ময়মনসিংহের সাহিত্য : তিনপ্রজন্মের তিনজন কবির কবিতা

সাহিত্য বাজার

সত্তুর দশকের কবি আমিনুল হাসান -এর কবিতা
01
ছায়াতে আগুন ধরে
আমি হেঁটে গেলে ছায়া পড়ে
তুমি হেঁটে গেলে
ছায়াতে আগুন ধরে
তোমার কথায় বায়ু হয়ে উঠে বিষ
আমার আর কোনো অবদান থাকে না
সমস্ত হৃদয় জুড়ে থাক তুমি
যদি কখনো কোনো বিপ্লব হয়

জিহ্বার নীচে লুকানো সাগর

গভীর রাত্রিতে মনে পড়ে
আমাকে কাঁদিয়েছিলে একদা কুয়াশা সকালে
ট্রেন ছেড়েছিল সরিষাবাড়ির দিকে
তুমি অপলক
আমি পলকহীন দৃশ্যত পাথর
জিহবার নীচে লুকানো সাগর
লোকাল ট্রেনের ব্যস্ততায়
ট্রেন ছেড়েছিলো
আমার অবুঝ অবোধ্য মুখে
তোমার সেকি ঘ্রাণ
যেন সরিষায় ডুবিয়ে ছিলে
ইভনিং ইন প্যারিস
পড়নে ছিলো দুধ সাদা শাড়ী
সরের লেপটানো ঢেউ
ঠিকানা দিয়েছিলে যেখানে
বেহায়ার মত এখনো তাকাই
সরিষার বাড়ির ট্রেনে
কানাডা থেকে এসেই চলে যাও
মনেই থাকে না
কি হয়েছিল আসলে!

শিরোনামহীন শিার কথকতা

এসো আজ একটা কবিতা লিখি
অর্থে সামর্থে
শক্তিতে রক্তাক্তে
সাহসে বা ইতিহাস অধ্যয়নে
গর্বিত আমি
এসে বললে
‘শিতি নও তুমি’

উত্তরে হাওয়া বইছিল
দেিণ জানালা ছিল
আধ্যাত্মিক অধ্যবসায়ে
দূরের তিমির দেখালো
আলো হচ্ছে
ভাবছিলাম জমিদার হবো
কিংবা নায়ক
বললে, তাও নয়
তাহলে কী?
অতিকায় দৈত্যের মতো কিছু?
হেসে বললে
এতোক্ষণে বুঝেছো শিশু।

আশির দশকের কবি আশিক চৌধুরীর কবিতা
02
ভালোবাসার সময়
শরতের আকাশে সুনীল প্রচ্ছদে সাদা সাদা মেঘ
যেমন অনি:শেষ স্বপ্নের ভেতর চলে
তেমনি, নদী তীর ভরা কাশবন
উড়ে যায় ভালোবাসার সময়,
পাখি হয়ে যাও যদি, দেখবে আকাশের কোন শেষ নেই
যদি আকাশ হয়ে যাও তবে দেখবে
শূণ্যতার নেই কোন সীমা পরিসীমা

ভালোবাসার সময় শূণ্যতায় আকাশ নীল সাদা
মেঘ, পাখির অন্তহীন যাত্রা
বিশ্বস্ত নি:শ্বাসের ছায়া
দেখে
কান্ত হয়ো না; পাথর সময়
কোনদিন পরশ বুঝে না পরম মমতার
ভালোবাসার সময় ভুলো না ভালোবাসা

সমবেদনা
দু:খস্নাত, এই বেদনার অংশ আমাকে দাও
আমার এই গল্পগুলোর মতো বিপত্তি-
জীবন থেকে ছিড়ে নেয়া কাহিনীর চেয়েও
সকরুণ বাস্তব
গল্পগুলোর ভুল কোনদিন
শুদ্ধ- আর হয় না, এই দু:খ রাত জানি আর কোনদিন
ভোর হবে না, এই অনন্ত বিষন্ন দীর্ঘ রাত্রির
বিষন্ন অন্ধকার খুড়ে
ডুবিয়ে দিয়েছে দু:খ তোমার
অমর দু:খের লাশ ভেসে চলেছে
অপ্রত্যাশিত ব্যথা বেদনার বন্যায়
সেই বেদনার অংশ আমাকে দাও…

মৃত্তিকার ক্রান্তিক প্রতিভূ
মৃত্তিকার ক্রান্তিক প্রতিভূ
কোনদিন তোমার কথা আমি ভুলিনি
ভুলিনি – শীতে সরষে ক্ষেতে হলুদ সমুদ্রে
প্রজাপতির নিসঙ্গতা, কলাবাগানে
ছেড়া পাতায় সবুজ ধুলোর আবেশ
ধানের পাতায় শিশির বিন্দুর স্ফটিক
মৃত্তিকার ক্রান্তিক প্রতিভূ তুমি
অপার্থিব ঐশ্বর্যের প্রাচূর্য তোমার বিবাগী
স্বপ্নে;
সুন্দর বসন্তে কালো কোকিলের কণ্ঠ
আহত নদীর বিস্তীর্ণ বালুচরের রোদ
বই মেলার উৎসব মুখর ব্যস্ততায় সাথীহারা
নির্জন সন্ধ্যার কথা আমি ভুলি নি;
কোনদিন ভুলিনি, গ্রামের বিরান মাঠে
একাকী রাস্তায় শ্যামল ছায়ার
চিরচেনা সেই জারুল গাছের কথা
শ্রাবণের উদাস বৃষ্টির ভেতর ভিজে যাওয়া
চুল, টপ টপ পানির ছন্দপতন
কিছুই ভুলি নি, কোনদিন ভুলিনি
কোনদিন একবারো ভুলিনি

নব্বই দশকের কবি তামান্না কদর-এর কবিতা
03
বারনারী, চুক্তিনারী

কতো কিছু পড়ে রয় জানা অজানায়,
তুমি আমি ছুটে চলি ভীষণ ব্যস্ততায়।
বারনারী বাসা বুনে মনের গহীন কোণে,
চুক্তিনারী ভালোবাসে গভীর বিশ্বাসে।
এতকিছু বোঝে পুরুষ, মনটুকু ছাড়া
চিরটাকাল পুরুষ রয়, মানুষ হয় না।
পাখিরা সব ঘরে ফেরে রাত্রি গভীর হলেও
বারনারীর পুরুষেরা দিনরাত্রি মুখ লুকোয়।
সাধু-সন্ত সেজে রয় চুক্তি নারীর কাছে
আড়ালে তার সবগুলি দাঁত শাবল হয়ে ওঠে।
সব জেনেও কিছুই যদি না থাকে করার
এইটে ভেবে চুক্তিনারী মুখ থেকেও নির্বিকার।

মুগ্ধতা
দৃষ্টিতে মুগ্ধতা তোমার
তাই তো আমার
সবকিছু আজ
সুন্দর খুব, নিপাট, নির্ভেজাল।

দু’জনার ফেরা
আমরা দু’জন খেলতে খেলতে
বেলা পড়ে গেলে,
এসেছি ফিরে নিজ নিজ গৃহে
পৃথক শরীর দু’টি নিয়ে।
মন দু’টিকে একটি করে
এসেছি রেখে সাধের বৃন্দাবনে।

অসমান
সমান্তরাল পথেই চলি
সমান নয় তবু।
উচু-নীচু এই চলার পথ
কেমন করে ভুলি!

Print Friendly