ধর্ম, সংবিধান ও চার বন্ধুর গল্প

সাহিত্য বাজার

Religiosমোঃ ইয়াসীর আরাফাত আহঞ্জী
‘পরম করুনাময় সৃষ্টিকর্তার নামে শুরু করছি’ (বিসমিল্লাহি রাহ-মানীর রহিম)। হে জ্ঞান অর্জনকারীগণ, আমাদের মধ্যে ও তোমাদের মধ্যে যে বাক্যে সুসাদৃশ্য রয়েছে, সে বিষয়ের প্রতি দেখ। যেন আমরা সর্বশক্তিমান সৃষ্টিকর্তা বা আল্লাহ ব্যতিত কারও ইবাদত না করি। তাঁর সঙ্গে কারো তুলনা না করি।- সূরা আল ইমরান, আয়াত-৬৪
পবিত্র কোরআনের এই আয়াতটি দিয়েই এ লেখার সূচনা করলাম কারণ এই আয়াতটির বক্তব্য সব ধর্ম গ্রন্থেই এক ও অভিন্ন এবং এ রচনাটির সাথে খুবই সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে তার আগে একটা ঘটনার কথা বলছি।
আরিফ, পাপন, রিপন ও লিটন পরস্পর খুবই ঘনিষ্ট বন্ধু।শৈশবকাল থেকে কক্সবাজার জেলায় পাশাপাশি গ্রামে তাদের বেড়ে ওঠা, স্কুল, কলেজ, খেলা-ধূলা, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি সবকিছুই তারা একসাথে করেছে। এমন কি বিশ্ব বিদ্যালয় থেকে পাস করে কর্মক্ষেত্রে যোগ দেয়ার পরও তাদের দুরত্ব ঘটেনি। চারজন নারীকে বিয়ে করে তারা কাছাকাছি পাশাপাশি এলাকা বা ফ্লাটে বাসা ভাড়া করে থাকছে এখন। একে অপরের দুঃখ-কষ্ট, হাসি আনন্দ সবকিছুর সমান বন্টন এই বন্ধুত্বে খুঁজে পাওয়া যায়।
সপ্তাহে ১টা দিন এই বন্ধুদের দীর্ঘ আড্ডার জন্য ধার্য করে দিয়েছেন তাদের স্ত্রী-গণ। একদিন রিপনের বাসায় তো অন্যদিন লিটনের বা পাপনের বাসায় জমে এই আড্ডা। তাই বলে তাদের প্রার্থনা বা ধর্মীয় রীতি নীতির পালন কোনোটাতেই কিন্তু বৃশৃংখলা হয় না। তারা প্রত্যেকেই উপরের ঐ আয়াতের অনুসরণ করে আসছে কৈশরকাল থেকে। তাই প্রার্থনা, খাওয়া – দাওয়ার ফাঁকে এ আড্ডা চলে রাত ১০টা পর্যন্ত।
এমনই এক আড্ডায় হঠাৎ করেই লিটন আর রিপনের মধ্যে বাংলাদেশের বর্তমান সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহি রাহ-মানির রাহিম’ রাখা না রাখা নিয়ে তর্ক শুরু হয়ে যায়। তর্ক-বিতর্ক হতেই পারে, এটা স্বাভাবিক। কিন্তু এই তর্ক যখন ছড়িয়ে পরে ও আরিপ-লিটন এবং পাপন-রিপন গ্রুপ হয়ে যায়, তখন বিষয়টি আর স্বাভাবিক থাকেনা। পরিস্থিতি এমন হয়ে যায় যে, তারা একে অপরকে ‘তুই আওয়ামী লীগ হয়ে গেছস’ বা ‘তুই বিএনপি হয়ে গেছস’ বলে পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
ভাবছেন এটা কি করে সম্ভব? বাল্য বন্ধুদের মাঝে সংবিধান কেন আসবে? আর এতে বন্ধুত্বই বা কেন নষ্ট হবে? এখানেই কবিরা নিরব। যেখানে বাংলাদেশের ওলামা একরাম, থানা-পুলিশ, প্রশাসন, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সবাই দুভাগে বিভক্ত হয়ে আছে, সেখানে এই বন্ধুরা কি আর করবে? মানুষতো!
দ্বন্ধের শুরুটা লিটনকে দিয়ে। তার আগে পাঠকের কাছে জানতে চাই, আপনারা কেউ কি এই বন্ধুদের নাম পড়ে খুঁজে বের করতে পারেন তারা কে কোন ধর্মের অনুসারী?
পারবেন না।
কারণ নামে কিছু আসে যায় না। আরিপ নামটা শুনে মুসলমান গন্ধ পেলেও সে কিন্তু আরিপ বড়ুয়া, অর্থাৎ বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী সে। পাপন অধিকারী জন্মসূত্রে নিজেকে খ্রিস্টান দাবি করেন, একই দাবি সনাতন ধর্মের অনুসারী রিপন বিশ্বাস ও জন্মসূত্রে মুসলমান লিটন আহমেদ-এর।
এবার বুঝুন তাদের ধর্মীয় চেতনা কতটা প্রবল যে শিশুবেলা থেকে যে যার ধর্মের অনুশাসন পালন করেও তাদের বন্ধুত্ব ছিল অটুট। তারা পবিত্র কোরআনের ঐ আয়াতটির সাথে আরও একটি হাদিস যুক্ত করে সবসময় পালন করে আসছিল। সেটি হচ্ছে, বুখারী শরীফের ঈমান অধ্যায়ে উল্লেখিত নবীজীর একটি কথা, যেখানে নবীজী বলেছেন, “কসম আল্লাহর, ঐ ব্যক্তি মুসলমান নয়, যার হাত ও জিহ্বা থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ নয়।”
তাই এই বন্ধু চারজন সবসময় তাদের আচারণ ও কথাবার্তায় সতর্ক থাকতেন, যাতে তার কথায় অন্য বন্ধু আহত না হয়। কিন্তু বাংলাদেশের সংবিধান প্রসঙ্গে তাদের আলোচনায় দ্বন্ধটা এসেই গেল। কেন? কেন তারা এখানে সতর্ক হতে পারলেন না।
চার ধর্মের অনুসারী চারবন্ধুর মধ্যে লিটন এখানে সংখ্যাগরিষ্টদের দলে। তাই লিটন আহমেদ ও রিপন বিশ্বাস যখন সংবিধান নিয়ে তর্ক করছে ও রিপন বলছে, পৃথিবীর কোন্ দেশের সংবিধান আছে, যেখানে ধর্মকে প্রধান্য দেয়া হয়েছে? কেন বিসমিল্রাহ শব্দটি সংবিধানে রাখতে হবে? কোন যুক্তিতে?
লিটন বলছে, এতে ক্ষতিটা কোথায়? এর বাংলাতো তুমি আমি পাপান, আরিপ সবাই জানি এবং আমরা যেকোনো কাজ শুরুর আগে সর্বশক্তিমান আল্লাহর নামে শুরু করছি-এটা বলিও। তোরাওতো বলিস, তাহলে?
রিপনের দাবি : ঠিক আছে তাহলে এটা বাংলায় দেয়া হোক। তানা করে কেন এটা রাখা হল। এতে করে ৫ ভাগ বা ১০ ভাগ যে অন্য সম্প্রদায়ের মানুষ রয়েছে তাদের অবহেলা করা হলো না? আর এটা করেই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর হামলা-নির্যাতনটা বৈধ করা হলনা?
লিটন একটু ক্ষীপ্ত স্বরে এতে বাঁধা দিল, একেতো ওদের চারজনের পূর্ব শর্ত রয়েছে যে ওরা কাউকে সংখ্যালঘু বলবে না। কারণ ওদের মতে, সত্যিকারের ভালো মানুষেরাই এ দেশে সংখ্যালঘু। ২য়ত, বিসমিল্রাহ আরবী শব্দ হওয়ায় রিপনের যত দ্বিধা বলে ভাবল লিটন। তাই সে বলল, এটা তুই কেমন কথা বললি? আরবী শব্দ বলে? তাহলেতো এই আইনও করতে হবে যে এ দেশে ‘গুড মর্নি, গুড নাইট, স্যার,’ এ শব্দগুলোর ব্যবহারও বন্ধ করে দিতে হবে।
এতে রিপন নয় ক্ষেপে গেল পাপন অধিকারী। ওই সালা গর্দভ। ইংরাজী আর আরবী সমস্যা না। সমস্যা হচ্ছে ‘বিসমিল্রাহ’ পবিত্র কোরআনের নিজস্ব শব্দ, যাঁ একটা দেশের সংবিধানে ব্যবহার করা মানে ঐ দেশটার সবকিছু মুসলিম আইন অনুযায়ী হবে বা হতে পারবে এটা ঘোষণা করে দেয়া। তুই তো আমাদের উপাসনালয়ে গেছস, বাহিরে পুলিশ প্রহরা রেখে আমরা প্রার্থনা করি। কেন? তোদের ঈদ বা ধর্মীয় উৎসবে কি কোনো পুলিশ প্রহরা দেয়। আমেরিকা বা ব্রিটেনে কোথাও কি মুসলমানরা এভাবে পুলিশী প্রহরায় থাকে?
লিটন চুপ হয়ে যায়, উত্তর যে জানা নাই ওর। এবার মুখ খোলে আরিপ বড়ুয়া, ওরা পুলিশ প্রহরাটা তোমার আমার মত ঢাকঢোল পিটিয়ে দেয় না। দেয়তো অবশ্যই। তবে গোপনে, গোয়েন্দা পদ্ধতীতে। যে আমরা জানিনা। সবদেশে, সবসময়ই সংখ্যায় কম যারা তারা নির্যাতনের স্বীকার হয়ে আসছে, ভবিষ্যতেও হবে। এটা দূর করতে হলে আমাদের আসলে প্রকৃতই ধর্মীয় অনুশাসনে যেতে হবে। ধর্মীয় অনুশাসনই একমাত্র আইন, যেখানে সবধর্মের সহ অবস্থান ও সমান অধিকার নিশ্চিত করছে।
আরিপের কথায় ক্ষেপে যায় রিপন-পাপন দুজনেই। কারণ ওরা দুজনেই মালয়েশিয়া, আমেরিকা ও কানাডায় ভ্রমণ করে এসেছে। সেখানে নাকি ওরা দেখেছে যে, মালয়েশিয়ার মুসলমানরা মাইকে আযান দেয় না। অপরের ডিস্ট্রাব হবে ভেবে জোরে আযান দেয়াটাকেও ওরা ক্ষতিকর মনে করে। এমনকি সয়ং সৌদি আরবেও আমাদের দেশের মত এত ঘন ঘন মসজিদ নেই। সেখানে একটা মসজিদের আযান যতটা দূরে শোনা যাবে, সেই গণ্ডির মধ্যে কোনো ২য় মসজিদ নির্মাণ হবে না বলে আইনও নাকি রয়েছে।
এই জায়গায় আরিপের ধর্মীয় অনুভুতি খুব চাঙ্গা হয়ে ওঠে। ছি: তোরা শেষ পর্যন্ত আযান দেয়া নিয়েও কথা বলতে শুরু করলি? এটা ঠিক না। চব্বিশ ঘণ্টায় মাত্র পাঁচবার আযান হয়। এটা কোনো সমস্যা না।
লিটন আহমেদ অবশ্য এখানে ওদের পক্ষে যুক্তি দেয়, না, এটা আসলে সমস্যাই বলতে হবে, একসাথে অসংখ্য মসজিদে যখন আযান হয়, তখন কিছুতো বোঝা যায়-ই না, বরং শুনতে খুব বিশ্রী লাগে। আমাদের ওঁলামা একরামদের উচিত হবে এ বিষয়ে কিছু পদক্ষেপ নেয়া।
তার আগে আসো আমরা সংবিধান বিষয়ে একটা সমাধানে পৌঁছাই। কাল-ই আমরা চারজনে সরকারের কাছে লেখিত আবেদন জানাই যে, আমাদের দেশের সংবিধানে হয় বিসল্লিাহ থাকবে না, আর যদি রাখতেই হয়, সেটা বাংলায় থাকবে। এবং এর নীচেই সব ধর্মের গ্রন্থ থেকে বাংলা উদ্বৃতি থাকবে। যদিও আমার এখনো বিশ্বাস যে, এটা আসলে সমস্যা না, সমস্যা সবসময় নোংরা রাজনীতি তৈরি করছে। বাণিয়ারচঙের চার্চে, নারায়ণগঞ্জের চার্চে বা গৌরনদীতে বোমা হামলার বিচারগুলো হয়ে গেলে আজ এই পুলিশ প্রহরার প্রসঙ্গ আসতোই না।ঐসব বোমা হামলার সাথে সয়ং রাজনীতিবিদরা জড়িত বলেই বিচার হয় নাই। আর তাই তোমাদের মনে হচ্ছে সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহ’ থাকায় এই সমস্যা তৈরি হয়েছে। যদিও বঙ্গবন্ধু বা জিয়াউর রহমানের সময় কিন্তু এইসব হামলা ককনোই হয় নাই।

Print Friendly