মুসলিম রাষ্ট্রে আমরা মুসলমানরাও যে সংখ্যালঘু ভাই

আরিফ আহমেদ

44

এই শিশুটির ধর্ম কি? বাবা-মা তাকে যেটা জানাবেন সেটাই… তাহলে আগাম কি কেউ বলতে পারেন শিশুটি সংখ্যালঘু না সংখ্যাগরিষ্ট?

সংখ্যালঘু, সংখ্যালঘু আর সংখ্যালঘু। সেই কিশোরবেলা থেকে এই একটি শব্দের বুনিয়াদী আক্রমণে অতিষ্ট আমি। বুনিয়াদী, কারণ, কিশোরবেলা নানাভাই শতীস চন্দ্র দাস তার মেয়ে বিভা, বীণা ও রীনা খালা (মাসি) আমাকে কোলে নিয়ে ঘুরতেন, আদর করে চুমু খেতেন আবার নিজেদের কথায় কথায় সংখ্যালঘু বলে গালি দিতেন। ছোট্টবয়সে এটাকে আমি গালি-ই ভাবতাম। যে ভাবনায় আজো কোনো পার্থক্য নেই।

আমার ঐ মাসি বা খালারা স্কুলে যেতেন গ্রাম থেকে প্রায় ৫ মাইল দূরত্বের ডি.কে.বি নামের একটি উচ্চ বিদ্যালয়ে। মামাত ভাই ও মামারাও ওখানেই পড়তেন। গ্রামের পটভূমিতে বেশিরভাগ মেয়েরাই বোরখা বা পর্দা ব্যবহার করতেন। মাসিরা করতেন না কিন্তু তাদের চলাফেরায় ছিল বেজায় সতর্কতা ও নমনীয়তা। তবুও দেখতাম আমার মামাত ভাই এর সহপাঠী বন্ধুরা মাসিদের বিরক্ত করার চেষ্টা করতো। তারা যে শুধু মাসিদের বিরক্ত করত তা কিন্তু না, তারা বোরখা ব্যবহার করেনা, এমন সব মেয়েদের সাথেই দুষ্টামী করার চেষ্টা করত, তবে সেটা কখনোই শ্লীলতাহানী জাতীয় দুষ্টামী নয়।

ছোটবেলা থেকে আমার বড় হওয়ার পরিবেশ ওদের থেকে আলাদা। আমি যেখানে বড় হয়েছি সেখানে মুসলমান মানেই- প্রতিবেশীর প্রতি সবসময় সত্য-সুন্দর ও নিরাপদ ব্যবহারের শিক্ষা দেয়া হয়। সে প্রতিবেশী হিন্দু, বৌদ্ধ বা খ্রিস্টান যে ধর্মেরই হোন। সেখানে ইসলামের শিক্ষার মূলনীতি-ই ‘মানবধর্ম’ সবার আগে। তাই বিভা-বীনা মাসিদের কাছে আমি খুব আপনজন। তাদের মা’ আমার নানু বা দিদা। এই দিদার কোলে মাথা রেখে বাতাসা খেতে খেতে কত যে মহাভারতের শ্লোক শুনেছি? তারপর হঠাৎই কোথাও একটি ‘ধরাম’ শব্দে লাফিয়ে উঠেছি। জেনেছি কেউ আঢ়াল থেকে ঢিল মেরেছে । এতে ক্ষিপ্ত দিদা মিুখ ভার করে বলেছেন, থাকবোনারে এ দেশে চলে যাব। এ দেশে আমরা সংখ্যালঘু।

না শতীস নানা বা তার পরিবারের কারোরই যাওয়া হয়নি এ দেশ ছেড়ে। তার আগেই ঐ হিন্দু নানা-নানী দু’জনই চলে গেছেন পৃথিবী ছেড়ে। তার সন্তানরা আজো আছেন বরিশালের বাকেরগঞ্জে দুধল মাদ্রাসা এলাকায়, মরহুম হযরত মাওলানা হাতেম আলী পীর সাহেবের বাড়ির পাশের বাড়িতেই। আর আমার স্মৃতিজুড়ে আজো আছে মাসিদের রিনঝিন নূপুরের শব্দ আর হাসির ধ্বনি।

আজ এতোটাবছর পরে এ যৌবকোল্লায় বসে(যুবক বয়স পার হবার পথে)চলমান আওয়ামী লীগ ও বিএনপির রাজনৈতিক দ্বন্দকে কেন্দ্র করে আবারো যখন সংখ্যালঘু নামের গালি সকলের মুখে মুখে বাজঁছে। তখন আর চুপ থাকা যায় না? রামুতে বৌদ্ধ মন্দিরে হামলা, ভাংচুর, পাবনার সাঁথিয়ায় হিন্দুগ্রামে আগুন, ভোলায়, পিরোজপুরে মন্দির ভাংচুর সংবাদ হয়, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর হামলা হচ্ছে- দায়হীন পত্রিকার শিরোনাম। চারিদিকে নিন্দার ঝড়। অমুসলিম বন্ধুদের অভিযোগ চলছে – তুই বুঝবিনা, আমরা কত ভাবে নাজেহাল হচ্ছি। সংখ্যালঘু হলে বুঝতি। ভারত বা আমেরিকায় তোরা সংখ্যালঘু, কিন্তু ওখানে কেউ ধর্ম নিয়ে মাথা ঘামায় না, যেটা এ দেশে ঘাটাচ্ছে।

ভারত আমেরিকার কথা জানিনা। যাইনি কখনো তাই জানার ইচ্ছেও নেই। কিন্তু এই যে এই দেমেই হাজারো মুসলমানের গাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভেংগে জ্বালিয়ে দেয়া হচ্ছে, গত তিনদিনের হরতালে ২০ জন আর অনির্দিষ্ট এই অবরোধে ১৮ জনের জীবননাশ হল। এটা কি সংখ্যাগরিষ্ঠতার উপর হামলা বলবেন না মুসলমানের উপর হামলা বলবেন? এই যে শাহবাগে বাসে আগুন দিল, আঠারো যাত্রী অগ্নিদগ্ধ হলেন, এটাকে কি বলবেন?

কোথাও পানি সংকট, বিদ্যুত সংকট, রাস্তা বা কালভাট ভাঙ্গা। সেটা অমুসলিম এলাকা হলেই বলছেন আমরা সংখ্যালঘু তাই! দুইবন্ধুতে কথাকাটাকাটি ও মারামারি সেটাও সংখ্যালঘু তাই। মাইক বাজিয়ে ওয়াজমাহফিল হচ্ছে, ওমনি বলছেন, আমরাতো এবাভে মাইক বাজিয়ে আমাদের ধর্মপালন করতে পারছিনা।আমাদের বাড়ির পাশে এভাবে মাইক বাজে, ডিস্টার্ব হয়, কিছু বলতেও পারি না, আমরা সংখ্যালঘু তাই। এটা অবশ্য চরম সত্য একটা অভিযোগ। যার প্রতিকারে আইন থাকলেও সরকারের দুর্নীতির কারনে আইনের প্রয়োগ নেই। তবুও বলবো, বিনযের সাথে মাইকটা ঘুরিয়ে দিতে বলুন। কারণ মুসলমান যে, সে কখনো অপরের ক্ষতি হয়, এমন কাজ করবে না।

আর আপনার ধর্মের চর্চায় বলবো, কসম সৃষ্টিকর্তার। আপনারা মাইক বাজান, আপনাদের ধর্ম নিয়ে চর্চা করুন কিন্তু আমাদের মতো কোনো বাদ্যযন্ত্র বা কোনো মিউজিক ছাড়া। দেখুন আপনাদের কেউ বাধাঁ দেয় কিনা। আপনাদের দুর্গা উৎসবে যদি আমাদের অংশগ্রহণ না থাকতো তাহলে ঐ উৎসব কতটা উৎসব হতো ভাবুন। উচ্ছৃংখলতা- কখনো কোনো উৎসব হতে পারে না। মদ্যপান সব ধর্মে হারাম। রাতজেগে আপনাদের উৎসব আয়োজনের প্রদান বাধা এই মদ্যপান। যেটা প্রবীণদের লুকিয়ে টিনএজাররা করবেই। সুযোগটা সবার আগে নেবে আপনার-আমার বন্ধু কিছু মুসলমান নামধারীরা।

অমুসলিম ভাই-বন্ধুরা আমার এই লেখনীতে কষ্ট পেলে ক্ষমা করবেন। আপনাদের কষ্ট দিতে নয়, আপনাদের এ কথা পরিস্কার ভাবে বলতে যে, আমরা যে নবীজীর অনুসরণ করি, সেই প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মদ মোস্তফা (সাঃ) যে পথে হেঁটে যেতেন, সেই পথে একজন অমুসলিম বৃদ্ধা কাটা বিষিয়ে রাখতেন। একদিন নবীজী দেখলেন পথে কোনো কাটা নেই। তিনি থমকে দাঁড়ালেন, কেন কাটা নেই। খোঁজ নিয়ে জানলেন এতিম ঐ বৃদ্ধা অসুস্থ হয়ে বিষানায় শুয়ে ছটফট করছেন। নবীজী তার কাছে গেলেন, তার সেবা করলেন ও তাকে সুস্থ করে তুললেন।

এই প্রিয় নবীকে তখন সাহাবারা প্রশ্ন করেছেন, আপনি কেন এটা করলেন?

নবীজী বলেছেন, কসম আল্লাহর, ঐ ব্যক্তি মুসলমান নয়, যার জিহ্বা ও হাত হতে তার প্রতিবেশী (সে যে ধর্মেরই হোক) নিরাপদ নয়।

১৬ কোটি মানুষের এই বাংলাদেশে আপনাদের বাদ দিয়ে তো ১৬ কোটি মানুষ হবেনা। যেখানে প্রতি মাসে গড়ে ৪০জন মুসলমান – মুসলমান নামধারী রাজনীতির নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, সেখানে গড়ে ৪জন অমুসলিমও ঐ নামধারী মুসলমানদের দ্বারাই নির্যাতনের শিকার হবে এটাই স্বাভাবিক। এটা সংখ্যালঘুত্বের জন্য না। এটা পেশীশক্তির মহড়া। এখানে ধর্ম বিষয় না, এখানে মূর্খতা আর ক্ষমতাই প্রধান বিষয়।

বুকে হাত দিয়ে বলুনতো আপনারা যে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রীস্টান ঐক্য পরিষদ করেছেন। এতে কি আদৌ কোনো লাভ হয়েছে? আজপর্যন্ত কি কোনো বোমা হামলা, মন্দির-গীর্জা ভাঙ্গার বিচার সাধিত হয়েছে? অমুসলিম সম্প্রদায়ের উপর হামলাকারীরা কি কখোনো গ্রেফতার ও বিচারের মুখোমুখি হয়েছে? কেন হয়নি? আপনারা সংখ্যালঘু বলে? তাহলে ঐ যে রমনা, উদীচীর বোমা হামলার বিচার কেন হলনা বলুনতো?

যদি সততা থাকে আর সত্যিকারের দেশপ্রেম থাকে, তাহলে ভেবে দেখুন এ দেশে দূর্বল মানুষ মাত্রই সংখ্যালঘু। আপনার জমি যেমন বেদখল হয়, তেমনি আমার জমিও বেদখল হয়েছে। আমার জাত-ভাইয়েরা আমাকেও ছাড় দেয় নাই। তাহলে আপাদের ঐক্য পরিষদ থেকে আমি কেন বাদ পরলাম? কেন ওটা হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রীস্টান ও মুসলমান ঐক্য পরিষদ হলো না? মুসলমান রাষ্ট্রে বাস করে আমরা দুর্বল মুসলমানরাও যে সংখ্যালঘু ভাই। সৎ ও ভদ্রলোক মানেই দুর্বল। আর ভদ্রলোক ছাড়া এ দেশে কেউ সংখ্যালঘু নেই। দয়া করে এ কথাটা বিশ্বাস করুন।

 

 

Print Friendly

About the author

ডিসেম্বর ৭১! কৃত্তনখোলার জলে সাঁতার কেটে বেড়ে ওঠা জীবন। ইছামতির তীরঘেষা ভালবাসা ছুঁয়ে যায় গঙ্গার আহ্বানে। সেই টানে কলকাতার বিরাটিতে তিনটি বছর। এদিকে পিতা প্রয়াত আলাউদ্দিন আহমেদ-এর উৎকণ্ঠা আর মা জিন্নাত আরা বেগম-এর চোখের জল, গঙ্গার সম্মোহনী কাটিয়ে তাই ফিরে আসা ঘরে। কিন্তু কৈশরী প্রেম আবার তাড়া করে, তের বছর বয়সে তের বার হারিয়ে যাওয়ার রেকর্ডে যেন বিদ্রোহী কবি নজরুলের অনুসরণ। জীবনানন্দ আর সুকান্তে প্রভাবিত যৌবন আটকে যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙ্গিনায় পদার্পন মাত্রই। এখানে আধুনিক হবার চেষ্টায় বড় তারাতারি বদলে যায় জীবন। প্রতিবাদে দেবী আর নিগার নামের দুটি কাব্য সংকলন প্রশ্ন তোলে বিবেকবানের মনে। তার কবিতায়, উচ্চারণ শুদ্ধতা আর কবিত্বের আধুনিকায়নের দাবী তুলে তুলে নেন দীক্ষার ভার প্রয়াত নরেণ বিশ্বাস স্যার। স্যারের পরামর্শে প্রথম আলাপ কবি আসাদ চৌধুরী, মুহাম্মদ নুরুল হুদা এবং তৎকালিন ভাষাতত্ব বিভাগের চেয়ারম্যান ড. রাজীব হুমায়ুন ডেকে পাঠান তাকে। অভিনেতা রাজনীতিবিদ আসাদুজ্জামান নূর, সাংকৃতজন আলী যাকের আর সারা যাকের-এর উৎসাহ উদ্দিপনায় শুরু হয় নতুন পথ চলা। ঢাকা সুবচন, থিয়েটার ইউনিট হয়ে মাযহারুল হক পিন্টুর সাথে নাট্যাভিনয় ইউনিভার্সেল থিয়েটারে। শংকর শাওজাল হাত ধরে শিখান মঞ্চনাটবের রিপোটিংটা। তারই সূত্র ধরে তৈরি হয় দৈনিক ভোরের কাগজের প্রথম মঞ্চপাতা। একইসমেয় দর্শন চাষা সরদার ফজলুল করিম- হাত ধরে নিযে চলেন জীবনদত্তের পাঠশালায়। বলেন- মানুষ হও দাদু ভাই, প্রকৃত মানুষ। সরদার ফজলুল করিমের এ উক্তি ছুঁয়ে যায় হৃদয়। সত্যিকারের মানুষ হবার চেষ্টায় তাই জাতীয় দৈনিক রুপালী, বাংলার বাণী, জনকণ্ঠ, ইত্তেফাক, মুক্তকণ্ঠের প্রদায়ক হয়ে এবং অবশেষে ভোরেরকাগজের প্রতিনিধি নিযুক্ত হয়ে ঘুরে বেড়ান ৬৫টি জেলায়। ছুটে বেড়ান গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। ২০০২ সালে প্রথম চ্যানেল আই-্র সংবাদ বিভাগে স্থির হন বটে, তবে অস্থির চিত্ত এরপর ঘনবদল বেঙ্গল ফাউন্ডেশন, আমাদের সময়, মানবজমিন ও দৈনিক যায়যায়দিন হয়ে এখন আবার বেকার। প্রথম আলো ও চ্যানেল আই আর অভিনেত্রী, নির্দেশক সারা যাকের এর প্রশ্রয়ে ও স্নেহ ছায়ায় আজও বিচরণ তার। একইসাথে চলছে সাহিত্য বাজার নামের পত্রিকা সম্পাদনার কাজ।