যোগ বিয়োগের সিঁড়ি : মনি হায়দার

অতিথি লেখক

যোগ বিয়োগের সিঁড়ি

SAM_3343

মনি হায়দার

আমাকে সবচেয়ে ভালো কে চেনে? আমিই তো আমাকে সবচেয়ে ভালো চিনি, চেনার কথা। অথচ এখন আমিই আমাকে চিনতে পারছি না। কেমন এক অচেনা সড়কের অলি-গলিতে আমাকে চেনার জন্য আমি হেঁটে মরছি। কেনো আমার আমাকে আমি চিনতে পারছি না! আমার মধ্যে কি হরমোনের কোনো বিষাক্ত বিক্রিয়া শুরু হয়েছে? চৈতন্যের পুকুরে কোনো খাদক মাছ সাঁতার কাটছে? আমার আমাকে আমূল গিলে ফেলছে?
না, তেমন তো কিছুই না। স্বাভাবিক মানুষের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে আমি বিছানায় বসে আছি। কেবল বসে না, বসে বসে ভাবছি। আমার আমাকে আবিষ্কার করার চেষ্টা করছি। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত গলির মোড়ে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা মেরেছি। সাত-আটটা সিগারেট ফুঁকেছি আয়েশ করে। পাশের বাসায় মেয়েটির সঙ্গে সর্বশেষ চোখাচুখি নিয়ে কথা বলছি॥এ পর্যন্ত সবই ঠিক ছিল বা আছে। আসল গণ্ডগোলটা বাধলো রাতে বাসায় এসে। সন্ধ্যেয় একটা টিউশুনি ছিল, কাস এইটের একটা ছেলেকে পড়াই। পড়িয়ে বাসায় ফেরার পথে সান্টুর সঙ্গে দেখা।
সান্টুকে মাস কয়েক আগে আইন-শৃ´খলা রাকারী বাহিনী ধরে নিয়ে গিয়েছিল। ওর বাবা-মা অনেক চেষ্টা চরিত্র করে  সান্টুকে জেলহাজত থেকে বাঁচিয়ে এনেছে। তারপরের দিন সান্টু এলাকা ছাড়া। ঘটনা কি? অনেক জল ঘোলা করে জানা যায়। সান্টুকে গ্রামে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে॥নিরাপত্তা হেফাজতে। সেই সান্টুকে আচমকা পেয়ে যাওয়ায় দু’একটা সুখ-দুঃখের কথা বলতে বলতে ইটালি হোটেলে পরপর তিন দু’গুণে ছ’কাপ চা পান করলাম। পা চান করতে করতে সান্টু এক সময়ে তেড়ছা চোখে আকাশের দিকে তাকায়। দেখেছিস মুন্না কতো বড় চাঁদ?
আমিও তাকাই। সত্যিই তো বড় একটা চাঁদ। অনেক অনেক দিন পর চাঁদের আলতো ছোঁয়ায় মাখামাখি হয়ে বাসায় ফিরি। দরজা খুলতেই দেখি মার মুখে অবিশ্বাস্য মধুর হাসিÑএসেছিস? আয়,ভেতরে আয়।
মনে হলো কোনো নাটকের দৃশ্য। পরে মনে হলো কোনো ভুল জায়গায় এলাম নাকি! গত কয়েক বছরে বাসায় এমন সম্মানজনক সমাদর বা অভ্যর্থনা পাইনি। সবসময় একটি অস্বস্তিকর চাপের মধ্যে থাকতে হয়েছে। প্রাণ খুলে বাসায় কেউ কথা বলে না আমার সঙ্গে। ব্যতিক্রম ছোট বোন ঝর্না। ঝর্না আমার কষ্ট বোঝে। ও এ বছর মেট্রিক দেবে। কিন্তু বুদ্ধি বিবেচনা এমএ পাসের মতো।
বাপজান অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী মোহাম্মদ সেলিম আমাকে আপদ নামে ডাকেন। গত তিন বছর ধরে এমএ পাস করে বসে আছি, খাই দাই ঘুমাই কোনো কাজ করি না। সংসারে আমি আপদ হবো না তো কে হবে? আমার ছোট দু’দুটো ভাই পশ্চিমের দেশে থাকে। তারা মাসে মাসে দিনার পাঠায়। আমি বসে বসে দেখি। ভাইয়েরা প্রস্তাব দিয়েছিল। এদেশে যখন কিছু হবে না তাদের সঙ্গে পশ্চিমের দেশে যোগ দেওয়ার জন্য। কন্তু আমি এদেশে ছেড়ে কোথাও থাকতে পারবো না। জানালে বাসার মধ্যে পরিস্থিতিটা উল্টে যায়। আরে বাবা উল্টে যাওয়ার কি আছে! আমি তো মিথ্যা কিছু বলছি না। সত্যি কথাটা বলেছি। বিদেশে গেলে আমি দমবন্ধ হয়ে মারা যাবো, আমি তো আমাকে চিনি। ওই সব দেশে গেলে কি বাংলা ভাষায় প্রাণ খুলে আড্ডায় বসতে পারবো? দিন নাই রাতই ঢাকার উন্মুক্ত রাস্তায় ঘুরতে পারবো? সময় এবং সুযোগ পেলে সুবর্ণাদের বাসায় যেতে পারবো? সুতরাং আমি বিদেশে যাবো না। বাবা তো আমার সঙ্গে কথা বন্ধ করে দিলেন। মাও দেখলাম ক্রামগত দূরের মানুষ হয়ে যাচ্ছেন।
কি আশ্চর্য। সবাই স্বার্থের নৌকায় চড়নদার। অথচ আজ মা আমাকে দেখে খুশিতে হাসিতে আটখানা। ঘটনা কি? কোনো আশ্চর্য ঘটনা কি ঘটেছে আমাকে ঘিরে এই অচলায়তন সংসারে?
কোথায় থাকিস সারাদিন? খেয়েছিস কিছু? মায়ের স্নেহকোমল জিজ্ঞাসা। আমি রীতিমত ভয় পেয়ে যাই। আমি কি কোনো দুঃস্বপ্নের ঘোরে আটকে পড়ছি? নাকি অলৌকিক কোনো স্বপ্নের নৌকায় উঠে লোলুপ নদী পাড়ি দিচ্ছি। আমি কি আমাকে ছিঁড়ে খুঁড়ে কোনো অন্ধকূপে ভাসিয়ে দিচ্ছি?
কিরে মুন্না! কথা বলছিস না কেনো? মা আবার প্রশ্ন করেনÑখেয়েছিস কিছু?
না মা।
টেবিলে বস, আমি খাবারটা গরম করে দিচ্ছি। মা দ্রুত চলে যান ড্রইংরুম থেকে। আমি স্থির অনড় দাঁড়িয়ে থাকি। অনন্তকালের সুই আর সুতোয় আমি এফোঁড় ওফোঁড় গেঁথে আছি ড্রইংরুমের মেঝের সঙ্গে। মা আমার জন্য খাবার গরম করতে যাচ্ছেন! বিগত পাঁচ বছরে এ রকমটি হয়েছে , মনে পড়ে না। সংসারের আর পাঁচটা উল্কি আঁকা আসবাবপত্র চেয়ার টেবিল সোফা কাপ পিরিচের মতো জড় জীবন যাপন করে যাচ্ছি। নিজেকে য়ে য়ে নির্মাণ করার কোনো সাহস বা কৌশল আমার জানা নেই। কেমন করে যে লেখাপড়া করেছি এমএ টা পর্যন্ত পাস করেছি বুঝতে পারছি না। পড়াশোনার সময়ে আমি সংসারে খুব আদরনীয় ছিলাম। দিন-রাত পড়াশোনা নিয়ে থাকতাম। মা-বাবা বেশ গর্ব করে বলতেন আত্মীয় স্বজনদের কাছেÑ মুন্না আমাদের লক্ষ্মী ছেলে। ওকে নিয়ে আমাদের কোনো চিন্তা নেই।
কিন্তু খুব ভালো ছাত্রও ছিলাম না। কোনোভাবে পাসের খেয়া পার হয়ে যেতাম। সমস্যাটা ধীরে ধীরে পাকিয়ে উঠলো যখন এমএ পাসটা সত্যি সত্যি করে ফেললাম, তারপর থেকে। বাবা একদিন ডেকে বললেন Ñ এমএ পাস ছেলে তুমি। তোমার পেছনে অনেক টাকা ব্যয় করেছি। এখন আর ঘরে বসে থেকো না, কাজটাজ একটা জুটিয়ে নাও। আমি আর ক’দিন?
পান চিবুতে চিবুতে মা বললেনÑযাক আর কটা দিন। চাকরির চেষ্টা করছে ও। হয়ে যাবে।
হলেই ভালো। বিরস বদনে বাবা আরও যোগ করেনÑএমএ পাস করাতে যে টাকা ব্যয় হয়েছে সেই টাকা দিয়ে ঢাকায় দশ কাঠা জমি রাখলে অনেক লাভ হতো।
আমি রুম থেকে ছিটকে বেরিয়ে এলাম। এই শহরে এখন এমএ পাস ছেলের পিতার কাছে দশ কাঠা জমি মূল্যবান! মানুষ হিসেবে নিজেকে কেঁচো মনে হচ্ছে। আসলে কি আমি একজন মানুষ? মানুষ হলে কেমন মানুষ? আমার জীবনে কোনো সাফল্য নেই কেনো? অন্যের চেয়ে আমি একটু আলাদা, অন্যরকম কখনোই হতে পারলাম না।
কী? আয়! মা ড্রইংরুমের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছেন। আমাকে স্থির দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অবাক Ñ কিরে। পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আছিস কেনো? আয় টেবিলে ভাত, গরম তরকারি দিয়েছি।
যাচ্ছিÑআমি মাকে অতিক্রম করে বাথরুমে ঢোকার জন্য বাথরুমের সামনে দাঁড়াই। ভেতরে কে একজন আছে। অপো করছি। মা আমার সামনে এসে দাঁড়ান, মুখে আশ্চর্য সুন্দর হাসিÑতোর জন্য বড় চিংড়ি মাছ ভাজি করে রেখেছি।
বাথরুমের দরজা খুলে যায় বেরিয়ে আসেন আমার পিতা, যিনি আমার মতো এমএ পাস পুত্রের চেয়ে ঢাকা শহরে দশ কাঠা জমিকে মূল্যবান মনে করেন। গামছায় ভেজা মুখ মুছতে মুছতে আমাকে বলেনÑকোথায় থাকিস সারাদিন!
আমার পিতার কণ্ঠও আজ আমার প্রতি প্রসন্ন, উদার, মহিমানি¦ত। আমার শিরদাঁড়া বেয়ে ভয়ের ঠাণ্ডা স্রোত নামে। ঠাণ্ডা ভয়ের স্রোত নিয়েই বাথরুমে ঢুকি। হাত-মুখ ধুয়ে ছোট্ট অপরিসর অস্বচ্ছ আয়নায় নিজেকে দেখি। চিনতে পারছি তো? হ্যাঁ, আমি আমাকে নিশ্চিন্তে চিনেছি। গোলগাল মুখের উপর লম্বা খাড়া বেমানান নাক, কুঁচকানো কপাল, মোচড়ানো গাল। গালের উপর খোঁচা খোঁচা দাড়ি। ভাসমান হলুদাভ দুটি চোখ। এই নিয়ে আমি, আমাকে বেশ চিনেছি। কিন্তু বাসার মধ্যে এমন কি ঘটলো আজ হঠাৎ আমার সঙ্গে এমন মানবিক দয়ালু ব্যবহার করছে? আমি কি দুঃস্বপ্নের মায়াজালে আটকানো কোনো কুমির? যাই হোক বাথরুমে কাজ ছাড়া বেশিণ থাকা যায় না। দরজা খুলে বের হয়ে আসি। মা আমার অপোয় অপেমাণ। আমি সুবোধ বালকের মতো টেবিলে বসি। মা আমাকে পরিবেশন করছেন। পরিবেশন করে মা আমাকে খাওয়াচ্ছেন। নিকট অতীতের কোনো স্মৃতি আমার মনে পড়ে না। খিদেটা নেই, আমার পেটের খিদেটা কোনো বাঘে খেয়ে ফেলেছে। কিন্তু কি সেই বাঘ, কেমন তার রঙ বুঝতে পারছি না। মুখের মধ্যে ভাত-চিংড়ি মাছ ধুলোর মতো লাগছে। তবুও প্রাণপণ চিবানোর চেষ্টা করছি।
মা হঠাৎ আমার খাবার থালার সামনে হাসি হাসি মুখে একটা লম্বা খাম রাখেন। আমি খামটা দেখে মায়ের দিকে তাকাই।
খুলে দ্যাখÑমা গভীর আন্তরিকতায় বলেন।
আমি খাম খুলে চিঠি পড়ে হতভম্ব। তাহলেও আমিও মানুষ! আমাকেও জয়েন করতে বলে কোনো কোনো কোম্পানি থেকে চিঠি লিখতে পারে। মাস চারেক আগে একটি বেসরকারি অফিসে চাকরির জন্য ইন্টারভিউ দিয়েছিলাম। ইন্টারভিউ ভালো হয়েছে। কিন্তু কখনও ভাবিনি আমার নামে জয়েনিং চিঠি আসবে। এতোণে আমার পিতা এবং জননীর এতো আন্তরিক অমায়িক ও মানবিক ব্যবহারের কারণ বোধগম্য হলো।
তাহলে এখন আমি এই সংসারের সোনার ডিম পাড়া হাঁস? এখন আমি ঢাকা শহরের দশ কাঠা জমির চেয়ে মূল্যবান? হঠাৎ নিজেকে খুব অসহায় আর বিপন্ন একজন মানুষ মনে হচ্ছে। খেতে খেতে বারবার, অজস্রবার চিঠিটা পড়ছি। নামতার মতো পাঠ করছি। বুকের ভেতরটা ছাইয়ের গাদায় পরিণত হচ্ছে। পদের নামÑঅফিস এক্সিকিউটিভ, বেতন দশ হাজার টাকা। দশ হাজার টাকা! এতো টাকা দিয়ে আমি কি করবো?
আমার প্রতিদিনের খরচ বিশ-পঁচিশ টাকা। কোথাও কোনো ইন্টারভিউ থাকলে শ’খানেক খরচ হয়। তাও মাসে গড়ে সর্বমোট এক থেকে দেড় হাজার টাকা। টাকাটা মা-ই দেন মুখ বেজার করে। সেই আমি এতো টাকা দিয়ে মাসে মাসে কি করবো? বিয়ে করে সংসারী হবার মতো সাহসও আমার নেই। এতোদিনে কড়ায় গণ্ডায় বুঝে গেছি।
গল্পের শুরুতে সুবর্ণার কথা বলেছি। সুবর্ণা আমার খালাতো বোন। আমাদের দেশের অসাধারণ লাবণ্যময়ী এবং প্রতিভাবান অভিনেত্রী সুবর্ণা মুস্তাফার সঙ্গে আমার চরিত্র সুর্বণার খুব একটা মিল নেই। তবে সুবর্ণা অসম্ভব সুন্দরী। সেই সৌন্দর্যের টোটাল বর্ণনা আমি দিতে পারবো না কিন্তু সুবর্ণা আমার অস্তিত্বের নিভৃতচারী ছবির রোমান্টিক ক্যানভাস। কতো রাত-দিন সুবর্ণাকে আমার শারীরিক সংরাগের কল্পনায় মাস্টারবেশন করেছি। সুবর্ণা তার কিছু জানে না, আমি জানি। আর চরম আনন্দের মুহূর্তে সুবর্ণাকে কম্পিত আদরের সীমাহীন বন্যায় আমি ভাসিয়ে নিয়ে যাই। তারপরও পরম প্রার্থিত সুবর্ণাকে আমি মুখ ফুটে কিছু বলতে পারি না। আমার আজন্ম ভীতু মনটা আমাকে আমার যাবতীয় সুখ, ঐশ্বর্য, চাহিদার কোষাগার থেকে দূরে রাখে। সুবর্ণাকে স্রেফ দেখতে প্রায়ই ওদের বাসায় যাই।
মেয়েরা শুনেছি চালাক চতুর বেশি হয়। সুবর্ণাও বুদ্ধিমতী। আমাকে দেখলেই মিষ্টি করে হাসে। হালকা দু’একটি কথা হয়। তারপরই উঠে পড়ে সুবর্ণাÑভাইয়া তুমি বসো, মাকে পাঠিয়ে দিচ্ছি। চড়–ই পাখির তীব্রগতিতে সুবর্ণা চলে যায়, আমি বসে বসে ওর শরীরের সুরভিত সৌরভ নাক দিয়ে টানি, টেনে টেনে বুকের গভীর মধ্যিখানে পাঠিয়ে দেই। বুকের গভীরে ঘুমিয়ে থাকা সুরভিজড়ানো সৌরভ। কতো দিন মনে মনে প্রস্তুতি নিয়ে গেছি। আজ সুবর্ণাকে সাহস করে বলবোÑসুবর্ণা?
মরাল গ্রীবা বাঁকিয়ে তাকাবে আমার দিকেÑবলো।
আমি বলবো……কন্তু আর বলা হয় না। আশ্চর্য এক কুহকে, ভয়ে থেঁতলে যাই, দুমড়ে যাই মুচড়ে যাই। আমার আমিকে গলাটিপে হত্যা করি। আর আপন রক্তে মহিমানি¦ত সিংহাসন তৈরি করি। সেই আমি আজ দশ হাজার টাকা বেতনের একজন পাওনাদার! কোথাও কোনো গণ্ডগোল বা ভুলটুল নেই তো? আমার মুখের গহ্বরে ভাত ঢুকছে না। হাঁসফাঁস করতে থাকি। মা মুরগির মাংস গরম করে নিয়ে আসেন।
কিরে কি হয়েছে? মা অবাকÑঘামছিস কেনো?
মা গলায় কাঁটা বিঁধেছে।
মায়ের চোখ দুটো বড় হয়ে যায়। অবিশ্বাস্য কণ্ঠে বলেনÑ মুন্না কি বলছিস তুই? তুই তো চিংড়ি মাছ আর লালশাক দিয়ে ভাত খাচ্ছিস! চিংড়ি মাছে কি কাঁটা থাকে। কথা বলতে বলতে মা পানির গ্লাস এগিয়ে দেন।
আমি নিঃশব্দে হাঙ্গরের তৃষ্ণায় পুরোটা পানি এক নিঃশ্বাসে গিলে ফেলি এবং ভাত, মুরগির মাংস রেখে উঠে পড়ি। নিজের ছোট বিছানায় শরীর এলিয়ে দিয়ে যুদ্ধকান্ত একজন মানুষের মতো হাঁপাতে থাকি।
পরেরদিনে কোথাও বের হই না। মা বারবার আসেনÑকি হয়েছে তোর? আজকে এমন খুশির দিনে তুই চুপচাপ বসে আছিস। বাইরে যা বন্ধুদের নিয়ে আয়। তোর ছোট খালার বাসায় মিষ্টি পাঠা। কুয়েতের দুই ভাইকে টেলিফোনে জানা সুখবরটা। মা আমার দিকে পাঁচশ’ টাকার দুটো নোট বাড়িয়ে ধরেনÑতোর বাবা দিয়েছে। ইচ্ছেমত খরচ করতে।
ঠিক আছে, রাখো। আমি নিরাসক্তভাবে বলি। আগে মা একশ’ টাকা দিলে নেচে উঠতাম আর আজ এক হাজার টাকা দিচ্ছে। অথচ আমার ভেতরের আমিটা কোনো উল্লাস বোধ করে না, কেনো? মা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকেন এবং এক সময়ে দীর্ঘনিঃশ্বাস ত্যাগ করে চলে যান। আমি আড়মোড়া তুলে হাঁটু ভেঙ্গে বসে পড়ি বিছানার ওপর।
সন্ধ্যায় বাবা এবং মা দু’জনে আমার রুমে আসেন। বাবা খুব গম্ভীর প্রকৃতির মানুষ। মুখটা সবসময় অজ্ঞাত কারণে কুঁচকে থাকে অথচ আজ বেশ প্রসন্ন। কণ্ঠে ভাসছে øেহের প্রাবল্য। প্রথমে খুক খুক কয়েকটি কাশ দিয়ে আমার পায়ের কাছে বসলেন। মা যথারীতি দাঁড়িয়ে। আমি পা দুটো গুটিয়ে নিলাম।
শোনো, চাকরিটা খুব যতœ করে করবে। ঠিক সময়মতো অফিসে যাবে। অফিসের সবাইকে বন্ধু, সহকর্মী ভাববে। দেখবে কোনো সমস্যা হবে না। বাবা একটু হাসলেন। বুঝতে পেরেছি তিনি আরও কিছু বলবেন, সেজন্য এই বিরতি। বাবা আবার আরম্ভ করলেনÑআটত্রিশ বছর চাকরি করে কাটিয়ে দিলাম। কেউ কখনও কোনো বদনাম করতে পারেনি। যেদিন আমার ফেয়ারওয়েল হলো,সেদিন অফিসের বড় বস থেকে আরম্ভ করে কেরানি, পিয়ন, মালি পর্যন্ত কেঁদেছে। এটা অর্জন করতে হয়েছে আমাকে। আবার একটু বিরতি নিলেন এবং পরেই আসল কথাটা বললেনÑআশা করি আমার সম্মান তুমি রাখবে। কালকে অফিসে যাওয়ার সময়ে তোমার মায়ের কাছ থেকে একশ’ টাকা নিয়ে যেও। যতিদন বেতন না পাবে, নিয়ে যাবে। প্রাইভেট অফিস সবসময় ভালো জামা কাপড় পরে যাবে অফিসে। টাকা লাগলে তোমার মাকে বলবে। কোনো সংকোচ করবে না, বুঝেছ?
আমি ঘাড় কাত করে বোঝার বিষয়ে কনফার্ম করি। বাবা উঠে পড়েন॥। পছনে পিছনে মাও চলে যান। আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচি।
সকালে ঘুম থেকে সবার আগেই উঠি। সাধারণত ঘুম থেকে উঠতে আমার দেরিই হয়। এজন্য সংসারে অনেক কথা আমাকে শুনতে হয়েছে। কিন্তু আজ কি করে যে উঠলাম আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় আমাকে জানিয়ে দিয়েছে। সারারাত ঘুম হয়নি। শেষরাতের দিকে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। তারপরও যে উঠতে পারলাম। নিজের প্রতি বেশ কৃতজ্ঞতা বোধ করছি। সারারাত ঘুম না হওয়ার কারণ আমি আমাকে এবং আমার চাকরির জয়েনিং লেটারটা নিয়ে একটা নাটক সাজিয়েছিলাম। আমি একদমই এই নাটক লিখতে চাইনি। তারপরও অবচেতনে কে যেনো আমাকে দিয়ে নাটকের পাণ্ডুলিপি রচনা করিয়ে নিয়েছে আমি তাকে চিনতে পারিনি। সারারাত আমার মনে হয়েছে আমি সকালে খুব সেজেগুজে যথাসময়ে প্রায় বিশ-বাইশ মিনিট আগে অফিসে গিয়ে পৌঁছলাম। সিঁড়িতে বা গেটে পরিচয় দিতেই দারোয়ান সম্মানের সঙ্গে দরজা খুলে ভেতরে নিয়ে রিসিপশনের সুন্দরী একজন রিসিপশনিস্টের কাছে আমাকে হস্তান্তর করল।
রিসিপশনিস্ট তার লেন্থমাপা নির্দিষ্ট হাসির চেয়ে সামান্য বেশি প্রসারিত হাসি দিয়ে গ্রহণ করলো এবং আমাকে ইঙ্গিতে সামনের নরম সোফায় বসতে বলে কানে ফোনের রিসিভার তুললো। ফোনে রিসিপশনিস্ট বেশ কয়েক মিনিট ভেতরে কথা বলার পর আমার হাত থেকে জয়েনিং চিঠিটা নিয়ে আমাকে বসতে বলে ভেতরে চলে যায়। আমি বসে বসে ঘামতে থাকি। ইতিমধ্যে অফিসে প্রচুর লোকজন এসেছেন। যে যার কাজ করে যাচ্ছেন। হঠাৎ দরজা খুলে যায় এবং রিসিপশনিস্ট দাঁড়িয়ে আমাকে ডাকছেÑ আসুন। ইশারায় ভেতরে প্রবেশ করার ইঙ্গিত দিয়ে যেন চকিতে দরজা থেকে সরে যায়। আমি রিসিপশনিস্টের শরীরের সোমরস গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে ভেতরে প্রবেশ করে দেখতে পাই ছোট ছোট রুমের মধ্যে বেশ কয়েকজন বসে কাজ করছেন। আর একটা রুম একটু বড় সামনে লেখা ‘জেনারেল ম্যানেজার’। জেনারেল ম্যানেজার সহাস্যে আমার দিকে এগিয়ে এলেন এবং হাত ধরে তার টেবিলের সামনে বসালেন। সঙ্গে সঙ্গে ধূমায়িত দু’কাপ কফি এসে যায়। তিনি আমাকে কাপ নেয়ার ইঙ্গিত দিয়ে নিজের কাপটা টেনে নিয়ে চুমুক দেন চেয়ারে হেলান দিয়ে আয়েশি আন্তরিকতায়। মুখে ধরা চমৎকার হাসি। তার সামনে টেবিলের ওপর বিছানো আমার জয়েনিং লেটার।
মুন্নু কাপে চুমুক দিয়ে টেবিলে নামিয়ে রাখতেই তিনি বললেনÑ আমাকে আপনার সঙ্গে কয়েকটি জরুরি কথা বলা দরকার। আমি সরাসরি কথা বলা পছন্দ করি আশা করি কিছু মনে করবেন না।
জ্বি না, কিছুই মনে করবো না। তাছাড়া আমিও সরাসরি কথা পছন্দ করি।
গুডÑ জেনারেল ম্যানেজারের হাতে কফির কাপ নেই, তার হাতে উঠে এসেছে সুদৃশ্য একটি পেপারওয়েট। তিনি আপন মনে পেপারওয়েটটাকে খেলতে খেলতে বলছেনÑঅনিবার্য কারণবশত আপনাকে দেয়া নিয়োগপত্রটি গতকালের মিটিংয়ে বাতিল করা হয়েছে। কিন্তু আপনাকে জানানোর আগেই যখন নির্দিষ্ট দিনে এসে পড়েছেন সেেেত্র কোম্পানি আপনাকে তিপূরণ এবং দুঃখ প্রকাশের সঙ্গে এক মাসের বেতন দিয়ে দিচ্ছে। তিনি, জেনারেল ম্যানেজার ড্রয়ার খুলে একটা খাম বের করে রাশেদ হাসান মুন্নাকে ধরিয়ে দেন, হ্যান্ডশেক করে বিগলিত হেসে বলেন, আশা করি কিছু মনে করবেন না। এটা একটা ছোট্ট দুর্ঘটনা মাত্র।
রাশেদ হাসান মুন্না জেনারেল ম্যানেজারকে পেছনে ফিরে আসতে আসতে শুনতে পায় তার নিয়োগপত্রটি ছেঁড়ার শব্দ। প্রতি মুহূর্তের শব্দ তার বুকের ভিতরে তীব্র রক্তপানের উৎসবে মেতে উঠে এই কল্পনা বা ভাবনা থেকে নিজেকে যতোই বিযুক্ত রাখার চেষ্টা করি না কেনো চিন্তাটা কল্পনার ভয়ংকর মানচিত্রটা এসে যায় আবছাভাবে। আমি ওই চিন্তা থেকে বিযুক্ত হাবার জন্য সুর্বণাকে নিয়ে ভাবতে থাকার চেষ্টা করি। সুবর্ণার সঙ্গে শারীরিক সংরাগে মত্ত হয়ে উঠি একা একা কিন্তু না, কোনোভাবেই কল্পনার ছায়া আমাকে ছাড়ছে না। বিকল্প হিসেবে আমি আমার সংগ্রহে রাখা বেশ কয়েকটি ন্যুড ছবির বই নিয়ে নারী শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের রূপ-রস-সৌন্দর্য চর্চায় মেতে উঠবার চেষ্টা করি। না, হচ্ছে না ভয়ংকর কল্পনা বা ছায়া আমার ভেতরে, করোটির খাঁজে ঢুকেই যাচ্ছে। সুবর্ণা যখন আমাকে কল্পনার ছায়া থেকে বিযুক্ত করতে পারলো না আমি হাল ছেড়ে দিয়ে শুয়ে থাকলাম বিছানায় চিৎ হয়ে। তারপর কখন ঘুমিয়ে পড়েছি জানি না।
ফিটফাট হয়ে অফিসে যাবার সময় মা বললেনÑঅফিস শেষে সরাসরি বাসায় আসিস।
কেনো?
সুবর্ণাদের বাসায় যাবো বিকেলে।
মা, কাউকে যখন জানানো হয়নি, এখন আর জানিও না।
কেনো?
পরে জানালে ভালো হবে।
ঠিকই বলেছে মুন্না – বাবা কখন পেছনে এসে দাঁড়িয়েছেন টের পাইনি। প্রথম মাসের বেতন পেয়ে সবার বাসায় মিষ্টি দেবে তখন সবাই জানবে।
কেনো জানি না বাবার এই পরিকল্পনা আমার খুব ভালো লাগে। আমি রাস্তায় এসে একটা সিএনজি নিয়ে সোজা মতিঝিলের আঠারো তলা ভবনের পনেরো তলায় নির্দিষ্ট অফিসের সামনে দাঁড়াই। কি চমৎকার মার্বেল পাথরের ওপর সোনালী রঙে অফিসের নাম লেখা। সেগুন কাঠের বিরাট দরজা। তখন থেকে প্রতিদিন আমিও অনেকের মেতো মহামূল্যবান দরজা পার হয়ে ভেতরে ঢুববো, বের হবো! এক অজানা ভয়ে শিহরণে রোমাঞ্চে আমি নার্ভাস ফিল করি। চারপাশটা একবার দেখে নিয়ে দরজার সামনে দাঁড়াই। দারোয়ান উঠে দাঁড়ায়Ñকোথায় যাবেন?
আমি হাতের চিঠিটি বাড়িয়ে ধরে বলি জায়েন করতে এসেছি। সঙ্গে সঙ্গে দারোয়ানের চেহারা খুব পাল্টে যায়। ঠকাস শব্দে আমাকে অভিবাদন জানায়। দরজা খুলে আমাকে ভেতরে প্রবেশ করতে বলে যান স্যার, ভেতরে যান। ভেতরে ঢুকতেই একজন সুদর্শন তরুণী আমার কাছে এগিয়ে আসে – কার কাছে যাবেন? আমি আবার আমার হাতের চিঠিটা তার দিকে বাড়িয়ে ধরলে নিমেষে চিঠিটা হাতে নিয়ে তরুণী আমার দিকে আগ্রহের সঙ্গে তাকায় এবং বলে আসুন। তরুণী খুব দ্রুত হাঁটছে শরীরের ছন্দ তুলে। চারপাশের ডেস্কে কাজ করছে অনেকে। কেউ কথা বলছে টেলিফোনে, কেউ কম্পিউটার নাড়াচাড়া করছে। কেউ চোখ তুলে এক পলকে দেখছে আমাকে। হঠাৎ একটা করে সামনে দাঁড়িয়ে যাই। দরজা খুলে তরুণী ভেতরে প্রবেশ করে এবং আমাকে ঢুকতে বলে।
ভেতরে ঢুকেই দেখতে পেলাম চমৎকার পরিপাটি করে সাজানো রুম। রুমটার মাঝখানে সুদৃশ্য চেয়ারে সৌম্য দর্শন একজন বসে আছেন। গভীর মনোযোগের সঙ্গে তিনি কাগজ পড়ছিলেন। আমাদের দিকে দয়া করে তাকালেন, তরুণীটি সঙ্গে সঙ্গে বলল – স্যার, ইনি রাশেদ হাসান মুন্না।
ভদ্রলোক পরিপূর্ণ মনোযোগ দিয়ে আমাকে দেখছেন, দেখে তরুণীর হাত থেকে আমার নিয়োগপত্রটা নিলেন, টেবিলের ওপর রাখলেন, আমাকে বললেন – বসুন। ইশারায় তরুণীকে যেতে বললেন। তরুণী চলে যায়। আমি অফিসের ভেতরে ভদ্রলোকের মুখোমুখি। তিনি কথা বলতে আরম্ভ করলেন – মি. রাশেদ হাসান মুন্না, আপনাকে স্বাগত, তবে একটা ছোট্ট দুর্ঘটনা ঘটেছে।
আমি কিছু বলতে চাইলে তিনি হাত উঠিয়ে থামিয়ে দিয়ে বললেন – আসলে আমাদের কম্পিউটার প্রোগ্রামের ভুলে আপনার নামে চিঠিটা চলে গেছে। ইতিমধ্যে ওই প্রোগামারকে আমরা চাকরিচ্যুত করেছি। এটা মারাত্ত্বক  অনিয়ম এবং আশাভঙ্গের কারণ বটে। যাই হোক আপনি একটা আশা নিয়ে এসেছেন, আপনাকে খালি হাতে ফেরাবো না।
তিনি বেল টিপলেন সঙ্গে সঙ্গে সেই তরুণী প্রবেশ করে – স্যার!
রাশেদ হাসান মুন্নাকে নিয়ে যাও। জেনারেল ম্যানেজারকে বলা আছেন ওনাকে পাঁচ হাজার টাকা দিতে।
আসুন, তরুণী ঘুরে দাঁড়ায়।
আমি উঠে দাঁড়ালাম । বললাম – হ্যাঁ, যাবো তবে আপনার সঙ্গে নয়, আমি একাই যেতে পারবো। আর ওই টাকা পাঁচ হাজার আমি আপনাদের দান করে গেলাম।
খরগোশের চেয়েও দ্রুতগতিতে রুম থেকে বের হয়ে আসি। মেহগনি কাঠের দরজা পার হয়ে আসার সময় দারোয়ান বুট ঠুকে যথারীত সশব্দে অভিবাদন জানায়। দারোয়ান জানে না আমি মূলত একজন ব্যর্থ মানুষ। লিফট ছেড়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে থাকি আর গুনতে থাকি সিঁড়ির ধাপ এক, দুই, তিন, চার….।
গুনতে গুনতে নিচে নামতে নামতে ভাবি আদিগন্ত জীবনের এই পাঠশালায় আমার জীবনে কি কোনোদিন কোনো সিঁড়ি যোগ হবে না? কেবলই বিয়োগ? কেবলই বোনাসহীন মাইনাস? বাসায় ফিরে যাবো কিভাবে? মা-বাবার তিক্ত ব্যবহার, আমার হলুদ রঙ চারপাশ আমাকে ক্রমশ গিলে খায়। খেতে থাকে হাসতে হাসতে।

Print Friendly