ছাত্রসমাজকে দুর্নীতিমুক্ত রাখতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রের ভূমিকা : তপংকর চক্রবর্তী

অতিথি লেখক

044

লেখক অধ্যক্ষ তপঙ্কর চক্রবর্তী

ছাত্রসমাজকে দুর্নীতিমুক্ত রাখতে শিা প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রের ভূমিকা
তপংকর চক্রবর্তী

বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের পর থেকে ধীরে ধীরে দুর্নীতি সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বাসা বেঁধেছে। মূল্যবোধের চরমতম অবয়, মতার অপব্যবহার, সীমাহীন লোভ, স্বার্থপরতা, অপ-সংস্কৃতি এবং অপ-রাজনীতির বিপুল বিস্তার যখন ব্যক্তি থেকে সমাজ, সমাজ থেকে রাষ্ট্রে ঘূণ ধরাচ্ছে তখন শিা প্রতিষ্ঠান কি সত্যিকার অর্থে এ সবের বাইরে থাকতে পারে ?
শিকতা পেশায় যে মহান আদর্শ নিয়ে এক একজন শিক নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন আজ সে রকম শিক কোথায় ? গুরুর আদেশ শিরোধার্য করার মতো ছাত্রই বা কোথায় ? যে সমাজে শিক নিগৃহীত, লাঞ্ছিত, অপমানিত হলে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে না, প্রতিবাদ হলেও তা অজ্ঞাত কারণে চাপা পড়ে যায়, সে সমাজে প্রকৃতপে শিা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা কি ?
আমাদের শিা ব্যবস্থার যারা কর্ণধার, তারা চলেন বিদেশী প্রেসক্রিপশনে। দেশের প্রেতি ভাবার সময় তাদের নেই। পরিবারে, প্রাথমিক বিদ্যালয় ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে যারা পড়াশোনা করে ব্যতিক্রম ছাড়া কোথাও কি তাদের নৈতিকতা, মূল্যবোধ, মানবপ্রেম শেখানো হয় ? শেখার মূল সময়টিতে যা শেখানো হয় না বা শেখানো যায় না তা নিয়ে কথা বলে লাভ কি ?
আমরা জানি, একটি শিশুর শিা শুরু হয় পরিবার, পরিবেশ এবং শিশু শিালয় থেকে। আমাদের ‘ঘূণে’ ধরা সমাজে পরিবার ও পরিবেশ কাঙ্খিত শিা দিতে ব্যর্থ। বাকী থাকে শিালয়। প্রাথমিক শিালয়ে যদি মূল্যবোধ এবং নৈতিকতা জাগ্রত করার ব্যবস্থা না থাকে তাহলে শিকরা কি করবেন ? আবার যে শিকরা নিজেরাই নৈতিকতা কি, মূল্যবোধ কি তা জানেনওনা, অনেক েেত্র মানেনও না তারা কি শিা দেবেন ? এ বিষয়গুলো নিয়ে গভীরভাবে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে। এটা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সুতরাং ছাত্র সমাজকে দুর্নীতিমুক্ত রাখতে হলে শিা প্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রের যুগপৎ ভূমিকা যদি একই মিলনবিন্দুতে পৌঁছায়, শুধু দায় সারবার জন্য নয়, আন্তরিকতার সাথে যদি এই ভূমিকা সবাই মিলে পালন করা যায় তবেই ছাত্র সমাজ দুর্নীতিমুক্ত হতে পারে। শিাঙ্গণে ছাত্র রাজনীতির নামে প্রতিহিংসার রাজনীতিও এেেত্র একটি বিরাট অন্তরায়।
মনে রাখা দরকার, আমরা যা পারিনি, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সেটা পারবার মতো পরিবেশ তৈরি করে দিতে হবে আমাদেরই। কবির ভাষায় বলতে হয় :
“এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি
নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার”।
02অন্যদিকে সারাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় রয়েছে প্রচন্ড সমন্বয়হীনতা। কোমলমতি শিশুদের উপরে পাঠ্য বইয়ের বোঝা চাপিয়ে তাদেরকে ক্রমাগত রোবটে পরিণত করা হচ্ছে, সাথে অভিভাবকদেরও। পরীায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের মতো ঘটনা শিার্থীদের মনে যে কি ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে তা নিয়ে কারুর মাথাব্যথা নেই। ‘এক অদ্ভুত উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ।’ কোচিং, প্রাইভেট পড়া, বাসায় পড়ার চাপ, আকাশ সংস্কৃতি এবং মোবাইলের মোহ এসব শিশুদের করে তুলেছে স্বপ্নহীন, আনন্দহীন আর অনেকটাই অপরিনামদর্শী। আমাদের আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক বাতাবরণে শিা হয়ে উঠেছে সার্টিফিকেট সর্বস্ব। তাই এই অর্ধ শিতি জাতির বিড়ম্বনার শেষ নেই। যে সমাজ জ্ঞানচর্চাকে সমাদর করে না, যে সমাজ প্রকৃতপে অসভ্য-বর্বর সমাজেরই অংশ বিশেষ।
যে সমাজে প্রায় সকলেই অন্যায় করছে অথবা অন্যায়কে প্রশ্রয় দিচ্ছে অথবা নিজের দায়িত্ব কর্তব্য পালন করছে না সে সমাজে এককভাবে শিক বা শিা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা কতটুকু ? বিপরীত স্রোতে গিয়ে যদি কুচিৎ কোন শিা প্রতিষ্ঠানে শিার্থীদের ভাল কিছু শেখাতে চায় তার কার্যকারিতা বা স্থায়ীত্ব কতটুকু ?
আমার পঁয়ত্রিশ বছরের শিকতার জীবনে শিক, অভিভাবক এবং শিার্থীর পেছনে যে সময়, শ্রম এবং আন্তরিকতা নিয়ে কাজ করেছি তারপরেও খুব সুফল কি ফলাতে পেরেছি ? এ প্রশ্ন তো আমি নিজেই নিজেকে করি। উত্তর মেলে না।
পঞ্চাশের শেষ দিক এবং ষাটের দশকের শুরুতে আমরা যখন স্কুলে পড়তাম তখন ‘বাল্যশিা’ এবং ‘আদর্শলিপি’ নামে দু’টি বই পড়া ছিল আমাদের জন্য প্রায় বাধ্যতামূলক। পরিবার ছিল নীতিবোধ ও মূল্যবোধের সহায়ক। পরিবেশ তখনও যে খুব অনুকুল ছিল তা নয়, কিন্তু অল্প হলেও শিকের মর্যাদা ছিল। বাবার সম্মান দেখে আমরাও শিক হতে চেয়েছিলাম।
কিন্তু গত পঁয়ত্রিশ বছর ধরে শিকতা পেশায় নানাভাবে সক্রিয় থাকার সুবাদে সরকারি-বেসরকারি হাজার হাজার শিককে দেখে এখন ভাবতে হচ্ছে আমরা কি আসলেই আমাদের ছাত্র-ছাত্রীদের কোন শিা দিতে পেরেছি ?
তাই বলা যা, একমাত্র নতুন কোন সামাজিক বিপ্লব সংঘটিত না হলে Ñ যে বিপ্লব আমাদের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক এবং মনোজাগতিক পরিবর্তন সূচিত করতে পারে, আমরা যে বিষবৃ রোপণ করেছি তাকে উৎপাটন করা কিছুতেই সম্ভব হবে না।
কথায় আছে, আশায় মানুষ বাঁচে। আমিও নৈরাশ্যবাদী নই। এখনও যদি আমাদের শিশু শ্রেণি থেকে পাঠ্যপুস্তকে-সিলেবাসে নৈতিক শিা, অনৈতিকতাকে ঘৃণা শিশুদের শেখানো যায়, মূল্যবোধে তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করা যায়, তবে হয়তো তিন-চার দশক পরে একটি ইতিবাচক পরিবর্তন সূচিত হতে পারে। কিন্তু সে দায় এবং দায়িত্ব বর্তমান শিা ব্যবস্থার কর্ণধাররা নেবেন কিনা, পাতি বুর্জোয়া শ্রেণির স্বার্থে যা লাগবে বলে রাষ্ট্র সে দায় নেবে কি না Ñ এ এক অসম্ভব জটিল প্রশ্ন।
উন্নত রাষ্ট্রসমূহে বুর্জোয়াজি যতই প্রাধান্য বিস্তার করুক, তারা শিাকে এবং শিককে মর্যাদা দিতে পেরেছে বলেই সব বিষয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পেরেছে। তারা এমন একটি সামাজিক ও রাষ্ট্রিক শৃঙ্খলা তৈরি করতে পেরেছে যেটা প্রায় সকলেই মেনে চলে।
পরিশেষে বলি, আমার জীবদ্দশায় ছাত্রসমাজকে দুর্নীতিমুক্ত রাখতে শিা প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্র সমন্বিত ভূমিকা পালন করুক এটা আমি দেখে যেতে পারলে সত্যিই আনন্দিত ও পরিতৃপ্ত হব। #

Print Friendly