ডিসেম্বর : ক্যালেন্ডার আর নতুন বইয়ে প্রেসপাড়ার ব্যস্ত জীবন

নিজস্ব প্রতিবেদক, সাহিত্য বাজার

DSC01979গড় গড় শব্দে দিনরাত চলছে ছাপাখানার মিশিনগুলো।বাঁধাইখানাতেও তিল ধারণের ঠাঁই নেই কোথাও।কোথাও চলছে নতুন বছরের নতুন ক্যালেন্ডার তৈরির কাজ, কোথাও আবার নতুন বইয়ের ঝকঝকে ছাপা। কাগজের মিষ্টি গন্ধ বইবাজারের আকাশে বাতাশে ভাসছে। ডিসেম্বর মানেই ব্যস্ত ভীষণ বাংলাবাজার বা বইবাজার। যার আরেক নাম প্রেসপাড়া।নতুন বছরের ক্যালেন্ডার, ডায়রী আর নতুন নতুন লেখকের বইয়ের প্রকাশনা নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত ছাপাখানার জীবন।

আধুনিকতার নিকতীর পাল্লা যতই ভারী হোকনা কেন হাতের কাজের প্রয়োজন কখনো থেমে যাবেনা, তারই প্রমাণ এই ছাপাখানা জীবন। একটি ক্যালেন্ডার বা বই তৈরির প্রথম কাজটা আধুনিক কম্পিউটার ও অফসেট প্রেসের বিশাল যন্ত্রটা করতে পারলেও সেটা হাতে নেয়ার মতো দৃষ্টিনন্দন কাজটা কিন্তু হাতেই করতে হচ্ছে। আর এই কাজটি করেন প্রেসপাড়া বা বইবাজারের বাঁধাইখানার শ্রমিকরা।ক্যালেন্ডার বা বইটির ছাপা শেষে প্রথমে এটি চলে যাবে বাঁধাইখানায়। সেখানে এটির লেমিনেশন, সেলাই, পিন, আঠা ও স্পাইরাল বা তার বাঁধাইয়ের কাজ হবে। বইয়ের প্রচ্ছদ যুক্ত হবে।ক্যালেন্ডারটির পৃষ্ঠাগুলো সাজানো হবে। বলা যায়, গ্রহণযোগ্য আসল কাজটাই করতে হবে হাতে। আর এ কাজের ব্যস্ততম মাসটি শুরু হয় এই ডিসেম্বর থেকে।

ডিসেম্বর! একদিকে বিজয়ের উৎসব গাঁথা আনন্দ উল্লাস, অন্যদিকে শোকগাঁথা জীবনের স্মরণীয় ইতিহাস। আবার ডিসেম্বর মানেই পুরাতনকে বাদ দিয়ে নতুন বছরকে বরণ করার মিশ্র একটি অনুভূতি।সব মিলিয়ে ব্যস্ততা, ভীষণ ব্যস্ততার রাজধানীর নগর জীবনে।সারা বছরের হিসেব মিলাতে কর্ম জীবনের ব্যস্ততা যেমন আছে, তেমনি আছে সাংস্কৃতিক ব্যস্ততাও।

জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র আয়োজিত পাক্ষিক বইমেলা, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, আবৃত্তি সমন্বয় পরিষদ এবং বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশানসহ সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর ব্যস্ত কর্মযজ্ঞ এই ডিসেম্বর থেকে শুরু হয়ে একটানা ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত চলবেই। মাঝখানে অল্প ক’টাদিন বিরতী দিয়ে স্বাধীনতা দিবসের আয়োজন, তারপরই আছে বাংলা নববর্ষের নিমন্ত্রণ।

তবে প্রেসপাড়ার ব্যস্ততা সবচেয়ে বেশি। কারণ অমর একুশে বইমেলার মাসব্যাপী আয়োজনের পুরো চাপটাই এই প্রেসপাড়াকে কেন্দ্র করে। নামিদামি প্রকাশনী সংস্থার পাশাপাশি অখ্যাত প্রকাশকদেরও ভিড় এই মেলাকে কেন্দ্র করে। প্রতিবছর অমর একুশে বইমেলাকে কেন্দ্র করে প্রায় ৬০০ প্রকাশনী তাদের বিভিন্ন প্রকাশনা নিয়ে মেলায় অংশগ্রহণ করেন।

২০১৫ এর একুশে বইমেলায় অন্যপ্রকাশ, আগামী প্রকাশন, পাঠক সমাবেশ, ঐতিহ্য প্রমূখরা এবার প্রয়াত হুমায়ুন আহমেদ ছাড়াও হাসান আজিজুল হক, সেলিনা হোসেন, আনিসুল হক ও নাসরীন জাহানের নতুন বইয়ের প্রকাশনা নিয়ে যেমন ব্যস্ত, তেমনি এবার তারা কিছু নতুন লেখকের বইয়ের মুদ্রণও আনছেন একুশের বইমেলায়। নতুন লেখক সৃষ্টিতে প্রকাশকরা চেষ্টা করছেন বলেও জানালেন সৃজনশীল পুস্তক প্রকাশক সমিতির সভাপতি আগামী প্রকাশনীর সত্বাধিকারী ওসমান গণি।

nasrin-jahanঅন্যপ্রকাশ থেকে এ বছর তারা কথাসাহিত্যিক নাসরীন জাহানের তিনটি নাটক নিয়ে একটি বই আসছে বাজারে জানালেন লেখিকা সয়ং। নাসরীন জাহান বলেন, এ বছর কোনো চাপ নিতে রাজী নই আমি, তাই কিছু লিখবোনা বলে ঠিক করেছি। আমি চাই ২০১৫ এর বইমেলাতে নতুন লেখক সৃষ্টি হোক। প্রকাশকরা নতুনদের লেখাকে প্রাধান্য দিক।

এদিকে অন্যপ্রকাশ থেকে এ বছর বেশ ক’টি নতুন লেখকদের বই বাজারে আসবে বলে জানালেও তাদের নাম এখনই বলতে রাজী নন তারা। এটা চমক থাকবে। তবে নতুন প্রকাশনী সংস্থা শিল্পৌষীর সত্বাধিকারী আব্দুস সালাম বইমেলার জন্য আমিনুল হকের হাসির নাটক ‘ফাঁদ’ ও সাহিত্য বাজার সম্পাদক আরিফ আহমেদ এর ‘এই যে শুনুন’ গল্পগ্রন্থের ২য় সংস্করণ বাজারে আনবেন বলে জানালেন। এই যে শুনুন -গল্পগ্রন্থটি মূলত ২০০৬ সালে র‌্যামন পাবলিশার্স এর আলোচিত প্রকাশনার অংশ ছিল।লেখকের ইচ্ছায় ও র‌্যামন পাবলিশার্স এর সত্বাধিকারী রহমতউল্লাহ রাজনের অনুমতিক্রমে শিল্পৌষী এটি ২য় মুদ্রণ করছে বলে জানান রাজন।

40এ বছর প্রকাশকদের একটা বড় অংশ নীলক্ষেত কেন্দ্রিক ছাপাখানাগুলোতে ভিড় করছেন বলে জানান রহিম বাঁধাইখানার সত্বাধিকারী আব্দুর রহিম। এখানে ছাপারমান বাংলাবাজার বা আরামবাগের তুলনায় অনেক ভালো বলে দাবি করেন শ্রাবণ প্রকাশনীর সত্বাধিকারী রবিন আহসান। ম্যাগনাম ওপাসের আনোয়ার ফরিদী, পাঠকসমাবেশের শহিদুল ইসলাম বীজু কাটবন ও হাতিরপুলের প্রেসপাড়া ও বাঁধাইখানার উপর নির্ভরশীল। এমনকি অন্যপ্রকাশের বেশকিছু বইয়ের কাজও চলছে এখানের ছাপাখানায়।

তবে বাঁধাইখানার খরচ এ বছর অনেক বেশি বলে অভিযোগ প্রকাশকদের। একটি ৬০ বা ৮০ পৃষ্ঠার বইয়ে শুধু বাঁধাইয়ের পিছনেই খরচ হচ্ছে ২০ থেকে ২৫ টাকা। যা গতবারের তুলনায় ৭/৮ টাকা বেশি। রহিমমিয়া বলেন, খরচতো বেশি পড়বেই। গতবারের তুলনায় বাজারে সবকিছুরই মূল্য অনেক বেশি। সরকার যদি পুনরায় বিদুৎ বা গ্যাসের বিল বৃদ্ধি করে তাহলে এ খরচ আরো বেড়ে যাবে।

 

Print Friendly