‘সাহিত্যের আয়নায় জেগে উঠুক মানুষের মুখ’: যুক্ত হলো ময়মনসিংহ ঘোষণা

নিজস্ব প্রতিবেদক, সাহিত্য বাজার

25

বইমেলা উদ্বোধন পর্বে জাতীয় সঙ্গীতের প্রতি সম্মান প্রদর্শন

144

আবৃত্তিগুরু তারিক সালা্হউদ্দিন মাহমুদের হাতে সম্মাননা ও নগদ টাকা তুলে দিচ্ছেন কবি নির্মলেন্দু গুন

Boi 1

বই বিষয়ক প্রবন্ধ পাঠ করছেন কবি ফরিদ আহমদ দুলাল।

সাহিত্যের আয়নায় জেগে উঠুক মানুষের মুখ
সত্য আর সুন্দরের সন্ধানে এসো হই উন্মুখ।
ধর্ম-কর্ম বল কিম্বা আল্লাহ-ইশ্বর-ভগবান
বিশ্বজুড়ে যা কিছু সুন্দর সব সাহিত্যের অবদান।
এই শ্লোগান নিয়ে ময়মনসিংহ ঘোষণা পাঠের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে সাহিত্যের সংবাদপত্র খ্যাত সাহিত্য বাজার পত্রিকার তিন দিনব্যাপী সাহিত্য সম্মেলন, বইমেলা ও সাহিত্য উৎসব ২০১৪। সমাপনী দিবসের প্রধান অতিথি খ্যাতনামা আবৃত্তিশিল্পী কামরুল হাসান মঞ্জু ও আবৃত্তিগুরু তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদের উপস্থিতিতে উৎসব সমন্বয়ক স্বাধীন চৌধুরী ময়মনসিংহ ঘোষণা পাঠ করেন। এতে শান্তিনিকেতনের মতো ময়মনসিংহ ও বরিশালে সাংস্কৃতিক বিশ্ববিদ্যাল স্থাপনসহ দেশের প্রতিটি জেলা-উপজেলায় রাইটারস ক্লাব তৈরি ও সাংস্কৃতিক কর্মকর্তা নিয়োগ, উপজেলাগুলোতে পাঠাগার নির্মাণ, ময়মনসিংহকে সাংস্কৃতিক রাজধানী ঘোষণা এবং ব্রহ্মপুত্র নদ সংলগ্ন আবুল মনসুর সড়কটিকে সাংস্কৃতিক জোন করার দাবিসহ বেশকিছু জনহিতকর দাবি পুরণের আহ্বান জানানো হয়েছে।
একইসাথে দেশের সব প্রবীণ ও দরিদ্র সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কর্মীর জন্য মাসিক সরকারি ভাতা ও সরকারি খরচে তাদের চিকিৎসা সেবা প্রদানের আহ্বান জানানো হয় এই ময়মনসিংহ ঘোষণায়।

এ সময় ৭ম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী এই উৎসব সফল করার জন্য আগত অতিথি ও ময়মনসিংহবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে সাহিত্য বাজার সম্পাদক আরিফ আহমেদ বলেন, এই উৎসব আয়োজনের প্রধান লক্ষ্য ছিল অসহায়, দুস্থ সাংস্কৃতিকজনদের পাশে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকা। প্রমাণ করা যে সাহিত্য সম্মেলন মানে শুধু আনন্দ উল্লাস নয়, সেবাও। আমরা আমাদের সাধ্য মত সেই চেষ্টা করেছি। আবৃত্তিগুরু তারিক সালাউদ্দিন মাহমুদ ও অধ্যাপক যতীন সরকারের জন্য তাদের চিকিৎসা সেবায় সংস্কৃতিক সচিব ড. রণজিৎ কুমার বিশ্বাস সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে আমাদের এ উৎসবকে সার্থক করে তুলেছেন। তাই তার প্রতি আমাদের আন্তরিক কৃতজ্ঞতা।

২৪ এপ্রিল সকাল ১০টায় শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গনে তিন দিনব্যাপী বইমেলার উদ্বোধন করেন প্রথম পর্বের প্রধান অতিথি জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় এর ভিসি মোহিত উল আলম। বইমেলার উদ্বোধন পর্বের সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক মুস্তাকীম বিল্লাহ ফারুকী। এ সময় ফরিদ আহমদ দুলাল রচিত বইয়ের সাথে আলোকিত সান্নিধ্য’ শীর্ষক প্রবন্ধ নিয়ে আলোচনায় অংশ গ্রহণ করেন কবি ও গল্পকার মোশাররফ করিম, অধ্যাপক আমীর আহম্মদ চৌধুরী রতন, নাট্যজন শাহাদাত হোসেন খান হীলু, কবি ইয়াজদানী কোরায়শী কাজল, অধ্যাপক আফজাল রহমান, আবৃত্তিশিল্পী ড. শাহাদাৎ হোসেন নিপু প্রমূখ। এরপর ছিল স্বরচিত কবিতা পাঠ ও আবৃত্তি।

বিকেল চারটায় উৎসবের ২য় পর্ব সাহিত্য সম্মেলনের উদ্বোধন করেন দেশ বরেণ্য কবি নির্মলেন্দু গুন। গীতিকার শহীদুল্লাহ ফরায়জীর সভাপতিত্বে প্রথমেই ছিল শ্রদ্ধা নিবেদন পর্ব। অধ্যাপক যতীন সরকার-এর পক্ষে ময়মনসিংহের আমরা চন্দ্রবতীর সন্তানেরা সংগঠনের সদস্য আবৃত্তিকার সজল কোরায়শীর হাতে সম্মননা ক্রেস্ট তুলে দিয়ে এবং প্রবীণ আবৃত্তিকার তারিক সালাউদ্দিন মাহমুদকে আনুষ্ঠানিকভাবে শ্রদ্ধা ও ভালবাসা জ্ঞাপন করে সাহিত্য বাজার উপদেষ্টা পর্ষদ।
এ সময় সাহিত্য বাজার সাহিত্য পদক প্রাপ্ত সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের পাঠানো বার্তা পাঠ করেন উৎসব আহ্বায়ক আবৃত্তিকার সালাম খোকন। এ বার্তায় সৈয়দ শামসুল হক বলেছেন, ‘বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে একটি সিনেমা তৈরির কাজে জরুরী টোকিও যাওয়ার কারণে আমি এই উৎসবে অংশগ্রহণ করতে না পারায় উপস্তিত সকলের নিকট ক্ষমা প্রার্থী। আমি এই সাহিত্য পদক সানন্দে গ্রহণ করছি এবং এই পদকের মূল্যমান অর্থ অসুস্থ সংস্কৃতজন আবৃত্তিগুরু তারিক সালাউদ্দিন মাহমুদের  চিকিৎসা সহযোগিতার জন্য দান করছি।’
কবি নির্মলেন্দু গুন এ সময় আবৃত্তিগুরু তারিক সালহউদ্দিন মাহমুদের হাতে আজীবন সম্মাননা ক্রেস্ট ও সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের দানকৃত অর্থ তুলে দেন।
এরপর একে একে সেরা লেখক সম্মাননা গ্রহণ করেন গল্পে কথা সাহিত্যিক আতা সরকার ও নাসরীন জাহান, কবিতায় কবি শামসুল ফয়েজ ও ওমর কায়সার, শিশু সাহিত্যে ছড়াকার দীপংকর চক্রবর্তী ও ফরিদুর রেজা সাগরের পক্ষে সালাম খোকন, সাহিত্য সমালোচনায় কবি আশীক চৌধুরী এবং আবৃত্তিকার মীর বরকত।

02

৩য় দিন সকালে পালে রাগে হাওয়া প্রবন্ধের আলাচনা পর্ব

alochona-3

গল্প বিষয়ক প্রবন্ধ নিয়ে আলোচকবৃন্দ।

22

উৎসব মঞ্চের বাইরে তমাল তলার আড্ডা
আমি কাব্য রাজ
গল্প কিম্বা নাট্যরাজ
রাজাধিরাজ আমি
রামায়ণ, মহাভারত খ্যাত
চন্দ্রাবতী; আমি সুন্দরম…
ময়মনসিংহ আমার নাম।
আমার যা কিছু সুন্দর; সবই তার আজ তোমার অপেক্ষায়
ওগো প্রিয়তম
তুমি এলে পূর্ণ হবে আমার পুণঃরুত্থান।
উৎসব মঞ্চের বাইরে জমে উঠেছিল তমাল তলায় কিছুক্ষণ নামের চায়ের দোকানে তমাল গাছের ছায়ায় জমজমাট চা আড্ড্।া এখানে বসে মুখচোরা সাহিত্য বাজার সম্পাদক আরিফ আহমেদ পাঠ করেছিলেন তার উৎসবকে নিয়ে লেখা কবিতাটি। 

 

 

 

 

 

প্রথম দিনের তৃতীয় অধিবেশন শুরু হয় সন্ধ্যা ৭টায়। অর্থাৎ বাংলাদেশের সাহিত্যচর্চায় সাহিত্য পত্রিকার ভূমিকা বিষয়ে রাজশাহীর লিটল ম্যাগাজিন চিহ্ন এর সম্পাদক রহমান রাজুর লেখা প্রবন্ধ নিয়ে আলোচনা। এ পর্বের প্রধান অতিথি সব্যসাচী কবি নির্মলেন্দু গুন এবং সভাপতিত্ব করবেন গীতিকবি শহীদুল্লাহ ফরায়জী। এতে বিশেষ অতিথি ও আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ছিলেন আতা সরকার, দীপংকর চক্রবর্তী, নাসরীন জাহান, কবি আমিনুল হাসান, কবি আশিক চৌধুরী প্রমূখ।  সবশেষে ছিল কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ব বিদ্যালয়ের সংঙ্গীত পরিবেশনা দিয়ে শেষ হয় প্রথম দিনের প্রথম উৎসব আয়োজন।

২৫ এপ্রিল শুক্রবার
২য় দিনের সকালে প্রথম অধিবেশন শুরু হয়েছিল বেলা ১১টায়। বরিশালের সাহিত্যজন অধ্যক্ষ তপংকর চক্রবর্তীর বাংলাদেশের শিশু সাহিত্য: বর্তমান ও  ভবিষ্যত শীর্ষক প্রবন্ধ নিয়ে আলোচনা পর্বের সূচনা করেন জাতীয় কবিতা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক কবি আসলাম সানী।  এতে প্রধান অতিথি বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক সচিব ড. রণজিৎ কুমার বিশ্বাস এবং সভাপতিত্ব করেন সাহিত্য বাজার সাহিত্য উৎসব উপদেষ্টা কবি এ এফ আকরাম হোসেন। এ সময় বিশেষ অতিথি হিসেবে মঞ্চে আসন গ্রহণ করেন কবি নির্মলেন্দু গুন, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় এর ভিসি মোহিত উল আলম, কবি শামসুল ফয়েজ, অধ্যাপক প্রদীপ কুমার বিশ্বাস, ছড়াকার সরকার জসীম, গোলাম সোবাহানী কোরায়শী, সাবাদিক নজরুল কবির, জুয়েল কবির, শামীম সিদ্দিক প্রমূখ। এই পর্বে কবিতা পাঠে অংশ গ্রহণ করেন সোহরাব পাশা, রওশন ঝুনু, আলপনা বেগম, ইশরার ইসরাইল, আব্দুল হক চাষী প্রমূখ।

দ্বিতীয় দিনের ২য় আলোচনার বিষয় বিকেল ৫টায় শুরু হয়। কবিতার আধুনিকায়নের দুর্বোধ্যতায় কমে যাচ্ছে পাঠক  যশোরের মধুসূদন একাডেমির অধ্যক্ষ খসরু পারভেজ এর প্রবন্ধ উপস্থাপন নিয়ে আলোচনার সুত্রপাত করেন কবি স্বাধীন চৌধুরী। সাহিত্য বাজারের উৎসব পর্ষদের উপদেষ্টা গীতিকবি শহীদুল্লাহ ফরায়জীর সভাপতিত্বে  এ পর্বের আলোচক ছিলেন কবি আশরাফ মীর, কবি ইয়াজদানী কোরায়শী কাজল, সুহৃদ জাহাঙ্গীর, সরকার আজিজ, শামীম সিদ্দিকী,  রওশন ঝুনু, শাবিহ মাহমুদ প্রমূখ।  সবশেষে ছিল মুকুল ফৌজ সাংকৃতিক একাডেমির পরিবেশনায় সঙ্গীত ও নাটকের প্রদর্শনী। ময়মনসিংহ গীতিকা অবলম্বনে নিজাম মল্লিক নিজু রচিত অতুলা সুন্দরী নাটকটির নির্দেশনা দিয়েছেন আমিনুল হাসান।

২৬ এপ্রিল শনিবার
৩য় ও শেষ দিনের অধিবেশনের প্রধান আকর্ষন ছিল আবৃত্তিগুরু তারিক সালাউদ্দিন মাহমুদ এর প্রবন্ধ পালে লাগবে হাওয়া। এ পর্বের প্রধান অতিথি খ্যাতনামা আবৃত্তিকার কামরুল হাসান মঞ্জু এবং সভাপতি তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ। আলোচক হিসেবে ছিলেন আলী ইদ্রিস, সালিম হাসান, আমজাদ দোলন, নজরুল কবীর, ড. কাশফিয়া প্রমূখ
এ পর্বে কবিতা পাঠে অংশগ্রহণ করেন যুগল দাস, মামুন মাহফুজ প্রমূখ।

বিকালে ৫টায় দ্বীতিয় ও শেষ অধিবেশনে প্রশান্ত মৃধা রচিত বাংলাদেশের গল্প পর্যালোচনা : করতলে যা দেখি শীর্ষক প্রবন্ধ নিয়ে আলোচনা করেন ধ্রুব জ্যোতি ঘোষ মুকুল, আলী ইদ্রিস, আল মাকসুদ, মনি হায়দার, থিওফিল নকরেক প্রমূখ। এ সময় উপস্তিত প্রায় সব কবিরাই গন কবিতা পাঠে অংশ গ্রহণ করেন। আবৃত্তিগুরু তারিক সালাহ উদ্দিন মাহমুদেও সভাপতিত্বে প্রধান অতিথি কামরুল হাসান মঞ্জুর উপস্তিতিতে এ দিন ময়মনসিংহ ঘোষণা পাঠ করেন কবি স্বাধীন চৌধুরী। তিনদিনের এই উৎসবকে প্রানবন্ত কওে রাখেন উপস্থাপক ও সঞ্চালক সজল কোরায়শী এবং আমজাদ দোলন।

Print Friendly