মহাকবির জন্মোৎসব : মধুসূদন পদক পেলেন কবি খসরু পারভেজ

নিজস্ব প্রতিবেদক, সাহিত্য বাজার

28299_kobi-madhusudandutta“দাঁড়াও পথিক-বর জন্ম যদি তব
বঙ্গে! তিষ্ঠ ক্ষণকাল ! এ সমাধি স্থলে
(জননীর কোলে শিশু লভয়ে যে মতি

বিরাম) মহীর পদে মহাদ্রিবৃত
দত্ত কুলোদ্ভব কবি শ্রী মধুসূদন।
যশোর সাগরদাঁড়ী কপোতাক্ষ-তীরে
জন্মভূমি জন্মদাতা দত্ত মহামতি
রাজ নারায়ন নামে জননী জাহ্নবী”।

যশোর জেলার সাগরদাঁড়িতে কবি মধুসূদনের সমাধীতে লেখা আছে এ চরণ কটি। চলতি বছর ২৫ জানুয়ারী থেকে সাগরদাড়িতে শুরু হয়েছে সপ্তাহব্যাপী মধুমেলা। প্রতি বছরের মতো এবারও মহাকবির পৈত্রিক নিবাসে ৭ দিন ব্যাপি এ মেলার আয়োজন করেছে যশোর জেলা পরিষদ ও সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয়। এ বছর মধুসূদন পদক পাচ্ছেন সাগড়দাড়ি গ্রামের সন্তান কবি খসরু পারভেজ।

sagordari-me-1

কেশবপুরের পথে মধুসূদন ভক্তরা।

দিবসটি উদযাপনে জেলা প্রশাসনের আয়োজনে মধু জন্মবার্ষিকী উদযাপন কমিটি সপ্তাহব্যাপী মধুমেলার আয়োজন করেছে। যশোরের কেশবপুরে কপেতাক্ষ নদতীরে কবির জন্মধন্য সাগরদাঁড়ির আম্রকাননে ২৫ জানুয়ারি শনিবার, বিকেল ৩ টায় মধু জন্মবার্ষিকী ও সপ্তাহব্যাপী মধুমেলার উদ্বোধন করেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী বেগম ইসমাত আরা সাদেক এমপি। ২৬ জানুয়ারি আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর মোহাম্মদ ফায়েক উজ্জামান। আর তা চলবে ৩১ জানুয়ারী পর্যন্ত।
প্রথম দিনের মেলায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কাজী নাবিল আহমেদ এমপি, রণজিৎ কুমার রায় এমপি,  স্বপন ভট্রাচার্য এমপি. যশোর জেলা আ’লীগের সভাপতি আলী রেজা রাজু, সাধারণ সম্পাদক শাহিন চাকলাদার, পুলিশ সুপার জয়দেব ভদ্র, প্রমুখ । সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক মোস্তাফিজুর রহমান।
মেলা উদযাপন কমিটির সদস্য সচিব ও কেশবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবু সায়েদ মোঃ মন্জুর আলম জানান, সাতদিন ব্যাপী মধুমেলায় থাকছে কবির সৃষ্টি ও সাহিত্য কর্মের ওপর দেশী-বিদেশেী কবিসাহিত্যিকদের অংশ গ্রহণে আলোচনা সভা, কবির প্রতিকৃতিতে মাল্যদান, আবৃতি, মধুসংগীত, কৃষি পণ্যের প্রদর্শন ।
প্রতিবছর সাগরদাঁড়ীতে অনুষ্টিত মধুমেলায় ডিজিটাল যাদু, সার্কাস, ভ্যারাইটি শো, জুয়া, অশ্লীল নৃত্য চালিয়ে এক শ্রেণীর মানুষ লক্ষ লক্ষ টাকা কামিয়ে পকেট ভারি করলেও সাগরদাঁড়ীর ‘মধুপল্লী’ নানা সমস্যায় জর্জরিত।

Modhuউনিশ শতকের নব জাগরণের শ্রেষ্ঠ প্রতিভা মাইকেল মধুসূদন দত্ত। মাইকেল মধুসূদন  দত্ত বাংলা কবিতার প্রথম আধুনিক কবি। নব্য বাংলার সাহিত্য পূর্ণরূপে আত্ম প্রকাশ করে তারই হাত ধরে। বিস্ময়কর প্রতিভার অধিকারী মধুসূদনের জীবন চরন ছিল ততোধিক বিস্ময়কর। ধর্মান্তরিত হয়ে খ্রিস্টান হয়েছিলেন, ইংরেজী সাহিত্য রচনা করেছিলেন, সমাধিক খ্যাতি ও যশ অর্জনের জন্য।  অনন্য প্রতিভার অধিকারী ছিলেন তিনি। তার সাহিত্য বোধ ও ইতিহাস বোধের তুলনা হয় না। তিনি ১৮২৪ সালে ২৫ জানুয়ারী যশোর জেলার সাগরদাঁড়ি গ্রামে জন্ম গ্রহন করেন। তার পূর্ব পুরুষের আদি নিবাস  ছিল বালি, হাওড়া, পশ্চিমবঙ্গ। বসতি ছিল গোপালপুর, তালা, সাতক্ষীরাতেও। প্রথম পুরুষের নাম ছিল রামরাম দত্ত। দ্বিতীয় পুরুষ হিসাবে ছিলেন রাম কিশোর দত্ত। তিনি বৈবাহিক সূত্রে সাতক্ষীরার গোপালপুর থেকে আসেন যশোরের সাগরদাঁড়ি গ্রামে। তৎপুত্র মহারাজ রামনিধি দত্ত যিনি ছিলেন মাইকেল মধুসূদনের পিতামহ। মধুসূদনের পিতার ছিলেন মহামতি রাজ নারায়ন দত্ত। মাতা ছিলেন রাড়ুলী কাঠিপাড়া গ্রামের গৌরীচরণ ঘোষের কন্যা জাহ্নবী দেবী। রাজ নারায়ন দত্তের কোন কন্যা সন্তান ছিলো না। তিন পুত্র সন্তান ছিল যথাক্রমে মধুসূদন দত্ত, মহেন্দ্র নারায়ন দত্ত, প্রসন্ন কুমার দত্ত, তারা বয়সেই মারা যায়। মধুসূদন ছিলেন পিতা মাতার বড়    সন্তান। পড়াশুনা করেন প্রথমে কলকাতা হিন্দু কলেজে এবং পরে ১৮৪৮ সাল থেকে পিতার অর্থ সাহায্য বন্ধ হলে ১৯৪৮ সালে কবি মাদ্রাজে গমন করেন। প্রতিষ্ঠা লাভ করেন | মাদ্রাজ যাবার পরেই তিনি ইংরেজ রমণী রেবেকা ম্যাক্টাভিসকে বিবাহ করেন | ১৮৪৯ সালে রচনা করেন ইংরেজী কাব্য The Captive Ladie। |  ১৮৫১ সালে মাতার মৃত্যুর কারণে ঐ সালে পিতার সাথে শেষ সাক্ষাত করেন। ১৮৫৪ সালে মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকুরী গ্রহন করেন। ১৮৫৬ সালে তিনি রেবেকাকে ত্যাগ করে এক ফরাসী মহিলা হেনরিয়েটার সাথে বিবাহ করে কলকাতায় ফিরে আসেন এবং তাঁর রচনার স্বর্ণকালের সূচনা হয় | ১৮৫৮ সালে রচনা করেন শর্মিষ্ঠা নাটক | ১৮৬০ সালে একেই কি বলে সভ্যতা ওবুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ নামক দুটি প্রহসন লেখেন । বছরেই সর্বপ্রথম অমিত্রাক্ষর ছন্দে লেখেন  তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য |  ১৮৬০ সালে দীনবন্ধু মিত্র তাঁর যুগান্তকারী নাটক নীলদর্পণ রচনা করেন | রেভারেণ্ড জেমস লং তা ইংরেজীতে অনুবাদ করিয়ে প্রকাশ করেন | তার জন্য তাঁকে ১০০০ টাকা জরিমানা করা হয় | কালীপ্রসন্ন সিংহ সেই জরিমানার টাকা দিয়ে দেন |  কিন্তু কবিতাটির অনুবাদক ছিলেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত, যা বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়  ১৮৭৭ সালে প্রকাশিত  “রায় বাহাদুর দীনবন্ধু মিত্র বাহাদুরের জীবনী”  প্রবন্ধে লিখে গেছেন | এরপর ১৮৬১ তে রচনা করেন তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ কীর্তি মেঘনাদবধ কাব্য | বিপুলভাবে বন্দিত এবং তীব্রভাবে নিন্দিত এই মহাকাব্য বাংলা কবিতার ইতিহাসে স্মরণীয়তম রচনা | এর পর লেখেন ব্রজাঙ্গনা কাব্য (১৮৬১), বীরাঙ্গনা কাব্য (১৮৬২) যা তাঁর রচনার মধ্যে অন্যতম |   কলকাতায় এসে কাজ করেন পুলিস কোর্টে কেরাণী ও পরে দোভাষী হিসেবে ১৮৬২ সালে নিজ জন্মভূমিতে স্ত্রী পুত্র সহ আগমন। |   সেই  ১৯৬২ সালে বিলেত গমন ব্যারিষ্টারী শিক্ষা গ্রহনের জন্য গ্রেজইন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৮৬৩ সালে তিনি ফ্রান্সে গিয়ে ভার্সাই নগরে সপরিবারে থাকতে শুরু করেন | এই সময় তাঁর তীব্র অর্থাভাব দেখা দেয় এবং ঋণের দায়ে জেলে যাবার উপক্রম হলে, তাঁর লেখা পত্র পেয়েই দয়ার সাগর ইশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মহাশয় দেড় হাজার টাকা পাঠিয়ে এবং পরে আরও টাকা সংগ্রহ করে পাঠিয়ে, কবিকে সেই বিপদ থেকে উদ্ধার করেন | ব্যারিষ্টারী শিক্ষা সমাপ্ত ১৮৬৬ সালের ১৭ ডিসেম্বর। ভার্সাইতে থাকাকালীন ইতালীয় ভাষার সনেট বাংলায় প্রবর্তনের চেষ্টা করেন, যার ফল তাঁরচতুর্দশপদী কবিতাবলী (১৮৬৬) । ১৮৬৭ সাল থেকে আইন ব্যবসা শুরু। ১৮৭০ সালে সুপ্রিম কোর্টে চাকুরী গ্রহন করেন। মালভূম পঞ্চকোট রাজার উপদেষ্টা পদে চাকুরী গ্রহন করেন। ১৮৭৩ সালে ফেব্রুয়ারী মাসে অনাহারে রোগশয্যা চিকিৎসাহীনতায় ভূগে একই  সালের ২৯ শে জুন আলিপুর দাতব্য চিকিৎসালয় (কলিকাতায়) পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চিরনিদ্রায় শায়িত হন যশোর জেলার প্রথম ব্যারিষ্টার মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত।

Print Friendly