নির্বাচন ২০১৪ : ঢাকার মিরপুরে নেতৃত্বহীন বিএনপি-আ.লীগ হারাচ্ছে দুটি আসন

সাহিত্য বাজার

Sharing is caring!

f-m--3

ফকির মহিউদ্দিন আহম্মেদ

s-molla

সাত্তার মোল্লা

সদানন্দ সরকার (ভ্রাম্যমান প্রতিনিধি) : ‘আমরা মরলে ওই কুত্তারবাচ্চারার কি? ওগোর ঘরেত তো চাইল-ডাইলের কমতি নাইকা। আমগোর চাইল এখন ৪৭ আর পিয়াজ ১০০ টাকা, ডাইলের দাম ১১০ টাকা। এইডাতো ওই কুত্তারবাচ্চারার চোখে পড়েনা। ওরা কামড়া-কামড়ি করে আর মরি আমরা।’ মিরপুরের লালকুঠিতে হযরত শাহ আলী কেজি স্কুলের পিছনের সড়কের বাসিন্দারা রাজনীতি নাম শুনেই এভাবেই গালির ঝড় তুলে তেড়ে আসেন প্রতিবেদকের দিকে। স্থানীয় ব্যবসায়ী এরফান ও ইকবালের হস্তক্ষেপে তারা শান্ত হন। বিএনপি – আওয়ামী লীগ নামেই তাদের মধ্যে বিতৃষ্ণা। পত্রিকায় লেকার ফলে আদৌ যদি কিছু হয় তাই, এখানের প্রথম কলোনী, ২য় কলোনী ও লালকুঠি বাজার সংলগ্ন বাসিন্দারা বিগত নির্বাচনের মত এবারও না ভোট দেয়ার সুযোগ রাখার দাবি জানান তারা।

তাদের এই ক্ষীপ্ত হবার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। বিশেষ কারো প্রতি কোনো অভিযাগ তাদের নেই। কিন্তু ঢাকা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন না হওয়ায়, স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর না থাকার কারণে প্রতিটি সড়কের দুপাশে জমে থাকা ময়লা-আবর্জনার স্তুপ ও দুর্গন্ধ, বাজারের মূল্য বৃদ্ধি এবং অহরহ ছিনতাইয়ের ঘটনায় অতিষ্ট এই ঢাকা ১৫ আসনের বাসিন্দারা। স্থানীয় সাংসদ আসলামুল হক রাস্তাঘাটরে যথেষ্ট উন্নতি করেছেন এটা তারা স্বীকারও করেন। তবে তার সন্ত্রাসী আচরণ নিয়ে ক্ষুব্দ এলাকাবাসী।

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে যতই বাক-বিতণ্ডা চলুক না কেন থেমে নেই মনোনয়োন প্রত্যাশীদের দৌড়ঝাঁপ ও প্রচারণা। নির্বাচন হবেই। সে আজ হোক আর দুই দিন পরে হোক নির্বাচন হবে। এই বিশ্বাসে নেতা-কর্মীদের কমতি নেই। ইতিমধ্যেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অনেক সম্ভাব্য প্রার্থীর পাশাপাশি স্থানীয় ব্যবসায়ী ও সাবেক কাউন্সিলর, চেয়ারম্যানদের মধ্যেই এলাকায় জোড় প্রচারণা চালাতে দেখা গেছে।

সম্প্রতী দুই নেত্রী শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার মধ্যের নির্বাচন বিষয়ে আলোচনার সম্ভাবনাটাও তাদের এই বিশ্বাসকে আরো শক্তিশালী করেছে। বেশির ভাগ নেতা-কর্মী এমনকি সাধারণ মানুষও এখন আশাবাদী নির্বাচন হবে।

স্বাভাবিক কারণেই এখন আগামি নির্বাচন বিষয়ে কথা বলা যায় ও আমরা নির্বাচন নিয়ে নিয়মিত প্রতিবেদন তেরির কাজ শুরু করতে পারি।

সে লক্ষ্যে সাহিত্য বাজার প্রথমেই রাজধানীর মিরপুরে ঢাকা ১৪, ১৫ ও ১৬ আসনের চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। এই আসনগুলো বর্তমানে একচেটিয়া আওয়ামী লীগের দখলে রয়েছে। বিগত নির্বাচনে এখানে আওয়ামী লীগের প্রার্থী যথাক্রমে কামাল আহমেদ মজুমদার, আসলামুল হক ও আলহাজ্ব ইলিয়াস মোল্লা সাংসদ নির্বাচিত হয়েছেন। এর আগে এই আসনগুলো একত্রে ঢাকা-১৪ হিসেবে পরিচিত ছিল এবং বিএনপির দখলে ছিল। এস এ খালেক ২ বার ও তারপুত্র এস এম মহসিন ১ বার এই আসনে সাংসদ নির্বাচিত হয়েছেন।

বিগত ১/১১ সরকারের আমলে এই আসনকে ভেঙ্গে ৩টি আসন করা হলে ঢাকা ১৪ মিরপুর-কাফরুল ও ক্যান্টনমেন্ট এর কিছু অংশ নিয়ে কামল মুজুমদার, ঢাকা ১৫ গাবতলি, বাগবাড়ি, হরিরামপুর, লালকুঠি, ১ম ও ২য় কলোনী, মিরপুর ১ পরোটা ও ২ এর পূর্বমনিপুর, বড়বাগসহ ৭নং ওয়ার্ড এর কিছু অংশ নিয়ে আসলামুল হক এবং ঢাকা ১৬ তে ২,৩,৫ ও ৬ নং ওয়ার্ড অর্থাৎ আলোকদি, দুয়ারীপাড়া, রুপনগর, এভিনিউ ফাইভ ৬নং শেকশন ও ৭ নং শেকমনের কিছু অংশ নিয়ে আলহাজ্ব ইলিয়াস মোল্লা নির্বাচিত হয়েছেন।

ইতোমধ্যেই এখানের প্রায় সব আসনেই আগামি নির্বাচনকে ঘীরে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের দৌড়ঝাঁপ ও প্রচারণা শুরু হয়েছে। এখানে বিএনপিতে সাবেক কমিশনার ও বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা মুন্সি বজলুর বাসিত আঞ্জু, সাবেক কমিশনার আহসানউল্লাহ হাসান, যুবদলের উত্তরের সভাপতি মামুন হাসান, স্বেচ্ছাসেবকদলের নেতা ইয়াছিন আলী – এর প্রচারণা যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিষ্টার রফিকুল ইসলামের প্রচারণা। আরো আছেন বিএনপির মিরপুর থানা সভাপতি দেলোয়ার হোসেন দুলু।

অন্যদিকে মিরপুর থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি আমীর হোসেন মোল্লা, কাফরুল কামাল মজুমদার এমপি, পল্লবীর ইলিয়াস মোল্লা এমপি ও শাহআলীতে আসলামুল হক এবং সাংগঠনিক সম্পাদক ফকির মহিউদ্দিন আহম্মদ ছাড়াও একাধিক প্রার্থীর প্রচারণা দেখা যায়। এখান জাতীয় পার্টির পক্ষে কেন্দ্রিয় সাংগঠনিক সম্পাদক আমানত হোসেন আমানতের প্রচারনা চারাচ্ছেন।

আওয়ামী লীগের প্রায় সব নেতাদের উপস্থিতিতে মিশিল সমাবেশ হতে দেখা গেলেও বিএনপি এখানে নেতৃত্বহীন বলতে হবে। অনেক খুঁজেও বিএনপির কোনো নেতাকে ফোনে বা ঘরে পাওয়া গেল না। তাদের বেশিরভাগই পলাতক রয়েছেন। মুধু মাত্র ব্যানার আর পোস্টার ব্যবহার করে দূর থেকে তারা প্রচারণা চালাচ্ছেন। বিএনপির একসময়ের জাদরেল নেতা হিসেবে খ্যাত সাবেক কমিশনার আহসানউল্লাহ হাসান বিগত তত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে চাপে পড়ে সংস্কারপন্থি হওয়ার অপরাধে এখনো তিনি দলীয় সাঁজা পাচ্ছেন। অথচ এখানে এই মিরপুরে বিএনপির ভিত্তি শক্তিশালী করতে তার এবং জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধাদলের সাবেক সভাপতি ফকীর কবির আহমেদ-এর অবদানই সবচেয়ে বেশি বলে মনে করেন এলাকাবাসী। এই প্রতিবেদন তৈরিকালে (২৩ অক্টোবর দুপুরে) কমিশনার হাসানকে তত্বাবধায়ক আমলে দায়েরকৃত মামলায় পুনরায় গ্রেফতার করা হয়েছে বলে জানান তার পরিবার। অন্যদিকে ৭নং শেকসনের বিএনপির নেতা জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধাদলের সাবেক সভাপতি ফকীর কবির আহমেদকে হামলা মামলায় জড়িয়ে এতটাই হেস্তনেস্ত করা হয়েছে যে সে এখন কোন দলের লোক আওয়ামী লীগ না বিএনপি তাও বোঝা কষ্টকর বলে জানালেন মিরপুর মিল্কভিটা অঞ্চলের অনেকে।

আলহাজ্ব ফকির মহিউদ্দিন আহম্মেদ

আমাদের নেত্রী বলেছেন, ধর্ম যার যার, দেশ সবার। আমরা স্বাধীনতার স্বপক্ষে ধর্ম নিরপেক্ষ একটা দেশ চাই, তাই সত্যিকারের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা নৌকায় ভোট চেয়ে প্রচারণা চালাচ্ছি। আমদের মধ্যে অন্তত কোনো দ্বিধা নেই। আমরা বিশ্বাস করি বিএনপি শেষ মূহুর্তে নির্বাচনে আসবেই। কাফরুল ও পল্লবী দুই আসনের জন্যই মনোনয়ন প্রত্যাশী আলহাজ্ব ফকির মহিউদ্দিন এভাবেই নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন।

একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, আর কোনো উপায় নেই, এইবার একবার অন্তত শেখ হাসিনার উপর আস্থা আনতেই হবে। আওয়ামী লীগ দেখাবে নিরপেক্ষ নির্বাচন তাদের দ্বারা হয় কি না। যদি না হয়, তাহলে আন্দোলনের পথতো খোলা্ আছে। জনগণতো আর অত বোকা নাই। তারা ভালো-মন্দটা বোঝে। বিগত সাড়ে চার বছরে আমাদের আওয়ামী লীগের এমপিদের অন্তত এই মিরপুরের তিনজন এমপির কোনো দুর্বল পয়েন্ট নাই। তাদের বরেুদ্ধে কোনো অভিযোগ কেউ প্রমাণ করতে পারবে না। দল যদি পুনরায় তাদের মনোনয়ন দেয়, তাহলে আমাদের কাজ হবে তাদের জন্য কাজ করা। এখানে দলীয় সিদ্ধান্তই সব। আমি কাফরুল ও পল্লবী আসনের জন্য মনোনয়ন চাইবো। কারণ বিএনপির এই দুই আসনে শক্তিশালী কোনো প্রার্থী নাই। দুই দলের মানুষের কাছেই এখানে আমার গ্রহণযোগ্যতা বেশি। সাবেক কমিশনার আলী আসাধ মনোনয়ন প্রত্যাশী নন, যার সম্ভাবনা আছে তিনি ব্যরিষ্টার রফিকুল, এখানের স্থানীয় নয়। আর মিরপুরবাসী স্থানীয় ছাড়া কাউকে এই আসনে পছন্দ করে না, তার প্রমাণ রফিকুল সাহেব আগেও পেয়েছেন।

এখানের বাসিন্দা চা দোকানদার থেকে শুরু করে ব্যবসায়ী ও বাড়ির মালিকদের কাছে বর্তমান শাসনামলটা আগের তুলনায় অনেক ভালো বলে দাবি করলেও প্রত্যেকের চোখে মুখে বিরক্তি। দূর, বাদ দেন তো ভাই। এ দেশে রাজনীতি আছে নাকি?

এই একটাই কথা সকলের মুখে মুখে। এখানের বেনারশী পল্লি ও এভিনিউ ফইভ এলাকায় রায়েছে প্রায় ৪০ হাজার অবাঙ্গালী সম্প্রদায়। যাদের বেশিরভাগই এখন জন্মসূত্রে বাংলাদেশের নাগরিক। তাদের অনেকের কাছে আলহাজ্ব ফকির মহিউদ্দিন বেশ জনপ্রিয়। অন্যদিকে ইলিয়াস এমপিকে নিয়েও তাদের কোনো দ্বিধা দন্ধ নেই। বিগত সময়ের চেয়ে তারা এখন ভালো আছেন বলেই দাবি। তবে রাজনৈতিক এই অস্থিরতা তারা চান না। এতে তাদের জীবন যাপনে কষ্ট বাড়ছে বলে অভিযোগ।

রুপনগর এলাকার বাসিন্দা ও থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাত্তার মোল্লা ও অন্যান্যদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এখানে মোল্লা পরিবারের ভোট ব্যাংক হিসেবে প্রায় ৪০ হাজার ভোট রয়েছে। হারুনাবাদের হারুন মোল্লা বস্তি, আরোকদি গ্রাম এবং লালমাটিয়া বেরিবাঁধ এলাকায় এসব ভোট রয়েছে। ইলিয়াম মোল্লার সবচেয়ে ভালো দিক যেটা, সেটা হচ্ছে অভিযোগ পাওয়া মাত্র সে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। তাই এখানে আগামিতে তার সম্ভাবনাই বেশি বলে দাবি সাত্তার মোল্লার। তবে তিনি জানান, হাউজিং ও সেটেলমেন্ট-এর জমি সংক্রান্ত ঝামেলায় পুনর্বাসনে ক্ষতিগ্রস্তদের নিয়ে এমপি সাহেব ঝামেলায় আসেন। এই ক্ষতিপূরণটার নিশ্চয়তা পেলে এখানে আওয়ামী লীগের অবস্থান আরো শক্তিশালী হবে। বাজেট না থাকায় কিছু রাস্তাঘাট নির্মাণের কাজ অসমাপ্ত রয়েছে। তবে আগামি নভেম্বরের মধ্যেই তা সম্পন্ন হবে বলে এমপি ইলিয়াস মোল্লার পক্ষে তিনি এটা জানান।

(ঢাকা-১৬ আসেনের এমপি ইলিয়াস মোল্লার বক্তব্য আসছে…)

Print Friendly, PDF & Email

Sharing is caring!