডিক্যাল বোর্ড। মেডিসিন ও নিউরোলজি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. আশরাফ আলীর নেতৃত্বে চার সদস্যের মেডিক্যাল বোর্ডে রয়েছেন ইন্টারনাল মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. সমীরণ কুমার সাহা, কিনডি রোগ ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এম এ সামাদ এবং ফিজিক্যাল মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এ কে এম সালেক।
অধ্যাপক ডা. আশরাফ আলী কবি ওমর আলীর শারীরিক অবস্থার বর্ণনা দিয়ে বর্তমানকে বলেন, ‘ওমর আলী বয়সজনিত মাল্টি ইনফাক্ট ডিমেনশিয়ায় ভুগছেন। গত বছর স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। নতুন করে আর স্ট্রোক হয়নি। তার বাঁ পাশ অবশ। বুধবার থেকেই ফিজিওথেরাপি দেয়া হচ্ছে। আরও চার থেকে পাঁচটি মেডিক্যাল পরীক্ষা করা হবে। পর্যায়ক্রমে পরীক্ষা করে তার স্বাস্থ্যের সঠিক চিত্র জানা যাবে।’
আশরাফ আলী জানান, তিনি হয়তো পুরোপুরি সুস্থ হবেন না। তবে যতটা সম্ভব সুস্থ রাখা যায় ততটা চেষ্টা করা হবে। ওমর আলী আর কখনও আগের মতো স্মরণশক্তি ফিরে পাবেন না। লেখার ক্ষমতা ফিরে পাবেন না। তাকে কয়েক সপ্তাহ নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা যাবে। তবে যতদিন তিনি বেঁচে থাকবেন ততদিন ফিজিওথেরাপি করে যেতে হবে।
ল্যাবএইড হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. এ এম শামীম বর্তমানকে বলেন, ‘বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ পড়ে ওমর আলীর চিকিত্সা দেয়ার জন্য সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তিনি যতদিন সুস্থ না হন ততদিন তার চিকিত্সা সেবা দিয়ে যাবে ল্যাবএইড।’
পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের অন্যতম প্রধান কবি ওমর আলী ১৯৩৯ সালের ২০ অক্টোবর পাবনা জেলার চরশিবরামপুর গ্রামে মামার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক, সাপ্তাহিক ও সাহিত্য সাময়িকীতে নিয়মিত কবিতা লিখেছেন। তিনি ছিলেন দুই বাংলার সুপরিচিত কবি। প্রেমের কবি হিসেবেও তার ছিল সুখ্যাতি। এ যাবত কবিতা ও উপন্যাস মিলে তার ৪০টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। কাব্যসাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য ১৯৮১ সালে ‘এদেশে শ্যামল রঙ রমণীর সুনাম শুনেছি’ কাব্যগ্রন্থের জন্য তিনি লাভ করেন বাংলা একাডেমি পুরস্কার। প্রতিভার স্বীকৃতি স্বরূপ তিনি আরও অর্জন করেছেন বন্দে আলী মিয়া পদক, আলাওল পদক, আবুল মনসুর আহমেদ পদক, রাজশাহী বিভাগীয় গুণীজন সম্মাননা পদক প্রভৃতি।

 

Print Friendly