চোর উপাখ্যান : ইথিজা অবেরয়

সাহিত্য বাজার

চোর উপাখ্যান : ইথিজা অবেরয়

im-3কয়েকমাস হলো এলাকার গৃহস্থ বাড়ীর কর্তারা চরম উদ্বেগ আর উৎকন্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন। তাদের রাতের আরামের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। দিনভর ক্ষেতখামারে কঠোর খাটুনি করে কোথায় রাতে একটু আরামে মাথায় বালিশ লাগিয়ে পরম শান্তিতে ঘুমাবে সে সুখও তাদের পোড়া কপালে নেই। কারন রাত জেগে পাহারা দিতে হয় গোয়ালঘর। সুন্দরপুর গ্রামে গত দু’মাসে অন্তত দু’হালি ক্ষেতের জোয়ান বলদ চুরি হয়েছে। তার মধ্যে পশ্চিম পাড়ার সুরুজ আলীর সদ্যকেনা একজোড়া ক্ষেতের বলদও আছে। সুরুজ আলীর ইচ্ছে ছিলো এই মৌসুমের ক্ষেত শেষে সামনের কোরবানির ঈদে তার মধ্যে বেচে তাগড়াটাকে আল্লার নামে বলি দেওয়ার। কিন্তু বাধ সাধলো শালা চুরবেটা। ভোর সকালে হালে বলদ নিয়ে যেতে গোয়াল ঘরে গিয়ে দেখেন দুটো বলদ’ই নেই। সুরুজ আলী চক্ষুজোড়া চড়কগাছ। সেদিন সুরুজ মিয়ার আহাজারিতে ঘুম ভেঙ্গেছিলো সুন্দরপুরের সবগুলো গৃহস্থ বাড়ীর। সুরুজ মিয়ার গরু চুরি যাওয়ার খবর সেদিনের ‘টপ অব দ্যা ভিলেজ’ হয়ে উটেছিলো। তারপর চারিদিকে লোক সমন্ত পাঠিয়ে হদিস বের করতে পারেনি হালের তাগড়া গরু দুটোর। আশা ছেড়ে দেন সুরুজ আলী। তার পর চায়ের দোকান থেকে মাঠে সবাই হু হতাশ আক্ষেপ করতে লাগলো বেচারা সুরুজ আলীর জন্য। তার যতটা না সুরুজ আলীর গরু হারানোর বেদনার্তে তার চেয়ে বেশি এমন তাগড়া বলদটা ঈদে ভক্ষন না করতে পেরে। বেচারা সুরুজ আলী গরু হারিয়ে একেবারে নি¯প্রভ হয়ে পড়েন। তার সারা বাড়ী জুড়ে নেমে আসে মরা বাড়ীর নিরবতা। তার দুদিন পর উত্তর পাড়ার চাঁন মিয়ার একটা হালের গরু চুরি হয়ে যায়। চাঁন মিয়ার ইচ্ছে ছিলো এই গরুটা সামনের হাটে বিক্রি করে নয়া একটা নিকাহ করার। ঘরে দুই দুই জন বিবি আছে। তবুও যেনো বুড়োর সখ মেটেনা নিকাহ করার। তাই বুড়োর গরু চুরি হওয়াতে গ্রামের কেউ তেমন কেউ আক্ষেপের নিঃশ্বাস ছাড়েনি আকাশে-বাতাসে। দক্ষিন পাড়ার জমির আলী তো সামনাসামনি বলে ফেলে- চাঁন ভাই এইবার বুজি আর বিয়াটা খাওয়া হইলোনা। সবাই সম্বসরে বত্রিশ দাতঁ বের করে হুহু করে হেসে উটে। হটাৎ কেউ দেখলে মনে হতে পারে এখানে সার্কাসের খেলা চলছে। দিনের পর দিন মশার কামড় সহ্য করে রাতজুড়ে পাহার দেন গরুর মালিকেরা। কিন্তু পাহারা দিয়ে আর কতদিন রাখা যায়? তাই শেষ মেষে গোয়াল ঘরে তালা মারার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো। সচারাচর গ্রামের গোয়াল ঘরে তালা মারা হয়না। কিন্তু এবার তালা মারতে হবে। অন্তত নিজের জানটুকু বাচানোর জন্য হলেও। যেভাবে নিজেদের জানের উপর একের পর এক ধকল ধাচ্ছে তাতে তালা মেরে নিশ্চিত থাকতে হবে। বাচাঁতে নিজের প্রানধনটাকে। কিন্তু চাইলে কি নিশ্চিন্ত থাকা যায়?।
দুই.
পশ্চিমপাড়ার কদম আলীর হালের জোয়ান একজোড়া বলদ। গত সাপ্তাহে পাইকার একটা বলদের দাম হাকিয়েছিলো ষাট হাজার টাকা করে। কিন্তু কদম আলী বিক্রি করবেনা। তার এককথা একটা বিক্রি করলে আমার আরেকটা বলদ একলা হয়ে যাবে। গ্রামের গরু চুরির হিরিক পড়ায় তিনিও বেশ দুশ্চিন্তায় আছেন। গত কয়েকদিন গোয়াল ঘর পাহারা দিতে গিয়ে বেশ ধকল গেছে তার বুড়ো জানের উপর দিয়ে। আজ তাই সিদ্ধান্ত নিলেন হাট থেকে বড়সড় একটা তাল কিনে আনবেন। এতে অন্তত চুর বেটা এত মোটাসোটা তালা ভেঙ্গে চুরি করার দুঃসাহস করবেনা। হাটে গিয়ে চারশ টাকা দিয়ে ‘মেড ইন চায়না’ দেখে একটা বড়সড় তালা কিনে আনলেন। রাতে খাওয়ার পর আল্লার নাম তেত্ত্বিশ বার জপে পরম যতেœ দেখে শুনে তালা মারলেন গোয়াল ঘরে। ঘরে এসে নিশ্চিন্ত মনে বিছানায় মাথা রাখলেন। এতদিনের চোখে জমানো ঘুম তাই মাথা বালিশে রাখতেই হারিয়ে গেলেন অতল ঘুমের রাজ্যে। যখন ঘুম ভাঙলো তখন ভোর হয়ে গেছে। যদিও ঘুমানোর আগে ভেবেছিলেন মাঝরাতে জেগে একবার এসে গরু দুটোকে দেখে যাবেন। কিন্তু এতই ঘুমে মজেছিলেন সে ঘুম আর সহজে ভাঙেনি। তার ঘুম ভাঙলো মুয়াজ্জিনের আযান শোনে। অভ্যাশমত দাত মাজতে মাজতে গিয়ে দাড়ালেন গোয়াল ঘরের দোয়ারে। গোয়াল ঘরের সামনে গিয়ে কদম আলী তাজ্জব বনে যান। বিস্ফোরিত তার চক্ষুযুগল। গোয়াল ঘরের তালা খোলা। হায় হায় করে উটেন কদম আলী। গোয়াল ঘরের ভীতরে টুকে গিয়ে দেখেন তার গোয়াল ঘর শুন্য। নিচে পড়ে রয়েছে একটা চিরকুট। চিরকুট হাতে নিয়ে কদম আলী ঝাপসা জল চোখে পড়তে লাগলেন-
“বউ রাখেনা কাবিনে
গরু রাখেনা তালায়”।
ইতি- আপনার স্নেহভাজন গরু চোর ।

Print Friendly