প্রকৃতির সুবাস ছোবল : নাসরীন জাহান

সাহিত্য বাজার

nasrin-jahanপ্রকৃতির সুবাস ছোবল : নাসরীন জাহান (ছোটোগল্প)

আসমানে মিহি সুতোয় বোনা মসলিনের শাড়ির মতোন পাতলা জমাট শিশিরে মোড়ানো প্রকৃতির মধ্যে পরানে হু হু এক নস্টালজিক আনন্দ কী বেদনার তুমুল ঘ্রাণ নওশীনকে বিমোহিত করে তোলে।

সহসা আত্মবুঁদ অবস্থা থেকে ফের রাজহাঁসের মতো গ্রীবা উচ্চকিত করে চারপাশের ধু-ধু প্রান্তর ধরে সোনার টুকরো দানার মতো ধানের কণা শত শত গাছের সম্ভারে এমনভাবে ঢেউ তুলছে যেন তা স্থির জলের এক কোনায় কেউ নেড়ে দিল… তাই কুচি-কুচি ঢেউ আঁচল তুলে তুলে অন্য প্রান্তে গিয়ে হাঁপ ছাড়ল।

বিকেলের বাতাসের এই ঘ্রাণ ঢেউ তোলা শস্যের না আসন্ন শীতের দূরবর্তী জায়গায় দাঁড়ানো প্রাণের মধ্যে না জানা কষ্টের বিরহ তোলা হেমন্তের, নওশীন জানে না।

এই হেমন্তেই জন্ম হয়েছিল তার, শহরতলীর এক ছিন্ন বিচ্ছিন্ন কক্ষে।

এই জন্যই কী সে আজন্ম তারিখ না জেনেও ইট-পাথরের মধ্যে থেকেও হেমন্তের গন্ধ পায়?

ক্ষেতের ভাঁজের মেঠোপথ ধরে সে রিকশা-ভ্যানে পা ঝুলিয়ে বসে চলতে চলতে নিজের বয়স, অবস্থানের ভেদ ভুলে যায়।

শহরে ননদের বাড়ি। হাজব্যান্ডের পিঠাপিঠি এই বোনটির কাছেই নওশীন চিরকাল অপূর্ব এক মাতৃছায়া পেয়েছে। তার দুই কন্যাও এই ফুপুটিকে ভালো করে চেনে, ফলে শাশুড়িকে নিয়ে শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার সময় তারা এখানে দু কন্যাকে রেখে যেতে নওশীন অসহজ বোধ করেনি। মুনিয়াকে নিয়েই চিন্তা ছিল বেশি। অপরিচিত কোথাও গেলে বোধ করে সাঁতার না জানা অবস্থায় তাকে জলে ফেলে দেওয়া হয়েছে। ননদের দু-মেয়ের বিয়ে হয়েছে। বাচ্চারা আসে বলে ওদের জন্য এ বাড়িতে কম্পিউটার রাখা হয়েছে। তাতেই দুবোন খড়কুটো পায়। মুনিয়ার বিপণ্নতা জেনে এক্ষেত্রে মৌটুসি তাকে যদ্দুর সম্ভব ছাড় দিয়ে বোনের পাশে রাখছে।

ঝাঁক ঝাঁক পাখি মিহি রোদ্দুরে ঝাপটাঝাপটি করছে। এ পাশের ধানের গোড়ায় এখনো কাস্তে পড়েনি। কিন্তু দূরে কোলাহলে ধান কাটার শব্দ শোনা যায়। শাশুড়ির পীড়াপিড়িতে হলেও মনে হয় নগর থেকে এখানে এসে যেন সে বহুদিন পর এক অনাবিল মুক্তির নিঃশ্ব্বাস নিচ্ছে।

পাকা রাস্তা দিয়েও আসা যেত।

কিন্তু মেঠোপথের এই মজাটা নওশীন নিতে চাওয়ায় গ্রামবাসীও মজা পেয়েছে।

ননদের বাড়ি ঢাকা থেকে প্লেনে আসার জার্নিটা গায়ে লাগেনি। ফলে বিকেলেই সে ননদ আর দু-কন্যার সাথে দিনাজপুর শহরের বড় মাঠে চক্কর খেতে গিয়েছিল। পাশেই অফিসার্স কোয়ার্টারের বাবা, মা, সহকর্মী, বন্ধু-বান্ধবী, ছেলেমেয়ে দলদের অনেকেই পায়ে কেড্স পরে হাঁটতে নেমেছিল। একটা তেপান্তরের মতো মাঠের ওপারে আরেকটা মাঠ। পুরো মাঠে হাঁপছাড়া মানুষের চলমান কোরাসের মধ্যেও যখন ছায়া নামছিল, একটি গাছে হেলান দিয়ে নওশীন দেখছিল প্রকৃতি মানুষকে কত বদলে দেয়, শহরে কারণে অকারণে চিরঅসুস্থ বড় বোনটিকে নিয়ে খিটমিট করলেও এখানে ঠিক যেন মুনিয়ার মা মৌটুসি, এমন কেয়ারিং-এ বড় বোনটির হাত ধরে ধীরে ধীরে তাকে চলতে সাহায্য করছিল। আচমকা হাতে এক বিন্দু শিশির কণা…

রীতিমতো শিহরিত নওশীন ভ্যান থেকে মাথা ঊর্ধ্বমুখী করে। শহরের কাছাকাছি একঘরে তাল গাছের নিচ দিয়ে তারা যাচ্ছে। শিশুর মতো চিল্লায় নওশীন—শিশির পড়েছে, এই সিজনেই? এতক্ষণ চুপ করে থাকা দেবর হাসে, অস্ফুটের কথায় আন্দাজ করা যায়, ভাবির চোখ মানুষী দেখে সে অবাক হয়ে কিছু মন্তব্য করেছে, যা আন্দাজ করে নিজের মধ্যেই নিঃশব্দে সেঁধিয়ে যায় নওশীন।

অল্প বয়সে ঢাকার ছেলের সাথে বিয়ে হয় ননদ শিউলী আপার। চাকরিসূত্রে তিনি তখন দিনাজপুর ছিলেন। শেষে অনেক শহর ঘুরে ননদের কাঙ্ক্ষাতেই দিনাজপুরে তারা স্থায়ী হলেও তাদের চাল-চলন, ভাষায় কোনো বিশেষ অঞ্চলের ভাষা মূর্ত হয় না।

ভোরে তেতুলিয়ায় যাওয়া হবে। মাইক্রোবাস ভাড়া থেকে সব আয়োজন করছে ননদ জামাই। ননদের চাচাত ভাই পঞ্চগড় জেলার ডিসি। সেই সূত্রে সেখানকার ডাক বাংলায় আজ রাতের মধ্যে কেউ না এলে ওরা ওখানে এক রাত কাটাবে।

এখানে আসার পর থেকেই নওশীনের শিরা-উপশিরায় শিরশির করছে হরিণিয়ার নাম। এখন সে কোথায়? গ্রামে এ প্রসঙ্গে এবার ওই অল্প সময়ের মধ্যে মুখ খোলেনি। শিউলী আপাও শহরে বসে তার খবর রাখে না বলেই মনে হয়। কিন্তু যে প্রসঙ্গ না শুনতেই প্রাণে আরাম হয়, তা জানতে কেন এত দুর্মর কৌতূহল?

রাতে আড্ডা শেষে ঘুমের আগে শফিউলের আকুতিময় কণ্ঠে নওশীন মুনিয়া মৌটুসিকে ‘আই মিস ইউ’ শুনে একটা স্বস্তির স্থিততা নিয়ে তলিয়ে যায়।

সকালে শিউলী আপা প্রচুর খাবার দাবার নিয়ে মাইক্রোবাসে উঠলে হাসে নওশীন, তুমি পারোও।

আমরা ঢাকা গেলে তুমি কম করো?

মাইক্রোবাস যাচ্ছে নাতিশীতোষ্ণ বাতাসের সে াত কেটে কেটে। ঠাকুরগাঁও আসতেই আরেকটা কারের মুখোমুখি দাঁড়ায় তারা।

চাচাতো দেবর নেমে এসেছেন। বলছেন, আমি সব ব্যবস্থা করে রেখেছি, কোনো প্রব্লেম হবে না। তাকে দেখে গাড়ি থেকে নেমে আসে নওশীনও, থ্যাংকস আপনাকে। একটা রেকর্ড করতে যাচ্ছি। টেকনাফ তো গিয়েছিই, তেতুলিয়ায় গেলেই পুরো বাংলাদেশ ঘোরার কৃতিত্ব নেব হা হা।

গাড়ির দিকে তাকিয়ে চাচাতো ভাই অবাক কণ্ঠে বলে, সফিউল আসেনি?

না, ঢাকায় ওর অনেক কাজ।

তাহলে অসুস্থ হরিণিয়া ভাবির কাছে কে আছে? তাকেও তো দেখছি না।

এক ভূমণ্ডল চক্করে নওশীনের সাথে সাথে সবাই যেন কেঁপে ওঠে। সরল মানুষটার চোখে এসব পড়ে না, সে নিজ মনেই বলে যায়, পরশু ঢাকার রাস্তায় বিকশায় দুজনকে দেখে আমি গাড়ি থামালাম, বলল, ভাবিকে ডাক্তার দেখিয়ে বাসায় নিয়ে যাচ্ছে শফিউল, লিফট দিতে চাইলাম, নিলো না।

গলায় নিঃশ্বাস আটকে নওশীন প্রাণপণে ব্যাপারটাকে সামাল দেয়, এই শহরে পড়াশোনা করা মানুষটা ওদের সম্পর্কের ব্যাপারে কিছু জানে না, বলে, এই জন্যইতো ছুটি নিয়ে শফিউল রয়ে গেল, এছাড়া আমার বাবার বাড়ির মানুষও আছে। আম্মা বাড়ি আসার জন্য এত অস্থির হলেন যে…।

চলো, দেরি হচ্ছে, যেন এতক্ষণ নিঃশ্বাস আটকে ছিল শিউলী আপা, দম ছাড়া কণ্ঠে তাড়া দিলে ফের গাড়ি চলতে থাকে।

দিনের মধ্যে ঢুকে যায় অন্ধকার আলোর হল্লোড়বাজি। ঠাকুরগাঁওয়ের ছিমছাম পথ। ছোট বড় নিরিবিলি বিল্ডিংয়ে চোখ রেখে জ্বালা জ্বালা বুক নিয়ে রীতিমতো কাঁপে নওশীন। বিয়ের অনেক পরে জেনেছিল সে, বিধবা ভাবির সাথে কৈশোর থেকেই শফিউলের দেহমন সর্বস্ব প্রেমের কথা। শেষে আত্মীয়-স্বজন এক হয়ে ভাবিকে বাপের বাড়ি পাঠালে কন্যাদের মাথা ছুঁয়ে কিরা কেটেছিলেন শফিউল। এখন আর হরিণিয়া ভাবির খোঁজ রাখে না সে।

Print Friendly