জিতলেন দুই নেত্রী, হারলো বাংলাদেশ

আরিফ আহমেদ

জিতলেন দুই নেত্রী, হারলো বাংলাদেশ

ভবিষ্যতে কোনোদিন কি তাদের এভাবে আর দেখতে পাবে জাতি?

ভবিষ্যতে কোনোদিন কি তাদের এভাবে আর দেখতে পাবে জাতি?

অবশেষে বাংলাদেশের চলমান সহিংসতার আন্দোলন, অবরোধ ও দাবী না মানার লড়াইয়ে দুই নেত্রী যার যার অবস্থানে অনড় থেকে জিতে গেলেন। আর তাদের এ গোঁয়ার্তুমিতে পুরো মাত্রায় হেরে গেল বাংলাদেশ তথা বাংলাদেশের আপামর জনগণ। আমেরিকান কংগ্রেসম্যানদের সই জাল করা ও ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজিপি’র সাধারণ সম্পাদকের ফোন আসা জনিত বারাবারি মিথ্যাচার এ দেশকে যতোটা খাটো করল, তার চেয়ে অনেক বেশি খাটো করলেন দুই নেত্রী তাদের সভ্যতা বিচ্যুত আচারণে।

যেই জনগণের দোহাই দিয়ে তারা রাজনীতি করছেন সেই জনগণকেই তুলোধুনো করে, জ্বালিয়ে – পুড়িয়ে মারার রাজনীতি করছেন একজন। অন্যজন এই জ্বলে-পুড়ে যাওয়া মানুষের শারীরে মলম পট্টির যাবতীয় খরচ জোগানোর ঘোষণা দিয়ে দ্দিব্বি আনন্দে প্রতিসমাবেশ করছেন ও বিরোধী দলকে হেনস্থা করতে এ গুলোকই তুলে ধরছেন বিশ্ববাজারে।

কি অদ্ভুত আমাদের রাজনীতিকদের জাতি স্বত্ত্বাবোধ?

সেই ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারীর নির্বাচনকে ঘীরে শুরু হওয়া দুটি দলের মধ্যকার যুদ্ধ আজ এতোটাই প্রকট যে একে ‘সাপ আর বেজীর লড়াই’ না বলে অন্য কিছু বলা যাবেনা।

01--01ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা তার শহীদ পিতার আদর্শকে পুঁজি করে যে রাজনীতির চর্চা শুরু করেছিলেন, সেই রাজনীতিতে তিনি এখনো কতটা আছেন তা বলাবাহুল্য। তবে তার নব রাজনীতিক কৌশলে মিথ্যাচার আর প্রবঞ্চণা এতোটাই যে, গত ৬ বছরে তার সরকারের গৃহিত যাবতীয় উন্নয়ন কর্মকান্ড, সে তুলনায় অতি ম্লান।বিশেষ করে সম্প্রতী, বেগম জিয়াকে তার পার্টি অফিসের সামনে অতিপুলিশ, জলকামান, ইট-বালু বোঝাই ট্রাক ফেলে পথ আটকে রেখেও যখন বললেন তিনি বন্দি না, এর চেয়ে মিথ্যাচার আর কি হতে পারে?

অন্যদিকে ‘ঠাকুর ঘরে কেরে, আমি কলা খাইনা’ প্রবাদটিকে বার বার সত্য প্রমাণ করছেন বি.এন.পি নেত্রী খালেদা জিয়া। আওয়ামী লীগ যখনই বলছে – বিএনপির আন্দোলন করার মুরোদ নেই, তখনই তিনি বা তারা আন্দোলনের ডাক দিচ্ছে আর নিজে পার্টি অফিসে বসে কলা-ই খাচ্ছেন।যদিও আপাতদৃষ্টিতে সরকারই তাকে কলা খাওয়াচ্ছেন, সরকারি অবরোধের মাধ্যমে সারা দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ করে। সম্প্রতী তিনি যে অবরোধ ডাকলেন, সেটাতে কেউ সমর্থন করুক বা না করুক, আমি অন্তত করছি, কারণ এ অবরোধটা দু’দিন আগে সরকারই শুরু করেছেন বিএনপির সমুহ সমাবেশ ঠেকাতে।তবে এই অবরোধের নামে যে জ্বালাও পোড়াও চলছে আমি এর তীব্র নিন্দ ও ঘৃণা জানাই। পরিস্থিতির বিবেচনায় বলা যায়, আন্দোলন আর অবরোধের ডাক দিয়ে বেগম জিয়া যেন নিজেই এখন মহা বিপাকে। তার নেতা কর্মীরা কেউ মাঠে নেই এ কথা আরসবার সাথে সরকারী দলের নেতাকর্মীরাও বার বার বলছেন। তাহলে পেট্রোল বোমার ধ্বংসযজ্ঞ কে বা কারা চালাচ্ছে?

২১ জানুয়ারী সকাল ৯টার সংবাদে বণানী থানা পুলিশ বিপুল পরিমাণ বোমা তৈরির সরঞ্জামসহ কোনো এক জামায়াত নেতাকে মহাখালী থেকে ধরেছেন বলে সংবাদ সম্মেলন করলেন।খুব সম্ভব এটাই প্রথম সংবাদ সম্মেলন যেখানে আসামী উপস্থিত নেই।কেমন রহস্যময় নয় কি?

গত ১৮ দিনের অবরোধে আঙ্কুর আর আকরাম ছাড়া কোনো হামলাকারীকে গ্রেফতার বা আটক করা গেলনা। অথচ অগ্নিদগ্ধ মানুষের আহাজারী ক্রমশ বাড়ছে বার্ণ ইউনিটে। ছোট্ট শিশুটিও রেহাই পাচ্ছেনা।

এক মিলন আর নূর হোসেনের লাশ স্বৈরাচার এরশাদকে বিবেকবান করে তুললো অথচ শত শত নিরিহ মানুষের লাশ বাংলাদেশের দুই নেত্রীর বিবেককে এতোটুকু স্পর্শ করতে পারলো না।কি অসাধারণ এদের ক্ষমতা ধরে রাখার লিপ্সা?

এবার একটু অতীতের দিকে তাকাই। ফিরে যাই ২০০৬ সালের প্রেক্ষাপটে। খালেদা জিয়ার বিখ্যাত উক্তি – ‘শিশু আর পাগল ছাড়া কেউ নিরপেক্ষ নয়’, তাই বিএনপির অধীনে আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে আসার আহ্বান জানালেন তিনি। শুরু হলো লগি-বইঠার ভয়াভহতা। সাপের মত মানুষকে পিটিয়ে মারা হলো।দাবি একটাই তত্ত্বাবধায়ক সরকার। অনেকগুলো প্রাণ ঝরে গেল সেই আন্দোলনে। ১১ দিনের মাথায় দাবি মেনে নিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার আইন পাশ করে ক্ষমতা ছাড়লেন খালেদা জিয়া সরকার। প্রশ্ন এখানেই, যে খালেদা বা বিএনপির অধিনে হাসিনা বা আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিলোনা সেই হাসিনার অধিনে খালেদা কি করে নির্বাচনে আসবে।সুতরাং বিএনপির দাবি ছিল যৌক্তিক। ৫ই জানুয়ারির নিয়ম রক্ষার নির্বাচনে অনেক স্থানেই ব্যাপক কারচুপি ঐ সময় মিডিয়া তুলে ধরেছে, যা প্রমাণ করেছে হাসিনা সরকারের অধীনে নিরপেক্ষ নির্বাচন সম্ভব নয়। তিনি যদি সত্যিই নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে চাইতেন তাহলে সর্বপ্রথমে একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন গঠন করতেন এবং নির্বাচনকালীন সরকার পরিচালনার দায়িত্ব থাকতো ঐ নির্বাচন কমিশনের। তা না করেই, তারা গণতন্ত্রের নামে প্রহসণ করছেন আর দেশের আপামর জনগণকেই শিশু ও পাগল বানিয়ে রেখেছেন।

একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন, নিরপেক্ষ ও স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন ও একটি স্বাধীন বিচার বিভাগ প্রতিষ্ঠার দাবি হতে পারতো বিএনপির আন্দোলনের প্রধান হাতিয়ার। যেখানে ১৬ কোটি মানুষকে তারা যুক্ত করতে পারতেন। বিশ্ববাজারে যখন তেলের দাম কমে গেল, আমাদের দেশে তখনো একই দর। এ নিয়ে মন্ত্রীদের একজন যখন বললেন, ‘দেশে তেলের দাম কিছুতেই কমানো হবে না’।

03-03তখনই বিএনপির উচিৎ ছিলো এ নিয়ে আন্দোলনে যাওয়া। জাতীয় কোনো সংকটে বিএনপির আন্দোলন নেই। ভারতের রাজনীতিবিদ এসে এ দেশে সাম্প্রদায়ীক উস্কানী দিলেন। বিএনপি চুপ। অর্থাৎ তাদের শুধু ক্ষমতাই চাই। জনগণ বাঁচলো না মরলো তাতে কিছুই আসে যায় না। অথচ শহীদ জিয়াউর রহমানের আদর্শ ছিলো – ‘গ্রামের সাধারণ মানুষের বাঁচার নিশ্চয়তা আগে। কৃষকের উন্নয়ন আগে, তারপর ধনি ও বণিকদের কথা ভাববো।’ জিয়াউর রহমানের এ শিক্ষা বিএনপির নের্তৃত্বের কোথাও নেই।

একই কথা বলা যায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে নিয়েও, জাতির স্থপতি বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে দু’পায়ে মাড়িয়ে তারা এখন এতোটাই অন্ধ যে, সাধারণ মানুষ কি চায় তা বোঝার কোনো চেষ্টাই নেই, বরং তারা কি চান, সেটাই মানুষকে বোঝাতে জোর যার মূল্লুক তার নীতি চালু করছেন। বলা যায়, আজকের এই সহিংসতার ৮০ ভাগ দায় ই তাদের ঘাঢ়ে বর্তায়। রাজনীতির অপ বলে যা কিছু আছে, তার সবটাই তাদের থেকে শিখছে অন্যরাও। হয়তো বলবেন, একটা প্রমাণ দেখানতো?

কত প্রমাণ চান, ব্যংক কেলেঙ্কারী, শেয়ার বাজার, এ গুলো কীভাবে ধামাচাপা পড়ে গেল ভাবুন। সাগর রুনির হত্যার বিচার কি পেয়েছেন? গতকালের হত্যার বিচার যে আজ করতে পারে না, তার কাছে ৪৪ বছর আগের হত্যার বিচার কি ন্যায্য হবে? এটা খুবই স্বাভাবিক প্রশ্ন। এখানেও বিএনপির যুক্তি অকাট্য, তবে আন্দোলনের ধারা ভুল।

সবশেষে বলবো, এই দুটি দলের কাছে ক্ষমতা-ই সব, জনগণ তুচ্ছ। তাই এদের বয়কট করতে শিখতে হবে আমাদের। নতুন কাউকে, নবীন কাউকে হাল ধরতেই হবে। বেরিয়ে আসতে হবে এই পারিবারিক ধারার রাজনীতি থেকে। কবে হবে তা। আল্লাহ আমাদের সহায় হোউন।

Print Friendly

About the author

ডিসেম্বর ৭১! কৃত্তনখোলার জলে সাঁতার কেটে বেড়ে ওঠা জীবন। ইছামতির তীরঘেষা ভালবাসা ছুঁয়ে যায় গঙ্গার আহ্বানে। সেই টানে কলকাতার বিরাটিতে তিনটি বছর। এদিকে পিতা প্রয়াত আলাউদ্দিন আহমেদ-এর উৎকণ্ঠা আর মা জিন্নাত আরা বেগম-এর চোখের জল, গঙ্গার সম্মোহনী কাটিয়ে তাই ফিরে আসা ঘরে। কিন্তু কৈশরী প্রেম আবার তাড়া করে, তের বছর বয়সে তের বার হারিয়ে যাওয়ার রেকর্ডে যেন বিদ্রোহী কবি নজরুলের অনুসরণ। জীবনানন্দ আর সুকান্তে প্রভাবিত যৌবন আটকে যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙ্গিনায় পদার্পন মাত্রই। এখানে আধুনিক হবার চেষ্টায় বড় তারাতারি বদলে যায় জীবন। প্রতিবাদে দেবী আর নিগার নামের দুটি কাব্য সংকলন প্রশ্ন তোলে বিবেকবানের মনে। তার কবিতায়, উচ্চারণ শুদ্ধতা আর কবিত্বের আধুনিকায়নের দাবী তুলে তুলে নেন দীক্ষার ভার প্রয়াত নরেণ বিশ্বাস স্যার। স্যারের পরামর্শে প্রথম আলাপ কবি আসাদ চৌধুরী, মুহাম্মদ নুরুল হুদা এবং তৎকালিন ভাষাতত্ব বিভাগের চেয়ারম্যান ড. রাজীব হুমায়ুন ডেকে পাঠান তাকে। অভিনেতা রাজনীতিবিদ আসাদুজ্জামান নূর, সাংকৃতজন আলী যাকের আর সারা যাকের-এর উৎসাহ উদ্দিপনায় শুরু হয় নতুন পথ চলা। ঢাকা সুবচন, থিয়েটার ইউনিট হয়ে মাযহারুল হক পিন্টুর সাথে নাট্যাভিনয় ইউনিভার্সেল থিয়েটারে। শংকর শাওজাল হাত ধরে শিখান মঞ্চনাটবের রিপোটিংটা। তারই সূত্র ধরে তৈরি হয় দৈনিক ভোরের কাগজের প্রথম মঞ্চপাতা। একইসমেয় দর্শন চাষা সরদার ফজলুল করিম- হাত ধরে নিযে চলেন জীবনদত্তের পাঠশালায়। বলেন- মানুষ হও দাদু ভাই, প্রকৃত মানুষ। সরদার ফজলুল করিমের এ উক্তি ছুঁয়ে যায় হৃদয়। সত্যিকারের মানুষ হবার চেষ্টায় তাই জাতীয় দৈনিক রুপালী, বাংলার বাণী, জনকণ্ঠ, ইত্তেফাক, মুক্তকণ্ঠের প্রদায়ক হয়ে এবং অবশেষে ভোরেরকাগজের প্রতিনিধি নিযুক্ত হয়ে ঘুরে বেড়ান ৬৫টি জেলায়। ছুটে বেড়ান গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। ২০০২ সালে প্রথম চ্যানেল আই-্র সংবাদ বিভাগে স্থির হন বটে, তবে অস্থির চিত্ত এরপর ঘনবদল বেঙ্গল ফাউন্ডেশন, আমাদের সময়, মানবজমিন ও দৈনিক যায়যায়দিন হয়ে এখন আবার বেকার। প্রথম আলো ও চ্যানেল আই আর অভিনেত্রী, নির্দেশক সারা যাকের এর প্রশ্রয়ে ও স্নেহ ছায়ায় আজও বিচরণ তার। একইসাথে চলছে সাহিত্য বাজার নামের পত্রিকা সম্পাদনার কাজ।