মাইররে উপর ওষুধ নাই : ইথিজা অবেরয়

সাহিত্য বাজার

বন্দুকের নলই সকল ক্ষমতার উৎস-একথা বলে মাও সে তুঙ বিখ্যাত হয়ে আছেন। মাও আসলে বন্দুকের নল বলতে শক্তি বা ডাণ্ডাকে বুঝিয়েছেন। আমাদের পরিবারগুলো একসময় টিকে ছিল এই শক্তি বা ডাণ্ডা ব্যবহারের উপর। শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে দমন করা অত্যন্ত প্রাচীন এবং অত্যন্ত কার্যকর একটি নীতি। ‘মাইরের ওপর কোন ওষুধ নাই’-এটা আমাদের সমাজে একটি সর্বজনস্বীকৃত উক্তি। আমাদের দেশের শাসকচক্র এই সত্যটা ভালভাবেই বুঝেছে। তাইতো প্রতিপক্ষ দমনে সব চরিত্রের শাসকই এই মাইর-এর চর্চা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে চালিয়েছে এবং এখনও চালিয়ে যাচ্ছে।
ডাণ্ডা মেরে ঠাণ্ডা করার এ দাওয়াই যুগে যুগে অনেকেই প্রয়োগ করেছে। ক্ষমতার মোহে উন্মত্ত স্বৈরশাসকরা অশিষ্ট-অবাধ্যদের শায়েস্তা করতে, নিরীহদের বশে রাখতে যুগ যুগ ধরে ডাণ্ডার ওপরই ভরসা করেছে।
সমালোচনা, প্রতিবাদ, আন্দোলন, যে কোন ধরনের বিরোধিতা দমন ও প্রতিপক্ষকে ঠাণ্ডা করতে ডাণ্ডার কোন জুড়ি নেই। আইয়ুব, ইয়াহিয়া থেকে শুরু করে জিয়া-এরশাদ পর্যন্ত সবাই ডাণ্ডার ওপর নির্ভরশীল হয়েই ক্ষমতার স্বাদ উপভোগ করেছেন। ডাণ্ডা যে কোন ‘শক্তিমান’ শাসকের জন্যই প্রধানতম অবলম্বন। একমাত্র ভরসা।
‘দুর্বল’ শাসকরা জনগণের মতামতকে উপেক্ষা করতে পারে না। তারা জনমতকে তোয়াজ করে চলে। জনগণের ভয়ে ভীত এসব শাসক ডাণ্ডা মারতেও ভয় পায়। পাছে এসব ডাণ্ডা দ্বিগুণ প্রতিশোধ হয়ে ফিরে আসে- এই আশঙ্কাই সম্ভবত এ শ্রেণীর শাসককে ডাণ্ডাবিমুখ করে তোলে। তাতে অবশ্য তেমন কোন লাভ হয় না। সাধারণ মানুষ তাদের ভীরু-দুর্বল ভেবে পরিত্যাগ করে। পক্ষান্তরে ডাণ্ডাবাজদেরই জনগণ সমীহ এবং সম্মান করে। ডাণ্ডা, লাঠি, লাঠিপেটা, মাইর মোটের ওপর শক্তি প্রয়োগের নীতি আমাদের দেশে বেশ জনপ্রিয়। আমাদের সমাজে এসবের আলাদা গুরুত্ব ও তাৎপর্য আছে। শুধু ‘শক্তিমান’ সরকারের জন্যই এ দাওয়াই নয়, আমাদের সামাজিক ও পারিবারিক জীবনেও এর উপযোগিতা ও কার্যকারিতা দেখা যায়।
আমাদের সমাজে অশিষ্ট, বেয়াদব, ঘাড়ত্যাড়া, উদ্ধতদের বাগে আনতে, ঘাড় সোজা করতে লাঠিপেটা বা মাইর মহৌষধ হিসেবে কাজ করেছে। পারিবারিক জীবনে একেবারে শিশু অবস্থা থেকেই মাইরের চর্চা শুরু হয়। মাইরের ভয়েই শিশুরা বাবা-মায়ের অবাধ্য হয় না। মাইর যদি না থাকত, তাহলে অধিকাংশ শিশুই হয়তো বখে যেত। আমাদের সনাতন রীতির শিক্ষা ব্যবস্থায় স্কুলে শিক্ষকরা বেতিয়ে তথা মাইরের সাহায্যেই গাধা ছাত্রকে মানুষ করার দায়িত্ব পালন করতেন।
কুকুর-বেড়াল থেকে শুরু করে যে কোন অবাধ্যকেই ডাণ্ডা বা মাইরের সাহায্যে উচিত শিক্ষা দেয়ার কাজটি করা হয়। কী পারিবারিক জীবনে, কী সামাজিক জীবনে যে কোন অপরাধের শাস্তি দেয়া হয় ডাণ্ডা বা লাঠিপেটার মাধ্যমে। মাইরের ওপরে সত্যিই কোন ওষুধ নেই। মাইরের চোটে ঠাণ্ডা বা সোজা হয়নি, এমন উদাহরণ বড় বেশি খুঁজে পাওয়া যাবে না। মাইর একাধারে অপরাধী, অশিষ্ট, পাগল, ভূত-সবাইকেই শান্ত বানিয়ে ফেলে। আমাদের সমাজে যতটুকু যা শৃঙ্খলা ও স্থিতিশীলতা তা সম্ভবত ওই লাঠি, ডাণ্ডা বা মাইরেরই অবদান! অপরাধীদের কথাই ধরা যাক। রিমান্ডে না নিলে অর্থাৎ না প্যাঁদালে কারও পেট থেকে কোন তথ্য বের হয় না।
কোন গুরুতর অভিযোগে কাউকে আটক করুন, এরপর বাবা-সোনা বলে, গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করুন, সেই ওই কর্মটি করেছে কি না, নিশ্চিতভাবেই সে তা অস্বীকার করবে। অথচ তাকে আচ্ছা মতো পেঁদিয়ে তারপর জেরা করুন, সে যা করেছে তা তো স্বীকার করবেই; এমনকি যা করেনি, তাও সুবোধ বালকের মতো কবুল করবে। এই ডাণ্ডা অস্ত্র প্রয়োগ করে আমাদের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা কত না অসাধ্য সাধন করছে। উদাহরণ হিসেবে বিএনপির শাসনামলে জজ মিয়া নামে এক যুবককে আটক ও রিমান্ডের ঘটনাটি উল্লেখ করা যায়। পুলিশি ডাণ্ডা জর্জ মিয়া নামে এক অখ্যাত ব্যক্তিকে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনার নায়কে পরিণত করে। মাইরের ঠ্যালায় নাকি ভূতও বাপ বাপ করে পালায়। আর জর্জ মিয়াকে দিয়ে গ্রেনেড হামলার স্বীকারোক্তি আদায় করা তো নস্যি!
আসলে মাইরের একটি আলাদা শক্তি আছে। এর মাধ্যমে অবশ্যম্ভাবী ঘটনাকে যেমন ভেস্তে দেয়া যায়, ঠিক তেমনি অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায়। বর্তমান সরকারও মাইরের যথাযথ প্রয়োগ অব্যাহত রেখেছে। রাজপথে, বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন জনপদে পুলিশ এবং শাসক দলের নেতাকর্মীদের যৌথ হামলার ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। বর্তমান জমানায় ‘গণতন্ত্র’ হচ্ছে লুটপাটতন্ত্র বা আখের গোছানোর তন্ত্র। প্রতিপক্ষকে অস্তিত্বহীন করে যুগের পর যুগ ক্ষমতা ভোগ করার তন্ত্র। এ তন্ত্রে ডাণ্ডা অপরিহার্য। ডাণ্ডা ছাড়া প্রতিপক্ষ দমন করা যায় না; আর প্রতিপক্ষকে ঠাণ্ডা রাখতে না পারলে নিশ্চিন্তে ‘উন্নয়নের’ নামে স্বেচ্ছাচারী রাজনীতি করা যায় না।
শাসকদের ডাণ্ডাতন্ত্র নিয়ে একটাই শুধু ভয়, বিজ্ঞানী নিউটন সাহেবের পদার্থ বিজ্ঞানের সেই যুগান্তকারী সূত্র : ‘প্রত্যেক ক্রিয়ারই সমান এবং বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে।’ এ সূত্রের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য নিয়েই যতটুকু যা শঙ্কা। বর্তমানের ডাণ্ডা বা মাইর যদি ভবিষ্যতে কখনও দ্বিগুণ হয়ে ফিরে আসে তখন তা কীভাবে মোকাবিলা করা যাবে? তখন কী হবে?

Print Friendly