সত্তর দশক : সিলেটের সাহিত্যের আলোকিত সময় – মিলু কাশেম

সাহিত্য বাজার

s-a-salim-bai-06

ছাটের দশকের অন্যতম কবি নৃপেন্দ্রলাল দাশের ৬৫তম জন্মদিন উদযাপন করেছে কবি আড্ডা-বৃন্দস্বর, সিলেট।

সত্তর দশক: সিলেটের সাহিত্যের আলোকিত সময়
মিলু কাশেম

শিল্প, সাহিত্য সংস্কৃতি ও সাংবাদিকতায় সিলেট অঞ্চলের রয়েছে সুদীর্ঘকালের সুপ্রাচীন ঐতিহ্য। এই ধারাবাহিকতা আজও বহমান থাকলেও কেন জানি মনে হয় অনেক কিছুতেই আগের সেই প্রাণচাঞ্চল্য নেই। আমরা যারা বিশেষ করে সত্তর দশকে সিলেটের সাহিত্য সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলাম তাদের অনেকেই আপসোস করে বলেন, সেই দিন আর নেই। নেই সেই ভ্রাতৃত্ববোধ, আন্তরিকতা, সাহিত্য-সাংস্কৃতিক কর্মীদের সেই ভালোবাসার সেতুবন্ধন। কেমন যেন এলোমেলো হয়ে গেছে সবকিছু। রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি শিল্প-সাহিত্য-সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও কলুষিত করছে।
সত্তর দশককে অনেকেই বলেন, সিলেটের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির গৌরবের দশক। গত শতাব্দীর এই দশকেই মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা অর্জন করেছি দেশের স্বাধীনতা। সারাদেশের ন্যায় স্বাধীনতা-উত্তর সিলেটের শিল্প-সাহিত্য-সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও দেখা দেয় প্রাণচাঞ্চল্য। নানামুখী সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে মূখর ছিল সিলেটের শিল্প-সাহিত্যঙ্গন।

সত্তর দশকে বিশেষ করে স্বাধীনতা-উত্তর সিলেট জন্ম দিয়েছে অনেক প্রতিভাবান লেখক, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক কর্মীকে। সিলেটের শিশু-কিশোর ও তরুণদের কাছেও এই সময়টা অত্যন্ত স্মরণীয় সাফল্যের প্রতিক। সারাদেশের ন্যায় বিভিন্ন শিশু-কিশোর যুবকল্যাণ সংগঠনের নানামুখী শিক্ষা, সাংস্কৃতিক কর্ম তৎপরতায় মুখর ছিল সিলেট। তখন ছিল না কোন সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, মাদকের আগ্রাসন। সুন্দর একটা শিল্প-সাংস্কৃতিক আবহ ছিল সর্বত্র। ছিল সবার মাঝে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, একে-অন্যের প্রতি ভালবাসা। স্বাধীনতা-উত্তর সিলেটে শিশু-কিশোরদের প্রাণপ্রিয় সংগঠন ছিল ‘সুরমা খেলাঘর আসর’। নিয়মিত সাহিত্য-সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের মধ্য দিয়ে এই সংগঠনটি সিলেটের শিশু-কিশোরদের মুক্ত চিন্তার বিকাশ ঘটিয়েছিল। খেলাঘরের নিয়মিত সাহিত্য আসর বসতো তাঁতপাড়াস্থ এইডেড হাইস্কুলে। সিলেটের নবীন-প্রবীণ লেখক, কবি, ছড়াকার সাহিত্যপ্রেমী মিলন মেলা বসতো প্রায়ই সুরমা খেলাঘর আসরের বিভিন্ন অনুষ্ঠানকে ঘিরে। কবি দিলওয়ার, ছাড়াকার তুষার কর, নাট্যকার বিদ্যুৎ কর, ভীষ্ম দেব চৌধুরী, সেলু বাসিত, ডা. ফজল মাহমুদ, গোবিন্দ পাল, সম্ভ চৌধুরী, শাখা দাস পুরকায়স্থ, শেখর ভট্টাচার্য, আনোয়ার ইকবাল কচি প্রমুখ ছিলেন সুরমা খেলাঘর আসরের সব সফল কর্মকান্ডের কান্ডারী। ‘আবার আসিব ফিরে’ নামক একটি সংকলন প্রতি বছর একুশ ফেব্র“য়ারীতে সুরমা খেলাঘর আসর থেকে বেরুতো। সুন্দর, পরিচ্ছন্ন, রুচিশীল এই সংকলনটির খ্যাতি ছিল দেশব্যাপী। খেলাঘরের পাশাপাশি যে সংগঠনটি আমরা সুন্দর হবো স্লোগান নিয়ে সারাদেশের মতো সিলেটের শিশু-কিশোর-যুবকদের বিনিসুতোর মালায় গেঁথে ছিল সেটি হলো ‘চাঁদের হাট’। প্রখ্যাত ছাড়াকার রফিকুল হক (দাদু ভাই) এর পরিচালনায় এই সংগঠনটি স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের শিশু-কিশোরদের প্রাণপ্রিয় সংগঠন হিসেবে জন্ম নেয়ার অল্প দিনের মধ্যেই দেশব্যাপী ঝড় তুলে।
১৯৭৪ সালে সিলেটে ‘চাঁদের হাট’-এর শাখা গঠনের পর থেকে নানামুখী কর্মকান্ডে অল্পদিনেই এটি সিলেটের শিশু-কিশোরদের মাঝে জনপ্রিয়তা লাভ করে। সিলেটে চাঁদের হাটের প্রতিষ্ঠাতা আহবায়ক ছিলেন তৎকালীন সিলেট পৌরসভার সর্বকণিষ্ঠ কমিশনার বর্তমান সিটি মেয়র বদর উদ্দিন আহমদ কামরান। যাদের অক্লান্ত পরিশ্রম আর কর্মদক্ষতায় অল্পদিনে চাঁদের হাট সিলেটের সুধীজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল তারা হলেন আবুল কাশেম মিলু (মিলু কাশেম), শাহাদাত করিম, সোলায়মান আহসান, এনামুল হক জুবের, রোকেয়া খাতুন রুবী, শাহেদা জেবু, হোসনে আরা হেনা, হীরা শামীম, সুফিয়ান আহমদ চৌধুরী প্রমুখ। চাঁদের হাটের নিয়মিত সাহিত্য আসর বসতো বারুতখানায় শাহাদাত করিমের বাসভবন এবং বারুতখানা পয়েন্টের পাশে যে বাড়িতে বর্তমানে মনোরম নামের কারুপণ্য সেই বাড়িতে। সিলেটে অনেক সুন্দর স্মরণীয় সাহিত্য-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপহার দিয়েছে চাঁদের হাট। সিলেটে পৌর পাঠাগার ছিল অধ্যাপক মোহাম্মদ শফিক, অধ্যাপক আবুল বশর প্রমুখের মতো গুণীজনরা নানাভাবে সহযোগিতা দিয়ে উৎসাহ যুগিয়েছেন চাঁদের হাটের সব কর্মকান্ডে।
‘আমরা ক’জন নবীন মাঝি’ নামে শাহাদাত করিম ও আবুল কাশেম মিলুর (মিলু কাশেম) সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছিল একটি অনিন্দ্য সুন্দর সাহিত্য সংকলন। আফজাল হোসেনের মনোরম চার রঙের প্রচ্ছদে সুখপাঠ্য অনেক কবিতা, ছড়া, গল্পে সমৃদ্ধ সংকলনটি সিলেটের সাহিত্যাঙ্গনের একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন। চাঁদের হাটের পরে যে সংগঠনের ছায়াতলে সিলেটের শিশু-কিশোররা সমবেত হয়ে শিল্প-সাহিত্যের শাখা-প্রশাখাকে পল্লবিত করেছেন সেটা হলো রেডিও ক্লাব, শাপলা শালুকের আসর। এই সংগঠনের কেন্দ্রীয় প্রধান ছিলেন রেডিও, বাংলাদেশের তৎকালীন প্রকাশনা বিভাগের সম্পাদক, ‘সালাম সালাম হাজার সালাম’ খ্যাত প্রখ্যাত গীতিকার ফজল এ. খোদা (মিতা ভাই)। সারাদেশের ন্যায় সিলেটের গ্রামগঞ্জের শিশুদের মাঝেও শাপলা শালুকের আসর ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল, প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল এর নানামুখী কার্যক্রম। সিলেটে শাপলা শালুকের আসরের বিভিন্ন সফল শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি ও শিশু কিশোরদের কল্যাণমুখী কর্মকান্ড যাদের ফলপ্রসু সহযোগিতায় ছিল কর্মমুখর তারা হলেন লোকমান আহমদ, আজিজ আহমদ সেলিম, আবুল কাশেম মিলু (মিলু কাশেম), শাহাদাত করিম, সৈয়দ নাহাস পাশা, সৈয়দ বেলাল আহমদ, সৈয়দ আবুল মনসুর (লিলু), আব্দুল বাসিত মোহাম্মদ, হীরা শামীম, সুফিয়ান আহমেদ চৌধুরী, সোলেমান আহমদ, সৈয়দ আবু জাফর (হিরু), সৈয়দ আবু নাসের দিলু, (দিলু নাসের) ও সৈয়দ ফাহিমা খাতুন রিপা প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য। ‘ঝিঙেফুল’ নামে শাপলা শালুকের আসর থেকে প্রকাশিত হয়েছিল একটি আকর্ষণীয় রঙিন শিশু-কিশোর সংকলন। সংকলনটি সম্পাদনা করেছিলাম আমি নিজে (আবুল কাশেম মিলু) ও প্রধান সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন লোকমান আহমদ। এই সংকলনে সিলেটের অনেক কবি, লেখক, সাংবাদিকের প্রথম লেখা ছাপা হয়েছিল। সিলেট শহর ছাড়াও মফস্বলের অনেক এলাকায় এই সংগঠনের নানামুখী কর্মতৎপরতা বিস্তৃত ছিল। শাপলা শালুকের সঙ্গে সিলেটের বাইরে যারা জড়িত ছিলেন-তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন গোলাপগঞ্জের হেতিমগঞ্জ শাখার ইকবাল সিদ্দিকী, বিশ্বনাথের কাশিমপুর শাখার আবু সাঈদ ফয়জী (আ.ফ.ম. সাঈদ) ও মৌলভীবাজারের গোড়ারাই শাখার গোলাম রব্বানী (রব্বানী চৌধুরী) প্রমুখ।
১৯৭৫ সালের মার্চ মাসে সিলেটে গঠিত হয় জাতীয় শিশু-কিশোর সংগঠন ‘প্রান্তিক কচি কাঁচার মেলা’। এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মেলার পরিচালক রোকনুজ্জামান খান (দাদা ভাই), বেগম সুফিয়া কামাল, মেলার তৎকালীন ছোট্টবন্ধু আজকের প্রখ্যাত ছড়াকার লুৎফুর রহমান রিটনসহ আরো অনেক যোগ দিয়েছিলেন। সিলেটে কচি-কাচাঁর মেলা গঠনে সবচেয়ে বেশি অবদান ছিল দৈনিক ইত্তেফাকের সিলেট প্রতিনিধি আব্দুল মালিক চৌধুরী। আর মেলার সব কর্মকান্ডের নেপথ্যে ছিলেন তরুণ গল্পকার মাহবুব আহসান চৌধুরী। শাপলা কুঁড়ির আসরসহ আরো বেশকিছু শিশু-কিশোর-যুবকল্যাণ সংগঠনের কর্মতৎপরতা ছিল উল্লেখ করার মতো। যারা নানাভাবে নিজেদের কর্মদক্ষতায় সমৃদ্ধ করেছেন সিলেটের শিল্প-সাহিত্য-সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে।

স্বাধীনতা-উত্তর সিলেটের অনেক স্থানে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিপ্রেমীদের জমজমাট আড্ডা বসতো। এর মধ্যে প্রধান আড্ডা বসতো প্রখ্যাত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হেমচন্দ্র ভট্টাচার্য (বাবুল দা)’র মালিকানাধীন বন্দরবাজারের নীরা রেস্টুরেন্টে। সকাল-দুপুর-সন্ধ্যায় পালাক্রমে নীরায় চলতো শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিপ্রেমীদের আড্ডার আসর। কবি দিলওয়ার, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম সংগঠক কবি বেলাল মোহাম্মদ, রফিকুর রহমান লজু, হামিদ মোহাম্মদ, তুষার কর, মোয়াজ্জেম হোসেন, জিষ্ণু রায় চৌধুরী, নুরুজ্জামান মণি, আজিজ আহমদ সেলিম, আবু বকর মোহাম্মদ হানিফ, আবুল কাশেম মিলু (মিলু কাশেম), সৈয়দ নাহাস পাশা, সৈয়দ বেলাল আহমদ, টিপু মজুমদার, বিদ্যুৎ কর প্রমুখের উপস্থিতি ছিল নিয়মিত। কবি দিলওয়ারের ভার্থখলাস্থ খান মঞ্জিলেও মাঝে মাঝে সন্ধ্যার পর বসতো জমজমাট আড্ডা। আবুল কাশেম মিলু (মিলু কাশেম), নুরুজ্জামান মণি, লোকমান আহমদ, আজিজ আহমদ সেলিম, তুষার করসহ অনেকেই ছিলেন সেই আড্ডার নিয়মিত অংশগ্রহণকারী। দেশ-বিদেশের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি, রাজনীতি নিয়ে সারগর্ভ আলোচনা করতেন অনেকেই। দিলওয়ার ভাইয়ের সৌজন্যে রাতের খাবারও জুটে যেত আড্ডাবাজদের ভাগ্যে।
বেলাল মোহাম্মদের বাসায়ও মাঝে মাঝে বসতো শিল্প-সাহিত্যিকদের আড্ডা। তাছাড়া রায়নগর ব্রজনাথ টিলার ‘সপ্তর্ষী’ (শাহেদা জেবুদের বাসভবন) ও দরগা মহল্লার ঝর্ণার পাড়ের রোকেয়া খাতুন রুবীদের বাসভবনের ভূমিকা ছিল সিলেটে শিশু সাহিত্যে উল্লেখযোগ্য। শাহেদা জেবুরা তিন বোনই (জেবু, হেনা, হীরা) পরিচিত ছিলেন শিশু সাহিত্যের জগতে। আর রোকেয়া খাতুন রুবীদের পুরো পরিবারই তো সাহিত্য জগতের নিবেদিত প্রাণ। সবাই লেখালেখির সঙ্গে জড়িত। এই দুই বাড়ির পরিবেশও ছিল শিল্প-সাহিত্যের আবরণে ঢাকা। নবীন-প্রবীণ অনেক সাহিত্যপ্রেমীর যাতায়াত ছিল তাদের বাসভবনে। আমাদের অনেকের সঙ্গেই লেখালেখির সূত্রে এই পরিবারের সঙ্গে গড়ে উঠেছিল আন্তরিকতাপূর্ণ পারিবারিক সৌহার্দ্য। এছাড়া সিলেটের ছড়াকারদের আড্ডা ছিল জিন্দাবাজারের ম্যাগাজিন সেন্টার, আম্বরখানার ফাতেমা রেস্টুরেন্টে। তুষার কর, শাহাদাত করিম, ভীষ্মদের চৌধুরী, গোবিন্দ পাল, আবুল কাশেম মিলু (মিলু কাশেম), আজিজ আহমদ সেলিম, নূরুজ্জামান মণি, সৈয়দ নাহাস পাশাসহ অনেকেই নিয়মিত আসতেন এসব আড্ডায়। প্রায়ই অনুষ্ঠিত হতো জমজমাট ছড়াপাঠের আসর। কবি দিলওয়ার, মাহমুদ হক, শামসুল করিম কয়েস, তুষার কর, মুকুল আশারাফসহ আমরা নবীন অনেক ছাড়াকার অংশ নিতাম এসব আসরে। হাট্টিমাটিম, চুমকিসহ অনেক ছড়া কার্ড বেরুতো সিলেট থেকে। তুষার কর ও আবুল কাশেম মিলু (মিলু কাশেম) এর সম্পাদনায় বের হয় দেশের প্রথম ছড়া ও ছড়াকার বিষয়ক মিনি সংবাদপত্র ‘ছড়া সন্দেশ’ এর প্রথম সংখ্যা। বিষয় বৈচিত্রে অনন্য এই পত্রিকাটি তখন বাংলাদেশে ও ভারতের ছড়া লেখক ও পাঠকদের মাঝে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। প্রখ্যাত সাংবাদিক হেদায়েত হোসেন মোর্শেদ দৈনিক বাংলা পত্রিকার শেষের পাতায় তার নিয়মিত কলাম ‘লোক-লোকালয়’ এর ছড়া সন্দেশের প্রশংসা করে আলোচনা করেন। আকাশবাণী কলকাতায় প্রখ্যাত সংবাদ ভাষ্যকার দেবদুলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ও ছড়া সন্দেশের উচ্ছসিত প্রশংসা করেন তার প্রতিবেদনে। ছড়া সন্দেশের আরেকটি সংখ্যা প্রকাশিত হয় ‘০৮ সালের জুন মাসে। তখন এই উদ্যোগের সঙ্গে যোগ হয় নূরুজ্জামান মণি, আজিজ আহমদ সেলিম ও সৈয়দ বেলাল আহমদের নামও।
সত্তর দশকে সিলেটের তরুণ কবিদের আরেকটি প্রধান আড্ডাস্থল ছিল জিন্দাবাজার পয়েন্টের বকস ছড়া ঘরে। লেখক আকসার বকসের মালিকানাধীন এই প্রেসে প্রায় সারাদিনই কবি, সাহিত্যিকদের আড্ডা লেগে থাকতো। ছাপাঘরে যারা নিয়মিত আসতেন তাদের মধ্যে ছিলেন মহিউদ্দিন শীরু, খলিলুর রহমান কাসেমী, রাগিব হোসেন চৌধুরী, আব্দুল হামিদ মানিক, মাহমুদ হক, জামান মাহবুব, মইনুল ইসলাম চৌধুরী, কুমার দিলীপ কর, অজয় পাল, হামিদ মোহাম্মদ, নিজাম উদ্দিন সালেহ, শাব্বির জালালাবদী, মাহমুদুল হক ওসমানী প্রমুখ। একঝাঁক প্রতিশ্র“তিশীল তরুণকিশোর সাহিত্যিকের কলতানে তখন মুখরিত ছিল। সিলেটের সাহিত্যপাড়া। নিয়মিত যারা স্থানীয় জাতীয় পত্র-পত্রিকায় লিখতেন তাদের মধ্যে এই মুহূর্তে যাদের নাম মনে পড়ছে তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন Ñ আবদুল হামিদ মানিক, মহীউদ্দিন শীরু, শামসাদ হুসাম, রাগিব হোসেন চৌধুরী, তুষার কর, আবুল ফতেহ ফাত্তাহ, খলিলুর রহমান কাসেমী, ফরিদ আহমদ রেজা, রেনু লুৎফা, মাহমুদ হক, শামসুল করিম কয়েস, হামিদ মোহাম্মদ, কাদের নওয়াজ খান, জামান মাহবুব, আকসার বকস, বুদ্ধদেব চৌধুরী, মুকুল আশরাফ মোস্তফা বাহার, মোজাহিদ শরীফ, রোকেয়া খাতুন রুবী, মাহবুব আহসান চৌধুরী, আনোয়ার ইকবাল, ভীষ্মদেব চৌধুরী, আবুল কাশেম মিলু (মিলু কাশেম), গোবিন্দ পাল, সেলু বাসিত, সন্ত চৌধুরী, নুরুজ্জামান মণি, আজিজ আহমদ সেলিম, জিষ্ণু রায় চৌধুরী, এনামুল হক জুবের, আজিজুল হক মানিক, শাহেদা জেবু, হোসনে আরা হেনা, হীরা শামীম, জেরিন শিরীন, ইয়াসমিন পলিন, রাজিয়া নীলুফার নীলু, সুরাইয়া নাসরিন শেফু, আব্দুল হাই মিনার, তমিজ উদ্দিন লোদী, নজরুল ইসলাম বাসন, শেখর ভট্টাচার্য, আব্দুল বাছিত মোহাম্মদ, কিশওয়ার ইবনে দিলওয়ার, শাহীন ইবনে দিলওয়ার, সুফিয়ান আহমদ চৌধুরী, সৈয়দ নাহাস পাশা, সৈয়দ বেলাল আহমদ, হামিদা খাতুন শেফালী, জুবেদা খাতুন শিউলী, সাজেদা খাতুন শুভী, টিপু মজুমদার, শাহাদাত করিম, মাহমুদুল হক ওসমানী, শাব্বির জালালাবাদী, নিজামউদ্দিন সালেহ, সোলায়মান আহসান, সেলিম আউয়াল, আয়েশা আহমদ, আববকর মোহাম্মদ হানিফ, শাহ মোহাম্মদ আনসার আলী, বদরুদ্দোজা বদর প্রমুখ। এদের অনেকেরই ছিল দেশব্যাপী খ্যাতি ও পরিচিতি।

সিলেটের শিশু সাহিত্য কেন্দ্রিক স্মরণীয় স্মৃতিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি উল্লেখযোগ্য সাপ্তাহিক যুগভেরীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা শাপলার মেলার স্মৃতি। যুগভেরীর এই ছোটদের পাতাকে ঘিরে সিলেটের সাহিত্য-সাংস্কৃতিক অঙ্গন মুখরিত হয়ে উঠেছিল। প্রায় তিন দশক পেরিয়ে এসেও আজ চোখের সামনে ভাসে সেইসব সফল কর্মকান্ডের উজ্জ্বল ছবি। ১৯৭৩ সালের ৪ আগষ্ট যুগভেরীর তৎকালীন সহ-সম্পাদক অজয় পালের পরিচালনা ও মাহবুবুর রহমান এবং মিসেস ফাহমিদা রশীদ চৌধুরীর সার্বিক সহযোগিতায় জন্ম নিয়েছিল ‘শাপলার মেলা’। পরবর্তীতে মাহবুবর রহমানের পরিচালনায় শাপলার মেলা হয় প্রাণবন্ত। পরিণত হয় সিলেটের শিশু-কিশোর, নবীন-প্রবীণ শিল্প-সাহিত্য সাংস্কৃতিকপ্রেমীকদের মিলনমেলায়। মনে পড়ছে কবি দিলওয়ার, অজয় পাল, মাহবুবর রহমান, তবারক হোসেন, বেলাল মোহাম্মদ, মাহমুদ হক, শামসুল করিম কয়েস, বুদ্ধদেব চৌধুরী, গিয়াস উদ্দিন আউয়াল, বিদ্যুৎ কর, পরেশ দেবনাথ, ফজলুল করিম অপি, লোকমান আহমদ, আজিজ আহমদ সেলিম, রোকেয়া খাতুন রুবী, শাহেদা জেবু, হোসনে আরা হেনা, হীরা শামীম, নূরুজ্জামান মণি, আবুবকর মোহাম্মদ হানিফ প্রমুখ বিশেষ করে যুগভেরী লিমিটেডের স্বত্ত্বাধিকারী শ্রদ্ধেয় আমীনুর রশীদ চৌধুরী ও মিসেস ফাহমিদা রশীদ চৌধুরীর কথা শাপলার মেলায় সব সাফল্য-ব্যর্থতার সঙ্গে যারা ছিলেন ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ে সেই বন্ধুদের যারা নিয়মিত শাপলার মেলার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিত জন্ম থেকে তারা অনেকেই ছিল শাপলার মেলার প্রধান। সিলেটের শিল্প-সাহিত্য সাংস্কৃতিক অঙ্গন ছিল যাদের পদচারণায় মুখরিত।

শাপলার মেলার উদ্যোগে নিয়মিত যুগভেরী অফিসে অনুষ্ঠিত হতো সাহিত্য সভা এসব সাহিত্য সভায় সিলেটের প্রবীণ-নবীন লেখকরা অংশ নিতেন। পঠিত লেখার উপর সারগর্ভ আলোচনা করতেন কবি দিলওয়ার, প্রয়াত মাহমুদ হক, শামসুল করিম কয়েস, তুষার কর প্রমুখ। নির্বাচিত লেখা নিয়ে প্রতি মাসে বের হতো আকর্ষণীয় অঙ্গসজ্জায় সজ্জিত দেয়াল পত্রিকা ‘শাপলা’। এটি সম্পাদনা করতেন পর্যায়ক্রমে-বিদ্যুৎ কর, তুষার কর, হামিদ মোহাম্মদ, আবুল কাশেম মিলু (মিলু কাশেম) আজিজ আহমদ সেলিম, নূরুজ্জামান মণি। আর আকর্ষণীয় এই পত্রিকাটি সাজাতেন আবু বকর মোহাম্মদ হানিফ। একবার সিলেটে বেড়াতে এসে প্রখ্যাত সাংবাদিক-কলামিষ্ট আখতারুল আলম (লুদ্ধক) দৈনিক ইত্তেফাকে তার কলাম ‘স্থান-কাল-পাত্র‘তে দেয়াল পত্রিকা ‘শাপলা’ দেখে লিখেছিলেন, ‘সিলেটে বেড়াতে এসে তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মতো সুন্দর দেয়াল পত্রিকা শাপলা দর্শন করে মুগ্ধ হলাম।’ এ রকমের অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে শাপলার মেলাকে ঘিরে। ১৯৭৬ সালের আগস্ট মাসে শাপলার মেলার তৃতীয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী এবং ১৯৭৭ সালের এপ্রিল মাসে বাংরা বর্ষবরণ উপলক্ষে শাপলার মেলার উদ্যোগে যুগভেরী কার্যালয়ে আয়োজন করা হয় দুটি স্মরণীয় অনুষ্ঠানের। এসব অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে মরহুম আমীনুর রশীদ চৌধুরী, ফাহমিদা রশীদ চৌধুরী, কবি দিলওয়ার, বেলাল মোহাম্মদ, আজিজুল মালিক চৌধুরী, সালাহ উদ্দিন চৌধুরীসহ শাপলার মেলার অনেক ভাইবোন অংশ নেয়। অনুষ্ঠান শেষে সুধীজনসহ সমবেত ভাইবোনদের নিয়ে তোলা হয় গ্র“প ছবি। এসব স্মরণীয় সফল অনুষ্ঠানগুলোর পেছনে যারা নিরলস কাজ করেছেন তাদের মধ্যে এই মুহূর্তে মনে পড়ছে মাহবুবর রহমান, তুষার কর, বিদ্যুৎ কর, গিয়াসউদ্দিন আউয়াল, মাহমুদ হক, পরেশ দেবনাথ, টিপু মজুমদার, লোকমান আহমদ, আজিজ আহমদ সেলিম, নূরুজ্জামান মণি, আববকর মোহামদ হানিফ, আবুল কাশেম মিলু, হামিদ মোহাম্মদের নাম। শাপলার মেলার উদ্যোগে একবার বিজয় দিবস উপলক্ষে যুগভেরী কার্যালয়ে আবুল কাশেম মিলু (মিলু কাশেম) ও নাহাস পাশার সংগৃহীত বাংলাদেশের কবি-সাহিত্যিকদের ছবির প্রদশর্নীও অনুষ্ঠিত হয়। সিলেটে এ ধরনের প্রদর্শনী মনে হয় সেটাই ছিল প্রথম। শাপলার মেলার সেসব সাথী ভাইবোনদের অনেকেই আজ সাহিত্য সাংবাদিকতাও অন্যান্য পেশায় দেশ বিদেশে প্রতিষ্ঠিত। সাপ্তাহিক যুগভেরী এখন দৈনিক রূপ নিয়েছে। শাপলার মেলার অস্তিত্ব এখন আর নেই। কিন্তু সেই দিনগুলোর স্মৃতি আজও জেগে আছে সিলেটের সাহিত্য-সংস্কৃতি প্রিয় মানুষের মনে।

Print Friendly