রোববার দেশের সব মানুষকে রাজধানীতে আসার আহ্বান খালেদা জিয়ার

নিজস্ব প্রতিবেদক, সাহিত্য বাজার

Begum jiaনির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে আগামি ২৯ ডিসেম্বর, রোববার সারা দেশের সব শ্রেণী-পেশার মানুষকে রাজধানীতে আসার আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। তিনি এ কর্মসূচিকে ‘মার্চ ফর ডেমোক্রেসি বা গণতন্ত্রের অভিযাত্রা’ নামে অভিহিত করেন।

মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলনে এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন খালেদা জিয়া। রাজধানীর গুলশানে নিজ কার্যালয়ে সন্ধ্যা ছয়টার দিকে সংবাদ সম্মেলন শুরু হয়। সংবাদ সম্মেলন উপলক্ষে গুলশান কার্যালয় এলাকায় নেতা-কর্মীদের ভিড় ছিল বিকেল থেকেই। আত্নগোপনে থাকা বিএনপির শীর্ষস্থানীয় নেতাদের অনেকেও উপস্থিত ছিলেন এ সংবাদ সম্মেলনে।

প্রায় এক ঘন্টার বক্তব্যে খালেদা জিয়া আন্দোলনের পরবর্তী করণীয় বিষয়ে বক্তব্য প্রদানের পাশাপাশি এক তরফা নির্বাচন প্রক্রিয়ার কঠোর সমালোচনা করেন। তাঁর বক্তব্য ছিল সুশীল, মার্জিত ও সরকারকে সমঝোতায় আসার আহ্বান ও অনুরোধ মিশ্রিত। আগামীতে ক্ষমতায় গেলে কী করবেন তারও উল্লেখ ছিল তাঁর এ বক্তব্যে।

বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ২৯ ডিসেম্বর তাঁদের ঢাকামুখে অভিযাত্রা হবে নির্বাচনী প্রহসনকে ‘না’ বলতে এবং গণতন্ত্রকে ‘হ্যাঁ’ বলতে। এই অভিযাত্রা হবে শান্তি, গণতন্ত্র ও জনগণের অধিকারের পক্ষে। অভিযাত্রা হবে ঐতিহাসিক। লাল পতাকা হাতে ঢাকা এসে সবাইকে নয়াপল্টনে বিএনপির কার্যালয়ের সামনে সমবেত হওয়ার জন্য তিনি আহ্বান জানান।
এই অভিযাত্রায় বাধা না দেওয়ার জন্য তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘যানবাহন, হোটেল, রেস্টুরেন্ট বন্ধ করবেন না, গ্রেপ্তার-হয়রানি করবেন না।’ কর্মসূচি পালনের সহায়তা করার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

আন্দোলনে চার দফা

চলমান আন্দোলনের চার দফা করণীয় ও নীতি-কৌশল তুলে ধরেন খালেদা জিয়া। এগুলো হলো- এক. সরকারের বিরুদ্ধে প্রাণক্ষয়ী লড়াইয়ে যারা শরিক আছেন এবং হচ্ছেন তাদের মধ্যে সমন্বয়, সমঝোতা ও ঐক্য গড়ে তোলা।

দুই. বিভক্তি ও বিভাজনের বিষাক্ত রাজনীতির চিরঅবসান ঘটানোর জন্য জনগণের ইচ্ছা ও অভিপ্রায়কে মূল্য দেওয়া। জাতীয় ক্ষেত্রে বিতর্কিত বিষয়সমূহ অবাধ ও শান্তিপূর্ণভাবে আলাপ আলোচনা এবং গণভোটের মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক পন্থায় মীমাংসার মাধ্যমে রাজনৈতিক সংকল্পকে জোরদার করা।

তিন. ভোটকেন্দ্রভিত্তিক সংগ্রাম কমিটিগুলোর পাশাপাশি অবিলম্বে জেলা, উপজেলা ও শহরে ‘সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র রক্ষা সংগ্রাম কমিটি’ গঠন করে পাঁচ জানুয়ারি নির্বাচনী তামাশা প্রতিহত করা।

চার. সংখ্যালঘু ধর্মাবলম্বী, সম্প্রদায় ও জাতিগোষ্ঠির মানুষদের যুক্ত করার পাশাপাশি তাদের জান-মালের নিরাপত্তা লঙ্ঘনের ‘সরকারি ষড়যন্ত্র’ সম্পর্কে সর্বোচ্চ সতর্কতা বজায় রাখা ও সজাগ থাকা এবং কোন ধরনের সাম্প্রদায়িকতাকে বরদাশত না করা। প্রয়োজনে এ জন্য পাড়ায় পাড়ায় প্রতিরোধ কমিটি গড়ে তোলা।

খালেদা জিয়া বলেন, প্রধানমন্ত্রী এখনো প্রহসনের নির্বাচন করার ব্যাপারে অনড়। তিনি বলেছেন, দশম সংসদ নিয়ে কোনো আলোচনা নয়। পরে একাদশ সংসদ নিয়ে আলোচনা হতে পারে। এটা যুক্তির নয়, জেদের কথা। এটা বাস্তবসম্মত নয়, অপকৌশলের কথা।

একগুঁয়েমি পরিহার করে সমঝোতায় আসার জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে খালেদা জিয়া বলেন, ‘সমঝোতা স্থাপন করলে কেউ ছোট হয়ে যায় না। ১৯৯৬ সালে আমরা আপনাদের দাবি মেনে নিয়ে সমঝোতা স্থাপন করেছিলাম। এখন আপনারা ক্ষমতায় আছেন। জনগণের দাবি মেনে নিয়ে সমঝোতায় আসুন। এখনো সময় শেষ হয়ে যায়নি। প্রহসনের নির্বাচনের তফসিল বাতিল করুন। আলোচনা শুরু করুন। আমরাও আলোচনায় বসতে রাজি আছি।’

সর্বশেষ জাতিসংঘের মধ্যস্থাতায়সহ বিভিন্ন সময়ের সংলাপের উদ্যোগের বিষয় তুলে ধরে খালেদা জিয়া বলেন, আসলে কেবল লোক দেখানোর জন্য আওয়ামী লীগ আলোচনায় এসেছিল। এটা ছিল সময়ক্ষেপণে তাদের এক প্রতারণাপূর্ণ কৌশল। এর আড়ালে তারা তাদের অসত্ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের পথেই এগিয়ে গেছে। তৃতীয় দফা বৈঠকে বিএনপির দেওয়া প্রস্তাব নিয়ে সরকারি দল তাদের নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলোচনা করে আবার ফিরে আসার অঙ্গীকার করলেও তারা তা রাখেনি।

ইলেকশন নয়, এটা নির্লজ্জ সিলেকশন
৫ জানুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠান প্রক্রিয়ার কঠোর সমালোচনা করে বিএনপির চেয়ারপারসন বলেন, প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের নামে যে প্রহসন পরিচালনা করছেন তাতে জনগণের ভোট ছাড়াই ১৫৪ জন এমপি হয়ে যাচ্ছেন। সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের জন্য তাদের জনগণের ভোটের কোনো প্রয়োজন হয়নি। দেশের মোট ভোটারের শতকরা প্রায় ৫৩ জনের ভোটের অধিকার এই প্রক্রিয়ায় কেড়ে নেয়া হয়েছে। বাকী আসনগুলোতেও যারা প্রার্থী আছেন তাদেরও কোনো উপযুক্ত ও যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। সেখানেও ভোটাররা বঞ্চিত হচ্ছেন তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে।

খালেদা জিয়া বলেন, শুধু আওয়ামী লীগ এবং তাদের জোটের একাংশ এই একতরফা প্রহসনে শামিল হয়েছে। এই নির্বাচনী তামাশা কোনো ইলেকশন নয়, এটা নির্লজ্জ সিলেকশন।

সরকার হবে সম্পূর্ণ অবৈধ
খালেদা জিয়া বলেন, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে যারা ইতিমধ্যে নির্বাচিত হয়েছে এবং যারা হবেন তাঁদের কেউই বৈধ জনপ্রতিনিধি হবেন না। কেননা, জনগণ তাদেরকে ভোট দিয়ে কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনে প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত করছে না। কাজেই তাদের সমর্থনে গঠিত সরকার হবে সম্পূর্ণ অবৈধ, অগণতান্ত্রিক ও জনপ্রতিনিধিত্বহীন। তেমন একটি অবৈধ সরকারের আদেশ নির্দেশ মান্য করতে প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং জনগণের  কোনো বাধ্যবাধকতা থাকে না।

খালেদা জিয়া বলেন, নৈতিক ও জনসমর্থনের দিক বিবেচনায় এই সরকার অনেক আগেই দেশ পরিচালনার অধিকার ও বৈধতা হারিয়েছে। তবুও সাংবিধানিক সংকট ও শূণ্যতা চায়নি বলেই এখনো সরকারের কর্তৃত্ব ও অস্তিত্বের প্রতি তাঁদের স্বীকৃতি অব্যাহত রয়েছে।

ইসির উচিত পদত্যাগ করা

নির্বাচনের প্রক্রিয়া বন্ধ করার সাধ্য না থাকলে নির্বাচনের কমিশনের অন্তত পদত্যাগ করা উচিত বলে মন্তব্য করেন খালেদা জিয়া। তিনি বলেন, এই নির্বাচন ও এর মাধ্যমে গঠিত সরকার হবে ‘বাই দ্য ইলেকশন কমিশন, ফর দ্য আওয়ামী লীগ, অফ দ্য আওয়ামী লীগ’।

এক তরফা নির্বাচন না করার আহ্বান জানিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা সরকারের উদ্দেশে বলেন, ‘জনগণের অর্থের অপচয় করে ভোটবিহীন, প্রার্থীবিহীন, প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন একটা অর্থহীন প্রহসনের নির্বাচন করার প্রয়োজন নেই। এতে শুধু আপনারাই কলংকিত হবেন না, গণতন্ত্রও ধ্বংস হবে।’

সেনাবহিনীকে জনগণের মুখোমুখি

সরকার সেনাবাহিনীকে দেশবাসীর মুখোমুখি দাঁড় করাবার অপচেষ্টা চালাচ্ছে বলে অভিযোগ করেন খালেদা জিয়া। সশস্ত্র বাহিনীকে প্রহসনের নির্বাচনে জড়িত করে বিতর্কিত না করার জন্য তিনি আহ্বান জানান।

খালেদা জিয়া অভিযোগ করেন, সরকারের নির্দেশে যৌথবাহিনীর অভিযানে শাসকদলের সশস্ত্র ক্যাডাররাও অংশ নিচ্ছে।

ড. মুহাম্মদ ইউনূস প্রসঙ্গ
খালেদা জিয়া বলেন, ‘দেশের একমাত্র নোবেল বিজয়ী ব্যক্তিত্ব প্রফেসর ড. মুহম্মদ ইউনূস ও গ্রামীণ ব্যাংক নারীর ক্ষমতায়ন ও ক্ষুদ্রঋণ আন্দোলনের মাধ্যমে দারিদ্রমোচনের ক্ষেত্রে  অর্জিত অগ্রগতিকে রক্ষার জন্য লড়াই করে যাচ্ছেন। আমি এই আন্দোলনকেও জনগণের অধিকার রক্ষার গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অংশ বলেই মনে করি। আমি তাদের ধন্যবাদ জানাই।’

বিজয়ের পর..
খালেদ জিয়া বলেন, এই সংগ্রামে বিজয়ের পর সকলে মিলে অখন্ড জাতীয় সত্ত্বা গড়ে তোলা হবে। হানাহানির অন্ধকার করা হবে। সুশাসন কায়েম করা হবে। সমঝোতার ভিত্তিতে প্রধান জাতীয় সমস্যা ও বিরোধীয় ইস্যুগুলোর নিষ্পত্তি ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী করা হবে।

সূত্র : প্রথম আলো

Print Friendly