প্যাঁচের রাজনীতি নাকি রাজনীতির প্যাঁচ : ইথিজা অবেরয়

সাহিত্য বাজার

images rajএক অসহনীয় পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে আমরা দিনাতিপাত করছি। করতে বাধ্য হচ্ছি। একের পর এক হরতাল হচ্ছে। কখনও জাতীয় পর্যায়ে, কখনও আঞ্চলিক পর্যায়ে। প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও হরতাল হচ্ছে। বড় দল, মাঝারি দল, ছোট দল, ভূঁইফোড় দল—সবাই যে যার ইচ্ছেমত হরতাল ডাকছে। হরতাল ডাকার জন্য এখন আর কোনো বিশেষ ইস্যু বা দাবি-দাওয়ার দরকার হয় না। পান থেকে চুন খসলেই আসে হরতাল। বোমা মেরে, ভাংচুর করে, হামলা-আক্রমণ চালিয়ে ত্রাস সৃষ্টি করা হচ্ছে। আর এই ‘ত্রাসের রাজত্বে’ মানুষ জানমালের ক্ষতি এড়াতে হরতাল মানতে বাধ্য হচ্ছে। হরতাল পালনে মানুষকে বাধ্য করা হচ্ছে। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস এই ধারা চলছে তো চলছেই। যারা এই অসহনীয় দমবন্ধ পরিস্থিতি থেকে দেশকে উদ্ধার করতে পারেন, দেশের মানুষকে শান্তি-স্বস্তি-মুক্তি দিতে পারেন, তারা রয়েছেন নির্বিকার। যেন কোনোকিছুতেই তাদের কিছু যায় আসে না। ‘দেশপ্রেমের’ নামে, ‘জনগণের সেবা’ ও ‘কল্যাণের’ নামে দেশের রাজনীতিকরা দেশের মানুষের উপর প্রতিনিয়ত অপরিমেয় জুলুম-নির্যাতন চালাচ্ছেন। এ ওর উপর, সে তার ওপর দায় চাপিয়ে তারা যে যার স্বার্থ ও সুবিধামত পথ চলছেন। বিরোধ এবং পারস্পরিক হিংসা দিন দিন বাড়ছে। এই বিরোধ ও হিংসা কমানোর কোনো উদ্যোগ কোনো পক্ষ থেকে গ্রহণ করা হচ্ছে না। কেউ কাউকে ন্যূনতম ছাড় দিচ্ছে না। একদল ‘গণতান্ত্রিক অধিকার’ প্রয়োগের নামে আইন ও সংবিধানবিরোধী ভূমিকা পালন করছেন। আরেক দল ‘সংবিধান রক্ষা’ ও ‘আইনের শাসন’ প্রতিষ্ঠার নামে সীমা লঙ্ঘন করছেন। তারা না পারছেন জনগণের জানমাল রক্ষা করতে, না পারছেন দস্যুতা ঠেকাতে। দুই পক্ষই তাদের অধিকারের সীমা লঙ্ঘন করে চলেছেন। এদিকে দেশের মানুষের নাভিশ্বাস দশা। একনাগাড়ে দীর্ঘকাল এমন ‘চিড়েচ্যাপ্টা’ অবস্থায় থেকে মানুষ এখন দিশেহারা। তারা চরম ক্ষুব্ধ, হতাশ এবং বিরক্ত। একই সঙ্গে তারা অসহায়।

আমরা আসলে এখন আপাদমস্তক রাজনীতির প্যাঁচে আটকা পড়েছি। এই প্যাঁচ থেকে কিছুতেই মুক্তি পাচ্ছি না। তবে এখানে বলে রাখা ভালো যে, আমাদের দেশের মানুষ কমবেশি সবাই একটু ‘পেঁচুয়া’ স্বভাবের। জীবনে কখনও কোনো প্যাঁচে পড়েননি, অথবা কখনও প্যাঁচ কষেননি এমন ব্যক্তি আমাদের সমাজে খুঁজে পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। দিন যত যাচ্ছে মানুষ যেন তত বেশি প্যাঁচালো হচ্ছে। প্যাঁচ ছাড়া মানুষ আর মাথা ছাড়া জ্যান্ত ইলিশ উভয়ই বিরল। প্যাঁচ সম্বন্ধে আমাদের সবারই কমবেশি ধারণা আছে। এমনকি রবীন্দ্রনাথও প্যাঁচ ব্যাপারটি জেনেছিলেন। উদ্ধৃতি দিলে বিষয়টা পরিষ্কার হবে। ‘যিশু চরিত’-এর প্রারম্ভে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ‘বাউল সমপ্রদায়ের একজন লোককে একবার জিজ্ঞাসা করেছিলাম, তোমরা সকলের ঘরে যাও না?

সে কহিল, না।

কারণ জিজ্ঞাসা করতে সে কহিল, যাহারা আমাদের স্বীকার করে না, আমরা তাহাদের ঘরে যাই না। আমি কহিলাম, তারা স্বীকার করে না নাই করিল, তোমরা স্বীকার করিবে না কেন? সে লোকটি কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া সরলভাবে কহিল, তা বটে, ওই জায়গাটাতে আমাদের একটু প্যাঁচ আছে।’ এখানে বলা দরকার যে, আমাদের দেশে আওয়ামী লীগ-বিএনপির মধ্যেও এরকম একটা ‘প্যাঁচ’ আছে। এক পক্ষ আরেক পক্ষকে সম্মান করে না। আর অপর পক্ষও তাই এ পক্ষকে শ্রদ্ধা করে না। পেছনের কারণ যতই জোরালো হোক না কেন—এটাই আমাদের রাজনৈতিক বাস্তবতা।
কবি অজিত দত্ত তার ‘নইলে’ নামক এক বিখ্যাত কবিতায় লিখেছিলেন, ‘প্যাঁচ কিছু জানা আছে কুস্তির?/ঝুলে কি থাকতে পারো সুস্থির?/…দাঁত আছে মজবুত সব বেশ?/পাথর চিবিয়ে আছে অভ্যাস?/ নইলে/রইলে/ভাত না খেয়ে/চালে ও কাঁকরে আধাআধি থাকো হে।’
কবি কুস্তির প্যাঁচের কথা বলেছেন। কিন্তু সে তো খুবই মোটা দাগের ব্যাপার। আসল প্যাঁচ হলো বুদ্ধির, সে অনেক সূক্ষ্ম ব্যাপার। এই সূক্ষ্ম প্যাঁচ নিয়েই আমাদের কারবার। মানুষ কেন প্যাঁচ কষে, কেন সহজ-সরল না হয়ে প্যাঁচালো হয় সে এক অপার রহস্য। সে রহস্য ভেদ করা দুঃসাধ্য নয়, অসাধ্যও বটে। তবু কিছু কিছু মানুষ মনের আনন্দে প্যাঁচ কষে যায়। এমন অনেক ব্যক্তি আছেন, তাদের বুদ্ধি এতই প্যাঁচালো যে, বলা হয় তাদের মগজের মধ্যে পেরেক ঢুকিয়ে দিলে সেটা স্ক্রু হয়ে বেরিয়ে আসবে এবং তখন সেই স্ক্রু দিয়ে তিনি যাকে ইচ্ছে, যত ইচ্ছে টাইট দিতে পারবেন। তবে সবাই যে অন্যকে ‘টাইট’ দেয়ার জন্য প্যাঁচ কষে তা নয়, অনেকে বিনা কারণেও প্যাঁচ কষে। নানাজনকে নানাভাবে জব্দ করে। সরল মনে কাউকে জিজ্ঞেস করলেন, ভাই আপনার ঘড়িতে এখন ক’টা বাজে? ঘড়িওয়ালা এর যা উত্তর দিলেন তা অভাবনীয়। তিনি উল্টো প্রশ্ন করলেন, আপনার ক’টা চাই!

আমাদের দেশে কিছু কিছু জেলার মানুষ আছে যারা সোজা কথার সোজা উত্তর দিতে পারে না বা দেয় না। সকাল বেলা যদি কাউকে জিজ্ঞেস করা যায়, ‘নাস্তা করেছেন?’ উত্তর আসবে, ‘আমারে কী পাগলে কামরাইছে যে, নাস্তা না কইরা এত বেলা পর্যন্ত বইসা রইছি?’
তবে শুধু বিশেষ কোনো জেলা বা অঞ্চল নয়, আমাদের সমাজে প্যাঁচালো কথা এখন বেশ চলছে। এ ব্যাপারে তেমন কোনো উচ্চ-নিচ নাই। সবাই কমবেশি প্যাঁচালো কথা বলছে। প্যাঁচালো কথার সবচেয়ে বেশি চর্চা হয় আদালতে, রাজনৈতিক আলোচনায়, হাটবাজারে। দোকানদাররাও ইদানীং পলিটিশিয়ান ও উকিলদের মতো প্যাঁচালো কথায় ওস্তাদ হয়ে উঠেছেন। এ ব্যাপারে পুরোনো গল্পটির কথা মনে করা যাক।

অনেকের যেমন অভ্যাস থাকে, এক ভদ্রলোক আমের বাজারে পাকা আম টিপে টিপে দেখছেন। বলা বাহুল্য আমের দোকানদার তাকে মানা করে যাচ্ছে। কিন্তু তিনি অবিচল। অবশেষে আমের দোকানি উঠে দাঁড়ালেন, দাঁড়িয়ে চেঁচাতে লাগলেন, আশপাশের আমওয়ালাদের বলতে লাগলেন, ওরে তোরা আর চিন্তা করিস না। আমের ডাক্তার এসে গেছে, ডাক্তার সাহেব সব আম টিপে টিপে দেখে চিকিত্সা করবেন। তোদের সব আম নিয়ে আয়। এরপর আম-টেপা লোকটির কী হয়েছিল তা সহজেই অনুমেয়।
প্যাঁচালো বুদ্ধি যে শুধু বড়দেরই থাকে তা নয়। অল্প বয়সীদের মধ্যেও এর অভাব নেই। স্কুলের ক্লাসে টিচার ছেলেদের বাসা থেকে রচনা লিখে আনতে বলেছিলেন। মোটামুটি তিন পৃষ্ঠার মধ্যে রচনা লিখতে হবে, বিষয় ‘আলস্য’। নির্দিষ্ট দিনে অন্য ছাত্ররা ক্লাসে এসে তাদের রচনার খাতা জমা দিল। প্রত্যেকেই যে যেমন পারে তিন পৃষ্ঠার মতো করে রচনা লিখেছে। শুধু একটি ছেলে ব্যতিক্রম।
তার রচনার খাতার প্রথম পৃষ্ঠার মাথায় লেখা আছে ‘আলস্য।’ তারপর পরপর তিন পৃষ্ঠা সাদা। তৃতীয় পৃষ্ঠার নিচে বড় বড় অক্ষরে লেখা— ‘এর নাম আলস্য।’

অবশ্য এর চেয়েও প্যাঁচালো বুদ্ধি ছিল সেই ছেলেটির যাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, তুমি সাঁতার কাটতে পারো? সে বলেছিল, সময় সময়।
এ অবাক উত্তর শুনে ফের প্রশ্ন, সময় সময় মানে?

ছেলেটির নির্বিকার উত্তর, ধরুন যখন যখন পানিতে নামি তখন।

আমরা বর্তমানে অবশ্য দোকানদার কিংবা শিশুর প্যাঁচ নয়, রাজনীতিবিদদের রাজনীতির প্যাঁচে জর্জরিত। প্রায় দুই দশক ধরে পেটভর্তি জিলেপির প্যাঁচ নিয়ে আমাদের দেশে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতারা পর্যায়ক্রমে ক্ষমতায় এসেছে। যখন যারা ক্ষমতায় বসেছে তখন তারাই নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে একটা প্যাঁচ কষেছে। তাদের মত করে নির্বাচন ব্যবস্থা সাজিয়ে নির্বাচন করার চেষ্টা করেছে। বিরোধীরাও পাল্টা প্যাঁচের রাজনীতি চর্চা করেছে। সরকারের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক সহিংস আন্দোলন গড়ে তুলেছে। আন্দোলনের মুখে নির্দলীয় ব্যক্তির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে বাধ্য হয়ে সেই ব্যক্তির তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে এখনও পর্যন্ত ‘বিরোধী পক্ষ’ জয়ী হয়েছে। তারপর ক্ষমতায় গিয়ে আবার একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। সরকারি দল তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। আর বিরোধী পক্ষ এই ব্যবস্থার পক্ষে দাঁড়িয়ে সব কিছু অচল করে দেয়ার অভিযানে শামিল হয়েছে।
এই খেলা এখনও চলছে। সরকারি দল প্যাঁচ কষছে বিরোধী দলের বিরুদ্ধে, বিরোধী দল প্যাঁচ মারছে সরকারি দলের বিরুদ্ধে। সরকারি দল বলছে, আগামী নির্বাচনে তাদের জয়লাভের সম্ভাবনা নেই বলেই তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি করছে। পক্ষান্তরে বিরোধী দল বলছে, তারা কারসাজি করে নির্বাচনে জিততে চায় বলেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করেছে।
সরকারি দল বলছে, বিরোধী দল দেশের মঙ্গল চায় না বলেই আন্দোলন-সংগ্রাম, হরতাল-নৈরাজ্যের পথ বেছে নিয়েছে। এদিকে বিরোধী দল বলছে, সরকারি দলের অপশাসন থেকে দেশবাসীকে মুক্ত করতে এবং দেশকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধেই তারা সরকার পতনের আন্দোলন করছে।
সরকারি দলের অভিযোগ, বিরোধীরা সংসদে না এসে রাজপথে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছে। বিরোধীদের অভিযোগ, সরকারি দল তাদের সংসদে কথা বলতে দেয় না, দমন-পীড়ন-নির্যাতনের মাধ্যমে আন্দোলনের পথে ঠেলে দিচ্ছে। সরকারি দল ও বিরোধী দল এভাবে পরস্পরের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত প্যাঁচ কষছে, একে অপরকে জব্দ করতে অবিরাম ভূমিকা পালন করছে। এদিকে আমরা বুদ্ধুরা কখনও এপক্ষকে কখনও ওপক্ষকে হাততালি দিয়ে উত্সাহিত করছি। আমাদের ভূত-ভবিষ্যত্-বর্তমান সরকারি দল ও বিরোধী দলের প্যাঁচে পড়ে ক্রমেই অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু তারপরও কারও হুঁশ আসছে বলে মনে হয় না। প্যাঁচের রাজনীতিতে পড়ে আওয়ামী লীগ-বিএনপির নামে আমাদের মাতম তোলা এখনও অব্যাহত আছে!

কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই ধারা কী অনন্তকাল অবধি চলতেই থাকবে? আমাদের পরমপূজ্য রাজনীতিকরা আরও বড় কোনো ক্ষয়ক্ষতি ঘটার আগে সমস্ত প্যাঁচের ঊর্ধ্বে উঠে নিজেরা বসে একটা সমাধানে পৌঁছতে পারেন না? রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে, দলের নেতাদের কাছে দেশ বড়, দেশের মানুষ বড়, নাকি পরস্পরকে দেখে নেয়ার ইচ্ছে বড়? নিজেদের সংকীর্ণতা, ইগো আর একগুঁয়েমি বড়?

Print Friendly