তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ : একজন আবৃত্তি শিল্পীর দুর্বিসহ জীবনকথা

সাহিত্য বাজার

tarik
তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ। আবৃত্তি অঙ্গনের অতি পরিচিত একটি নাম। যে নামের সাথে মিশে আশে আবৃত্তির ভাবনা ও বোধের জগৎ।
‘বল বীর, চির উন্নত মম শির… বিদ্রোহী কবি নজরুলের এই বিদ্রোহী কবিতার উচ্চারণ ঢং, আবেগ, অনুভ’তির প্রকাশ তার মত কওে আর কে পেরেছে একালে। কনেঠ যাঁর এমন পৌরুষ নাচে সেই তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদই আজ কিনা অর্থাভাবে একমাত্র মেয়ের পড়াশুনার খরচটিও যোগাতে পারছেন না। শুধু তাই নয়, অর্থাভাবে সুচিকিৎসা বঞ্চিত একজন আবৃত্তিশিল্পী কতটা কষ্টে দিন অতিবাহিত করছেন তা স্বচক্ষে না দেখলে কেউ হয়তো বিশ্বাসই করতে চাইবেন না।
সরজমীনে, তাকে দেখার জন্য আমরা যখন ময়মনসিংহ শহরের কবি শামসুল ফয়েজকে সাথে নিয়ে তার ভাড়াবাসায় পৌঁছলাম তখন রাত্র ৯টা। বয়বৃদ্ধ মানুষটি স্ত্রী ও কন্যা নিয়ে যে ঘরটিতে থাকেন সেটি খুবই ছোট তবে বেশ সাজানো গোঁছানো ও পরিচ্ছন্ন। দুরুমের কক্ষে কোনোভাবে রাত্রিযাপন বলে হাসলেন তিনি। দিনের বেশিরভাগ সময়টাতো কেটে যায় পথে ঘাটে পরিচিতজনদেও কাছে ধার (টাকা) খুঁজতে খুঁজতে। আমাদের কাছে পেয়ে, কী খাওয়াবেন, কোথায় বসাবেন এই নিয়ে ব্যস্ত হয়ে ওঠেন তিনজনে। তাঁর সহধর্মিনী ও মেয়ে সংহিতা বহ্নি নাস্তার আয়োজনে ব্যস্ত হলে তিনি মগ্ন হন আবৃত্তি নিয়ে। বিদ্রোহী আবৃত্তি শেষে কবি শামসুল ফয়েজের অনুরোধে তিনি যখন তালেব মাস্টার আবৃত্তির সূচনা করেন…

তাল সোনাপুরের তালেব মাস্টার আমি …
মাপ করবেন, নাম শুনেই চিনবেন
এমন কথা কেমন করে বলি,
তবু যখন ঝাড়তে বসি, স্মৃতির থলি,
মনে পড়ে, অনেক অনেক কচি মুখ, চপল চোখ
তাদের মধ্যে অনেকেই এখন নাম করা লোক
তাল সোনাপুরের তালেব মাস্টারকে না-ও চিনতে পারেন
তবে, তাদের কিন্তু নাম শুনেই চিনবেন।…

চমকে উঠলাম আমরা। এ যেন তার নিজেরই কথা আবৃত্তির ছলে তুলে ধরছেন তিনি। প্রতিবেদন করার ইচ্ছে শক্তি দুটোই হারিয়ে ফেললাম। আমাদের চা দিতে এসে তাঁর মেয়ে জানালেনÑ বাবাকে নিয়ে আমার একটা লেখা আছে। আমার দীর্ঘদিনের স্বপ্ন আমার বাবাকে নিয়ে আমি লিখব।
তারিক বাবু হেসে উঠে বললেন, আমার এই একটাই সন্তান। ওর নাম সংহিতা বহ্নি। খাটি বাংলা নাম রেখেছি যার অর্থ জ্ঞানের আগুন। আমাদের ছেলে আর মেয়ে দুটোই ভূমিকা পালন করে ও একা। হাট বাজার সব করে। শুধু যদি ওর লেখাপড়াটা চালিয়ে যেতে পারতাম। উচ্চ মাধ্যমিকে ভালো রেজাল্ট করেও ঘরে বসে আছে ও এখন।
কথা প্রসঙ্গেই জানতে পারলাম অনেক বড় মাপের মানুষদের সাথে বন্ধুত্ব তাঁর। ওঠাবসাও ছিল বড় বড় সাংস্কৃতিক নেতাদের সাথে। সকলেই তার জন্য অল্প বিস্তর সাহায্যের হাত বাড়িয়েছিলেন শুনে খুব ভালো লাগলো। অনেকটা সময় আলাপ শেষে আমরা যখন বিদায় নেব ঠিক তখন আবৃত্তি তাত্ত্বিক তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ অনুরোধ জানালেন ঢাকায় অবস্থানরত কবি আসাধ চৌধুরী, সাহিত্যিক আতা সরকার, নাট্যব্যক্তিত্ব আসাদুজ্জামান নূও এমপি এবং আবৃত্তি শিল্পী কামরুল হাসান মঞ্জু এই চারজনের কাছে যেন তাঁর তাঁর কথা বলি, তাঁর দুরাবস্থার কথা বলি। অতীতে এরা তাকে অনেক সাহায্য করেছেন, হয়তো আগামীতেও করবেন এই প্রত্যাশা তাঁর।
আমাদের চেষ্টায় কোনো ত্রুটি ছিলনা। মূল লেখাটা কবি শামসুল ফয়েজ লিখবেন বলে কথা দিলেন। কবি আসাধ চৌধুরী জানালেন, তাঁর হাতে সময় নেই, আতা সরকার জানালেন, তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ এতো বড় মাপের একজন মানুষ যে তাকে নিয়ে ছোটো পরিসরে কিছু করা তাকে অপমান করার মতই হবে। আর আবৃত্তিকার কামরুল হাসান মঞ্জু ও আসাদুজ্জাসান নূর এমপি অনেক ব্যস্ত মানুষ এখন। তবু তারা আশ্বাস দিলেন ময়মনসিংহে যেয়ে তারিক সারাউদ্দিন মাহমুদকে দেখে আসবেন তারা। তাঁর মেয়ে সংহিতা বহ্নি বাবাকে নিয়ে যে লেখাটি লিখেছেন আমরা সেটাই হুবহু তুলে ধরলাম।

tarik 3

আমার চোখে আমার বাবা
সংহিতা বহ্নি

তারিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ আমার বাবা। আমার বাবাকে আমি কখনো সুস্থ-সবল অবস্থায় দেখিনি, আজও নয়। কেবল দেখি অসুস্থ অবস্থাতেও সবসময় আবৃত্তি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে যাচ্ছেন। তাঁর একটাই লক্ষ্য মানুষকে আবৃত্তি দিয়ে সচেতন করে তুলবেন। শুনেছি দুই বাংলায় (বাংলাদেশ ও কলকাতা) আমার বাবার আবৃত্তির চিন্তা ধারা অনুসরণ করে আবৃত্তি করা হয়। তাতে আমি অনেক গর্ববোধ করি এমন বাবার সন্তান বলে। যখন শুনি আমার বাবাকে নিয়ে মানুষ আলোচনা করেন, বাবাকে সম্মান দেয় তখন যে আমার কতটা আনন্দ লাগে তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।
আমার বাবা ছোটবেলায় খুবই দুষ্ট প্রকৃতির ছিলেন এবং লেখাপড়ায় একদম মনোযোগ ছিল না। খুব অল্প বয়সে আমার বাবা তাঁর মাকে হারান। ফলে মায়ের আদর, স্নেহ, মায়া, মমতা, ভালবাসা থেকে বঞ্চিত ছিলেন। পরে বাবা একসময় লেখাপড়ায় খুব ভাল ছাত্র হয়ে উঠেন। ১৯৬২ সালে মেট্রিক ও ১৯৬৪ সালে আই.এ পাশ করেন বাবা। ১৯৬৭ সালে বি.এ পাশ করার পর তিনি এলেন ঢাকার উদ্দেশ্যে লম্প্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬৯ সালে বাংলায় এম.এ ডিগ্রী লাভ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, ড. নীলিমা ইব্রাহিম, মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী বাবাকে পছন্দ করতেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালীন সময়ে আবৃত্তি প্রতিযোগিতায় তিনি প্রথম স্থান অধিকার করেন। পরপর ছয়টা হলেই প্রথম হলেন আমার বাবা। সম্বত আজও সে রেকর্ড কেউ ভাঙ্গতে পারে নি। তারপর এম.এ ডিগ্রী লাভ করার পরই তিনি আবার ফিরে আসেন ব্রহ্মপুত্রের তীরে। আমার বাবা জীবনের প্রায় প্রতিটি আবৃত্তি প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান লাভ করেন।

১৯৭০ সালে তিনি ময়মনসিংহের গৌরীপুর কলেজে প্রথম কর্মজীবন শুরু করেন। বাবা কর্মজীবনে প্রবেশ করলেও তাঁর ধ্যান-জ্ঞান ছিল আবৃত্তিকে ঘিরে। আবৃত্তিকে তিনি এক মুহুর্তের জন্যও ভোলেন নি। গৌরীপুর কলেজে চার বছর কাটানোর পর ১৯৭৪ সালে তিনি ময়মনসিংহ শহরের মিন্টু কলেজে আধ্যাপনা শুরু করেন (তৎকালীন মিন্টু কলেজের অধ্যক্ষের আমন্ত্রণে)। মিন্টু কলেজে অধ্যাপনা কালীন সময়ের দুই বছরের মাথায় আমার বাবা আক্রান্ত হন মস্তিস্কের গুরুত্বর ব্যাধিতে। বাবার মাথার নার্ভ সিস্টেমের পতন হল। চরম একটি কঠিন অবস্থায় তিনি দিনযাপন করছিলেন। দিন রাত তিনি চিৎকার করতেন। কোন কাজেই তিনি মন বসাতে পারতেন না।  বাবার এই কষ্টকর জীবন ও দুরবস্থা দেখেও অধ্যক্ষ বাবাকে তাঁর কলেজে আর বেশি দিন রাখতে পারলেন না। তখন বাবাকে সান্তনা দিয়ে কলেজ থেকে অব্যহতি দিলেন। এরপর শুরু হয় বাবার কঠিন আর ভয়াবহ এ জীবন। জীবন সংগ্রামে টিকে থাকার জন্য বাবা পরিচিত সবার কাছে গেলেন। মাইলের পর মাইল হেঁটে বেড়াতেন শুধু টাকার জন্য।
এরপর ১৯৮২ সালে ডাঃ জাফরুল্লাহর প্রতিষ্ঠান গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে বাবা চাকুরী পান। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে বাবা সাংবাদিকতা বিভাগে চাকরি করতেন। আর সেখানেই আমার মায়ের সাথে বাবার পরিচয় হয়। মা সেখানে শিক্ষকতা করতেন। সেখানকার সবার মুখে মা আমার বাবার সব কথা শুনতে পান। এইসব কথা শুনার পর আমার মা জীবনের চরম ও কঠিন সিদ্ধান্ত নেন যেÑ তিনি আমার বাবাকে বিয়ে করবেন। সিদ্ধান্ত ছিল চ্যালেঞ্জের মতো। পৃথিবীতে খুব কম মানুষই আছেন যারা এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে পারে। আমার মার জন্যে এ কারণে তার প্রতি শ্রদ্ধার অন্ত নেই।
তারপর ১৯৮৫ সালে ২৬ নভেম্বর ডাঃ জাফরুল্লাহর নিজ উদ্যোগে আমার মা ও বাবার বিয়ে করান। বিয়ের পরও বাবা দিন-রাত শুধু চিন্তাই করতেন। আমার বাবা আমার মায়ের অক্লান্ত চেষ্টা সেবা আর ভালবাসায় জীবনের নতুন দিশা ফিরে পান এবং ধীরে ধীরে সুস্থ হতে থাকেন। আর এই জন্য মাকে অনেক কষ্ট সহ্য করতে হয়েছে। কিন্তু আমার মা এক পাও পিছু হটেন নি। বরং সেবার মানসিকতা নিয়ে আমার বাবার পাশে থেেেছন এবং এখনও আছেন। আজ যদি আমার মা না থাকতো তাহলে হয়তো আজকের এই তরিক সালাহউদ্দিন মাহমুদ থাকতেন না। আজ একমাত্র আমার মায়ের কারণেই আমার বাবার বেঁচে থাকা। আমার বাবার সব কিছুর পিছনে আমার মায়ের অবদানই সবচেয়ে বেশী।
গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের জীবন শেষ করে মা-বাবা পাড়ি জমান নিজেদের শহর ময়মনসিংহের। ১৯৮৭ সালে বাবা ময়মনহিংহ শহরের মুকুল নিকেতন স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। এখানে দীর্ঘ ১৪টি বছর কাটান। ২০০২ সালে ২রা জুলাই এই স্কুল থেকে বাবা কর্মজীবন শেষ করেন। কিন্তু সকউল থেকে অবসর নিলেও তিনি জীবন থেকে অবসর নেননি। তখন শুরু হয় নতুন আরেক জীবন সংগ্রাম। বাবা যখন অবসর নেন তখন আমার বয়স মাত্র ১০ কি ১১ হবে। বাবা অবসর নেওয়ার পর থেকেই আমাদের দুঃর্বিসহ জীবন শুরু হয়। বাবার এত ব্যয় বহুল চিকিৎসা যার ব্যবস্থা করা আমাদের মতো পরিবারের জন্য খুবই কষ্ট সাধ্য। এত ব্যয় বহুল চিকিৎসা আরো দীর্ঘ সময় ধরে চালাতে হবে। তবে কিছু মানুষ আমার বাবাকে আর্থিকভাবে সাহায্য করেছেন। এর মধ্যে জনাব কামরুল হাসান মনজু, জনাব আসাদুজ্জামান নূর, জনাব আমীর আহমেদ চৌধুর প্রমুখ। এত সব এর মধ্যেও আমার মায়ের অনুপ্রেরণা ও সহযোগিতায় বাবার দুইটি বইও প্রকাশিত হয় এবং আবৃত্তি জগতে বেশ সমাদ্রিত হয়। ২০১০ সালে কবি আসাদ চৌধুরী সাহায্যে শিলালিপি প্রকাশনী থেকে “বস্তুবাদী আবৃত্তিতত্ত্ব” বই প্রকাশ পায়। এই দুইটি বইয়ের জন্য ববা কবি আসাদ চৌধুরী ও আবৃত্তিকার কামরুল হাসান মনজুর প্রতি কৃতজ্ঞচিত্তে তাঁদের কথা স্মরণ করেন।
আমার বাবা একজন প্রখ্যাত আবৃত্তিকার ছিলেন। অথচ দুরারোগ্য ব্যধির কবাল গ্রাসে আজ বাবা নিঃশোষিত। জীবন সংগ্রামে তিনি আজ ক্লান্ত। আজ আমার বাবার কণ্ঠে নেই মাধুর্য্য, নেই আবৃত্তি করার মতো সেই মেজাজ। বাবাপ্রগতিশীল রাজনীতি থেকে শুরু করে খেলাধুলা পর্যন্ত প্রায় সব ক্ষেত্রেই নিজেকে বিকশিত করেছিলেন। কিন্তু আজ এই কঠিন অসুস্থতার জন্য সব কিছু থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছেন। শুধুমাত্র আবৃত্তি থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেননি। এখনও বাবা প্রবল ইচ্ছা শক্তি দিয়ে আবৃত্তি চর্চা চালিয়ে যাচ্ছেন। আবৃত্তি ও আমার বাবা পরস্পর পরিপূরক। একটি ছাড়া আরেকটি যেন অসহায়। আজ জীবনের এই ক্রান্তি লগ্নে আবৃত্তিই বাবার সবকিছু।

Print Friendly