ফাঁকি : অচিন্ত্য কুমার ভৌমিক

সাহিত্য বাজার

Blue-Tiger111-

দৃক গ্যালারীতে অনুষ্ঠিত বাটারফ্লাই অব বাংলাদেশ শীর্ষক প্রদর্শনীর একটি ছবি।

ফাঁকি
অচিন্ত্য কুমার ভৌমিক

আগে ঝুঝতাম না। ছোট ছিলাম। এখন বুঝি।
এখন আমি অনার্স তৃতীয় বর্ষে। বিষয়টি দর্শন। তবে বেশ কিছুদিন ওর সাথে আমার দর্শন হচ্ছে না। বিদেশে গেছে। বড়লোকের ছেলে। মা বলেন- বড়লোকের ছেলেদের কখনো বিশ্বাস করবিনা। ঠকাবে। ফাঁকি দেবে। মায়ের কথা রাখতে ওর সাথে অনেক ছলচাতুরি করেছি। কথা দিয়েও ধরা দেইনি। সাথে গিয়েও কাছে থাকিনি। মন দিয়েও মন রাখিনি। এখন ওতো বিদেশে চাকরি করছে। কবে ফিরবে জানিনা। আমাকে সংসারে নেবে কিনা তাও জানিনা। জীবনে কত রকম যে ফাঁকি থাকে! মেয়েরা এটা আরও ভালো বোঝে। তবু শ্যামা পোকা প্রদীপের শিখায় পাখা পোড়ায়। হয়তো আমারও- না, থাক। দোষ তার একার নয়। আমি খুব ভালো নাটক করি। ভার্সিটিতে সুনাম আছে, ভক্ত আছে। প্রণয় প্রার্থীর সংখ্যাও একেবারে হাতে গোনা নয়। তবু ভার্সিটির ভালোলাগা! বিশ্বাস কি? ফাঁকিতো থাকেই। তাই বুঝে শুনে পা ফেলতে হয়। তবু বেশ বড় গলায় বোহায়া বাঁশীর মত বলতে দ্বিধা নেই- আমি- আমি অন্তরা চক্রবর্তী বাঁধন বোসকে ভালোবাসি।
আমার বাবা চন্দ্রকান্ত চক্রবর্তী আট বছর আগে মাকে বিধবা করেছেন। মামারা বন্দোপাধ্যায়। ব্রাক্ষ্মণ বলে হাউসফুল অহংকার। তারপর আবার কুলীন। সুতরাং কথায় কথায় তার ঢেকুর ওঠে। কিন্তু তাদের পেশা মিষ্টির দোকান। যাকে বলে ময়রা। সে দোকানও এমন কিছু না। কোনমতে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলে। আর, মামাগুলো? একটা অলস, একটা পুলিশ তাড়ানো মাস্তান, আর ছোটটা মিথ্যাবাদী, প্রতারক, চিট। জাতের অহংকারে মা’র জীবনে বড় একটা ছন্দ পতন হয়ে গেছে। অবশ্য এর কারণও আছে।
আমার বাবা চন্দ্রকান্ত চক্রবর্তীর মত ভালো লোক খুব একটা হয়না। সুশিক্ষিত এবং প্রচুর অর্থ দ্বারা সুরক্ষিত। সংস্কৃতিমনা, উদার, উদ্যোগী এবং সমাজ সচেতন। কেন যে এই ধরনের মানুষরা ব্যবসায়ে আসে? ঠাকুরদাদার চালের ব্যবসার হাল ধরেছিলেন তিনি। সংসারে বড় ছেলে, বড় দায়িত্ব। অনেকগুলো ভাইবোন তার। তাদের দাঁড়  করাতে, বিয়ে দিতে গিয়ে নিজের বিয়ের সময় হয়নি। বাবার আগে মেজ কাকা বিয়ে করেছিলেন। শেষ বয়সে ঠাকুরদা অসুস্থ হয়ে পড়ে যখন বুঝলেন আর সময় নেই তখন বাবার হাত ধরে বসলেন- তুই এবার সংসারি হ চন্দ্র। আমি তোর বউ দেখে মরতে চাই। ঠাকুমাও চোখের জল ফেললেন। সুতরাং বাবার কোন আপত্তি আর টিকলোনা। আমার বাবার বয়স তখন বেয়াল্লিশ। আঠারো বছরের অনিতার সাথে বাবার বিয়ে হয়ে গেল। এখানে একটা কথা। বাবা বিয়ের আগে মাকে দেখেনি। বাসর ঘরেই তাদের প্রথম দেখা। বিয়ের ব্যাপারে যা কিছু করার তা ঠাকুরদা আজ মেজকাকাই করেছিলেন। বাসর ঘরে মাকে দেখে বাবা চমকে উঠেছিলেন – ছি! একি করেছি আমি!
এসব কথা মার কাছ থেকেই শুনেছি। আমার মা অনন্যা কিন্তু খুবই খোলামেলা। সারাক্ষণ হাসি-খুশি। কথা বলতে বলতে সামান্যতেই হাসে। গায়ের রঙ খুব ফর্সা না হলেও তার মুখে কারুকার্য আছে। যেজন্যে চোখ নাচালে তাকে খুব ভালো লাগে, আকর্ষণ জাগে। এই বিধবা বয়সেও সেজেগুজে বেড়ায়, দারুণ মিষ্টি হেসে কথা বলে, কথা বললে কোঁকড়া চুলে কাঁপে, চোখে ফাগুন হাসে। কিন্তু মার ভিতরটা? সে খুব কষ্টের, কান্নার। কাউকে কষ্ট দিয়ে কেউ কোনদিন সুখী হতে পারেনা। বাঁধনও কি তাই করবে ?
মার সব কথা খুলে না বললে তার ফাঁকিটা বোঝানো যাবেনা। এখন আমরা তিন ভাই বোন। আমি, আনন্দ আর সুনন্দ। আনন্দ ভার্সিটিতে পড়ে – প্রথম বর্ষে। সুনন্দ স্কুলে। মার ছোট ছেলে। কোলের আদর। বাবার বিয়ের পরেই ঠাকুরদা গেলেন, কিছুদিন পরে ঠাকুমাও। আমি তাদের দেখিনি এবং বাবার মৃত্যুর পর মেজকাকা জাল দলিল করে মাকে স্বামীর বাড়ি থেকে উৎখাতের চেষ্টা করেছিলেন। পারেনি। শুধু একজনের জন্যে। মেজকাকার ফাঁকির এই ব্যাপারটা জানাজানি হবার পর মা কোনদিন মেজকাকাকে ক্ষমা করেনি, তবে বাইরে তাদের সম্পর্ক যেন স্বাভাবিক। বালুচরের গভীরে যেমন ফল্গুধারা। মার ঘৃণাটা এইরকম।
যে উদ্দেশ্যে কুলীন বামন ঘরের যুবতী কন্যা অনন্যাকে পয়সায়ালা বড়লোক ব্যবসায়ীর হাতে তুলে দেয়া হয়েছিল সেটা বাবার বিয়ের পরেই বোঝা গেল। বেয়াল্লিশ বছরের বাবা আঠারো বছরের স্ত্রীর পিতামাতার স্বরূপটি তখন সঠিক বুঝতে পারলেন। বিয়ের মন্ত্রে ফাঁকি ছিল কিনা জানিনা, তবে বিয়ের উদ্দেশ্যে বিপুল ঘাঁপলা ছিল। শুধু মেয়ের সুখ নয়, মেয়ের স্বামীর পয়সার সুখে আমরাও যেন সুখে থাকি। টাকা। আমার দিদিমা টাকার জন্যে প্রায়ই জামাই বাড়ি আসতেন। মার সাথে গোপনে কথা। আলমারির চাবি থাকতো মার কাছে। বাবা হিসাব মেলাতে হিমসিম খেতেন। মা অবশ্য সত্যিকথা বলতেন – বাবার দোকান ভালো যাচ্ছে না। মাকে দিয়েছি। পরে দিয়ে যাবে। চন্দ্রবাবু বুঝতেন – পরে মানে একেবারে পরলোকে। দোকান, মেয়ের বিয়ে, ছেলের বিয়ে, পূজার খরচ ইত্যাদি অজুহাতের অন্ত নেই। আমার দাদামশায় এবং দিদিমার কন্যা সন্তান জন্মদান সার্থক হয়েছিল, লক্ষীর বরপূত্র জামাতা চন্দ্রকান্ড নিজের ঘরের লক্ষীকে ঠেলতে ঠেলতে নির্বাসন দিলেন শ্বশুরালয়ে। একেই বলে কন্যাভাগ্য ! মা আমার বাবার লক্ষ্মী হয়ে এসে লক্ষ্মী প্রতিষ্ঠা করলেন তার পিত্রালয়ে।
লক্ষ্মী চঞ্চলা, সুখ সবার সহ্য হয়না। আমার জননীর জীবনেও প্রায় তাই দেখেছি। বাবার বিয়ের কিছুদিন পর ব্যবসা সংক্রান্ত জটিলতায় বাবা এবং কাকাদের সংসার আলাদা হয়ে গেল। বাবা ব্যবসা তেমন ভালো বুঝতেন না। তার উপর মায়ের অতিরিক্ত অপচয়। লক্ষ্মী দাঁড়াবে কি করে? ধীরে ধীরে ধ্বস নেমে এলো। দুশ্চিন্তায় বাবা অসুস্থ হয়ে পড়লেন। আমি তখন ছোট। ভিতরে ভিতরে এই ক্ষয় বুঝতাম না। মায়ের সাধের গহনাগুলো স্যাকরার দোকানে গেল। সংসার, লেখাপড়া, পারিবারিক ঐতিহ্য এবং মায়ের খামখেয়ালি সামলাতে বাবা বিপর্যস্ত হয়ে পরলেন, অসুখ আরও বাড়লো। প্রেসার। সাথে ডাইবেটিস। অবশেষে যা হবার তাই। কপর্দকশূন্য পিতা সংসার শূন্য করে ফাঁকি দিয়ে চলে গেলেন। আমি তখন সবে কলেজে, আনন্দ স্কুলের শেষ বছরে।
আমার ময়রা ঠাকুর দাদামশায়ও লক্ষ্মীকে ধরে রাখতে পারলেন না। তার অলস বড়ছেলে আনন্দ-বিলাসে বিহ্বল। ছোটছেলে এখানে সেখানে ধার করে। দোকান থেকে সে অর্থ গচ্ছা যা। মেজটা মাস্তান, চাঁদাবাজ। ছিনতাই করা মটর সাইকেলে এলাকায় চক্কর দেয়। নেশা করে। তবুও বড় মাস্তানের বাপ বলে আমার দাদামশায় কৃতার্থ হতেন, দিদিমা অহংকার করতেন। এমনকি আমার মাও নাকি মাস্তান ভাইকে নিয়ে গর্ব করতো। তবে আমার বাবা এর তীব্র প্রতিবাদ করতেন। এ নিয়ে বাবার প্রায়ই মায়ের সাথে বিতর্ক হতো। স্থানীয় একটি খুনের কেসে জড়িয়ে গেল আমার মাস্তান মামা। থানা, পুলিশ, হাজত, কোর্ট। অর্থের শ্রাদ্ধ কাকে বলে ? জমাজমি বেচেও দাদামশায় কুল পেলেননা। অবশেষে মাস্তান মামা পুলিশের ভয়ে দেশ ছেড়েছে। ততদিনে ময়রা ঠাকুরের মিষ্টির দোকানে লালবাতি। সে দোকান ঠেকাতে বাবা – আমার বাবা সর্বশান্ত। মা যে কি! বাবার অভাব- বিপর্যয় কখনো বুঝতে চাইতোনা। তার চাই সোনার হরিণ। ঠিক এই সময়টাতে কার্তিক কাকু বাবার পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। বাবার সাথেতো কার্তিক কাকুর ভালো সম্পর্ক হবার কথা নয়। কার্তিক কাকু নায়ক, বাবা ভিলেন। কিংবা উল্টোটা। একমাত্র আমার মা-ই জানে কে কোনটা। আমি বলবো এরজন্যে দায়ী  আমার মা। আমার গর্ভধারিণী জন্মদাত্রী। নাহলে কার্তিক কর আমাদের সংসারে সবচেয়ে বড় সম্পর্কের সম্মানে অনন্যা নামের মেয়েটির জীবন সঙ্গী হতো। ফাঁকি ছিলো। নিশ্চয়ই কোথায়ও ফাঁকি ছিলো। ফাঁকি এখনো কি নেই?
বাবা জানতেন না। মেজকাকা আর আমাদের চালের দোকানের কর্মচারি কানাই কাকা জানতো। সব জেনে শুনেই তারা আমার মাকে বাবার শয্যাশায়িনী করে এনেছিল। বৃদ্ধস্য তরুণী ভার্যা। এসব কথা মা এখন নিজের মুখেই স্বীকার করে। ‘হ্যাঁ সত্যি! বিয়ের আগে কার্তিকের সাথে আমার সম্পর্ক ছিলো’। ব্যস। এইটুকু। এর বেশী সীমা অতিক্রম করেনা মা। কিন্তু আমিতো সব জেনে গেছি। মামা বাড়ির প্রতিবেশী হারু ঠাকুরের মার কাছ থেকে সব শুনেছি। দেব-দেবতা মানলে কার্তিক কর আমার মার প্রথম স্বামী। কে না জানে ? জানাজানি হতে বাকি ছিলনা। এত কিছুর পরও আমার দাদামশায়রা কার্তিককে মেনে নিলোনা। কি ছিলোনা কার্তিক নামের লোকটির ? উচ্চশিক্ষিত, অতিশিক্ষিত পরিবার, ব্যাংকের বড় অফিসার, সঙ্গীত শিল্পী, উদার মুক্তপ্রাণের মানুষ। আমার অল্পশিক্ষিত মায়ের জন্যে আর কি লাগে? কিন্তু ওই যে অহংকার। কার্তিক কর কায়স্থ। কুলীন ব্রাক্ষ্মণের মেয়ে নিম্নশ্রেণীর কায়স্থর ঘরে যাবে ? কার্তিকরা পীরালী কায়েত, অন্ত্যজ। পীরালী কায়েস্থদের হাতের জল আগে কোন হিন্দুরা গ্রহণ করতোনা, পীরালী ব্রাক্ষণদের ঘরে উচ্চশ্রেণীর বামনরা কন্যা দান করতোনা। এজন্যে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথকে খুলনার ফুলতলার দক্ষিণ ডিহির পীরালী ব্রাক্ষণের ঘর থেকে মেয়ে নিয়ে জোড়াসাঁকোতে বিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আমার মামাবাড়ি দক্ষিণ ডিহির কাছে ভৈরব নদীর ওপারে ভাটপাড়া গ্রামে। কার্তিক বাবুর বাড়ি তারই পাশে অভয়নগরে। দাদামশায় অস্বীকার করলেন কার্তিককে। শেষপর্যন্ত আমার মাও। হয়তো অর্থের লোভে। নাহলে একজন বিবাহিতা মহিলার স্বামী থাকতে অন্য পুরুষের সাথে আবার বিয়ে হলো কি করে? ডির্ভোসতো হয়নি। তাহলে কি বাবার সাথে মায়ের বিয়েটা অবৈধ ?
তখন বুঝতাম না। এখন মনে নানা প্রশ্ন জাগে। প্রশ্ন জাগে নারী-পুরুষের দৈহিক সম্পর্ক নিয়ে। এখনো মাকে আমি মাঝে মাঝে ঠিক বুঝিনা। দিব্যি আমাদের বুকে নিয়ে একা একা সংসার করছে, বাবার স্মৃতি রোমন্থন করছে, যেন কোন শোক নেই, সন্তাপ নেই, সমস্যা নেই। হাসছে, গল্প করছে, বেড়াতে বেরোচ্ছে, সেজেগুজে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিন্তু এসবের অর্থ আসে কোথা থেকে। কাকারাতো কিছু সাহায্য করেনা। তাহলে আমার মা কি- না, সে কথা বিশ্বাস করার আগে আমার মৃত্যু হয়ে যাক ! তাহলে এতো অর্থ আসছে কোথা থেকে ?
একদিন মা বাধ্য হয়ে স্বীকার করলেন- কার্তিক আমাদের পিছনে এসে না দাঁড়ালে সবাই মিলে না খেয়ে মরতে হতো, আমার পরের বাড়ি ঝিগিরি করতে হতো।
কার্তিক কাকুকে আমাদের বাড়িতে বহুদিন দেখেছি। বাবার বিয়ের কয়েক বছর পর, তখন আমি বেশ ছোট। আমিতো ওনাকে বাবার বন্ধু বলেই মনে করতাম। মা ও সেভাবে বলতেন। বাবা বলতেন – কার্তিক বাবু তোর মার বন্ধু। শুনে মা অন্য ঘরে চলে যেতেন। কিন্তু কি আশ্চর্য! তখন কার্তিক কাকুকে মার সাথে কখনো কথা বলতে দেখিনি। বাবাতো শেষপর্যন্ত মার বিয়ের আগের সব ঘটনাই জেনেছিলেন। তার পরেও কার্তিক কাকুকে সাথে করে বাড়ি নিয়ে আসতেন, কখনো আমাকে নিয়ে কার্তিকের বাড়ি যেতেন। কার্তিকের বউ কাকলী আমাকে খুবই আদর করতো। মাকে নিয়েও বাবা দু’তিনদিন ও বাড়ি গেছেন। কার্তিকের বউ মাকে জড়িয়ে ধরে শোবার ঘরে নিয়ে গেছে। হেসে হেসে কতো গল্প। মানুষের চরিত্র কি বিচিত্র ! মা, বাবা, কার্তিক কাকু, কাকলী কাকিমা -সব যেন কেমন রূপকথার মতন মনে হয়। সোনার কাঠি রূপোর কাঠির অদল বদল। এ রূপ কথায় রাক্ষস নেই, রাক্ষসী আছে। সে রক্ত খায়না, হৃদয় বিক্ষত করে। দুটো সুস্থ সুন্দর রাজপুত্রের কলজে সে চিবিয়ে খেয়েছে। কার্তিক করের এবং আমার জন্মদাতার। হয়তো এটাই তার স্বভাব। পুরুষদের আকর্ষণ করে কষ্ট দেবার মারাত্মক মজার খেলার অভ্যাস তার। মেয়েরা নরম, দুর্বল, দুর্বাদল সমতুল্য। সেসব মেয়েরা এ খেলা খেলতে পারেনা। আমার মায়ের পুরুষ মানুষকে কষ্ট দেবার বড্ড লালসা !

রাক্ষসীদের কি হৃদয় থাকে না ? কোন অনুভূতি থাকে না ? দেখা হয়নি। জানিনা। তবে আমার মাকে দেখেছি। বিবেক নেই, অনুভূতি নেই। কার্তিক কাকুর সুখ-দু:খে কখনো তাকে বিচলিত হতে দেখিনি। লোকটি অসুস্থ হয়ে পড়ে থাকলেও মা তার কোন খোঁজ নেয়না। অথচ এখনো মার শরীর সামান্য এদিক ওদিক হলেই কার্তিক কাকু বারবার খবর নেয়, দেখতে আসে। ডাক্তার আসে, দামী দামী ওষুধ আসে। তাছাড়া আমাদের তো ওষুধের দোকান ঠিক করাই আছে। বাড়ির কারও সামান্য কিছু হলে মুড়ি-মুড়কির মত দামী দামী ওষুধ আসে। পয়সাতো দিতে হয়না, কার্তিক কাকুর পকেট থেকে যায়। শুধু কি তাই ? মার, আত্মীয়-স্বজনরাও ওই ধরনের। বেহায়া, বিবেকহীন। বাবা নেই, আয় করবার কেউ নেই জেনেও তারা দিনের পর দিন আমাদের ঘাড়ে এসে পড়ে থাকে। নড়েনা। দিব্যি হাল-হকিকত। মা তাদের তেমন কিছু বলেনা। কার্তিক কাকু আমাদের পুরো সংসারটা চালাচ্ছে। মাসে মাসে হিসেব করে টাকা দিচ্ছে। আর মা তার নিজের আত্মীয়দের নিয়ে সংসারে উৎসবে উন্মত্ত। দুটো সংসার চালাতে কার্তিক কাকুর খুবই কষ্ট হয়। তার বয়স বাড়ছে, চাকরি প্রায় শেষ। মার বিবেকহীন ব্যবহার সামলাতে তার খুবই কষ্ট হয়, অফিস থেকে ফিরে অতিরিক্ত আয়ের জন্যে গানের টিউশনি করে। তা নাহলে তিনি যা বেতন পান তাতে কাকলী কাকিকে নিয়ে দিব্যি রাজার হালে চলতে পারেন। আমার সামনেই কার্তিক বাবু মাকে বারবার অনুরোধ করেন – বয়স বাড়ছে, শরীরে কুলাচ্ছেনা। আর পারছিনা। খুবই কষ্ট হচ্ছে। তোমার সংসারের খরচ কমাও। তোমার আত্মীয়দের কি কোন বিবেক নেই ? দিনের পর দিন পড়ে আছে। তুমি ওদের টানবে কেন ? আমার কষ্টকি বোঝ না ? মনে হচ্ছে তোমারও বিবেক নেই।
শুনে মা হাসে। শোষকদের মত মিষ্টি হাসে। ‘কি করবো? বলছিতো। ওরা যায় না। তাড়িয়ে দিতে তো পারিনা। দেখি কি করা যায়’।
ব্যস ! ওই পর্যন্ত। আমার যে দিদিমা কার্তিক করকে সেদিন জামাই বলে মেনে নিতে প্রবল আপত্তি করেছিলেন তিনি এখন মার ঘাড়ে চেপে দিব্যি কার্তিক কাকুর আয় ভক্ষণ করছেন। আমার ছোটমামা যিনি জীবনে কখনো সত্য কথা বলেছেন কি না সন্দেহ। তিনিও মার ঘাড়ে চেপে জমিদার, মা তাকে টেনে রেখেছেন। আমার এক মাসির ছেলে মার গর্দানে পদযুগল রেখে স্কুলে পড়াশোনা করছে। এতো সব দরকার কি ? অথচ মা তা বোঝেনা। আমাদের পুরো সংসার, মার সাজসজ্জার এটা-ওটা দাবী, ওষুধ, পারিবারিক অনুষ্ঠান, আমাদের লেখাপড়া, তারপর জরুরি প্রয়োজনে এটা-ওটা-সবই এখন কার্তিক কাকুর পরে। অথচ তিনি আমাদের পরিবারের কেউ নয়, পরিবারের কোন ব্যাপারে তাকে ডাকাও হয়না। তিনি নিতান্ত বাইরের। আমাদের পরিবারের কর্তা ব্যক্তি আমার মেজকাকা, মামারা, দিদিমা যারা সংসারে মাকে সামান্য সাহায্য করেনা।
আমার নিজেরও মনে হয় মার বিবেক বলে কিছু নেই। কার্তিক কাকুর দায়িত্ব শুধু দেবার, প্রতিদানে পাবার কিছু নেই। সে তা চায়ও না। কখনো তাকে মায়ের সাথে তেমন ঘনিষ্ঠ দেখিনি। কেউ দেখেনি। তবু মেজকাকা লোকটিকে সহ্য করতে পারেনা। নোংরা কথা বলে। কার্তিক কাকুর তাতে কিছু এসে যায় না। তিনি তেমন আসেন না। দূর থেকে নৌকার গুন টেনে চলেছেন। আমি বুঝতে পারি মাকে তিনি আজও অন্তর দিয়ে ভালোবাসেন। সত্যিকার ভালোবাসা। আর সেই সুযোগ মা এবং তার আত্মীয়রা মার মাধ্যমে কার্তিক কাকুকে রীতিমত শোষণ করছে। অপরদিকে কাকলী কাকিমার অবদান স্মরণীয়, চিরস্মরণীয়। প্রণাম করতে হয় সেই মহিলাকে। সব জেনেশুনেও তিনি কখনো কার্তিক কাকুকে নিষেধ করেননি, আপত্তি তোলেননি। বরঞ্চ তিনি বলেছেন-আমারতো ছেলে মেয়ে নেই, অন্যর ছেলেমেয়েগুলো যদি খেয়ে পরে লেখাপড়া শিখে মানুষ হয় তাতে বাধা দেব কেন ? আমার স্বামীর ভালোবাসাকে আমি অসম্মান করিনা।
দেবী কাকে বলে ? কাকলী কাকির তুলনায় আমার মা অত্যন্ত স্বার্থপর। যতোটা পারা যায় আদায় করে নেয়া যাক। আমার বাবাকেও আমার মাতৃদেবী শোষণ করতে ছাড়েননি। দশ হাজার টাকা নিয়ে শাড়ি কিনতে গিয়ে আরও তিন হাজার বাকি রেখে এসেছেন। অপচয়ে সামান্য ক্রটি রাখেননি তিনি। অতি সাধারণ নিম্নবিত্ত ঘরের কন্যা বড়লোকের ঘরে পরে তখন বিলাস ব্যসনের তুফান তুলে দিয়েছেন। মামাবাড়ির আত্মীয়দের জন্যে মা অর্থের ফোয়ারা ছুটিয়েছেন। বাবাকে কশাইদের মতন কর্তন করেছেন। অপচয়ে লক্ষ্মী টেকেনা, বেসামাল দ্রুতগামী ঘোড়া গর্তে পড়বেই। অর্থ হারিয়ে বাবা গর্তে পড়ে গেলেন। অত্যন্ত মনের কষ্ট ছিল তার। মৃত্যুর আগে সব বলে যেতে পারেননি। শুধু কার্তিক কাকুকে কিছু কথা বলেছিলেন। কি বলেছিলেন তা জানিনা। কাকু আমাদের বলেনি। শোনা যায় তিনি মৃত্যুশয্যায় বাবাকে কথা দিয়েছিলেন – আপনার ছেলেমেয়েদের দায়িত্ব আমি নিলাম। আমি ওদের দেখবো।
কার্তিক কাকু সে কথা রেখেছেন, রেখে যাচ্ছেন। কিন্তু আমার মা ? আমার মা কারও কোন কথা রাখেনি। বিয়ের আগেও না, পরেও না। একটা মেয়ে ক’বার ক’জনকে ভালোবাসতে পারে ? কথা দিতে পারে ? হৃদয় দান করতে পারে ? সন্দেহ হয় বাবাকেও মা ভালোসতো কিনা। নাকি অর্থ আর জৌলুসের লালসায় বাবার সাথে মা স্ত্রীর, শয্যাসঙ্গিনীর, সন্তান ধারণের অভিনয় করে গেছেন ? প্রশ্ন জাগে। নাহলে কার্তিক বাবুর মত অত ভালো মানুষটির নিখাদ ভালোবাসা পোষাকের মত খুলে ফেলে মা আমার পিতার সাথে বিয়ের পিড়িতে বসলো কি করে ? কি করে অগ্নিসাক্ষী রেখে সত্যের মন্ত্র উচ্চারণ করলো ? হয়তো উচ্চারণ করেনি। শুনতে গেছে কে ? আমার মা’তো মানুষ খুন করতে পারে। হ্যাঁ পারে! আমি বলছি পারে। ওই ভদ্রমহিলা নিজের স্বার্থ উদ্ধারের জন্যে কিনা পারে ? মা খুনী, আততায়ী, খড়গধারিণী ! ওকে ক্ষমা করা যায়না। ওকে ক্ষমা করলে পাপ হবে !
ছি ! নিজের মা সম্পর্কে এসব কি বলছি ! হাজার হলেও উনিতো আমার মা, মাতৃদেবী। আমাকে গর্ভে ধারণ করেছেন, কতো কষ্ট করে মানুষ করেছেন, কতো আশা নিয়ে আমাকে লেখাপড়া শেখাচ্ছেন। আমি কি মায়ের সে প্রত্যাশা পূর্ণ করতে পারবো? আমার বিয়ের জন্যে উনি  খোঁজ-খবর নিচ্ছেন। আমিতো স্পষ্ট বলে দিয়েছি – তোমার মত আমি ভুল করবো না মা। তোমার মত আমি ইহকাল-পরকাল ফাঁকি দেব না। ভালোবাসা আমার ইহকালের পূজা, ভালোবাসা আমার পবিত্রতম পরকাল। বাঁধনের শান বাঁধানো সিংহাসনে আমি আর কাউকে ভাবতে পারিনা। মায়ের পাপের প্রায়শ্চিত্তের জন্যে আমার এই আত্মত্যাগ। হ্যাঁ। বাঁধন যদি আমাকে ফাঁকি দেয় ? তাহলে ? তাহলে আর কিবা হবে ? মা’তো কার্তিক কাকুকে ফাঁকি দিয়েছিল। তবুও কি কার্তিক নামের লোকটা ভালোবাসার অমর্যাদা করেছে ?
মাঝে মাঝে মার হাসি দেখে আমি ভয় পাই। হো-হো করে হাসে। আমি জড়িয়ে ধরি। মা! তুমি কি পাগোল হয়ে গেলে ? অনেকক্ষণ হাসাহাসির পর মা চোখ মোছে। বলে- তুই বুঝবিনা মা! বুকের কান্নার সমুদ্রকে চেপে রাখবার জন্যেই বাইরে এই হাসির ঘূর্ণিঝড়। সবাই আমাকে হাসতে দেখে। কাঁদতে দেখেনা। ভিতরের কষ্ট অনুভব করতে পারেনা। এটাইতো আমার অভিশাপ।
– অভিশাপ কে দিয়েছে মা ? বাবা না কার্তিক কাকু ?
– এমনই ফুল ফুটলাম যে দেবতার পূজায় ঠাঁই পেলাম না, মানুষের ভোগেও লাগলামনা। এখন আর্বজনায় পড়ে আছি খুকি।
মা আমাকে ওই নামেই ডাকেন। কখনো কখনো তার সাথে আমার বন্ধুর মত সহজ সম্পর্ক হয়ে যায়। মন খুলে অনেক কথা হয়। বাবার কথা, সংসারের কথা, সমস্যার কথা, এমনকি বাঁধনের কথাও। কিন্তু কার্তিক কাকুর কথা উঠলেই মা গম্ভীর হয়ে থেমে যায়। কিছু বলেনা। শুধু জোরে একটি চাপা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। ব্যস ! তখনকার মত আলাপ বিনিময় শেষ। আমি তার বুকের ভিতরের মৃত অথচ জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরিকে আর, খোঁচাইনা। থাক। জ্বলুক। নিভৃতে অগ্নি উচ্চারণ হোক। ভুলের প্রায়শ্চিত্ত হোক। পাপের প্রক্ষালন হোক, দহনে দহনে মানুষের ইহকাল পবিত্র, শাপমুক্ত হোক।
মা কি তাহলে এখনো কার্তিক কাকুকে ভালোবাসে? কি করে বুঝবো? সব মেয়েদের সবকিছু বোঝা যায় না। নিজের মা হলেও না। তবে কার্তিক কাকুর, ভালোবাসা শ্বেতচন্দন। পবিত্র অথচ দাগ পরেনা। বাঁধনের মতন স্পর্শকাতর নয়। উ! বাঁধন যে কি ধরনের স্পর্শ ভিখারী! যা জ্বালিয়েছে! কাছে না এলে ভাবাই যায় না। রাক্ষুসে স্বভাব ছেলেটার। শান্ত জলের তলে কুমীর। তা হোক। চরম বিরক্ত হলেও অনেক সময় অনেক কিছু মেনে নিতে হয়। যেমন মার অনেক কিছুই আমার বিরক্ত জাগায়। রেগে উঠি। তবু সহ্য করতে হয়। মেঘলা হয়ে থাকি।
কার্তিক কাকু আমাদের ভিতরে না থাকলেও পাশে আছেন। বাবার জীবনের শেষদিকে তিনি বাবার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে উঠেছিলেন। হাসপাতাল, ক্লিনিক, রোগশয্যা এমনকি বাবার শ্মশানেও তাকে একেবারে নিজের লোকের মত দেখেছি। মা বিধবা হবার পর থেকে লোকটি আমাদের  সংসারের প্রায় সব দায়িত্বই বহন করে আসছেন। উনি আমাদের দাঁড় করিয়ে দিতে চান। কেন সেটা আমি এখন বুঝি। লোকে নানা কথা বলে। এ নিয়ে আমার অনেক নিকটের আত্মীয়রাও কটাক্ষ করতে ছাড়েনা। অথচ তারা কখনো মাকে সামান্য সাহায্য করেনি। এ ব্যাপারে মা নির্বিকার। বলছে, বলুক। কিন্তু কার্তিক কাকুকে নিয়েও যে মার তেমন একটা উদ্বেগ, অতি আন্তরিকতা সেটাও বুঝিনা। বরং কার্তিক কাকু যেগুলো একেবার্ইে নিষেধ করেন মা সেটা আরও বেশী করে। প্রায় সন্ধ্যায় আমাদের বাড়িতে লোকজন আসে। মা সেজেগুজে, হেসে, আদিখ্যেতা দেখিয়ে তাদের সাথে সময় দেয়, গল্প করে, আপ্যায়ন করে। কেন? এ নিয়ে আমারও রাগ হয় ! লোকগুলোতো ভালোনা। ব্যবসায়ী, পয়সাওয়ালা, চরিত্রহীন। মা সবই জানে। তবু তাদের প্রশ্রয় দেয়। ওইসব হাসি, ঠাট্টা, ইয়ার্কি, ফাজলেমির উদ্দেশ্য ভালো মনে হবার কথা নয়। এইসব ব্যাপারে মাকে আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারিনা। কিন্তু মা একটি ব্যাপারে খুবই সতর্ক। আমাকে নিয়ে। আমি ওদের সামনে গেলে রাগ করে।
– খবরদার খুকু। ওদের সামনে যাবিনা। ওরা ভালো না।
– তাহলে তুমি কেন ওদের বাড়িতে নিয়ে আসো ?
– সে তুই বুঝবিনা। ওরা তোর বাবার বন্ধু।
– তুমি বিধবা। এই বয়সে এতো সাজগোজেরই বা কি দরকার ? লোকে নানা কথা বলে। আমার খারাপ লাগে।
– লোকে কি আমাকে খেতে দেয় ?
– যে দেয় সেওতো তোমাকে নিষেধ করেছে।
– তার নিষেধ যে শুনতে হবে এমন কি কথা আছে ? আমি তার ঘরের বউ নাকি ?
– অকৃতজ্ঞ। তুমি একটা বিবেকহীন বিধবা !
– বিধবা হলেও আমার বয়সতো চলে যায়নি।
– ছি ! ঘেন্না ! বাবার স্মৃতির প্রতি তোমার এতটুকু শ্রদ্ধা নেই মা।
– কার্তিক বাবুর প্রতিও না।
– মা হেসে উঠে। রহস্যময় হাসি। বুঝি। মা কোন একটা কিছু লুকায়। কাকে ভালোবাসে আমার জননী? বাবাকে ? না কার্তিক কাকুকে ? নাকি কাউকেই না ? ওই লোকগুলো- যারা সন্ধ্যায় এসে আমাদের বাড়িতে আড্ডা জমায় তাদের কাউকে ? নারীদেহ বর্ণে গন্ধে নিজেকে বিকশিত করতে চায়, আকর্ষণ করতে চায়! তবে তারওতো একটা বয়স আছে। অনন্যা নামের মহিলাটির বয়স যাই হোক না কেন, এখন সে মা। আমার মা। আমাদের মা। সংসারের মা। এর চেয়ে অধিক রূপসজ্জা মেয়েদের হতে পারে বলে জানা নেই। মা হবার জন্যেইতো মেয়েরা সবকিছু করে। জানা কিংবা একেবারে অজানা পুরুষকে একরাতের পরিচয়ে শয্যায় সঙ্গ দেয়, দেহের অধিকার দেয়, সবকিছু দেয়। কাজটি বেহায়ার প্রায় বেশ্যার মত। শুধু সমাজ সম্মত বলেই নিন্দার নয়, পাপের নয়, পবিত্র সম্পর্ক বলে সমাজ-সংসারে স্বীকৃতি পায়। কিন্তু আসলে ব্যাপারটি কি? কি কাজের জন্যে? সন্তান জন্মদানের স্বার্থে শয্যায় সম্মতি দেওয়া। এ সম্মতি, সম্মান, স্বীকৃতি সৃষ্টির জন্যে, সৃষ্টি বিন্যাসের বৃহত উদ্দেশ্যে। স্ত্রী কি শুধু সন্তান জন্ম দেবার সামগ্রী ?
মার সাথে কার্তিক কাকুর দীর্ঘ প্রবাহিত সম্পর্কটি আমি ঠিক ধরতে পারিনা। কার্তিক বাবু মাঝে মাঝে আমাদের বাড়িতে আসেন। মা ও কালে ভদ্রে ওদের বাড়িতে যান। কাকলী কাকির সাথে মার অন্তত বৈরী সম্পর্ক নয়। কথা হয়। বেড়াতে আসা যাওয়া চলে। পিকিনিকে দুজনেই যায়, আলাপ হয়। বিদ্বেষ দেখিনা। ভিতরে কি আছে কে জানে? মেয়েদের মন! আমার মনের খবর কি বাঁধন সবটা জানে? সেই যে আমাদের নাটকের গ্র“পের মলয় ছেলেটি আমাকে গ্রীন রুমে একা পেয়ে হঠাৎ আদর করেছিল- তা কি বাঁধনকে বলা যায়? ছি ! মলয়তো আমাকে জোর করেনি, আমার মনের সম্মতি না থাকলেও দেহে তো আপত্তি ছিলনা। আবেগ বড় সর্বনেশে ! এখনো মলয় আমাকে একা পেলে – না, থাক। ওসব দুষ্টুমির কথা সবার জীবনেই কমবেশী থাকে। আমি বাঁধনকে এখনো ভালোবাসি। খাদ নেই। তাহলে মলয়কে দেহের সন্নিকটে সম্মতি দেই কেন ? ফাঁকি নেই কি ?
এখন প্রশ্ন হলো- কার্তিক কাকুর নিষেধ সত্বেও মা কেন বাজে লোকদের বাড়িতে সময় দেয় ? এটা আমি বুঝি যে কার্তিক কাকুর প্রতি মার সম্মতি আছে, স্বীকৃতি আছে। তাহলে ভিন্ন পুরুষরা কেন মায়ের আকর্ষণীয় দেহের ইয়ার্কি উপভোগ করবার সুযোগ পায়? মনের সাথে নারী দেহের একি রহস্যময় বিরোধ? না, আমার মা মোটেই চরিত্রহীনা নয়। এটা আমি দৃঢ় বিশ্বাস করি ! মায়ের হাসিটাই বড্ড শিকারী। ফাঁদ পাতা। নজর পড়লে আর রক্ষে নেই। ফাঁসবেই। কার্তিক কাকু এসব পছন্দ করেন না। মাকে বলেন – আমি বন্ধুর মত তোমার পাশে দাঁড়িয়েছি কেন জানো ? তুমি যাতে পয়সার জন্যে কারো কাছে ছোট না হও, তোমার ছেলেমেয়েরা যাতে লেখাপড়া শিখতে পারে, আর যাতে তুমি মর্যাদা ব্যক্তিত্ব নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারো। এই জন্যে। উত্তরে মা বলেছে – শুধু এই? আর কিছু না?
– মা হেসেছে কেন তা জানি না। এই একটি মাত্র শব্দ এ ব্যাপারে বলতে পারি।

আর একদিন। বিকেল বেলা।
বাড়িতে কেউ ছিলনা। ঘরে মা আর কার্তিক কাকু। আমি ভার্সিটি থেকে এসে ঘরের ভিতর কথা শুনলাম। চেনা কণ্ঠ। ঘরে না ঢুকে বারান্দায় দাঁড়ালাম।
– আমি কি তোমার কেউ নই অনন্যা ?
– আমি কি তা বলেছি ?
– আমি তো তোমার স্বামী। প্রথম স্বামী। মন্দিরে মালা বদল করে আমাদের বিয়ে হয়েছিল।
– সে সম্পর্কে তো আমি অস্বীকার করিনা।
– তাহলে এভাবে দূরে রয়েছো কেন ?
– আমার ছেলেমেয়ের কথাও তো ভাবতে হবে।
– আমি তো ওদের আপন করে নিয়েছি।
– ওরাওতো তোমাকে ভালোবাসে।
– তোমার পরে কি আমার কোন অধিকার নেই ?
– নেই তাতো বলিনি।
– তাহলে আমাকে এমন ফাঁকি দিচ্ছো কেন ? আমি তোমাকে ইচ্ছেমত কাছে পাইনা কেন ? নাকি তৃতীয় কোন জনের আগমন ঘটেছে ?
– বাজে কথা শুনলে বড্ড রাগ হয়। এতো সন্দেহ থাকলে এ সম্পর্ক রাখা সম্ভব হবে না কার্তিক।
– বাড়িতে কেন তুমি বাজে লোকদের জায়গা দাও ? ডেকে আনো ?
– ডেকে আনিনা। ওরা এমনি আসে। ওদের নিষেধ করা সম্ভব নয়।
– কেন ?
– ওরা আমার কোন ক্ষতি করতে পারবেনা। সে সাহস ওদের নাই। ওরা স্থানীয় প্রভাবশালী। মিষ্টি কথাতেই ওরা খুশী।
– ও ? তাহলে তুমি মিষ্টির দোকান খুলেছো ? যেদিন মাছি পড়বে সেদিন বুঝবে। বেশ! ভালোই করেছো! ময়রার মেয়ে। মিষ্টির দোকানতো খুলবেই।
রাগের মাথায় ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছিল কার্তিক বাবু। ঘরে ঢুকে দেখি মা কাঁদছে। বালিশে মুখ চেপে কাঁদছে। জিজ্ঞাস করলাম – কি হয়েছে মা ? উত্তর নেই।
সেদিন সন্ধ্যাবেলা।
মাকে বললাম – আজ থেকে বাড়িতে বাইরের লোক নিয়ে আড্ডা জমানো চলবেনা। আমাদের পড়াশুনার ক্ষতি হয়। তাছাড়া লোকে নানা কথা বলে। যে তোমাকে সম্মানের সাথে বাঁচিয়ে রেখেছে তার প্রতি তোমার কৃতজ্ঞ থাকা উচিত।
– আমি ওদের নিষেধ করতে পারবো না।
– কেন ?
– এ বাড়িতে টিকতে হলে ওদের আমি রাগাতে পারবোনা। ওরা যাতে আমার পক্ষে থাকে, সেই স্বার্থের জন্যে আমি তো ওদের সাথে অভিনয় করে, ফাঁকি দেই।
– কার্তিক কাকুর সাথেও কি তাই ?
– কার্তিক না থাকলে তোদের নিয়ে আমি ভেসে যেতাম, পথে নামতে হতো। লোকটা নিশ্চয়ই আমার আগের জন্মের কেউ ছিল। তাই এতো করে।
– তাহলে তুমি ওকে ফিরিয়ে দিয়ে এ সংসারে এলে কেন? কেন তাকে ফাঁকি দিয়েছিলে? আর আমার বাবাকেও কেন এই ফাঁকির মধ্যে জড়ালে?
– তোর বাপকে আমি কোনদিন ফাঁকি দেইনি খুকি।
– দিয়েছো। তোমার অজান্তে। অর্থের লোভে।
– না ! দেইনি।
মা গম্ভীর হয়ে যায়।
– তোর বাবা মরে যাবার পর থেকে আমি যে কত একা খুকি! শুধু তোরা আছিস বলেই সবকিছু ভুলে থাকি। কার্তিক তখন আমার মনের কিনারা ছুঁতে পারে না। জল হয়ে নদীতে থাকে।
মার এই কথাগুলোর মধ্যেও কি ফাঁকি নেই? একথা সত্য যে আমার মা অত্যন্ত একা। আমরা ঘুমালে অনেক রাত পর্যন্ত মা জেগে থাকে। একা। সামনে টেলিভিশন চললেও একা। মার চোখ দিয়ে শ্রাবণ নামে। চোখ মোছে। দীর্ঘশ্বাসে শব্দ হয়। কখনো জানালা খোলে, দরজা খুলে বাইরে আসে। বারান্দায় বসে থাকে। হাঁটে। তখন অন্ধকারে কে এসে দাঁড়ায় ? আমার বাবা ? না কার্তিক কর ? আসল ফাঁকিটা কোথায় ? বাবা মাকে কোনদিন চিঠি লেখেনি। কিন্তু কার্তিক কাকু মার বিয়ের আগে লিখেছে। এখনো মাঝে মাঝে লেখে। রাত জেগে মা পুরানো চিঠি পড়ে। শুকনো ফুলে ফাগুন আসে।
একদিন সকালে একটা চিঠি আমার হাতে পড়েছে। ইদানিং লেখা। মার বিছানার পাশে ছিল। মা হয়তো তুলতে ভুলে গেছে। কার্তিক কাকুর হাতের লেখা।
“প্রিয়তমা অনন্যা ! বউ আমার ! তুমিতো আমাকে কথা দিয়েছিলে – আমার ঘরে আসবেই। তাই কতোদিন ধরে তোমার পথ চেয়ে রয়েছি। এখনতো আর তেমন কোন অসুবিধে নেই। তোমার ছেলেমেয়েদের দায়িত্বেতো আমি নিয়েছি। তাহলে আর দ্বিধা করছো কেন ? আর কতদিন আমি তোমাকে ছাড়া এভাবে থাকবো ? আমার প্রতি তোমার কি কোন দায়িত্ব নেই? আমার এ শূন্যতা আর সহ্য হয়না ! এসো ! তুমি চলো এসো। আমি সম্মানের সাথে আমার সংসারে তোমাকে আবার সিঁদুর পরিয়ে দেবো। নাকি এবারও তুমি আমাকে ফাঁকি দেবে ???”
চিঠিটা পুরো পড়লাম। কেন যেন চোখে জল এসে গেল। এসব ক্ষেত্রে বাঁধন আর কার্তিক কর আলাদা নয়। শুধু একটি প্রজন্মের পার্থক্য। হ্যাঁ, বাঁধনকে আমি কথা দিয়েছি -একদিন ওর ঘরে সিঁদুর পরে যাবোই যাবো। দূরদেশে এজন্যে সে অপেক্ষা করে আছে। আমার মাতৃদেবীর অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত আমি করবো। ফাঁকি দেবনা।
ততক্ষণে মা এসে পিছনে দাঁড়িয়েছে। আমার হাতে চিঠি।
– এই যে। এই নাও। তোমার চিঠি।
– চিঠি হাতে নিয়ে মা ওদিকে সরে গেল। ওঘরে। একেবারে কোনায়। জানালার ধারে। আমি তীর্থক তাকিয়ে দেখলাম মা চিঠিখানা হাতের ভেতরে ধরে আছে।
চিঠি হাতে মা জানালায় মাথা রেখে কাঁদছে। মানুষের চোখের জলেও কি শিশিরের অম্বুবিন্দুর মত ফাঁকি থাকে ? রোদ এসে পড়েছে মার চোখের শিশিরে। মুক্তার বর্ণচ্ছটা। ঘাসের পাতায় শিশির বিন্দু ।

 

 

Print Friendly