বাংলাদেশের লোকসাহিত্য : শেখ সাইফুল্লাহ রুমী

অতিথি লেখক

বাংলাদশেরে লোক সাহত্যি
02বিভিন্ন কারণে ।বিশেষ করে তার মরমি গান গুলো মানুষের হৃদয়ে শক্ত অবস্থান করে নিয়েছে বহুকাল ধরে – লোকে বলে ,বলে রে ঘর বাড়ি ভালানায় আমার / কি ঘর বানাইমু আমি শূন্যের মাঝার- এবং বাউলা কে বানাইলো রে হাছন রাজারে/ বাউলা কে বানাইলো রে / আমি না লইলাম আল্লাজির নাম রে /না করলাম তার কাম ,গানটি দারুণ মর্মস্পর্শি হাছন রাজা যে একজন সাধক কবি ছিলেন এই গানই তার প্রমাণ।হাছন রাজা সম্পর্কে ইতিহাস থেকে যতদুর জানা যায় তিনি ছিলেন পাঞ্জাবের পীওে কামেল সৈয়দ মাহমুদ আলী (রহঃ) এর মুরিদ।সিলেটের সুনামগঞ্জে জন্ম নেয়া আর এক সাধক Ñস্বশিক্ষায় শিক্ষিত শাহ আব্দুল করিমের গান সাধরণ মানুষের লোহিতকণায় শিহরণ যোগায় প্রতিমুহুর্ত। তার অসাধারণ সৃষ্টি বাংলাদেশের লোক-সাহিত্য কে এতোটাই সমৃদ্ধ করেছে যে দেশের সীমানা পার হয়ে তার লেখা গান বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের কাছে সমান জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে । আবহমান বাংলার লোকায়ত জীবনের সমঝদার কবি শাহ আব্দুল করিম ছিলেন একজন সফল মরমি কবি তার প্রমাণ তারই লেখা কালজয়ী গান- মক্কাতে ক্বাবার ঘর /আদি ক্বাবা আদম শহর, এ গানের মধ্যদিয়ে বুঝাযায় কবি সুফিদের মনুষ্যহৃয় কে কতটা অনুভব করতেন।অসাম্প্রদায়িক চেতনায় সমাজ পরিবর্তন ও গণমানুষের মুক্তির জন্য তিনি অসংখ্য গান রচনা করেছেন-আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম /গ্রামের নওজোয়ান হিন্দু মুসলমান /মিলিয়া বাউলা গান আর ঘাটুগান গাইতাম…শাহ আব্দুল করিম নিজ জীবন সংগ্রামে ক্ষত বিক্ষত হলেও গণমানুষের মুক্তির অন্বেষায় কাজ করেছেন জীবনের শেষদিন পর্যন্ত।আমি কুল হারা কলংকিনি/ আমারে কেউ ছুইও না গো সজনী …এবং গাড়ী চলে না /চলে না/চলে না রে সহ প্রায় দুই হাজার গান রচনা করেছেন ।রাষ্ট্রিয় স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন একুশে পদক।একুশ শতকের বাংলাশের লোক- সাহিত্য সংস্কৃতির দিকপাল- সিলেটের মাটিতে জন্ম নেয়া হাছন রাজা ,রাধারমন ও শাহ আব্দুল করিম এই ত্রিরতœ আমাদের অমূল্য সম্পদ।লোক-সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে রংপুরের ভাওয়াইয়া গানও অত্যন্ত প্রশংসনীয়। ভাওয়াইয়া গান রংপুরের আঞ্চলিক ভাষায় সৃষ্টি হওয়ায় উত্তর জনপদের মানুষের কাছে বেশ জনপ্রিয়। ভাওয়াইয়া রংপুরের লোকসঙ্গীতের উজ্জ্বল ও সমৃদ্ধ শাখা। গ্রামীণ জনপদের সহজ সরল মানুষের সুখ-দুঃখ,হাসি-কান্না, প্রেম ভালোবাসা ,বিরহ-বেদনার সংমিশ্রণে লোকের মুখে মুখে রচিত গান বাঁশি এবং দোতরার বাদ্যযন্ত্রযোগ যেগান সৃষ্টি হয় তাকেই সাধরণত আমরা লোক গান বলে থাকি,ভাওয়াইয়াও তার বাইরে আলাদা কোন গান নয়।বিশেষ করে ভাওয়াইয়া গান কে বিশ্ব দরবারে ১৯৫৪ সালে উপস্থাপন করেন ভাওয়াইয়া স¤্রাট আব্বাস উদ্দীন ।ভাওয়াইয়া নামটি আঞ্চলিক নামানুসারে
পাঁচ ধারায় বিভক্ত- ভাব,ভাওয়া,বাওয়া,বাউদিয়া,প্রভৃতি শব্দ থেকে ভাওয়াইয়া শব্দের উৎপত্তি বলে ধারনা করা হয়। ও কি গাড়ীয়াল ভাই /কি ও কাজল ভোমরা / তোরসা নদীর ধারে ধারে /নাইওর ছাড়িয়া যেও মোর বন্ধু/নদী না যাই ওরে বৈদ/ফান্দে পড়িয়া বগা কান্দে রে এছাড়াও আছেমেয়েলি গীত ,বিশেষ করে রংপুরে মানুষের সামাজিক ও পারিবারিক আচার অনুষ্ঠানে মেয়েলি গীত এখনও জনপ্রিয়।রংপুরের ভাওয়াইয়া গান রচনা এবং সংরক্ষণে যারা কাজ করেছেন বা করছেন তাদের মধ্যে হরগোপালরায়,অতুল গুপ্ত,অতুল প্রসাদ সেন , শেখ ফজলুল করিম, খেরাজ আলী,রবীন্দ্রনাথ মৈত্র,তুলসী লাহিড়ী, নুরুল ইসলাম কাব্যবিনোদ, সৈয়দ শামসুল হক,আশুতোষ দত্ত,সূফী মোতাহার হোসেন,মহফিল হক,মঞ্জু সরকার, সৈকত আসগার ও সাঈদ সাহেদুল ইসলাম অন্যতম ।লোক-সাহিত্য সংস্কৃতি সমৃদ্ধতায় বরিশাল অঞ্চলেরও রয়েছে অসামান্য অবদান-সারি গান ,জারি গান,ভাটিয়ালি গান,যাত্রা,সয়লা,গাজনের গীত ও রয়ানী ।সারি গান বলতে সাধারণত নৌকাবাইচের সময় মাঝিরা দাঁড়ের ছন্দময় আওয়াজের সাথে তাল রেখে সারিবদ্ধভাবে যে গান গাওয়া হয় তাকেই সারি গান বলে।জারি গান দেশের দক্ষিন অঞ্চলেরজন্য অত্যন্ত জনপ্রিয় গান।মূলত জারি গানের সাথে মুসলিম সম্প্রদয়ের লোকজনের সম্পৃক্ততা বেশি, জারি গানে একজন মূল গায়ক এবং তার কয়েকজন সহযোগী কর্তৃক এই গান পরিবেশিত হয়ে থাকে।ভাটিয়ালি গানও বরিশাল সহ দক্ষিন অঞ্চলের মানুষের কাছে জারি গানের মতো সমান জনপ্রিয়।ভাটিয়ালি গানকে ভাটি অঞ্চলের গান হিসেবেই ধরা হয়, এই গান বরিশাল সহ দক্ষিন অঞ্চলে ব্যপক পরিচিতি রয়েছে।নিঃসঙ্গ নির্জন নদী পথে নৌকার মাঝির একাকীত্ব দূরীকরণেরগান ভাটিয়ালি এবং যাত্রাপালা বরিশালের লোকসংস্কৃতিকে প্রতিনিধিত্ব করে আসছে বহুকাল থেকে।বরিশালের পুঁথি আমাদের দেশিয় লোক সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে, বিশেষ করে – গুনাই বিবি,রসুলের মেরাজ গমন,ইউসুফ জোলেখা পুঁথিসমূহ এ অঞ্চলের অন্যতম পুঁথি হিসেবে পরিচিত। আমাদের দেশের জন্মেরও কয়েক শত বছর অতীত থেকে ময়মনসিংহ অঞ্চলে লোক সাহিত্য ও সংস্কৃতির চর্চা হয়ে আসছে। বাংলাদেশের লোকজ সাহিত্য সংস্কৃতিতে বৃহত্তর ময়মনসিংহের রয়েছে ঐতিহাসিক ভূমিকা বিশেষ করে পালা গান বেশ জনপ্রিয় বৃহত্তর ময়মনসিংহের মানুষের কাছে।ময়মনসিংহের বাউল গান ,কবিগান ,পুঁথিও পালাগানযারা রচনাকরে সমৃদ্ধ করেছে আমাদের দেশের লোক সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে তাদের মধ্যে-নয়ন চাঁদ,বরকত সরকার,মনসুর বয়াতী,দ্বিজ কানাই,শ্যামল চাঁদ গুপ্ত,হারধন বাগচী,রাজা রাজসিংহ ,রশিদ উদ্দিন ,জালাল উদ্দিন খাঁ,অন্যতম । ময়মনসিংহের গান নিয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক দীনেশ চন্দ্র সেন স্থানীয় সংগ্রাহকদের
সহায়তায় প্রচলিত পালাগানগুলো সংগ্রহ ও সম্পাদনা করে মৈমনসিংহ গীতিকা (১৯২৩) নামে গ্রন্থাকারে প্রকাশ করেছেন।গ্রন্থটি বর্তমানে সব মানুষের মন জয় করেছে। মৈমনসিংহ গীতিকায় মোট ১০টি গীতিকা স্থান পেয়েছে- মহুয়া,মলুয়া,চন্দ্রাবতী,কমলা, দেওয়ান ভাবনা,দস্যু কেনারামের পালা,রূপবতী,কঙ্ক ও লীলা,কাজল রেখা ও দেওয়ানে মদিনা। মৈমনসিংহের গীতিকা প্রকাশিত ও সমাদৃত হওয়ার পরে দীনেশচন্দ্র সেন নোয়াখালি,চট্টগ্রাম প্রভৃতি অঞ্চল থেকে আরো গীতিকা সংগ্রহ ওসম্পাদনা করে পূর্ববঙ্গ গীতিকা (১৯২৬) নামে মোট তিন খ-ে প্রকাশ করেন।এসব গীতিকা আমাদের গ্রাম অঞ্চলের মানুষের কাছে পালা গান নামেই পরিচিত। আমাদের লোক সাহিত্য সংস্কৃতির ভা-ার এতোটাই সমৃদ্ধ যে,অনেক বিদেশি গবেষক আমাদের দেশের লোক সাহিত্য সংস্কৃতির প্রতিনিয়ত প্রসংশা করে অথচ আমরা শিক্ষিত মধ্যবিত্ত সমাজ আমাদের এই অমূল্য সম্পদ কে যথাযথ মূল্যায়ন করতে কার্পণ্য করি! এবং দেশিয় সংস্কৃতির বদলে বিদেশি সংস্কৃতির প্রতি আমাদের আকর্ষণ দিনদিন বেড়েই চলেছে যা অত্যন্ত দুঃখজনক। আমাদের দেশ কে এগিয়ে নিতে এবং আত্মনির্ভরশীল জাতি গঠন করতে দেশিয় লোক- সাহিত্য সংস্কৃতি কে সংরক্ষণ করে আগামী প্রজন্মের কাছে জনপ্রিয় করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করতে হবে।

(সুত্র : সুখময় বন্ধ্যোপাধ্যায় এর ময়মনিসংহ গিতিকা অবলম্বনে..।)

 

Print Friendly