রুডইয়ার্ড কিপলিং-এর কবিতা : কামাল রাহমান

সাহিত্য বাজার

নীল গোলাপ, সমুদ্রের ঘুমগান ও অন্যান্য কবিতা: রুডইয়ার্ড কিপলিং
অনুবাদ:  কামাল রাহমান

23(ত্রিশ, চল্লিশ ও পঞ্চাশের দশকে ইয়োরোপের যে কবিরা বাংলা কবিতায় আধুনিকতা প্রসারে সহায়ক হয়েছিলেন রুডইয়ার্ড কিপলিং তাঁদেরই একজন। ১৯০৭ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পাওয়া এই কবির জন্ম ১৮৬৫ সালে, ভারতের মুম্বাই শহরে। জন্মসূত্রে ভারতীয় এই ইংরেজ কবির দেহাবসান ঘটে ১৯৩৬ সালে। ব্রিটিশ সৈনিক ও শিশুদের নিয়ে লেখা গল্প ও কবিতার জন্য সুনাম অর্জন করেছিলেন তিনি। ‘দ্য জাঙ্গল বুক’, ‘জাস্ট সো স্টোরিস’, ‘কিম’, ‘দ্য ম্যান হু উড বি দ্য কিং’,  ও কবিতাগ্রন্থ ‘মান্দালয়’, ‘গুঙ্গা ডিন’ ‘দ্য গডস অব দ্য কপিবুক হেডিংস’, ‘দ্য হোয়াইট ম্যানস বার্ডেন’, ‘ইফ-’ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। তাঁর কবিতার অনুবাদ হয়েছে অনেক। ইংরেজি ভাষার অনেক ধ্বনির উচ্চারণ এত ভেতর থেকে যে প্রায় ফুসফুসের কাছাকাছি এসবের অবস্থান। কিন্তু বাংলার উচ্চারণ তালু পেরিয়ে আর ভেতরে যায় না। এমনকি আরবি ক্বাফ যে অবস্থান থেকে উচ্চারিত হয় সেখানেও যায় না। কিপলিঙের কবিতা চমৎকার ছন্দোবদ্ধ। অন্তমিল, এমনকি পর্বমিল সমৃদ্ধ। বাংলা অনুবাদে দেখা যায় সে-সময়ের কবিরা অন্তমিল রেখে মূল কবিতার ছন্দ অনুসরণ করার চেষ্টা করেছেন। ইংরেজের কণ্ঠে ইংরেজি কবিতার আবৃত্তি না শুনলে অনেক সময় বোঝা যায় না যে ছন্দটা কোথায়। পুরোনো অনুবাদগুলো পড়ে মনে হয়েছে যে ছন্দ অনুসরণ করে অনুবাদ করতে যেয়ে অনেক েেত্র মূল কবিতার সৌন্দর্য ব্যহত হয়েছে ও কবিতার রূপ ও ভাব পাল্টে গেছে। মুক্ত গদ্যছন্দে এগুলোর অনুবাদ কেমন দাঁড়ায় ভেবে দশটা কবিতা অনুবাদ করা হল।)

নীল গোলাপ

গোলাপেরা লাল ও গোলাপেরা সাদা
ভালোলাগার আনন্দে ছিঁড়ে নেই ওদের।
কোনো বিষয় না ওটা–
সে আমন্ত্রণ জানায় তুলে আনতে ওর নীল গোলাপগুলো ।

ঢুঁড়ে বেড়াই আধখানা পৃথিবী
ঐ নীল গোলাপের খোঁজে।
বাকি অর্ধেকটা পৃথিবী ঘুরি নিজেরি তাড়ণায়,
প্রত্যুত্তর আসে শুধু হাসি ও কৌতুকে।

ঘরে ফিরি শীতার্ত হয়ে,
মরে গেছে কবে সেই সব বোকা ভালোবাসারা
ওর শেষ নিঃশ্বাসের গন্ধ খুঁজে
মৃত্যুর বাহুতে গোঁজা গোলাপ হতে।

হতে পারে এক সমাধি ছাড়িয়ে
যা থাকতে পারতো তা খুঁজে পাবে সে।
আমার ওটা ছিল কেবলি এক অলস আকাঙ্খা —
সাদা ও লাল গোলাপেরা হল সব চেয়ে সুন্দর এ পৃথিবীতে!

সমুদ্রের ঘুমগান

ওহো! শান্ত হও, বাছা, একটা রাত রয়েছে পেছনে আমাদের
এবং ঐ কালোগুলো হচ্ছে জল, যা চকচক করছে এখন সবুজাভায়।
সন্ধানীদের উপর দিয়ে নিচে তাকায় চাঁদ, খুঁজে পেতে আমাদের
প্রশান্তি মর্মর শব্দ তোলে ফাঁকা খোলসের ভেতর।
তরঙ্গ যেখানে মেশে তরঙ্গে, সেখানে বালিশটা কোমল,
ওহো, সাঁতার কাটে কান্ত বিন্দু, কুঁকড়ে যায় তোমার নমনীয়তা!
কোনো ঝড়ই জাগাবে না আর তোমাকে, পেরিয়ে যাবে না কোনো হাঙর
ঘুমিয়ে থাকো এই তাণ্ডবের ভেতর ধীর লয়ের সমুদ্রগুলোয়।

বাড়িগুলো

তোমার ও আমার বাড়ির মাঝখানে পথটা অনেক চওড়া
তোমার বাড়ি অথবা আমার বাড়ির ভেতর পৃথিবীর অর্ধেক পতিত জমি
তোমার ও আমার বাড়ির মাঝখানে ঝুলে আছে অর্ধেকটা পৃথিবীর ভাগ্য
তোমার ও আমার বাড়ির মাঝখানে রয়ে গেছে অর্ধেকটা পৃথিবীর ঘৃণা।

তোমার ও আমার বাড়ির জন্য কোনো অবলম্বন খুঁজে পাই না
তোমার ও আমার বাড়ি দুটোর সুরায়– বদলে যায় দয়ার্দ্র প্রিয়জনেরা;
যদি সরিয়ে নেয়া হয় আমার বাড়িটা, সঙ্গে সঙ্গে ধ্বসে পড়বে তোমারটা
যদি খোয়া যায় তোমারটা, মুহূর্তের ভেতর অনুসরণ করবে আমারটা।

তোমার বাড়ি ও আমার বাড়ির মাঝখানে কি কথা থাকতে পারে
প্রাধান্য নিয়ে অথবা মালিকানার, অথবা রণাবেণের অথবা খরচপাতির?
আমার বাড়ি হতে তোমার বাড়িতে পাঠানো যায় না এর চেয়েও বেশি কিছু
তবে তোমার বাড়ি হতে আমার বাড়িতে–  বন্ধু সঙ্গ দেয় বন্ধুকে
এবং তোমার বাড়ি হতে আমার বাড়িতে কম কিছুও আনা যায় না
অতএব আমার বাড়ি ও তোমার বাড়ির ভেতর– রাজার পরামর্শ আরেক রাজার সঙ্গে।

মঠ
১৯১৪

ভেবেছিলাম আমাদের শরীর ছিল অসুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা-রহিত।
হতে পারে অন্যদের ওটা, আমাদের কখনোই না, আমরা ছিলাম বিচণ
ও স্বাধীনতার বণিক। মিথ্যের উপর দাঁড়িয়ে এক লাগামহীন ইচ্ছেয়
ভৃত্যদের টেনে নিতে দিয়েছিলাম আমাদের শক্তিমত্তা
আনন্দানুভূতি ও হলাহলের ছিল নিজস্ব গতি ও পথ
ওটা ছিল সব চেয়ে বিশ্রী, তবুও শিখেছি
যে মিথ্যা বলে সে চুরি করবে, যে চুরি করে সে খুন হবে।
অথচ, না ঈশ্বরের বিচার না মানুষের হৃদয় বদলেছিল এতটুকুও।

তবুও রয়েছে তাঁর মা– চাওয়ার জন্য
তীব্র রোষাণল ও বিপদ থেকে ঝেড়ে ফেলি আমাদের ভুলগুলো
একমাত্র ঐ ‘সঠিকে’ যা আমাদের পূর্বপুরুষেরা দাবী করেছিল
যখন ব্যর্থ হয় ওদের কানুন, এবং কিনে নেয়া হয় এটার প্রয়োগকারীদের।
এটা আমাদের কারণ। প্রভু সাহায্য করো আমাদের, এবং সফল করো।
আমাদের ইচ্ছে, পরে কখনো দেখা করবো ওর সঙ্গে, নির্লজ্জভাবে!

চিকিৎসক
১৯২৩

খুব দ্রুত মরে যায় মানুষ, অর্ধ-পরিকল্পিত ওর কাজের পাশে।
হাতে গোনা ওর দিনগুলো, দণ্ডাদেশের স্থগিত কল্পনা এক ব্যর্থ আশা:
কে অনুনয় করে মৃত্যুর সঙ্গে হাতে হাত রাখতে,
অথবা থামিয়ে দিতে ব্যথার লজ্জাকর নগ্নতা?

পাঠাও এখানে ঐ দুঃসাহসীদের, ঐ পথ প্রত্যাশীদের–
অনুরাগহীন, অকম্প আত্মারা,
ওরা নিবেদন করে এক অন্তর্মুখী রহস্য, মানুষের কোমলতা,
এবং বলে না আর কখনো ঐ পূর্ণতার দিকে যেতে।

মা আমার

যদি ঝোলানো হয় আমাকে সব চেয়ে উঁচু ঐ পাহাড়টায়,
মা আমার, ও আমার মা!
জানি আমি কার ভালোবাসা তবুও অনুসরণ করবে শেষ পর্যন্ত
মা আমার, ও আমার মা!

যদি ডুবিয়ে দেয়া হয় আমাকে গভীরতম সমুদ্রে,
মা আমার, ও আমার মা!
জানি কার অশ্র“ গড়িয়ে এসে পৌঁছোবে ওখানে,
মা আমার, ও আমার মা!

যদি আমাকে নিন্দিত করা হয় দেহ ও আত্মায়
জানি আমি কার প্রার্থনা পূর্ণ করবে আমাকে আবার
মা আমার, ও আমার মা!

প্রস্তাবণা

রুটি ও নুন খেয়েছি তোমার।
পান করেছি জল ও মদ্য।
পাশে থেকে দেখেছি মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছো তুমি,
এবং যে জীবনটা যাপন করেছিলে তুমি সে তো আমারই।

সামান্য কিছুও কি বাকি ছিল যা নেইনি ভাগ করে আমি
উপবাস-নিশি পালনে অথবা কঠোর শ্রমে অথবা আয়েশে,–
ছোট্ট একটা তৃণের সমান হর্ষ অথবা বিষাদও কি ছিল অজানা আমার,
অথবা কোনো প্রিয় হৃদয়, এমনকি ঐ সমুদ্রগুলোরও ওপারে?

লিখেছি জীবনের গল্প সব আমাদের
আশ্রয় পাওয়া এক মানুষের আনন্দোচ্ছলতায়,
এক ভাড়ের পোশাকে–  কিন্তু তুমি ছিলে বিচণ,
এবং জানতে, কৌতুকটা মূল্য দেয় কোথায়।

সাতজন পাহারাদার
১৯১৮

সাতজন পাহারাদার বসে আছে এক ভবন-চূড়োয়
আর দেখে কি সব নেমে এসেছে এই মানবতার উপর
মানুষটাকে দেখায় ওর বিজয় ও মতা,
আহ্বান জানায় মনের ভেতর ওর রাজত্বের এক প্রতিরূপ গড়ে নিতে।
‘‘যা-কিছু আছে এ পৃথিবীতে তোমার জয় করে নেবে সে-সব তোমাকে।
(যেভাবে চলেছিল ওদের পরিষদগুলো)
‘‘কিন্তু রাজত্বটা– ঐ রাজত্বটা কিন্তু তোমারই ভেতর,’’
মানুষটার অন্তর বলে ঐ মানুষটার কাছে।
সময়ে– এবং কিছু সময়ে–
যেমন আগের বছরগুলো ছিল তেতো
বিপরীতে এটা হবে বেশি মিষ্টি, ঘন্টার হিসেবে–
ঐ মানুষটার অন্তর এর চেয়ে বেশি কিছু বলে না ওর কাছে
তারপর সাতজন পাহারাদার বসে থাকে ঐ ভবন-চূড়োয়।

পুত্রদের গান

পৃথিবীর শেষ প্রান্ত হতে একটা– একটা খোলা দরোজার সামনে সাজানো অসংখ্য উপহার–
প্রতারণা আছে অনেক ওখানে, কিন্তু আমরা, মা, তোমার পুত্রদের আছে আরো ঢের বেশি!
মৃত্যুপথযাত্রী এক মানুষের আর্ত চিৎকার হতে, নেকড়ে ভরা এক অরণ্যের ভয়ার্ত ডাক হতে
ঘুরে যাও, এবং দেখো, এ পৃথিবীটা তোমারই। মা, গর্বিত হও তোমার সন্তানদের জন্য!
ভেবে দেখো, আমরা কি দুর্বল, অথবা সংখ্যায় অনেক কম? শোনো, এত কর্কশ কি আমাদের ভাষা?
আমরা কি দরিদ্র আমাদের এ মাটিতে? বিচার কর, আমরা কি রক্ত পিপাসার্ত মানুষ?

তোমার জানুতে ছিল যারা এক সময়, মা, ডেকে আনো ওদের–
দূর বিভূঁয়ে জন্মেছি আমরা যারা, অপো করবো, এবং কথা বলবো তোমার প্রিয়জনদের সঙ্গে
অন্ধকারে কখনো যুদ্ধ করি না আমরা, বরং দর কষি ও তাচ্ছিল্য করি ও বিদ্রুপ করি।
মূল্যের বিনিময়ে বিক্রি করি আমাদের ভালোবাসা– কোনো প্রতিজ্ঞা অথবা মূল্য ছাড়া ভালোবাসা
শোনো, তোমার সন্তানদের জন্য কথা বল, সমুদ্রের সব চেয়ে নির্মম প্রান্ত হতে।

নগরের গান
কোলকাতা

আমি, এক সমুদ্র নাবিক, ভালোবেসেছিলাম এক নদীর গড়ে ওঠা,
ধরে রাখতে তোমার রাজকীয় অভিযান সম্বৃদ্ধ জীবন ও প্রার্থিত সম্পদ
শুভেচ্ছা হে ইংল্যান্ড! আমি এশিয়া — এক ফাঁটলের ভেতর সীমাহীন মতা,
আমার হাতে মৃত্যু, কিন্তু সোনায় গড়া!

অনেক আবিষ্কার

যদি না চাও পায়ের আঙ্গুলে হাঁটতে তাহলে ফিরে আসা ভালো তখুনি
গাড়ি টানার জন্য গরুগুলো হাঁটে জোড়ায় জোড়ায়
ঘোড়াগুলোও হাঁটে জোড় বেঁধে
আর হাতিরা বয়ে আনে কামান।
হুঁ-হুঁউ!
প্রকাণ্ড-বড়-লম্বা-কালো-চল্লিশ-পাউন্ড ওজনের সব কামান।
সামনে ও পেছনে হেঁইয়ো-হো ধাক্কা
এত বড় একেকটা যেন হাজারমনী নৌকো
অন্ধ-বোবা-মাথামোটা-গুলিভরা–ভিুকেরা ঐ গোলাদাগা কামানগুলো!
প্রভু আমার ঐ হাতি।

Print Friendly