স্বাধীনতার সাহসী সৈনিকদের স্মরণে : আলী যাকের

অতিথি লেখক

স্বাধীনতার সাহসী সৈনিকদের স্মরণে 

লেখক

লেখক

আলী যাকের

কেন্দ্রীয় ভাষা শহীদ মিনারের ঠিক বিপরীত দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যে ভবনটি সায়েন্স অ্যনেক্সবিল্ডিং হিসাবে পরিচিত তারই নিচের তলার একটি কামরায় পাঁচজন তরুণ প্রায় প্রতি সন্ধ্যায় মিলিত হ‘ত। কাজ ছিলো দাবা খেলা আর বলাইয়ের ক্যান্টিনের চা কাপের পর কাপ গলধ:করণ করা। সেই চা ছিলো অত্যন্ত বিস্বাদ। অনেকটা কবিরাজি ঔযুধের মত তেঁতো। তবুও প্রতি সন্ধ্যায় ঐটা-ই মনে হ‘ত অমৃত। এই তরুণেরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে বিভিন্ন পেশায় ইতোমধ্যে কাজ করতে শুরু করেছে। তবুও এরা বিশ্ববিদ্যালয়ের মায়া কাটাতে পারেনি। সবচেয়ে বড় কথা এদের মধ্যে একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যাতত্ত্ব বিভাগে ছাত্র পড়াতো। সেই সুবাদেই তার জন্য বরাদ্দ ছিলো ঐ কামরা। সেই ১৯৬৯-এর গণঅভ্যূত্থানের সময়ে এরা ছিলো রাজপথে।
এই পাঁচজন ছিলো রাজনীতি সচেতন, দেশন্মাদ প্রায় অস্থির তরুণ যারা ভাষা, সংস্কৃতি, বাঙালীত্বের প্রশ্নে কোন আপোষ করার কথা চিন্তাও করতে পারতো না। ১৯৭১ এর মার্চ মাস। সমগ্র বাংলাদেশতখন উত্তাল। সেই সঙ্গে এই তরুণেরাও রোজ সন্ধ্যায় একসাথে শহীদ মিনারের পাদদেশে সমবেত হ‘ত দেশাত্ম বোধক গান, নৃত্য, কবিতা এবং বক্তৃতায় বুক জুড়িয়ে গেলে অ্যানেক্স ভবনের সেই ঘরে এসে নানা বিষয়ে উত্তেজিত ভাবে বিভিন্ন সম্ভাবনা নিয়ে কথাবার্তা বলতো। পূর্বপাকিস্তান অচিরেই যে বাংলাদেশ হয়ে যাবে সে বিষয়ে এদের মনে কোন সন্দেহ ছিলোনা। এই প্রত্যয় তাদের হয়েছিল ১৯৭০ এর নির্বাচনে যখন নিশ্চিত রায় দিলো যে বাঙালী নিজস্ব শিল্প, সংষ্কৃতি, চিন্তা-ভাবনা, বোধ এবং বুদ্ধি নিয়ে একটি ভিন্ন জাতি। পাকিস্তানের সাথে তাদের কোথাও কোন ধরনের মিল নেই, যাতে ভারত উপমহাদেশের দুই প্রান্তে অবস্থিত এই দেশটি একদেশ থাকতে পারে। ১৯৬৯-এর ২৩শে মার্চ পল্টন ময়দানের এক জনসভায় পূর্ব বাংলার অবিসংবাদিত নেতা শেখ মুজিবুর রহমান ‘বঙ্গবন্ধু’ বলে আখ্যায়িত হন। সেই তখন থেকেই এরা বঙ্গবন্ধুর প্রতিটি কথা এবং প্রতিটি ইশারা অতি সুক্ষ্ম ভাবে অনুসরণ করতো, বিশ্লেষণ করতো এবং নেতার পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে নজর রাখতো।
Muktijuddo 2মার্চে পাদ প্রদীপের আলোয় যেমন কিছু আপাত তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা ঘটছিল, পর্দার আড়ালে একই সাথে বিছানো হচ্ছিল ষড়যন্ত্রের জাল, ৩রা মার্চ খবর পাওয়া গেল যে জেনারেল ইয়াহিয়া খান, জুলফিকার আলী ভূট্টোর পরামর্শ অনুযায়ী জাতীয় পরিষদের অধিবেশন নির্ধারিত দিনে ডাকা থেকে বিরত থাকছে। এই খবর শোনামাত্র বাংলার মানুষ গর্জে উঠলো। তারা স্বত:স্ফুর্তভাবে খন্ড খন্ড মিছিল শুরু করলো সারা দেশে। শ্লোগান উঠলো ‘‘পাকিস্তানিরা বাংলা ছাড়ো’’ ।
ঢাকা স্টেডিয়ামে পাকিস্তান বনাম কমন ওয়েলথ একাদশের মধ্যে ক্রিকেট ম্যাচ হচ্ছিল। সেটি বন্ধ হয়ে গেল। স্টেডিয়ামের সামিয়ানায় আগুন ধরিয়ে দিলো বিক্ষুব্ধ জনতা। বাংলাদেশের সর্বত্র মিলিটারীর গুলি চললো। অজস্র মানুষ আত্মাহুতি দিলো।
হোটেল পূর্বাণীতে বঙ্গবন্ধু এক সাংবাদিক সম্মেলন ডাকলেন। সেখানে ঘোষণা দেওয়া হ‘ল। বাংলাদেশের মানুষ সেই দিন থেকে সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনে অবতীর্ণ হ‘ল। বিকেলে পল্টন ময়দানে উন্মোচিত হ‘ল বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত পতাকা। সারাদেশ চলতে থাকলো বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে। সন্ধ্যায় প্রথাসিদ্ধভাবে পাঁচ বন্ধু মিলিত হলো সায়েন্স অ্যানেক্স বিল্ডিং-এর ঐ ঘরে। দেশের এই পরিস্থিতিতে ওদের বসে থাকলে তো চলবে না। কিছু একটা তো করতেই হবে। এখন আর বসে থাকার দিন নয়। দূর থেকে যেন ভেসে এলো সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতার চরণ ‘‘প্রিয় ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য”। এদিকে ভাবনা, কি করা যায়?
ওদের এক বন্ধু খোঁজ দিলো তার পরিচিত একজন, সে বোমা তৈরীতে পারদর্শী। সেই ব্যক্তির মাধ্যমে গোটা কয়েক বোমা তৈরী করানো হ‘ল। দুর থেকে নেগেটিভ, পজেটিভ ঘষে বিষ্ফোরণ ঘটানো যায়। ইতোমধ্যে ৭ই মার্চ সমাগত। দলের সবাই লক্ষ, লক্ষ মানুষের সঙ্গে মিছিল করে গেলো রেসকোর্স ময়দানে। রেসকোর্স যেন জনসমুদ্র। নেতা এলেন।দ্রুত পায়ে সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেলেন বিশাল মঞ্চের ওপরে। তারপর সেই অবিনশ্বর আহবান, “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।” সেই সন্ধ্যাতেই মিলিত হ‘ল ঐ পাঁচজন অ্যানেক্স বিল্ডিং-এর ঐ ঘরে। শহীদ মিনারে তখন নেতার ভাষণে অনুপ্রাণীত শিল্পীরা দ্বিগুণ উৎসাহে গাইছে “আমার দেশেরও মাটির গন্ধে…”।
M 1ঐ ঘরে ওদের একজন বলে ওঠে গানবাজনায় হবেনা, অ্যাকশান চাই। বোমা প্রস্তুত। সিদ্ধান্ত হ‘ল ঐ ৭ তারিখ রাতেই বোমা পরীক্ষা করা হবে। তখন রাত একটা। শহীদ মিনারে অনুষ্ঠানাদি শেষ হয়ে গেছে অনেক আগে। এই পাঁচজনের মধ্যে একজনের ছিলো একটা ভাঙাচোরা ফোক্স ওয়াগেন গাড়ী। ওটি অবশ্য বলতে গেলে ছিলো সকলেরই গাড়ী। সেই গাড়ীতে পাঁচজন অতি সাবধানে বেরুলো সায়েন্স অ্যানেক্স ভবন থেকে। অতিযত্নে বিষ্ফোরক কোলের ওপর রাখা। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ঘোরাঘুরি করলো কিছুক্ষণ। সব রাস্তাতেই অল্পবিস্তর ব্যারিকেড দেয়া। সেগুলো সরিয়ে, সরিয়ে সন্তর্পনে পাওয়া গেল একটা ইস্পাতের তৈরী খালি পানির ট্যাংক। নিশ্চয়ই কোন হলের বাতিল করা ট্যাংক দিয়ে ব্যারিকেড দেয়ার চেষ্টা করে ছিলো ছাত্ররা। সিদ্ধান্ত হ‘ল ঐ ট্যাংকের ভেতরেই ফাটানো হবে বোমা। দু’জন নেমে গেলো বিষ্ফোরক স্থাপন করার জন্য। গাড়ীটা দ্রুত সরিয়ে নেয়া হ‘ল অন্য দিকে। একবার চক্কর দিয়ে গাড়ী আবার ফিরে এলো। ততক্ষণে স্থাপন করা শেষ। বোমার সাথে সংযুক্ত তার দুটো সযত্নে গড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হ‘লো একটি বৃহৎ বৃক্ষের পেছনে। গাড়ীটা সরিয়ে নেয়া হয় আরও দূরে।তারপর তারের নেগেটিভ-পজিটিক্সে একটি ঘর্ষণেই বিকট আওয়াজে ফেটে গেলো বোমা। ওরা পাঁচজন উল্লাসে ফেটে পড়তে গিয়েও সংযত করলো নিজেদের। তখন ঢাকা ঘুমে অচেতন।ঢাকা যেন প্রতিদিন অগ্নিগর্ভ হয়ে ওঠে। প্রতিদিন বাংলাদেশের সর্বত্র পাখির মত পাকিস্তানিদের শিকারে পরিণত হয় মানুষ। উত্তেজনা বাড়তে থাকে। বাড়তে থাকে প্রতি সন্ধ্যায়শহীদ মিনারে ভীড়। গান আর কবিতায় অবিরত উচ্চারিত হয় স্বাধীনতার অমিত বাণী।
ওরা পাঁচজন নিজেদের দৈনন্দিন কাজকর্ম ভুলে হয়ে ওঠে মহাসড়কের সগ্রামী।
মার্চেও কয়েকদিন চলতে থাকে সংলাপ, সংলাপ খেলা। ইয়াহিয়া খান ভাব দেখায় যে বঙ্গবন্ধুর সাথে সে বাংলার মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের সাধু চেষ্টায় আন্তরিকভাবে নিয়োজিত। ওদিকে বিমানে প্রতিদিন আসতে থাকে অস্ত্রধারী সৈনিক এবং মিলিশিয়া। প্রতিটি সেনা ছাউনি কানায়, কানায় পরিপূর্ণ হয়ে যায় হিংস্র হায়নায়। ঐ পাঁচজনের এক আত্মীয় যিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ট তাঁর বাড়ীতে মেজর খালেদ মোশাররফ আসেন জানতে নেতার নির্দেশ। বঙ্গবন্ধু মহাত্মা গান্ধীর মত অসীম ধৈর্যের আধার যেন। তিনি শান্তির দূত, ভাবেন একটা দেশের সকল মানুষের ইচ্ছেকে কি অস্ত্র দিয়ে অবদমিত রাখা যায় ? অসহযোগিতায় পাহাড় টলবেই। বঙ্গবন্ধু ছিলেন উদার প্রাণ এক মানুষ।তিনি মানুষের সাথে মানুষের মত কথা বলতে অভ্যস্ত ছিলেন। কিন্তু যারা পশুরও অধম তাদেরকে তিনি চিনবেন কি করে? পাকিস্তানিদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর আলোচনা ভেঙে গেলো। বাংলার মানুষ হয়ে উঠলো উন্মত্ত সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ের মত। পঁচিশে মার্চ সন্ধ্যা। পাঁচ বন্ধু তাদের পরিচিত ঘরে মিলিত হয়েছে আজো। বাইরে শহীদ মিনারে যথারীতি দেশাত্ববোধক অনুষ্ঠানাদি চলছে। ভেতরে উত্তেজিত কথাবার্তা। সকলেরই মনেপ্রশ্ন ‘‘কী হবে এখন?’’ একজন তুমুল উত্তেজনায় চিৎকার করে বলে উঠলো, ‘‘আমরা লড়বো’’। আরেকজন ভাবলো বোমাগুলো তো আছেই। আর হৃদয়ের মত মারাত্মক এক আগ্নেয়াস্ত্র ? হঠাৎখেয়াল হ‘ল যে আজ শহীদ মিনারের অনুষ্ঠান যেন তড়িঘড়ি শেষ হয়ে গেল। ওরা বারান্দায় এসে দেখলো শহীদ মিনারের আলো নিভে গেছে। চারিদিক শুনশান। পিঠের শিরদাঁড়া দিয়ে ঠান্ডা একটা তরল বয়ে গেল যেন। তখন রাত ১০টা। প্রত্যেকেরই মনের ভেতরে চাপা অস্থিরতা। কি করবো ? কোথায় যাবো ? ওরা সিদ্ধান্ত নিলো ইকবাল হলে (এখন জহরুল হক হল) যাওয়ার। যেমন ভাবা তেমন কাজ। সেই আধভাঙা ফোক্স ওয়াগেনে চেপে ইকবাল হলের উদ্দেশ্যে যাত্রা। রোকেয়া হলের সামনে একটা বিরাট কড়ইগাছ ফেলে ব্যারিকেড দেওয়া হয়েছিল তখন। সেখানে ফুটপাথের ওপরে গাড়ির চাকা তুলে দিয়ে কোন মতে ওপারে যাওয়া যেত। আজ গাড়ির আলোয় দেখতে পেল সৈনভর্তি তিনটি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ট্রাক অপর দিকের ফুটপাতের পাশে দাঁড়িয়ে। কয়েকজন সৈন্য একটি বিশাল করাতদিয়ে গাছটিকে কাটছে। ওরা অবাক হলো। কেননা সেই ২১শে ফেব্রুয়ারীর পরে প্রকারান্তরে পাকিস্তানি আর্মির জন্য নিষিদ্ধ হয়ে গিয়েছিল ঢাকার নগর এলাকা। হঠাৎ আজ রাতে এখানে আর্মি কেন। ইকবাল হলের গাড়ি বারান্দায় বেশ কয়েকজন যুবক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করছিল। তাদেরকে জিজ্ঞেস করা হলে তারা বললো, ‘‘আমরা ঠিক জানিনা। আমাদের নেতারা এখনও কোন সিদ্ধান্ত দেননি’’। ওরা পাঁচজন শেষ গন্তব্যস্থল ৩২ নম্বরের বঙ্গবন্ধুর বাড়ীর দিকে রওয়ানা হ‘ল। বঙ্গবন্ধুর বাড়ী সেই মূহুর্তে ছিলো জনশুণ্য। সামনের ফটকের ছোট গেটটি খোলা। ওরা ভেতরে প্রবেশ করলো। নেতার বৈঠক খানায় দেখা পেল তাঁর কোন এক তরুণ একান্ত সচিবের। তিনি বললেন, ‘‘আপনারা এক্ষুনি যার, যার বাড়ীতে চলে যান। খুব শীঘ্রই পাকিস্তানি সেনাবাহিনী সাঁজোয়া বহর নিয়ে রাস্তায় নামবে। তাদেরকে নির্বিচারে গুলি চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’’ বঙ্গবন্ধু তাঁর দলের নেতাদের নির্দেশ দিয়েছেন নিজস্ব নির্বাচনী এলাকায় গিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে। তিনি বলেছেন আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন। পুলিশ এবং ই.পি.আর-এর(এখন বি.ডি.আর) ওয়ারলেসের মাধ্যমে সারা দেশে বঙ্গবন্ধুর এই নির্দেশ এবং ঘোষণা জানিয়ে
দেওয়া হয়েছে। পাঁচ বন্ধু সিদ্ধান্ত নিলো তারা আপাতত নিজ, নিজ বাসস্থানে ফিরে যাবে।তারপর আপনজনদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে এসে মগবাজারের মোড়ে ক্যাফে তাজ-এ মিলিত হবে সবাই এবং তখন প্রতিরোধের ব্যাপারে নির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করা যাবে। এঁদের একজন রাজারবাগ পুলিশ লাইনের ১৫০ গজ দূরে একটি গলির মধ্যে থাকতো। সে তখন কেবলই হাত মুখধুয়ে পরিবারের সঙ্গে খেতে বসেছে। রাত প্রায় ১১টা। হঠাৎ দূরে কামানের গর্জণ শোনা গেল।রাজারবাগ পুলিশ লাইনের পাশের বড় রাস্তা থেকে হৈ চৈ এর শব্দ ভেসে এলো। খাওয়া ফেলে রেখে এই তরুণ দৌড়ে গেল সদর রাস্তায়। সেখানে বেশ কয়েকজন পুলিশ বাহিনী সদস্য সাদা পোষাকে তাদেরকে বরাদ্দ করা ৩০৩ রাইফেল হাতে সবাইকে নিবীত অনুরোধ করছিল যার, যার বাড়ীতে ফিরে যেতে।রাস্তায় নিরস্ত্র মানুষ থাকলে তাদের পক্ষে প্রতিরোধ গড়ে তোলা অসম্ভব হবে। তারা এও বললো যে পাকিস্তানি আর্মিও সাঁজোয়া বাহিনী এবং ট্যাংক বহর দ্রুত এগিয়ে আসছে। তাদের লক্ষ্য রাজারবাগ পুলিশ লাইন এবং পিলখানা ই.পি.আর-এর ছাউনি। তরুণ ফিরে এলো নিজেদের বাসায়।অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রেও গুলি, কামানের শব্দ আর মর্টারের বোমার শব্দ স্পষ্ট হয়ে এলোআরও। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর লক্ষ্য রাজারবাগ পুলিশ লাইন। অবিশ্রান্ত এবং অবিরাম গুলি বর্ষণ হতে লাগলো সেই লক্ষের দিকে। তখন রাজারবাগ পুলিশ লাইনে ছিাে বাঁশের বেড়ার ব্যারাক।গোটা রাজারবাগ পুলিশ লাইন দাউ, দাউ করে আগুন জ্বলে উঠলো। এমন সে আগুন যার উত্তাপে আশেপাশের বাড়ীর মানুষদের জীবন ওষ্ঠাগত। তোয়ালে ভিজিয়ে শরীর জড়িয়ে রেখে কোনমতে বাঁচোয়া।
তরুণ ভাবলো যুদ্ধের কত সিনেমা দেখেছে তারা। ফল অব বার্লিণ, লংগেস্ট ডে, গানস্ অব নেভারন। এর কোনটিই আজকের লব্ধ অভিজ্ঞতার ধারে কাছেও আসতে পারে না। এই তরুণএবং তার পরিবারের সবাই বাড়ীর মেঝেতে শুয়ে জানালা দিয়ে দেখতে পাচ্ছে আগুনের লেলিহান শিখা আর ট্রেসার বুলেটের আলো ঝলকানি। শেষ রাতের দিকে স্তিমিত হয়ে এলো গোলাগুলির শব্দ। তরুণ মনে, মনে হাসলো এই ভেবে যে কি মুর্খের মতই ওরা ভেবেছিল কয়েকটি কেবল তাজা বোমা দিয়ে এই সেনাবাহিনীকে প্রতিহত করবে। ভোড় সাড়ে চারটা কি পাঁচটা। বাড়ীর সামনের দরজায় করাঘাত। ভয়ে ভয়ে তরুণ দরজা খুললো। তরুণ প্রশ্ন করে, ‘‘আপনারা?’’ জবাব এলো, ‘‘আমরা পুলিশ, ভাই’’। ওরা যা বললেন তা সংক্ষেপে এই দাঁড়ায় যে ওদের গুলি ফুরিয়ে গেছে। সঙ্গের অনেক সহকর্মী আত্মহুতি দিয়েছেন হাতের দুটি রাইফেল দেখিয়ে বললেন এগুলো নিয়ে কোথাও যাওয়া সম্ভব নয়। তাই আমাদের বাড়ীতেই রেখে যেতে চান। আমরা যেন ওগুলো কোথাও ফেলে দেই। যাবার আগে বলে গেলেন, ‘‘আপনারা আশহত হবেন না। আমরা আবার ফিরে আসবো। যুদ্ধ করবো।আমাদের দেশ স্বাধীন হবে। জয় বাংলা।’’ বলেই নিচ্ছিদ্র অন্ধকারে কোথায় যেন তারা হারিয়ে গেলেন। তরুণ স্থাণুর মত সেই খোলা দরজার সামনে কতক্ষণ যে দাঁড়িয়ে থাকলো তা কে জানে ? তারপর সম্বিত ফিরে পেয়ে বাড়ীর পেছনে একটা অব্যবহৃত কুয়ার ভেতর রাইফেল দুু‘টোকে বিসর্জন দিলো সে। তাকিয়ে থাকলো কুয়ার গাঢ় অন্ধকার গহ্বরের দিকে। কখন যে তার অজান্তে দুই চোখ ভরে এলো জল? কখন যে সে বাচ্চাদের মত ডুকরে কেঁদে উঠলো সে নিজেই জানেনা। তখনপূর্ব দিক ফর্সা হয়ে এসেছে তরুণ আস্তে, আস্তে উঠে দাঁড়ালো সেই কুয়ার পাশে। পূর্বদিকে উদীয়মান সূর্যের লাল আলোর দিকে তাকিয়ে রইলো সে। তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল দৃঢ়প্রত্যয়ে। তার বুক ভরে এলো এমন অমিত সাহসে যা সে কখনও অনুভব করেনি এর আগে। এর পরের কথাতো আছে ইতিহাসেই বিধৃত। লক্ষ মানুষের বিজয় গাঁথা। যার শুরু সেই ২৬শে মার্চের সাহসী প্রভাতে।

Print Friendly